হোম সাক্ষাৎকার মোজাফ্‌ফর হোসেনের সাথে আলাপ

মোজাফ্‌ফর হোসেনের সাথে আলাপ

মোজাফ্‌ফর হোসেনের সাথে আলাপ
693
0

তরুণ কথাশিল্পী মোজাফ্‌ফর হোসেন সম্প্রতি অর্জন করেছেন ‘আবুল হাসান সাহিত্য পুরস্কার ২০১৮’। পরাধীন দেশের স্বাধীন মানুষেরা বইয়ের পাণ্ডুলিপির জন্য তার এই পুরস্কার। উল্লেখ যে, পুরস্কারটির উদ্যোক্তা অনলাইন সাহিত্য পত্রিকা ‘পরস্পর’ ও প্রকাশনা সংস্থা ‘অগ্রদূত অ্যান্ড কোম্পানি’। আর্থিক সহায়তাকারী প্রতিষ্ঠান ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক লিমিটেড। মোজাফ্‌ফর হোসেনের সাম্প্রতিক সাহিত্যচর্চা ও বিবিধ বিষয় নিয়ে আলাপ করেছেন তরুণ কবি রাসেল রায়হান…


সা ক্ষা  কা 
❑❑

রাসেল রায়হান

আবুল হাসান সাহিত্য পুরস্কার ২০১৮-এর জন্য অভিনন্দন। আপনি আগেও পুরস্কার পেয়েছেন, সুতরাং অনুভূতি না জানতে চাই। বরং পুরস্কার পাওয়ার আগে এবং পরে আপনার পরিবারের—বাবা, মা, স্ত্রীর, ভূমিকাটা আমি জানতে আগ্রহী। এটা দিয়েই শুরু করা যাক।

মোজাফ্‌ফর হোসেন

মা মারা গেছেন ২০০২ সালে। আমার লেখালেখির বিষয়ে তিনি কিছুই জেনে যেতে পারেন নি। বাবা মারা গেছেন ২০১৫ সালে। তত দিনে আমি গল্পে ‘অরণি’ ছোটগল্প পুরস্কার ও বৈশাখী টেলিভিশন থেকে প্রদত্ত ‘তোমার গল্পে সবার ঈদ’ পুরস্কার পেয়েছি। বাবা ভীষণ খুশি হয়েছিলেন। আমি বৃহৎ পরিবারের সদস্য—আট বোন, চার ভাই। পরিবারের সকলের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে পারি না। লেখালেখি ও পড়াশোনার বাইরের জগৎটা আমার ক্রমেই গুটিয়ে আসছে। আমার স্ত্রী মাটির কথা বলতে পারি। এই পুরস্কার প্রাপ্তিতে সবচেয়ে বেশি খুশি হয়েছে সে। এই অর্জন তারও।

রাসেল রায়হান

যেহেতু আমিই সাক্ষাৎকার নিচ্ছি, পুরস্কার পাওয়া বইয়ের পাণ্ডুলিপিটা পড়েছি কিছুটা। প্রথম গল্পটাই মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে। আপনার মা দেশভাগের কথা বলে কাঁদতেন,  মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছেন; সেসব আলাদা কতটা রসদ জুগিয়েছে আপনার জন্য।

মোজাফ্‌ফর হোসেন

আমার সাহিত্যের বা জীবনবোধের অনেক রসদ আমি মায়ের কাছ থেকে পেয়েছি। আমি আমার মায়ের বোধ নিয়েই একজীবন লিখে যেতে পারব। কথার কথা বলছি না। তিনি ছিলেন বারো সন্তানের মা। এর মধ্যে ৯ সন্তান তিনি নিজের পেটে ধরেছিলেন, বাকি ৩ জনকে পেয়েছিলেন বাবার আগের স্ত্রীর পক্ষে। সে এক মহাকাব্য। এখানে আর বেশি বলতে চাই না।

রাসেল রায়হান

এ ধরনের গল্প লেখার ক্ষেত্রে আপনার প্রস্তুতিটা ঠিক কেমন থাকে?

মোজাফ্‌ফর হোসেন

আমি কখনোই প্রস্তুতি নিয়ে গল্প লিখি না। প্রবন্ধ লেখার ক্ষেত্রে অনেক প্রস্তুতি নিতে হয়।

রাসেল রায়হান

বিশ্বসাহিত্য নিয়ে আপনার পাঠ বিস্তর। আপনি প্রবন্ধ-নিবন্ধও লিখেছেন এসব নিয়ে। এগুলোর তুলনায় যদি আপনার লেখাকে দাঁড় করানো হয়…? কিভাবে দেখছেন?

মোজাফ্‌ফর হোসেন

আমি বিশ্বসাহিত্য পড়ার আগেই লিখতে শুরু করেছি। পরে ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র হওয়ার কারণে বিশ্বসাহিত্য পাঠের সুযোগ হয়েছে। বলা যেতে পারে, এই সুযোগটা নেব বলেই আমি পরিকল্পনা করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি ছেড়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হয়েছিলাম। তুলনা-প্রতিতুলনা সাহিত্যের একটা অপরিহার্য অংশ। কিন্তু বিশ্বসাহিত্য একটা ব্যাপক অংশ। বিশ্বসাহিত্যের একটা খণ্ডিত অংশ হিসেবে বাংলা সাহিত্যও পড়ে। ফলে যেকোনো দুর্বল লেখকও বিশ্বসাহিত্যের বাইরের কেউ নন। ভালো লেখকের পাশাপাশি যাচ্ছেতাই লিখছেন, এমন লেখক প্রতি দেশেই আছেন। ফলে বিশ্বসাহিত্যের কারও তুলনায় আমার লেখা ভালো হতে পারে, কারও তুলনায় খারাপ। কিন্তু সেই বিচারে যাওয়ার আগে আমি যেটা ভাবি, আমার লেখাটি আমাকেই লিখতে হবে। ওটা লেখার জন্য অন্য কারও জন্ম হবে না।

 

রাসেল রায়হান

দেশভাগ থেকে মুক্তিযুদ্ধ—আপনার গল্পে এটা নিয়ে কাজ করার ইচ্ছা কতটা আছে? আমার মত হলো, কোনো বিষয় নিয়ে লিখতে হলে লেখকের নির্মোহ হওয়া জরুরি। সে ক্ষেত্রে এসব বিষয় নিয়ে মহৎ কাজ এখানে ঠিক কতটা হয়েছে বলে আপনার মনে হয়? বা ঠিক কখন বড় কাজ করা যাবে?

মোজাফ্‌ফর হোসেন

উপমহাদেশের রাজনীতির দুটো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো দেশভাগ ও আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধ। এই দুটো ঘটনা আমরা চাইলেও এড়িয়ে যেতে পারব না। আমার মায়ের পরিবার দেশভাগের শিকার। সীমান্তবর্তী গাঁয়ে আমাদের বাড়ি। আমার বড়খালা মারা গেছেন ওপারে। মা এপার থেকে আকাশের দিকে তাকিয়ে থেকেছেন দিনের পর দিন। দেশভাগের ঘটনার ইমপ্যাক্ট নিয়ে আমি তিনটি গল্প লিখেছি। মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী প্রজন্ম আমি। আমি যখন বেড়ে উঠছি, তখন রাজনৈতিকভাবে আমাদের ইতিহাসের ভুল পাঠদান চলছিল। সঠিক ইতিহাস আমাকে খুঁজে নিতে হয়েছে সেই রাজাকারশাসিত গাঁয়ে বসে। ফলে সঠিক মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের প্রতি আমার অধিকার জন্মেছে। আমার আত্ম-অন্বেষণ এর সঙ্গে মিশে আছে। আমি ৫টি গল্প লিখেছি মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে। যে পাণ্ডুলিপিটি পুরস্কৃত হলো, সেখানেও নামগল্পসহ আরও একটি গল্প মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন পরিস্থিতি নিয়ে। কিন্তু এগুলো সবই আমার খণ্ড খণ্ড প্রয়াস, বড় কাজের প্রস্তুতি বলতে পারেন। কোনো বিষয় নিয়ে লিখতে হলে অবশ্যই নির্মোহ থাকা জরুরি। কিন্তু আমি মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লেখার সময় নির্মোহ থাকতে পারি না। আবেগে আক্রান্ত হই। ক্ষতবিক্ষত হই সেই সময়ে আমার মায়ের অনেকগুলো সন্তান নিয়ে ভয়ে-শঙ্কায় দিনযাপনের কথা স্মরণ করে। এ দেশের যেখানেই পা দিই, সেখানেই মিশে আছে এই বাংলার স্বাধীনতাকামী মানুষের রক্ত। এই আবেগ থেকে সরে গিয়ে আমি কখনোই মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কিছু লিখতে চাই না। লিখতে জানলে আবেগ ভেতরে ধারণ করেও যুদ্ধভিত্তিক মহৎ সৃষ্টি সম্ভব, যেমন হেমিংওয়ে পেরেছেন। আমার বিশ্বাস আমাদের এখানেও সেটি হবে।

মুক্তিযুদ্ধ সমাপ্ত হয়েছে আজ থেকে প্রায় ৫০ বছর আগে। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক অনেকগুলো মহৎ শিল্পসৃষ্টির জন্য এই সময় একেবারে কম সময় নয়। আমরা দেখেছি প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সব উপন্যাস লেখা হয়েছে, চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে গত শতকের মাঝামাঝিতেই। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের পরে আমাদের দুর্ভাগ্য যে রাজনৈতিক অবস্থা পাল্টে যায়। ৭৫-এ সপরিবারে বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতাকে হত্যার পর থেকে দেশে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তির যে উত্থানপর্ব শুরু হয়, সেখানে অনেকে হয়তো বড় ক্যানভাসে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লেখার সাহস করেন নি। জয় বাংলা স্লোগান কিংবা রাজাকার চরিত্র ছাড়া তো মুক্তিযুদ্ধের পূর্ণাঙ্গ উপন্যাস লেখা সম্ভব নয়। কিন্তু অনুকূল রাজনৈতিক অবস্থা তখন দেশে ছিল না। তারপরও আমি মনে করি, অনেকে সাহসিকতার সঙ্গে লিখেছেন, আগামীতেও লেখা হবে।


বাতিঘর, পাঠক সমাবেশ, প্রথমা, তক্ষশীলা, বেঙ্গল বুকস-এর মতো রাজধানীর বড় বড় বই বিক্রয় কেন্দ্রগুলোতে আশি শতাংশ কিংবা তারও বেশি বই পশ্চিমবাংলার।


রাসেল রায়হান

‘লাশটি জীবিত বাকিরা মৃত’ থেকে কোট করছি… ‘লাশের যেদিন জন্ম হয় বাংলাদেশের বয়স সেদিন পাঁচ মাস পূর্ণ হলো। লাশ যখন পেটে, লাশের বাবা তখন যুদ্ধে।’ পুরো গল্পটাতে এক ধরনের বিদ্রূপ-স্বর টের পাওয়া যায়। আচ্ছা, কোনো কারণে এই লাশ কি বাংলাদেশ? রূপকার্থে যদি ধরে নিতে যাই। সে ইশারা কিন্তু আছেও। কিংবা কোনো পাঠক এমনটা মনে করতে পারে কি না?

মোজাফ্‌ফর হোসেন

পারে। পাঠকের সম্পূর্ণ স্বাধীনতা থাকে তার চিন্তার। এটা অনেক আগে লেখা গল্প, আমাকে কিছু বলতে হলে আবার পড়ে নিতে হবে। আর এখন পাঠ থেকে যেটা বলব, সেটা ভেবে হয়তো তখন লিখি নি।

রাসেল রায়হান

পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্য একসময় এখানকার বাজার পুরোটাই দখল করে ছিল। তার ভেতর দিয়েই আমরা আমাদের গ্রেটদের পেয়েছি। এখন তাদের বাজার নষ্ট হয়ে গেছে, কিন্তু এখানকার লেখার মানও পড়ে গেছে। এটার কারণ কী? আবার এখনকার পাঠকও যেন সাহিত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। কেন?

মোজাফ্‌ফর হোসেন

আমি মনে করি, পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্যের বাজারটা এখানে আরও শক্তিশালী হয়েছে। বাতিঘর, পাঠক সমাবেশ, প্রথমা, তক্ষশীলা, বেঙ্গল বুকস-এর মতো রাজধানীর বড় বড় বই বিক্রয় কেন্দ্রগুলোতে আশি শতাংশ কিংবা তারও বেশি বই পশ্চিমবাংলার। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সময়ে পুরস্কৃত বা আলোচিত অধিকাংশ বইও এখানে পাওয়া যায় না। কিন্তু কলকাতার অনেক অল্পখ্যাত লেখকের বইও পাওয়া যায়। মাস কতক আগে আমি কলকাতার এক লেখক-বন্ধুকে শহরের একটি বড় বই-বিক্রয়কেন্দ্রে নিয়ে গিয়েছিলাম। উনি সেখানে গিয়ে হাসতে হাসতে বললেন, দাদা, আমি তো কলকাতার বই কিনতে আসি নি! শুধু বাংলাদেশের বই পাওয়া যায়, এমন স্টলে নিয়ে চলুন। আমি উনাকে বললাম, কলকাতায় যেমন শুধু কলকাতার বই পাওয়া যায়—এমন বই-বিক্রয়কেন্দ্র অধিকাংশ, আমাদের এখানে তেমনটি একটিও পাবেন না। সবখানে মিলেমিশে দুই বাংলার বই-ই পাবেন। কোথাও কোথাও কলকাতার বই ডিসপ্লেতে বেশি, কারণ এখানে কলকাতার সাহিত্যের পাঠক আছে, দুই, শুনেছি কলকাতায় বই বিক্রিতে বেশি কমিশন থাকে। উনি আফসোস করে বললেন, কলকাতায়ও যদি একই রকম চিত্র হতো, তাহলে আর আমাকে বইয়ের তালিকা করে বাংলাদেশে আসতে হতো না!

এখানকার সাহিত্যের মান বাড়া-কমার সাথে কলকাতার সাহিত্যের কোনো সম্পর্ক আছে, এমনটি আমি ভাবি না। ভালো বই যত আসবে, ততই ভালো। কলকাতার লেখকদেরও বলতে শুনি, ওখানে সাহিত্যমান-পাঠকের সংখ্যা কমে গেছে। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র-সংগীত-সাহিত্য-চিত্রকলা শিল্পের কোনো ক্ষেত্রেই আমি মনে করি না খুব বেশি এগুতে পেরেছি। বরং যে অগ্রযাত্রা ত্রিশ-চল্লিশ বছর আগে ছিল, সেটাও কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্তিমিত হয়ে এসেছে। এটা আমার ব্যক্তিগত মত। শিল্প-সাহিত্য থেকে মানুষ সরে যাওয়ার কারণটি খুব সরলভাবে ব্যাখ্যা করতে চাই না। এর পেছনে সমাজকাঠামো বদল, নব্য-ধনিক শ্রেণি তৈরি, মধ্যবিত্তের সংকট, শিক্ষাব্যবস্থা, পুঁজির অসুস্থ বিকাশ, অর্থব্যবস্থা, প্রযুক্তি ও মিডিয়ার আগ্রাসন—এমন অনেক অনুষঙ্গ জড়িয়ে আছে।

রাসেল রায়হান

পাঠকের প্রতি আপনি কতটুকু দায়বদ্ধতা অনুভব করেন?

মোজাফ্‌ফর হোসেন

গল্প যখন লিখি, তখন ওই গল্প ছাড়া পৃথিবীর আর কারও প্রতি কোনো দায়বদ্ধতা অনুভব করি নি।

রাসেল রায়হান

আমি দু-জায়গায় দেখেছি যে আপনি বলেছেন, আপনি গল্প জেনে লিখতে বসেন না; লিখতে লিখতে জানতে চান, অনেকটা পাঠকের মতো। ব্যাখ্যা করবেন একটু?

মোজাফ্‌ফর হোসেন

এর একটা কারণ, আমি পূর্বপরিকল্পিত ছক এঁটে গল্প লিখি না। যে গল্পটা লিখতে শুরু করি, অনেক সময় সে-গল্পের কিছুই আমি জানি না। যেমন, ‘লোকটা আত্মহত্যা করার জন্যই মরেনি’ গল্পের শিরোনাম-বাক্যটি আমার হঠাৎ করেই মাথায় এল। এই লাইনটার আগেপিছে কিছু যোগ করা যায় কি না ভাবতে ভাবতে গল্পটি লেখা হয়ে যায়। অনেকে আছেন পুরো গল্পটা মনে মনে সাজিয়ে বা একটা আউটলাইন ভেবে নিয়ে লিখতে বসেন। আমি সেটা পারি না। ফলে আমার গল্পে শুরুটা হঠাৎ করেই হয়, শেষটাও কোনো সোজা পথ ধরে গন্তব্যে পৌঁছানোর মতো নয়। ‘লোকটা আত্মহত্যা করার জন্যই মরেনি’ গল্পে যেটা হয়েছে—একটি উপযুক্ত বাক্য খুঁজে পাওয়ার পর মনে হয়েছে, বাক্যটিকে বাঁচিয়ে রাখা প্রয়োজন। এখানে একটা গল্পের প্রয়োজনে কতগুলো বাক্য নয়, একটা বাক্যের প্রয়োজনে কতগুলো গল্প তৈরি হয়েছে।

আবার যে গল্পটি আমার জানা—যেমন ‘বাঁশিওয়ালা মজ্জেল’, ‘আলীমেয়েলি’, ‘চক্করকাটা জটি’, ‘সফেলা’—এদের গল্পটা আমি জানি, কিন্তু লিখতে বসে আমি তাদের অস্তিত্বের অন্য একটা সম্ভাবনার গল্প লিখেছি। ফলে আমার সেই গল্প নিয়ে বিশ্বস্ততার প্রশ্ন উঠেছে পরিচিত মহলে। এভাবেই অধিকাংশ গল্পই লিখতে লিখতে বাঁকবদল করে ভিন্ন একটা গল্প হয়ে গেছে। আমি চেষ্টা করেছি, যে গল্পটা সত্য, তার অন্য একটি বা একাধিক সম্ভাবনার কথা বলতে। তাই গল্পগুলো সরাসরি বাস্তবতা-নির্ভর না থেকে সম্ভাবনা-নির্ভর হয়ে উঠেছে।


বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করার মতো ইংরেজি ভাষায় কোনো লেখক আমাদের তৈরি হয় নি।


রাসেল রায়হান

আপনি গল্প নিয়ে নিরীক্ষা করতে চান বেশি, নতুন কিছু করতে আগ্রহী। প্রশ্নটা হালকা মনে হতে পারে। হালকা চালেই করা যাক। সব সময় গুরুগম্ভীর ভালোও না। প্রসঙ্গে আসি, আপনার গল্পে দেখা যায়, গল্পের চরিত্রগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, আপনি মানুষের মনস্তত্ত্ব নিয়ে কাজ করতে তীব্রভাবে আগ্রহী। আপনার সমস্ত চিন্তাভাবনাই থাকে গল্পের ফর্ম আর মনস্তত্ত্ব নিয়ে। আপনার কি মনে হয় না, এটা পুরনো হয়ে গেছে। আগে অনেকেই এগুলো নিয়ে বিস্তর কাজ করেছেন?

মোজাফ্‌ফর হোসেন

নাথিং ইজ নিউ আন্ডার দ্য সান, একজন বিখ্যাত লেখক বলেছেন। সম্ভবত টমাস মান। আমি নতুন কিছু করব বলে লিখতে আসি নি। সেটা করতে চাইলে নাসায় গবেষণা করতে হবে। আমি আমার গল্পটা লিখতে এসেছি। আগে যারা লিখেছেন তাদের চরিত্রের মনস্তত্ত্ব আর আমার চরিত্রের মনস্তত্ত্ব এক না। তাছাড়া, কাঠামো আর মনস্তত্ত্ব বাদ দিয়ে সাহিত্য হয় কি না আমার জানা নেই। হলেও তাতে আমার আগ্রহ নেই।

রাসেল রায়হান

আপনি ডায়াসপোরা সাহিত্য নিয়ে বেশ কাজ করেছেন। নানান কিছুই জানেন। আমি নিজে আপনার একটা প্রবন্ধ শুনেছিলাম এ বিষয়ে। আপনার কি মনে হয় নি কখনো যে, এদের অনেকেই বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন এবং বাংলাদেশকে ভুলভাবে উপস্থাপন করছেন?

মোজাফ্‌ফর হোসেন

আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করছেন, ইংরেজি ভাষায় এমন কোনো সেলেব্রেটি লেখক বাংলাদেশের তৈরি হয় নি। ভারতের তেমন অসংখ্য লেখক আছেন। পাকিস্তানের হানিফ কুরাইশি কিংবা আফগানিস্তানের খালিদ হোসাইনির মতো বৈশ্বিক পর্যায়ে পরিচিত লেখক আমাদের নেই। মণিকা আলি যতটা না বাংলাদেশি, তার চেয়ে বেশি ব্রিটিশ। তিনি চারটি উপন্যাস লিখেছেন, সেখানে ব্রিক লেন-প্রবাসী বাংলাদেশিদের সংকট নিয়ে লেখা হলেও পরেরগুলোর বিষয় অন্য। তাছাড়া তিনি বিশ্বসাহিত্যের অতি উল্লেখযোগ্য লেখকও নন। তাহমিমা আনাম যতটা না দুর্বল, তার চেয়ে কম পঠিত। কাজেই খুব শক্তভাবে বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করার মতো ইংরেজি ভাষায় কোনো লেখক আমাদের তৈরি হয় নি। দ্বিতীয়, লেখক লিখবেন স্বাধীনভাবে। তিনি তার গল্পটা লিখবেন। পাবলিক সেন্টিমেন্টের পক্ষে একজন লেখক কলম ধরেন না। নিজের দেশের প্রচলিত সব বিশ্বাস ও ঘটনার প্রতিনিধিত্ব করেন নি বলেই আজ মুসলিম বিশ্বের অনেক লেখক দেশ ছেড়ে ইউরোপে বসে লিখছেন। এই সঠিক-বেঠিক মাপকাঠিটা নির্ণয়ই-বা কে করে দেবে? দেশের শোষকশ্রেণি বা আমজনতা তা করে দিলে আমি মানব কেন? দেশকে সঠিকভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে কি না, এই প্রশ্ন আমরা এখন মিডিয়াকে করতে পারি। কারণ মিডিয়া ও প্রযুক্তিবিপ্লবের এই সময়ে সাহিত্য আর জনসম্পৃক্ত বা গণ-শিল্পমাধ্যম না। কিন্তু মিডিয়া বিশ্বের সবখানেই একটা পেইড এজেন্সি। ফলে সাহিত্যের দায় চলে গিয়েছে ঘটনার অন্তর্বয়ানে এবং সম্ভাব্যতায়। আমি এখন বিশ্বাস করতে চাই, গল্পটাই সত্য। যে জীবন আমরা যাপন করি, তার অনেকটাই বানোয়াট, ফলে একজন পাঠকের জন্য হলেও আমি গল্পটা ঠিকঠাক বলতে চাই, যে গল্পটা অবশ্যই সম্ভাব্য গল্প।

রাসেল রায়হান

আমি যতটা দেখেছি, আপনি গল্প বলার ক্ষেত্রে ভাষার দিকে মনোযোগ বেশি দেন। আপনার কি মনে হয় না, এই অতিরিক্ত মনোযোগ গল্পের স্বতঃস্ফূর্ততাকে নষ্ট করছে। কিংবা সামান্য হলেও মিইয়ে দিচ্ছে?

মোজাফ্‌ফর হোসেন

আমি ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোনো রীতি অনুসরণ করি না। গল্প অনুযায়ী ভাষার প্রবাহকে আসতে দিই। অনেক সময় ভাষা নিজেই গল্পের কাঠামো হয়ে ওঠে। যেমনটি বর্তমান গ্রন্থের ‘জলের মাঝে স্বপ্নের বুদ্বুদ’ গল্পে হয়েছে। এ ক্ষেত্রে গল্পটা জটিল হয়ে উঠতে পারে। স্বতঃস্ফূর্ততা যে সাহিত্যের সর্বোত্তম গুণ, এই বিশ্বাস আজ ভেঙে গেছে। অনেকে প্রশংসা করতে গিয়ে কোনো কোনো লেখক সম্পর্কে বলেন, তার লেখা পড়তে পড়তে পুরো দৃশ্যটা চোখের সামনে ভেসে ওঠে। কিন্তু আধুনিক সাহিত্য ভাষা দিয়ে চলচ্চিত্র তৈরি করে না।

যদি স্বতঃস্ফূর্ততায় সাহিত্যের একমাত্র উৎকৃষ্ট পথ হতো, তাহলে আর নতুন করে জয়েস-ফকনার-ভার্জিনিয়া উলফ-বার্থলেম-জন ফাওলস থেকে শুরু করে শহীদুল জহিরের মতো লেখকদের জন্ম হতো না। আমি মনে করি, ভিক্টোরিয়ান যুগের বা ঐ ধারার সাহিত্যের পাঠক যে কমে গেছে, তার কারণ সেগুলো অতিমাত্রায় স্বচ্ছ। চিন্তার কোনো ক্ষেত্র সেখানে ভাষা বা বর্ণনাশৈলীর মধ্যে নেই। হয়তো গল্পে আছে। কিন্তু গল্পটা সরল-সোজা বলে ফেলা সাহিত্যের একমাত্র কাজ না।

রাসেল রায়হান

আপনি ডিটেইলিংয়ের দিকেও খুব বেশি জোর দেন মনে হচ্ছে। এই সময়ের বেশিরভাগ লেখকেরই এই প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। এমন কি হতে পারে, ক্ষুদ্র বিষয়ের দিকে অতিরিক্ত এই মনোযোগ বড় কোনো বিষয়কে আড়ালে ঠেলে দিচ্ছে? ধরেন, আমরা কি ধানের শিষের ওপরের একটি শিশির বিন্দু খুঁজতে গিয়ে পর্বতমালা, সিন্ধু থেকে আড়ালে চলে যাচ্ছি না?

মোজাফ্‌ফর হোসেন

আপনি আমার গল্পের মনোযোগী পাঠক নন। আমি ডিটেলিংয়ে যেতে পারছি না বলেই গত পাঁচ বছর ধরে উপন্যাস লিখতে পারছি না। এই বিশেষ গুণটা আমার ভেতর খুঁজে পাচ্ছি না। আমার চারটি ছোটগল্পের বই প্রকাশিত হয়েছে। দ্বিধা গ্রন্থে ৩৫ পৃষ্ঠায় আছে ১০টি গল্প। আদিম বুদ্বুদ অথবা কাঁচামাটির বিগ্রহ বইয়ে ১২০ পৃষ্ঠায় আছে ২০টি গল্প। অতীত একটা ভিনদেশখুন হয়ে যাচ্ছে সব সাদেক গল্পগ্রন্থেরও একই অবস্থা। অর্থাৎ আমি হেমিংওয়ের মতো অল্পকথনে বন্দি। গদ্যের ডালপালা নেই। মেদ জমার আগেই গল্প শেষ। আমি অনেক সময় অতি সামান্য বিষয় নিয়ে গল্প লিখেছি, অণুগল্পের মতো হয়ে গেছে। আবার উপন্যাসের মতো বড় প্লটও চেপেচুপে ছোটগল্পে নিয়ে এসেছি, ফলে অনেক পাঠক আরেকটু ডিটেইলিং হলে ভালো হতো বলে জানিয়েছেন। এ ক্ষেত্রে আমি ব্যর্থ হয়েছি।

রাসেল রায়হান

আরেকবার ‘লাশটি জীবিত বাকিরা মৃত’ গল্পে ফেরত আসি। আপনি এই গল্পে বাংলাদেশের অনেকগুলো কমন চিত্র ধরেছেন, যেসব চর্চা আমাদের মধ্যে তুমুলভাবে চলছে। গল্পটার প্রেক্ষাপটটা বলবেন, সংক্ষেপে?

মোজাফ্‌ফর হোসেন

গল্পটি যখন লিখি তখন আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। যতদূর মনে পড়ছে, খবরের কাগজে কোনো এক সময় পড়েছিলাম নির্মাণাধীন ভবনে লাশ ঝুলছে। কী কারণে যেন লাশটি নামানো যাচ্ছে না। এর বেশি কিছু মনে পড়ছে না।


হাসান আজিজুল হকের ছোটগল্পের ধারাটি বাংলা সাহিত্যের ঐতিহ্যগত এবং আগে-পরে জনপ্রিয়। 


রাসেল রায়হান

একশ বছর আগে নোবেল এসেছিল এ দেশে। সেটা কবিতায়। বাংলাভাষায় কথাসাহিত্যে কোনো নোবেল নেই। এটাকে কিভাবে দেখেন? নোবেল কমিটির চোখে পড়ার যোগ্য লেখক জন্মান নি? জন্মালে কারণ কী? ক্রাইটেরিয়াগুলো কী কী?

মোজাফ্‌ফর হোসেন

নোবেল কমিটি সাহিত্যে নোবেল প্রদান করার জন্য লেখক খুঁজে বের করেন না। যে সকল মনোনয়ন জমা পড়ে, তা থেকে নির্বাচন করেন একজন লেখককে। আমি নিজে মনে করি, বাংলা ভাষার একাধিক লেখক সাহিত্যে নোবেল পেতে পারতেন। কিন্তু পান নি যে, তাতে তারা ছোট হয়ে যান নি। নোবেল পেলে বাংলা ভাষার আরও কয়েকজন লেখক বিশ্বের অন্যান্য দেশে পঠিত হতেন, না পাওয়াতে সেই প্রাপ্তিযোগ আমাদের ঘটে নি। নোবেল না পেলেও আমি মনে করি, ইশিগুরো, মো ইয়ানের চেয়ে হাসান আজিজুল হক, রিজিয়া রহমান, সৈয়দ শামসুল হকের মতো লেখকরা কম শক্তিশালী নন। তারাশঙ্কর-মানিক-বিভূতিভূষণের কথা বলে এখন আর আফসোস করতে চাই না। কিন্তু বাংলাদেশের কথাসাহিত্য বাংলা ভাষা জানা ইউরোপীয়দের হাতে অনূদিত হয় নি। আমরা জানি, রবীন্দ্রনাথের নির্ভরযোগ্য অনুবাদকদের ভেতর আছেন ম্যারিনো রিগন, যিনি বাংলা থেকে সরাসরি ইতালি ভাষায় অনুবাদ করেছেন, ফরাসি ভাষায় অনুবাদ করেছেন আঁদ্রে জিদের মতো প্রখ্যাত লেখক, যিনি পরবর্তীকালে নিজেও সাহিত্যে নোবেল পান, স্পেনে আরেক নোবেলজয়ী লেখক হুয়ান রামোন হিমেনেস, আর্জেন্টিনায় ভিক্তোরিয়া ওকাম্পো, নেদারল্যান্ডে ফ্রেদেরিক ভন ইডেন, চেক ভাষায় ভিনসেনস লেসনি এবং দুসান জাভিতেল, লাটভিয়াতে কার্লিস ইগল এবং রিচার্ডস রুডিটিস, আরবে মুহাম্মদ সুখরি আয়াদ এবং রুশ ভাষায় এ পি নাতুক-ডানিল’চাক। পরবর্তী সময়ে বাংলা ভাষার আর কোনো লেখক ইংরেজি ভাষায় ভালো অনুবাদক খুঁজে পান নি। বা কেউ আগ্রহ নিয়ে করেন নি। নোবেল কমিটির হাতে আমাদের লেখককের পৌঁছাতে হলে ভাষার সেতুটা ব্যবহার করতে হবে। মানের প্রশ্ন আসছে পরে। আমরা প্রথম শর্তটাই পূরণ করতে পারছি না। সাহিত্যের মানচিত্রে বাংলাদেশের সাহিত্যের পরিচিতিটা এখনো হয় নি। এটা নেটিভ লেখকদের হাত দিয়ে হয় না। আফ্রিকার কয়েকটি দেশ পেরেছে তাদের দেশের ইংরেজি ভাষায় লেখা লেখকদের দিয়ে। আমাদের দেশ থেকে ইংরেজি ভাষায় শক্তিমান লেখকের জন্ম হয় নি।

রাসেল রায়হান

শেষ প্রশ্ন, বিশ্বসাহিত্যের বিচারে বর্তমান বাংলা সাহিত্যকে কিভাবে দেখেন? ৩০ বছর আগের বাংলা সাহিত্যকেও কিভাবে দেখেন?

মোজাফ্‌ফর হোসেন

আবারও বলছি, বাংলাদেশের বাইরে বসবাসকারী যেকোনো মানুষের জন্য বাংলাদেশও বিশ্বসাহিত্যের অংশ। কোনো দেশ বাদ দিয়ে বিশ্বসাহিত্য হয় না। বিশ্বসাহিত্য বলতেই নির্দিষ্ট কোনো মানদণ্ড না। ভালো লেখা সব দেশেই হয়েছে, হচ্ছে। শিল্পসাহিত্যের একটা স্থানিক-কালিক অবস্থান আছে। আমরা চেষ্টা করলে পরিসংখ্যান ঘেঁটে বলতে পারি, ফুটবলে আর্জেন্টিনা সেরা, না পর্তুগাল সেরা। আবার ফুটবলের শিল্পের বিচারে মেসি সেরা, না রোনালদো সেরা—সেটি নিয়ে তর্কের অবকাশ থাকে। পৃথিবীর যেকোনো দেশের সাহিত্যের ক্ষেত্রে একই কথা খাটে। কথাসাহিত্যে নাইজেরিয়ার নুরুদ্দিন ফারাহ, কানাডার মার্গারেট অ্যাটউড, চিনের মো ইয়ান, ব্রিটেনের জর্জ সন্ডার্স, আমেরিকার জুনোট ডায়াজ, জাপানের মুরাকামি কিংবা জাপানি বংশোদ্ভূত মার্কিন লেখক ইশিগুরো, পাকিস্তানের হানিফ কুরাইশি, ভারতের অমিতাভ ঘোষ কিংবা ভারতীয় বংশোদ্ভূত কানাডীয় লেখক রহিনটন মিস্ত্রি, কেনিয়ার নগুগি, মিশরের নগিব মাহফুজ, তুরস্কের ওরহান পামুক, ব্রাজিলের পাওলো কোয়েলহো, বাংলাদেশের সৈয়দ শামসুল হক কিংবা হাসান আজিজুল হক, ভারতের দেবেশ রায় কিংবা সমরেশ-সুনীল—কাকে আপনি বর্তমান বিশ্বসাহিত্যের মানদণ্ড ধরবেন? কারও সঙ্গে তো কারও মিল নেই। কিন্তু সকলেই অসাধারণ লিখেছেন বা লিখছেন। কাজেই আমি চাইলেও কোনো দেশের গোটা সাহিত্যকে মোটাদাগে বিচার করে ফেলতে পারি না।

ত্রিশ বছর আগের বাংলা সাহিত্য থেকে বর্তমান বাংলা সাহিত্যের তফাৎ খুব বেশি নেই। ব্যক্তির জীবনে ত্রিশ বছর অনেক সময় হলেও একটা দেশের সাহিত্য-ক্যালেন্ডারে ত্রিশ বছর খুব কম সময়। ত্রিশ বছর আগে যারা লিখেছেন, তারা এখনো সক্রিয়ভাবে লিখে যাচ্ছেন। তবে রবার্ট ফ্রস্ট যে বলেছিলেন, প্রত্যেক কবির জন্ম হয় নতুন কিছু বলার জন্য। সেই হিসেবে একই সময়ে বহুস্বর চলে আসে। ষাটের দশকে মোটাদাগে একই সঙ্গে ছোটগল্পের তিনটি ধারা তৈরি হয় বাংলাদেশে। ক্ষীয়মাণ গল্পগ্রন্থ নিয়ে আসেন আবদুশ শাকুর, সমুদ্রের স্বপ্ন শীতের অরণ্য নিয়ে আসেন হাসান আজিজুল হক ও দুর্বিনীত কাল নিয়ে আসেন জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত। হাসান আজিজুল হকের ছোটগল্পের ধারাটি বাংলা সাহিত্যের ঐতিহ্যগত এবং আগে-পরে জনপ্রিয়। বাংলা সাহিত্যের জমজমাট গল্প বলার জনপ্রিয় ধারা থেকে বের হয়ে অন্য একটি ধারা তৈরি করেন জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত। তার অনেক গল্পে স্বপ্ন ও বাস্তবতার মিশেল ঘটেছে। গল্পের বিভিন্ন দৃশ্যকে তিনি চলচ্চিত্রের মতো আলাদা করে ধারণ করে montage-এর রীতি অনুসরণ করে জুড়ে দেন। অন্যদিকে আবদুশ শাকুরের গল্পের কাঠামো ভাষাপ্রধান। অর্থাৎ সাধারণ মানুষের ভাষা তিনি তার গল্পের চরিত্রের মুখে তুলে না দিয়ে একটি নির্মিত ভাষা তুলে দিয়েছেন। সাহিত্যে বাস্তবের মতো হুবহু চরিত্র ও ভাষা নির্মিতিতে বিশ্বাসী ছিলেন না শাকুর। তিনি সাহিত্যকে সামগ্রিকভাবে নির্মাণ হিসেবে দেখতে চেয়েছেন।

এত কথা বলার কারণ হলো, সাহিত্য একই সময়ে এতগুলো তল নিয়ে আমাদের সামনে আসে যে আমরা চাইলেও সাহিত্য নিয়ে ঢালাওভাবে কোনো মন্তব্যে যেতে পারি না।

রাসেল রায়হান

রাসেল রায়হান

জন্ম ৬ ডিসেম্বর, ১৯৮৮; বাগেরহাট। ঢাকা কলেজ থেকে পদার্থবিজ্ঞানে মাস্টার্স। বর্তমানে একটি বেসরকারি কোম্পানিতে কর্মরত।

প্রকাশিত বই:
সুখী ধনুর্বিদ [কবিতা; প্লাটফর্ম, ২০১৬]
বিব্রত ময়ূর [কবিতা; প্রথমা, ২০১৬]

ই-মেইল : rasahmed09@gmail.com
রাসেল রায়হান