হোম সাক্ষাৎকার মুখোমুখি : মোহাম্মদ রফিক ও সেলিম আল দীন

মুখোমুখি : মোহাম্মদ রফিক ও সেলিম আল দীন

মুখোমুখি : মোহাম্মদ রফিক ও সেলিম আল দীন
717
0

মোহাম্মদ রফিক এবং সেলিম আল দীন—এক ভূখণ্ডে, একই জগতের দুই দিকপাল। মোহাম্মদ রফিকের সাম্প্রতিক কাব্যগ্রন্থ মৎস্যগন্ধা [১৯৯৯] পাঠ এবং মঞ্চে ঢাকা থিয়েটারের সাম্প্রতিক প্রযোজনা সেলিম আল দীনের বনপাংশুল প্রত্যক্ষ করলে বিগত দুই যুগব্যাপী গড়ে ওঠা এই ধারণা স্পষ্টতর হয় যে, দুই শিল্পীই বাংলা ভাষার প্রধানত ইংরেজি সাহিত্যের আধিপত্যে গড়ে ওঠা অবক্ষয়ক্লিষ্ট এবং পর-অনুকারী শিল্পের বিপরীতে দেশীয় জীবনযাপন, সংস্কৃতি, পুরাণের ছায়ার একটি প্রাতিস্বিক শক্ত ভিত্তিভূমি গড়ে তুলতে তৎপর। এক অর্থে দুজনই কবি—স্রষ্টা। দুজনের শিল্পচিন্তার মধ্যে ঐক্য যেমন আছে তেমনি আছে বৈপরীত্যও। এই ঐক্য ও বৈপরীত্য বিষয়ে তাদের মধ্যে একটা কথোপকথন হয়েছিল সম্প্রতি। এতে ইন্ধন জুগিয়েছেন কথাশিল্পী মঈনুল আহসান সাবের। কবিতা নাটক ও উপন্যাস ছোটগল্প মহাকাব্য, শিল্পবোধ জনরুচি ইত্যাকার বিষয়ে তারা কথা বলেছেন। ইতঃপূর্বে সেলিম আল দীন আশঙ্কা ব্যক্ত করেছিলেন যে, ‘বিশ্বসাহিত্যে একবিংশ শতাব্দী শিল্প বিষয়ে এক আঙ্গিক ও পদ্ধতিগত সঙ্কটে নিপতিত হবে।’ এই আশঙ্কা পুনর্ব্যক্ত করে আলোচনার সূত্রপাত করেছেন তিনি। উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটারের সাধারণ সম্পাদক হুমায়ূন কবির হিমু, তরুণ কবি নাট্যকর্মী শামীম রেজা, নাট্যকর্মী হারুন রশীদ ও কবিতাকর্মী জাফর আহমদ রাশেদ। ধারণকৃত কথোপকথনের শ্রুতি উদ্ধার করেছেন জাফর আহমদ রাশেদ।


ড্ডা


সেলিম আল দীন

২০০০ সালের পর, ২০০১ সাল থেকে কালের একটা দায় পড়ছে মানবজাতির ওপর। মানুষ সব সময় তার উত্তরাধিকার বহন করে নিয়ে আসছে নিজের মতো করে। আমার ধারণা জন্মেছে যে, বিশ্বে বর্তমানে পোয়েট্রি, ছোটগল্প, নাটক—এই লেখ্য শিল্পমাধ্যমগুলো, নাটকের লিখিত আকারের কথা বলছি, এগুলোর ক্ষেত্রে একটা পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী এবং এগুলো আলটিমেটলি, বোর্হেস যে রকম বলেছে যে, কোনো কোনো নদী মরে যায়, এবং কোনো কোনো নদী আবার পুনরুজ্জীবিত হয়, শিল্পের নতুন নতুন শাখা-প্রশাখা সব সময় জন্মাচ্ছে, কোনো কিছু মারা যায় আবার নতুন কোনো কিছু গ্রো করে। তাহলে ২০০১ সাল থেকে, এখন যে ফর্মগুলোতে আমরা লিখছি, এগুলো কি ফুলফিল করবে আগামী শতাব্দীর দায় বা আবেগ বা রুচি বা পছন্দ—ছোটগল্পের ব্যাপারে বলতে হয়, এটি শিল্পের ক্ষেত্রে অনিবার্য ছিল না, এটা পছন্দের ব্যাপার ছিল। আলটিমেটলি ‘শর্ট স্টোরি’ বলে কোনো শব্দ হতে পারে কি না? কবিতা বলতে আমরা নির্বিশেষে একটা বিশাল ব্যাপার বুঝি, কিন্তু শর্ট স্টোরি? হোয়াট ইজ দিস? লেংথ দিয়ে কোনো শিল্প মাধ্যমকে তো মাপাই যায় না। এটা তো একেবারে এস্থেটিকালি ভুল। তারপরও আমরা দেখতে পাচ্ছি ছোটগল্প লেখা হয়েছে, এক সময় হোর্সেস—আমি একটু কম পছন্দ করি, মার্কেস বেশি পছন্দ করি, এরা এখনো ছোটগল্প লিখছেন, কিন্তু ছোটগল্প ওই মাত্রই। পোয়েট্রির ক্ষেত্রে আমরা দেখি, ক্লাসিক পিরিয়ড থেকে ভাগ হয়ে বা রিচুয়াল পোয়েট্রি থেকে ভাগ হয়ে রোমান্টিক পিরিয়ডে যে আত্ম-উন্মোচনটা ঘটল, তারপর থেকে গীতলতার বিরুদ্ধে স্টিফেন স্পেন্ডারদের আমলে একটা নতুন ধারা তৈরি হলো যে, কবিতাকে দূরবর্তী রাখা চলবে না। কবিতাকে একেবারে দৈনন্দিন জীবনের কাছাকাছি আনতে হবে, যদিও আমার ব্যক্তিগতভাবে মানতে কষ্ট হয় যে, কবিতার পদাবলী বিষয় একেবারে দৈনন্দিন হবে, আমি টি এস এলিয়টদের সঙ্গে এ ব্যাপারে একমত নই। তারপরও দেখা যাচ্ছে যে, কবিতা একটা মোড় নিয়েছে, বিশ্বব্যাপী ওই ধারাটাই প্রচুর সকল কবি, বিশাল বিশাল কবির আবির্ভাব ঘটেছে। কবিতার ক্ষেত্রে গেল এটা : এখনো কবিতার ধারা অব্যাহত রয়েছে। আমরা অবশ্য এ হিসাব করে বলতে পারব না, এ মুহূর্তে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কবি কে? ২০ বছর আগে হলে পারতাম, নেরুদা যখন জীবিত ছিলেন, তখন আমরা বলতে পারতাম তিনি শ্রেষ্ঠ কবি। এখন একটা ক্রান্তিলগ্ন উপস্থিত হচ্ছে। ছোটগল্পের ক্ষেত্রে আমরা জানি যে, এ রকম না যে আমি হাল কোনো ধারণা নিচ্ছি, যে ওই সময় এ রকম হয়েছিল বলে আর এ রকম হবে না। কিন্তু আমরা দেখছি মহাকাব্য মৃত, আর কেউ লেখে না, ছোটগল্পও মৃত একটা শাখা বলে মনে করি। ছোটগল্প আর আগের ফর্মে থাকছে না, ছোটগল্পকে বাঁচাতে হলে অন্য কোনো ফর্মে যেতে হবে। উপন্যাস দাঁড়াচ্ছে, যদি ল্যাটিন আমেরিকা বা আফ্রিকান উপন্যাস, আচিবির উপন্যাসের কথা ধরি, আমার মনে হয়েছে ইট ইজ মোর টেল দেন এ নোবেল, দেন এ ফিকশন, টেলের ধারায় চলে গেছে। টলস্টয়, রবীন্দ্রনাথ যে অর্থে উপন্যাস লিখেছেন, সে অর্থে পৃথিবীতে শ্রেষ্ঠ উপন্যাসগুলোর কোথাও সে লক্ষণ নেই। খুব ক্লিশে উপন্যাসগুলোর লক্ষণ সেগুলো— বাস্তবতাবাদ, এই সেই।

নাটকের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে নাট্যকার ক্রমেই দূরবর্তী, ডিরেক্টর একটা বড় জায়গায় চলে আসছেন। পিটার ব্রুককে দেখলেই আমরা তা বুঝতে পারি। নাট্যকারের স্থান খুবই সঙ্কীর্ণ এখন, মঞ্চে। তার মানে ডেডলি জায়গায় এসে সবকিছু ঠেকে গেছে বলে আমার মনে হচ্ছে। কাজেই একুশ শতকে টোটাল পৃথিবীর অবস্থাটা কিভাবে দাঁড়াবে এবং ততোদিন আমরা বেঁচে থাকি বা না থাকি, তাহলেও আমাদের ওপর দায় বর্তায় যে, উত্তরকালে শিল্পের গতি-প্রকৃতি কী হবে? রবীন্দ্রনাথকেও পার্টিসিপেট করতে হয়েছিল একসময়, আধুনিকতা নিয়ে। পাউন্ডকেও হতে হয়েছিল ইয়েটসদের মুখোমুখি। যেজন্য ইয়েটস আর্তনাদ করে বলেছিলেন, ‘উই আর দ্য লাস্ট মেরান্টিকস’। তিনি টেরও পেয়েছিলেন যে, রোমান্টিসিজমের দিন শেষ। কাজেই এটা আমাদের বিচার্য, একুশ শতকে শিল্পভাবনা কোনদিকে মোড় নেবে। রফিক ভাই, আপনি বলুন।

মোহাম্মদ রফিক

আসলে সেলিম তুমি এতক্ষণ যা বললে, এসবের ঠিক কথার পিঠে কথা বলে একটা উত্তর সাজানো খুব কঠিন। সেজন্য, আমার কথা যে ঠিক তোমার কথার পিঠে কথা হবে, তা হয়তো নয়। আর আমরা হয়তো প্রত্যেকেই বিয়ষটা নিজের মতো করে ভাবছি। শিল্পের গতি-প্রকৃতি নির্ণয় করা কঠিন, আসলেই শিল্পের গতি-প্রকৃতি নির্ণয় করা যায় না। শিল্প তার নিজের নিয়মেই চলে এবং সেখানে দেখতে গেলে একজন লেখক নিমিত্তমাত্র।

পৃথিবীতে সমালোচনা বা লেখকের কথা শুনে সৃষ্টিশীলতা কখনো চলে না। সৃষ্টিশীলতা তার নিজের নিয়মে, নিজের পরিবেশে চলে, নিজের সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে চলে এবং আগামী শতাব্দীর শিল্পও মোটামুটি বলা যায় যে, সেই নিয়মই মানবে; তার মতো করেই সে তার অবস্থান গড়ে তুলবে। তবে সঙ্কট কিছু আসছে, সঙ্কট সব সময় থাকে। এক সময় ধরে নেওয়া হয়েছিল, বিশেষত ফ্রান্সের লোকেরা বলেই ফেলেছিলেন যে, উপন্যাস আর হবে না। কিন্তু দেখা গেল, ফরাসি দেশে না হলেও উপন্যাস কিন্তু হলো, ল্যাটিন আমেরিকায় আবার উপন্যাসের একটা সময় এল, নিজস্ব আঙ্গিকে তারা উপন্যাস লিখলেন। হয়তো এক সময় এই ঘাটটা মরে আসবে। কবিতাকে একইভাবে বিভিন্ন সঙ্কটের মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে। আমাদের একটা মুশকিল হচ্ছে, আমরা যারা ষাটে শুরু করেছি, আমরাও কবিতা সম্পর্কে মূল শিক্ষাটা পেয়েছি ইংরেজদের কাছ থেকে। ইংরেজরা কথাগুলো আমাদের যেভাবে বলেছে, আমরা সেভাবে শুনেছি এবং বিশ্বাস করেছি। যেমন রোমান্টিসিজমের প্রথম আঘাতটা কিন্তু ইংল্যান্ড থেকে আসে নি, এসেছে ফরাসি দেশ থেকে এবং রোমান্টিকতা থেকে বের করে কবিতাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য যে লোকটিকে আমাদের সবসময় মনে রাখতে হবে, তিনি হলেন অ্যাপোলিনেয়র, গিয়ম অ্যাপোলিনেয়র ও লাফার্গ এবং এলিয়ট ও পাউন্ড—এদের কাছ থেকে শিখে নিয়েছি, আমি ধার করেছি কথাটা ব্যবহার করব না। তবে যে কথাটাতে আমি আসছি এবং তোমার কথাতেও সেটা বেরিয়ে এসেছে, আমরা যখন লিখতে বসি কোনো একটা মিডিয়ামে, আমাদের একটা ধারণা থাকে, যেমন, আজকে ছোটগল্পের কথা উঠল যখন, যিনি বাংলাদেশে আজ ছোটগল্প লিখছেন, তার বাংলা ছোটগল্প সম্পর্কে একটা ধারণা আছে, তিনি এক বিশেষ কাঠামোর মধ্যে বসে তার ছোটগল্পটা লিখতে চেষ্টা করেন। আমি যখন একটা কবিতা লিখি, আমারও একটা ধারণা আছে যে, কবিতাটার চেহারা হবে এই, কবিতাটি এই এই জিনিস মানবে, এই এই জিনিস মানবে না এবং আমাদের সাহিত্যে কবিতাবোধ বলে একটা ধারণা আছে—আমরা মনে করি এটা কবিতা আর এটা কবিতা নয়। আবার ঠিক একইভাবে যিনি নাটক লিখছেন, যিনি উপন্যাস লিখছেন তাদেরও তাদের মাধ্যম সম্পর্কে একটা ধারণা আছে। আমি মনে করি এই ধারণাগুলো এক সময় এসে একটা বাতাবরণ সৃষ্টি করে। কবিতাবোধের যে কথাটা বলছিলাম, সেটা পরিবর্তিত হয়েছে। যারা শেলি-কিটস পড়ে কবিতার ধারণা তৈরি করেছে, তাদের পক্ষে হোমারকে এতবড় কবি ভাবতেই কষ্ট হয় এবং ধারণা করতেও কষ্ট হয়।


আমাদের দেশে যারা খণ্ডিত আধুনিকতার চর্চা করতে এসেছে, তারা রবীন্দ্রনাথের আধুনিকতা বোঝে নি।


সেলিম আল দীন

তারা হোমারকে কাহিনিকার মনে করে।

মোহাম্মদ রফিক

হ্যাঁ, তার কাব্যিকতাটা কোথায় বুঝতে চেষ্টা করে না। দ্বিতীয়ত, ত্রিশের দশকে আমাদের এখানে এক ধরনের সমালোচনা তৈরি হয়েছিল যার পুরোধা বলা যায় বুদ্ধদেব বসুকে। এরা কবিতা বলতে কিছু জিনিস বুঝিয়েছে, হাহাকার, অপ্রাপ্তির জন্য বেদনা বুঝিয়েছেন, যেজন্য এর বাইরে যে কবিতা রচনা করা যায় এ জিনিসটা আমরা মানতে চাই না। আমরা মানলেও আমাদের হৃদয় মানতে চায় না, আমাদের হৃদয় মানলেও আমাদের শিক্ষা মানতে চায় না, এভাবে বিভিন্ন রকমের বিরোধ তৈরি হয়। এজন্য দেখবি, মূল সঙ্কটটা হলো—যেখানে আমরা আসতে চাইছি, আমরা লিখতে বসে কিছু অনুশাসন মানছি। আমাদের লেখাগুলো লেখার মতো হয়ে উঠছে না। সেখানে বিভিন্ন ধরনের আরোপ আসছে, এক. আমি কবিতা লিখতে চাইছি, দুই. আমি ছোটগল্প লিখতে চাইছি। আমি বলতে চাই যে, এইসব বাদ দিয়ে লেখাটাকে যদি আমরা ছেড়ে দিই, আমরা যদি ধরে নিই যে, লেখাটা লেখা হয়ে উঠবে, তা ছোটগল্প হোক, উপন্যাস হোক বা কবিতা হোক—আমার লেখাটা লেখা হয়ে উঠলেই হলো। এই জায়গাটার মুখোমুখি আমাদের হতেই হবে। কারণ, এটা শুধু আমাদের সঙ্কট নয়, আগামীতে আরো অনেক সঙ্কট আসছে। যেমন মিডিয়ার সঙ্কট, আমরা বলি যে, মানুষ কবিতা পড়ে না। এক্ষেত্রে পাঠকের দোষ দিয়ে তো লাভ নেই, অন্য জিনিসে যদি তার আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ হয়, কবিতা সে কেন পড়বে? সে নাটক কেন দেখবে, সে উপন্যাস কেন পড়বে? কবিতায় টিকে থাকতে হলে আমাকে আমার মতো করে আমার জিনিস তৈরি করে যেতে হবে। সুতরাং আমাকে লিখতে হবে। আজকে একজন লোক কবিতা না বুঝতে পারে, কিন্তু যেটা সে বুঝল না, সেটা যে কবিতা নয়—একথা কে বলেছে? অ্যাপোলিনিয়ের সম্পর্কে তো খুব ভালো ধারণা ছিল না। কিন্তু পরবর্তীকালে দেখা গিয়েছে যে, অ্যাপোলিনিয়রকে মানুষ গ্রহণ করেছে। সারা পৃথিবীতে পরবর্তীকালে যে কবিতা লেখা হয়েছে বলা যায়, তার চেহারা অনেকটা ওই লোকটিই ঠিক করে দিয়ে গেছেন।

সেলিম আল দীন

এলিয়টের ভূমিকা?

মোহাম্মদ রফিক

এলিয়টরা তার বিষয়টাকেই আরো সম্প্রসারিত করেছেন। আমরা কী করি? একটি বিষয়কে প্রসারিত করি। সুতরাং আমার মনে হয়, প্রথম যা হওয়া উচিত, লেখাকে লেখার মতো হতে দিতে হবে। তাকে কোনো ধারণা দিয়ে বেঁধে রাখলে চলবে না।

মঈনুল আহসান সাবের

রফিক ভাই, আমার যেটা মনে হয়, লেখাটা যে লেখা হয়ে উঠবে বা লেখাটা যে লেখা হয়ে উঠল, এটা বুঝবে কে?

মোহাম্মদ রফিক

এটা একটা কঠিন প্রশ্ন। এটা সবাই মিলে বুঝবে, এজন্য আমার বারবার মনে হয়েছে যে, সমষ্টির একটা ভূমিকা এসে যাচ্ছে। আমি লেখায় যে কথাটা বারবার বলছি, তা হলো সামষ্টিক দ্বন্দ্ব—রোমান্টিসিজম থেকে যে ধারাটা এসেছিল, একক মানুষের ধারণা, একক সৃষ্টিশীলতার ধারণা—এই ধারণাটা মনে হয় নিঃশেষিত। এখন সবার অপেক্ষাকৃত কাছাকাছি আসার, একটা চিন্তায় আসার সময় এসেছে।

মঈনুল আহসান সাবের

লেখকের ব্যক্তিক চিন্তার বদলে সমগ্রের চিন্তায় যাওয়া—সামগ্রিক হওয়া?

মোহাম্মদ রফিক

হ্যাঁ তাকে সমষ্টির কাছে যেতে হবে, এটা এক ধরনের দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়া, এই দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়া সেলিমও নিশ্চিত টের পায়। সে যে চরিত্রগুলো তৈরি করে, সে চরিত্রগুলো যেমন তার ওপর অভিঘাত তৈরি করে, সেও তেমন চরিত্রগুলোকে তৈরি করেছে।

সেলিম আল দীন

ইন্টারেকশন—

মোহাম্মদ রফিক

হ্যাঁ, ইন্টারেকশন। এই প্রক্রিয়াটা থাকতে হবে। কবিতার ক্ষেত্রে, ছোটগল্পের ক্ষেত্রেও। আমার মনে হয় যে, এই যে আমি একা তৈরি করলাম—একার জন্য এই ধারণার দিন শেষ। ওটা করতে গেলে আর কিছুই হবে না এবং এই সম্প্রসারিত রূপটাকে আমাদের এগিয়ে নিতেই হবে; একটা মুক্তির, একটা স্বাধীনতার বিষয় ভিতর থেকে আসতে হবে। এই স্বাধীনতার বিশ্বাস ছাড়া আগামীর সাহিত্যচিন্তা চলবে না।

সেলিম আল দীন

আপনি কি স্বাধীনতাবাদী বলতে বোঝাচ্ছেন যে কবিতা যেভাবে লেখা হচ্ছে, এই ধারণাটার পূর্বকৃত না করে আমি আমার স্বাধীনতায়…

মোহাম্মদ রফিক

আমি বলছি কবিতার স্বাধীনতায় কবিতাকে বেড়ে উঠতে দিতে হবে। আমি সেখানে একটা অনুঘটক মাত্র।

সেলিম আল দীন

এটা একটা চমৎকার ধারণা কিন্তু—

মোহাম্মদ রফিক

একটা অনুশাসন মেনে তো আমরা লেখা শুরু করছি। কিন্তু লেখাকে অনুশাসনের ভিতরে বেঁধে না রেখে, লেখাকে লেখার স্বাধীনতা দিয়ে দিতে হবে।

মঈনুল আহসান সাবের

তাহলে কি পাঠকের সঙ্গে আরো দূরত্ব বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে?

মোহাম্মদ রফিক

আমার তো মনে হয় আশঙ্কা কমে। নেরুদার কবিতায় দেখি, নেরুদার কিন্তু অনেক ত্রুটি আছে। তা সত্ত্বেও অনেকে বলেছেন, নেরুদা হচ্ছেন সেই মহৎ লেখকের উদাহরণ যিনি অনেক মহৎ কাজের জিনিসও তৈরি করেছেন। আমি বলতে চাই, ওই যে মহৎ কাজের জিনিস তৈরি করেছেন তার কারণ তার কবিতা, কবিতার ভিতর থেকে এসেছে, তার কবিতায় যেটা বিচলিত করে আমাকে। তার কবিতা পড়লে মনে হবে না যে তিনি কোনো চিন্তাভাবনা করে লিখতে বসেছেন। ভিতর থেকে তার কবিতা স্বতঃস্ফূর্তভাবে উৎসারিত হয়েছে। আর আমরা আধুনিকতার নামে স্বতঃস্ফূর্ততাকে হারিয়ে ফেলি, সেটা হবে সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্যের ব্যাপার।

সেলিম আল দীন

এখানে একটা এলার্মিং পয়েন্ট আছে শিল্পের ক্ষেত্রে। এলার্মিং পয়েন্টটা হলো যে, আমি নাম ভুলে গেছি, একজন এসথেটিসিয়ান, তিনি বলেছেন, শিল্পের ক্ষেত্রে ভাঙচুরের ব্যাপারটি এমন এক পর্যায়ে চলে এসেছে, যেটা শেষ পর্যন্ত শিল্পের জন্য আত্মঘাতী হয়ে দাঁড়াচ্ছে, দাঁড়াবে। আমি তখন খুব ক্ল্যাসিক্যালি—ক্ল্যাসিক্যাল চিন্তাগুলোকে আমি প্রাগ্রসর চিন্তায় রূপান্তরের চেষ্টা করছি। ’৭৭/৭৮ সালে। আমি খুব সাবধান হয়ে গেলাম এবং আমার মনে হলো যে, আমি একটা অদৃশ্যলোক থেকে আহ্বান পেলাম যে, লেখকের স্বাধীনতা এবং লেখার স্বাধীনতা, রফিক ভাই যেমনটি বলেছেন, কথাটি অসাধারণ। লেখার ভিতর থেকে স্বাধীনতা অর্জন করা আর লেখকের স্বাধীনভাবে লেখা—দুটোর ভিতর কিছু হলেও পার্থক্য আছে। আমার প্রশ্ন হলা যে, আপনি যে কবিতার স্বাধীনতার কথা বলছেন, সেটি কি পূর্বের কোনো ধারায় অবগাহন না করেই একেবারে সম্পূর্ণ সার্বভৌম হয়ে উঠবে? না পূর্বের ধারাগুলোকে আত্মস্থ করে সে এগোবে? যদি আত্মস্থ করে, তাহলে জন ময়্যার আর জোসেফ রাম্বেলের ধারার, মিথের যে এক্সপ্লেনেশন, সে অনুযায়ী আমাকে বলতেই হবে, কোথাও না কোথাও কবিতায় বা শিল্পের শেষ পর্যন্ত রিচুয়াল থাকেই এবং আমি এক জায়গায় লিখেছি, শিল্পে ‘হবে’ কেউ নির্ণয় করতে পারে না, কিন্তু এটা হবে। কেন আমি জন্ডিস হলে হলুদ পাখির পালক ঝোলাব গলায়, তার কারণ কেউ বলতে পারে না।

মোহাম্মদ রফিক

একটি কথা তুই ঠিক বলেছিস, তুই যখন লিখছিস, তখন তো তুই অনুশাসন দিয়ে বাঁধা থাকছিস, তুই তো একটা জগতের ভিতরে থেকে লিখছিস। আমি যখন একটা কবিতা লিখছি, আমার তো মাথার ভিতর কবিতার একটা ধারণা আছে। ওটাকে বাদ দেওয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না। কারণ, তুই যে কথা বলেছিস, আমাদের দেশে ইদানীং দেখছি কেউ কেউ সার্বভৌমত্বের কথা বলছে। শিল্প সাহিত্যে এইসব শব্দের কোনো জায়গা নেই। শিল্পসাহিত্য হচ্ছে একটা নদীর স্রোত। এ স্রোত চলে। কেউ এসে তাকে এগিয়ে নেয়; সম্প্রসারিত করে।

সেলিম আল দীন

যোগ করে।

মোহাম্মদ রফিক

যোগ করে সুতরাং যখন আমি লিখছি, তখন অনেক কিছু মেনে নিয়ে লিখছি। অনেক কিছু মেনে নিয়ে তার ভিতর থেকে আমি শুরু করেছি। এই যে মেনে নিয়ে আমি শুরু করছি, শুরু করার পর যে জিনিসটা গড়ে উঠছে, তাকে তার নিয়মে গড়ে উঠতে দেওয়া হোক। তাকে যেন আমি সব সময় অনুশাসনে বেঁধে না রাখি, আমি সব সময় কবিতাকে কবিতাই করার চেষ্টা না করি। হোক না, দেখা যাক না, সে কী হয়।

সেলিম আল দীন

এই কথাটি পাশ্চাত্যে আমার মনে হয়, এখনো সুবিদিত নয়। আমরা এখান থেকে বাংলা ভাষায়, যদিও আমাদের ভাষাগোষ্ঠী আকারে বিশাল, কিন্তু প্রচার খুবই সীমিত, আমার মনে হয় যে, রফিক ভাই আমাদের কালকে শেয়ার করছেন—এ কথা বলে যে, আমি কি লিখছি এটাকে বড় না ভেবে, কোন মাধ্যমে লিখছি, এটা না ভেবে, ভাবতে হবে যে আমি লিখছি। এক্ষেত্রে রফিক ভাইকে উত্তর অবশ্যই দিতে হবে যে, আমি কি বিশেষীকৃত, না নির্বিশেষীকৃত রূপটিকে পাব?

মোহাম্মদ রফিক

বিশেষ কথাটা আমি ঠিক বুঝতে পারলাম না।

সেলিম আল দীন

অর্থাৎ আমি কোনো একটা বিশেষ ফর্মে আবদ্ধ না থেকে, ফর্মটাকে আমি ওপেন করে দিলাম।

মোহাম্মদ রফিক

আমি এটাই বলতে চাইছি যে, আমাদের একটা ধারণা আছে, যখন লিখতে বসি, কবিতাটা এইভাবে, এরকম করে লিখতে হবে। আমি ওটাতে রাজি না।

সেলিম আল দীন

আমি তো বরং বলতে চাইছি যে, কবিতা লেখার সময় মোহাম্মদ রফিক যেন মনেই না রাখেন যে, তিনি কবিতাই লিখছেন।

মোহাম্মদ রফিক

আমি মুক্ত করে দিতে চাই। আমি মুক্ত করে দিতে চাই, আমি এই পর্যন্ত হয়েছি। ব্যস, আমার অার করার কিছুই নেই। আমি এখানে জোর করে একটি পঙ্‌ক্তি ঢুকিয়ে মুখে আমি একটা ছিপি লাগিয়ে দিতে চাই না। আমরা যেটা করি যে, একটা অর্থ করতে হবে, একটা চেহারা করতে হবে, এটা একটা ছিপি আর কি, আমি এই ছিপি আঁটার পক্ষপাতী না। আমি ছিপিগুলো সব খুলে দিতে চাই।

সেলিম আল দীন

তাতে, বিশেষীকৃত মাধ্যম, এই মাধ্যমেই দায় থেকে কিন্তু আপনি মুক্ত হচ্ছেন না। আপনি কিন্তু শুরুতে বলেছেন যে, আমি লিখছি, এটাই আমার জন্য যথেষ্ট। আমি কী লিখছি, কিংবা কোন মাধ্যমে লিখছি, ছোটগল্পের আকারে, উপন্যাসের আকারে না কবিতার আকারে লিখছি এটার চেয়ে বড় কথা হলো যে, আমি লিখছি। আমার আইডিয়াটা যে ওয়েতেই প্রকাশ পাবে, আমি ভাবছি, সেই ওয়েতেই আমি লিখছি। লোকে বলছে এটা কবিতা, আমার কাছে এটা কবিতা না, আমার কাছে এটা আট লাইনের একটা উপন্যাস মনে হচ্ছে, আমার কাছে এটা আট লাইনের একটা ছোটগল্প মনে হচ্ছে, আট লাইনের একটা নাটক মনে হচ্ছে, আট লাইনের একটা পেইন্টিং মনে হচ্ছে। আমি বলতে চাইছি যে, আঙ্গিকের নির্বিশৈষীকৃত প্রথম ধারণা আপনি দিয়ে পরে এর বিরোধিতা করছেন।

মোহাম্মদ রফিক

না, আমি কিন্তু প্রথম ধারণাটাকে সম্প্রসারিত করছি। একটি ধারণা তো আছেই। শুরুর সময় এ ধারণা কিন্তু সবার মধ্যেই থাকে যে, কবিতা এ রকম, এই তার ফর্ম, এই তার ছন্দ—কিন্তু আমি বলতে চাইছি, আমি এখন মনে করি যে, কবিতাকে তার নিয়মে গড়ে উঠতে দিতে হবে, অনুশাসনের নিয়মে নয় এবং সে হয়ে উঠতে গিয়ে আরো অনেক কিছুর দ্বারস্থ সে হতে পারে, সে উপন্যাসের দ্বারস্থ হতে পারে। সে নাটকের কাছে যেতে পারে—বহুকিছুর কাছে যেতে পারে। বাংলা কবিতা তো অনেকের কাছেই যায় নি।

সেলিম আল দীন

রবীন্দ্রনাথ ছাড়া। এটা এক আশ্চর্য বিষয়।

মোহাম্মদ রফিক

হ্যাঁ, রবীন্দ্রনাথ ছাড়া। যেমন ধর, আমাদের দেশে ভাটিয়ালি গানের একটা ফর্ম আছে, ভাওয়াইয়ার একটা চেহারা আছে। আমাদের কবিতা কিন্তু কখনো ওই চেহারার কাছে যায় নি। আমাদের কবিরা ভাবেই নি এটাকে আত্মস্থ করার, এটাকে আত্তীকরণ করার একটা প্রয়োজন আছে। মনে রাখতে হবে, শিল্প, চারদিকে তার যে পরিবেশ থাকে—এটাকে ভূমি-সাংস্কৃতিক পরিবেশ বলো, জীবনযাপনের পরিবেশ বলো, তাকে দাঁড়াতে হলে সমস্ত পরিবেশটা নিয়ে দাঁড়াতে হবে। রবীন্দ্রনাথ এ সমস্ত পরিবেশ নিয়ে দাঁড়িয়েছেন। সমস্ত পরিবেশের আধুনিকতা তিনি নির্মাণ করেছেন। সে জন্য পরবর্তীকালে আমাদের দেশে যারা খণ্ডিত আধুনিকতার চর্চা করতে এসেছে, তারা রবীন্দ্রনাথের আধুনিকতা বোঝে নি।


বাংলা কবিতা শুধু বাংলা ভাষার কবিতা নয়, বাঙালির কবিতা, বাংলা কবিতা সেই মাত্রায়, যে মাত্রায় বিশ্ব পটভূমিতে দাঁড়াতে পারে। 


সেলিম আল দীন

আমি রফিক ভাইয়ের সঙ্গে যোগ করছি—চিত্রা পর্বে নয়, সোনার তরী পর্বে, ‘সুখ’ কবিতাটার কথা—পাশ্চাত্য হার মানবে ওই সময় নাইনটিন সেঞ্চুরির শেষের দিকে, পদ্মাপারে লেখা, যে পদ্মার পাশে ভেসে যায় তরী প্রশান্ত পদ্মার স্থির বক্ষের উপরি, তারপরে তরল অর্ধমগ্ন বালুচর রোদ পোহাচ্ছে, একটা ন্যাংটো ছেলে ঝাঁপ দিচ্ছে। আমি রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কিত একটা কবিতার উদাহরণ টেনে বলব যে, রবীন্দ্রনাথ এ কালের কি না! সেখানে উলঙ্গ বালক এই পদ্মার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ছে বারংবার, কলহাস্যে ধৈর্যময়ী মাতার মতন, মনে হয় সুখ অতি সহজ-সরল। সুখ জিনিসটাকে তিনি কোন লেবেলে নামিয়ে এনেছেন; কত দৈনন্দিনতার কাছে এনেছেন। রফিক ভাই মৎস্যগন্ধা’য় দূর বলে একটা শব্দ ব্যবহার করেছেন। বিশ্বসাহিত্যে দূর কথাটা নানাভাবে নানা মাত্রায়, ঈনিড থেকে শুরু করে ভার্জিল, হোমার থেকে শুরু করে ঈনিড হয়ে ফেরদৌসী থেকে শুরু করে রবীন্দ্রনাথ হয়ে মোহাম্মদ রফিক পর্যন্ত সর্বত্র। কিন্তু সেই দূরটাকেই এত সংলগ্ন অথচ এত দূরত্বে সমকালীন কোনো কবিকে আমি করতে দেখি নি। মৎস্যগন্ধার প্রথম কবিতাটি। আমার কথা হলো যে, রবীন্দ্রনাথ যে জায়গায় একটা বালকের সামান্য লাফিয়ে পড়ার ভিতরে সুখ সহজ-সরল বলছেন, আধুনিককালে এবং ওইকালে সুখের সংজ্ঞা ছিল বিশাল চিত্তটিত্ত ইত্যাদি বিশাল আয়োজন। সেখানে এর ভিতর একজন কবি যে সুখ পাচ্ছেন, এটাকে, রফিক ভায়েরটাকে আধুনিকতা বলব না বুদ্ধদেব (বসু) বাবুদের ওইসব কবিতাকে আমি আধুনিক মনন বলব? জানালার পাশে একটা হাত দেখলাম, এই হাত আমি কোনোদিন দেখব না, এই হাত কত সেবা করে যাবে, রোমান্টিকতার একেবারে চূড়ান্ত।

মোহাম্মদ রফিক

শেষ আর কি।

জাফর আহমদ রাশেদ

রফিক ভাই বলেছেন, রবীন্দ্রনাথ সমূহ পরিবেশ নিয়ে দাঁড়িয়েছেন, বলেছেন পরবর্তীকালে খণ্ডিত আধুনিকতার চর্চা যারা করেছেন তারা রবীন্দ্রনাথের আধুনিকতা বোঝেন নি। তাহলে, আপনি কি বলতে চাইছেন যে, রবীন্দ্রনাথের পর আর বাংলা কবিতা দাঁড়ায় নি?

মোহাম্মদ রফিক

দাঁড়িয়েছে—প্রশ্নটির উত্তর অন্যভাবে দিতে হবে। আমি দাঁড়ানো কথাটা শুধুমাত্র পায়ে পায়ে দাঁড়ানোর কথা বলি নি। আমি কবিতার বিস্তারের কথা বলছি। আমি মনে করি যে, বাংলা কবিতা শুধু বাংলা ভাষার কবিতা নয়, বাঙালির কবিতা, বাংলা কবিতা সেই মাত্রায়, যে মাত্রায় বিশ্বপটভূমিতে দাঁড়াতে পারে। আমি সেরকম দাঁড়ানোর কথা বলছি। এখানে আমার বা সেলিমের—এরকম একক প্রচেষ্টার কথা বলছি না; সবার মিলিত প্রচেষ্টার কথা বলছি। কবিতার চর্চা হতেই থাকবে, অনেকে কবিতা লিখবে, লোকে বলবে, বাহ্!

জাফর আহমদ রাশেদ

এ পর্যন্ত আপনাদের বক্তব্যে রবীন্দ্রনাথ ছাড়া আর কারো নাম উচ্চারণ করা যায় নি। মাঝখানে সেলিম ভাই বুদ্ধদেব বসুর এক প্রস্থ সমালোচনাই করে ফেললেন। রফিক ভাই বলেছেন, ভাটিয়ালি-ভাওয়াইয়ার প্রসঙ্গ তুলে যে, আমরা দেশীয় পরিবশেগুলোর কাছে যাই-ই নি—

সেলিম আল দীন

বুদ্ধদেব বসুর মধ্যে অনেক ছেলেমানুষি ছিল।

জাফর আহমদ রাশেদ

তাহলে বলতে চাইছেন রবীন্দ্রনাথের পর ওইভাবে বাংলা কবিতায় দাঁড়াবার চেষ্টায় হয় নি।

মোহাম্মদ রফিক

না, হয় নি। তবে এটা ঠিক, একক প্রতিভার প্রচুর ভালো কবিতা লিখেছেন কেউ কেউ, দাঁড়িয়েছেন। তার মধ্যে জীবনানন্দ দাশ আছেন। রবীন্দ্রনাথের ঐতিহাসিক জায়গাটা বুঝতে হবে। বাঙালি মধ্যবিত্ত যাকে আমরা বলি, এসব ভাষা ব্যবহারের আমি বিপক্ষে, যাদের উত্থান শুরু হলো মাইকেল থেকে বা বিদ্যাসাগর থেকে বা বঙ্কিম থেকে, সেই বাঙালি তার মননে-মানসে-সংস্কৃতিতে যে শীর্ষে পৌঁছেছিল, তার প্রতিভূ হলেন রবীন্দ্রনাথ। তখন যে বাঙালি, সে কিন্তু সমস্ত পৃথিবী জুড়ে বাঙালি। তারপর থেকে মধ্যবিত্ত বাঙালির এক অবক্ষয় শুরু হয়েছে। এই পতনেরও মহত্তম মানবিক রূপ জীবনানন্দ দাশ। সুতরাং এটাকে নিয়ে কচলালে আরো চলবে। ব্যাপারটা ওখানেই শেষ। এরপর থেকে নতুন দিগন্তের যে বিস্তৃতি, তার মধ্যে যে আকাঙ্ক্ষা, যে দৌড়, সেই দৌড় বা সেই আকাঙ্ক্ষা বাংলা কবিতায় কোথায়? সে তো কচলাচ্ছে।

সেলিম আল দীন

এখানে একটা কথা বলা দরকার, যেটা রফিক ভাই আরো বিস্তারিত বলতে পারতেন—রবীন্দ্রনাথ বৈশ্বিক হয়ে উঠেছেন, বাঙালি হয়ে। কিন্তু পরবর্তীকালে তাকে ডিঙিয়ে তার থেকে আলাদা হওয়ার বাসনায়, কালের তাগিদে যারা ভাবলেন যে, তারা কবিতা লিখবেন, উপন্যাস লিখবেন, শিল্পচর্চা করবেন—তাদের মধ্যে কিন্তু পরানুকরনের মাধ্যমে বৈশ্বিক হওয়ার চেষ্টা ছিল। আর রবীন্দ্রনাথ বিশ্বকে আত্মস্থ করে, মধুসূদন বিশ্বকে আত্মস্থ করে বৈশ্বিক। এরা কিন্তু আত্মস্থ করেন নি, অনুকরণ করেছেন, এক জীবনানন্দ দাশকে বাদ দিয়ে, সুধীন্দ্রনাথ দত্তের বেশকিছু অংশ বাদ দিয়ে, বিষ্ণু দের কিছু অংশ বাদ দিয়ে আমি বলব যে, ওরা বৈশ্বিক হওয়ার চেষ্টা করেছেন অনুকরণ করে। সেই জায়গাটাতেই তাদের এস্থেটিক, নান্দনিক ভ্রান্তি।

মোহাম্মদ রফিক

এখানেও সেলিম একটা গোলযোগ, সেটা হলো, তারা অনুকরণ করেছেন বিশ্বকে নয়, ওরা অনুকরণ করতে চেয়েছেন ইউরোপকে, বিশ্ব আরো অনেক বড় ব্যাপার। বিশ্বে তো তখন বহু কিছু হচ্ছিল, সেগুলো নিয়ে তারা মাথা ঘামান নি, তাদের মাথায় ছিল কেবল ইউরোপ।

মঈনুল আহসান সাবের

আলোচনাটা মূলত কবিতায়ই থেকে যাচ্ছে, কিন্তু বিষয়গুলো যদি আমরা গদ্যের ক্ষেত্রে দেখি, নাটকের ক্ষেত্রে দেখি—

সেলিম আল দীন

আমার প্রশ্নটাতে আমি আবার ফিরে আসছি। আমার প্রশ্নটা কিন্তু কোনো বিশেষ শিল্পমাধ্যমের রূপ-রস-রীতি কী হবে তা নয়, আমার মূল অন্বেষণ হলো—একবিংশ শতাব্দীতে, আমি বলছি যে, ছোটগল্পের যেমন একটা উদ্ভাবন ঘটেছে আকস্মিকভাবে শিল্পবিপ্লবের পর, মানুষের নিজস্ব প্রয়োজনে, কোনো অমর্ত্য লোকের ধারণা থেকে এটা তৈরি হয় নি, মহাকাব্যের ক্ষেত্রে যেমন দাবি করা হতো, ছোটগল্প-উপন্যাসের ক্ষেত্রে সে দাবি নেই। ধরে নিচ্ছি, কালের প্রবাহে মহাকাব্যের স্থান দখল করেছে উপন্যাস। কিন্তু মহাকাব্য তো একই সঙ্গে কবিতার দাবিও মিটিয়েছে। উপন্যাস তো তা পারে না, যদি না সেটা রবীন্দ্রনাথ-টলস্টয়-দস্তয়েভস্কি-মার্কেজদের মতো নভেল হয়। পৃথিবীর বহু শ্রেষ্ঠ উপন্যাস আছে, যেগুলো কবিতার ভাবনা ঘিরেই সৃষ্ট। সে জায়গায় আমার মনে হয় যে, রিপ্লেসমেন্ট ওই অর্থে হয় নি, একটা পূর্ব ধারা মরে গিয়ে নতুন একটা ধারার জন্ম হয়েছে, খানিকটা ওটাকে কাভার করে। কারণ মানুষ উত্তরাধিকারকে অস্বীকার করতে চাইলেও পারে না। চরম বৈজ্ঞানিকভাবে ফুটবল খেলার নিয়মকানুন বেঁধে দেওয়ার পরও টাইব্রেকার হয়। এর কোনো ব্যাখ্যা নেই, সেটা বোঝা যায় যে, লাক, যার ভাগ্য ভালো সে জিতবে—শেষ পর্যন্ত ওই প্রাচীন জায়গায় ঘুরে আসতে হয়। আমার কথা হলো যে এর আঙ্গিকগুলোর ভিতর কোনো কোনোটি, শুরুতে আমি বলেছি যে, আমি আপনার দরবারে উপস্থাপন করছি যে, আঙ্গিকগুলো সঙ্কটাপন্ন। আপনি এটা মনে করেন কিনা জানি না, আমি মনে করি এবং আমার সঙ্গে সঙ্গে তরুণ প্রজন্মের একটা বড় অংশও মনে করে যে, আঙ্গিকের ক্ষেত্রে একটা দৈন্যদশা, একটা হ্যাজার্ড ফেস করতে যাচ্ছি। আমরা যারা ৩০ বছর ধরে লিখছি, আমার ক্ষেত্রে নাটক, নাটক মারা যাচ্ছে—এটা আমি টের পাচ্ছি। কিন্তু এটা স্বীকার করতে আমার খারাাপ লাগছে যে, নাটকের আর প্রয়োজন নেই। যিনি বড় কবি, তিনি নিশ্চিয় টের পাচ্ছেন যে, কোথাও স্নায়ুতন্ত্রী ছিঁড়ে যাচ্ছে। কোমা চলছে, যিনি ঔপন্যাসিক তিনি চেষ্টা করছেন, কিছু গল্প, উপাখ্যান, আকস্মিকতা দিয়ে কোনো মতে কিছু একটা টিকিয়ে রাখতে। আমরা যারা একালে লিখছি, একুশ শতক শুরু হওয়ার মাত্র আর এক বছর নাকি, একালে আমরা যারা বিষয়টি ফিল করে ফেললাম, যদিও সমাধান আমাদের হাতে নেই, কারণ—রবীন্দ্রনাথের কবিতার চরণ দিয়ে বললে, ‘তোমার হাতে নাই ভুবনের ভার’, আমরা কি একটা ইমাজিনারি শিল্পরীতির কথা, হতে পারে একটু কল্পিত, যাতে প্লেটো-প্লেটো একটা ভাব আসবে—এ ধরনের শিল্প হবে, এ ধরনের কাজ হবে, এটা ডিটারমিন করতে যদিও আমরা পারি না, কিন্তু উই ক্যান সাজেস্ট ফিউচার অথবা হিন্স করতে পারি কি না, আসলে ডেস্ট্রয়েশনটা এই পর্যায়ে পৌঁছাবে এবং তা থেকে এ ধরনের শিল্পযাত্রা নতুন করে পৃথিবী শুরু করতে পারে। অথবা এগুলোরও অবলেশগুলো ক্রমে ক্ষয়িষ্ণু হয়ে এক সময় শিল্প নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। দুটোর ভিতর কোনো বিকল্প নেই আমি বিশ্বাস করি, স্ট্রংলি এটা আমি বিশ্বাস করি। এ ধারায় শিল্প মারা যাবে, আর এ থেকে বাঁচতে হলে নতুন পথের অন্বেষণ করতে হবে। আপনি কোনটাকে অনিবার্য মনে করছেন টুয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরির জন্য?

মোহাম্মদ রফিক

সেলিমের বিশ্বাসের জোর আছ, কিন্তু আমার পক্ষে এটা মানা খুব মুশকিল হয়ে যাচ্ছে যে, এই শিল্প মাধ্যমগুলো শেষ হয়ে যাবে। আমার মনে হয় যে, শেষ হয়ে যাবে না, এক ধরনের নতুন জন্ম হবে। আমি প্রথম বলেছি যে, লিল্প তার নিজস্ব প্রয়োজনে নিজে পথ তৈরি করে নেয়। ধরা যাক উপন্যাস। উপন্যাস বারবার সে নিজের চেহারা পাল্টেছে। ভুল করে এগুলোকে এক সময় বলতাম পরীক্ষা-নিরীক্ষা। আসলে তা নয়। একজন লেখক শুধু তাই লেখেন যা না লিখে তার কোনো উপায় নেই। সুতরাং ওটাকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা বলা উচিত না। আসলে উপন্যাস তার প্রয়োজনে জয়েসের হাতে এক রূপ নিয়েছে, টলস্টয়ের হাতে এক রূপ নিয়েছে। আবার আধুনিককালে মার্কেজ, ফুয়েন্তেস—এদের হাতে একটা রূপ নিয়েছে। কবিতাও বিভিন্ন লেখকের হাতে এক একটি রূপ নিয়েছে। একজন কবি এ ধরনের কবিতা লিখেছেন,এ কথা না বলে, আমি মনে করি, বলা উচিত, কবিতা তাকে বাধ্য করে ওই রূপ তৈরি করিয়ে নিয়েছে। প্রকৃত লেখার মধ্যে এমন কিছু থাকে যে, ওটা না করে লেখকের উপায় থাকে না। তুমি দেখবে, কবিতা লিখতে গিয়ে যে লাইনটি আমি পরে ইচ্ছা করে বসাচ্ছি, ওটাই বাজে লাগে। সুতরাং কবিতা কবির মাধ্যমে নিজেকে তৈরি করিয়ে নেয়। সেলিম যে সঙ্কট ও বিপদের কথা বলছে, সেটা তো অবশ্যই আছে। আমরা প্রত্যেকে তা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি। এখানে সাবের আছে, তোমরা আছ, সঙ্গে সঙ্গে আমরা কি এটাও টের পাচ্ছি না, সেলিমও কি টের পাচ্ছে না—সেলিমের নাটক দেখলে অবশ্য বোঝা যায়, সেও টের পাচ্ছে যে, তার নাটকই তাকে দিয়ে এমন সব কাণ্ডকারখানা করিয়ে নিচ্ছে যা সেলিম ১০ বছর আগেও চিন্তা করত না। আমার কবিতাও আমাকে দিয়ে এমন সব কাণ্ড করিয়ে নিচ্ছে, আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে আছি। এ কি সম্ভব ছিল? এই সম্ভাবনা ছিল না তা আমি বলছি না। আমি স্বাধীনতার ওপর জোর দিচ্ছি। সম্ভাবনার দরজা কোনোদিন বন্ধ করে দেওয়া চলবে না। বললে চলবে না যে, এটাই কবিতা, এটাই উপন্যাস, এটাই নাটক—আর কিছু নয়। সেলিম আজ বনপাংশুল লিখতে বসেছে কেন? সে মনে করে নি যে, হাতহদাই তো ভোলোই লিখেছি, লোকে প্রশংসাও করেছে, সুতরাং আমাকে এখানেই থাকতে হবে, এটাই করব। সেলিমের শক্তি তাকে দিয়ে বনপাংশুল লিখিয়ে নিয়েছে। অথবা বনপাংশুলের ব্যাপারটাই তাকে দিয়ে সৃষ্টি করিয়ে নিয়েছে। এখন কারো মনে হতে পারে, বনপাংশুলের এই জায়গাটা হাতহদাইয়ের চেয়ে শক্তিশালী। কিন্তু এই যে, নিজেকে শিল্পের তাগিদে বারবার নির্মাণ করে নেওয়া এবং শিল্প যে আমাকে এ জায়গায় দাঁড় করাচ্ছে, এ জায়গাটার কথা সব সময় মনে রাখতে হবে। দেখা যাবে, আজকে সেলিম যেমন বনপাংশুল লিখছে, হয়তো আগামী শতাব্দীতেও আর একটা কিছু অদ্ভুত কিছু তৈরি করছে, যা আগে জানা ছিল না, হয়তো আমিও এমন কিছু লিখব, আমার পাঠকরা বা আমি ভাবব যে, এটা তো আমাদের চিন্তার মধ্যে ছিল না! হয়তো সাবেরের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটবে। সেলিমের কথার একটা দিক—শিল্পের কখনো মৃত্যু হবে না, কারণ মানুষের মৃত্যু হবে না অতএব শিল্পেরও হবে না। যেমন অনেকে ভাবছে যে, সমাজতন্ত্রের মৃত্যু হয়েছে, আসলে মানুষের এ ধরনের মৌলিক আকাঙ্ক্ষা, সব মানুষ ভালো থাকবে—এটা মানুষের মৌলিক আকাঙ্ক্ষা, এ আকাঙ্ক্ষার কোনোদিন মৃত্যু হতে পারে না। একটা সরকারের, একটা অবস্থার মৃত্যু হতে পারে, কিন্তু এই আকাঙ্ক্ষা থেকে যাবে। শিল্পে মানুষের আর একটা মূর্তি দেখার আকাঙ্ক্ষা আছে এটা কোনোদিন যাবে না। এই আকাঙ্ক্ষাই তরুণদের দিয়ে আরো নতুন কিছু করিয়ে নেবে।

একটা কথা মনে পড়ছে, একই ধরনের একটা প্রশ্ন করা হয়েছিল পাবলো নেরুদাকে। ১০০ বছর পর লোকেরা কি কবিতা পড়বে? নেরুদা বলেছিলেন : আমি তো আর কারো সম্পর্কে বলতে পারব না, আমার লেখা সম্পর্কে বলতে পারি যে, ১০০ বছর পর আমার লেখা পাঠের প্রয়োজনীয়তা কেউ বোধ করবে না, তবে একজনকে তারা পড়বে, তিনি হলেন হোমার। আমরাও হয়তো বলতে পারব ১০০ বছর পর আমাদের কেউ পড়বে না। কিন্তু আমরা কি বলতে পারব যে, ব্যাসদেব পড়বে। বা, রবীন্দ্রনাথ পড়বে না? আরেকটা ব্যাপার আছে শিল্পে, মানুষের একটা মৌলিক রুচির ব্যাপার থাকে শিল্পে, লেখা একটা রুচির জায়গা তৈরি করেন। এই রুচি কখনো মরার নয়। সুতরাং এই রুচি নিশ্চয় বারবার ঘুরে ফিরে, বিভিন্নভাবে বিভিন্ন আঙ্গকে সে একটা পরিবেশ তৈরি করিয়ে নেবে। তাতে করে অনেক কিছু পরিবর্তিত হয়ে যাবে, আজকের এই শিল্পের চেহারা পরিবর্তিত হয়ে যাবে, কবিতার চেহারা, নাটকের চেহারা পরিবর্তিত হয়ে যাবে। এমন হতে পারে যে, নাটকের জন্য আর মঞ্চের প্রয়োজন হবে না।


কোটি কোটি বছরের যে বিবর্তনের ধারা আমরা বহন করে আসছি এই ধারার মধ্যেই শিল্পসৃষ্টির তাগিদটা রয়ে গেছে। কাজেই এটি নষ্ট হবে না।


সেলিম আল দীন

এখনই তাই শুরু হয়ে গেছে।

মোহাম্মদ রফিক

দেখা যাবে যে, মঞ্চে অন্য জিনিস হচ্ছে। কবিতার মতো নাটকও হয়তো পড়ার জিনিস হয়ে যাবে। সুতরাং সম্ভাবনার দ্বারগুলো উন্মুক্ত রাখতে হবে সব সময়।

মঈনুল আহসান সাবের

লেখার হয়ে ওঠার ব্যাপরটা বলছিলেন রফিক ভাই। সেলিম ভাইকে বলছি, বনপাংশুল কি আপনা আপনিই বনপাংশুল হয়ে উঠেছে? না একেবারে তীব্রভাবে নির্ধারণ করেছেন বিষয়টি।

সেলিম আল দীন

না, আমি নির্ধারণ করি নি, প্রথমত, অমি ৮০ পাতার মতো লিখলাম। লিখে দেখলাম যে, কিছুই হয় নি। হয় আগের মতো হচ্ছে অথবা কিছুই হচ্ছে না। আগের মতো হওয়াটাও কিছু না হওয়ার সমান। আমি ছিঁড়ে ফেললাম এবং হাত গুটিয়ে বসে রইলাম। আমি দেখলাম যে, গল্পটিতে মানুষগুলো যে যেভাবে আসে এসে যাক, কেউ যদি গানে গানে কথা বলতে চায় বলুক, কেউ যদি নেচে নেচে কথা বলতে চায় বলুক, তারপর যা চেহারা দাঁড়াবে—দাঁড়াবে। মাঝামাঝি জায়গায় হঠাৎ আমার মনে হলো, কি রে, এ রকম ফর্ম তো পূর্বপুরুষরা করে গেছেন, সুতরাং আমার সামনে আর কোনো দ্বিধা রইল না। আমি দেখলাম যে, আমি যেমন করেছিলাম পঞ্চ উপাদানের সমষ্টিতে, হ্যাঁ, নানা ধরনের সবগুলো যদি অন্বিত হয়ে থাকে, এক জাযগাতে, তাহলে যা দাঁড়ায় আমার লেখা তাই। এটাকে নাটক হিসেবে ‘শৈলী’ ছাপতে চাইল না, নাম দিয়ে দিল উপাখ্যান। আমি বললাম, তাতে কিছু আসে যায় না। নাম তুলে দিলেও ক্ষতি নেই। কাজেই রফিক ভাইয়ের কথাটা ঠিক। তবে শিল্পের মৃত্যুর কথাটা আমি বলি নি। আমি বলেছি যে, শিল্পমাধ্যমের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে, কবিতার যুগ শেষ হয়ে যাওয়ার পর, নাটকের যুগ শেষ হয়ে যাওয়ার পর, অনবরতই আমরা কবিতা-নাটক লিখতে থাকি, আস্তে আস্তে লোকে মুখ ফিরিয়ে নেবে। কিন্তু শিল্প কখনো মরবে না, একজন মানুষ জীবিত থাকলেও। কারণ মানুষের যে নিউরোবায়োলজিক্যাল বা স্নায়ুজৈবিক পরিবর্তন তার ভিতরে প্রপার এবং হকিংস, ইকলিস—এরা প্রমাণ করে ছেড়েছেন যে, স্নায়ুতন্ত্রের মধ্যেই মানুষের কিন্তু রূপ সৃষ্টির স্পৃহা এবং প্রপারেরা থ্রি ওয়ার্ল্ড থিয়োরি দিয়েছেন সোসাইটির বিবর্তনের ক্ষেত্রে। থ্রি ওয়ার্ল্ড থিয়োরিতে সেকেন্ড ওয়ার্ল্ডে শিল্প নির্মাণ, ফার্স্ট ওয়ার্ল্ডে সারভাইব, থার্ড ওয়ার্ল্ডে গিয়ে বিজ্ঞান, কোয়েশ্চেন, তর্ক ইত্যাদি। সেকেন্ড ওয়ার্ল্ডটাই হচ্ছে শিল্পসৃষ্টি। অর্থাৎ কোনো কুঠার তৈরি করতে গেলেও নিউলিথিক যুগের বা পেলিউলিথিক যুগের সেই কুঠারের একটা শেভড তাকে দিতে হতো এবং দিতে গিয়ে সে, স্নায়ুজৈবিক কারণেই সৌন্দর্য বের করত। কাজেই যারা ভাবছে যে, শিল্প একটি মানবজাতির বানানো লেখা—তা একেবারেই নয়। এই আঙুল এই শরীর যতদিন আছে এবং কোটি কোটি বছরের যে বিবর্তনের ধারা আমরা বহন করে আসছি এই ধারার মধ্যেই শিল্পসৃষ্টির তাগিদটা রয়ে গেছে। কাজেই এটি নষ্ট হবে না।


মঈনুল আহসান সাবের

আমি একটু পিছনে ফিরতে চাই। সেলিম ভাই বলেছেন যে, বনপাংশুল কিছু পৃষ্ঠা লিখে আপনি ছিঁড়ে ফেলেছেন, কিছু হচ্ছে না। কিছু হচ্ছে না মানে কী? আপনি যে বিষয়টা বেছে নিয়েছিলেন। সে বিষয়গত কারণে কি আপনার মনে হলো যে, বিষয়টা যেভাবে উপস্থাপন করা দরকার, সেভাবে উপস্থাপন করতে পারছেন না? নাটক—এই মিডিয়াটার সঙ্গে দর্শকের দূরত্ব অনেক বেড়ে গেছে।

সেলিম আল দীন

শকুন্তলার পর আমি আর কখনোই মঞ্চ নিয়ে চিন্তা করি নি। আমার নাটকটি মঞ্চস্থ হোক বা না হোক তাতে আমার কিছু আসে যায় না। এক অর্থে আমি মোটেই নাট্যকার নই, আর এক অর্থে আমি হয়তো নাটক লিখি কিংবা দৃঢ়ভাবে সবাই বলাতে আমি বিশ্বাস করি যে, আমি নাটকই লিখি। আসল কথা, কিভাবে আমি লিখব বিষয়টা, আমার আইডিয়াটা কিভাবে আমি উপস্থাপন করব। একটা গোত্রের একটা মেয়ে মদের শুদ্ধতাটাকে নাটকের শেষ পর্যন্ত, বহু সামাজিক-রাজনৈতিক আবর্তের সংঘাতের মধ্য দিয়ে বহন করে নিয়ে যাবে। বিষয়টি কোনভাবে আমি বলব। এই বলার ক্ষেত্রে দেখা গেল যে, আমি—এ রকমই আমার সেই অস্থিরতার কালটা কিভাবে লিখবে, আমি কাউকে কাউকে বাচ্চাদের মতো কোয়েশ্চেন করতে শুরু করলাম—পাঁচবার আমাকে ওই এলাকায় যেতে হয়েছে।

মোহাম্মদ রফিক

সাবের যে প্রশ্নটা করেছে, সে প্রসঙ্গে আমি একটু বলি! এটা আসলে একটা দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়ায় চলে, লেখক যেমন তার চারদিকের মানুষগুলোকেই তৈরি করে, ওরাও লেখককে তৈরি করে দেয়, যতক্ষণ পর্যন্ত এই তৈরির প্রক্রিয়াটা চলে, ততক্ষণ এই অস্থিরতাটা থাকে। সেলিম বলছে যে, আমি অমুককে জিগ্যেস করেছি, কীটসের একটা বিখ্যাত পঙ্‌ক্তি শোনা যায় যে, তার পাশে যে কাজ করত, কবিতার সঙ্গে যার কোনো সম্পর্ক নেই, সে বলছে যে, তোমার শেষ পঙ্‌ক্তিটি ভালো হয় নি। তুমি এটা পাল্টে কি করা যায় করো। দেখা যায়, একজন লোক, সাহিত্যের সঙ্গে যার কোনো যোগাযোগই নেই, সে তোমাকে লেখার ব্যাপারে অনেক বেশি সাহায্য করছে, একজন পণ্ডিতের চেয়ে।

মঈনুল আহসান সাবের

একটা কথা আমার মনে হচ্ছে যে, বিষয়টা তিনি কিভাবে উপস্থাপন করবেন সেটা নিয়ে তীব্রভাবে চিন্তিত হয়ে পড়েছিলেন, ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। তাহলে প্রথম থেকে যে কথা বলা হচ্ছে যে, একবিংশ শতাব্দীর দ্বারপ্রান্তে এসে এত কি অস্থির হওয়ার কোনো কারণ আছে? বিষয়ই তো ঠিক কের দেবে উপস্থাপন ভঙ্গি আঙ্গিক কী হবে।

মোহাম্মদ রফিক

অস্থিরতার নিশ্চয় কারণ আছে। কারণ প্রশ্ন হচ্ছে। প্রশ্ন তো থাকবেই। আমি তো বলতে চাইছি যে, আমি সেলিমের মতো এভাবে ভাবি নি। কিন্তু প্রশ্নের ওপর উত্তরটা চাপিয়ে দেওয়া চলবে না। আমরা যদি সচেতন থাকি এবং শিল্পের মূল ব্যাপারটা বুঝে নিই যে, শিল্পের মূল ব্যাপারটা কী—এটা কোনো বাঁধাধরা বিষয় নয়, শিল্পের মূল বিষয়টি হচ্ছে শিল্পের ভিতরে থেকেই শিল্পের এবং মানুষের দুজনেরই মুক্তি থাকতে হবে। দুজনেরই স্বাধীনতা থাকতে হবে। যেখানে রোমান্টিকরা মানুষকে বাদ দিয়ে দিয়েছিলেন, মানুষকে বাদ দিয়ে আমার কোনো কবিতা হয় না, সেলিমের কোনো নাটক লেখা হয় না। সুতরাং সবটাই একটা প্রক্রিয়ায় বিবর্তিত হবে। আমাদের লেখার ভিতর দিয়ে সেটা আঙ্গিক যেটাকে আমরা বাংলায় বলেছি পরগ্রহণ করবে, অবশ্য বাংলাটা আমার কাছে অশ্লীল মনে হয়—এভাবে একটা বিষয় এসে দাঁড়াবে।

সেলিম আল দীন

আপনি খুব বেশি মাত্রায় সময়ের ওপর ছেড়ে দিচ্ছেন না?

মোহাম্মদ রফিক

তা ছেড়ে দিচ্ছি না। আমরা ছেড়ে দিচ্ছি বিবর্তন ধারার ওপর এবং এটার ওপর সবকিচু ছেড়ে দিতে হবে।

সেলিম আল দীন

তাহলে কার্ল মার্কসের সেই ইতিহাসকে পরিবর্তন করতে হবে। এই প্রশ্নটি আসছে কেন?

মোহাম্মদ রফিক

পরিবর্তন তো করবেই, কিন্তু—

সেলিম আল দীন

আমরা করেছি সেটা। কালে কালে ইউরোপ তার চাহিদা অনুযায়ী কাপড়ের ফ্যাশনও বদলেছে, কবিতার ফ্যাশনও বদলেছে।

মঈনুল আহসান সাবের

এটা কি একেবারে বুঝেশুনে ধরেবেঁধে বদলেছে?

সেলিম আল দীন

হ্যাঁ, ধরেবেঁধে বদলেছে। লিরিক্যাল ব্যালাডে তো তাই ঘোষণা দেখতে পাচ্ছি।

মোহাম্মদ রফিক

বদলাতে গিয়ে বিভ্রাটও হয়েছে। আমাদের সময়ের বিভ্রাট হবে। বিভ্রাট এড়েয়ে কখনো শিল্প হয় না। সৃষ্টি হয় না।

সেলিম আল দীন

কিন্তু তাজমহলের মতো সৃষ্টির কথা যখন ভাববেন তাজমহল নির্মাণে ভুল হলে তো চলে না।

মোহাম্মদ রফিক

তোর কথাটা আমাদের জন্য প্রয়োজনীয়, কারণ এটা আমাদের প্রত্যেককে প্রস্তুত করে নেবে। এজন্য তোকে আমি ধন্যবাদ দিতে চাই। কিন্তু প্রস্তুত হতে গিয়ে তড়িঘড়ি যদি বেশি করে ফেলি তাহলে একটা বিভ্রাট—কালকে গিয়েই যদি ভাবতে শুরু করি যে, কথাটা তো ঠিক, সুতরাং পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়ে যাবে, এটা শিল্প হবে না।

সেলিম আল দীন

আমার ভিতরে এ প্রশ্নটার জন্ম হয়েছে নাইনটি থ্রি-ফোরে। আমার মনে হচ্ছে যে, আমি ঠিক নাটক লিখতে পারছি না কেন বা এ রকম কেন, নাটকে বাম পাশে নাম থাকবে, ডান পাশে সংলাপ—এরকম থাকতে হবে, লিখতে হবে এর কি মানে আছে?

[কয়েক মিনিট বিরতি]

সেলিম আল দীন

টিএস এলিয়টের সিলেক্টড প্রোজে আছে, মৌলিক স্রষ্টা যারা, শেষ পর্যন্ত প্রবন্ধ লেখে তাদের নিজের লেখাকে বাঁচার জন্য। আপনি সাহিত্যের অধ্যাপক, আমার চেয়ে অনেক বেশি জানেন, রফিক ভাই যে কলামগুলো এখন কাগজে লিখছেন ওগুলো টু সাপোর্ট হিজ মেইন ওয়ার্কস তার মূল কাগজগুলোকে বাঁচানোর জন্য।

মঈনুল আহসান সাবের

আপনি নিজে প্রয়োজন বোধ করছেন?

সেলিম আল দীন

না এটা হচ্ছে আমার স্থাপনার চারপাশে একটা বাউন্ডারি ওয়াল তৈরি করা। যাতে তিরন্দাজের, সমালোচকদের তিরগুলো এসে আটকে যায়।

মোহাম্মদ রফিক

আমি এক সময় ভেবেছিলাম, আমি গদ্য লিখব না। আমার একটা ধারণা ছিল যে, যা কিছু কবিতায় লেখা যায় না তা লেখার দরকার নেই। তারপরও গদ্য লিখেছি একেবারেই যে লিখি নি তা নয়। কিন্তু কখনো বইটই করব ভাবি নি।

সেলিম আল দীন

রফিক ভাইয়ের গদ্য, ইনফরমেশন এবং এনালাইসিস একসঙ্গে পাওয়া যায়, যা আমি বলব যে প্রায় দুর্লভ। বৈশ্বিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে বিশ্লেষণ।

মোহাম্মদ রফিক

আমাকে যখন প্রথম লিখতে বলা হলো, আমি প্রথম এটাকে খেলা হিসেবেই নিয়েছি। আমার এখনো ধারণা, আমার কবিতা লেখার ব্যাপারটা আর গদ্য লেখার ব্যাপারটা একটু আলাদা।

সেলিম আল দীন

না, না আপনার সংবাদের যে কলামটা সেটা পড়ে আমার মনে হয়েছে যে, কবির মন নিয়ে আপনি শিল্পবোধের তাড়নায় এক ধরনের প্রতিবাদী গদ্য লিখেছেন। কিছু লেখা আছে রফিক ভাই, মঈনুল আহসান সাবেরও জানে, জাফরও জানে যে, যেগুলো ফরমায়েশি লেখা সেগুলোর ভিতর এক ধরনের বার্ডেন ফিল আপনি করবেন। এগুলোতে স্বতঃস্ফূর্ততা থাকবে না। যেমন আমি ভোরের কাগজে গিয়ে বলেছি যে, আমি ঘন ঘন দেখা করছি, আমার কিন্তু লেখা দেওয়ার জন্য কোনো বাসনা নেই, এ ব্যাপারে নিশ্চিন্ত থাকতে পারো। সাবের বেশ লজ্জাও পেয়েছিল।

মোহাম্মদ রফিক

গদ্য লিখতে গিয়ে এখন কিন্তু বেশ মজাই লাগছে। মাঝেমধ্যে গদ্য লিখতে বেশ ভালোই লাগে এবং ও যে কথা বলেছে এটা কিন্তু ঠিক যে, কবিতায় অনেক কথাই বলা যায় কিন্তু সব কথা বলা যায় না। সব কথা বলার জন্য একটা আলাদা জায়গা।

সেলিম আল দীন

একটা ফর্ম তো আছেই। পাঁচালি। ইভেন ইউ ক্যান পুট পেইন্টিং। ইফ ইউ অ্যাট অল বিলিভ, শাহ মুহম্মদ সগীরের জোলেখা গবেষণার কাজে পড়তে গিয়ে হঠাৎ করে মাঝরাতে দেখলাম যে, পাঁচালি কাজের মধ্যে দেখা যাচ্ছে দৃশ্য এক, দৃশ্য দুই, দৃশ্য তিন। এটা তো নাটক না, তাহলে এটা কী? পরে আমি গবেষণা করে বের করলাম যে, ওটি পটচিত্র। অর্থাৎ পাঁচালি পেইন্টিংকে অ্যালাউ করছে। এটা আমাদের মূল আঙ্গিক। পেইন্টিংকে পর্যন্ত আত্মীকৃত করেছে পাঁচালি। জনগণের শিল্প তো! জনগণ যেমন যেটা পছন্দ করেছে গায়েন সেভাবে জুড়ে দিয়েছেন। এভাবে বাঙালি একটা ক্লাসিক ফর্ম জনগণের থেকে উঠিয়ে এনে দিয়েছেন, যেটা আলাওলের মাধ্যমে রাজদরবার পর্যন্ত বিস্তৃত। আলাওলের ভাষা এবং মধুসূদনের ভাষার তফাত নির্ণয় খুবই কঠিন।

জাফর আহমদ রাশেদ

আজকের আলোচনায় আঙ্গিকের বিষয়টা একটু বেশি আসছে।

সেলিম আল দীন

আসছে, কারণ আমাদের নির্ধারণ করতে হবে এই স্রোতটা কোনদিকে কোন আধারে যাবে।

মোহাম্মদ রফিক

আঙ্গিক নিয়ে চিন্তাটা এজন্য প্রয়োজনীয় হয়ে দেখা দিয়েছে যে, এভাবেই কি সব থাকবে? না সবকিছু মিলেমিছে যাবে?

মঈনুল আহসান সাবের

আর একটু সীমিত পরিসরে আসি না কেন? বাংলাদেশের কবিতার আঙ্গিকগত সমস্যা বা সম্ভাবনা।

সেলিম আল দীন

আমি আর একটু বলি, তারপর অন্যদিকে যাওয়া যেতে পারে। ছোটগল্পের কাতারে ওয়ান অফ ওয়ে বলে এক ধরনের লেখা শুরু হয়েছিল। স্টকহোমে দ্রামাস্তিকা ইনস্টিটিউটের আমার একটা বক্তৃতা ছিল, এমএ ক্লাসের নাট্যরচনা বিষয়ক শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে। আমি বললাম, যদি দুই অঙ্ক না থাকে তবে এক অঙ্ক বলো কী করে? উপন্যাস ছোটগল্প একাঙ্ক (অস্পষ্ট) এই কাতার থেকে একাঙ্ক কি পৃথিবী থেকে হারিয়ে যায় নি? একজন বড় লেখক আছেন যিনি একটি একাঙ্ক লিখেছেন গত ৩০ বছরে? উপন্যাস ছোটগল্প কবিতা একই রণক্ষেত্রে সমানভাবে এগিয়ে যাচ্ছিল। একজন সহযোদ্ধা পড়ে যাওয়ার পরই বোঝা উচিত যে, যুদ্ধাবস্থা বিরাজমান শিল্পের মাধ্যমগুলোতে। অতএব বাকিদের সতর্ক হতে হবে আত্মরক্ষার জন্য অথবা ওই পরিণতি বরণ করবে। ছোটগল্পও মৃত—আমি বলতে পারি।

মঈনুল আহসান সাবের

মৃত মানে কী? মূলত কি আঙ্গিকগত কারণে?

সেলিম আল দীন

যা-ই হোক অ্যাজ এ ফর্ম এটা আর টিকছে না। রবীন্দ্রনাথর ‘সমাপ্তি’কে আমি কবিতার আকারে সাজাতে পারি।

মোহাম্মদ রফিক

এমনও হতে পারে, এই মুহূর্তে পৃথিবীতে প্রয়োজন ফুরিয়েছে। আবার হয়তো কোনো লেখকের হাতে এটি প্রয়োজনীয়তা ফিরে পাবে।

সেলিম আল দীন

আপনি নিশ্চয় দাবি করতে পারেন না যে, হোমারের স্টাইলে আর কেউ পৃথিবীতে মহাকাব্য লিখবে। আপনি জানেন যে, এরিস্টটলের কালেও বেশ কয়েকটি মহাকাব্য রচনার চেষ্টা করা হয়েছে, এগুলো এক্কেবারে যাচ্ছেতাই মহাকাব্য।

মঈনুল আহসানে সাবের

আপনি কি কবিতার মধ্যে যথেষ্ট উচ্ছ্বাস বা তীব্রতা পাচ্ছেন?

সেলিম আল দীন

কবিতা যখন ভালো হচ্ছে, পাচ্ছি। কিন্তু আলটিমেটলি, যূথবদ্ধভাবে যখন কবিতাকে দেখছি সারা পৃথিবীর মানচিত্রে তখন মনে হচ্ছে যে, একটা থ্রেটিং কন্ডিশন আছে। নট দ্যাট দি ইটশ এ টাইম মিডিয়ান, আমি এটা বলছি না। থ্রেট ভেরি এক্সিজেনসি থ্রেট।

মঈনুল আহসান সাবের

এটা আমরা বিচার করব কিভাবে? পাঠক দিয়ে বিচার করব না নিজের উপলব্ধি দিয়ে?

সেলিম আল দীন

দুভাবেই আমরা করতে পারি।

মঈনুল আহসান সাবের

পাঠক দিয়ে বিচার করলে, কবিতার অবস্থা সারা পৃথিবীতে আরো খারাপ। তারপর হয়তো গল্পের অবস্থা খারাপ। এদিকটা তো আমাদের তাহলে একটু বিশ্লেষণ করতে হবে।


গ্রিকরা তাদের অঙ্কশাস্ত্র, দর্শন নিয়েছে সুমেরীয়দের কাছ থেকে, একইভাবে তারা নাটকের ঐতিহ্য নিয়েছে আফ্রিকানদের কাছ থেকে।


সেলিম আল দীন

আমার ধারণা, গল্পের চেয়ে কবিতার অবস্থা পৃথিবীতে এখনো ভালো।

মোহাম্মদ রফিক

কবিতার আর একটা বিচার আছে। সেটা হচ্ছে যে, কবিতা আদি শিল্প। কবিতা নিজের কারণে নিজের মধ্যে আরো কতগুলো জিনিস আত্মীকরণ করে নিয়েছে। কবিতার ভিতরে সংগীতের ব্যাপর আছে, চিত্রকলার ব্যাপার আছে সুতরাং কবিতাকে যতই মনে হয় যে, একা একা, কবিতা কিন্তু আসলে একা নয়। ছোটগল্প অনেক পরে পঞ্চদশ শতাব্দীর দিকে এসেছে। যদিও আগে যে ছোটগল্প ছিল না তা নয়।  ঊনবিংশ শতকে ছোটগল্প তার নিজের চেহারায় আবির্ভূত হয়েছে। পৃথিবীতে ছোটগল্প থাকবে না, এটা কিন্তু আমি বলব না, কারণ এর জন্য আমার অনেক বেদনাবোধও আছে। আমার সব সময় মনে পড়ে যে, ছোটগল্প মানে হচ্ছে মোপাসা, শেখভ—এরা আমার প্রিয় লেখক। এটা যে থাকবে না—এবং এই বিষয়টি অন্যভাবে আসতে পারে। সেটা কারো হাতে এলে আমি বুঝব। আমার ধারণা, ছোটগল্প নিজেকে তৈরি করে নেবে। ছোটগল্প আগামী সংকটের জন্য নিজের চেহারাটা পরিবর্তন করে নেবে। হয়তো সেও কবিতাকে নেবে, তার চেহারাও দেখা যাচ্ছে। যেমন আমাদের দেশেও দেখা যাচ্ছে।

আমরা তিন হাজার বছরের ব্যবধানে হোমারের দিকে তাকাচ্ছি। ফলে আমরা বলতে পারছি হোমার এই আর বাদবাকিরা এই। আজ থেকে তিন হাজার বছর পরে যখন এদিকে তাকানো হবে তখন আজকের সাহিত্যের কোন রূপটা ধরা দেবে এটা বলা কিন্তু মুশকিল। আমেরিকায় একটি আলোচনায় আমি অংশ নিয়েছিলাম। হঠাৎ শেক্সপিয়রের প্রসঙ্গ এল। আমরা দু শ বছর ধরে জেনেছি শেক্সপিয়র মহানাট্যকার। কথায় কথায় একজন আমেরিকান ঔপন্যাসিক আমার কাছ জানতে চাইল যে, শেক্সপিয়র যে মহানাট্যকার তুমি কি করে জেনেছ? আমি বললাম, আমার পড়ে মনে হয়েছে। সে বলল, না, তোমার পড়ে মনে হয় নি। আমি বললাম : আমাদের পড়ানো হয়েছে। সে বলল, আচ্ছা, ইংরেজরা তোমাদের দেশ দু শ বছর শাসন করেছে যদি তোমরা ইংরেজদের দু শ  বছর শাসন করতে তাহলে ওদের কাছে শ্রেষ্ঠ লেখক কে হতো?

হয় বিদ্যাপতি, নয় চণ্ডীদাস। সে বলল, তোমরা যে মুহূর্তে শেক্সপিয়রকে বড় নাট্যকার বলছ, সে সঙ্গে আরো কিছু অনুশাসন মেনে নিচ্ছ। একটা চেহারা, একটা আঙ্গিক কতগুলো বোধ মেনে নিচ্ছ। যেমন, সে বলল, আমি লাৎভিয়ায় গিয়েছি, সেখানে তাদের একজন মহাকবির নামের একটি মন্দির আছে। মন্দিরের মধ্যে ওই কবির মহাকাব্য রাখা হয়েছে। এই দেশের সব লোক মনে করে, এখানে একজন কবি রয়েছেন, তিনি হোমারের চেয়ে বড়। আমরা লাৎভিয়ার কথা জানি না। এস্তানিয়ার কথা জানি না। আমাদের বিচার করারও নেই ওই কবি হোমারের চেয়ে বড় কি না? লাৎভিয়ানদের কাছে সে কিন্তু বড়।

সেলিম আল দীন

আমাদেরও মেনে নিতে হবে। কারণ স্থানিক বিচারে মহাকাব্য হয়। ওই জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি-রুচি-ধর্মকে আত্মস্থ করে মহাকাব্য হয়। যখন ওই জাতি স্বীকৃতি দিচ্ছে, অতএব তিনি বড় মহাকবি।

মোহাম্মদ রফিক

দ্বিতীয়ত ওই লোকটি যখন অনূদিত হবে, তখন কিন্তু এই লোকটি আর ওই লোক থাকবে না। হোমারের একটা রূপ আমরা অনুবাদ করি। আজকের পৃথিবী ভীষণ বদলে যাচ্ছে। কে জানে, জুলু ভাষায় আর একজন হোমার আছেন কি না? কে বলে দেবে অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীদের ভাষায় একজন হোমার নেই? এখন নতুন নতুন জিনিস আমাদের সামনে আসবে। আগামী ২০ বছরে বহু ধারণা পাল্টে যাবে। এজন্য আমাদের প্রস্তুতি নিতে হবে।

সেলিম আল দীন

এজন্য আমরা প্রস্তুত আচ্ছি বলেই এখানে একত্র হয়েছি, নিজেরা প্রস্তুতি হচ্ছি।

মঈনুল আহসান সাবের

জুলু ভাষায় হোমারের মতো একজন মহাকবি আছে কি না এটা জানার কি কোনো উপায় আছে? এখনকার মিডিয়া—যে সিস্টেমে আমরা চলে গেছি…

মোহাম্মদ রফিক

মিডিয়ার ঠিক নিচেই হচ্ছে অন্ধকার। মিডিয়া কি রেড ইন্ডিয়ানদের ইতিহাস থেকে তুলে দিতে পেরেছে? আধুনিক আমেরিকায় বরং তাদের এক কবিতার ধারা তৈরি হচ্ছে। সুতরাং মিডিয়া পৃথিবী শাসন করবে। কিন্তু সব শাসন করবে না। মিডিয়ার নিচে ফাঁকফোকর আছে, আর মানুষের ওই ফাঁকফোকরের জন্য যে আকাঙ্ক্ষা—এটা রয়ে যাবে। এবং ওটা গলে ঠিকই বেরিয়ে আসবে। আমরা প্রথম যে-কথাটা দিয়ে শুরু করেছিলাম, আঙ্গিকের সমস্যা এই আঙ্গিক থাকবে? না, প্রত্যেকে নিজে নতুনভাবে প্রস্তুত হবে? আমার মনে হয়, নতুন জিনিস পাওয়ার পর এখানেও আমরা বহু কিছু নতুন জিনিস দেখতে পাব। দেখা যাবে। আজকে যে চিন্তা আমরা এখানে করছি, মানুষ সৃষ্টির শুরু থেকে সে-চিন্তাটা করে আসছে। সেও বিভিন্নভাবে নিজেকে প্রস্তুত করেছে।

সেলিম আল দীন

এটা তো গ্যয়ে বলেই গেছেন, আমরা যা কিছু চিন্তা করছি তা পূর্বেই চিন্তা করা হয়ে গেছে। গ্যয়ে না গ্যেটে? আমাদের কাজ হচ্ছে সেগুলো ব্যাখ্যা করা।

মোহাম্মদ রফিক

আর একটা মজা যেটা আমি বলেছিলাম—আমাদের ক্লাসগুলোতে পড়ানো হয় নাটক শুরু করেছেন ইস্কিলিস। এমন ভাব, নাটক মানে ইস্কিলিস হচ্ছেন ধর্মগুরু। তিনি না থাকলে নাটক হতো না। এটা তো ডাহা মিথ্যা। গ্রিকরা তাদের অঙ্কশাস্ত্র, দর্শন নিয়েছে সুমেরীয়দের কাছ থেকে, একইভাবে তারা নাটকের ঐতিহ্য নিয়েছে আফ্রিকানদের কাছ থেকে। ইজিপ্ট থেকে। ওই সময় তারা ওটা একেবারে গায়েব করে রেখেছে।

সেলিম আল দীন

ইজিপ্টুজ তো ক্যারেক্টারই আছে!

মোহাম্মদ রফিক

হয়তো আফ্রিকায় একটা মহাসমৃদ্ধিশালী নাট্যযুগ ছিল—

সেলিম আল দীন

ইরাকে ছিল, মিসরে ছিল।

মোহাম্মদ রফিক

আফ্রিকার রিচুয়ালই কিন্তু তাই বলে।

সেলিম আল দীন

হোগার মাউন্টেন, আমি জানি না, উচ্চারণটা হোজার হবে কিনা, হোগার মাউন্টেন-এ দেখা যাচ্ছে, নগ্ন উড়ন্ত নারীমূর্তি। কৃষ্ণাঙ্গ। তার শাড়ির লক্ষণ যেটা সেটাকে ভরতকৃতনাট্যশাস্ত্রের সঙ্গে, সেটা ছিল, খ্রিস্টপূর্ব পাঁচ হাজার বছর আগে, তাহলে যে ভঙ্গিতে পরেছে লীলাচপল কোনো নারী দেখানো অর্থই দাঁড়াচ্ছে, সে কোনো পারফরমেন্স করছে, এই শাড়ির লক্ষণগুলো মিউরো-বাইয়োলজিক্যাল ডেভেলপমেন্টে থিয়েটারে আসে কি না, এর ওপর বোধ হয় দেশি-বিদেশি ভাষায় আমারই লেখা একমাত্র দাবি করছি না, পরীক্ষা করে দেখা যেতে পারে, নিউরো-বায়োলজিক্যাল ডেভেলপমেন্টের সঙ্গে শিল্পের সম্পর্ক আছে কি না—এটা আমি বের করেছি। আমার মনে হয়েছে ভেরি মাচ, থিয়েটারের চেয়ে বেশি। তারপর বারকামূর্তি যেটা, এটা পাওয়া গেছে মেসোপটেমিয়াতে। বারকামূর্তিরও সাজসজ্জা সব দেখে মনে হচ্ছে যে, কোনো বিশেষ নারী নয়, ভাস্কর্যের প্রেরণায় এটি গড়া। তার চোখ, চুল, ভ্রু সব মিলিয়ে। কাজেই রফিক ভাইয়ের কথাটা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না মোটেই, যে শুরুটা বা সমৃদ্ধশালী কোনো শিল্পমাধ্যম হয়তো তখনো ছিল। কিন্তু রফিক ভাই, একটি কথা, রবীন্দ্রনাথের সঞ্চয়িতার ভূমিকায় আছে একজন কবির কবিতার ইতিহাস বলে তখন যখন সেটা প্রকৃত কবিতা হয়ে ওঠে। তখন থেকে ইতিহাসটা শুরু। সেক্ষেত্রে আমরা মানতে বাধ্য হচ্ছি যে, ইস্কিলিসের আমলেই প্রথম ওই অর্থে নাটকের শুরু। মহৎ নাটক যাকে আমরা বলছি। আপনি নিজেই একবার ভাবুন যে…

মোহাম্মদ রফিক

এটা ভাবা যায়, আমি পৃথিবীতে কোনো সম্ভাবনাকেই বাদ দিতে রাজি নই। আমি মনে করি যে, তার আগেও যদি পৃথিবীতে কোনো ভালো জিনিস দেখা যায় তবে আমাদের কোনো অসুবিধে নেই।

মঈনুল আহসান সাবের

একটু অন্য জায়গায় বলি, পাঁচালিটা কোন সময় প্রচলিত ছিল এই অঞ্চলে।

সেলিম আল দীন

রামাই পণ্ডিতের শূন্য পুরাণ টুয়েলভ সেঞ্চুরি—আট শ বছর আগে।

মঈনুল আহসান সাবের

এখন আমরা যে বাংলা ভাষাটা ব্যবহার করছি, আপনি পাঁচালিতে যে ভাষাটা ব্যবহার করেছেন। এটা তো এখনকারই ভাষা, ইংরেজদের আসার ফলে বাংলাভাষার যে মূল প্রবাহটা ছিল বা যেভাবে বিকশিত হওয়া উচিত ছিল, ইংরেজদের হাতে আমাদের বাংলা ভাষাটা নিশ্চয়…

সেলিম আল দীন

বিস্তর বিশিষ্ট ভাষা তৈরি হয়েছে। সাধারণ মানুষের ভাষাটা কিন্ত স্রোত-প্রাণ প্রবাহ। একেবারে অক্ষুণ্ন বারবার ছিল। এবং এই একটি ভাষা পৃথিবীতে, রাজভাষা না-হয়েও এই খেটে খাওয়া নেংটি পরা মানুষগুলো ভাষাটাকে, আজকে যে ভাষায় মোহাম্মদ রফিক কবিতা লেখেন, রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, খেটে খাওয়া মানুষগুলোই এই ভাষাটাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। রাজদরবারে কোনো পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া। তারা পায় নি কোনো কালিদাস, কিন্তু রবীন্দ্রনাথকে পেয়েছে। পায় নি কোনো ভাস কিংবা বিষাদ দত্ত, জয়দেব, কিন্তু পেয়েছে তো রবীন্দ্রনাথকে : মধুসূদনকে। আমি বলছি যে, এদের আসার ফলে আঙ্গিকগত মধ্যখণ্ডই শুধু হয় নি, ক’টি ভাষাও তৈরি হলো। শিল্পিত ভাষা। প্রয়োজন ছিল। আমি মনে করি না, ইতিহাসে কোনো ভুল আছে। ইতিহাসে যা অনিবার্য তাই হবে। মীর জাফরের হাতে সিরাজ নিহত হবেন—যতই অমনঃপূত হোক—ইতিহাসে এটা নির্ধারিত হয়ে ছিল।

মঈনুল আহসান সাবের

ইতিহাস তার মতো করেই তার ভূমিকা পালন করে যাবে। আর কিছু ভাববে না। কিন্তু আমাদের আর ওটা ভাবার কোনো প্রয়োজন নেই? ইংরেজরা না এলে আমাদের বাংলা ভাষা অন্য কোনোভাবে বিকশিত হতো কি না?

মোহাম্মদ রফিক

অনেক আগেই এ বিতর্ক শেষ হয়েছে। শশীভূষণ দাশগুপ্ত তার এক গ্রন্থে স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন যে, ইংরেজরা না এলেও ভারতচন্দ্র এবং সব মিলিয়ে বাংলা ভাষায় যে কিভাবে আধুনিক কবিতা শুরু হয়ে গেছে, ইংরেজরা আসাতে এটা একটু ত্বরিত গতিতে হয়েছে, খানিকটা দিক পরিবর্তিত হয়েছে—এটাও অনিবার্য ছিল। আমি এটা অস্বীকার করছি না। আজকে আমি যে চিত্রকল্পটা তৈরি করছি কে জানে যে, ওটা আমি ব্লেকস ওয়ান থেকে ধার করি নি? কে জানে যে, ওটা আমি অ্যালেন পোর স্বল্পসংখ্যক কবিতা থেকে লোন করি নি? আমি কেন করব না? আবার আমি কেন তাকে পুরোটা অনুকরণ করব? কাজেই পাঁচালির ক্ষেত্রে প্রশ্ন দুটা থাকতে পারে। সেটা হলো যে, ভাষাটা বদলে গেল ধীরে ধীরে হাজার বছরে, অথচ আপনি ফর্মটা সে আমলের কেন নিচ্ছেন? কিন্তু না, সেটা হলো যে, সেভেনটিন সেঞ্চুরি পর্যন্ত পাঁচালি রাজদরবারে, আরাকানের রাজদরবারের ভাষা। আলাওলের ভাষা পড়লে বোঝা যায় যে, এ ভাষায় মধুসূদনের জন্মানোটা অত্যন্ত স্বাভাবিক।

মঈনুল আহসান সাবের

আমার প্রশ্ন আসলে এইটেই ছিল—

সেলিম আল দীন

যে কারণে গোপাল হালদার বলেন যে, আলাওল একালে জন্মালে তিনি রবীন্দ্রনাথ হতেন। কোনো আবেগ তো আর গোপাল হালদারের ইতিহাস রচনায় নেই।…

মোহাম্মদ রফিক

বাংলা ভাষার একটা চেহারা নিজে থেকে দাঁড়াতোই। বরং বাংলাভাষার গৌরবটা সেখানেই ইংরেজরা অন্য যেসব এলাকায় গেছে মূলত প্রতিটি জায়গায় বিশেষ করে আফ্রিকায়, তাদের ভাষা ভুলিয়ে দিয়েছে। বাংলা ভাষা ভোলাবার তো প্রশ্ন আসে না, বরং বাংলা ভাষার পরিধি কি বিরাট তার প্রমাণ হলো, বাংলা ভাষা তার মুখোমুখি নিজেকে নতুনভাবে তৈরি করেছে। নিজের তাগিদে নিজেকে প্রস্তুত করে নিয়েছে। ফলে এখানে অন্যান্য এলাকার মতো আমাদের যে ইংরেজি ভাষায় কথা বলাবার ব্যাপার ছিল, ইংরেজরা সেটা পারে নি।

মঈনুল আহসান সাবের

এখানে অর্থনীতি কি একটা বড় বিষয়? যেমন আফ্রিকার বহু দেশে আমরা দেখি, ফরাসিরা, ডাচরা যেখানে গেছে ওখানকার ভাষা শেষ হয়ে গেছে; সেইসব ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীটি অর্থনৈতিকভাবে খুব দুর্বল ছিল আর বাংলা অর্থনীতি কি সচল ছিল যে, যা বাংলা ভাষার অস্তিত্ব রক্ষায় সহায়ক হয়েছে।

মোহাম্মদ রফিক

বাংলার অর্থনীতি সবল ছিল, সেটা মূল ব্যাপার না। কিন্তু এটাও তো মিথ্যা কথা যেটা ইংরেজরা বলে যে, আফ্রিকানরা অসভ্য ছিল, আমরা তাদের সভ্য করেছি।

মঈনুল আহসান সাবের

আফ্রিকায় তাদের মতো সভ্যতা ছিল।

মোহাম্মদ রফিক

আমি জানি না, বাংলাভাষার ক্ষেত্রে অর্থনীতি একটা প্রধান কারণ কি না, কিন্তু তারপরেও এটা ঘটেছে। তবে এটা আমি মানতে রাজি না যে, শুধুমাত্র অর্থনৈতিক কারণেই ঘটনাটা ঘটেছিল। আসলে আমি মনে করি যে, বাংলা ভাষার ভিতরেই এমন একটা অন্তর্গত শক্তি ছিল, যার ফলে পরিস্থিতির মুখোমুখি সে নিজেকে প্রস্তুত করে নিতে পেরেছে। এজন্য দেখা যায় যে, আমরা ইংরেজি ভাষা গ্রহণ করি নি। এজন্য বিদ্যাসাগর, বঙ্কিম—এদের কাছে আমাদের চিরকালই কৃতজ্ঞ থাকতে হবে।

[বিরতি…]

সেলিম আল দীন

এখানে রফিক ভাই একবার মিডিয়া প্রসঙ্গে বলেছেন, মিডিয়ার প্রভাবে পাঠক কমে যেতে পারে, বলা হয়েছে, বিষয়টা জটিল এবং আধুনিক পৃথিবীতে এটা নিয়ে ম্যাক লোহানের মতো লোকরা সিক্সটিজে ঘোষণা করেছিলেন যে, আলটিমেটলি অক্ষর বা লেখ্য সিস্টেমটাই ওঠে যাবে। এটা পরে ভ্রান্ত প্রমাণিত হয়েছে।


সাহিত্যের প্রধান নগরী নিশ্চিত ঢাকা, এটাকে অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই।


মঈনুল আহসান সাবের

আমরা শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের গল্পে দেখছি, শ্যামল মাঝখানে গল্পের মধ্যে কিছু ছবি এঁকেছেন।

সেলিম আল দীন

এই যে ভূমিকম্পের সতর্কীকরণ করলাম না আমরা এখানে বসে এটা তার লক্ষণ। কিংবা গিন্সবার্গের কবিতাটা যে এ রকম করে সাজানো, সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের কবিতা এ রকম করে সাজানো, ওইসব মানে হচ্ছে এক ধরনের অতৃপ্তিতে ভোগা এবং এলার্মিংও এই মাধ্যমের জন্য। রফিক ভাই আপনি কি মনে করেন যে, মানুষ লেখার যে আনন্দটা, লেখার মধ্যে দিয়ে আত্মপ্রকাশটাকে বাদ দিয়ে শুধুমাত্র মিডিয়ার চিত্র দর্শনের মাধ্যমে পৃথিবীর সমস্ত সমাধান হয়ে যাবে।

মোহাম্মদ রফিক

আমি এটা মনে করিই না। এটা সম্পূর্ণ আলাদা জিনিস। যারা মিডিয়া দেখে আনন্দিত হবে, তারা হবে। যারা লেখা পড়ে হবে, তারা হবে। হয়তো মিডিয়ার দিকে লোক বেশি যাবে এবং মিডিয়া কিছু সঙ্কটও তৈরি করবে।

সেলিম আল দীন

করেছে।

মোহাম্মদ রফিক

হ্যাঁ, করেছে।

সেলিম আল দীন

নরওয়েজিয়ান থেকে দুজন ছাত্রী এসেছিল আমার কাছে পড়তে বার্গান ইউনিভার্সিটির। তারা এক মাস ছিল। তারা বলল যে, স্যার আমাদের দেশে আমরা উই আর ট্রায়িং বেস্ট যাতে স্ক্রিন থেকে বইয়ের দিকে মানুষ মুখ ফেরায়।

মোহাম্মদ রফিক

এটা উন্নত বিশ্বের ধারণা। আমার যে অনুবাদিকা, তার বাড়িতে কোনো টেলিভিশন নেই। আমার বাসায় টেলিভিশন ছিল, আমি হঠাৎ ক’দিন সেটটা প্যাক করে আমার ছেলেমেয়েদের বললাম, দিজ ওয়ান এ আন ওয়েলকাম গেস্ট ফর এ লং টাইম, … এটা বেশি হয়ে গেছে।অতএব আমি এখন এটাকে বিদায় করতে চাই। আমি ওটাকে নিয়ে গিয়ে ফেলে দিয়ে আসলাম। আমেরিকায় এমন প্রচুর পরিবার আছে, যারা বাড়িতে টেলিভিশন রাখে না। এটা হবে। কিন্তু এটা ঘটবার আগেও মিডিয়ার প্রতি একটা মোহ মানুষের মধ্যে থাকবে। কিন্তু মিডিয়া পৃথিবীতে সব কিছু ওলটপালট করে দেবে, লেখালেখি শিল্প-সাহিত্য বন্ধ করে দেবে—এটা সম্ভব না।

মঈনুল আহসান সাবের

রফিক ভাই, ১০ বছর আগে আপনার বই কেমন বিক্রি হতো?

মোহাম্মদ রফিক

আজো যা হয় তাই।

সেলিম আল দীন

মানুষের কল্পনা শক্তির অপচয় একটা সীমা প্রায় অতিক্রম করে গেছে। সত্যজিৎ রায় বা কুরোসোয়ার ছবি বাদ দিয়ে বলছি, চিত্রকলা বা ওই সমস্ত শিল্প মাধ্যমের কথা আমি বলছি না, আমি বলছি যে রিচুয়াল মিডিয়া মানুষের কল্পনা শক্তিকে এমন একটা সীমাবদ্ধ জায়গায় নিয়ে গেছে, অপরিণত বালকদের হাতে পড়ে, মানুষ এখন আর কিছু ভাবতে চাচ্ছে না। কামু বলেছিলেন না যে, একটা সময় আসবে যে আমরা নির্বিকার চিত্তে ধর্ষণের খবর, গণহত্যার খবর পড়ে সিদ্ধ ডিম খাব সকালবেলা।

মঈনুল আহসান সাবের

আমরা তো এসবের সঙ্গে মিলেমিশেই আছি।

সেলিম আল দীন

তবে এটা মনে রাখতে হবে যে, লেখার যে আবেগটা, এটা নিউরোবায়োলজিক্যাল ডেভেলপমেন্টের ফল, এটা নষ্ট হবে না। এটি পাশ্চাত্যের লোকেরা কেন বলছে না, কেন প্রচার করছে না, আমি বুঝতে পারছি না। আমরা থার্ড ওয়ার্ল্ডে যারা নিজেদের আলো থেকে এত বঞ্চিত বলে মনে করছি, আমরা ঠিকই টের পেয়ে যাচ্ছি যে, নিউরোবায়োলজিক্যাল ডেভেলপমেন্টের সঙ্গে লেখ্যরীতির একটা সম্পর্ক আছে। সুতরাং মানুষ কখনো লেখা এবং পড়া বাদ দেবে না। এককালে যেটা সাইন ছিল, কিছু সঙ্কেতের জন্য কোনো গোত্র কিছু অক্ষর তৈরি করেছিল, সেটা ক্রমে ক্রমে হাজার হাজার বছর ধরে মানুষ সেটাকে একটা পরিশীলিত রূপে এনে, একেবারে তার বিস্তার সর্বশ্রেষ্ঠ আধাস্বরূপে পরিগণিত করেছে। আগামী ১০ হাজার বছরে হোমারের ইলিয়াসের মতো কোনো লেখ্যরীতির কাব্য আমরা পাব না। এমন কোনো দৃশ্য তৈরি হবে না, যেটা হোমারের ইলিয়াডকে অতিক্রম করে। মিডিয়া কোন জায়গায় ফেল করছে? আমি মোহাম্মদ রফিকের কবিতা পড়ছি, এটাকে চিত্রায়ণ সম্ভব, এমনকি চিত্রকলা করাও সম্ভব। কিন্তু পঙ্‌ক্তির ফাঁকে ফাঁকে আমার যে ভুবনটা তৈরি করছে সেটি করার অবকাশ দিচ্ছে না। আমি যখন শটও ওপেন করছি, তখন আমি সীমাবদ্ধ করে দিচ্ছি, যে এই দেখ, এটাই কারেক্ট—সুতরাং লেখ্যরীতির সঙ্গে দৃশ্যরীতির এই সংঘাতটা থাকবেই। যেজন্য রিয়ালিস্টক ছবির বদলে বিমূর্তকরণে আন্দোলনটা শুরু হলো পৃথিবীতে। তারা চাচ্ছে যে ছবিটা ভাবাক। যদি এতই সোজা হতো, তাহলে সবাই ক্যামেরা ধরে বসে থাকত।

মোহাম্মদ রফিক

বিমূর্ততার যে ব্যাপারটা এটা তো আমাকে কোনোদিন এই মিডিয়া দেবে না এবং বিমূর্ততা ছাড়া তো কোনো জায়গা দাঁড়ায় না।

সেলিম আল দীন

মানুষকে তো কল্পনার সুযোগ দিতে হবে। রবীন্দ্রনাথ তো এজন্যই বলেন, ইউরোপে দৃশ্যপটের নামে যে উৎপাতটা শুরু হয়েছে, এটা তার কাছে একেবারে অনাবশ্যক মনে হয়েছে। দর্শক কি কল্পনার চাবি বন্ধক রেখে নাটক দেখতে যায়?

মঈনুল আহসান সাবের

এটাই তো মিডিয়ার ইতিহাস। মিডিয়া তো এরকম আচরণই করবে, এটাই নির্ধারিত।

সেলিম আল দীন

আরো প্রকট রূপ ধারণ করবে থার্ড ওয়ার্ল্ডে।

মোহাম্মদ রফিক

তাতে কিছু এসে যায় না।

জাফর আহমদ রাশেদ

আমি একটা বিষয়কে আলোচনায় আনতে চাচ্ছি। আপনারা দুজনেই বলেছেন, তিরিশের কাল থেকে বাংলা সাহিত্যে একটা অবক্ষয় সূচিত হয়েছে। গত ১৫/২০ বছর ধরে বাংলাদেশের কবিতা, নাটক যে দেশীয় জীবনযাপন, মিথ, লোকগাথা ইত্যাদিকে অবলম্বন করে দাঁড়াতে চাইছে, তার মধ্যে আপনারা দুজনের শিল্পচর্চারও ঘনিষ্ঠভাবে অঙ্গীভূত। রফিক ভাই মৎস্যগন্ধায় মহাভারতের চরিত্রকে আজকের পটভূমিতে সাজাচ্ছেন, সেলিম ভাই বনপাংশুল-এ একটি ছোট নৃ-গোষ্ঠীর জীবন সংগ্রামকে দেখাচ্ছেন। এগুলো কিন্তু তরুণরা গভীরভাবে লক্ষ করছেন এবং এসবকে আত্মীকৃত করতে চাইছেন সচেতনভাবে।

সেলিম আল দীন

মোহাম্মদ রফিক দ্বারা আমি এককালে অনুপ্রাণিত হয়েছি। মোহাম্মদ রফিক যখন লোককথা-রূপকথা নিয়ে ভাবছেন তখনই কিন্তু আমার কীত্তনখোলা লেখা। আমি কিন্তু খুব সচেতন এবং রফিক ভাই জানেন না যে, আমি তার থেকে কী গ্রহণ করেছি। আমি কিন্তু আমার ওয়েতে গ্রহণ করেছি।

মোহাম্মদ রফিক

এটাকে আমি দেখছি এভাবে মানুষের বেড়ে ওঠার দুটো স্তর। প্রথম হচ্ছে নিজেকে চেনা, তারপরে নিজেকে পৃথিবীর লোক হিসেবে দেখা। তরুণ নিজেকে চেনার স্তরটা পার হচ্ছে। স্বাধীন মানুষ প্রথমে নিজেকেই চিনবে। তার ভাষার মধ্য দিয়ে সে নিজেকে চিনবে, তার মিথের ভিতর দিয়ে নিজেকে চিনবে, এই চেনায় যেন আবার ভুল না হয়। আমরা যেন গণ্ডিবদ্ধ না হয়ে যাই। চেনাটাকে যেন আমরা সমস্ত পৃথিবীর মধ্যে ছড়িয়ে দিতে পারি। নিজেদের যেন পৃথিবীর মানুষ হিসেবে চিনতে পারি।

জাফর আহমদ রাশেদ

আপনি নিজেকে চেনার জন্যই কি নিজের ঐতিহ্যগুলোকে চিনিয়ে দিচ্ছেন না?

মোহাম্মদ রফিক

বটেই।

জাফর আহমেদ রাশেদ

তরুণরা যে নিজেকে চেনার এবং চেনানোর চেষ্টা করছে সেটাকে আপনি কিভাবে দেখছেন?

মোহাম্মদ রফিক

এটা তো খুবই আনন্দের ব্যাপার।

জাফর আহমদ রাশেদ

রবীন্দ্রোত্তরকালে জীবনানন্দকে এবং অংশত সুধীন্দ্রনাথ দত্তকে বাদ দিয়ে এই যে অবক্ষয়ের কাল বলছেন তার এতদিন পরে এসে নিজস্ব জায়গায় দাঁড়ানোর প্রসঙ্গটি, সেলিম ভাই এর আগে বনপাংশুল-এর আলোচনা প্রসঙ্গে ‘ভোরের কাগজ’কে যেটা বলেছিলেন এই চেষ্টাটার মাধ্যমে আমরা আর একবার কি নিজের হয়ে বৈশ্বিক হওয়ার চেষ্টা করছি?

সেলিম আল দীন

হ্যাঁ, অবশ্যই। রবীন্দ্রনাথের পথেই আমরা চলেছি। এটার গুরুত্ব সম্পর্কে রফিক ভাই অলরেডি বলেছেন যে, রবীন্দ্রনাথ একমাত্র, যিনি বঙ্কিমদের ধারাকে আত্মসাৎ করে স্বকাল-স্বদেশের হয়ে বৈশ্বিক হয়েছেন। তারপর থেকে আমি বলেছি, পরকে অনুকরণ করার ত্রুটিটা রবীন্দ্রোত্তরকালের কবিদের প্রধান ত্রুটি। পরকে অনুকরণ করে বৈশ্বিক হওয়ার চেষ্টা, এখন আবার সেই পালাটা চলছে যখন দেশটি স্বাধীন, একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র এবং সাহিত্যের প্রধান নগরী নিশ্চিত ঢাকা, এটাকে অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। আবেগের কথা নয়, এটা একটি রাজনৈতিক অপরিহার্যতা, ভৌগলিক সত্য। প্রাণাবেগের দিক থেকেও এটাকে দেখা যায়, আমাদের কবিতার শক্তি, আমাদের গল্পের শক্তি, উপন্যাসের শক্তি, তবে উপন্যাস হয়তো ততোটা ওভাবে দাঁড়াতে পারে নি।

মোহাম্মদ রফিক

হ্যাঁ, তবে, একটা কথা যেটা বলছিলাম কেন্দ্র বা আমরা হয়েছি তা ভাগ্যক্রমে। বাঙালি বলতে এখন বাংলাদেশকেই লোকে চিনবে। সঙ্গে সঙ্গে একটা দায়িত্বও আমাদের ওপর বর্তেছে, আমাদের ক্ষুদ্র হলে চলবে না। মনকে বড় করতে হবে। বলতে হবে, আমি বাঙালি, আমি পৃথিবীর লোক। আমাকে বাঙালি হয়ে হিমালয়ের ওপর দাঁড়াতে হবে। যাই হোক, বাংলাদেশে যে একটা জিনিস শুরু হলো এটাই আনন্দের।

সেলিম আল দীন

এবং সাবের সাহিত্য সম্পাদক হওয়ার পরে এক ধরনের কোয়্যারি এই সম্পাদকের মধ্যে কাজ করছে আমি দীর্ঘদিন থেকে লক্ষ করছি, যদিও কোনো লেখা দিয়ে তাকে আমি সম্মানিত করতে পারি নি। আমি এত বাজে লেখায় ব্যস্ত, আমি তার অফিসে গিয়ে প্রথমে সাবধান করে দিয়েছি, আমি আসছি বলে লেখা-টেখা দেবো, তা নয়, জাস্ট আপনি হয়েছেন লেখার পরিবেশ এই পত্রিকায় কাজ করবে।

মোহাম্মদ রফিক

শোনো, তোমাদের তরুণদের একটা জরুরি কথা বলি। তোমরা একটা সাহিত্য পত্রিকা কর। বাংলাদেশে একটা ভালো সাহিত্য পত্রিকা নেই। দৈনিক পত্রিকায় কবিতা-গল্প লেখা যায়। কিন্তু প্রবন্ধ লেখা যায় না। আমি সংবাদে লিখতে গিয়ে হাড়ে হাড়ে বুঝছি। তোমরা একটা জিনিস পারো, তোমরা একটা সিরিয়াস পত্রিকা করার চেষ্টা করো। সাহিত্য পত্রিকা। সেলিম বা আমি যে প্রবন্ধ লিখি দৈনিক পত্রিকায় ওগুলো পাঠক কেউ পড়ে না। অবশ্য দুএকজন তরুণ খুঁজে পড়ে।

হুমায়ুন কবির হিমু

আমার মনে হয়, কম্পিউটার যুগের যতই বিকাশ হোক মানুষের পাঠ কিন্তু কমবে না। তাকে পড়তেই হবে। কম্পিউটারে কিছু করতে হলে, দেখতে হলে পড়তেই হয়। স্ক্রিনে পড়তে হচ্ছে।

মঈনুল আহসান সাবের

কাগজকে তো আপনি উঠিয়ে দিতে পারছেন না, সম্ভব না উঠিয়ে দেওয়া। ইম্পুট-আউটপুট সবই তো কাগজ দিয়ে।

সেলিম আল দীন

চমৎকার বলেছ।

জাফর আহমদ রাশেদ

আচ্ছা, অবক্ষয়ের কথা বলতে গিয়ে জীবনানন্দ দাশকে একটি আলাদা জায়গা দেওয়া হয়েছে আজকের আলোচনায়, তার কবিতা সম্পর্কে…

সেলিম আল দীন

আজকের একসঙ্গে জাহাঙ্গীরনগর [ইউনিভার্সিটি] থেকে আসার সময় রফিক ভাই আমাকে বলেছেন, জীবনানন্দ দাশের ভিতরের যে ফ্লো-টা তার যে আর্তনাদ, এষণা, যে দৃষ্টি, যে দ্বান্দ্বিকতা এদিকে না গিয়ে শব্দের এমন কারুকাজ কবিরা প্রথমে গিয়ে সেই ফাঁদে ধরা দেয় এবং তারা মিস-লেড, সিম্পলি। তারা ওই বিবর্ণ, ধূসর, আকন্দ-ধুন্দুল এগুলোর মধ্যে দিয়ে—রফিক ভাইয়ের সঙ্গে আমি একমত।

মোহাম্মদ রফিক

আমি জীবনানন্দের ওপর একটা বই লিখছি তো, আমি তো প্রমাণ করছি যে, জীবনানন্দ একেবারে রবীন্দ্রনাথ থেকে বেরিয়ে এসেছেন, রবীন্দ্রনাথের সন্তান, আমি কবিতার সঙ্গে মিলিয়ে দেখেছি, কোন কবিতা থেকে কোন কবিতা জন্ম নিয়েছে। জীবনানন্দের বিকশী প্রভাব—লোকেরা যা আজেবাজে কথা বলে না! জীবনানন্দের মধ্যে এক ধরনের প্রচণ্ড ইন্দ্রিয়গ্রাহ্যতা আছে, সঙ্গে সঙ্গে ইতিহাস, দর্শন, মানুষ, সভ্যতা বিভিন্ন অনুষঙ্গ তাকে জড়িয়ে আছে।

সেলিম আল দীন

প্রকৃতি?

মোহাম্মদ রফিক

প্রকৃতি তো ইন্দ্রিয়গ্রাহ্যতার মধ্যে আছে, আমরা তার ইতিহাস, দর্শন, মনের সভ্যতা অর্থাৎ তার সিরিয়াসগুলোকে বাদ দিয়েছি, আমাদের কাছে বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে তার ইন্দ্রিয়গ্রাহ্যতা।

সেলিম আল দীন

আর শব্দ, আমি এককালে কবিতা লেখার চেষ্টা করেছিলাম, দেখি কি, হুট করে জীবনানন্দ দাশ এসে পড়ে। বিষয়টা কি, তারপর ছেড়েই দিলাম।

মোহাম্মদ রফিক

আর জীবনানন্দ সম্ভব হয়েছে কেন? তখন যদি বাংলা ভাগ না হতো, জীবনানন্দকে যদি বরিশাল ছেড়ে যেতে না হতো তবে জীবনানন্দের একটা অন্য বিবর্তন দেখতে। কলকাতা গিয়ে তিনি খুব একা হয়ে গেছেন, যে বিবর্তনটা কেবল শুরু হয়েছিল রূপসী বাংলা’য়, যেটার আর পরিণতি হলো না। বাঙালির ইতিহাসের মতোই। বাঙালির ইতিহাসের কোনো পরিণতি নেই কিন্তু—

সেলিম আল দীন

আমি বলছিলাম যে, সঠিক ধারায় বাঙালি যায় নি।

মোহাম্মদ রফিক

যায় নি।

সেলিম আল দীন

মকসুদে মঞ্জিল যাকে বলে, সেখানে বাঙালি পৌঁছুতে পারে নি। গ্রিকরা পেরেছে, ইউরোপিয়ানরা পারে, আমেরিকানরা পারে, আফ্রিকার কোনো কোনো দেশও পারে, আমরা পারি নি। তারপর উত্তরাধিকারী হিসেবে বলতে হয়, আমাদের চেয়ে সৌভাগ্যবান জাতি বোধহয় এশিয়ায় নেই। যেখানে রবীন্দ্রনাথ আছেন, যেখানে বিজ্ঞানী আছেন, অর্থনীতিবিদ, পৃথিবীর সেরা মানের লোকগুলো যে ভাষাতে জন্মগ্রহণ করছেন, যেখানে স্বাধীনতা অর্জন করতে হয় যুদ্ধ করে, সাম্প্রদায়িকতার মতো নোংরা জিনিস দিয়ে নয় দেশ স্বাধীন করা।

জাফর আহমদ রাশেদ

আমরা মনে হয়, উপসংহারের দিকে চলে এসেছি। সেলিম ভাইয়ের একটি কথার সূত্র ধরে একটি প্রশ্ন করতে চাই। আপনি বলেছিলেন, সাহিত্যের মাধ্যমগুলো সাহিত্যে নন্দন একটি ক্রাইসিসের দিকে যাচ্ছে।

সেলিম আল দীন

আমি না আমি না, কাল—

জাফর আহমদ রাশেদ

হ্যাঁ, ওই সময় বলতে গিয়ে আপনি বলেছেন, নাটকের ডিরেক্টর একটা জড় জায়গায় চলে আসছে, কথাটা একটু ব্যাখ্যা করুন।

সেলিম আল দীন

হ্যাঁ, এখন তো পিটার ব্রুক যা চালু করেছেন, তাতে ডিরেক্টর নাট্যকারের জায়গায় দাঁড়িয়ে যাচ্ছেন। এমনকি নাটক লিখিত না হলেও চলে। কোনো একটি নাটক, যেমন শেক্সপিয়রের মিড সামার নাইট ড্রিম—এটিকে অবলম্বন করে নতুন করে ভাঙচুর করে সুন্দরভাবে তিনি গড়েছেন।

মোহাম্মদ রফিক

কিন্তু সেটা তো তারপরেও শেক্সপিয়রের নাটক তার মহাভারত তারপরেও মহাভারত।

সেলিম আল দীন

পিটার ব্রুক এমন একটি সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করে দিচ্ছেন, যাতে আর মনে হয় না নাট্যকারের প্রয়োজন আছে। অন্তত চেখভের সময় ভাবাই যেত না, চেখভের নাটকটি একেবারে ধ্রুব ছিল। কিন্তু এখন নাট্যকার বলে আলাদা আর কিছু থাকছে না।


ফেরদৌসীর মহাকাব্য যে না পড়েছে সে শিশু।


মোহাম্মদ রফিক

এটি যদি হয়ে থাকে, তাহলে এটা খুবই চিন্তার কথা। নাট্যকারের সমস্ত কথাবার্তা বাদ দিয়ে।

সেলিম আল দীন

এটা ভাঙনের মুখে আপনি কি বলবেন? আপনার ঘরবাড়ি ভেঙে নিয়ে যাচ্ছে, নদীর স্রোত এত বড়, কোনো ঔচিত্যবোধ দিয়ে রফিক ভাই ঠেকাতে পারবেন না।

জাফর আহমদ রাশেদ

আলোচনাটা আবার সূচনা বিন্দুতে চলে এসেছে।

সেলিম আল দীন

নিশ্চয়।

মোহাম্মদ রফিক

তার মানে এই নয় যে, আলোচনার মধ্যে জিজ্ঞাসাগুলোর উত্তর নেই। মনে হয় যে আমরা ফিরে এলাম, কিন্তু যেখানে ফিরে আসি, সেটা আগের জায়গা নয়। অনেকদূর এগিয়ে আমরা ফিরে আসি। তবে হ্যাঁ, ফিরে একবার আসতেই হয়। নিজেদের চেনার-জানার জন্য।

জাফর আহমদ রাশেদ

আপনি কি এজন্যই বলেছিলেন, আমি কি বলতে পারি যে, আর কেউ কখনো ব্যাসদেব পড়বে না?

মোহাম্মদ রফিক

ব্যাস-বাল্মীকি তো পড়তেই হবে। আমি মৎস্যগন্ধা লেখার পরে, আমি তো এখন ‘মহাভারত’ ছাড়া কিছু পড়ি না। আর তো কিছু পড়ার দরকার নেই এই মুহূর্তে, আমার জন্য।

সেলিম আল দীন

হাজার হাজার বছরের যে রুচি, টেইলস, ফোক, ডিফারেন্ট হিউম্যান ফিগার, প্রোটোটাইপ, বাচনভঙ্গি, জীবনের পরিণাম সব একত্রে, একটি গাথায় আর পাচ্ছ না কোথাও, মহাকাব্যগুলো ছাড়া। ফেরদৌসীর শাহনামার মতো মহাকাব্য কোনো জাতিতে আছে না-কি? আদি মহাকাব্যগুলো বাদ দিয়ে, সিয়োডো এপিক থাকে আমরা বলি। সিয়োডা এপিক হলো একেবারে স্ব-উদ্ভাবিত মহাকাব্য, যেমন মধুসূদনের মেঘনাদবধ কাব্য।

মোহাম্মদ রফিক

কারেক্ট, ইংরেজিতে যাকে বলা হয়, সেকেন্ডারি এপিক।

সেলিম আল দীন

ইরানে প্রচলিত একটি গল্প দাকাকির কাছ থেকে শুনে ফেরদৌসী ইলাবরেট করে শাহনামা লেখেন।

জাফর আহমদ রাশেদ

মহাভারতের গল্পগুলোও তো প্রচলিত।

মোহাম্মদ রফিক

হ্যাঁ, মহাভারতও তাই, প্রচলিত গল্পগুলোকে একত্রিত করা হয়েছে।

সেলিম আল দীন

ফেরদৌসীও সেভাবে করেছেন। ফেরদৌসীর মহাকাব্য যে না পড়েছে সে শিশু।

মোহাম্মদ রফিক

সব মহাকাব্য যে না পড়েছে সে শিশু। আমি এখন পর্যন্ত একটি বই প্রতিদিন শোয়ার আগে পড়ি—হোমারের ইলিয়ড। সারাদিন পড়ি মহাভারত, রাতে হোমার আর দান্তে। সেলিমও দান্তে খুব ভালোবাসে। ওর ওপর দান্তের প্রভাব আছে।

মঈনুল আহসান সাবের

আমরা এবার শেষ করতে চাই। যে সমস্যা সঙ্কটের কথা এসেছে—

মোহাম্মদ রফিক

হ্যাঁ, আমরা একা তো কেউ সমস্যার সমাধান করতে পারব না, আমরা সবাই মিলে একটি জিনিস তৈরি করব। সেলিম যদি চায় যে, আমিই তৈরি করব, হবে না। আমি যদি চিন্তা করি যে, আমি করব, হবে না।

সেলিম আল দীন

রবীন্দ্রনাথের সংবর্ধনায় শরৎচন্দ্র লিখেছেন, বাণীর দেউল আজ গগণ স্পর্শ করিয়াছে, বঙ্গের কত না কবি কত কারিগর এই দেউলে, তুমি তার চূড়ান্ত রূপটি দিলে—এই ধরনের।

সামনের কাজ অসংখ্য কবি-কারিগরের।


সোহেল হাসান গালিব ও নওশাদ জামিল সম্পাদিত
কহনকথা বই থেকে