হোম বিভাগবিহীন দ্বিষদ অসুখের রকমফের ও অনুৎকীর্ণ প্রাপ্তবয়স্কতা

দ্বিষদ অসুখের রকমফের ও অনুৎকীর্ণ প্রাপ্তবয়স্কতা

দ্বিষদ অসুখের রকমফের ও অনুৎকীর্ণ প্রাপ্তবয়স্কতা
579
0

“শিল্পকর্মের বিচারে ছোটগল্প পলকাটা হীরের মতো সংহতি ঘনত্বে নিরেট, তথা বাহুল্যহীনতার জন্য নিখাদ। অসহ্য এবং অস্বচ্ছ তার স্বচ্ছতা, যে কোনও আলোর রেখাকে সে যে কোনও কোণে বাঁকাতে পারে, চূর্ণ করতে পারে, পারে ঠিকরে দিতে—a flash that suddenly illumines, then passes. অতর্কিতে সে মানুষের হৃদয় বিদীর্ণ করে দেয়। সার্জেনের ক্ষিপ্র ছুরির মতো তার প্রতিটি আঁচড় রক্তরেখার আগে আগে চলে। তার ক্ষত নিরাময়, নিশ্চিহ্ন হবার পরেও থেকে যায়। চোখের আড়ালে খচখচ করে জানান দেয়।”

ব্রিটিশ গল্পকার ও সাহিত্য সমালোচক ভিএস প্রিচেটের উপরিউক্ত বক্তব্য আমার প্রায়শই মনে পড়ে যখনই কোনও গল্পের বইয়ের পর্যালোচনা করতে বসি। আসলে গল্প তো সেটাই যা বহু উপন্যাসের সম্ভাবনাকে পিষে দিয়ে মাথা উঁচু করে তার সুরভি ছড়িয়েছে আদিগন্তজুড়ে। বয়সে উপন্যাসের চাইতে অনেকটা ছোট হলেও গুরুত্ব বা প্রকরণে তা হীন তো নয়ই বরং অপ্রতর্ক্য ঢঙে সুসন্নদ্ধ তথা সমুচ্ছিত।


তানিমের গল্পের, আমার পাঠ-দর্শনে, উৎস একরূপ, একমুখী; যদিও প্রেক্ষিত ভিন্নতর।


শুরুতেই যে মুখব্যাদান [ঐতিহাসিক তপন রায়চৌধুরীর রস-কথন অনুযায়ী] রাখলাম তার বিশেষ কারণ, আজকাল বেশির ভাগ গল্পই যখন মননের ক্ষুধা যথাযথ মেটায় না, তখন এই তরুণ গল্পকারের অনধিক একশো পৃষ্ঠার একটি ছোট্ট গল্পগ্রন্থের [অসুখগুলো প্রাপ্তবয়স্ক] মাত্র ছটি গল্প আমাকে নড়েচড়ে বসতে বাধ্য করেছে। যদিও অসীম রায়ের মতো দৃপ্ত ঢঙে এখনই বলতে পারছিনা যে এই তরুণের গল্পের নিশ্বাস পাঠকের গায়ে এসে লাগবে, কেননা এই গল্পকারের সবে পথ চলা শুরু, তবুও আশা জোরদার হয় গল্পগুলি মন দিয়ে পড়লে। প্রসঙ্গত বলি, ভৌমজল প্রকৌশলী লেখক রেজওয়ান তানিমের এটি প্রথম গল্পের বই। এর আগে তার দুটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ পেয়েছিল। সেই অর্থে তানিমকে মূলত কবি হিসাবে চিহ্নিত করা যায়। আর এখানেই যে আলোচনা আবশ্যিক হয়ে পড়ে তা হলো কবির সঙ্গে গল্পকারের সহমর্মিতার মেলবন্ধন। কবি যেখানে আহরণ করেন বস্তুর সাংকেতিকতা, গ্রহণ করেন তার ভাবনির্যাস সেখানে গল্পকারের কাছেও প্রত্যক্ষ প্রতিবেশ তার অবলম্বন এবং উদ্দীপক বিভাব। কবিতা যেখানে জীবনের ভাবরূপ, ছোটগল্প সেখানে সেই জীবনেরই প্রতীকী প্রকাশ। আলোচ্য বইটির ‘ধ্বংসপুরাণ অথবা সৃষ্টি’ জাতীয় গল্প পাঠ করলে এই কাব্যানুষঙ্গের পরিচয় মেলে। আসলে কবির মতো গল্পকারও বস্তুময় জীবন থেকে ছিন্ন ছিন্ন সামগ্রী জোগাড় করে নেন।

যে কোনও শিল্পবস্তুর মতোই ছোটগল্পও তৈরি হয় ‘ইমপ্রেশন’ থেকে। S T Coleridge বলেছিলেন, ‘No man was ever yet a great poet without being at the same time a profound philosopher’. অর্থাৎ এখানেও দর্শনজাত ইমপ্রেশনের ভূমিকার কথা বর্তমান। এই কথাকেই একটু ঘুরিয়ে বলা যায়, কেউ-ই মহৎ গল্পলেখক হতে পারেন না যদি না তার একান্ত-নিজস্ব ইমপ্রেশন গ্রহণের শক্তি থাকে যার উৎস হতে পারে বিচিত্রমুখী—টুকরো টুকরো দর্শন [দেখা]।

কিন্তু তানিমের গল্পের, আমার পাঠ-দর্শনে, উৎস একরূপ, একমুখী; যদিও প্রেক্ষিত ভিন্নতর। নানাবর্ণিল খুনের পটভূমিতেই তার গল্পচলন; সেইসব খুন, যা কিনা সুবোধ ঘোষের গল্প ‘মা হিংসীঃ’র ছন্দে বলতে হয়, ভুল করে হয়, মেজাজের ভুল। আবার জ্ঞানপাপজাতও বটে।

শুরুরও যেমন শুরু থাকে তেমনি গল্পগুলো নিয়ে নাড়াচাড়ার আগে বলি, বইটির নামকরণ প্রসঙ্গে। প্রথম চোটেই হোঁচট খেয়েছিলাম ‘অসুখগুলো প্রাপ্তবয়স্ক’ নামটি দেখে। পাঠান্তে বুঝেছি, আজকের আর্থ সামাজিক-রাজনৈতিক আবহে সাবলীল সব খুন সমন্বিত যে প্রভবিষ্ণু প্রেক্ষিত সেখানে আমাদের দেখার চোখ, নিয়ত-প্রচল অভ্যাস, সৌমনস্য সম্পর্ক—সবই কেমন অনাবিদ্ধ ঢঙে প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে গেছে; তাই পথপাশে মৃতদেহ পড়ে থাকতে দেখেও পথচারী কেমন অপাঙ্গে তাকিয়ে আপন ব্যস্ততার কর্মপথে উধাও হয়। যেন সবই স্বাভাবিক, সবই নির্ধারিত। এভাবেই তো আমাদের অন্তর্গত অসুস্থতাসমূহ কবে কবে বেড়ে ওঠে, হয় প্রাপ্তবয়স্ক। তানিমের বয়ানেই বুঝে নিই তার গল্পভাব। ‘অসুখডুবের রোজনামচা’-য় তিনি বলছেন, ‘লোভ, হিংসা, বিভেদ, কাম, ক্রোধ, জরা, খুন, ধর্ষণ, রাহাজানি বা সন্ত্রাস—এগুলো শূন্যে মিলিয়ে যায় না চোখ বুজে থাকলে। ওরা আছে দিনের আলোর মতো, সত্যের মতো, পাতা হারিয়ে মৃত্যুর দোরগোড়া থেকে ফিরে আসা শীতশেষের বৃক্ষশাখার মতো। আলো যতটা সত্য, অন্ধকার তার চেয়ে কিছুমাত্র কম নয়। বরং ওরাই এখন ভীষণ শক্তি নিয়ে মানুষের যেটুকু ভালো, অবশিষ্ট সুকুমার বৃত্তিগুলোকে তিলে তিলে নষ্ট করে দিচ্ছে। আর এরাই হয়ে উঠছে দিনকে দিন সময়ের সন্তান, প্রকৃত উত্তরাধিকার। আমরা সকলে ডুবে আছি আশ্চর্য এক অসুখে যার রোজনামচা লিখতে গিয়ে পুনঃপুন বিক্ষত হওয়া ছাড়া আর পাবার কিছু নেই।’ তাই বইয়ের নামকরণের যথাযথ্য উপেক্ষণীয় নয়।

‘বর্ষামাত্রিক’ দিয়ে শুরু এই বইয়ের গল্পযাত্রা। দুটি গুম-খুন আর একটি খুন-ভাবনায় জারিত এই গল্পের রহস্য-খোল যেখানে নুলা মুসা এক ভাড়াটে খুনি যাকে আজকের শব্দবন্ধে বলা যায়, সুপারি কিলার। যদিও তাকে মারতে চাওয়া চেয়ারম্যান জয়নালের লোক রজব আলীকে প্রতীক্ষিত খুন করে সে তার চরম প্রতিশোধ কড়ায় গণ্ডায় আদায় করে ছেড়েছে। এখানে জয়নালের খুন আত্মহত্যা বলে প্রাথমিকভাবে মনে হলেও পরবর্তীতে তা খুন বলেই প্রতিপন্ন হয় যার হন্তারকও সেই মুসা। এরমধ্যেই ঢুকে পড়ে সাংবাদিক রাশেদউদ্দিন যে নানাবিধ তদন্তে এসে জড়িয়ে যায় এই গুমখুনের তালাশ-প্রক্রিয়ায় এবং আক্ষেপজর্জর হয় এই কারণে যে সে-ই মাঝি হাবিজুলের সহায়তায় খুনি মুসাকে বাঁচিয়েছিল। শেষতক সেও শিকার হয়ে যায় মুসার আক্রোশের যার প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিতমাত্র পাই গল্পান্তে।

রহস্যাবৃত বর্ষাঘন রাতের মতোই এই গল্পের শুরু ও চলন। মুসা গলিময় ঢাকার পথে, খুঁজে খুঁজে পৌঁছে যায় তার অভীষ্ট লক্ষ্যস্থলে; এবং দীর্ঘ অপেক্ষার পর সে তার শিকার হাত-মুঠোয় পায় আর নিপুণ কৌশলে নৃশংসতার চরমে গিয়ে খুন করে রজবকে। কাটা কাটা বাক্যে এই অপেক্ষার বর্ণনাও বেশ রহস্যময় :

‘দীর্ঘ অপেক্ষা।
রুদ্ধ নীরবতায়।
চাপা অন্ধকারে।
অপেক্ষা কিছু রক্তের।
অপেক্ষা আর একটি খুনের।
আর এ অপেক্ষা মানুষের আদিমতম প্রবৃত্তির নাম।’

এরপরই সৃষ্টির প্রথম খুনি ও তার শিকার কাবিল-হাবিলের উল্লেখ এক বাড়তি মাত্রা যোগ করে গল্পশরীরে। ঘটনা নৈমিত্তিক। টানটান বর্ণনার দাপটে তার অভিঘাত পরাক্রমী। মধ্যেমাঝে স্বভাবজ কাব্যিক নির্যাস সাধারণ গল্পবস্তুকেও সুসন্নদ্ধ করে তোলে। ‘পার (পাড়)  ভাঙানো দেমাগি জল’, ‘চারপাশের বিস্তীর্ণ জলে গুলে গেছে কালি, এক অন্ধরাত… ‘জাতীয় কাব্যময় প্রকাশ যেমন আছে, তেমনই আছে ‘চোদনার পো’, ‘খানকির নাতি’, ‘… চুদতি চুদতি ন্যাদা বানাতি পারি’, ‘ইনভেস্টিগেশন চোদাইতে চোদাইতে’ জাতীয় চাঁচাছোলা শব্দাবলি যা শ্লীল-অশ্লীলের ভেদরেখা মাড়িয়ে সঠিক গল্পের হাড়মাস গড়ে তোলে, অবধারিতভাবেই। এখানেই গল্পকারের শুদ্ধতা।

‘প্রমাণ-প্রকাশ নিয়ে সমালোচকের গবেষণা। কিন্তু প্রত্যক্ষের অতীত যে একটি অনুভব তা নিয়ে লেখকের সম্ভাষণ। বইয়ের দ্বিতীয় গল্পটি অর্থাৎ ‘অন্ধ নিসর্গে, আলো অলঙ্কারে’ পড়তে গিয়ে অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তর এই উক্তি মনে এল কেননা বাস্তবকে ছাপিয়ে গল্পে যে এক প্রতীকী অনুভব লক্ষ করি সেখানেই লেখকের ব্যক্তিত্বের স্বাক্ষর অনুভূত হয়। এ গল্প একাকী মধ্যবয়স্ক  মোবারক মনির নামে এক ‘জিন্দা লাশ’-এর। গল্পের চলন এইরকম যেখানে ঘিঞ্জি শহরের প্রাসাদোপম অট্টালিকার গা ঘেঁষে বস্তির নগ্নতা। বৈষম্যের ভাষায় কথা বলে মেকি উন্নয়ন; আর তেমনই তুলনামূলক বৈসাদৃশ্যের মাঝে পিছিয়ে পড়া অংশে বাস এই মোবারকের। আসলে লেখকের বয়ানে সেখানে ‘সে জীবন যাপন করছে না, যাপন তাকে কষে বেঁধে নিয়েছে, অতঃপর নিজেকেই বয়ে যেতে বাধ্য করছে।’ সুরতিটোলা পুরনো মসজিদ এলাকার গলি মহল্লাগুলোও ধুঁকে ধুঁকে চলছে ঠিক তারই মতো। সেখানে নিত্য-নূতন ঝইঝগড়ার প্রবাহিত জীবন আর তার মাঝেই স্বাভাবিক বাস ধনী নেতা খয়বর সর্দার আর অন্ধ চান মিয়ার যে কিনা পুরনো দ্বন্দ্বের জেরে খয়বরকে চক্ষুশূল মানে। এরই মধ্যে মহল্লায় উৎসবের জেল্লা ছড়িয়ে গেল একদিন। খয়বরের মেয়ে আলভিনার বিয়ে যার নাম শুনলেই কুৎসা রটনায় পারদর্শী চান মিয়ার ‘মনে লয় য্যান কান্দুপট্টির খানকী একটা।’

এই বিয়ের গণ-দাওয়াতে নিমন্ত্রিত মোবারক মনিরও। সাজগোজ করতে করতে সে স্মৃতিতাড়িত হয়। ফিরে যায় উনত্রিশ বছর আগের বউ জমিলা খাতুনের সঙ্গে নিজস্ব ফুলশয্যার রাতের দৃশ্যে। সেইদিন যৌথজীবনের দ্বার উন্মোচিত করলেও তা তার স্থায়ী হয় নি। সেই থেকেই সে স্ত্রী সন্তানহীন একা। বিমর্ষ মোবারক ভাবে সময় নামক এই অসুস্থতায় তার যৌবনের কোনও সাধই পূর্ণ হয় নি। আজ হঠাৎই সুপ্তোত্থিত হয়ে তাকে টালমাটাল করেছে সেই শারীরিক-মানসিক ক্ষুধা যা মানিকের ভাষায় প্রাগৈতিহাসিক। তাই সে কিনে এনেছে এক প্রাণহীন প্লাস্টিক—ম্যানিকুইন যাকে জড়িয়ে সে মেটাতে চায় তার উপ্ত জৈবিক খিদেটা। এখানেই তৈরি হয় গল্পবাঁক।


গল্পের নামকরণের মধ্যে লেখকের অদ্ভুত এক ঘোরাল পাকদণ্ডী আছে যা শুরুতেই ভুলভুলাইয়ায় নিক্ষেপ করে আম-পাঠককে। 


তার একান্ত প্রস্তুতির মুহূর্তটি নিপুণ বাক্যবিন্যাসে ফুটিয়ে তুলেছেন গল্পকার যেখানে তিনি বলছেন, ‘উত্তেজনা উঠে যাওয়া বয়স্ক পুরুষ আর নারীদেহের ঘ্রাণ পাওয়া উন্মত্ত ঘোড়ার মধ্যে নেই পার্থক্যবিশেষ, দুটোর বেলাতেই উত্থিত যন্ত্র আর নামতে চায় না সহজে।’ এও তো এক অমলিন দর্শন, অমোঘ অনুভব। ঠিক এখানেই জুড়ে যায় গল্পের ক্লাইম্যাক্স। মোবারকের বন্ধ দরজায় কড়া নাড়ে অন্ধ চান মিয়া। মোবারক দরজা খুলতে না চাইলে এক কালের দাপুটে আর এখনকার নখদন্তহীন বুড়ো মিয়া ক্ষুব্ধ হয়ে সামান্য আঘাতেই ভেঙে ফেলে দরজার দুর্বল ছিটকিনি। আবার একটি অযাচিত খুনের সামনে পড়ে যাই আমরা। আসলে একটা আত্মহনন পর্যবসিত হয় খুনে। বিষ মেশানো দুধের গ্লাস যা মোবারক নিজের জন্য রেখেছিল তাই জোরপূর্বক গলায় ঢেলে দেয় বৃদ্ধ চান মিয়ার। নিজের যে নষ্ট জীবনকে বারছয়েক চেষ্টাকরেও শেষ করতে পারে নি সেই ভীরু মোবারক এমন সফল কাম হলো একজনকে খুন করে এবং তাকেও সে বিরাট অর্জন হিসাবে, অর্থবহ হিসাবে মান্যতা দিয়ে নিজেকে রাবীন্দ্রিক ঢঙে বীরপুরুষ ভেবে আত্মপ্রসাদ লাভ করল—কোথাও কি জোরপূর্বক কিছু করার তাগিদ ছিল লেখকের মনে? নাকি ‘খুন’ শব্দটাকে মান্যতা দিতেই তার এই অপ্রতিসম প্রয়াস! প্রশ্নটি থেকেই গেল। অবশ্য একে যদি অধিক বা মিথ্যা বাস্তবতার গল্প বলে ধরি তবে এর সাহিত্যমূল্য অনস্বীকার্য। শেষ মুহূর্তে হাস্যময়ী জমিলা খাতুনের আবির্ভাবও পাঠককে খানিক চমকিত করে বইকি! কোনও ধোঁয়াটে ভাব কি থেকে যায়!

এপার বাংলা থেকে প্রকাশিত গৌতম অধিকারী [যিনি আবার পাঠান্তে এই বইয়ের অদীনসত্ত্ব মুখবন্ধ লিখেছেন] সম্পাদিত ‘গল্পদেশ’ পত্রিকার প্রথম সংখ্যায় তানিমের যে স্তুত্য গল্পটি পড়েছিলাম সেই ‘চন্দ্রাহত প্রহরে কেউ’ এখনকার আলোচ্য। গল্পের নামকরণের মধ্যে লেখকের অদ্ভুত এক ঘোরাল পাকদণ্ডী আছে যা শুরুতেই ভুলভুলাইয়ায় নিক্ষেপ করে আম-পাঠককে। গল্পের কন্দরে ঢুকলেও অগভীর পাঠক কিছুটা ঘুরে মরবে বইকি! প্রতিটি গল্পের নামকরণই অল্পবিস্তর এই বৈশিষ্ট্যে সমুজ্জ্বল। খানিক পীড়িতও বটে। যাই হোক, এটিও আর এক গুম-খুনের গল্প। আমাদের রোজনামচায় এ সব অনাবিদ্ধ সাধারণ ঘটনা কিন্তু বিন্যাসের পরাক্রমে সেইসব ঘটনাই হয়ে ওঠে প্রাতিস্বিক।

রবীন্দ্রনাথ একসময় তাঁর সাহিত্য সচিব কবি অমিয় চক্রবর্তীকে লিখেছিলেন, ‘মানুষের আপনাকে দেখার কাজে আছে সাহিত্য। তার সত্যতা মানুষের আপন উপলব্ধিতে, বিষয়ের যাথার্থে নয়। সেটা অদ্ভুত হোক, অতথ্য হোক, কিছুই আসে যায় না। এমনকি সেই অদ্ভুতের, সেই অতথ্যের উপলব্ধি যদি নিবিড় হয় তবে সাহিত্য তাকেই সত্য বলে স্বীকার করে নেবে।’ কথাটি মনে পড়ল তানিমের এই গল্পটি প্রসঙ্গে যেখানে গল্পনায়ক এক নামহীন ভাড়াটে খুনি যার কাজই হচ্ছে যে নীতি-আদর্শ-দলমত নির্বিশেষে অর্থের বিনিময়ে খুন করে যাওয়া। লোকটা নামহীন কেন? এই কারণেই যে জঘন্য পেশাদারিত্বের নিরিখে তার নাম-পরিচয় তুচ্ছ। গল্পের শুরুটা কাব্যময়, আছে চন্দ্রালোকিত রাতের অনুষঙ্গ যেখানে ‘চারপাশে ছড়ানো চাঁদোয়ার মাতাল আহবান।’ প্রহর চন্দ্রাহত, খুনের শিকার ও শিকারি উভয়ই চন্দ্রাহত-বা। ইংরেজিতে চন্দ্রাহত অর্থে লুনাটিক, উন্মাদ। অনেকের বিশ্বাস, এমনই চন্দ্রাহত ক্ষণে প্রার্থীর মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হয়। এখানেও তো খুনির লক্ষ্যভেদ হয়েছে; কিন্তু বিষঙ্গাক্রান্ত উন্মাদনায় সে নিজেও যে নার্সিসাসের ঢঙে খুনের শিকার হয়ে গেছে সেই প্রেক্ষিতেই রবীন্দ্র-কথিত অদ্ভুত, অতথ্যের অন্তর্গত উপলব্ধি যা এই অধিক বাস্তবতার গল্পটিকে স্বয়ংদীপ্যমান করে তুলেছে বলেই আমার বিশ্বাস।

খুবই সাদামাটা আকছার-দৃষ্ট গল্পের বিষয়। নগরের পথ জুড়ে বিবিধ রাজনৈতিক দলের দুর্বার মিছিল, পাল্টা মিছিল—আখলাক পার্টি, ন্যাশনালিস্ট পার্টির জোট আর তার বিপরীতে জনতা লীগ। এই বিস্রস্ত পরিস্থিতির মাঝে অসহায় দাঙ্গা পুলিশ আর র‍্যাবকে কলা দেখিয়ে অভ্যস্ত খুনি তার আরব্ধ কাজটা সেরে ফেলে। এমন দৃশ্যপট এপার-ওপার সর্বত্রই প্রকট, বিশেষত ভোটসর্বস্ব রাজনীতিতে নতুন কিছু নয়। কিন্তু এরপর যে দৃশ্যবদল তথা গল্পের বাঁকবদল হয় তাতেই উত্তরণ ঘটে গল্পের তথা গল্পকারের। নর্দমায় পতিত শিকারের কাটা মুণ্ডু খুনির সঙ্গে অনাবিল কথালাপে জড়িয়ে যায় আর এই অস্বাভাবিকতাতেই চরম ভীত হয়ে পড়ে অভিজ্ঞ খুনি। অট্টহাসি দিয়ে শিকার যখন জানতে চায়, ‘কত টাকার লাইগা আমারে মারলেন, কন দেখি।’ তখন খুনি পালাতে চেষ্টা করে। হাতের চাপাতিটা ছুড়ে ফেলতে চেষ্টা করলেও পারছে না। তার শরীরের অঙ্গ হয়েই লেপ্টে থাকছে তা। হঠাৎই শিকারের চেহারায় নিজেকে দেখে খুনি। শিকার হয়ে যায় তার আয়না। কাটা মুণ্ডু বলে দেয় তার কাছ থেকে খুনির পালাবার পথ নেই। মিলবে না রেহাই। এরপর যে যেভাবে খুনি আক্রান্তকে মেরেছিল একে একে তারও সেই দশা হলো। শেষে গলা থেকে ধড় আলাদা হয়ে গেলে শিকার-শিকারি একাকার হয়ে যায়। অদ্ভুত পরাবাস্তব ধোঁয়া ছড়িয়ে শেষ হয় গল্প যেখানে নিজের অজান্তেই খুন হয়ে যায় খুনি, কোনওরূপ বাস্তব আঘাত ব্যতিরেকে। এখানেই বাস্তবের মিথ্যা সত্য হয়ে ওঠে সাহিত্যে। উত্তরিত হয় সাধারণ একটি ঘটনা সহভূ প্রাতিস্বিকতায়—বিশ্বসনীয় না হয়েও।

আবার একবার স্মরণ করি অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তর প্রাগুক্ত কথা যেখানে তিনি প্রমাণ, প্রত্যক্ষতার অতীত অনুভবই যে লেখকের বীজমন্ত্র তা উদ্ব্যক্তি সহকারে বলেছিলেন। প্রসঙ্গ, গল্পকারের ‘ধ্বংসপুরাণ অথবা সৃষ্টি…’ নামাঙ্কিত অদ্ভুত গল্পটি যা আবিশ্ব ঘটে চলা এক নিয়ত ভয়ংকর পরিস্থিতির মোকাবিলায়  বিচিত্র সমাধানের পথ দেখায়—আবক তালি ঢঙে। চমকপ্রদ উন্নয়নের নামে অবিরাম নির্বোধ বৃক্ষচ্ছেদন এবং তজ্জনিত যে সামগ্রিক দূষণ তথা অসহনীয় উত্তাপ গোটা পৃথিবীকে আজ নিশ্চিত ধ্বংসের কিনারে এনে দাঁড় করিয়েছে তারই দুর্ভাবনাময় ছবি এঁকেছেন তানিম অনেকটাই কাব্যিক নির্যাসে। এখানে ইরা-মাহসুদ-রফিক-লাবলি-নিলয় নাম্নী কিছু প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ চরিত্র আছে বটে কিন্তু তা নিতান্তই গল্পচলনের খাতিরে। মূল চরিত্র এক ক্রমোপচিত স্থবিরতা যার জন্ম এক অনড় যানজট থেকে এবং স্বাভাবিকভাবেই যা আমাদের নাগরিক জীবনের প্রাত্যহিক ঝঞ্ঝাটময় অঙ্গ। শুধু নাগরিক জীবনের কথাই বলি কেন, মফস্বল শহর ছাড়িয়ে গ্রামগঞ্জেও তার দুর্বিষহ আঁচ লেগেছে যথেষ্টই। কিন্তু এই অগ্নিপাট বিষয়টিকে নিয়েই শুধু নাড়াচাড়া করলে তো আর গল্প হয় না, প্রবন্ধ-নিবন্ধ হতে পারে। তাই এই জ্বলন্ত সমস্যার অবিশ্বাস্য সমাধানের বাঁকপথে পাঠককে চালিত করলেন গল্পকার তার স্বভাবজ নৈপুণ্যে। তথ্যাভিজ্ঞ পাঠক এই শেষ পর্বেই ছোঁয়া পেয়ে যান কাফকায়েস্ক মেটামরফোসিসের। এখানেই এক একঘেয়ে নিত্যকার বিষয় পেয়ে যায় নতুন মাত্রা। অনুসন্ধানী পাঠক ভাবতে থাকেন, যদি এমনটি হতো! যদি শ্বাসরুদ্ধ মানুষ এভাবেই খুঁজে পেত খানিক প্রাণদায়ী সবুজ, স্বচ্ছ বেঁচে থাকার টুকুন রসদ! এখানেই একটু গল্পপথে ফিরি। একটা দুর্ঘটনা। কয়েকটি ছাত্রের মৃত্যু। পথ অবরোধ। খুবই স্বাভাবিক বিষয় আজকাল। কিন্তু ধীর লয়ে এটাই চলে যায় অস্বাভাবিকতার অতল গহ্বরে যেখানে নিশ্চলভাবে থমকে যায় পথহারা মানুষ, আশ্চর্যজনকভাবে থমকে যায় সময়ও। আর এই থমকানো সময়েই জন্ম নেয় নানান অবিশ্বাস্য সব ঘটনা, শেষত সেই ক্লাইম্যাক্স যখন একে একে জন্মাতে থাকে  না-মানুষ, না-বৃক্ষ জাতীয় এক প্রজন্ম যারা জন্মমাত্রই আশ্চর্য দক্ষতায় পুষিয়ে দিতে থাকে প্রকৃতির ক্ষয়ক্ষতি যা নির্মম মানুষের অমানবিক অবদান। এই স্বপ্নিল প্রজন্ম ‘নতুন সময়ের, নতুন নগর কাঠামোর সন্তান।’ চকিতে মনে পড়ে যায় নচিকেতার সেই গান… ‘যখন সময় থমকে থাকে… স্বপ্ন স্বপ্ন স্বপ্ন স্বপ্ন দেখে মন…।’ হয়তো কোনওদিন এমন স্বপ্নই বাস্তবায়নের সুগম পথে হাঁটবে; হয়তো না। তবুও সামগ্রিক ধ্বংসের হাত থেকে এ বিশ্বকে বাঁচাতেই তো গল্পকারের এই কল্পক প্রয়াস। এবারে লেখকের কাব্যবিভাবের সামান্য পরিচয় দিই। নিত্যযাত্রীর পরনের জামাটির বর্ণনা যা তিনি রাখছেন তা এইরকম :

‘চামড়া পুড়ে গাঢ় কালো হয়ে ওঠা দেহের অফিসগামী লোকগুলোকে দেখে মনে হচ্ছিল, পরাজিত সৈনিকদল বহু কষ্টে মার্চ করছে। আর তাদের ঊর্ধ্বাঙ্গের অন্তর্বাসে দেহ নিঃসৃত জল ও নুন নিবিড় হয়ে সঙ্গমকাব্য লেখার ফলে বিশ্রীভাবে বের হয়ে আসা তরলটুকু, বিন্দু বিন্দু ছড়িয়ে গিয়ে স্পষ্ট হতে থাকে উপরের তুলনামূলক শক্ত নানান গাঢ়ত্বের দাগকাটা বা একরঙা কাপড়খণ্ডের গায়ে, শার্ট বলে যার পরিচিতি।’ এমন কাব্যরস সুরভিত বর্ণনা যেমন আছে, তেমনই আছে সটানভাষ্যও : ‘রফিক আমি, চুদির ভাই, /পাইলে বাগে, মাইয়া খাই।’ একটু বড়, তবুও পাঠক ক্লান্ত হবেন না এই গল্প পড়তে; এবং অবশ্যই ভাবতে হবে… ‘শেষের সে দিন ভয়ংকর!’

একটি আরবি শব্দবন্ধ ‘মর্সিয়ানামা’ যার অর্থ শোকগাথা বা শোকগীতি। এই নামের এবারের আলোচ্য গল্প যা একটা হঠাৎ-মৃত্যু [অবশ্যই খুনজনিত] পরবর্তী শোকজ্ঞাপনের তৎসহ লাশ—দাফনের নিয়মিক আবহে নির্মিত। এক অদ্ভুত আতঙ্কগ্রস্ত বালক জমিরের পড়িমরি দৌড় দিয়ে গল্পের শুরু। সে পেরোচ্ছে এক রহস্যঘেরা খামারবাড়ি যার নাম ‘আমজাদ ব্যাপারীর সমন্বিত কৃষি খামার।’ এর দাপুটে মালিক আমজাদ লস্কর ওরফে আমজাদ মাতবর ওরফে আমজাদ ব্যাপারী যার দোকান-কর্মচারী এই জমিরের বাবা দরিদ্র আমিনুল্লাহ যে কিনা ঘটনাচক্রে খুন হয়ে গেছে দোকানের দায়িত্ব সামলাবার কালে। এই দুঃসহ খবরের আভাস তাকে দেয় গ্রামেরই মজিদ চাচা। বাড়ি ঢুকে জমির মানুষের ভিড় দেখে,  ইতস্তত সুবিন্যস্ত কান্নারোল শুনে বুঝতে পারে। ‘তার বড় কোনো সর্বনাশ হয়ে গেছে। কিছু একটা নাই হয়ে গেছে…।’ এরপর মাতবরের লোকেদের মাতব্বরি, ভীতু পুলিশের অ-পুলিশি কার্যকলাপ, এই খুনের পিছনে জনৈক তালুকদারের হাত আছে বলে মাতবরের হম্বিতম্বি, স্বজনসহ এলাকার মহিলাদের কাঁদনগীত আর তারই মাঝে ঢুকে পড়া নাজিব পাগলার অস্বস্তিকর প্রবেশ তথা মাতবরের বিরুদ্ধে [হয়তো] সত্যকথন, গোসলদার আয়নাল মিয়াকে না পাওয়া এবং শেষ মুহূর্তে গোঁঁজামিল দিয়ে দাফনকাজ সেরে ফেলা—এই হলো বিবৃত গল্পের গতিপ্রকৃতি। সেখানে পুলিশ তার নির্ধারিত কর্তব্য পালন করে না, হুঙ্কার ছড়ানো আমজাদ লস্করের কথায়। তার সঙ্গে সঙ্গতদার গ্রামের আপামর ধর্মান্ধ মানুষ যাদের মতে ‘লাশ কাটা মানে লাশের অসম্মান।’ তবে মাতবরের ময়নাতদন্তে আপত্তির কারণ হয়তো আরও গভীরতর। তাই সে শোকতাপের ঘ্যানঘ্যানানি মাড়িয়ে তড়িঘড়ি লাশ দাফনের ব্যবস্থা করতে নির্দেশ দেয়। অথচ গল্পে বারবারই উচ্চারিত হয় তার ভালোত্ব, উদারতার কথা। কিন্তু তার কাছে ‘আমিনুল্লাহর মরা তো সমস্যা না। সমস্যা আমজাদ মাতুব্বরের মানইজ্জত, একহাত কাদোত ঢুকি যাওয়া।’ তাই পাগলা নাজিবের মতো কর্তব্যপরায়ণ আয়নাল মিয়ার অনুপস্থিতিও কি আমজাদের জঘন্য [যদিও তা অনুচ্চারিত] কাজের প্রতি কোনও প্রতিবাদী ইঙ্গিত করে! পাঠকের গোয়েন্দা-দৃষ্টি তা খোঁজ করুক। মনে হয় এই গল্পের মূল অভিমুখ বেচারা আমিনুল্লাহর রহস্যঘন খুনের দিকে। তাই আমার মতে এই গল্পের নামকরণ যথাযথ হয় নি। তবু্ও বলব, মহাশ্বেতা দেবীর রুদালী উপন্যাসের অনুসরণে যদি এই গল্পের নামকরণ হয়েও থাকে তবু্ও দুই কাহিনির ভরকেন্দ্র এক নয়। মনে রাখতে হবে রুদালীর শনিচরির চোখের জল শুকিয়ে কাঠ হওয়ায় ভাড়াটে কাঁদুনে আমদানি করতে হয়েছিল। এই গল্পে তেমনটি ঘটে নি। আর একটি কথা—বইয়ের নিরানব্বইতম পৃষ্ঠায়’… জমিরের মৃত্যুর বিষয়টা’র জায়গায় হবে, হয় ‘জমিরের আব্বার’ নয়তো ‘আমিনুল্লাহর…’। অনবধানতাবশত হলেও এমন ভুল কাম্য নয়।


নিপুণ কলম চালনায় সেই দেওয়াল ঘড়িরূপ নীরব দর্শক তথা দার্শনিক বস্তুতে প্রাণারোপ করে তানিম।


বইয়ের শেষ গল্প ‘অন্ধকারের পরের গান’ যার বর্ণনাকারীকে খুঁজে পেতে আমাকে দুবার পড়তে হয়েছে এই দ্বিবিধ ঠান্ডা মাথার খুনের গল্পটি। শুরুতেই রাস্তায় পড়ে থাকা এফোঁড়-ওফোঁড় করে দেওয়া এক মধ্যবয়স্কের লাশ যার  নাম-পরিচয় আমরা জানব আব্দুল বলে আর যে খুন করেছে সেবাহার উদ্দিন। এরা দুজনেই আশফাক-সোমার নির্বিবাদ সংসারে কাজের লোক। বাবুর্চি আব্দুল যে কিনা আশফাকের পছন্দের আরমালী বাহার উদ্দিন যে ছিল সোমার প্রিয় পাত্র। অথচ আশফাকের অনুপস্থিতিতে সোমাকে বলাৎকার করে খুন করে সে আর তার প্রত্যক্ষদর্শী হওয়ায় জীবন দিয়ে মাশুল গুনতে হয় আব্দুলকে যাকে সোমা বরাবরই সন্দেহ করে এসেছে। বাড়িটির প্রাত্যহিকতাসহ নানাবিধ ঘটনার নীরব সাক্ষী আরও এক নিষ্প্রাণ বস্তু কোনও কিছুই যার তীক্ষ্ণ দৃষ্টির অগোচর নয়, অথচ সে অসহায়, নিরুপায়। খুব নিপুণ কলম চালনায় সেই দেওয়াল ঘড়িরূপ নীরব দর্শক তথা দার্শনিক বস্তুতে প্রাণারোপ করে তানিম তার এই শেষ গল্পটিকে অন্য মাত্রায় নিয়ে গেছেন। মানুষের জীবনের প্রতিটি পল অনুপল স্মরণ করিয়ে দেবার এই নির্বিন্ন প্রতিনিধি নানাবিধ স্থির-অস্থির সময়ের জীবন্ত প্রতীক বলেই মনে হয়। সে শব্দহীনতার অভিশাপগ্রস্ত। মানুষনামক দুপেয়ে জন্তুদের নৃশংসতা দেখে তার অনন্ত স্থবিরতা ভেঙে মুক্তি কামী সে; কিন্তু শক্ত তারকাঁটায় গেঁথে থাকা সে চলৎশক্তিহীন। বাকহীনও বটে। লেখকের বয়ানে, ‘জীবনচালিকা ছিল না আমার, ছিল না আর কোনও উপায়। লাফিয়ে পড়তে চেয়েছিলাম, কিন্তু আমাকে ছাড়ে নি মহাকালের মতো স্থাণু হয়ে থাকা ধূসর দেয়ালটা। ‘

এবারে শেষ করব। বইতে আমার ওপার বাংলার বন্ধু লেখকদের [এপারেরও বটে] ‘র’/ ‘ড়’-এর ব্যবহার জাতীয় কিছু সহজাত ভুলসহ আরও কিছু বানানবিভ্রাট আছে যা অবশ্যই সংশোধনীয়। আমার বিশ্বাস, এই বইটির দ্বিতীয় মুদ্রণ হবে অচিরেই এবং তখন এইসব প্রমাদ দূরীভূত হবে। প্রচ্ছদ আমার কাছে জবরজং লেগেছে। তরুণ লেখকের প্রথম গল্পগ্রন্থ। গদ্যের নীরস (!) জগতে সবে পথচলা শুরু। আমি আশাবাদী—অযথা স্তুতি-পীড়িত না হয়ে নির্বেদ স্বাবমাননায় উপচিত কলমটিকে একমুখী লক্ষ্যভেদে স্থির করতে পারলে সাহিত্যপথে অনেকটা এগোবে এই রেজওয়ান তানিম।


পর্যালোচিত গ্রন্থ : অসুখগুলো প্রাপ্তবয়স্ক; লেখক : রেজওয়ান তানিম; প্রকাশক : দিব্যপ্রকাশ, ঢাকা; প্রথম প্রকাশ : ফেব্রুয়ারি ২০১৯; মূল্য : ২৪০ টাকা।

(579)