হোম সাক্ষাৎকার মাহমুদ দারবিশের সাথে আলাপ

মাহমুদ দারবিশের সাথে আলাপ

মাহমুদ দারবিশের সাথে আলাপ
320
0

মাহমুদ দারবিশ ফিলিস্তিনের জাতীয় কবি। আরবি কবিদের মধ্যে যারা সংগ্রাম, স্বাধীনতা ও দেশের কবিতার জন্য খ্যাত ছিলেন, তিনি তাদেরই অন্যতম। শুধু ফিলিস্তিন নয়—গোটা আরবজুড়েই তার সুখ্যাতি। সাহিত্য জগতে তাকে আরব বিশ্বের কণ্ঠস্বর বলা হয়। ১৯৪১ সালের ১৩ মার্চ ফিলিস্তিনের গালিলি প্রদেশের আল-বিরওয়াহ গ্রামে মাহমুদ দারবিশের জন্ম। ১৯৪৮ সালের আরব-ইসরাইল যুদ্ধের সময় ইসরাইলি সেনাবাহিনী তাদের গ্রাম দখল করে নিলে মাত্র ছয় বছর বয়সে গভীর রাতে সপরিবারে পালিয়ে যান লেবাননে। পরিবারের সাথে কোনো রকমে প্রাণ রক্ষা করে উদ্বাস্তু হিসেবে সেখানেই কাটে তার জীবনের পরবর্তী এক বছর। এরপর যখন বাবা-মা’র সাথে আবার ইসরাইলে ফিরে আসেন, তখন বিরওয়া নামে কোনো গ্রামের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় নি। ফলে দায়ের আল-আসাদ নামক অন্য একটি গ্রামে অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু হিসেবেই কোনো রকমে খেয়ে-পড়ে বেঁচে থাকতে হয় দারবিশকে। ১৯৭১ সালে আবার তাকে দেশত্যাগ করতে হয়। মিশর, কায়রো, বৈরুত, তিউনিস, প্যারিস এবং আম্মানে নির্বাসিত জীবন কাটান। ১৯৯৬ সালে আবার দেশে প্রত্যাবর্তন করেন। সর্বশেষে ২০০৮ সালের ৯ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে মৃত্যুবরণ করেন তিনি।

শৈশব থেকে কবিতা চর্চা শুরু করেন মাহমুদ দারবিশ। তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ আসাফির বিলা আজনিহা প্রকাশ হয় ১৯৬০ সালে—১৯ বছর বয়সে। এই গ্রন্থে প্রেমের কবিতা প্রাধান্য পেলেও ১৯৬৪ তে প্রকাশিত তার দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ আওরাক আল যায়তুন ফিলিস্তিনি প্রতিরোধের কবি খ্যাতি এনে দেয়। প্রতিরোধের কাব্য নামে আরবি কাব্যে যে নতুন ধারার সূচনা হয়েছিল তার অন্যতম প্রতিনিধিত্বকারী কবি তিনি। মাহমুদ দারবিশের প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা ৩০ এবং প্রবন্ধগ্রন্থ সংখ্যা ৮। আরবি পত্রিকা ‘আল-মাজিলা’র পক্ষ থেকে সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মুসাভি। সাক্ষাৎকারের চুম্বকাংশ বাঙলায়ন করেছেন আদিল মাহমুদ।


সাক্ষাকা


 মুসাভি

বিগত কয়েক মাস আপনি গুরুতর অসুস্থতায় ভুগেছেন। বলতে গেলে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়েছেন। যদিও আঘাত সইবার অভ্যাস আপনার আছে, তবু এই অসুস্থতাকে আপনি কিভাবে মোকাবেলা করলেন। জানতে ইচ্ছে হয় খুব।

মাহমুদ দারবিশ

আমি আসলে ব্যক্তিগত বিষয়ে আলোচনা করতে পছন্দ করি না। তবে বিশ্বাস করি যে, সম্প্রতি যে হার্ট অ্যাটাক হয়েছিল, সেটা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় অসুস্থতা। আমার মনে হয়েছে, আমি জীবন ও মৃত্যুর মাঝখানে একটা স্বচ্ছ ফাটলের মধ্যে পড়ে গিয়েছিলাম। এর আগে আমার আরও একবার হার্ট অ্যাটাক হয়েছিল। সে সময় আমার ক্লিনিক্যাল ডেথের অভিজ্ঞতা হয়েছিল, কিন্তু সেটাও এবারের চেয়ে গুরুতর ছিল না। এবার মনে হয়েছে, যেন মৃত্যুকে বরণ করার চেয়ে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করা অনেক বেশি কঠিন এবং যন্ত্রণাদায়ক। তবে এই অসুস্থতায়ও একটা জিনিস ছিল বিস্ময়ের ব্যাপার। অসুস্থতার চূড়ান্ত অবস্থাতেও আমি কবিতা লিখে চলেছিলাম। আমি জীবনকে উপভোগ করছিলাম।

বলা যায় যে, আমরা শূন্য থেকে আসি, আবার শূন্যে ফিরে যাই। এজন্য আমাদের জীবনের প্রত্যেকটা মুহূর্তকে উপভোগ করা দরকার। কারণ জীবনটা খুব সংক্ষিপ্ত সময়ের। সত্যিই খুব সংক্ষিপ্ত। আর দু’টো শূন্যের মাঝখানের ভ্রমণে আমরা শুধুই পরিব্রাজক নই। খোলা মনে বলছি, আমার জীবনের এই কঠিন পরীক্ষার পর, যার বর্ণনা আমি এখানে তোমাদের কাছে দিয়েছি, আমি হতাশা বোধ করি। আর সেটাই স্বাভাবিক, এ রকম এক অসুস্থতায় ভোগার পর, যা আমার অন্তরে রেখে গেছে গভীর দাগ এবং অসাড়তা ও তিক্ততার অতুলনীয় অনুভূতি। এমনকি এখনও সেই অসুস্থতার কথা মনে হলে আমাকে আতঙ্ক গ্রাস করে। আমার শরীর শিউরে ওঠে।


আমার সাথে তোমার কাজ আছে, যুদ্ধও আছে, কিন্তু আমার কবিতার সাথে তোমার কোনো সম্পর্ক নেই। 


মুসাভি

আপনি মাত্র ইঙ্গিত দিয়েছেন, মৃত্যুর সঙ্গে লড়াইয়ের সময়ও আপনি কবিতা লিখেছেন। কবিতা কোনো না কোনোভাবে আপনার সঙ্গে ছিল। কিন্তু এটা কিভাবে সম্ভব হলো?

মাহমুদ দারবিশ

হাঁ, অসুস্থতার সময়ও আমার সঙ্গে কবিতা ছিল সবসময়। চিকিৎসকরা আমাকে কৃত্রিম কোমার মধ্যে রেখেছিলেন পুরো এক সপ্তাহ। তার থেকে মুক্তিলাভ করে আমি প্রথম যে চেষ্টা করেছিলাম, সেটা হলো কথা বলার চেষ্টা। কিন্তু এসময় আমি কথা বা আমার জিভ খুঁজে পাচ্ছিলাম না। তখন আমি তাদের ইশারায় কাগজ-কলম দিতে বললাম। সেই সময় আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম এই কথা ভেবে যে, আমি হয়তো চিরদিনের জন্য বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেছি। তারপর বুঝতে পারলাম আমার মুখের মধ্যে একটা যন্ত্র ঢুকানো আছে, সেটাই কথা বলতে বাধা সৃষ্টি করছে। আমাকে ডাক্তার, নার্স এবং দর্শনার্থীদের সঙ্গে আলাপ চালাতে হয়েছিল কাগজ-কলমের সাহায্যে। তখন আমার সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় ছিল, আমি হয়তো কবিতা লেখার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলবে।

আমি সত্য বলছি, কবিতা সঙ্গে ছিল আমার অসুস্থতার সমস্ত সময় জুড়ে। যদিও ব্যথা এবং যন্ত্রণা আমার মন ও শরীরকে ছিন্নভিন্ন করে ফেলছিল। তাই আমি বলি, আমার জীবনের নির্যাস হচ্ছে কবিতা। কবিতা ব্যতিত কিছু নয়, কেবল কবিতা।

মুসাভি

মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে এখন মৃত্যু নিয়ে আপনার কী মনোভাব?

মাহমুদ দারবিশ

মৃত্যুর জন্য আমি প্রস্তুত। তবে অপেক্ষমাণ নই। কারণ অপেক্ষা করাটা আমার পছন্দ নয়। আমার একটি প্রেমের কবিতা আছে, যেখানে এই বিষয়টি তুলে ধরেছি। কবিতাটি এমন—‘তুমি অনেক বিলম্ব করেছে এবং অবশেষে আসো নি/ আমি ভাবি, হয়তো গিয়েছ এমন জায়গায়, যেখানে সূর্যোদয় হবে/ হয়তোবা গিয়েছ কেনাকাটা করতে/ হয়তো আয়নায় দেখছো নিজেকে … ।’

মৃত্যুর সাথে আমার একটা অলিখিত চুক্তিপত্র আছে, যা খুব পরিষ্কার। আমি তো এখনো মূল্যহীন হয়ে যাই নি। এখনো আমার অনেক কিছুই লেখার বাকি, করার বাকি। আমার সাথে তোমার কাজ আছে, যুদ্ধও আছে, কিন্তু আমার কবিতার সাথে তোমার কোনো সম্পর্ক নেই। আমি মৃত্যুকে বলি, চলো, আমরা আলোচনায় বসি। এরপর তুমি তোমার সময় বলে দাও, আমি প্রস্তুত থাকব। উত্তম পোশাকে সজ্জিত হয়ে তোমার সাথে সাক্ষাৎ করব আমার লেখার টেবিলে। তারপর একটি কবিতা লিখব, কবিতা লেখার পর তুমি তোমার কাজ সেরো।

মৃত্যুকে নিয়ে আমার কোনো ভয় নেই। আবার আমি এ ব্যাপারে অন্যমনস্কও নই। তাকে গ্রহণের জন্য আমি প্রস্তুত। তবে সে যখনই আসে, যেন বীরের বেশে আসে। চোরের মতো চুপিচুপি যেন না আসে। কোনো ধরনের জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে মরতে চাই না।

মুসাভি

আচ্ছা, আপনার এই হার্ট অ্যাটাকের কারণ কী? আপনি কি মনে করেন, সুদীর্ঘ অনুপস্থিতির পর নিজ বসতভিটায় প্রত্যাবর্তন এবং তার থেকে সৃষ্ট ক্ষোভ-উত্তেজনার অনুভূতি আপনার এই হার্ট অ্যাটাকের কারণ?

মাহমুদ দারবিশ

না, এমনটা না। এ ধরনের ব্যাখ্যায় আমি বিশ্বাসী নই, এটা ভুল। তার কারণ হলো, বসতভূমিকে এরকম সঙ্কীর্ণভাবে সংজ্ঞায়িত করাটা সবচেয়ে বিপজ্জনক। যেমন : উদাহরণস্বরূপ বাসভূমি হচ্ছে নির্বাসনের বিপরীত। আমি বিশ্বাস করি না যে স্বদেশভূমি নির্বাসনের বিপরীত অবস্থা। স্বদেশভূমি ও প্রবাসের মধ্যকার সম্পর্ক আমরা যেরকম কল্পনা করি তার চেয়ে জটিল। আমাদের সবচেয়ে খারাপ কাজ হচ্ছে, কবি বা সৃজনশীল লেখকের অভিজ্ঞতাকে নির্বাসনের পর মাতৃভূমিতে ফিরে আসার অভিজ্ঞতার মধ্যে সঙ্কুচিত করে ফেলা। সেটাই যদি হয়, তাহলে বৃত্ত সম্পূর্ণ হয়ে যাবে এবং তার কাব্য-ভ্রমণ এবং একইভাবে জীবনও। তার আবর্তন শেষ করে ফেলেছে বলে অবসর নেয়া ছাড়া কবির আর কোনো গত্যন্তর থাকবে না।

একজন কবির জন্য স্বদেশভূমি কোনো মৌলিক প্রয়োজন না। আমার কাছে নির্বাসন মানেই কালো বা ধূসর কিছু নয়, কারণ আমি অভিজ্ঞ হয়েছি নির্বাসনেই। আমার গুরুত্বপূর্ণ রচনাগুলো আমি নির্বাসনে থেকেই লিখেছি। সুদীর্ঘ অনুপস্থিতির পর নিজ বসতভিটায় প্রত্যাবর্তন এবং তার থেকে সৃষ্ট ক্ষোভ-উত্তেজনার অনুভূতি, এসব কিছুর কারণে আমার হার্ট অ্যাটাক হয় নি।


জীবন যেসব মাধ্যমে প্রকাশ লাভ করে তার অন্যতম হচ্ছে কবিতা।


মুসাভি

শৈশব থেকে কবিতা ছিল আপনার লক্ষ্য। সম্প্রতি হার্ট অ্যাটাকের সময় কবিতা আপনাকে নূহের নৌকার মতো রক্ষা করেছে মৃত্যুর হাত থেকে। এবার কবিতা সম্পর্কে একটু বলুন।

মাহমুদ দারবিশ

তোমার প্রশ্নের একটা দার্শনিক উত্তর যদি তুমি চাও, তাহলে আমি বলব, কবিতার বাইরে আমার জীবনের কোনো গুরুত্ব বা তাৎপর্য নেই। এটা একটা খুব বিপজ্জনক ব্যাপার। কারণ এমন দিন আসবে, যখন আমাকে আমার অস্তিত্বের জন্য কবিতা ছাড়া অন্য কিছুতে যুক্তি খুঁজতে হবে। কিন্তু এটা আমার জন্য বাজি জেতার ব্যাপার নয় কোনো মতেই।

সম্প্রতি ভোগা এই তিক্ত অভিজ্ঞতার পর যখন সুস্থ হলাম বা প্রায় স্বাভাবিক জীবন ফিরে পেলাম, তখন আমি কঠিন অবসাদের শিকার হয়েছিলাম। তার কারণ কেবল যে অসুখের প্রভাব তা নয়, বরং কবিতা লেখার ক্ষমতা হারানোর ভয়ও ছিল। কয়েক মাস আমি একলাইন কবিতাও লিখতে পারি নি। এই উদ্বেগ কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত ছিল এবং এখনও পর্যন্ত সেটা আছে। বিশেষভাবে যখন আমার অনেক পুরনো অভ্যাসের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি হয়। যেমন : ধূমপান, যা দীর্ঘদিন ধরে আমার দৈনন্দিন জীবনের একটা অংশ হয়ে আছে। কারণ আমি অনুভব করতে শুরু করেছিলাম যে লেখা এবং ধূমপান একত্রে চলে, এ দুটোকে আলাদা করা যায় না।

সুতরাং আমাকে কবিতা ছাড়াও অন্য সূত্রগুলোর ব্যাপারেও শিক্ষিত হয়ে উঠতে হবে, যেন আমি ভবিষ্যতে জীবনকে মোকাবেলা করতে পারি। জীবন যেসব মাধ্যমে প্রকাশ লাভ করে তার অন্যতম হচ্ছে কবিতা। এটাকে জীবনের উৎস বলে বিশ্বাস করা সম্ভবত স্বপ্নবিলাস মাত্র।

মুসাভি

আপনি ঠিক কবে থেকে কবিতা লেখা শুরু করেন?

মাহমুদ দারবিশ

শৈশব-কৈশোরে আমি শারীরিকভাবে খুবই দুর্বল ছিলাম। খেলাধুলা করার মতো শক্তিও ছিল না। ফলে লেখালিখিতে সময় দেয়া ছাড়া আর কিছু করার ছিল না আমার। এছাড়া বড়দের সঙ্গে সময় কাটাতেও ভালো লাগতে। আমার দাদাসহ প্রতিবেশী বয়ঃবৃদ্ধরা প্রায়ই প্রাচীন লোকগাথা পাঠ করতেন। সেখানে আমার সমবয়সী কেউ থাকত না, কিন্তু আমি নিয়মিতই উপস্থিত থাকতাম। ওইসব শুনে ধীরে ধীরে কবিতার প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠলাম। অবশ্য কেন হলাম তা জানি না। শুধু জানতাম, কবিতার টুপটাপ ধ্বনি আমাকে বিমোহিত করে। কবি হওয়ার স্বপ্ন দেখতে লাগলাম। ভাবতাম, কবি মানেই একটি রহস্যজনক চরিত্র। যার হরেকরকম মানবীয় গুণ ও শক্তি আছে। ফলে ছোটবেলা থেকেই লেখালিখি শুরু। অবশ্য তখন বুঝতাম না, যা লিখছি তা কবিতা হচ্ছে কি না। বাবা-মা ও শিক্ষকদের কাছ থেকে অনুপ্রেরণা পেয়েছি বেশ। যেহেতু কবিতা ছাড়া আমার করার কিছু ছিল না, তাই চেষ্টা বাড়িয়ে দিলাম। লেখালেখি আমার ছেলেবেলার খেলাধুলা হয়ে গেল। তারপর কবিতাই হয়ে উঠলে আমার যুদ্ধক্ষেত্র, ভাষা হাতিয়ার। যখন বারো বছর বয়স, তখন স্কুলের অনুষ্ঠানে একটি স্বরচিত কবিতা পড়েছিলাম। পরদিন ইসরাইলি আদালতে আমাকে হাজিরা দিতে হয়েছে।

মুসাভি

কবে থেকে নিজেকে সত্যিকারের কবি ভাবতে শুরু করলেন?

মাহমুদ দারবিশ

তা জানি না। তবে আমি মন থেকে যা বেছে নিয়েছি, তা হচ্ছে কবিতা। আমার কবি পিছনে ইসরায়েলি এক গভর্নরের সম্পর্ক আছে। বলা যায়, তিনিই আমার কবিতার প্রথম সমালোচক এবং শিখিয়েছেন কবিতা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। আমার বয়স যখন ১২। তখন ক্লাসের ভালো ছাত্র হওয়ায় আমাকে ইসরায়েলের বিজয় দিবস উপলক্ষ্যে কিছু আবৃত্তি করতে বলা হল। আমি স্বরচিত একটি কবিতা আবৃত্তি করলাম। পরের দিন সেখানকার সামরিক গভর্নর আমাকে তলব করেন এবং এমন কবিতা লেখার জন্য ধমকা-ধমকি দেন। যতদূর মনে পড়ে, কবিতায় যা লিখেছিলাম তা সত্য ভেবেই লিখেছিলাম। এতটাই অবুঝ ছিলাম যে, কী বলতে হবে তা-ও বুঝতে পারি নি। তখন ভেবে খুব অবাক হলাম, সামান্য কবিতাকে এত ভয় পায় বিরাট এই ইসরায়েল! বুঝতে পারলাম কবিতা কত প্রভাবশালী একটি কর্ম।

মুসাভি


কবিতা হচ্ছে অন্য সব প্রকাশযোগ্য শিল্পের জনক।


আপনি মিশর, কায়রো, বৈরুত, তিউনিসসহ বিভিন্ন জায়গায় নির্বাসিত জীবন কাটিয়েছেন, কিন্তু মনে হয় আপনার জীবন এবং কবিতায় বৈরুতের জন্য বিশেষ জায়গা আছে। আপনি কিভাবে এর ব্যাখ্যা দেবেন?

মাহমুদ দারবিশ

আমি তিউনিসে বাস করেছি এক বছর। যদিও অনেকবার ফিরে গেছি সেখানে, কিন্তু আমি কবিতায় ব্যবহারযোগ্য যেসব অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছি, সেই অর্থে তিউনিসে বাস করি নি। কায়রোর ক্ষেত্রেও একই কথা খাটে। আমি সেখানে বেশিদিন ছিলাম না। ষাট দশকের শেষ দিকে অধিকৃত এলাকা ছেড়ে আসার পর আরব বিশ্বের সঙ্গে আমার প্রথম সাক্ষাৎ কায়রোকে দিয়েই। মিশর তখনও যুদ্ধ পরবর্তী পরিস্থিতির মধ্যে ছিল এবং তার রাজনৈতিক অবস্থা স্থিতিশীল হয় নি। সে জন্য সেখানকার অবস্থান জীবন বা কাব্য-অভিজ্ঞতা হওয়ার মতো যথেষ্ট প্রভাবশীল ছিল না। কিন্তু আমি বৈরুতে বাস করেছি অনেক বছর, বেশিরভাগ গৃহযুদ্ধের সময়। তাই আমি বলতে পারি সেখানকার অভিজ্ঞতা আরও কঠিন এবং একইসঙ্গে কায়রো বা তিউনিসের তুলনায় অধিকতর স্বচ্ছ। আমার সেখানে অবস্থানকালে বৈরুত ছিল সংলাপের একটা মঞ্চ ও কারখানাস্বরূপ। এটা এমন একটা নগরী যেখান থেকে গোটা আরব জাহানে বই রফতানি হতো এবং সেটা ছিল অসংখ্য এবং ভিন্ন ভিন্ন ধরনের মানবীয় সম্পর্কের উন্মুক্ত স্থান। এখনও আমি যখন আমার নিজের কাব্য-পরিস্থিতি নিয়ে গভীরভাবে ভাবি, আমার বৈরুত-অভিজ্ঞতার ইতিবাচক দিকগুলোকে শনাক্ত করি, অর্থাৎ কবিতা এবং সাধারণভাবে আরবি সাহিত্যের বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষাকে বিবেচনা করি, তখন আমি বলতে পারি বৈরুত পর্ব সিদ্ধান্তমূলক ক্রান্তিকাল ছিল না। তার সরল কারণ হচ্ছে ওই সব বিশৃঙ্খলা, রক্তপাত এবং গোলমাল কবিকে কবিতার অবস্থা নিয়ে ভাবার মতো যথেষ্ট সময় দেয় নি। সে জন্য যখনই বৈরুতে রচিত কবিতাগুলোর দিকে তাকাই, তখনই আমার মনে হয়, এগুলোর বেশিরভাগকেই অতিক্রম করা যেত।

মুসাভি

কবি বরিস লেয়োনিদভিচ পাস্তেরনাক বলেছেন, সত্যিকার কবিতা হলো সেটাই, যাকে গদ্যে লেখা সম্ভব। আপনার কবিতায় গদ্য ও পদ্য সমান জায়গা পেয়েছে। একজন কবি হিসেবে গদ্যের সঙ্গে আপনার সম্পর্কটা কী রকম বলে আপনি মনে করেন?

মাহমুদ দারবিশ

কবিতা হচ্ছে অন্য সব প্রকাশযোগ্য শিল্পের জনক। অন্য সব মৌখিক শিল্প, বিশেষত গদ্যের সঙ্গে, কবিতার সংলাপ একটা চলমান ব্যাপার। গদ্য সবসময় কবিতার উপর নজর রাখে। আর সেটা ঘটলেই কবিতা উৎকর্ষ অর্জন করে। কবিতা মহত্ত্ব অর্জন করে তখন, যখন সে দৃষ্টি দেয় গদ্যের প্রতি, বিশেষভাবে তার সরলতার দিকে, তাকে নিয়ন্ত্রণকারী অনমনীয় নিয়ম-কানুনকে চ্যালেঞ্জ করে বা পেছনে ফেলে রেখে। সুতরাং কবিতা ও গদ্যের ভেতর পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের জায়গা আছে। উভয়েই প্রত্যেকের কাছ থেকে কোনো না কোনোভাবে উপকৃত হয়।

আমার মনে হয়, গদ্য ও পদ্যের মধ্যে সীমানা টানা খুব সূক্ষ্ম ব্যাপার। তাদের মধ্যকার পার্থক্য টানা স্বেচ্ছাচারমূলক। মহৎ কবিতা হচ্ছে সেটা, যার ভেতর আছে গদ্যের অভিজাত স্বাধীনতা। কারণ গদ্য হচ্ছে উৎকর্ষের বিচারে অভিজাত শিল্প। আমার ক্ষেত্রে যা হয়েছে, আমি মনে করি আমার সাম্প্রতিক কবিতাগুলো গদ্যের সঙ্গে সংলাপস্বরূপ। টমাস স্টার্ন এলিয়টের ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছিল, এই বিবেচনায় তিনি সকলের গুরু। গদ্যের সঙ্গে সংলাপ ব্যতিত কোনো কবিতার উদ্ভব ঘটতে পারে এবং উল্টোটাও সত্যি। চাই সে সংলাপ ইতিবাচক বা নেতিবাচক যাই হোক। ঠিক একজন নর এবং একজন নারীর সম্পর্কের ক্ষেত্রে যা ঘটে থাকে। এই সম্পর্কের বিচারে কবিতা হচ্ছে নারী আর গদ্য হচ্ছে পুরুষ।

মুসাভি

আপনি অনেক সময় বলেন, ‘কবিরা কেন প্রান্তবর্তী হয়ে পড়ার ভয় করে, তারা কি জানে না যে তারা প্রাকৃতিকভাবেই প্রান্তিক।’ আপনার এই কথার একটু ব্যাখ্যা করবেন?

মাহমুদ দারবিশ

কবিতার ক্রম হ্রাসমান ভূমিকা নিয়ে অনেক কথা হয়েছে। কিন্তু আমরা জানি, একেবারে শুরু থেকেই কবিতায় আভিজাত্যের ব্যাপার ছিল। যুগ যুগ ধরে কবিতা অনেক সঙ্কটে হাওয়া দিয়েছে। আর এখন যে সঙ্কটের মধ্য দিয়ে কবিতা পথ অতিক্রম করছে তাও নতুন নয়। কবিতার সঙ্কট বলতে আমি কবিতার বিকাশের শর্তাবলিকে বোঝাচ্ছি। সঙ্কটটা নির্দিষ্টভাবে এই যে, সেটা কবিতাকে তার উপাদান, প্রকাশভঙ্গি, আঙ্গিক এবং পাঠকের সঙ্গে তার সম্পর্কের উৎকর্ষ সাধনে কী সাহায্য করছে। সমাজে কবির অবস্থান কী হবে, সে সম্পর্কে অভিযোগ উত্থাপন করা আমাদের বন্ধ করতে হবে। আমি কবিতার অবস্থান বিন্দুর পশ্চাদপসরণকে স্বাগত জানাই। অন্তত আরব বিশ্বকে। কারণ আমরা যাত্রা শুরু করেছি পশুপালন ও কৃষিজীবী সমাজ থেকে। থিয়েটার, চলচ্চিত্র বা উপন্যাসের মতো অন্যান্য শিল্পে কী বিকাশ ঘটছে তার উপর আমাদের অবশ্যই পক্ষপাতমূলক দৃষ্টিক্ষেপ করতে হবে। যখন সব শিল্পমাধ্যমেই উৎকর্ষ সাধিত হয়, কেবল তখনই তা সমাজের উপকারে লাগে।

যাই হোক, আমি বিশ্বাস করি না যে কবিতার অবস্থান সর্বদাই প্রাধান্যশীল। কেউ যেমন সেই বিখ্যাত মন্তব্য দিয়ে উপসংহার টানতে পারে—‘আরবদের সবচেয়ে উৎকর্ষশীল শিল্প হচ্ছে কবিতা।’ ইসলাম-পূর্ব যুগে আরবদের ছিল ইমরুল কায়েসের মতো কবি। এসবের মধ্যে নতুন যে বিষয়টি সেটা হলো, কবিতার শ্রেষ্ঠত্ব, তার সম্মোহনী তাড়না এবং উচ্চস্তরের বাগ্মিতার কবল থেকে আমাদের মুক্ত হওয়া উচিত। কবিতা আমাদের সকল সমস্যা ও সঙ্কটের সমাধান এনে দেবে, এরকম ভাবনাও আমাদের অবশ্যই পরিত্যাগ করতে হবে।


লেখার জন্য সবচেয়ে ছোট জায়গাটি সবচেয়ে বেশি উপযোগী।


মুসাভি

আপনি একবার বলেছিলেন যে, ‘বিংশ শতাব্দীর মতো আর কোনো শতাব্দীতেই এত অধিক সংখ্যক মহান কবির জন্ম হয় নি।’ কেন এই কথা বলেছেন? যদি এ সম্পর্কে একটু বলেন।

মাহমুদ দারবিশ

হাঁ, আমি বলেছি ‘বিংশ শতাব্দীর মতো আর কোনো শতাব্দীতেই এত অধিক সংখ্যক মহান কবির জন্ম হয় নি।’ কারণ এই শতাব্দীতে, তার উৎপীড়ন, তার যুদ্ধ, অসংখ্য রক্তঝরা সংঘর্ষ, এযাবৎকালের ইতিহাসের সবচেয়ে বৃহৎ সাম্রাজ্যগুলোর উত্থান ও পতন, শতাব্দীর সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনা ফিলিস্তিনি ট্র্যাজেডি, তার বর্ণবাদ ও স্বৈরতন্ত্র, এসব সত্ত্বেও এই শতাব্দীতে অনেক সংখ্যক কবির সমাহার ঘটেছে। এই শতাব্দী যেমন যুদ্ধ, ধ্বংস, ট্র্যাজেডি এবং অশ্রুর শতাব্দী; এটা যেমন সত্যি, তেমনই এটাও ঠিক যে এটা কবিদের উৎকর্ষের শতাব্দী। সুতরাং আমরা এই শতাব্দীকে অভিশাপ দিতে পারি না।

মুসাভি

ফিলিস্তিনে বসে আপনি যখন কোনো কবিতা পড়েন, আবার আরবের অন্য কোথাও বসে কবিতা পড়েন, তখন কোনো তফাত টের পান?

মাহমুদ দারবিশ

আমার কাছে মনে হয়, আরব বললে চারপাশটা বেশ বড় লাগে। কিন্তু ফিলিস্তিনে এসব উদ্‌যাপনের কোনো সুযোগ নেই। ফলে সেখানে এমন অত্যাচার-নিপীড়নের মধ্যে কবিতা মানুষের কাছাকাছি আসতে পারে না। কিন্তু আরব বিশ্বে ঘটনাটি আলাদা। এজন্য কাউকে দোষ দিচ্ছি না। লেবাননের বৈরুতে ২৫ হাজার মানুষের সামনে কবিতা পড়েছি। অথচ ফিলিস্তিনে এক শহর থেকে অন্য শহরে যেতেও বাধা পেতে হয়। তাই এত মানুষকে এক সঙ্গে কবিতার কাছাকাছি আনা আসলেই খুব কঠিন। এর উপর এসব করার সুযোগই কতটা দেবে ইসরায়েলি সৈন্যরা।

মুসাভি

আচ্ছা, কবিদের জন্য কোথায় থাকা সহজ? প্যারিস, নাকি রামাল্লার মতো নীরব-নিথর গ্রামে?

মাহমুদ দারবিশ

অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানের জন্য আমার রামাল্লা ভালো। যদিও লেখালিখির জন্য গ্রাম কিছুটা মনোযোগ নষ্ট করে দেয়, তবুও লেখার জন্য সবচেয়ে ছোট জায়গাটি সবচেয়ে বেশি উপযোগী।

আদিল মাহমুদ

জন্ম ২০ ডিসেম্বর; ভাটিদিহি, কানাইঘাট, সিলেট।

শিক্ষা : ইসলামি আইন ও ফিকাহ শাস্ত্র, জামিয়া ইকরা বাংলাদেশ। আরবি ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর, জামিআ ইকরা বাংলাদেশ।

পেশা : শিক্ষক ও সাংবাদিক।

ই-মেইল : adilmahmud85@gmail.com

Latest posts by আদিল মাহমুদ (see all)