হোম সাক্ষাৎকার নুরি বিলগ ছেইলানের সঙ্গে আলাপ

নুরি বিলগ ছেইলানের সঙ্গে আলাপ

নুরি বিলগ ছেইলানের সঙ্গে আলাপ
261
0

নুরি বিলগ ছেইলান, সমসাময়িক বিশ্ব-সিনেমার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পরিচালদের একজন—যিনি তার ক্যারিয়ারের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত অপেক্ষাকৃত একটিও খারাপ সিনেমা তৈরি করেন নি। বরং বলা যায়, তিনি সেই সব বিরলপ্রজ পরিচালকদের একজন, যারা নিজেরাই নিজের সাথে তীব্র প্রতিযোগিতা করে এবং নিজের পূর্ববর্তী কাজগুলোকে এমনভাবে ছাপিয়ে যায় যে, আমরা ভাবতে বাধ্য হই, কেবলমাত্র উৎকৃষ্টমানের সিনেমা তৈরির জন্যই বুঝি তাদের জন্ম হয়েছে।

১৯৯৭ সালে নির্মিত তার প্রথম সিনেমা ‘দ্য টাউন’ থেকে শুরু করে ২০১৮ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত তার সর্বশেষ সিনেমা ‘দ্য ওয়াইল্ড পিয়ার ট্রি’, এই দুই দশকের অধিক সময়ে আমরা তাকেও পাই সেভাবেই। পরিচালক হিসেবে তিনি বিশ্বজুড়ে সম্মানিত এবং বলা যায়, সমসাময়িক বিশ্ব-সিনেমার পাঠ তাকে ছাড়া অসম্পূর্ণ।

১৯৫৯ সালে তুর্কির ইস্তানবুলে জন্ম নেয়া এই পরিচালক ইতিমধ্যেই আমাদের উপহার দিয়েছেন ‘দ্য টাউন’ [১৯৯৭], ‘ক্লাউডস অব মে’ [১৯৯৯], ‘ডিসট্যান্ট’ [২০০২], ‘ক্লাইমেটস’ [২০০৬], ‘থ্রি মাংকিস’ [২০০৮], ‘ওয়ান্স আপন এ টাইম ইন এনাটোলিয়া’ [২০১১], ‘উইন্টার স্লিপ’ [২০১৪], ‘দ্য ওয়াইল্ড পিয়ার ট্রি’ [২০১৮] ইত্যাদি অনবদ্য সব সিনেমা, আর পুরস্কার হিসেবে জিতেছেন ৮৮টি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কার, যার মধ্যে শিকাগো ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভাল, বার্লিন ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভাল, এশিয়া প্যাসিফিক স্ক্রিন  অ্যাওয়ার্ডস ও কানস ফিল্ম ফেস্টিভাল উল্লেখযোগ্য এবং ‘ডিসট্যান্ট’-এর পর থেকে তিনি প্রায় নিয়মিতভাবেই কানস-এ পুরস্কার জিতে চলেছেন।

বিএফআই সাউথ ব্যাংক [যা পূর্বে ‘ন্যাশনাল ফিল্ম থিয়েটার’ হিসেবে পরিচিত ছিল আর এটা ‘ব্রিটিশ ফিল্ম ইন্সটিটিউট’ দ্বারা পরিচালিত] এর এক অনুষ্ঠানে ছেইলানের এই দীর্ঘ সাক্ষাৎকারটি নিয়েছিলেন জিওফ এনড্রিও। যেখানে তিনি কিভাবে ফটোগ্রাফি থেকে ফিল্ম মেকিং এ এলেন, কেন সাম্প্রতিক সময়ে আত্মজীবনীমূলক সিনেমা তৈরি থেকে সরে এসেছেন এবং কেন তিনি সে বিষয়ে আর সিনেমা তৈরি করতে চান না ইত্যাদি নানা বিষয়ে বিস্তারিত কথা বলেছেন। নিম্নে তার সাক্ষাৎকারটির ভাষান্তর তুলে ধরা হলো।

—অরণ্য


সা ক্ষা  কা 

1284683_Nuri-Bilge-Ceylan
দ্য টাউন, ১৯৯৭-এর একটি ভিডিও ক্লিপ দেখানোর পর।

জিওফ এনড্রিও

আপনারা যদি সিনেমাটি না দেখে থাকেন, তবে বুঝবেন না, যে বয়স্ক লোকটিকে এখানে দেখানো হয়েছে, তিনি নুরির বাবা এবং বয়স্ক মহিলাটি তার মা। এছাড়া আরও একটি চরিত্রে রয়েছেন তার চাচাত ভাই। আর কোনো আত্মীয় কি রয়েছে এই দৃশ্যে?

নুরি বিলগ ছেইলান

না [শ্রোতাদের হাসি]।

জিওফ এনড্রিও

আমার মনে হয়, নুরির সিনেমায় কোনো ঘনিষ্ঠ বিষয়ের প্রতি আলোকপাত করা তার সিনেমা তৈরির এক ধরনের কৌশল। এই সিনেমাটি তুর্কির ছোট্ট একটি গ্রামে বেড়ে ওঠা নিয়ে। এটা আপনার নিজস্ব অভিজ্ঞতার সাথে কতটা সম্পৃক্ত?

নুরি বিলগ ছেইলান

বস্তুত, অনেকটাই সম্পৃক্ত। কিন্তু, এই ক্লিপটি দেখা আমার জন্য চমকের মতো। আমি গত ১০ বছর হবে এটা দেখি নি। আমি কখনোই আমার সিনেমা দেখি না। সিনেমাটির এডিআর [অটোমেটেড ডায়লগ রিপ্লেসমেন্ট], ডাবিং ছিল যথেষ্ট খারাপ আর এটা তৈরির সময় আমাদের কাছে ভালো ক্যামেরা ছিল না। সিনেমাটির জন্য আমি নিজেই অর্থায়ন করি। এডিআর করার জন্য আমাদের কাছে পেশাদারি লোক ছিল, কিন্তু, তা ঠিকঠাক কাজ করে নি, বিশেষত শিশু ও মহিলাদের অংশটির ক্ষেত্রে। সুতরাং এটা ছিল আমার জন্য বাজে অভিজ্ঞতা। তারপর থেকে আমি লোকেশনের শব্দসহই শুট করার সিদ্ধান্ত নিই। হ্যাঁ, এটা খুবই আত্মজীবনীমূলক সিনেমা। আমি অনেক কিছুই মনে রেখেছিলাম যেগুলো একসাথে এই সিনেমায় এসেছিল, কিন্তু, আমি ভুলে গিয়েছিলাম কোন অংশটি বাস্তব আর কোনটি কল্পনা। আমি মনে করি, চিত্রনাট্য লেখা ও সিনেমা তৈরি এক ধরনের কোলাজ এবং খুবই গোলমেলে ব্যাপার—এটা সংগীত লেখার মতো বিষয়, যেখানে আপনি সব কিছুই ছন্দের মধ্যে নিয়ে আসতে চাইছেন, আর সেই ছন্দ আনার জন্য আপনি কখনও কিছু চিনি, কিছু লবণ এখানে সেখানে যোগ করছেন। বিভিন্ন রকমের বিষয় এখানে একসাথে ওঠে আসে। সিনেমাটির অধিকংশ বিষয়ই ছিল আমার বোনোর স্মৃতি থেকে নেওয়া, বিশেষত সংলাপগুলো। কিন্তু প্রথম অংশটি একটি ক্লাসরুমে করা হয়েছিল আর সেটি আমি লিখেছিলাম।

জিওফ এনড্রিও

এবং যথারীতি সেখানেও চেখভের উপাদান ছিল?

নুরি বিলগ ছেইলান

হ্যাঁ ছিল। প্রকৃতপক্ষে আমি বিশ্বাস করি যে, আমার সব সিনেমাতেই কিছু না কিছু চেখভের উপাদান রয়েছে, কারণ চেখভ অসংখ্য গল্প লিখেছেন। তিনি প্রায় সকল বিষয়ের উপরেই গল্প লিখেছেন আর আমি সেগুলো ভীষণ ভালোবাসি। সম্ভবত, জীবনকে আমি যেভাবে দেখি, সে বিষয়ে তিনিই আমাকে প্রভাবিত করেছেন। এক অর্থে আমার জন্য জীবন চেখভকে অনুসরণ করে। চেখভ পড়ার পর আপনি একই ধরনের ঘটনা নিজের জীবনেও দেখতে পাবেন। চিত্রনাট্য লেখার সময়, আমি চেখভের গল্পগুলো স্মরণ করার চেষ্টা করি। সুতরাং বলা যায়, হ্যাঁ, চেখভ এখানে আছে।

জিওফ এনড্রিও

আপনি উল্লেখ করেছেন যে, এগুলোর কিছু আপনি নিজে লিখেছেন এবং কিছু আপনার বোনের সাথে মিলে। আপনি ছবি তোলেন এবং সিনেমা তৈরি করেন, আর আপনার বোন [এমিন ছেইলান] নিজেও একজন দক্ষ ও যথেষ্ট পারঙ্গম চিত্রগ্রাহক। আপনি কি শিল্পবোধ সম্পন্ন পরিবার থেকে এসেছেন? এবং আপনি কিভাবে সিনেমা তৈরিতে এলেন?

নুরি বিলগ ছেইলান

বস্তুত, যখন আমি ছোট ছিলাম, আমার চারপাশে কোনো শিল্প ছিল না। আমি একটি ছোট্ট শহরে বাস করতাম এবং আমার চারপাশে শিল্প বলতে যা পেয়েছি, তা লোকগীতি এবং সম্ভবত সিনেমা। কিন্তু, সেখানে কোনো প্রদর্শনী বা তেমন কিছু ছিল না। আমি নিজেই বিস্মিত হই কিভাবে আমি শিল্পের সাথে সম্পৃক্ত হলাম। আমার মনে হয়, এটা শুরু হয়েছিল যখন আমি হাই স্কুলে ছিলাম এবং ইস্তানবুলে বাস করতাম। আমি সত্যিই জানতাম না কিভাবে, কিন্তু আমি, আমার বোন ও চাচাত ভাই সবাই শিল্পের সাথে সম্পৃক্ত হই। আমার মনে আছে, কেউ আমাকে ফটোগ্রাফির উপর লেখা একটি বই উপহার দিয়েছিল। সম্ভবত, তখন থেকেই শুরু। অতএব, আপনি অবশ্যই সাবধান থাকবেন যখন ছোটদের জন্য উপহার সামগ্রী কিনবেন [শ্রোতাদের হাসি]। আমার মনে হয়, সেই বইটিই আমার জীবন বদলে দিয়েছিল—যা চিত্রগ্রহণকে আমার কাছে দারুণ উপভোগ্য একটি বিষয় হিসেবে তুলে ধরেছিল। আমি একটি ডার্করুম তৈরি করেছিলাম এবং সেখানে ছবিগুলোর প্রিন্ট নিতাম। ধীরে ধীরে আমি উপলব্ধি করলাম, এটা একটা শিল্প এবং আমার আগ্রহ ক্রমশ বেড়েই চলল। আমার বোন আমার পরে চিত্রগ্রহণ শুরু করেছিল।


আমি গল্পে রসবোধ আনার জন্য কোনো পরিকল্পনা করি না।


জিওফ এনড্রিও

আপনি ফটোগ্রাফি থেকে কিভাবে সিনেমা তৈরিতে এলেন?

নুরি বিলগ ছেইলান

আমার ভালোভাবে মনে নেই, কিন্তু, সে সময় কোনো ভিডিও ক্যামেরা ছিল না, সুতরাং, সিনেমা তৈরির কথা চিন্তা করাও ছিল কঠিন। সে সময়ে এটা হাতে গোনা কিছু মানুষের কাছে ছিল। এমনকি ইউনিভার্সিটি পাস করার অনেক পর, মিলিটারি সার্ভিস করার সময়ও আমি সিনেমা তৈরির কথা ভাবি নি। অন্যান্যদের মতো আমিও সিনেমা দেখতে পছন্দ করতাম, কিন্তু, আমার মনে হয় সিনেমা তৈরি সম্পর্কিত একটি বই আমার জীবন বদলে দেয়। সেটা ছিল রোমান পোলানস্কির জীবনী, যা মিলিটারি সার্ভিসে থাকাকালীন পড়ার সময় আমাকে দারুণ উদ্বুদ্ধ করে। বইটিতে নাজি ক্যাম্পে একদম শূন্য থেকে শুরু করে হলিডউ পর্যন্ত তার জীবনী ছিল দারুণ রোমাঞ্চকর এবং সে বইটিতে সিনেমা তৈরি আমার কাছে খুব সহজ মনে হয়ছিল। সুতরাং, আমি সিনেমা নিয়ে অনেক বই পড়া শুরু করলাম, যার মধ্যে টেকনিক্যাল বইও ছিল। একদিন আমি একটি শর্ট ফিল্মে অভিনয় করলাম, যেটা ৩৫ মি.মি. এ শুট করা হয়েছিল এবং আমি সিনেমা তৈরির সকল ধাপ পর্যবেক্ষণ করলাম, আর সেটির কাজ শেষ হবার পর ক্যামেরাটি কিনে আনলাম। সেটা ছিল এরিফ্লেক্স ২সি আর সেটি কাজ করার সময় মেশিনগান এর মতো শব্দ তৈরি করত। সবচেয়ে কঠিন কাজ হলো শুরু করা, এমনকি ক্যামেরা কিনে আনার ১০ বছর পরও আমি কোনো সিনেমা তৈরি করতে পারি নি। তারপর সেই ক্যামেরাটি দিয়ে আমি একটি শর্ট ফিল্ম তৈরি করলাম। প্রথমে নিজেই শুরু করেছিলাম, যেন-বা ছবি তুলছি এমন মনে করে। কিন্তু, পরে আর মনঃসংযোগ করা সম্ভব হচ্ছিল না, ফলে সিনেমার মাঝামাঝি একজন সহকারীকে যুক্ত করি এবং দু জন মিলে শর্ট ফিল্মটি তৈরি করি। আমার পরিবারের সদস্যরা তাতে অভিনয় করেছিল এবং আমার মনে হয় সেটা ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে কঠিন কাজ। তারপর আবারও মাত্র দু জন নিয়েই আমি আমার প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমা তৈরি করলাম। তবে বলতেই হয় যে, সিনেমার কলা-কুশলীরা সবকিছু বহনে আমাদের যথেষ্ট সহযোগিতা করেছিল এবং তখন থেকেই আমি ভাবতে শুরু করি যে, সিনেমা তৈরি করা সম্ভব। তারপর থেকে আমার কাছে বিষয়টি হয়ে উঠেছিল সহজতর।

20111017-nuri-bilge-ceylan-interview-samsung-16x9
ক্লাউডস অব মে, ১৯৯৯-এর একটি ভিডিও ক্লিপ দেখানোর পর।

জিওফ এনড্রিও

এটা আমাদেরকে খুব ভালোভাবেই পরবর্তী ক্লিপে নিয়ে যায়, যেটা ক্লাউডস অব মে-এর। স্পষ্টতই, ক্লাউডস অব মে আংশিকভাবে তার পূর্বসূরি থেকে সরে এসেছে এবং এই ক্লিপে আমরা প্রায় আগের দৃশ্যটিরই শুটিং দেখলাম। আপনি কি মনে করেন যে, আপনার কাজগুলো একে অপরকে ছাপিয়ে যায়? যদিও আপনি কোনো সিক্যুয়াল তৈরি করেন না, তারপরও আপনার একটি কাজের সাথে অপর একটি কাজের সূত্র রয়েই যায়।

নুরি বিলগ ছেইলান

হ্যাঁ, আমি নিজেও তাই মনে করি। যখন আমি এই সিনেমাগুলো মধ্যে একটির কাজ শেষ করি, তখন কোনোভাবে অনুভব করলাম যে, এই বিষয়গুলি সম্পর্কে আরও কিছু বলার আছে, যা উজাক [ডিসট্যান্ট] শেষ হবার আগ পর্যন্ত চালু ছিল। সম্ভবত এ জন্য যে, আমি জানতাম তারপর কী ঘটবে, কারণ সেগুলো ছিল আমার জীবনের বেশ ঘনিষ্ঠ। কিন্তু, এই সিদ্ধান্তগুলি ছিল বেশ সহজাত এবং কখনোই তা পূর্বপরিকল্পিত ছিল না। তাছাড়া সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হয়েছিল পূর্ববর্তী সিনেমার কাজ শেষ হবার অনেক পরে।

জিওফ এনড্রিও

উল্লেখিত ক্লিপে পরিচালক স্পষ্টতই তার পিতা-মাতাকে ব্যবহার করছেন সিনেমা তৈরির জন্য। সে শহর থেকে মফস্বলে ফিরে আসে এবং মানুষজনের অলক্ষে তার ক্যামেরাটি চালু করে। এক অর্থে বলা যায় যে, সে তার পরিবারকেই সবসময় ব্যবহারের চেষ্টা করেছে। এই সিনেমায় আত্ম-সমালোচনার কোনো উপাদান ছিল কি?

নুরি বিলগ ছেইলান

আমিও তাই মনে করি। এই সিনেমাটি তৈরির আগেই ভিডিও ক্যামেরার জন্ম হয়েছিল, সুতরাং, আমি পরীক্ষা ও অনুসন্ধানের জন্য ক্যামেরাটি কিনেছিলাম। আমি এই অঞ্চলেরই একজন এবং অনেক কিছুই শুট করছিলাম, যেখানে মা-বাবার সাক্ষাৎকার, দাদিকে করা নানাবিধ প্রশ্ন ছিল। এমনকি আমি একটি স্ক্রিপ্ট লেখার চেষ্টাও করেছিলাম। পরে ইস্তানবুলে ফিরে এসে যখন আমি আমার ক্যামেরায় যা শুট করেছিলাম তা দেখলাম, লক্ষ করলাম যে, আমি খুব স্বার্থপর ছিলাম। আমার দাদি হয়তো আমাকে কিছু বলতে চাইছে, কিন্তু আমি তা শুনছি না। সম্ভবত এমন হতে পারে যে, আমি সিনেমাটি নিয়ে কী করব তা ভাবছিলাম। এই বিষয়গুলো আমার মধ্যে অপরাধ বোধের জন্ম দিয়েছিল, ফলে আমি নিজেকে পছন্দ করি নি এবং আমার মনে হয়েছিল, অধিকাংশ পরিচালক কিংবা শিল্পীরা, বিশেষত যারা শহরের, তাদের মধ্যে এই ধরনের আত্মপ্রিয়তা বর্তমান। কিন্তু, গ্রামের মানুষগুলো নিজেদের যা আছে সব উজাড় করে দেয় আর আমরা তা অকাতর গ্রহণ করি। কিন্তু যখন তারা শহরে আসে, তখন তাদের প্রতিদান দিই না। সুতরাং উজাক ছিল সেই বাস্তবতার একটি ধারাবাহিকতা।

জিওফ এনড্রিও

আপনার কর্মজীবনের এই পর্যায়ে আকর্ষণীয় বিষয় কি, বিশেষত উজাক-এ, যেখানে আপনি নিজেই চিত্রনাট্য লিখছেন, পরিচালনা করছেন, চিত্রগ্রহণ, সম্পাদনা, অর্থায়ন, এমনকি বিক্রি অব্দি করছেন—এক অর্থে আপনি নিজেই সবকিছু করছেন, যা সচরাচর দেখা যায় না। এসব কি আপনার জন্য অনেক বেশি ছিল, নাকি বিষয়টি এমন যা করতে আপনি মজা পেতেন?

নুরি বিলগ ছেইলান

আমি কখনোই অন্যের সিনেমায় সহকারী পরিচালক বা অন্য কোনোভাবে কাজ করি নি, সুতরাং, অন্য পরিচালকরা কিভাবে কাজ করে তা জানার সুযোগ হয় নি। আমি সবকিছুই বই থেকে নিজে নিজে শিখেছি এবং সিনেমার বিক্রি, বাজার সম্প্রসারণ থেকে শুরু করে তৈরির সকল খুঁটিনাটি বিষয় নিজে শিখেছি। এমনকি কানস-এ আমি নিজেই সিনেমাটি বিক্রি করছিলাম এবং তারা আমাকে বলেছিল, আর একজন মাত্র পরিচালক ছিলেন যিনি নিজেই নিজের সিনেমা বিক্রি করতেন, তিনি আফ্রিকান পরিচালক আব্দেররেহমান সিসাকো। ঘটনাটি ছিল অস্বাভাবিক এবং ডিস্ট্রিবিউটররা বেশ বিস্মিত হয়েছিল। আমি কিভাবে বিক্রি করতে হয় তা শিখেছিলাম, কিন্তু, এখন আর নিজে করি না। এখন আমার সিনেমার জন্য প্রোডিউসার, চিত্রগ্রাহক সব রয়েছে। যদিও বিষয়টি ছিল অপ্রয়োজনীয়, কিন্তু সে সময়ে আমি জানতে চেয়েছিলাম। আমি মনে করি, একজন পরিচালকের অনেক কিছুই জানা প্রয়োজন, বিশেষত টেকনিক্যাল বিষয়গুলোর খুঁটিনাটি, অন্যথায় আপনি টেকনিক্যাল লোকজনদের মুখাপেক্ষী হয়ে পড়বেন। যদি আপনি টেকনিক্যাল বিষয়গুলো জানেন, তবে তাদের ভালোভাবে বোঝাতে ও পরিচালনা করতে পারবেন।

জিওফ এনড্রিও

এই সিনেমায়, যে দৃশ্যটি আমরা এইমাত্র দেখলাম, সেখানে আপনি আপনার পিতাকে উৎসাহ দিচ্ছেন যে তাকে কী বলতে হবে। বিষয়টি কি এভাবে বাস্তবেও কাজ করেছিল?

নুরি বিলগ ছেইলান

হ্যাঁ। এটা আমার প্রথম সিনেমার চিত্রায়ণকে খুব বাস্তবিকভাবে প্রতিফলিত করে। আমার মনে হয়, সেটা ছিল সত্যিকার অথেই বিশৃঙ্খল অবস্থা, যখন আমরা দুজন মাত্র মানুষ বাকি সবাইকেই পরিচালনা করার চেষ্টা করছি। সেটা ছিল সত্যিকার অর্থেই তালগোল পাকানো এক পরিস্থিতি।

Nuri-Bilge-Ceylan-and-Geo-001
উজাক/ ডিসট্যান্ট, ২০০২-এর একটি ভিডিও ক্লিপ দেখানোর পর।

জিওফ এনড্রিও

অনেকগুলো বিষয়ের মধ্যে আপনি একটি বিষয় উল্লেখ করেছেন এবং সেটা উভয় ক্লিপেই উঠে এসেছে যে, গ্রামাঞ্চল থেকে মানুষ শহরের দিকে সরে আসার ফলে তুর্কিস জন-জীবনে কী ঘটছে? যেমন আপনার প্রথম সিনেমা ‘উজাক’-এর কথাই ধরা যাক, যেখানে আপনি সিনেমাটি ইস্তাম্বুল শহরের পটভূমিতেতে একজন ফটোগ্রাফারের জীবন-যাপন তুরে ধরেছেন, যার কাছে তার চাচাত ভাই বেড়াতে আসে মফস্বল থেকে। অনকেগুলো কারণের একটি, যার জন্য আমি ক্লিপটি বেছে নিয়েছি, এখানে আমরা নুরির পরিবারে আগত নতুন সদস্যকে দেখতে পাই—রাস্তায় দাঁড়ানো নারীটি নুরির স্ত্রী, ইব্রু। কিন্তু, অন্য যে কারণে এটিকে প্রাধান্য দিয়েছি তা হলো, এটি একটি দারুণ দৃশ্য, যেখানে একটি যুবক যুবতীটির দিকে তাকিয়ে আছে এবং সানগ্লাস দিয়ে নিজেকে আকর্ষক করে তোলার চেষ্টা করছে, আর ঠিক সেই গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তেই গাড়ির এলার্ম বন্ধ হয়ে যায়। দৃশ্যটি খুবই হাস্যকর এবং এমন অনেক হালকা রসাত্মক উপদান রয়েছে আপনার সিনেমায়। বিষয়টি আমাকে বাস্টার কিটন-এর কথা মনে করিয়ে দেয়, যার কাজ খুব কমই পরিচিত। মূলত, আপনার নিজের সিনেমায় কৌতুক অথবা রসবোধ থাকাটা আপনার কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ?

নুরি বিলগ ছেইলান

আমার মনে হয়, জীবনকে আমি এভাবেই দেখি। আমি গল্পে রসবোধ আনার জন্য কোনো পরিকল্পনা করি না। আমি যথাসম্ভব বাস্তবতার কাছাকাছি থাকতে চাই এবং মনে করি যে, বাস্তব জীবন হাস্যরসে পূর্ণ। আমি যখন ঘরে একা থাকি, নিজেকে অনেক মজার মুহূর্তে খুঁজে পাই। যদি কখনও আমি নিজেকে আয়নায় দেখি, তবে দেখা যাবে আমার অভিব্যক্তি যথার্থই অসংলগ্ন। ফলে, সেগুলোর জন্য আমি কোনো পরিকল্পনা করি না। কিন্তু, এই সিনেমায় অমন অবস্থায় লোকজনদের হাসতে দেখে আমি একটু বিস্মিতই হয়েছি!

জিওফ এনড্রিও

এই সিনেমায় পরের দিকে তারা একে অপরের সাথে কথা বলা বন্ধ করে দেয় এবং ফটোগ্রাফার এই আগন্তুক ভাইকে অহেতুক উৎপাত মনে করতে থাকে। সুতরাং এক সন্ধ্যায় সে পর্ণছবি দেখতে শুরু করে, কিন্তু, যখন চাচাত ভাই আসে, সে দ্রুত তা বন্ধ করে তারকোভস্কির সিনেমা দেখা শুরু করে। মূলত, যে সিনেমাটি তারা একসাথে দেখছিল, তা ছিল চাচাত ভাইকে ঘুমাতে পাঠানোর একটি কৌশল এবং সেটা বিদ্রূপাত্মক, বিশেষত যখন আপনি তারকোভস্কির একজন অনুরাগী, নয় কি?

নুরি বিলগ ছেইলান

হ্যাঁ, তিনি সে সকল পরিচালকদের অন্যতম যাদের আমি পছন্দ করি। কিন্তু, সেই দৃশ্যে আমি তারকোভস্কির সিনেমা বেছে নিয়েছিলাম এ জন্য না যে আমি তার কাজ পছন্দ করি, বরং সেই দৃশ্যে সিনেমাটি ছিল যথোপযুক্ত এবং আমি চেয়েছিলাম, যে ধরনের সিনেমা গ্রামের লোকেরা দেখে অভ্যস্ত তার সাথে এই ধরনের সিনেমার একটি তুলনা করতে। আমি চেয়েছিলাম ফটোগ্রাফারের [সিনেমার নায়ক] জন্য একটি আদর্শ সিনেমা বিছে নিতে, আর তারকোভস্তি ছিল সে ক্ষেত্রে যথার্থ। সাধারণত সমোলোচনাকারীরা ভেবেছে যে, চাচাত ভাইয়ের হাত থেকে মুক্তি পাবার জন্য সে তারকোভস্কির সিনেমা দেখা শুরু করে, কিন্তু, সেটা আমার উদ্দেশ্য ছিল না।

জিওফ এনড্রিও

সমালোচকরা সব সময়ই ভুল [হাসিসহ]।

নুরি বিলগ ছেইলান

সম্ভবত আমি কিছু ভুল করেছিলাম [হাসিসহ]। কিন্তু, একটু আগের দৃশ্যে ফটোগ্রাফার তার বন্ধুদের সাথে আলোচনা করছিল এবং এক বন্ধু তার সমালোচনা করে আদর্শ হারানোর জন্য, আর তারা সে জন্য তাকে দোষারোপ করে। সুতরাং যখন সে বাসায় ফেরে, তখন সে তার আদর্শ পুনরায় ফিরে পাবার জন্য এক ধরনের জিদ অনুভব করে। মূলত সে কারণেই সে তারকোভস্কির সিনেমা দেখা শুরু করে এবং সে মনে করেছিল যে সে তার হারানো উৎসাহ ও উদ্দীপনা ফিরে পাবে। এজন্য সে অপর ব্যক্তিকে আমলেই নেয় না, ফলস্বরূপ তার চাচাত ভাই অবশ্যই বিরক্ত হয়ে ওঠে। অতঃপর, চাচাত ভাই যখন ঘুমাতে যায়, তখন তার মধ্যে কিছু একটা কাজ করে এবং সে পুনরায় তার উদ্দীপনা হারিয়ে ফেলে ও পর্ণ দেখা শুরু করে, কারণ সেটা দেখা ছিল সহজতর। সে তার ভেতরের ক্রোধান্বিত ভাব থেকে মুক্তি পেতে চেয়েছিল, আর সে জন্যই পর্ণ দেখা শুরু করেছিল।


আমি ভাববাদিতা পছন্দ করি না—বরং আমি ইঙ্গিতময়তা পছন্দ করি।


জিওফ এনড্রিও

এই সিনেমার একটি বিষয় আমাকে আলোড়িত করেছে, তা হলো, অনেক দৃশ্যই খুব অল্প সংলাপসহ শুট করা এবং আমার কাছে মনে হয়েছে, বিষয়টি আপনার সিনেমায় সবসময়ই ঘটে। আপনি কি মনে করেন যে, চরিত্রেরা শব্দ ছাড়াই নিজেদের ভালোভাবে প্রকাশ করতে পারে?

নুরি বিলগ ছেইলান

আমি ঠিক জানি না। চরিত্রগুলোকে নিরব রাখার চেষ্টা আমি করি না। চিত্রনাট্যে সেই দৃশ্যে অনেকগুলো সংলাপ ছিল। কিন্তু দৃশ্যায়ন, এই একটিমাত্র ক্ষেত্র, যখন আপনি বুঝতে পারবেন যে, আপনি যা লিখেছেন তা সেখানে কাজ করবে কি না। চিত্রগ্রহণের বেলায় আমি সবসময় চেষ্টা করি পরিস্থিতির সামঞ্জস্যতা বজায় রাখতে। ফলে আমি দৃশ্য থেকে সংলাপ বাদ দিই, যার দরুন সেখানে কোনো সংলাপ ছিল না। আমি সেই পরিস্থিতিতে যথার্থ সামঞ্জস্যতা খুঁজে পেয়েছিলাম, আর আমি জানি না এই বিষয়ে আমার কী করা উচিত। মূলত, পরিস্থিতি আমাকে সেভাবেই বুঝিয়েছিল। আর হ্যাঁ, সংলাপ নির্বাচনের ক্ষেত্রে অবশ্যই সাবধান হওয়া প্রয়োজন। আমি এই বিষয়ে অনেক অনুসন্ধান করেছি, আর বিষয়টির প্রকৃতি বোঝার জন্য অনেক কথোপকথন রেকর্ড করেছি। এটা কোনো যৌক্তিক অগ্রগতির নিয়ম মানে না। কেউ হয়তো কিছু বলল, কিন্তু দেখা গেল অপর ব্যক্তি সম্পূর্ণ ভিন্ন কিছু বলে বসেছে। যদি আপনি বিশ্লেষণ করেন, তবে সেভাবেই বিষয়টি আপনার কাছে ধরা দেবে। সুতরাং, সংলাপ, যদি আপনি তা ব্যবহার করেন, তবে দেখবেন যে সেটা যৌক্তিক নয় আর তা সিনেমার নিগূঢ়তা বা অর্থ সম্পর্কে কোনো তথ্য দিচ্ছে না। আমার কাছে সংলাপ তখনই কাজ করে যখন চরিত্রেরা অনর্থক কথা-বার্তা বলছে, যা সিনেমাটি সম্পৃক্ত নয়। আর আমি যথাসম্ভব সেটাই করার চেষ্টা করি। আমি সংলাপ ছাড়াই সিনেমার অর্থ বোঝানোর চেষ্টা করি—পরিস্থিতি, অভিব্যক্তি বা এমন অন্যান্য বিষয়ের মাধ্যমে। এটাই আমার ইচ্ছা, আর সম্ভবত তাতে আমি সফল নই।

thumbs_b_c_1cf73635a58bbb093ac453a03cce5a28
ক্লাইমেটস, ২০০৬-এর একটি ভিডিও ক্লিপ দেখানোর পর।

জিওফ এনড্রিও

যা হোক, আপনি যে সফল হচ্ছেন সেটা প্রতীয়মান—কারণ ‘উজাক’ কানস-এ একটি বড় পুরস্কার জিতেছে এবং তারপর থেকে আপনি নিয়মিতভাবেই তা জিতে চলেছেন। আমরা উল্লেখিত ক্লিপ-এ আপনার স্ত্রীকে দেখেছি, এখন চলুন আমরা ‘ক্লাইমেটস’-এর একটি ক্লিপ দেখি। আপনি হয়তো দৃশ্যটির অভিনেতাকে চিনতে পেরেছেন। সিনেমাটির কাহিনি আপনি আপনার বোন ইব্রুর সাথে লিখেছেন এবং নিজেই দুটি প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন, আর সিনেমাটি ছিল একটি সম্পর্কের ভেঙে যাবার বিষয়ে। এই বিষয়ে নির্মিত সিনেমাগুলোর মধ্যে এটি ছিল সবচেয়ে সৎ ও পুরুষোচিত বিষয়ে নির্মিত অসম্ভব বিষাদময় একটি সিনেমা। সত্যিকার অর্থেই এটা অনবদ্য আর তা এমন অনেক দিকই ছুঁয়ে গেছে, যা অপরাপর সিনেমাগুলি স্পর্শ অব্দি করে না। এটা তৈরি করা কি আপনার জন্য যথেষ্ট বেদনাদায়ক ছিল?

নুরি বিলগ ছেইলান

না, মোটেও নয়। বস্তুত, আমরা তেমন দম্পতি নই যারা জীবনের অন্ধকার দিকগুলো সম্পর্কে কথা বলতে ভয় পায়। আমার বরং সে বিষয়ে কথা বলতে পছন্দ করি। সুতরাং, আপনি যদি জীবনের অন্ধকার দিকগুলোর সাথে পরিচিত থাকেন, তাহলে আপনি নিরাপদ—এটা থেরাপির মতো—ফলে অন্ধকার বিষয়গুলো একত্রিত হতে বা বাড়তে পারে না। বলা যায়, ছোট থাকতেই সাপের মাথা কেটে ফেলার মতো বিষয়। সুতরাং এটা ছিল কৌশলগত দিক, যা আমাদের জন্য মোটেও কঠিন ছিল না।

জিওফ এনড্রিও

কেন আপনি নিজেই দুটি চরিত্রে অভিনয় করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন?

নুরি বিলগ ছেইলান

আমি এই সিনেমাটির মাধ্যমে সেই বিষয়ে বলতে চেয়েছি, যা অন্যকে ব্যাখ্যা করা বা বোঝানো কঠিন। আমি চাই নি যে, কিভাবে অভিনয় করবে তা বোঝেনোর জন্য অভিনেতাদের সাথে লড়াই করতে। আমি চেয়েছিলাম যে, কাজটি তারা তাদের সহজাত প্রবৃত্তি থেকেই করুক। তাছাড়া যখন আমি চিত্রনাট্য লিখছিলাম, এক ছুটির দিনে আমি ও আমার স্ত্রী সিনেমাটি নিয়ে কথা বললাম। আমরা একটি পরীক্ষামূলক দৃশ্যায়ন করেছিলাম, যেখানে আমরা অভিনয় করেছিলাম আর ফলাফল আমাদের পছন্দ হয়েছিল। সুতরাং সেটা আরেকটি কারণ যার জন্য আমরা সিনেমাটিতে অভিনয় করেছিলাম। সার্বিকভাবে, তুর্কিতে আমার অভিনয় দর্শকরা পছন্দ করে নি [শ্রোতাদের হাসি], কিন্তু আমার ধারণা পশ্চিমারা পছন্দ করেছিল, অপরপক্ষে আমার স্ত্রীর অভিনয় সৌভাগ্যবশত সকলেই পছন্দ করেছিল।

জিওফ এনড্রিও

এটা আপনার প্রথম সিনেমা যেখানে প্রযুক্তিগত কৌশল ব্যবহার করেছেন। আমার মনে আছে সমুদ্র সৈকতে আপনাদের দুজনের সেই দৃশ্যটির কথা, যেখানে নৌকা ব্যাকগ্রাউন্ডে চলে যেতে থাকে এবং সবকিছুই নিখুঁতভাবে রাখা হয়েছে কেন্দ্রবিন্দুতে। যতদূর মনে আছে, যখন এটা আমি কানস-এ দেখছিলাম, দৃশ্যটি দেখে বেশ চমকে উঠেছিলাম। তাছাড়া পুরো সিনেমাটিই ডিজিটাল ক্যামেরার কাজ দ্বারা এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যা অনেকেই এভাবে আগে করে নি। আপনার কি মনে হয় ডিজিটাল টেকনোলজি অভিব্যক্তি প্রকাশের নতুন সম্ভাবনা উন্মুক্ত করছে?

নুরি বিলগ ছেইলান

অবশ্যই। আমি মনে করি, এটার আরও অজানা ক্ষমতা রয়েছে যা অনেক গভীর ও লুকায়িত বিষয় তুলে ধরতে পারে। সুতরাং ফিল্ম এ শুট করা অর্থহীন—তাহলে কেন আর ফিল্মে শুট করব? এই সিনেমাটি পুরোনো ডিজিটাল টেকনোলজি ব্যবহার করে শুট করা হয়েছে, আর ইতিমধ্যে তা অনেক উন্নতিও লাভ করেছে। ফিল্ম এ শুট করা খুব ব্যয়বহুল আর অনেক অসুবিধাও রয়েছে। আমার জন্য এটাই যথার্থ। আমি আর কখনোই ছবি তোলা বা সিনেমা তৈরির জন্য ফিল্মে ফিরে যাব না। আমি মনে করি, আমাদের উদার হওয়া দরকার এবং আমাদের গভীরতম আবেগসমূহ তুলে ধরার বিষয়ে নতুন এই টেকনোলজির সুবিধা গ্রহণ করা প্রয়োজন।

জিওফ এনড্রিও

চলুন এবার ‘থ্রি মাংকিস’ নিয়ে কথা বলা যাক—এটাকে বরং একটি এক্সপ্রেশনিস্ট সিনেমা বলা যায়, এই অর্থে যে, মাঝে মাঝে লাল রং-এর ছটা ছাড়া আপনি রং-এর বিকৃতি ঘটিয়েছেন, যেটা নিতান্তই একমাত্রিক। এর অধিকাংশই সবুজ ও হলুদ, আর দৃশ্যগুলো খুবই অস্বস্তিদায়ক। এটা অনেকটাই এক্সপ্রেশনিস্ট পেইন্টিং-এর মতো।

নুরি বিলগ ছেইলান

আমি তা জানি না। বস্তুত, আমি ভাববাদিতা পছন্দ করি না—বরং আমি ইঙ্গিতময়তা পছন্দ করি, কেন না আবেগ ও অনুভব ভাববাদিতায় অনেক বেশি দমিত। অথচ অনেক সমালোচকই বলেছেন যে, সিনেমাটি ভাববাদী—হয়তো তারাই ঠিক। আমি আরও বেশি সূক্ষ্ম ও গোপনীয় হতে পছন্দ করি, যাতে দর্শকরা আরও বেশি সক্রিয় হতে পারে। আর রং-এর বিষয়ে বলতে গেলে বলতে হয়, এটাই স্বাভাবিক যে, একজন কোনো কিছু যেভাবে দেখে, বাকিরা তা সেভাবে দেখে না। আমি যখন পৃথিবীর দিকে তাকাই, সেটাই সেই প্রকরণ যা আমি দেখি। আমার ফটোগ্রাফির হয়তো বিষয়টিতে প্রভাব রয়েছে—আর রং আমি এভাবেই দেখি। আমি যখন রং-এর প্রকরণে সম্পৃক্ত হই, মোটেও বুঝতে পারি না যে আমি এসব রং থেকে খুব দূরে সরে এসেছি। আর অবশ্যই এই সিনেমার ক্ষেত্রে আমি চেয়েছিলাম চরিত্রগুলোকে একটু বিচ্ছিন্ন রাখতে। এই বিচ্ছিন্নতা আমি অন্যভাবে করেছিলাম, উদহারণ স্বরূপ বলা যেতে পারে, সিনেমায় আমি তিনটি চরিত্রের মুখ ছাড়া অন্য কোনো চরিত্রের মুখ দেখাই নি। আর রংগুলোর ব্যবহার এই বিচ্ছিন্নতা তৈরিতে আমাকে সহায়তা করেছিল। বস্তুত, আমি বেশি কিছু করি নি, শুধুমাত্র কনস্ট্রাস্ট বাড়িয়ে দিয়েছিলাম আর রংগুলোকে আলাদা করেছিলাম। তারপর একটি রং নির্বাচন করেছিলাম, যেটা ছিল লাল, আর তাকে আর একটু সামনে এনেছিলাম।

জিওফ এনড্রিও

অন্যান্য বিষয়, যেমন আপনি কোনো বিষয়কে জোরালোভাবে প্রকাশের জন্য সুচারুভাবে শব্দ ব্যবহার করেন, আর কাজটি আপনি একদম শুরু থেকেই করে আসছেন।

নুরি বিলগ ছেইলান

আমি শব্দের ক্ষেত্রে বাস্তববাদী হতে পছন্দ করি না। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, আমরা সিনেমায় এমন একটি শব্দ শুনলাম যা পূর্বে শুনি নি। আমাদের কান খুবই নির্দিষ্টভাবে কাজ করে আর আমরা কেবল তাই শুনি, যা আমরা শুনতে চাই। সুতরাং, শ্রোতাদের জন্য আমি কিছু শব্দ নির্বাচন করি এবং তাদের তা শোনাই। শব্দের মাধ্যমে আমি তাদের সেদিকে নিয়ে যেতে পারি, যেখানে আমি তাদের নিয়ে যেতে চাই, আর বিষয়টি দৃশ্যপটের বাতাবরণকে তেমন হেয়ে উঠতে সাহায্য করে, যেমনটা আমি চাই। তাছাড়া, আপনি যদি শব্দের মাধ্যমে কোনো কিছু বলতে পারেন, তবে আপনার তা দেখানোর প্রয়োজন নেই।

41606106_761511590856472_1663853356759646208_n
জিওফ এনড্রিও

জিওফ এনড্রিও

সিনেমাটিকে অবশ্যই অন্যান্য সিনেমা থেকে ভিন্ন মনে হয়—কারণ আংশিক হলেও এটাকে একটি ক্রাইম সিনেমা হিসেবে বর্ণনা করা যায়। যতদূর আমার মনে হয়, এটা মোটেও আত্মজীবনীমূলক নয়, যদিও অনেক কিছুই উহ্য, তারপরও বর্ণনাবহুল। এক অর্থে, এটা বেশ নাটকীয়। আপনি কি মনে করেন, আপনি এখানে এক ধরনের পথ তৈরি করেছেন এবং সে পথ ধরেই এগুবেন?

নুরি বিলগ ছেইলান

আমারও তাই মনে হয়, কেন না আপনি সারা জীবন ধরে তো আর আত্মজীবনীমূলক সিনেমা তৈরি করতে পারবেন না [শ্রোতাদের হাসি]। ক্লাইমেটস তৈরির পর আমি গভীরভাবে অনুধাবন করেছিলাম যে, আমার একটি পরিবর্তন দরকার। কিন্তু, তার অর্থ এই নয় যে, আমি এ পথেই যাব। আমি এখনও জানি না। সে সময় মনে হয়েছিল, আমার পরিবর্তন দরকার আর আমিও তা করেছি। ফলাফল হয়তো আবারও আমাকে ভিন্ন দিকে নিয়ে যাবে, কিন্তু, এই মুহূর্তে আমি নিশ্চিত নই।

জিওফ এনড্রিও

ঠিক আছে, চলুন তবে তা শ্রোতাদের সামনে উপস্থাপন করা যাক।

প্রশ্ন- ০১ : আপনার প্রতিটি সিনেমাতেই ভিন্ন ভিন্ন ধরনের রঙের সমাবেশ রয়েছে, যা আপনার সিনেমার উল্লেখযোগ্য একটি দিক—সেগুলো কি ইমপ্রেশনিস্টিক নাকি এক্সপ্রেশনিস্টিক? আপনি কি আপনার রং-এর ব্যবহার সম্পর্কে আমাদের কিছু বলবেন এবং সেগুলো দিয়ে আপনি কি করতে চেয়েছেন?

নুরি বিলগ ছেইলান

সেগুলো ছিল সিনেমায় ব্যবহৃত রং। আমার পক্ষে এ ধরনের প্রশ্নের উত্তর দেওয়া কঠিন, কারণ সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হয়েছিল সহজাত প্রবণতা থেকে। এই সিনেমার কথাই ধরা যাক,  আমি সিনেমার শুটিং শুরুর পূর্বে রং নির্ধারণ করেছিলাম। আমি লোকেশনগুলোর কিছু ছবি তুলেছিলাম এবং সিনেমায় কোন ধরনের আবহ কাজ করবে তা নির্ধারণ করার জন্য সেগুলো নিয়ে কম্পিউটারে কাজ করেছিলাম। শেষ পর্যন্ত আমি যা চাই তার কাছাকাছি কিছু পেয়েছিলাম। কিন্তু, সাধারণত আমি সত্যিই আগে থেকে জানি না—নিতান্তই সহজাত প্রবণতা থেকে বিষয়টি ঘটে যায়। আমি চাইলে হয়তো এই বিষয়ে কিছু বলতে পারব, কিন্তু সেটা হবে মিথ্যা [শ্রোতাদের হাসি)]


আমি তেমন একজন মানুষ, যে সবসময় নেতিবাচক অবস্থান থেকে সবকিছু পর্যবেক্ষণ করে।


জিওফ এনড্রিও

প্রশ্ন- ০২ : আপনার বয়স কত ছিল যখন আপনি প্রথম স্বল্প দৈর্ঘ্যের সিনেমাটি [কোজা, ১৯৯৫] তৈরি করেন? সিনেমাটি কানস-এ পুরস্কৃত হয়েছে—আপনি কি আগে থেকেই অনুমান করেছিলেন যে, সেটি একটি ভালো সিনেমা ছিল?

নুরি বিলগ ছেইলান

আমি যথেষ্ট বয়স্ক ছিলাম, বস্তুত ৩৬ বছর। তবে আপনি যদি আগে শুরু করতে পারেন সেটাই মঙ্গলজনক। আমি ইউনিভার্সিটি থেকে বের হবার পর কমপক্ষে ১০ বছর কিছুই করি নি শুধু এই চিন্তা ছাড়া যে, জীবন ধারণের জন্য কী করা যেতে পারে। যখন আপনি তরুণ, তখন আপনি সাহসী আর যৌবনে ভুল করাই শ্রেয়। আমি যখন সিনেমাটি তৈরি করলাম, তখন সবসময় ভেবেছি যে, এটা কোনো সিনেমা নয়। আমি কিছু বিষয় নিয়ে শুট করছিলাম, কিন্তু আমি কখনোই ভাব নি যে, কানস সেটাকে গ্রহণ করবে, কিংবা আমি সেটা অন্যদের দেখাব। আমি ভেবেছিলাম, আমি অর্থহীন কিছু করছি। এডিটিং রুমে আমি সেগুলো দিয়ে একটা ধারণা অথবা গল্প তৈরির চেষ্টা করেছিলাম। আমার মাথায় কিছু একটা চিন্তা-ভাবনা ছিল, কিন্তু আমি সবসময় ভেবেছিলাম যে তা কাজ করবে না। এমনকি সিনেমাটি শেষ করার পর আমার মনে হয়েছিল, এটা একটি বাজে কাজ এবং কেউই সেটা পছন্দ করবে না। আমি আমার বন্ধুদের জিগ্যেস করেছিলাম, ‘সেটা সিনেমার মতো হয়েছে কি না?’ একই প্রশ্ন পুনরায় করেছি, যখন আমি আমার প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমা ‘দ্য সম্মল টাউন’, ১৯৯৭ তৈরি করেছিলাম। আমার মনে আছে, বার্লিন ফিল্ম ফেস্টিভালে, যেখানে সিনেমাটি প্রিমিয়ার করা হয়েছিল, সেখানে এটি আমার বোনের সাথে দেখার সময়, আমরা একে অপরের দিকে তাকিয়ে ভাবছিলাম, ‘এটাকে সিনেমার মতো মনে হচ্ছে না!’ নিজের পুরোনো সিনেমাগুলো দেখা সত্যিই কঠিন, কারণ আপনি কিছুই বুঝবেন না। একটা সিনেমা শেষ করার পর আপনি সম্পূর্ণরূপে অন্ধ। নিরপেক্ষভাবে নিজের সিনেমাটি দেখার কোনো সুযোগই আপনার থাকবে না। কিন্তু, আমি তেমন একজন মানুষ, যে সবসময় নেতিবাচক অবস্থান থেকে সবকিছু পর্যবেক্ষণ করে—আমি সবসময় ভুলগুলো খুঁজতে থাকি, যার দরুণ বিষয়টি যন্ত্রণাদায়ক, আর সেজন্য আমি আমার সিনেমা কখনোই দেখি না।

জিওফ এনড্রিও

একটি বিষয়ে আমি আপনাকে প্রশ্ন করতে চাই—উজাক-সহ এখন পর্যন্ত আপনি খুব কম সংখ্যক লোক নিয়ে সিনেমা তৈরি করেছেন। আপনি যদি ‘উজাক’ সিনেমার শুটিং-এর ভিডিও দেখেন, তবে দেখতে পাবেন একটি ছাতার নিচে মাত্র তিনজন লোক একটি দৃশ্য শুট করছে। এখন আপনি অনেক বেশি লোকজন নিয়ে কাজ করেন, যা আন্তর্জাতিকভাবেও গ্রহণযোগ্য, আপনার ক্যারিয়ার বিভিন্ন দিক থেকে অনন্য—বিষয়টা কি আপনার জন্য সহজ ছিল নাকি অনেক কঠিন?

নুরি বিলগ ছেইলান

বস্তুত দুটোই, সহজ এবং যথেষ্ট কঠিন। এটা নির্ভর করে বিষয়টিকে আপনি কিভাবে দেখছেন। আমি পুরোনো দিনের মতো কাজ করতে পছন্দ করি না—আমি এখন বৃদ্ধ এবং সামর্থ্য কম। মানুষ এমন এক জীব যে সহজেই বিলাসিতায় অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। ‘উজাক’ পর্যন্ত আমি নিজেই নিজের সিনেমা শুট করেছি। কিন্তু এখন, তা করার কথা কল্পনাও করতে পারি না আর সেটা আমার কাছে কঠিন মনে হয়। আমি অলস আর আমার একটি মনিটরের মাধ্যমে কলা-কুশলী, সম্পাদনা, উপস্থাপন ইত্যাদি বিষয় নিয়ন্ত্রণ করা অনেক সহজ মনে হয়। আমার মনে হয়, বিষয়টি এমনই হওয়া উচিত আর সে জন্যই আমি এখন এভাবে কাজ করি। কিন্তু, অন্যভাবে ভাবলে বিষয়টি খুব কঠিন। যেমন এই সিনেমায় ২০-২৫ জন মানুষ ছিল ক্যামেরার পেছনে আর সবকিছু করতে যথেষ্ট সময় লাগছিল। লোকজন ও জিনিসপত্র এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নিয়ে যাবার জন্য আমাদের ট্রাকের প্রয়োজন পড়েছিল । যদি আপনার মনে থাকে, ‘উজাক’-এ একটি বরফের দৃশ্য ছিল। এটা ইস্তানবুলে খুব অল্প সময়ের জন্য ছিল, মাত্র দুদিন। কিন্তু, আমরা দুদিনের মধ্যেই শুটিং-এর সব কিছু শেষ করেছিলাম, কারণ আমরা সংখ্যায় ছিলাম অল্প। একটি মাত্র জিপ দিয়েই আমরা সব কলা-কুশলী, মাল-পত্র বহন করতে পারতাম এবং এক স্থান হতে অন্য স্থানে জলদি যেতে পারতাম। আমাদের কাজ হয়ে যেত অনেক দ্রুত। সুতরাং, এই অর্থে সেটা ছিল আমার জন্য সহজতর। কিন্তু, তারপর আমি অনেক কিছুই মেনে নিতে অভ্যস্ত হয়েছিলাম। যদি আমি কোনো কিছুর সমাধান করতে না পারতাম, তখন আমি চিত্রনাট্য বদলে দিতাম এবং আরও অনেক কিছুর সাথেই নিজেকে অভ্যস্ত করাতে রাজি ছিলাম। কিন্তু, এখন আমি বেশি ছাড় দিই না, কারণ আমার একজন প্রোডিউসার আছেন এবং তিনি অনেক সমস্যা সমাধান করতে পারেন। এখন আমাদের সমস্যা সমাধানের জন্য যথেষ্ট অর্থ ও জনবল আছে। সুতরাং, যখন আপনি নতুন সম্ভাবনা খুঁজে পাবেন, তখন সেগুলো এড়িয়ে যেতে চাইবেন না। অতএব, আমার মনে হয়, বিষয়টি একইসাথে অনেক কঠিন ও সহজতর।

জিওফ এনড্রিও

অলসতা সম্পর্কে তিনি যা বলছেন সেটা বিশ্বাস করবেন না—আমি তার নোটগুলো পড়েছি, তিনি ‘থ্রি মাংকিস’ সম্পাদনা করার সময় রাতে মাত্র দুঘণ্টা ঘুমাতেন।

প্রশ্ন-০৩ : ‘থ্রি মাংকিস’-এর একটি চরিত্র একজন রাজনীতিবিদ আর আপনি সিনেমায় এ.কে. পার্টির নির্বাচনে জয়লাভের ভিডিও ফুটেজ দেখিয়েছেন। আমি ভাবছি, যদি আপনি এই সিনেমার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট সম্পর্কে কিছু বলেন? তাছাড়া, সিনেমাটি কি তুরস্কের রাজনীতির উপর একটি মন্তব্য হিসেবে গৃহীত হয়েছিল?

নুরি বিলগ ছেইলান

তুরস্কে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের দিকে মনোযোগ টানার জন্য সিনেমাটির যথেষ্ট সুযোগ ছিল, কিন্তু আমি এটাকে এমনভাবে এডিট করি, যাতে সে বিষয়ে সমালোচনা করার কোনো সুযোগ না থাকে। আমি চাই নি সিনেমাটি শুধু রাজনীতিতেই সীমাবদ্ধ থাকুক। ফলে অনেকগুলো রাজনৈতিক সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিল শুট করার পরও আমি সেগুলো সিনেমায় যুক্ত না করার সিদ্ধান্ত নিই, কারণ বিষয়টিকে আমি সিনেমায় একটি পার্শ্ববর্তী উপাদান হিসেবে রেখে দিতে চেয়েছিলাম। দর্শক ও সমালোচনাকারীরা সিনেমার এই দিকটিকে সামনে তুলে আনতে বেশ আনন্দ বোধ করে, কিন্তু সেটাকে আমি পেছনে রাখতেই চেষ্টা করেছি।

জিওফ এনড্রিও

প্রশ্ন- ০৪ : এটা পূর্বেও অনেকবার বলা হয়েছে যে, আপনার কম্পোজিশনের ধরন ‘ইয়াসুজিরো ওজু’ [বিখ্যাত জাপানিজ পরিচালক] এর মতো, বিশেষত খুব নিচু অবস্থানে ক্যামেরার পজিশন রাখা, সম্ভবত হাঁটুর উচ্চতায়, বিশেষত ঘরের ভেতরের দৃশ্যটিতে। আপনি কি ইচ্ছা করেই ওজুকে অনুকরণ করেছেন, নাকি সেটা অনিচ্ছাকৃত ঘটেছে? তাছাড়া, এই বিষয়ে কি আপনি আমাদের বলবেন যে, শুটিং এই বিশেষ ধরন কি ক্যামেরার নড়া-চড়া বা ট্র্যাক-এ শুট করা এড়িয়ে যাবার জন্য গুরুত্বপূর্ণ, যা সিঙ্গেল শট-এর বিপরীত।

নুরি বিলগ ছেইলান

হ্যাঁ, সে [জিওফ এনড্রিও] রাতে খাবারের সময়ও একই কথা জিগ্যেস করেছিল। বস্তুত, ওজু আমার প্রিয় একজন পরিচালক আর আমি ক্যামেরা বেশি নড়াচড়া করি না—কিন্তু, আমি জানি না সেটা ওজুর কারণে নাকি একজন ফটোগ্রাফার বলে। আমি ক্যামেরার অধিক নড়া-চড়া মোটেও পছন্দ করি না, কারণ এটা সবাইকে ক্যামেরা সম্পর্কে সচেতন করে তোলে। আর ক্যামেরার উচ্চতা অধিকাংশ সময় আমিই নির্ধারণ করি, আর আমি মনে করি, ওজুর বেলায় সেটা ঘটে ফাঁকা জায়াগায় উল্লম্ব রেখার অবস্থানের কারণে। বইতে তারা লিখেছে যে, ওজু তার ক্যামেরা ভূমি থেকে ৯০ সে.মি. উপরে রাখত, কিন্তু, আমি তা বিশ্বাস করি নি। এটা নির্ভর করে উল্লম্ব রেখার উপর—আর জাপানিজ বাড়িগুলোতে আপনি তেমন অনেক পাবেন। এসব ছাড়াও চরিত্রের মানসিকতাও গুরুত্বপূর্ণ—যদি একটি লোককে আপনি উপর থেকে শুট করেন, তবে নিচ থেকে তাকে শুট করা আলাদা কিছু। আমি সাধারণত প্রতিকৃতির বেলায় মুখের উচ্চতায় শুট করতে পছন্দ করি। বিশেষত ক্লোজ শটগুলোর বেলায় ১ সেমি ও খুব গুরুত্পূর্ণ। সে জন্য বিষয়টি আপনি সিনেমাটোগ্রাফারের উপর ছেড়ে দিতে পারবেন না, কারণ সিনোমাটোগ্রাফার কখনোই জানে না কিভাবে পরবর্তী শট-এর সাথে যুক্ত হতে হবে, কেবল পরিচালকই জানেন পূববর্তী শট-এর সাথে পরবর্তী শট-এর সম্পর্ক। সেজন্য পরিচালক খুব সাবধানতার সাথে ক্যামেরার অবস্থান নির্ধারণ করেন, যাতে ব্যাঘাত ছাড়াই মানসিকতা সচল থাকে।

জিওফ এনড্রিও

প্রশ্ন- ০৫ : কেন আপনি সিনেমায় প্রচলিত সংগীত ব্যবহার না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন?

নুরি বিলগ ছেইলান

আমি সিনেমায় সংগীত পছন্দ করি না, এটা আমার কাছে নির্ভরতার মতো মনে হয়। যদি আপনি সিনেমাটিক ভাবে কোনো কিছু প্রকাশ করতে না পারেন, তখন সেটাকে ছাপিয়ে যাবার জন্য আপনি সংগীত-এর সহায়তা নিতে পারেন। আমি বিষয়টির বিপক্ষে নই, কিন্ত যদি সম্ভব হয় তবে তা ব্যবহার না করারই চেষ্টা করি। এডিটিং-এর সময় আমি অনেক সংগীতাংশ ব্যবহারের চেষ্টা করি, কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনোটাই ব্যবহার না করার সিদ্ধান্ত নিই। তাছাড়া আমার কাছে সিনেমায় বাতাবরণের শব্দই সবচেয়ে সুন্দর। সুতরাং আমি সংগীত-এর চেয়ে বাতাবরণের শব্দই ব্যবহার করতে পছন্দ করি, কারণ সংগীত বিষয়গুলোকে দমিত করে।

জিওফ এনড্রিও

প্রশ্ন- ০৬ : কেন আপনি সিনেমাটির নাম ‘থ্রি মাংকিস’ দিয়েছিলেন?

নুরি বিলগ ছেইলান

এটি মূলত কনফুসিয়াস থেকে আগত, যেখানে তার একটি ইতিবাচক অর্থ রয়েছে, কিন্তু পরে সেটি নেতিবাচক হয়ে দাঁড়ায়। এটা বাস্তবতা থেকে আমাদের পলায়নপরতার মনোভাব প্রতিফলিত করে।

জিওফ এনড্রিও

এটা কোনো মন্দ দেখে না, শোনে না বা বলে না।

নুরি বিলগ ছেইলান

সেটাই ছিল মূল বিষয়।

জিওফ এনড্রিও

এবং অবশ্যই সিনেমাটি সে সব মানুষ সম্পর্কে যারা ভাব করে যে কিছুই ঘটবে না; এটা বস্তুত মিথ্যা সম্পর্কিত।

প্রশ্ন- ০৭ : আমি মৃত বালকটি সম্পর্কে আগ্রহী, যাকে দু বার দেখা যায়—কেন আপনি তাকে সে দুটি দৃশ্যে রেখেছিলেন?

নুরি বিলগ ছেইলান

আমি চেয়েছিলাম বালকটিকে সে-সব দৃশ্যে রাখতে যেখানে একটি চরিত্রের সহনীয়তা প্রয়োজন, বিশেষত সেই চরিত্রটির ক্ষেত্রে যে কিনা বালকটির মৃত্যুর জন্য এক ধরনের অপরাধ বোধ করে।

জিওফ এনড্রিও

প্রশ্ন- ০৮ : আমরা ‘থ্রি মাংকিস’-্এর লোকেশনগুলো সর্ম্পকে জানতে কৌতূহল বোধ করছিলাম, বিশেষত সেই বাড়িটি এবং যেখানে মহিলাটি রাজনীতিবিদের সাথে দেখা করে। এটি কি ‘কোকা মোস্তাফা পাশা’র নিকটবর্তী কোথাও?

নুরি বিলগ ছেইলান

আপনি ঠিক ধরেছেন। জায়গাটি ছিল ইয়েদিকুল ট্রেন স্টেশনের কাছে, একদম বিপরীতে। তাছাড়াও আমরা ব্ল্যাক সি’র কাছে, এনাটোলিয়ান অংশেও শ্যুট করেছিলাম।

জিওফ এনড্রিও

তাছাড়া বাড়িটি সর্ম্পকে এই বিষয়টিও তো ছিল, যে সেটি ভেঙে ফেলা হবে। কিন্তু আপনি যেভাবে এর চিত্রায়ণ করেছেন, তাতে সিদ্ধান্তটি বাতিল হয়।

নুরি বিলগ ছেইলান

তারাও আমাকে সেটাই বলেছিল, কিন্তু পরে আর করে নি [শ্রোতাদের হাসি]।

জিওফ এনড্রিও

প্রশ্ন- ০৯ : একটি দৃশ্যে, বালকটি যখন দরজার চাবির ফুটোর মধ্যে দিয়ে দেখছিল, তখন আমরা তার মুখে ঘাম ও তা ফোঁটায় ফোঁটায় ঝরে পড়তে দেখি। বিষয়টি কি নিতান্তই অকস্মাৎ ছিল?

নুরি বিলগ ছেইলান

সিনেমার কিছু দৃশ্য নিতান্তই অকস্মাৎ, কিছু নয়। কিছু সময় আপনাকে একটি দৃশ্য ২০-৩০ বার শুট করতে হয় আর তারপর আপনি সেটাই বেছে নেবেন, যেটাতে আপনি মনে করেন যথার্থ বর্ণনা ওঠে এসেছে। উদাহরণস্বরূপ, রান্না ঘরে কম্পনরত ছুরির কথা বলা যেতে, সেটা অকস্মাৎ ছিল না। কিছু কিছু সময় আমি সত্যিই গুলিয়ে ফেলি, কোনো অকস্মাৎ আর কোনটি নয়।

জিওফ এনড্রিও

দুঃখজনকভাবে, এই সন্ধ্যার পরিসমাপ্তি টানতে হবে। আসুন আমরা সবাই করতালির মাধ্যমে নুরি বিলগ ছেইলানকে ধন্যবাদ জানাই।

অরণ্য

অরণ্য

জন্ম ১৯৮১, রাজশাহী। এইচ. আর.-এ এমবিএ। পেশা : ম্যানেজার, এইচ. আর.।

প্রকাশিত বই :
যে বেলুনগুলো রংহীন [কবিতা]
কাক সিরিজ [কবিতা]
এখন আমি নিরাপদ [ছোট গল্প]

ই-মেইল : mail.aronno@gmail.com
অরণ্য