হোম সাক্ষাৎকার শবনম নাদিয়ার সঙ্গে কিছু কথা

শবনম নাদিয়ার সঙ্গে কিছু কথা

শবনম নাদিয়ার সঙ্গে কিছু কথা
1.23K
0

মার্কিন-প্রবাসী লেখক শবনম নাদিয়া একজন চোস্ত অনুবাদক। সম্প্রতি তাঁর অনূদিত একটি গল্প ‘হিমাল সাউথ এশিয়ান শর্ট স্টোরি কম্পিটিশন ২০১৯’-এ সেরা নির্বাচিত হয়। মূল গল্পটির নাম দুধ, রচয়িতা বাংলাদেশের প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক মশিউল আলম। অনুবাদে গল্পটির নাম দাঁড়ায় Milk। মূল গল্পটি বছরখানেক আগে প্রকাশিত হয় পরস্পর ওয়েবজিনে। আর তাই পরস্পরের পক্ষ থেকে দুজনকে অভিনন্দন জানাতে আমরা মুখোমুখি হয়েছিলাম তাঁদের। তবে সেটা ভার্চুয়ালি। এই সুযোগে কিছু আলাপও সেরে নেয়া গেল।

সেই ধারাবাহিকতায় এবারে আমরা শুনব অনুবাদকের কিছু কথা। বলে নেয়া ভালো, আমাদের কথা চালাচালি হয়েছে ই-মেইলে। সময় লেগেছে দুসপ্তাহ। আশা করি পুরো সাক্ষাৎকার পাঠকেরা পড়ে ফেলতে পারবেন দু-দশ মিনিটে।

– গালিব

সোহেল হাসান গালিব

হিমাল সাউথ এশিয়ান শর্ট স্টোরি কম্পিটিশন ২০১৯-এ আপনার অনূদিত গল্পটি সেরা গল্প হিশেবে নির্বাচিত হওয়ায় আপনাকে অভিনন্দন। এ ধরনের প্রতিযোগিতার মধ্যে এর আগে নিজেকে কখনো যাচাই করেছেন?

শবনম নাদিয়া

অনেক ধন্যবাদ। হ্যাঁ—নিজের লেখা ও অনুবাদ দুই ক্ষেত্রেই। জীবনে প্রথম বোধহয় ‘ডেইলি স্টার’-এর একটি প্রতিযোগিতায় গল্প পাঠিয়েছিলাম। সেটা প্রায় ষোল-সতেরো বছর আগে। জিতি নি। কিন্তু ওই গল্পটিই পরে স্পেন-এ একটি ছোট্ট প্রতিযোগিতায় তৃতীয় স্থান পায়। অনুবাদে প্রথম পুরস্কার পাই ‘নিউ এজ’ পত্রিকা থেকে সম্ভবত। তারপর দেশে, দেশের বাইরে অনেক জায়গাতেই লেখা পাঠিয়েছি। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সেগুলোতে লবডঙ্কা। তবে এগুলো অনেকখানিই ভাগ্যের ব্যাপার—ঠিক সময়ে, ঠিক পাঠক পাওয়ার ব্যাপার, সাহিত্যের ব্যাপারটি তো অনেকখানিই সাবজেকটিভ। ২০১৯-এ আমার উপন্যাস Unwanted নিয়ে কাজ করার জন্য স্টাইনবেক ফেলোশিপ পাই স্যান হোসে স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে। আর এখন, আজকেই (২৪ ডিসেম্বর ১৯), মশিউল ভাইয়ের ছোট গল্প নিয়ে কাজ করার জন্যই, PEN America থেকে একটা গ্রান্ট পেলাম।

সোহেল হাসান গালিব

একটা কথা শুরুতেই স্বীকার করে নেয়া ভালো। আমি আপনার সম্পর্কে বিশেষ কিছুই জানি না। শুধু জানি, আপনার মা আমার শিক্ষক। প্রিয় শিক্ষকদেরই একজন তিনি। তাই এই সাক্ষাৎকারের উদ্দেশ্য একভাবে আপনাকে জানতে চাওয়া, আমার জন্য। ফলে গোড়া থেকেই আলাপ শুরু করা যাক। আপনার পড়াশোনা কোথায়?

শবনম নাদিয়া

আমার পড়াশোনা মূলত বাংলাদেশে। জাহাঙ্গীরনগর স্কুল থেকে ম্যাট্রিক, হলিক্রস থেকে ইন্টারমিডিয়েট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর।  জন্ম ও বেড়ে ওঠা জাহাঙ্গীরনগর ক্যাম্পাসে—ওখানে পড়াশোনা না করলেও, ওই ক্যাম্পাস আমার মানসজগতের বিশাল একটা অংশ। বা বলা ভালো, আশির দশকের জাহাঙ্গীরনগর। ২০১০ সালে দেশ ছাড়ি। প্রথম সংসারের ভাঙন, চাকরির টানাপড়েন, এসবের মধ্যে সিদ্ধান্ত নেই লেখার কাজটিকে প্রাধান্য দেব। ফিকশন তো লিখি মূলত ইংরেজিতে। ২০০৮/০৯-এর দিকে  বাংলাদেশি-আমেরিকান কিছু লেখকবন্ধুর কল্যাণে জানতে পারলাম MFA প্রোগ্রামের কথা। মাস্টার অফ ফাইন আর্টস আমি জানতাম চারুকলার জন্য; ওই প্রথম জানলাম যে যুক্তরাষ্ট্রে সৃজনশীল সাহিত্যে এই ডিগ্রিটি দেয়া হয়। এপ্লাই করলাম আটটি প্রোগ্রামে, তিনটি প্রোগ্রামে স্কলারশিপসহ সুযোগ পেলাম। সেই লেখকবন্ধুরা একযোগে বলল আইওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের MFA প্রোগ্রাম সর্বসেরা, ওখানে না যাওয়াটা পাগলামি। ওখানেই গেলাম। দুই বছরের মাস্টার্স প্রোগ্রাম, তারপর তৃতীয় একটি বছর একটা পোস্ট-গ্রাজুয়েট ফেলোশিপ পেলাম—তিনটি বছর লেখক পরিবৃত হয়ে, গল্প-কবিতা-উপন্যাস এবং তার ক্রাফট বিষয়ক আলোচনা, তর্ক, ভাবনায় ডুবে থাকলাম। ২০১৩-তে আইওয়া সিটি ছেড়ে আসি; কিন্তু সেখানে জন্ম নেয়া নানা কিসিমের বন্ধুত্ব এখনো আমার লেখকজীবনে দারুণ গুরুত্বপূর্ণ।

সোহেল হাসান গালিব

Pen America থেকে অনুদান পাবার জন্য আবারও অভিনন্দন। যে কথা বলছিলেন, আপনার নিজের উপন্যাস নিয়ে কাজ করার জন্য একটা ফেলোশিপ পেয়েছেন, ব্যাপারটা একটু খুলে বলবেন? উপন্যাসটা কি লিখছেন না লেখা হয়ে গেছে?

শবনম নাদিয়া

অনেক ধন্যবাদ! দারুণ লাগছে PEN America-র অনুদানটির খবরে। এর আগে আরো দুবার এপ্লাই করেছিলাম, হয় নি।

আমার উপন্যাস লেখা চলছে। সময় বের করা খুব মুশকিল—লেখার জন্য যে মনোযোগ দরকার, সেটার স্পেস তৈরি করা খুব কঠিন। আরেক লেখক/অনুবাদকের সঙ্গে সংসার পাতার একটা ভালো দিক হচ্ছে যে, এই প্রয়োজনটা সে খুব ভালো বোঝে। দুজনেই চেষ্টা করি সাংসারিক দায়িত্ব ও ঝুটঝামেলা একসাথে সামাল দিয়ে, দুজনের হাতেই যেন লেখার সময় রাখা থাকে; হয়ে ওঠে না সবসময়।

স্যান হোসে স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে আমি স্টাইনবেক ফেলোশিপ পেয়েছি এ বছর আমার উপন্যাসের জন্য। এ অনুদানটির উদ্দেশ্য হলো লেখার সময়কালটিতে লেখককে খানিকটা সাপোর্ট দেয়া। আমি সহ ছয়জন ফেলো আছেন এ বছর, এবং অনুদানের অর্থ একেকজন একেকভাবে ব্যবহার করবেন। একজন যেমন তার উপন্যাসের গবেষণার জন্য নানা জায়গায় যেতে হবে, সেসব ঘোরাঘুরিতে টাকাটা ব্যয় করবেন। আরেকজন জানালেন যে এই বাড়তি অর্থ ব্যবহার করে তিনি তার কর্মস্থলের একদম কাছাকাছি আরেকটু ভাড়া-বেশি বাড়িতে উঠে গিয়েছেন; প্রতিদিন যাওয়া-আসায় তার প্রায় এক-দেড় ঘণ্টা সময় বাঁচে, এবং সেই সময়টি তিনি প্রতিদিন লেখার কাজে ব্যয় করেন। আমি ভাবছি আমি দু-তিনদিন সময় বের করে কাছাকাছি কোথাও হোটেল বা এয়ার বিএনবি ভাড়া করে চলে যাব—এরকম কয়েকবার যদি টানা দু-তিনদিন মন দেবার সুযোগ পাই, তাহলে লেখার কাজটি অনেক দ্রুতই আগাবে। আমার সংসারসঙ্গী (স্বামী শব্দটি আমার না-পসন্দ, এখনো লাগসই একটি শব্দ খুঁজছি!) মাহমুদ রহমান, যার নিজের একটি প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ আছে এবং সে মাহমুদুল হকের কালো বরফ-এর অনুবাদকও বটে, তার বিবিধ লেখা তৈরির সময় এই পদ্ধতি ব্যবহার করেছে, এবং তার জন্য বেশ ফলপ্রসূ হয়েছে প্রক্রিয়াটি।

সময় বের করার যুদ্ধ বোধহয় সব দেশেই লেখকের সবচেয়ে বড় দ্বন্দ্ব। পেট চালানো, সংসার, সংসারের মানুষ—সব সামলে লেখার সময় বের করা খুব কঠিন। নারীলেখকদের জন্য আরো কঠিন। আমি প্রচুর পুরুষলেখককে তাদের স্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে দেখেছি, যে স্ত্রীদের অবদান ছাড়া লেখক হিশেবে জীবনযাপন করা তাদের জন্য প্রায় অসম্ভব হতো (মশিউল ভাইও ইরা ভাবীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেছেন) এবং সেরকমটিই হওয়া উচিত। সে তুলনায় প্রায় কোনো নারী লেখকের কাছে শুনি নি যে তার পুরুষসঙ্গী/স্বামী ঘরে সাংসারিক দায়িত্ব টেনে নিয়েছেন তার লেখকসত্তাকে স্পেস দেয়ার জন্য। আমার নিজেকে ছাড়া বোধহয় আমি আরেকজন দেশি নারীলেখকের কথা জানি যার এই ‘সৌভাগ্য’ আছে।

আমি ছোটগল্পে দড়; উপন্যাস লেখার চেষ্টা আগে করি নি। লিখতে গিয়ে বারবার মনে হয়, কী করছি জানি না তো, অন্ধকারে হাতড়াচ্ছি। সেসব সময় এই ফেলোশিপটা আত্মবিশ্বাসে ঠ্যাকনা দিতে কাজে দেয়—একেবারেই অপরিচিত কয়েকজন সাহিত্যবোদ্ধা মানুষ, কয়েকশো পাণ্ডুলিপির ভিড় ঠেলে, আমার উপন্যাসের অংশবিশেষ পড়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে এই বইটির জন্মপ্রক্রিয়াকে সাপোর্ট দেয়া দরকার। তার মানে কিছু একটা নিশ্চয় দাঁড়াচ্ছে, একেবারে হাবিজাবি নয়!


অনুবাদক এখনো আমাদের সাহিত্যজগতে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিশেবেই পরিগণিত।


সোহেল হাসান গালিব

আপনার এ যাবৎ প্রকাশিত গ্রন্থ কয়টি?

শবনম নাদিয়া

আমার অনুবাদে শাহীন আখতারের সখী রঙ্গমালা ও মঈনুল আহসান সাবেরের কবেজ লেঠেল বেরিয়েছে ঢাকার বেঙ্গল লাইটস থেকে, ওদের লাইব্রেরি অফ বাংলাদেশ সিরিজে। এর মধ্যে কবেজ লেঠেলের আন্তর্জাতিক এডিশন সীগাল বুকস থেকে বের হয়েছে গত বছর। সখী রঙ্গমালার জন্য এখন দেশের বাইরে প্রকাশক খুঁজছি। দেখা যাক, কী হয়। লীসা গাজীর উপন্যাস রৌরব-এর অনুবাদ হাতে আছে—মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে ভারতের ওয়েস্টল্যান্ড প্রকাশনা সংস্থা নিয়ে নিল। ২০২০ সালের মাঝামাঝি এটি বের হবে।

আমার নিজের লেখা ছোটগল্প ছাপা হয়েছে এখানে সেখানে, সাহিত্যপত্র, নানা রকমের সংকলনে। বই এখনো হয় নি। উপন্যাস শেষ হলে হয়তো হবে।

সোহেল হাসান গালিব

মৌলিক রচনায় যারা সম্পৃক্ত, সাধারণত অনুবাদের দিকে তাদের আগ্রহ কম। এটা ইগো-সেন্ট্রিক ব্যাপার কিনা আমি জানি না। আপনি অনুবাদে উৎসাহী হলেন কেন?

শবনম নাদিয়া

আমি ঠিক জানি না। ইগোর একটি ব্যাপার সম্ভবত আছে; অনুবাদক নিজে লেখক হলে তো কথাই নেই—লেখক হিশেবে নিজের narrative instinct, voice এসব কিছুতে কড়াভাবে রাশ টেনে ধরতে হয়। সহজ নয় কাজটি। তাছাড়াও অনুবাদক এখনো আমাদের সাহিত্যজগতে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিশেবেই পরিগণিত। প্রায় কুড়ি বছরের অভিজ্ঞতায় আমি তা-ই দেখেছি, দেখছি। সব লেখক, সম্পাদকের মনোভাব সেরকম তা বলছি না, কিন্তু বড় একটা অংশের মনোভাব সেরকমই যে, অনুবাদ-সাহিত্য ‘প্রকৃত’ সাহিত্য নয়, এর সৃজনশীলতা ঠিক সেরকম মাপের নয়। তো এর একটা ফল হয় যে, অপেক্ষাকৃত তরুণদের মধ্যে অনুবাদকের ভূমিকা, সৃষ্টিশীলতা এসব বিষয়ে তেমন আগ্রহ তৈরি হয় না।

আর ব্যক্তিগত ইচ্ছা-অনিচ্ছা ছাড়িয়ে অন্য আরেকটি দিক হলো যে, অনুবাদ-সাহিত্যের জন্য যে সামগ্রিক পরিবেশ ও সংস্কৃতি দরকার, সেখানে আমাদের বড় ঘাটতি আছে। আমি মূলত বাংলা থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করি, সেটুকু নিয়েই বলি।

বাংলাদেশে সাহিত্যপুরস্কার আছে হাতে গোনা কয়েকটি, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কোনো অনুবাদ-পুরস্কার বোধহয় নেই, তা বাংলা-ইংরেজি বা ইংরেজি-বাংলা যে দিককার কথাই ধরা যাক না কেন। পুরস্কার-টুরস্কার ঘোষণা হলেই কিছু মানুষ ‘পুরস্কার একটি মূল্যহীন ব্যাপার’ ধরনের মন্তব্য নিয়ে হাজির হন। একদিক থেকে তা ঠিক আছে—প্রকৃত শিল্পী, যে মাধ্যমেরই হন না কেন, পুরস্কারের আকাঙ্ক্ষায় সৃজন করেন না। কিন্তু এসব পুরস্কারের নানা গুরুত্ব আছে, তার মধ্যে একটি হলো, এগুলোর দ্বারা এক ধরনের visibility তৈরি করা, একটা শিল্পমাধ্যমের গুরুত্ব প্রতিষ্ঠা করা, এবং মানসম্মত কাজকে সবার সামনে তুলে ধরা।

আমাদের সমালোচনাসাহিত্য এমনিতেই খুব দুর্বল মানের—বেশির ভাগ গ্রন্থসমালোচনা আখ্যানের সারমর্ম বয়ানেই সীমিত থাকে, তার ওপর তার সাথে যোগ হয় ব্যক্তিগত সম্পর্ক বা গুরুত্বের ভিত্তিতে পিঠ-চাপড়ানো, পিঠ-আঁচড়ানোর প্রক্রিয়া। খুব কম গ্রন্থসমালোচনা দেখেছি গত দশকুড়ি বছরে যেখানে উপন্যাস বা গল্পসংকলনকে গভীরভাবে নিরীক্ষা করা হয়। অনুবাদের ক্ষেত্রে বাড়তি দুর্বলতা যোগ হয়, অনুবাদ হিশেবে সেটির আলোচনা প্রায় হয়ই না। এটি অনুবাদগ্রন্থ এবং অনুবাদকের নাম এই (অনেক ক্ষেত্রে অনুবাদকের নামটা পর্যন্ত উহ্য রাখা হয়, যেন এসব বই কোনো সৃজনপ্রক্রিয়া ছাড়াই জন্মে গেছে)—এর বাইরে তেমন একটা আলোচনা হয় না। গ্রন্থসমালোচনার বাইরে অনুবাদ, এর প্রকরণ, শৈলী, প্রক্রিয়া ইত্যাদি বিষয়ক আলোচনাও খুব একটা হয় বলে মনে হয় না।

12195863_10153239375307634_7201527458328501315_n
অনুবাদক অরুণাভ সিনহা ও লেখক-অনুবাদক মাহমুদ রহমানের সঙ্গে শবনম নাদিয়া

কিছু প্রাতিষ্ঠানিক সাপোর্ট-ও দরকার। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ক্র্যাফট বিষয়ক কোর্স থেকে শুরু করে (সরকারি বা প্রাইভেট সেক্টর) অনুদান, বিশেষ প্রকল্প, নানা কিছু করা দরকার। প্রকাশকদের তরফ থেকেও অন্যভাবে আগাতে হবে। পাঠক কারা, সেই পাঠক অনুযায়ী মার্কেটিং, ডিস্ট্রিবিউশন কিভাবে করা যায়, সেসব নিয়ে ভাবতে হবে। আমাদের যা রিসোর্স আছে, সেগুলো ব্যবহার করে প্রাথমিক পদক্ষেপ নেয়া যায়। আমি শুনেছি বাংলা একাডেমির অনুবাদ বাবদ অ্যালোকেশন থাকে বাৎসরিক বাজেটে। সেসব অনুবাদের মান ও মার্কেটিং নিয়ে আসলে বলার কিছু নেই। হয়তো ওসব দিকে আশা নিয়ে তাকানোটাও বোকামি। অনুবাদ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ আপাতত যেটা হচ্ছে, তা প্রাইভেট সেক্টরে। জেমকন পুরস্কারের প্রবর্তকেরাই গত কয়েক বছর ধরে Library of Bangladesh বলে একটি সিরিজ প্রকাশ করছেন, অনুবাদক ও সম্পাদক অরুনাভ সিনহার সম্পাদনায়। প্রতি বছর দুটি করে বই বের হচ্ছে সেখান থেকে। বইগুলো মন কাড়ার মতো—প্রোডাকশন সুন্দর, অনুবাদ চমৎকার। (বলে নেই, আমার নিজের দুটো অনুবাদ এ সিরিজে জায়গা পেয়েছে।) এবং বছর দুয়েক আগে সীগাল বুকস-এর সাথে তারা চুক্তিবদ্ধ হয়, ফলে সীগাল-এর ইমপ্রিন্ট-এ এই বইগুলো এখন বাংলাদেশের বাইরে পাওয়া যাচ্ছে। তো এরকম নানা ধরনের ব্যাপার দরকার, বহির্বিশ্বে বাংলা ভাষা, সাহিত্যের একটা জায়গা করতে হলে। কারণ বাস্তবতা হলো যে, বাংলা সাহিত্য সম্পর্কে আন্তর্জাতিক সাহিত্যের ক্ষেত্রে এখনো ধারণা ওই ‘টেগোর’ পর্যন্তই। এই জায়গাটা তো আমাদের আস্তে আস্তে তৈরি করতে হবে, নাকি? অনুবাদকেরা নিজেদের চেষ্টায় বিদেশি প্রকাশক জোগাড় করে বই দেশের/ভাষার বাইরে নেয়ার চেষ্টা করে বটে, কিন্তু আমাদের সদিচ্ছা থাকলেও, আমাদের সময় ও সামর্থ্য সীমিত।

আমার নিজের পথ চলা বলি, অনুবাদক হিশেবে। কম বয়সে টুকটাক অনুবাদ করেছি। একটা কিছু পড়লাম, ভালো লাগল, অনুবাদ করে ফেললাম—এরকম আর কি। কিচ্ছু জানতাম না। এমনকি একটা অনুবাদ করার আগে লেখকের অনুমতি নেয়া যে বাধ্যতামূলক, এটুকু পর্যন্ত নয়। মাস্টার্স-এর শেষ দিকে ড. নিয়াজ জামান, আমার শিক্ষক, ডেকে পাঠালেন। তিনি এবং ড. ফিরদাউস আজিম গ্যেটে ইনস্টিটিউটের অর্থায়নে নারীলেখকদের নিয়ে একটি দ্বিভাষিক সংকলন তৈরি করছিলেন। আমাকে বললেন কয়েকটা গল্প-কবিতা অনুবাদ করে দিতে। ওই প্রথম আমি সিরিয়াসলি কিছু অনুবাদ করলাম। এবং আবিষ্কার করলাম যে ঠিক লাগসই একটি শব্দ বা শব্দবন্ধ খুঁজে পাওয়ার ব্যাপারটি আমাকে দারুণ একটা আনন্দ দেয়, একেবারে অন্যরকম। তখন অনুবাদের কলাকৌশল বা নীতিগত বিষয়াদি প্রায় কিছুই জানতাম না, বা অনুবাদ নিয়ে তেমন কোনো চিন্তাভাবনা ছিল না, গড়ে ওঠে নি। কিন্তু অনুবাদ ওই তখনই অন্তরে প্রবলভাবে গেঁড়ে বসলো, নিখাদ ভালোবাসা থেকে। নিয়াজ আপা আর ফিরদাউস আপার কাছে আমার অনেক ঋণ, বিশেষ করে নিয়াজ আপার প্রতি—আমার লেখা, অনুবাদ, সব কিছুতেই প্রচণ্ড সাপোর্টিভ ছিলেন সবসময়ই।

এই আনন্দের সাথে যুক্ত আছে এই বোধটিও—বাংলা সাহিত্য এবং বাংলাদেশি বাংলা সাহিত্য থেকে লেখক হিশেবে, পাঠক হিশেবে আমি পেয়েছি প্রচুর। এটি সেই দেনা শোধ করার খানিকটা চেষ্টা হয়তো! আমার কাছে এটা প্রায় দায়িত্বই মনে হয়। দুই ভাষাতেই সমান স্বাচ্ছন্দ্য কম লোকেরই আছে। আর আমি নিজে ফিকশন লিখি, সুতরাং সেটি আরেকটি মাত্রা যোগ করে। আমার কাছে মনে হয় এই নানারকম স্কিলের সমন্বয় যখন ঘটেছে আমার মধ্যে, তখন সেটিকে কাজে লাগানো উচিত।

তো ওই সময় থেকেই অল্পবিস্তর অনুবাদ করতাম, বেশির ভাগই ছোটগল্প। দেশে তখন ‘ডেইলি স্টার’ আর ‘নিউ এজ’—এই দুটির সাহিত্যপাতা ছাড়া ইংরেজির জন্য তেমন কোনো জায়গা ছিল না। নিয়াজ আপা ‘নিউ এজ’ সাহিত্যপাতার দায়িত্ব নিলেন এবং একটি অনুবাদ প্রতিযোগিতা চালু করলেন। এক বছর সেটি আমি জিতলাম। এটি বোধহয় কয়েক বছর মাত্র চালু ছিল। এই সময়েই, স্টার-এর সাহিত্য-সম্পাদক খাদেমুল ইসলামের সম্পাদনায় একটি সংকলন বের হলো, ওখানেও একটি ছোটগল্পের অনুবাদ ছাপা হলো, বোধহয় শাহীন আখতারের। তখনও বলতে গেলে দেশে আমরা কেউ ইংরেজিতে লিখি, এনিয়ে তেমন কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া যেত না। ডেইলি স্টার-এর বইটি বাদে ইংরেজি ভাষায় ওই সময়েই আরো কয়েকটি বই বের হয়—যেমন বিলেতের Saqi Books থেকে Galpa নামের একটি সংকলন বের হয় (সম্পাদক নিয়াজ জামান)। প্রকাশনা সংস্থা বলতে নিয়াজ আপার প্রতিষ্ঠিত writers.ink ইংরেজি বা ইংরেজিতে অনূদিত ফিকশন ছাপত। এ ছাড়া UPL সম্ভবত হাতে গোনা কটি বই বের করে।

এর মধ্যে অনুবাদক হিশেবে আস্তে আস্তে আমার একটা পরিচয় তৈরি হচ্ছে, অনেক লেখকের সাথে জানাশোনা হচ্ছে, আমার নিজের জগৎ বড় হচ্ছে, সে লেখারই হোক আর অনুবাদেরই হোক। অনুবাদ নিয়ে ভাবনা, উচ্চাকাঙ্ক্ষার পরিধি বাড়ছে। তখন ভাবা শুরু করলাম আসলে অনুবাদের পাঠক কে? এই সময়েই দেশের বাইরে পত্রিকায় পাঠানো শুরু করলাম। দেশের বাইরে সম্ভবত প্রথম অনুবাদ ছাপা হলো Cerebration বলে একটি ভারতীয় পত্রিকায়, এবং তারপর আমেরিকার Words Without Borders পত্রিকায়।

তারপর এখানে ওখানে নানা সাহিত্যপত্রিকা আর সংকলনে একটা দুটো করে গল্প ছাপা হতে লাগল। আমার অনুবাদক কমিউনিটি আসলে তৈরি হয় আমি আমেরিকায় আসার পর।আইওয়াতে থাকাকালীন ইন্টারন্যাশনাল রাইটিং প্রোগ্রাম-এর (সুনীল এই প্রোগ্রাম নিয়ে ছবির দেশে কবিতার দেশে বইয়ে বিশদ লিখেছেন) লোকজনের সাথে একটা সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে। আমার সংসারসঙ্গী, আমার সাধনসঙ্গীও বটে—তার সাথে আন্তর্জাতিক সাহিত্যঅঙ্গনে বাংলাদেশি সাহিত্যের অনুপস্থিতি নিয়ে নানারকম আলাপ চলছিল। এসময় সে Asymptote পত্রিকার ব্লগে একটি চার পার্ট নিবন্ধ লেখে, ইংরেজি সাহিত্যঅঙ্গনে দক্ষিণ এশীয় অনুবাদ কেন হালে পানি পাচ্ছে না, এ বিষয়ে। এই লেখাটি তৈরি করতে গিয়ে আমাদের ছোট্ট একটি গ্রুপ তৈরি হয়, যারা দক্ষিণ এশীয় ভাষা থেকে অনুবাদ করি। আর একটা বাৎসরিক সম্মেলন হয় ALTA বা American Literary Translators Association—সেটিতে আমরা বার কয়েক যোগ দেই। এসব নানা সূত্র মিলিয়ে আমার একটা অনুবাদ ও অনুবাদকের জগৎ তৈরি হয়েছে, যা ছাড়া আমার পক্ষে আসলে আগানো প্রায় অসম্ভব। একটা হিন্দি গানের লিরিক অনুবাদে সাহায্য থেকে শুরু করে, এই একটা বই নিয়ে আর কদ্দিন আমার ঝুলে থাকতে হবে ঘ্যান ঘ্যান করার জন্য, সমমনা মানুষ দরকার, খুব দরকার। আমার লেখক ও অনুবাদক কমিউনিটি আমার হাতের অত্যাবশ্যকীয় যষ্টি। এদের ছাড়া আমি হাঁটতে পারি, কিন্তু হোঁচট খাওয়ার সম্ভাবনা দারুণরকম বেড়ে যায়।


মেসেজধর্মী ফিকশন আমাকে খুব একটা টানে না—অনেক লেখকই পাঠকের ওপর ঠিক ভরসা রাখতে পারেন না।


সোহেল হাসান গালিব

অনুবাদের জন্য টেক্সট বাছাইয়ের ক্ষেত্রে আপনি কোন দিকটাতে নজর দেন? শুধুই সমকালীনতা? নব্বই বা আশির দশকের লেখক? নাকি বিষয় বা শৈলীগত বিশেষ কিছু নির্বাচন?

শবনম নাদিয়া

অনেক কিছুই মাথায় রাখতে হয় টেক্সট নির্বাচনে—সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কোন দুটি বিষয় জানেন? ১. লেখাটা আমার খুব ভালো লাগছে কিনা, ২. অনুবাদের অনুমতি জোগাড়ে ঝামেলা কতখানি।

আপনি কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ করেছেন, আমি খুব prosaic একটা প্রসঙ্গ তুললাম। আপাতদৃষ্টিতে মামুলি মনে হতে পারে। কিন্তু আমি ঘরপোড়া গরু। দেশের বাইরে যে কোনো সাহিত্যপত্রিকা, সম্পাদক, প্রকাশকের সাথে যোগাযোগ করলেই প্রথম প্রশ্নটি হলো, এই টেক্সট অনুবাদের অনুমতি নেয়া আছে কিনা। কপিরাইট পারমিশন জোগাড়ের জটিলতার কারণে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও অনেক কাজেই হাত দিতে পারি নি, পারি না। অনেকখানি কাজ এগিয়েছি, তারপরে কপিরাইটের কারণে আটকে থাকতে হবে, এই যন্ত্রনায় আমি আর পড়তে চাই না। কিন্তু এই বিষয়টিতেই সবচেয়ে বেশি ঝামেলার মুখোমুখি হতে হয়, বিশেষ করে মৃত লেখকদের বেলায়।

অনুবাদ করা মানে, অন্তত দেশের বাইরে ছাপতে চাইলে, শুধু একটি টেক্সট অনুবাদ করা নয়। সম্ভাব্য ভেন্যু খোঁজা, তাদের নিয়মানুযায়ী (এবং এসব ব্যাপারে বাইরের পত্রপত্রিকা বেশ কড়া, শব্দসংখ্যা, ফরম্যাট, ফন্ট, অনেক কিছুই পত্রিকার নিয়ম ধরে করতে হয়) লেখা সাবমিট করা, অনুমতি নিশ্চিত করা, উক্ত সম্পাদক/প্রকাশককে বাংলাদেশি বাংলা সাহিত্য এবং লেখক সম্পর্কে খানিকটা ধারণা দেয়া, মূল টেক্সটের একটু প্রেক্ষিত দেয়া—হাজারটা জিনিশ এর সাথে জড়িয়ে আছে। সুতরাং আরেকটি জিনিশ হিশেবে নিতে হয়, আমার হাতে সময় কতখানি। আমি নিজেও লিখি, সুতরাং অনুবাদে যে সময়টুকু দিতে পারি, সেটুকু আমার নিজের লেখার সময় থেকে স্যাক্রিফাইস করা।

এছাড়া, হ্যাঁ, ক্লাসিক কোনো টেক্সটের চাইতে সমকালীন লেখকের কাজ আমাকে টানে বেশি। বিষয়গত ব্যাপার তো আছেই কিছু, পাঠক হিশেবে নিজের পছন্দ-অপছন্দ। ভাষার সাবলীলতা পছন্দ করি অনুবাদক হিশেবে। মেসেজধর্মী ফিকশন আমাকে খুব একটা টানে না—অনেক লেখকই পাঠকের ওপর ঠিক ভরসা রাখতে পারেন না। যে বিষয়টা চরিত্রচিত্রণ, দৃশ্য নির্বাচন, narrative voice ইত্যাদির মাধ্যমে সামনে হাজির হওয়া উচিত, সেটিকে হাতুড়ি বাটালি দিয়ে পাঠকের মাথার মধ্যে সেঁধিয়ে দিতে চেষ্টা করেন। Subtle বিষয়গুলো আমাকে টানে খুব, যে গল্প বা উপন্যাস পাঠকের কাছে প্রয়াস ও পরিশ্রম দাবি করে।

tmm3.1এছাড়াও অনেক সময় টেক্সট নির্বাচন নির্ভর করে বাহ্যিক বিষয়ের ওপর। যেমন বছর কয়েক আগে Words Without Borders-এর এক সম্পাদক যোগাযোগ করলেন, তারা অনুবাদে LGBTQ ফিকশন নিয়ে একটি ইস্যু করবেন। আমার চট করে বাংলা ভাষায় এমন কিছু মাথায় আসলো না—পরিচিত লেখক, যাদের লেখা ভালোবাসি, তাদের সাথে যোগাযোগ করলাম। শাহীন আখতার একটি গল্প পাঠালেন (সাপ, স্বামী, আশালতা ও আমরা), সেটি আমার পছন্দ হলো। তো সেটা অনুবাদ করলাম (Snakes, Husbands, Ashalota, and Us)। একইভাবে একটি বিশেষ ইস্যুর জন্য প্রশান্ত মৃধার হারিয়ে যাওয়া জীবিকা সিরিজের দুটি ভুক্তি অনুবাদ করেছিলাম। তো এরকম হয় আর কি, ব্যক্তিগত যোগাযোগ ছাড়াও, কোন পত্রিকা বিশেষ করে অনুবাদ চাইছে, বা বিশেষ কোন বিষয় বা থিমে অনুবাদ চাইছে—এসব বিষয়ে চোখকান খোলা রাখি, সেরকম কিছু দেখলে চেষ্টা করি কিছু পাঠানোর। মশিউল আলমের ‘মাংসের কারবার’, আমার অনুবাদে The Meat Market, ছাপা হয় Asymptote পত্রিকায়।

সোহেল হাসান গালিব

সুনির্দিষ্টভাবে যদি জানতে চাই, অনুবাদের জন্য মশিউল আলমের ‘দুধ’ গল্পটি নির্বাচনের কারণ কী ছিল?

শবনম নাদিয়া

‘দুধ’ নির্বাচনে সবচেয়ে বড় যে বিষয়টি : আমি মোটামুটি গল্পটির প্রেমে পড়ে যাই। খুব কম গল্পের ক্ষেত্রেই এটি হয়। মানে অনেক লেখাই তো ভালো লাগে, অনুবাদ করতে ইচ্ছে করে, নানারকম চিন্তা-ভাবনার জন্ম দেয়, নানাভাবে ভাবিয়ে নেয়। মশিউল আলমের সেরকম গল্পও আছে। এক্ষুনি অন্তত পাঁচটি গল্পের নাম দিতে পারব যা আমার বেশ ভালো লাগে। কিন্তু পড়বার পর একদম মোহগ্রস্ত করে রাখে খানিকটা কাল, এরকম খুব বেশি হয় না। ‘দুধ’ গল্পটির ক্ষেত্রে আমার তাই হয়েছিল। দুবার, তিনবার পড়লাম, কিন্তু নেশা কাটে না। বিশেষ করে ওই শেষ দৃশ্যটা। এই গল্পে আসলে লেখক ও পাঠক হিশেবে আমার অনেকগুলো পছন্দের বিষয়ের সন্নিবেশ ঘটেছে। তার মধ্যে বিশেষ করে দুটি বিষয় আমাকে এই গল্পে খুব টানে—নন-হিউম্যান প্রাণিকুলের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের ধরন এবং জগতের বিভিন্ন hierarchy। আর এই গল্পের ধরন ও ব্যাপ্তি বেশ মিথিক্যাল, সেটিও আমাকে খুব আচ্ছন্ন করে রাখে। দ্বিতীয় বা তৃতীয় পাঠের সময় শেষ অংশে এসে ‘অনির্বচনীয়’ শব্দটি পড়ার সাথে সাথে আমার মাথায় ‘numinous’ শব্দটি ধাক্কা মারে। তখনই স্থির করি এই গল্পটি অনুবাদ করব।

সোহেল হাসান গালিব

অনুবাদের দক্ষতা নিয়ে আপনার কী মতামত? বিষয়টা একটু খুলে বলি। ধরা যাক, ভালো ইংরেজি-জানা একজন শিক্ষক বা শিক্ষার্থী অনুবাদের জন্য আগ্রহী হয়ে উঠলেন। বাঙালি পরিমণ্ডলে বাস ক’রে, ইংরেজি-বলা জনগোষ্ঠীর থেকে চির-বিচ্ছিন্ন থেকে তার হাতে সাহিত্যের অনুবাদ কোনো টিউটোরিয়াল খাতা বা অ্যাসাইনমেন্ট হয়ে উঠবে কিনা?

শবনম নাদিয়া

আমাদের দেশে বাংলা থেকে ইংরেজিতে যা অনুবাদ দেখি, তার বড় একটা অংশই টিউটোরিয়াল খাতা মনে হয় পড়লে। যদিও একদম ছোটকাল থেকে ইংরেজির ক্লাস শুরু হয়, ইংরেজি শেখানোর প্রক্রিয়া আমাদের দেশে খুব উন্নত নয়। তার সাথে যুক্ত হয় কনটেম্পোরারি কন্টেন্টের অভাব। অনুবাদ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে তেমন কোর্স-ও তো বোধহয় নেই। বাংলায় অনুবাদ নিয়ে তেমন লেখালেখি হয়েছে কি? আসলে অনুবাদকে একটি স্বতন্ত্র শিল্পমাধ্যম হিশেবে বিবেচনা করে, তাকে ঘিরে একটা পড়া-আলাপ-ভাবনার জগৎ তৈরি হলে আস্তে আস্তে ভালো অনুবাদক তৈরির জমিনটা পাওয়া যায়।

তবে ইংরেজি-বলা জনগোষ্ঠী থেকে চির-বিচ্ছিন্ন বোধহয় আমরা নেই—ওই যে, প্রাইমারি লেভেল থেকেই তো একটা অন্য ভাষার সঙ্গে আমাদের পরিচয় হয়ে যায়।

আরেকটা বিষয় হলো আমাদের বাংলা মিডিয়াম-ইংলিশ মিডিয়ামের ঘটনাটা। ইংলিশ মিডিয়ামে যারা পড়েছেন, তাদের ইংরেজির দক্ষতা হয়তো যথেষ্ট, কিন্তু বাংলা ভাষার সঙ্গে সাধারণত তাদের সংযোগ খুব হালকা হয়। আমি নিজে কিন্তু আগাগোড়া বাংলা মিডিয়ামে পড়েছি, সুতরাং এটা বলে নেয়া ভালো যে ইংলিশ মিডিয়ামের শিক্ষার্থীদের সম্পর্কে আমার ধারণা-অভিজ্ঞতা বাইরে থেকে দেখা।

সোহেল হাসান গালিব

সাহিত্য-অনুবাদে যারা আগ্রহী, বিশেষত যারা তরুণ, তাদের ব্যাপারে আপনার কোনো পরামর্শ আছে কিনা?

শবনম নাদিয়া

পড়তে হবে। প্রচুর, প্রচুর, প্রচুর। শুধু পড়লেই হবে না, সচেতনভাবে, উদ্দেশ্যমূলকভাবে পড়তে হবে।

ভালো অনুবাদ যেমন পড়তে হবে, তেমনি অনুবাদ সংক্রান্ত আলোচনা পড়তে হবে। অনুবাদতত্ত্বের কথা বলছি না। তত্ত্ব একাডেমিকদের কাজে লাগে বেশি। বলছি যারা practitioner, তাদের চিন্তাভাবনা, আলাপ, তর্কবিতর্ক এসবের কথা। ইন্টারনেট যুগের একটা বড় সুবিধা হলো যে অনেক রিসোর্স একদম করতলে। কিভাবে খুঁজতে হয়, কোথায় খুঁজতে হয়, এটুকু জানা দরকার। কিছু অনুবাদক আছেন ব্লগ করেন, অনুবাদ জগতের নানা খবরাখবর নিয়ে, কেউ হয়তো অনুবাদের অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখেন। অনেক পত্রিকা আছে যারা অনলাইন একটা ব্লগ চালু রাখে, সেখানে আলোচনা, নিবন্ধ ইত্যাদি ছাপা হয়। অনুবাদকদের গ্রুপ আছে অনলাইনে। এ সবই কাজে দেয়। আমার সোর্স ভাষা নিয়ে কাজ করেন না, এমন অনুবাদকের অভিজ্ঞতা থেকেও নেয়ার মতো অনেক কিছু থাকে।

অনূদিত টেক্সট পড়তে হবে—খেয়াল করে। ছত্রে ছত্রে অনুবাদকের সিদ্ধান্ত নিতে হয়, সেসব সিদ্ধান্ত নেয়ার প্রক্রিয়া বোঝার চেষ্টা করতে হবে। অনেক ক্লাসিক টেক্সটের একাধিক অনুবাদ পাওয়া যায়। একাধিক interpretation পড়া, তা নিয়ে সিস্টেম্যাটিকভাবে চিন্তা করা কাজে দেবে।

প্র্যাকটিস/নিয়মিত চর্চা। যে কোনো শিল্পের মতোই, অনুবাদের হাতও করতে করতে খোলে। দশ বছর আগে আমি যেভাবে, যে মানে অনুবাদ করতাম, তার সঙ্গে এখনকার অনুবাদক-আমি-র তফাৎ অনেক। কিন্তু ওই কাঁচা অনুবাদগুলো পার না হয়ে আসলে এই পর্যন্ত পৌঁছানো হতো না। লেখার মতোই, লেগে থাকার ব্যাপার আছে, বিবর্তিত হওয়ার ব্যাপার আছে।

যে ভাষায় অনুবাদ করতে চাই, সেই ভাষায় স্বাচ্ছন্দ্য খুব জরুরি। শুধু বলতে-পড়তে জানলেই হয় না, শব্দভাণ্ডার বড় হলেই হয় না। ভাষার যুগোপযোগিতার ব্যাপার আছে, আঞ্চলিক চর্চার ব্যাপার আছে, শব্দ ব্যবহারের ইতিহাস আছে। এসব সম্পর্কে খানিকটা ধারণা থাকা দরকার। সুতরাং টার্গেট ভাষার সাম্প্রতিক সাহিত্য পড়াটাও জরুরি। সোর্স ভাষাতেও স্বাচ্ছন্দ্য জরুরি—সে ভাষাতেও প্রচুর পড়বার প্রয়োজন আছে।

মূল টেক্সট একাধিকবার, সচেতনভাবে পড়তে হবে। একটা শব্দের অনেক প্রতিশব্দ থাকতে পারে, একটা বাক্য গঠনের অনেকগুলো সম্ভাব্য উপায় থাকতে পারে। লেখক ঠিক এই শব্দটি, এই বাক্যটি কেন ব্যবহার করছেন? এই শব্দ বা বাক্য মূল টেক্সটে যে ভূমিকা পালন করছে, তা অনূদিত ভার্শানে কিভাবে আনা যায়? অনুবাদক একসঙ্গে দুটো কাজ করেন—ঘনিষ্ঠ, সচেতন এবং প্রবল বিবেচনাবোধ নিয়ে একটি লেখা পাঠ করেন, এবং তারপর সচেতনতার সঙ্গে, নিষ্ঠভাবে একটি সৃজনশীল, নতুন টেক্সট রচনা করেন।

লেখক-ইগো ধামাচাপা দিতে হবে। আপনি বিশাল কাব্যপ্রতিভা বা গল্প-শৈলীর অধিকারী হতে পারেন, কিন্তু আপনার সৃজনশীল মেধাকে মূল টেক্সটের লাগাম দিয়ে রাশ টেনে রাখতে হবে। অনুবাদের বিষয়টি এদিক দিয়ে একটু ঝামেলার। একই সাথে একটা নতুন কাজ দাঁড় করানো, যে কাজ তার স্বকীয়তা এবং স্বাধীন সৃজনশীল সত্তা নিয়ে নিজের শক্তিতেই দাঁড়াতে পারে, কিন্তু ওদিকে আবার তাকে প্রকৃতিগতভাবে মূলানুগ হতে হবে। ঝামেলা না?

ও, হ্যাঁ, প্রশ্ন করতে জানতে হবে, এবং কখন প্রশ্ন করা দরকার সেটা বুঝতে হবে। অর্থাৎ নিজের জ্ঞানের সীমারেখা ও পরিধি নিরূপণ করতে পড়তে হবে। এটা আমার কাছে খুব বড় ব্যাপার মনে হয়।


সত্য বললে বলতে হয় যে গত এক দশকে যা উপন্যাস পড়েছি, তার সিংহভাগ পড়ে মনে হয়েছে যে উপন্যাসের প্রথম খসড়া। 


সোহেল হাসান গালিব

আপনি তো কথাসাহিত্য নিয়েই কাজ করছেন। ওভার-অল বাংলাদেশের কী সম্ভাবনা দেখতে পান? এখানে একটা ধারণা চালু আছে, কথাসাহিত্যের অবস্থা তেমন সুবিধার নয়।

শবনম নাদিয়া

সম্ভাবনা তো আছেই, কিন্তু এটাও সত্য যে আজকে আমাদের যেখানে থাকার কথা ছিল, আমরা ঠিক সে অবস্থানে নেই বলেই আমার মনে হয়। দেশের বাইরে থেকে হাতে বইপত্র পাওয়া একটু কঠিন বটে, কিন্তু আমি যথাসম্ভব চেষ্টা করি নতুন কারা লিখছেন, কী লিখছেন, খবর রাখতে। সত্য বললে বলতে হয় যে গত এক দশকে যা উপন্যাস পড়েছি, তার সিংহভাগ পড়ে মনে হয়েছে যে উপন্যাসের প্রথম খসড়া। প্রেমিসটা হয়তো মনকাড়া, কিন্তু পড়বার পর ঠিক তুষ্টি হয় না পাঠক হিশেবে।

আমাদের প্রকাশনা জগৎ এখনো ঠিক পেশাদার হয়ে ওঠে নি, তার নানারকম নেতিবাচক ফলাফল আছে। বড় একটা দুর্বলতা আমার কাছে মনে হয়ে যে বেশির ভাগ লেখকই লেখায় সময় দিতে চান না। প্রতি বছর তিন-চারটি বই না বের হলে আপনি কিসের লেখক, বা নিদেনপক্ষে একটি বই যদি বের না করেন বইমেলায়, তা হলেই লেখক হিশেবে আপনাকে সবাই ভুলে যাবে, এরকম একটা ভাবনা অনেকেরই আছে। এমনকি যারা জানেন যে এতে তাদের লেখা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তারাও একাজটি করেন। কেন, আমি ঠিক জানি না। অনেকের কাছেই শুনেছি প্রকাশকের চাপ থাকে, আচ্ছা পরের এডিশনে ঠিক করে নেব। প্রকাশকদের এই চাপ দেয়ার ব্যাপারটিও বেশ আশ্চর্যের। একটি লেখা পরিপূর্ণভাবে তৈরি হওয়ার আগে সেটা বাজারে নেয়ার কী মানে হয়?

আমার কাছে এটা পাঠকের প্রতি অসততা মনে হয়, লেখক ও প্রকাশক উভয় তরফ থেকেই। খুব কম লেখককেই চিনি যারা সময় নিয়ে একটি গল্পগ্রন্থ বা উপন্যাস দাঁড় করান। কিন্তু যারা করেন, তাদের লেখার ওজনই অন্যরকম হয়ে দাঁড়ায়। প্রকাশকদের মধ্যেও এই বাজারি মনোভাবের বাইরে থাকতে চান, এমন লোকজনের সংখ্যা বাড়ছে বলে মনে হয়।

সুতরাং সম্ভাবনা থাকবে না কেন, সম্ভাবনা নিশ্চয় আছে!

সোহেল হাসান গালিব

শুরুতে বলেছিলেন একটা উপন্যাস লেখার কাজে হাত দিয়েছেন। এছাড়া আর কী কী পরিকল্পনা আছে আপনার? পরস্পরের পাঠকদের সঙ্গে শেয়ার করা যায়?

শবনম নাদিয়া

পরিকল্পনা তো প্রচুর। কত কিছু লিখব, কত কিছু অনুবাদ করব! তার সিকিভাগও হয়তো এই এক জীবনে করা হবে না।

আপাতত এই উপন্যাসটি শেষ করতে চাই—কতদিন লাগবে, জানি না। ছোটগল্পের ফর্মটি আমার ভালো লাগে, আরো কিছু গল্প লিখতে চাই। দ্বিতীয় আরেকটি উপন্যাসের ভূত ঘাড়ে চেপে আছে, প্রথমটিকে না নামালে তাকে জায়গা দেয়া কঠিন। মাইক্রো-ফিকশন এবং মাইক্রো-ননফিকশন নিয়ে আমার আগ্রহ আছে—মাইক্রো-ননফিকশন ধরনে লেখা একটি স্মৃতিকথা নিয়ে কাজ করছি, হয়তো বছরে তিনবার সেটিতে নজর দেই, সেটি একদিন না একদিন শেষ করার ইচ্ছে আছে। শোক এবং মৃত্যু—মানুষের, সম্পর্কের—এ নিয়ে একগুচ্ছ কবিতা লিখেছি, লিখছি, সেটি হয়তো একটি সংকলন হতে পারে কোনো একদিন। ননফিকশন নিয়েও ইচ্ছে আছে : বাংলাদেশে নারীবাদ ও লৈঙ্গিক রাজনীতি নিয়ে আমার কৌতূহল আছে, দুতিনটা লেখা আছে, মাথায় আরো কিছু লেখার আইডিয়া আছে, সেগুলো মিলে হয়তো একদিন একটা বই হবে। আর অনুবাদের ইচ্ছের লিস্টে যে কত কী আছে, তার কোনো ইয়ত্তা নেই। আসলে জীবনের পরিধি সবসময়ই হয়তো স্বপ্নের তুলনায় খাটো রয়ে যায়!

সোহেল হাসান গালিব

সে কারণেই হয়তো বড় আকারে স্বপ্ন দেখার কথা বলেন সবাই। আপনার স্বপ্ন, পরিকল্পনা সার্থক হোক, এই প্রত্যাশা রাখি। অনেক ধন্যবাদ আপনাকে আমাদের সময় দেবার জন্য।

শবনম নাদিয়া

আপনাকেও অনেক ধন্যবাদ, গালিব, সময় নিয়ে এই আলাপটা করার জন্য। পরস্পর-এর প্রতি শুভকামনা রইল অনেক—পরস্পর এবং এ ধরনের অন্য উদ্যোগগুলো দেশের বাইরে পাঠকদের জন্য আশীর্বাদ।

সোহেল হাসান গালিব
গালিব

সোহেল হাসান গালিব

জন্ম ১৫ নভেম্বর ১৯৭৮, টাঙ্গাইল। বাংলায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর।
সহযোগী অধ্যাপক ও প্রশিক্ষণ বিশেষজ্ঞ, নায়েম, ঢাকা।

প্রকাশিত বই :
কবিতা—
চৌষট্টি ডানার উড্ডয়ন [সমুত্থান ২০০৭]
দ্বৈপায়ন বেদনার থেকে [শুদ্ধস্বর ২০০৯]
রক্তমেমোরেন্ডাম [ভাষাচিত্র ২০১১]
অনঙ্গ রূপের দেশে [আড়িয়াল, ২০১৪]
তিমিরে তারানা [অগ্রদূত ২০১৭]

প্রবন্ধ—
বাদ-মাগরিব (ভাষা-রাজনীতির গোপন পাঠ) [অগ্রদূত ২০১৮]

সম্পাদিত গ্রন্থ—
শূন্যের কবিতা (প্রথম দশকের নির্বাচিত কবিতা) [বাঙলায়ন ২০০৮]
কহনকথা (সেলিম আল দীনের নির্বাচিত সাক্ষাৎকার) [শুদ্ধস্বর ২০০৮]

সম্পাদনা [সাহিত্যপত্রিকা] : ক্রান্তিক, বনপাংশুল।

ই-মেইল : galib.uttara@gmail.com
সোহেল হাসান গালিব
গালিব