হোম সাক্ষাৎকার মশিউল আলমের সঙ্গে এক চিলতে আলাপ

মশিউল আলমের সঙ্গে এক চিলতে আলাপ

মশিউল আলমের সঙ্গে এক চিলতে আলাপ
1.76K
0

মশিউল আলম বাংলাদেশের প্রথিতযশা কথাসাহিত্যিক। দশকীয় বিবেচনায় তিনি নব্বইয়ের দশকের লেখক। পেশায় সাংবাদিক। ফলে গল্প-উপন্যাসের বাইরে নিয়মিত কলাম লিখে থাকেন। বিভিন্ন অনুবাদ ও ননফিকশন ধারার রচনাতেও তার সমান আগ্রহ। অতি-সম্প্রতি তার একটি গল্প (দুধ) শবনম নাদিয়ার অনুবাদে (Milk) কলম্বো-ভিত্তিক ওয়েব ম্যাগাজিন ‘হিমাল’ আয়োজিত ‘শর্ট স্টোরি কম্পিটিশন ২০১৯’-এ সেরা নির্বাচিত হয়েছে। আমাদের বিশেষ আনন্দ এই যে, গল্পটি বছর খানেক আগে প্রকাশিত হয় ‘পরস্পর’ ওয়েবম্যাগে।

মশিউল আলম ও শবনম নাদিয়ার এই যৌর্থ অর্জনে তাদের অভিনন্দন। আমরা পরস্পরের পক্ষ থেকে চেয়েছি তাদের সঙ্গে দুএক মুহূর্তের অনলাইন আড্ডা দিতে। সেই ইচ্ছাতেই এ পর্যায়ে গল্পকারের মুখোমুখি হওয়া।

এই সাক্ষাৎকারটি নেয়া হয়েছে ফেসবুক ম্যাসেঞ্জারের মাধ্যমে। আলাপ হয়েছে লিখে লিখে—বাসে যেতে যেতে, ক্লাসের করিডোরে হাঁটতে হাঁটতে, এমনকি টয়লেটে বসে বসে। অন্য তরফেও সেই একই অবস্থা বলে অনুমান করি। আশা করি এই সাক্ষাৎকার যারা পড়বেন, তাদের দশাও হবে তথৈবচ।

–  গালিব

সোহেল হাসান গালিব

আপনাকে প্রথমেই অভিবাদন জানাই, হিমাল সাউথেশিয়ান শর্ট স্টোরি কম্পিটিশন ২০১৯-এ আপনার গল্পটি সেরা গল্প হিশেবে নির্বাচিত হবার জন্য। কেমন লাগছে আপনার?

মশিউল আলম

ধন্যবাদ। আমার ভালো লাগছে। আমি আনন্দিত।

সোহেল হাসান গালিব

আমাদের অনেকেরই কৌতূহল, ঘটনাটা কিভাবে ঘটল? মানে প্রক্রিয়াটি কী ছিল? নাদিয়ার কাছে শুনলাম, উনি পরস্পরেই প্রথম গল্পটি পড়েন। তারপর তিনি যে অনুবাদ করছেন, সেটি কি আপনি জানতেন? গল্পটি হিমাল কর্তৃপক্ষের কাছে কে পাঠিয়েছিলেন?

মশিউল আলম

আমি এটা জানতাম না যে শবনম নাদিয়া আমার এই গল্পটা (দুধ) আগে পড়েন নি, পরস্পরেই প্রথম পড়েছেন। তিনি আমার ২টা গল্প আগে অনুবাদ করেছেন, সেগুলো বিদেশে প্রকাশের ব্যবস্থা করেছেন। ‘দুধ’ গল্পটাও অনুবাদ করবেন এটা আমাকে বলেছিলেন। কিন্তু এত দ্রুত করবেন তা ভাবি নি।

হিমাল সাউথেশিয়ান শর্ট স্টোরি কম্পিটিশনের কথা আমি জানতাম না। শবনম নাদিয়াই আমাকে জানিয়েছেন এবং সেখানে ‘দুধ’ গল্পটা সাবমিট করার পরামর্শ দিয়েছেন। লেখককেই গল্প সাবমিট করতে হয়, এটাই নিয়ম। আমি সাবমিট করে শবনম নাদিয়াকে জানালে তিনি মেইলে আমাকে লিখেছিলেন—’দেখা যাক কী হয়’।

সোহেল হাসান গালিব

এবার গল্পটি সম্পর্কে কিছু শুনতে চাই। কবে লিখেছিলেন এটি?

মশিউল আলম

গল্পটা লেখা হয়েছে অনেক আগে, ১৯৯৪ সালে, আমার প্রথম গল্পগ্রন্থ রূপালী রুই ও অন্যান্য গল্প প্রকাশিত হওয়ার পরপরই। এটা আমার দ্বিতীয় গল্পগ্রন্থ মাংসের কারবার-এর অন্তর্ভুক্ত। মাংসের কারবার মাওলা ব্রাদার্স থেকে প্রকাশিত হয়েছে ২০০২ সালে।

Mangsher Karbarগল্পটা উত্তরবঙ্গের একটা গ্রামের পটভূমিতে লেখা। আমার ছেলেবেলায় দেখা গ্রাম, সেখানকার প্রকৃতি ও মানুষদের নিয়ে লেখা। শবনম নাদিয়া যখন বলেছিলেন, তিনি গল্পটা ইংরেজিতে অনুবাদ করবেন, তখন আমার মনে প্রশ্ন জেগেছিল, অন্য দেশের পাঠকের কাছে গল্পটা কেমন লাগবে। পুরস্কার পাওয়ার পর বুঝলাম, এর মধ্যে এমন কিছু ইউনিভার্সাল হিউম্যান এলিমেন্ট আছে, যা সব ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষই কমবেশি বুঝবে, অনুভব করবে। প্রতিযোগিতার বিচারকেরা তাঁদের সাইটেশনে গল্পটার চিরন্তন মানবিক উপাদানগুলোর কথাই উল্লেখ করেছেন। বিশেষভাবে প্রশংসা করেছেন অনুবাদের।

সোহেল হাসান গালিব

অনুবাদ আপনি নিজেই করেন না কেন? যেহেতু আপনি ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র।

মশিউল আলম

আমি সাহিত্য পড়ার জন্য রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়র ভর্তি হয়েছিলাম। কিন্তু এক বছর পরেই সাংবাদিকতা পড়তে গিয়েছিলাম মস্কো। রুশ ভাষা শিখে সেই ভাষাতেই মাস্টার্স পর্যন্ত পড়েছি।

এখন ইংরেজি আমি জানি; যোগাযোগের প্রয়োজনে লিখতে ও পড়তে পারি এ ভাষায়। কিন্তু কথাসাহিত্য অনুবাদ করার জন্য ভাষা যেমন ন্যাচারাল হতে হয়, আমার ইংরেজি সেরকম নয়।

সোহেল হাসান গালিব

ভালো এবং বেশি পরিমাণে অনুবাদের অভাবেই কি আমাদের সাহিত্য বাইরে ফোকাসড হচ্ছে না?

মশিউল আলম

আমি ঠিক জানি না। আমাদের কার কোন গল্প-উপন্যাস অনুবাদের ছাঁকনি পার হওয়ার পর কতটা কী থাকবে আমি জানি না। তবে আমাদের সাহিত্য অবশ্যই বেশি বেশি অনুবাদ হওয়া উচিত; অন্য ভাষার, অন্য সংস্কৃতির পাঠকের কাছে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা উচিত। সমস্যা হলো, আমাদের দেশে যাঁরা ইংরেজি ভাষাটা সাহিত্য অনুবাদ করার জন্য প্রয়োজনীয় মাত্রায় জানেন, তাঁদের সঙ্গে সম্ভবত এদেশের সাধারণ মানুষের, সাধারণ সংস্কৃতির যোগাযোগ গভীর নয়। কোনো দেশের কথাসাহিত্য অনুবাদ করার জন্য সেই দেশের মানুষ ও সংস্কৃতি সম্পর্কে ভালো ধারণা থাকা উচিত বলে আমার মনে হয়। শবনম নাদিয়া আমার যে-কটা গল্প অনুবাদ করেছেন, সেগুলো আমার ভালো লাগার কারণ, তিনি আমার গল্পের লোকাল কালারগুলো ঠিকঠাকভাবে তুলে আনতে পেরেছেন। পেরেছেন এ জন্য যে তাঁর জন্ম ও বেড়ে ওঠা এদেশেই, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন এদেশেই। আর তিনি নিজে ফিকশন লেখেন বলেই হয়তো তাঁর পর্যবেক্ষণ খুব তীক্ষ্ণ। আমাদের দেশে তাঁর মতো আরও অনুবাদক দরকার।

সোহেল হাসান গালিব

অনুবাদের জন্য এখন যদি আপনার কোনো একটি উপন্যাস বেছে নিতে বলা হয় সেক্ষেত্রে আপনি কোনটিকে অগ্রাধিকার দেবেন?

মশিউল আলম

প্রথমে চাইব যেভাবে নাই হয়ে গেলাম অনূদিত হোক। এই উপন্যাসিকায় এই সময়ের বাংলাদেশের বাস্তবতার চাপটা ভীষণভাবে আছে। তবে ওটা নিয়ে আরেকটু কাজ করতে হবে। অনুবাদের জন্য ঘোড়ামাসুদ আমার দ্বিতীয় অগ্রাধিকার। জুবোফস্কি বুলভার অনূদিত হলে পড়তে কেমন লাগবে এ নিয়ে আমি কৌতূহলী।


প্রথম গল্পগ্রন্থের প্রায় সব গল্পই মস্কোর গণমৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছয় বছরের ছাত্রাবস্থায় লেখা।


সোহেল হাসান গালিব

রুশ ভাষা ও সাহিত্যের সঙ্গে আপনার তো একটা নিবিড় পরিচয় ঘটেছে। কথাসাহিত্যের প্রতি ঝোঁকটা কি রুশ দেশে যাবার পরে ঘটেছে, নাকি দেশে থাকতেই আপনি লিখতেন?

মশিউল আলম

রুশ সাহিত্যের প্রতি আমার আগ্রহ ও অনুরাগ তৈরি হয়েছে সোভিয়েত ইউনিয়নে যাওয়ার আগেই, বাংলায় অনূদিত রুশ গল্প-উপন্যাস পড়তে পড়তে। আমার ছেলেবেলায় সোভিয়েত ইউনিয়নের ‘প্রগতি’, ‘রাদুগা’, ‘নাউকা’—এসব প্রকাশনা সংস্থার প্রকাশিত বাংলায় অনূদিত অনেক বই এদেশে খুব সহজলভ্য ছিল। আমার সেগুলো পড়ার সুযোগ হয়েছিল খুব ছেলেবেলাতেই।

আমার গল্প লেখার শুরু স্কুলজীবনে, মস্কো যাওয়ার অনেক আগেই। কলেজ-জীবনে ভালোভাবে প্রস্তুতি নেওয়া শুরু হয়। মস্কো যাওয়ার পরে লেখা চলতে থাকে। প্রথম গল্পগ্রন্থের প্রায় সব গল্পই মস্কোর গণমৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছয় বছরের ছাত্রাবস্থায় লেখা। কিন্তু সব গল্পের বিষয়, ঘটনা, পটভূমি বাংলাদেশের। মস্কো বসবাসকালে আমি সেই দেশের পটভূমিতে একটা গল্পও লিখি নি; ভাবনাতেই আসে নি। কিন্তু ১৯৯৩ সালে দেশে ফিরে আসার পর থেকে সোভিয়েত ইউনিয়ন নিয়েই সবচেয়ে বেশি লেখার কথা ভাবনায় এসেছে, কিছু কিছু লিখেছি। আমার প্রথম লেখা উপন্যাস তনুশ্রীর সঙ্গে দ্বিতীয় রাত-এর পটভূমি সোভিয়েত ভাঙনের সময়ের মস্কো।

At Moscow with a Lebanese Roommate 1988
১৯৮৮ সালে মস্কোর গণমৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ের হোস্টেলে লেবানিজ রুমমেট মোহাম্মদ হার্বের সঙ্গে

সোহেল হাসান গালিব

আপনার প্রথম লেখার অভিজ্ঞতাটা একটু বলুন।

মশিউল আলম

প্রথম লেখার অভিজ্ঞতা স্মরণ করতে পারি না, সম্ভবত ক্লাস সেভেনে পড়ার সময় গল্প/স্কেচ জাতীয় কিছু লিখেছিলাম।

সোহেল হাসান গালিব

আপনার গল্পের ক্ষেত্রে একটা ব্যাপার লক্ষ করি, এগুলো শুরু হয় খুব রিয়ালিস্টিক জায়গা থেকে, শেষ হয় আনরিয়াল, আনন্যাচেরাল মোমেন্টাম তৈরির মধ্য দিয়ে। একটা কাব্যিক মীমাংসা আপনি খুঁজে নেন। মীমাংসা না বলে বোঝাপড়াও বলা যেতে পারে। এটা কেন হয়?

মশিউল আলম

আপনি যা বললেন, আমার অনেকগুলো গল্প সেরকম। ফ্যাকচুয়াল রিয়ালিটির রিপ্রডাকশন এড়িয়ে ইন্দ্রিয়জ–প্রত্যক্ষণের জগৎকে অতিক্রম করে নতুন, অন্য রকমের এক জগৎ নির্মাণ করার চেষ্টা এগুলো।

এরকম কেন হয়, তা বলতে গেলে নির্দিষ্ট গল্প ধরে ধরে বলতে হবে। কারণ বিভিন্ন গল্পে এটা ঘটেছে বিভিন্নভাবে, বিভিন্ন কারণে। কখনো কখনো ইচ্ছাপূরণের গল্প হয়ে যায়। ইচ্ছা করেই আমি কয়েকটা ইচ্ছাপূরণের গল্প লিখেছি, জাস্ট দেখার জন্য যে কেমন লাগে, কী মনে হয়। দেখেছি ভালোই লাগে। এরকম একটা গল্পের নাম ‘পাখিরা’। একদম বানোয়াট গল্প, একেবারেই অসম্ভব। কিন্তু কেউ কেউ পড়ে আমাকে জিগ্যেস করেছে, ঘটনা সত্য নাকি? কবে ঘটল?

আমার এই ধরনের ননরিয়ালিস্টিক গল্পের অতিবাস্তব অংশটা আমি এমনভাবে নির্মাণ করার চেষ্টা করি, যাতে আমার নিজের মনে যে ব্যাখ্যাটা থাকে, তার কোনো ইঙ্গিত যেন পাঠককে চালিত না করে। আমি পাঠকের নিজের মতো করে ব্যাখ্যা করার বা বুঝে নেওয়ার সুযোগ রেখে দেওয়ার চেষ্টা করি।

সোহেল হাসান গালিব

আমার মনে হয় এই উত্তরটুকুই যথেষ্ট। এই সূত্র ধরে একটা অন্যরকম প্রশ্ন করি। গল্পের মধ্যে কী ঘটলে পাঠক হিশেবে আপনার মন বিদ্রোহ করে বসে? ক্রাফট এবং কনটেন্টের জায়গা থেকে আপনার চয়েসটা বুঝতে চাইছি।

মশিউল আলম

লেখক হিসেবে যেমন, পাঠক হিসেবেও তেমন, আমি ভান অপছন্দ করি। গল্পে ভান বা মেকিত্ব টের পেলে আমার বিরূপ প্রতিক্রিয়া হয়। গল্পের ভাষায়, অর্থাৎ বাক্যগঠনে ও শব্দ-ব্যবহারে কাব্যিকতাও আমার অপছন্দ। আর সামগ্রিকভাবে গল্পের ক্রাফট ও কনটেন্টের সাজুয্য আমার লক্ষ্য। সেটাই আমি করার চেষ্টা করি। কনটেন্টের দিকে তাকিয়ে সিদ্ধান্ত নিই, ক্রাফট কেমন হলে গল্পটার সাজুয্য নিশ্চিত হতে পারে। আমার কাছে বয়ানের সুর খুব গুরুত্বপূর্ণ। বয়ানকারীর পয়েন্ট অব ভিউও খুব গুরুত্বপূর্ণ।

সোহেল হাসান গালিব

সাম্প্রতিক, স্বাধীনতা-পরবর্তী প্রজন্মের কাদের লেখা আপনার ভালো লাগে? কয়েকজনের নাম বলবেন কি?

মশিউল আলম

সব লেখকের সব লেখা ভালো লাগে না। কারো কারো কোনো কোনো গল্প ভালো লেগেছে। নাম না বলি।


লেখালেখির সূত্রেই আমার বন্ধুত্বের সূচনা ঘটেছে যাঁর সঙ্গে, তিনি শবনম নাদিয়া। এই অর্থে বলতে পারি, আমার একজন লেখকবন্ধু আছেন।


সোহেল হাসান গালিব

ঠিক আছে। এইটা অন্তত বলুন, আপনার বন্ধুলেখক কারা? মানে একটা গল্প লেখার পর কাদের সঙ্গে প্রথম শেয়ার করেন? কাদের মতামত বা পরামর্শ আমলে নেন? আপনার সার্কেলটা একটু জানতে চাইছি।

মশিউল আলম

আমার বন্ধুদের কেউ লেখক ব’লে বন্ধু নয়। সেই অর্থে আমার কোনো লেখকবন্ধু নেই। আমি লিখি, আমার বন্ধুও লেখে—এরকম বন্ধু আছে। দুর্ভাগ্যের বিষয়, আমি গল্প লিখে কোনো বন্ধুকে পড়তে দিলে সে আগ্রহের সঙ্গে সেটা পড়বে এবং মন্তব্য করবে, পরামর্শ দেবে, এমন বন্ধু সম্ভবত নেই। ভয় হয়, এরকম চেষ্টার মানে হবে বন্ধুকে পীড়া দেওয়া, বিব্রত করা।

লেখকসমাজে আমার যে সব বন্ধু আছে, তাদের অধিকাংশ আমার খুব কম সংখ্যক লেখা পড়েছে। সবচেয়ে কম পড়েছে সবচেয়ে কাছের বন্ধুরা।

‘দুধ’ গল্পটা পুরস্কৃত হওয়ার পর খুব কাছের বন্ধুদের কয়েকজন সেটা পড়লেন, কেউ কেউ আমার কাছে কপি চাইলেন। অথচ এটা ২৫ বছর আগে লেখা গল্প।

তবে সম্প্রতি সাহস করে আমি দুয়েকজন বন্ধুকে দুয়েকটা গল্প পড়তে দিয়ে মন্তব্য-পরামর্শ চেয়েছি। তাঁরা আমাকে বিমুখ করেন নি। আর আমার গল্পের ইংরেজি অনুবাদক, যুক্তরাষ্ট্র-প্রবাসী শবনম নাদিয়ার সঙ্গে অনুবাদের সময় ই-মেইলে চিঠি চালাচালির সময় তিনি নিজে থেকেই আমার বেশ কয়েকটা গল্প পড়ার জন্য চেয়ে নিয়েছেন। আর, একটা গল্প লেখার প্রক্রিয়ায় তাঁর সঙ্গে খুব ভালো রকমের সলা-পরামর্শ হয়েছে। তিনি শুধু অনুবাদক নন, ভালো একজন গল্পলেখকও; উপরন্তু তিনি ক্রিয়েটিভ রাইটিংয়ে পড়াশোনা করেছেন, নিজেও পড়িয়েছেন। গল্প লেখার কলাকৌশল, যেটার ওপর এখন আমি সবচেয়ে বেশি জোর দিই, সেই ক্ষেত্রে ওই গল্পটা লেখার সময় তিনি আমাকে খুব সহযোগিতা করেছেন। একই গল্পের পর পর ৪টা খসড়া তিনি পড়েছেন এবং পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁর প্রতি আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। লেখালেখির সূত্রেই আমার বন্ধুত্বের সূচনা ঘটেছে যাঁর সঙ্গে, তিনি শবনম নাদিয়া। এই অর্থে বলতে পারি, আমার একজন লেখকবন্ধু আছেন।

সোহেল হাসান গালিব

বলা হয়ে থাকে, বাংলাদেশের কবিতা যতটা বিকশিত হয়েছে, গল্প ততটা নয়। আপনিও কি তাই মনে করেন? এ ব্যাপারে আপনার কী পর্যবেক্ষণ?

মশিউল আলম

আমারও তাই মনে হয়। এই সময়ের যত কবির কবিতা আমি উপভোগ করি (তাঁদের সংখ্যা বেশি নয়), ততজন গল্পকার নেই, যাঁদের কোনো কোনো গল্প আমার ভালো লেগেছে। বাংলাদেশের এই সময়ের ছোটগল্পের অবস্থা কবিতার মতো সৃজনশীল নয়।

With Dwijen Sharma
দ্বিজেন শর্মার সঙ্গে তাঁর সিদ্ধেশ্বরীর বাসায়

সোহেল হাসান গালিব

এই অবস্থার কারণ কী? আমাদের জীবনে কি নাটকীয়তা কম? নাকি গল্প বলাটা আমাদের ধাতে নেই? আমাদের আছে শুধু ভাবুকতা?

মশিউল আলম

আমাদের জীবন তো নাটকীয়তায়, উত্তেজনায়, বিভীষিকায়, উন্মাদনায় ভরপুর। আমার তো ভীষণ স্ট্রেসফুল মনে হয়। কিন্তু সাহিত্য সৃষ্টির জন্য এইসব অপরিহার্য নয়।

গল্প বলাটা আমাদের ধাতে আছে। বরং ভাবুকতাই কম বলে আমার মনে হয়। গভীর চিন্তার দেখা তো পাই না। চিন্তা আসে বাইরে থেকে, বাইরের চিন্তার দিকে আমরা চেয়ে থাকি।

কিন্তু গল্প আমরা আমাদের মতো করে বলতে পারি। বলতে। লিখতে নয়। কিন্তু আধুনিক কথাসাহিত্য ওরাল আর্ট লয়, রিটেন আর্ট। কোনো গল্প পড়তে পড়তে যদি মনে হয় যে গল্পটা যেন মুখে বলা হচ্ছে, এবং আমি তা উপভোগ করছি, তবু সেই গল্পের লেখক একজন সুদক্ষ গল্পলেখক। লেখকই, কথক নন।

এইখানে, মানে লিখে গল্প বলার কলাকৌশলে আমাদের এই সময়ে ঘাটতি দেখতে পাই। বিরাট ঘাটতি।

কিন্তু বাংলা কথাসাহিত্যে বঙ্কিম-রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে আমাদের ৭০-৮০ পর্যন্ত গল্প বলার একটা সাবলীল ধারা ছিল। সেই ধারাটা ক্ষীণ হয়ে গেছে। এখনকার ছোটগল্পের চেহারা খাপছাড়া লাগে আমার। এমন গল্পের দেখা পাই খুবই কম যার অভিঘাত ভালোভাবে অনুভব করা যায়, যা পড়ে মনের মধ্যে কিছু ঘটে। অধিকাংশ গল্প পড়ে শেষ করতে কষ্ট হয়। পড়া গল্পগুলোর অধিকাংশই মনে থাকে না।

আমার ধারণা এটা ঘটেছে প্রস্তুতি না নিয়ে ক্রাফটের নিরীক্ষা করতে গিয়ে। ছোটগল্পে গল্প থাকবে না/ গল্পই মুখ্য হবে না—এই রকমের ভাবনা থেকে গল্প লিখতে গিয়ে গল্প বলার সেই সাবলীল কৌশলটা প্রথমে ত্যাগ করা হয়েছে, পরে ভুলে যাওয়া হয়েছে।

কিছু গল্পলেখক আইডিয়ানির্ভর গল্প লেখেন, কিন্তু তাঁদের অধিকাংশই আইডিয়া এক্সিকিউট করার ন্যারেটিভ বাহন সৃষ্টি করতে পারেন না, তখন তাঁরা ভাবুকতার আশ্রয় নেন। যে ভাবুকতার কথা আপনি বললেন, সেটা আমি এই ক্ষেত্রে দেখতে পাই। গল্পের পরতে পরতে দার্শনিক বাক্যের দেখা মেলে। অর্থহীন কাব্যিপনার দেখা মেলে।

আইডিয়ানির্ভর গল্প অবশ্যই লেখা যায়, পৃথিবীতে অনেক লেখা হয়েছে। অনেক গল্পলেখক প্রথমে একটা আইডিয়া পান, তারপর সেই আইডিয়ার বাহন হিসেবে একটা জুতসই গল্প বা গল্পাংশ নির্মাণ করেন। বোর্হেস তা-ই করেছেন। পেটার বিকসেলও অনেক গল্পে তা করেছেন।


এমন হয়েছে কি, আত্মীয়স্বজন গল্পের মধ্যে আপনাকে বা তাদের নিজেদের প্রতিচ্ছবি খুঁজে পেয়ে আহত, ক্ষুব্ধ বা বিরক্ত হয়েছে? বিশেষত প্রেমের গল্পে?


সোহেল হাসান গালিব

গল্প বা উপন্যাস লিখতে গিয়ে পারিবারিক বাধা অনুভব করেছেন কখনো? মানে, এমন হয়েছে কি, আত্মীয়স্বজন গল্পের মধ্যে আপনাকে বা তাদের নিজেদের প্রতিচ্ছবি খুঁজে পেয়ে আহত, ক্ষুব্ধ বা বিরক্ত হয়েছে? বিশেষত প্রেমের গল্পে?

মশিউল আলম

উপন্যাস-গল্প কোনো কিছু লিখতে গিয়েই আমি কখনো কোনো পারিবারিক বাধা অনুভব করি নি। বরং খুব সহযোগিতা পেয়েছি। আমার স্ত্রী মৌরী তানিয়া ইরা আমার পুরো সংসারের ভার নিজের কাঁধে নিয়েছেন আমার লেখালেখির সুবিধা করে দেওয়ার জন্য। সাংসারিক দিক থেকে আমি প্রায় অকর্মা ধরনের মানুষ; আমার দুই ছেলেমেয়ের পড়াশোনার খোঁজও আমি রাখতে পারি না। সবই করেন ওদের মা। তাঁর প্রতি লেখক মশিউল আলমের ঋণ অপরিশোধ্য।

আমি বেশ কিছু গল্প-উপন্যাস লিখেছি, যেগুলোতে নারী-পুরুষের রোমান্টিক সম্পর্কের বিষয় আছে; কয়েকটা গল্প উত্তম পুরুষে লেখা। কিন্তু সেগুলো আমার স্ত্রীকে কখনো বিব্রত করেছে বলে আমার মনে হয় নি। আর আত্মীয়স্বজনেরা আমার গল্প-উপন্যাস পড়েছেন কিনা আমি টের পাই না। কেউ কেউ পড়ে থাকলে তাঁরা আমাকে কিছু বলেন না। সুতরাং কোনো গল্প-উপন্যাসের কোনো চরিত্র নিয়ে তাঁদের বিব্রত হওয়া বা আপত্তি বোধ করার ঘটনা অন্তত আমার জানা নেই।

DSC_0306
পরিবারে সঙ্গে একটি আনন্দময় মুহূর্তে

সোহেল হাসান গালিব

‘রাশিয়ার চিঠি’ না হোক, ‘রাশিয়ার দিনগুলি’ টাইপের কোনো বই কি পাব আপনার কাছ থেকে? হিস্ট্রিকাল বায়োগ্রাফিকাল কোনো ফিকশনের পরিকল্পনা আছে?

মশিউল আলম

আমি যখন রাশিয়া যাই (১৯৮৭), তখন দেশটা ছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন। যখন ফিরে আসি (১৯৯৩) তার দুবছর আগে দেশটা ভেঙে যায়। মস্কো হয় রাশিয়ার রাজধানী। আমি সোভিয়েত ইউনিয়ন দেখেছি, সোভিয়েত-পরবর্তী প্রথম দিনগুলোর রাশিয়াও দেখেছি। কিন্তু আমার মনের মধ্যে প্রবলভাবে রয়ে গেছে সোভিয়েত দিনগুলির স্মৃতি। ফলে আমি যা লিখব, তার বেশিরভাগই হবে সোভিয়েত ইউনিয়নের কথা। হ্যাঁ, একটা উপন্যাস লেখার চেষ্টা আমি করছি, সোভিয়েত ইউনিয়নের সেই দিনগুলো নিয়ে। বহু বছর ধরে চলছে সেই চেষ্টা। খুবই উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা (হয়তো–বা রুশ উপন্যাস পড়ার ফল); সম্ভবত সে কারণেই শেষ করতে পারছি না। লিখছি আর কাটছি প্রায় কুড়ি বছর ধরে। উপন্যাসটার নাম দিয়েছি ‘লাল আকাশ’। আশা করি মৃত্যুর আগে শেষ করতে পারব।

সোহেল হাসান গালিব

এই সময়ে কী ধরনের বইপত্র পড়ছেন?

মশিউল আলম

ফিকশন ও ননফিকশন দুই ধরনের বইপত্রই আমি পড়ার চেষ্টা করি। বেশিরভাগ বিদেশি। বহির্বিশ্বে কেমন গল্প-উপন্যাস লেখা হচ্ছে, সেই কৌতূহল থেকেই এসব পড়ার চেষ্টা। আর ক্লাসিকগুলো বার বার পড়ি। গুন্টার গ্রাসের টিন ড্রাম, জেমস জয়েসের পোর্ট্রেট অব দা আর্টিস্ট অ্যাজ আ ইয়াং ম্যান এ বছর আবার পড়েছি। দস্তইয়েস্কির উপন্যাস নোটস ফ্রম আন্ডারগ্রাউন্ড রুশ থেকে অনুবাদ করছি বছর দুয়েক ধরে, সেটা করতে গিয়ে দস্তইয়েফস্কি সম্পর্কে কিছু ননফিকশনও পড়া হয়েছে।

সোহেল হাসান গালিব

আলোচনা শেষ করব রাজনীতির আলাপ দিয়ে। খুব গুরুতর প্রশ্ন নয়। আমাদের দেশের পার্টিজান পলিটিক্সে আপনার পছন্দের দুতিনটি দিক উল্লেখ করুন।

মশিউল আলম

আমাদের দেশের রাজনীতিতে পছন্দ করার মতো কোনো উপাদান আমি দেখি না। খুবই খারাপ রাজনীতি হচ্ছে এদেশে। রাজনীতির মুখ্য উদ্দেশ্য যখন হয় ব্যক্তিগত ভাগ্যোন্নয়ন, তখন আর তাতে ভালো কিছু থাকে না। রাজনীতি নষ্ট হয়ে যায়। বাংলাদেশের রাজনীতি ভীষণভাবে নষ্ট হয়ে গেছে।

সোহেল হাসান গালিব

অনেক ধন্যবাদ মশিউল ভাই। প্রায় দুদিন আপনাকে এনগেইজড করে রেখেছি অনলাইনে। তবে আমার তরফে এই পদ্ধতিটা বেশ প্রীতিপ্রদ ছিল। ভালো লাগল আপনার জবাব দেবার সাবলীল ভঙ্গিটিও। অনেক অনেক ভালো থাকবেন।

মশিউল আলম

আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ, গালিব। আপনার মনোযোগ আমার জন্য অত্যন্ত আনন্দদায়ক। আপনিও ভালো থাকবেন।

(1762)

গালিব