হোম সাক্ষাৎকার ‘নিমজ্জন’ আড্ডা

‘নিমজ্জন’ আড্ডা

‘নিমজ্জন’ আড্ডা
534
0

১৯৭৩ সালের ২৯ জুলাই যাত্রা শুরু ঢাকা থিয়েটারের। আজ সে পা ফেলল ৪৫ বছরে। অত্যন্ত ব্যতিক্রমী নাট্যধারার প্রবর্তক এই সংগঠন ও তার কলাকুশলীদের প্রতি আমাদের সশ্রদ্ধ সালাম। এ উপলক্ষে পরস্পরে ছাপা হলো প্রায় ১০ বছর আগে ‘সাপ্তাহিক ২০০০’ কর্তৃক গৃহীত একটি বৈঠকি বা আড্ডা। এ আড্ডায় অংশ নিয়েছিলেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অরুণ সেন, নাট্যকার সেলিম আল দীন, নির্দেশক নাসির উদ্দীন ইউসুফ ও অভিনেত্রী শিমূল ইউসুফ। আলাপের মূল বিষয় ছিল ‘নিমজ্জন’ নাটক। আড্ডার সঞ্চালনায় ছিলেন জব্বার হোসেন ও শুভ কিবরিয়া…


নাসির উদ্দীন ইউসুফ

একটা বিষয়ে আমি ও শিমূল একমত। আশা করি আপনারাও একমত হবেন। সেটা হচ্ছে, রাষ্ট্র কিন্তু ক্রমশ অমানবিক হচ্ছে। মানুষের সঙ্গে মানবিক আচরণ করছে না। গণহত্যা, লুণ্ঠন, ষড়যন্ত্রের ওপর রাষ্ট্র দাঁড়াচ্ছে। ভালোবাসার ওপর রাষ্ট্র দাঁড়াচ্ছে না। উচিত ছিল ভালোবাসার ওপর দাঁড়ানো। তাহলে হয়তো রাষ্ট্রের চেহারাটা অন্য রকম হতো। আজকের মতো এত দুর্ধর্ষ হতো না। বাংলাদেশের মতো একটা ছোট্ট দেশেও এখন ক্রসফায়ারে লোকজন মারা যাচ্ছে। রাষ্ট্র কখনো রাষ্ট্রের নামে, কখনো রাজনীতির নামে, কখনো অর্থনীতির নামে, কখনো শৃঙ্খলার নামে যখন যে সরকারে থাকছে সে তার ইচ্ছামতো ব্যবহার করছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে রাষ্ট্র আসলে কী? সেলিম কিন্তু এক জায়গায় বলেছে যে, সাম্রাজ্য ও রাষ্ট্রের মধ্যে তফাত কী। সাম্রাজ্যবাদে শুধু গণতন্ত্রই নয়, মানুষেরও কোনো অধিকার নেই। রাজা-রানি হচ্ছে সার্বভৌমত্বের প্রতীক। আর রিপাবলিকের সার্বভৌমত্বের প্রতীক হচ্ছে জনগণ। পাকিস্তানের সার্বভৌমত্ব নির্ভর করে সেনাবাহিনীর ওপর। বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব নির্ভর করে জনগণের ওপর। ভারতের সার্বভৌমত্ব নির্ভর করে জনগণের ওপর। রাষ্ট্রের নানা রকম ফরমেশন আধুনিক যুগেও আছে। সাম্রাজ্য থেকে বেরিয়ে এসেই কিন্তু রাষ্ট্রের মুক্তি ঘটে নি। হয়েছে কী? হয় নি!

সেলিম আল দীন

টলস্টয় ক্রিশ্চিয়ান এটিচিউড থেকে রাষ্ট্রের বিরোধিতাই করেছেন। রাষ্ট্রের নাগরিক হওয়াটাকে তিনি আত্মহত্যার শামিল মনে করেছেন। স্লেভারি মনে করেছেন। আমার কাছে যেটা বিষয় মনে হয়েছে, আমাদের সাহিত্যে বিশ্ব-অভিজ্ঞতাকে রবীন্দ্রনাথ তার অভিজ্ঞতায় রূপান্তরিত করেছেন, কিংবা বলা যায়, তার অভিজ্ঞতাকে বিশ্ব-অভিজ্ঞতায় রূপান্তরিত করেছেন বা নানা দিকে প্রেরণ করেছেন। আমার কাছে এটা একটা চ্যালেঞ্জ ছিল যে, বিশ্বের নানা স্থান, কাল বাংলা মঞ্চে আসে কি না। আমাদের লেখার মধ্যে আসে কি না, যেভাবে আসা উচিত। আমার মনে হলো যদি এই ফর্মে নাটক করি, তাহলে দেশ, কাল, পাত্র, স্থান—এ প্রশ্নগুলো উঠে যাবে। অনেকটা উপমেয়টা দূরে রেখে শুধু উপমানটা নিয়ে অগ্রসর হওয়া। যে বিষয়ে বলা হচ্ছে সে বিষয়টা একেবারেই সত্য। একটা বিষয় বলতে গিয়ে বলা হচ্ছে অন্য কথা। হয়তো বাংলাদেশের কথা বলছে, হয়তো ভারতবর্ষের কথা বলছে। আমার খুব ইচ্ছা বাংলাদেশের মঞ্চে পুরো পৃথিবীটা তুলে আনা। এটাকে হয়তো অনেকে বাড়াবাড়িও বলতে পারেন।

সাপ্তাহিক ২০০০

নিমজ্জনে গল্প নেই। কিন্তু বিচ্ছিন্ন ঘটনাগুলো প্রত্যেকটাই তো একেকটা গল্প।

শিমূল ইউসুফ

নিমজ্জনে কী হয়, আমরা গণহত্যার কথা বলছি আর যে ঘটনাগুলো ঘটছে তা দেখাচ্ছি। আসলে সাধারণভাবে পুরো নিমজ্জনটা যদি পড়া হয়, তাহলে কোনো গল্প নেই। বিচ্ছিন্নভাবে কতগুলো ঘটনা আছে।

নাসির উদ্দীন ইউসুফ

প্রথাগত নাটকে একটা গল্প থাকে, একটা শুরু থাকে, একটা শেষ থাকে এবং সমাপ্তি ঘটে। কিন্তু নিমজ্জনে উল্টো।

অরুণ সেন

আমার যেটা মনে হয়, কেউ যদি গল্প খুঁজে পায় তো সমস্যা নেই। আবার কেউ যদি বলে এতে তো গল্প নেই; তখন তাকে বলব, এভাবে গল্প খুঁজো না। গল্প বলার উদ্দেশ্যে এই নাটক নয়। এর লক্ষ্য, উদ্দেশ্য আলাদা।

নাসির উদ্দীন ইউসুফ

২০০১-এ সেলিম আর আমার মধ্যে একটা আলোচনা হয়েছিল। আমাদের হঠাৎ করে মনে হয়েছিল যে, গল্পের আড়ষ্ট কাঠামো থেকে বের হওয়া যায় কি না। বিসমিল্লাহ খাঁ অথবা আকবর আলী খান যখন বাজাচ্ছেন, তিনি কিন্তু একটা নির্দিষ্ট রাগ বাজাচ্ছেন। এবং ঐ ফরমেটের ভেতর বাজাচ্ছেন। এখন কী হচ্ছে, আমি আমার মতো করে ঐ সুরের সঙ্গে ভাসছি।  পেইন্টিংয়ের ক্ষেত্রেও তাই। আমার কথা হচ্ছে, তাহলে নাটকে কেন গল্প অপরিহার্য হবে? এটা আমার দীর্ঘদিনের একটা প্রশ্ন।

সেলিম আল দীন

আমি মনে করি থিয়েটারে আড়াই হাজার বছর পরে এটা একটা নতুন উপলব্ধি। মনে হয়েছে যে, গল্প দর্শক নিজেরা তৈরি করে নেবে।

শিমূল ইউসুফ

দর্শক কোনো না কোনো জায়গা বা ঘটনার সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে গল্পকে মিলিয়ে ফেলে যে, এটা হয়তো ভারত বা পাকিস্তান, আফগানিস্তান কিংবা বাংলাদেশ। পুরো নাটকে কিন্তু কোনো স্থানের উল্লেখ নেই। শুধু তুতসি হত্যার বিষয়টি উল্লেখ আছে। বাদবাকি যে ঘটনাগুলো বলা হচ্ছে তার কোনো গল্প নেই। সেনেরখিল বা দু-তিনটির উল্লেখ আছে।

নাসির উদ্দীন ইউসুফ

মফিদুল হক নাটক দেখে আমাকে বলল, ইমেজগুলো এত সুন্দরভাবে এসেছে যে, আমি আর গল্প খুঁজি নি। অনেকেই বলেছে, একটু এদিক-সেদিক করা যায় কি না। যদিও আমি তাদের সঙ্গে একমত না। আমার মনে হয় কিছু সংলাপ, বর্ণনা, সেলিম আল দীনের বক্তব্য, বর্তমান বিশ্বের ক্রাইসিসগুলো মানুষকে বলারও প্রয়োজন আছে।

সাপ্তাহিক ২০০০

সভ্যতার ইতিহাস হলো গণহত্যার ইতিহাস। এ বক্তব্যটা নিয়ে যখন নাটকে ফিরে আসি তখন পৃথিবীতে একটা নৈরাশ্য, যন্ত্রণা-কাতরতা—এটাই কি আসলে পৃথিবী? আমাদের মধ্যে তো ভালোবাসা আছে, মমতা আছে…

সেলিম আল দীন

সেটা ভালো করে বোঝার জন্যই তো ওটার দরকার।

অরুণ সেন

ওর লেখায় এবং নাটকে হয়তো একটু অন্যভাবে ইন্টারপ্রেট করা হয়েছে। এবং সেটা নিয়ে আমার ভাবনাও আছে। সেখানে নৈরাশ্য দিয়ে শেষ হয়েছে এমন তো মনে হয় নি।

শিমূল ইউসুফ

একদম শেষটা যদি আপনি মনোযোগ দিয়ে শোনেন তাহলে সেখানে তো ‘তোমার সম্মুখে অনন্ত মুক্তির অনিমেষ ছায়াপথ। তোমার দুই হাতেই তো ধরা ঐ দূর নীলাভের ছত্রদণ্ড। পাঠ করো, পাঠ করো, নতুন কালের গ্রন্থ, চলো মানুষ।’

সাপ্তাহিক ২০০০

কিন্তু বারবার যেভাবে জেনোসাইডের বিষয়গুলো এসেছে তাতে…

সেলিম আল দীন

পৃথিবীতে জেনোসাইডের ওপরেই সভ্যতা বেঁচে আছে। বরং এটার বাহুল্য পুরো শিল্পপ্রয়াসকে ধ্বংস করে দেয় কি না এই ভয়ে ভীত হয়ে আমি সংবরণ করেছি।

শিমূল ইউসুফ

এই পৃথিবী আমাদের কাঙ্ক্ষিত পৃথিবী। সেই পৃথিবীতে আমরা যেতে চাই। আমার সব সময় যেটা মনে হয়েছে যে, সেলিম ভাই, রবীন্দ্রনাথ গণসংগীত লেখেন নি। কিন্তু সেলিম ভাই রবীন্দ্রনাথের যে চিন্তা এবং চেতনা তার সমগ্র জীবনে ধারণ করেছেন, রবীন্দ্রনাথ যে পৃথিবীটা চেয়েছেন সব সময় অর্থাৎ ভেদাভেদহীন পৃথিবী, আমার মনে হয় সেলিম ভাই সেই চিন্তাটা থেকেই নিমজ্জনটা লিখেছেন।

সেলিম আল দীন

আমি যেন পৃথিবীর সমস্ত বিধ্বংসী সবার মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথের চরণপ্রান্তে পৌঁছাতে চাচ্ছি যে ‘এই তোমার পৃথিবী, যেই পৃথিবী তুমি চেয়েছিলে’।

নাসির উদ্দীন ইউসুফ

ইয়াহিয়ার বিপরীতে রবীন্দ্রনাথ দাঁড়িয়েছে, লোরকার হত্যার বিপরীতে রবীন্দ্রনাথ দাঁড়িয়েছে। প্রথম যখন লোকটা যাত্রা শুরু করল। তারপর ঘটনাগুলো একে একে ঘটে যায়। অধ্যাপক বা বন্ধুর বাড়ি পৌঁছা পর্যন্ত যতগুলো ঘটনা ঘটেছে এগুলো কি আদৌ ঘটেছে? স্টেশনের লোকটা ঐ রকম মুখোশপরা, ঐ রকম একটা ঘোড়া কি ছিল? সে যেখানে গেল সেখানে মৃতদেহ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, এগুলো কি আসলেই সত্য? কিন্তু আপনারা যদি ভালোভাবে লক্ষ করেন তাহলে দেখবেন যে, লোকটা বন্ধুর কাছে তো নরমালি পৌঁছেছে। এগুলো তার অভিজ্ঞতাগুলো মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। যেহেতু সে বিশ্বনাগরিক।

অরুণ সেন

নাটকের সমস্ত অংশের মধ্যে রবীন্দ্রনাথের রেফারেন্স রয়েছে। তা এত প্রবল যা না বলে পারা যায় না। রাবীন্দ্রিক বিশ্বাসের আভাসে মনে হয় যেন সমস্ত নাটকটা বাঁধা আছে।

শিমূল ইউসুফ

আমার মনে হয় যে, এটাই তো আমরা চাই। এ রকমই আমাদের বিশ্বাস।

অরুণ সেন

‘আকাশ ভরা সূর্য তারা’কে যেভাবে রাখা হয়েছে সেটার মধ্যে একটা উত্তরণও ঘটে। ‘একলা পথে যেতে যেতে’ সেখানেও রবীন্দ্রনাথ। আমরা যখন উজ্জীবিত হচ্ছি তখনো রবীন্দ্রনাথ। আমাদের বেদনা, আমাদের শোকাহত যে স্থানগুলো, সেখানেও কিন্তু রবীন্দ্রনাথ প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।

সাপ্তাহিক ২০০০

সেই কারণেই কি মিউজিকেও রবীন্দ্রনাথ এসেছে…

শিমূল ইউসুফ

আমার ভেতরে সেলিম ভাইয়ের লেখাগুলো স্পর্শ করে। আমার চিন্তা-চেতনায় সেলিম ভাইয়ের লেখাগুলো থাকে। সেলিম ভাইয়ের লেখার মধ্যে যেহেতু রবীন্দ্রনাথ বারবার এসেছে, ফলে আমার মধ্যেও রবীন্দ্রনাথের সুরগুলো বারবার এসেছে। সেখানে প্রথমেই আমি শুরু করি ‘আনন্দলোকে মঙ্গল-আলোকে’, ‘আলো আমার আলো ওগো, আলোয় ভুবন ভরা’। তারপরে আসছে ‌’আকাশভরা সূর্য-তারা’। আমি তিনটা গানের কিন্তু হামিং দিয়ে সুর রেখেছি।

সাপ্তাহিক ২০০০

মিউজিকটা হয়তো আমাদের রিলিফ দেয়। কিন্তু যখন ইনকা সভ্যতা, বুরুন্ডির হত্যা বা রাষ্ট্রের বিকলঙ্গতার কথা বলা হয় তখন আতঙ্কিত মনে হয়, আমি কি এই পৃথিবীতে আছি? স্যার কি এই জায়গাগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে চিহ্নিত করতে চেয়েছেন?

সেলিম আল দীন

একটা জায়গায় কিছু চরিত্র নিজেই বলে, আমার কি তবে সিজোফ্রেনিয়া হয়ে গেছে। আমি যা দেখেছি বা দেখব এটা কি সিজোফ্রেনিয়া?  এই দৃষ্টি দিয়েই কি আমি পৃথিবীকে দেখব? আবার আরেক জায়গায় বলা হয় এশিয়া, আমেরিকা, আফ্রিকা বিভিন্ন দেশে এইডস, ম্যাডকাউ এগুলো দেখে দেখে মানুষ সম্পর্কে আমার অনেক ধ্রুব জ্ঞান নষ্ট হয়েছে। ফলে আমি মনে করি যে, এটা লেখকের নিরপেক্ষতার প্রমাণ করে।

নাসির উদ্দীন ইউসুফ

আমার মনে হয় নিমজ্জন সেলিম আল দীনের একটি সামাজিক বাস্তবতা নিয়ে লেখা। মানুষের মধ্যে বা মানবজাতির মধ্যে একটা ওয়েক আপ কল। অর্থাৎ জেগে ওঠো। আমরা তো আজকে সমর্পণ করেছি রাষ্ট্রের যে অমানবিক জায়গা সেখানে। রাষ্ট্রে এসব হচ্ছে অহরহ। আজকে বাংলাদেশের রাজনীতি, ভারতের রাজনীতি, পাকিস্তানের রাজনীতি, আমেরিকার রাজনীতি দেখলে আমরা দেখব যে, সামরিক শক্তি এবং কিছু রাজনৈতিক শক্তি মিলে কাজ করছে। আপনার বেরোবার কোনো রাস্তা নেই। আপনি টেলিভিশনের সামনে ৮ ঘণ্টা থাকছেন আর ৮ ঘণ্টা চাকরি করছেন। ১৬ ঘণ্টা আপনার চলে যাচ্ছে। পৃথিবীটা এত ব্যস্ত হবার দরকার ছিল কি?

সাপ্তাহিক ২০০০

মার্কস তো বলেছিলেন, কর্মের ভার আনন্দে পৌঁছে দেয়া, তেমন জীবনই প্রয়োজন।

সেলিম আল দীন

মানুষ বই লিখবে, মাছ ধরবে এবং গান গাইবে। এটাই তো সুখী মানুষ। অল্পের মধ্যে গুজবেরি হয়ে যাবে।

অরুণ সেন

আমি নিমজ্জনটা খুব নিবিড়ভাবে পড়েছি। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়েছি এবং ভেবেছি। পড়তে পড়তে এবং ভাবতে ভাবতে নিমজ্জনকে একটা অতুলনীয় রচনা মনে হয়েছে। আজকের দিনে আমরা এ সমস্যাগুলো ফেইস করছি এবং এর আশু সমাধান প্রয়োজন। এটা সারা বিশ্বে হচ্ছে। এমন একটি বিষয় সেলিম আল দীন অত্যন্ত ব্যাপকভাবে তুলে এনেছে। আর সেলিমের নাটক সব সময় আমার আগে পড়া হয়েছে। আমার সবচেয়ে বেশি মনে হতো যে, এটা কি মঞ্চে করা সম্ভব, আদৌ সম্ভব? নিমজ্জন পড়ার সময় এটা বেশি মনে হয়েছে। সেজন্য আমি এসেই উদগ্রীব হয়ে গেছি যে, কখন নিমজ্জন দেখব। নিমজ্জন দেখে আমি আশ্চর্য হয়ে যাচ্ছি, এটা আমার প্রাপ্তি। নিমজ্জনের যে মূল অভিজ্ঞতা, সেটা আমি মঞ্চে পুরোপুরি পেয়েছি। এটাই আমার নান্দনিক তৃপ্তি। সেলিমের নাটক আগে পড়া হয় বলে ভাবি এটা মঞ্চে আনা সম্ভব নয়। ৫, ৬, ৭ ঘণ্টা যাবৎ নাটক, এটা তো ভাবা যায় না। আর ভাবলেও তো হয় না। নিমজ্জনের ক্ষেত্রেও খানিকটা তাই হয়েছে। স্যাটায়ারের অংশগুলো প্রয়োজনীয় মনে হয়েছে। সে ফুটবল খেলা হোক, চিড়িয়াখানার সামনেই হোক। কিন্তু শেষটা যেভাবে হয়েছে তাতে সেলিমের কাছ থেকে একটু দূরে সরে আসাও হয়েছে। তবে সেলিমের যে মেজাজ, অভিজ্ঞতা, যা বলতে চায়, সেটা পুরোমাত্রায়ই হয়েছে।

সাপ্তাহিক ২০০০

নিমজ্জনের টেক্সট আগে পড়বার কারণে আমাদেরও মনে হয়েছে এটা কি আদৌ মঞ্চে সম্ভব?

নাসির উদ্দীন ইউসুফ

আমারও প্রায় অসম্ভব মনে হয়েছিল। সত্যিকার অর্থে আমি নিজেও শঙ্কায় ছিলাম। সবচেয়ে জটিল নাটকগুলো করার পরও মনে হয়েছে, এটা সবচেয়ে জটিলতম। এর চেয়ে জটিল কাজ এর আগে আর করি নি। আমি প্রথমেই বলেছি যে, গল্পহীনতা থাকবে। গল্পের কাঠামো থাকবে না। থিয়েটার থিয়েটারের ভাষায় কথা বলবে। আমার একটা কথা মনে হয়েছে, সেলিম লিখতে পারলে আমরা করতে পারব না কেন? সেলিমও আমাকে বলেছে যে, করতে পারবি না মনে হয়। তারপরও আমরা করেছি। আমরা কিন্তু অনেক দৃশ্যই রেখেছিলাম, ফুটবল, রাবারের নেতা—পরে অনেক দৃশ্যই ফেলে দিয়েছি।

সেলিম আল দীন

ফুটবল খেলা ও গণহত্যা দুটোকে একসঙ্গে মেলাতে পেরে আমার ভীষণ আনন্দ হয়েছে। এ লেখায় যে আনন্দ পেয়েছি, তা আমি আর কোনো লেখায় পাই নি। বিষয়টা আমাকে খুব অবাক করেছে।

সাপ্তাহিক ২০০০

নিমজ্জন দেখে কিন্তু মায়ারহোল্ড, গ্রেটোভস্কি, ব্রেখটের থিয়েটারের কথা মনে পড়ে। কোনো প্রভাব কি এতে কাজ করেছে?

নাসির উদ্দীন ইউসুফ

আমি একশত ভাগ থিয়েটারে বিশ্বাস করি। একদিকে কনস্ট্রাকশন, আরেকদিকে ডিকনস্ট্রাকশন। এটাকে অনেকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করছে। কেউ বলছে পুয়র থিয়েটার, কেউ বলছে মায়ারহোল্ডের থিয়েটার। আবার কেউ বলছে গ্রেটোভস্কির থিয়েটার। আমি আসলে কতগুলো ইমেজ তৈরি করতে চেয়েছি। সেলিম আল দীনের টেক্সটটা অনেক বড়। শিমূল যখন টেক্সটটা ঠিক করে, রিডিং পড়ায় এবং কারেকশন করে তখন প্রথমে ৭ ঘণ্টা করব বলে পত্রিকায় ঘোষণা দিয়েছিলাম। আবার ৯ ঘণ্টাও বলেছিলাম। আমি ৭ ঘণ্টা করব বলে মহিলা সমিতিতে প্ল্যানও দিয়েছিলাম। সকাল বেলা থেকে শুরু করব। লাঞ্চ হবে, বিকেলে টি-ব্রেক হবে এবং সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় শেষ করব। পরে আমি ভেবে দেখলাম, এটা আমাদের দর্শকদের জন্য খুব বোরিং হয়ে যাবে। শুধু হত্যা, হত্যা, গণহত্যা শুনতে শুনতে দর্শক অধৈর্য হয়ে যেতে পারেন। তখন শিমূল এডিটিং পার্টটা করেছে। আমি শিমূলকে বললাম, ১৯৬ থেকে আমরা কেটে ৯১ দৃশ্য করব। সেলিমও রাজি হলো। ৯১টা করতে গিয়েও দেখি ৫ ঘণ্টা লাগে।

সাপ্তাহিক ২০০০

ভিজুয়াল করতে এক ধরনের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাও তো প্রয়োজন। আবার শিল্প সৃষ্টির ক্ষেত্রে সবটাই যে বাস্তব অভিজ্ঞতা থাকতে হবে তাও তো নয়।

নাসির উদ্দীন ইউসুফ

এ বিষয়গুলো আমার দেখা। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে মানুষের লাশ আমার দেখা। মানুষ মারা গেলে দুই-তিন দিন পরে শরীরটা কেমন হয়। কুঁকড়ে যায়, বেঁকে যায়, এবড়ো-খেবড়ো হয়ে থাকে। আমি যখন খুব ছোট, ১৯৬২ সালে চট্টগ্রামে একটা বড় ঝড় হয়েছিল। আমি সকালবেলা যখন উপকূলে আমাদের বাড়ির কাছে এলাম, দেখলাম হাজার হাজার মানুষের লাশ, কারো হাত সোজা, কারো পা বাঁকা, কারো ঘাড় কাত হওয়া। সেই দৃশ্য এবং ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর ঘূর্ণিঝড়ে মৃত মানুষের শরীরের অংশটাই কিন্তু আপনারা নিমজ্জনে দেখেছেন। সেখানে ১০ লাখ লোক মারা গেছে। আমি অনেক পোড়া মানুষের মৃতদেহ দেখেছি। আরেকটা বিষয় খেয়াল করবেন, আমার থিয়েটারে একটা অ্যাপ্রোচ থাকে যে, আমি শুরু করব একটা বিন্দু থেকে, শেষও করব ঐ রকম একটা জায়গায়। আমার বনপাংশুল, হাতহদাই বা বিনোদিনী-তে কিন্তু একই অ্যাপ্রোচ আছে।

সেলিম আল দীন

মায়ারহোল্ড ১৯২০ সালেই দেখিয়েছেন মঞ্চের তিনটা ভাগকে কিভাবে ব্যবহার করা যায়। বাচ্চু (নাসির উদ্দীন ইউসুফ) অদ্ভুতভাবে মঞ্চকে ব্যবহার করেছে। কোনো না কোনোভাবে লম্বা লম্বা দড়ি, মানুষের মুণ্ডু এসব মিলিয়ে মনে হয়েছে যে পুরো মঞ্চটা সক্রিয়।

সাপ্তাহিক ২০০০

মঞ্চে ডিজিটাল গ্রাফিক্স ব্যবহার করেছেন। যুক্তিটা কী?

নাসির উদ্দীন ইউসুফ

ঢালী আল মামুনের কথা না বললেই নয়, মাঝে-মধ্যে ঢাকায় আসেন। অসম্ভব ভালো মানুষ। নিজের পয়সা খরচ করে রিহার্সেল করেছেন। মিউজিক, সাউন্ড, অভিনয় সবগুলো যদি একটা ছন্দে না আসে, একের সঙ্গে একে মিশে না যায় তাহলে কিন্তু সমস্যা। স্ক্রিন ব্যবহারের ক্ষেত্রে আমার একটা লোভের ব্যাপার ছিল। আসলে থিয়েটারে আমরা এগুলো ব্যবহার করি না। শিমূলেরও পছন্দ হয় নি। কিন্তু আমি মনে করি যে, টেকনোলজির যুগে এসে আমি যদি একটা বিষয় ভালো কমিউনিকেট করার জন্য টেকনোলজির সাপোর্ট নিই, দোষটা কোথায়?

সেলিম আল দীন

বাচ্চু এটা সচেতনভাবে ব্যবহার করেছে।

নাসির উদ্দীন ইউসুফ

যেমন শ্রমিকদের একটা ডকুমেন্টারি বা দৃশ্য দেখাতে গিয়ে পিসকার্টার প্রজেক্টর ব্যবহার করেছে।

শিমূল ইউসুফ

আমার মনে হয় যে, আমি যদি ভালো পারফরমেন্স করতে পারি, তাহলে পেছনে এগুলো দিয়ে কোনো লাভ নেই, প্রয়োজন নেই।

সাপ্তাহিক ২০০০

ঢাকা থিয়েটারে অনেক সিনিয়র আর্টিস্ট আছেন। কিন্তু তারা কেউই নিমজ্জনে অভিনয় করেন নি…

নাসির উদ্দীন ইউসুফ

আমি মনে করি যে, থিয়েটার সব সময় নতুনের মাঝে বেঁচে থাকে। থিয়েটার কোনো পুরনো মানুষের হাতে থাকে না। এখন যদি বলেন, শিমূল আপা এত বছর ধরে থিয়েটারে কাজ করছেন, তিনি তো পুরাতন। তিনি প্রতিদিন থিয়েটারে আসছেন। প্রতিদিন নতুন মানুষ হিসেবে আসছেন। আরেকটা কথা, এই থিয়েটারটা আমরা যখন ডিজাইন করেছিলাম তখন যে স্ক্রিপ্টটা দাঁড় করালাম, তাতে দীর্ঘমেয়াদি একটা রিহার্সেলের প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল। সেই রিহার্সেলে সিনিয়ররা সময় দিতে পারছিলেন না। ফলে আমি জুনিয়রদের নিয়ে শুরু করি। জুনিয়রদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো—প্রথমত তাদের উচ্চারণ খারাপ। দ্বিতীয়ত, তাদের কল্পনা, পড়ালেখার অভাব। তৃতীয়ত, ওদের অভিজ্ঞতা একেবারেই কম। তখন আমি দেখলাম, যারা আমার সিনিয়র তারা ফিজিক্যালি এটা করতে পারবে না। তারা সময় দিতে পারবে না। এটা আমি তাদের দোষ দিচ্ছি না। এটা হতেই পারে। জীবনের একটা পর্যায়ে এসে মানুষ ব্যস্ত হতেই পারে।

শিমূল ইউসুফ

আমার মনে হয় এই ছেলেমেয়েগুলোর সততা আছে, নিষ্ঠা আছে। যে কারণে তারা আড়াই বছর একনাগাড়ে সময় দিয়েছে।

নাসির উদ্দীন ইউসুফ

আমরা যে প্রোডাকশনটা দাঁড় করালাম, এটা আসলে একটা ধাবমান প্রক্রিয়া। এটা সামনের দিকে দৌঁড়ায়। কখনো পেছনে যাচ্ছে না। এবং পেছনের ঘটনাই সামনে নিয়ে আসছে। আমি ওদের মধ্যে স্পিরিটটা দেখেছি এবং সেই কারণে একটা পর্যায়ে তাদের আমরা অভিজ্ঞতা দেয়া শুরু করেছি। গণহত্যা কী? গণহত্যাগুলোর ছবি দ্যাখো, বই পড়ো, জ্ঞান অর্জন করো—এইসব।

শিমূল ইউসুফ

ইন্টারনেট থেকে ভালো ভালো গণহত্যার ছবি কালেক্ট করে ওদের দেখিয়েছি। ভালো ভালো ফিল্ম যেমন রুয়ান্ডা, বুরুন্ডি, সামটাইম ইন এপ্রিল ইত্যাদি গণহত্যার ছবি দেখতে বলেছি।

নাসির উদ্দীন ইউসুফ

শুধু তাই নয়, ঐ সময়কার অস্ত্রগুলো ইন্টারনেট ঘেঁটে বের করেও তাদের দেখিয়েছি। এমনকি মায়া, ইনকা সিভিলাইজেশন সম্পর্কে পড়তে দিয়েছি। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ওপর যে তথ্যচিত্রগুলো আছে সেগুলোও দেখতে বলেছি। স্টপ জেনোসাইড, বার্থ অব নেশন দেখিয়েছি। রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ দাশ, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় পড়তে বলেছি।

অরুণ সেন

আমার নিজের যেটা হয়েছে, নিমজ্জন পড়তে গিয়ে আমার কম্পিউটারে জেনোসাইডের একটা ফাইল হয়ে গেছে। কারণ আমি ইন্টারনেট থেকে অনেক কিছু ডাউনলোড করেছিলাম।

নাসির উদ্দীন ইউসুফ

আমি একটা কথা প্রায়ই বলি, সেটা শুনতেও হয়তো খারাপ লাগবে যে, কবিতার প্রতিদ্বন্দ্বী হবে থিয়েটার। থিয়েটার দেখলাম, বাসায় চলে গেলাম এটা কিন্তু নয়। আমি বক্তৃতায় প্রায়ই বলি, এই থিয়েটারটা দেখে বাড়িতে যাওয়ার সময় অবশ্যই আপনি গণতন্ত্রের কথা ভাববেন। অবশ্যই মানুষের সম-অধিকারের কথা ভাববেন, অবশ্যই আপনি গণহত্যার কথা ভাববেন। আমি রাজনীতির জায়গায় দাঁড়িয়ে বলছি না। আমি শিল্পের ভূমিতে দাঁড়িয়ে বলছি। আমাদের আসলে আসল মানুষ নেই, যারা থিয়েটারটা করবে। তখনই বাচ্চাদের নিয়ে কাজ করতে হয়। যাদের বয়স ৩০-এর নিচে। কেন? নানা কারণে—১. আনুগত্য ২. সময় ৩. কমিটমেন্ট ৪. শারীরিক ক্ষমতা দরকার ঘণ্টার পর ঘণ্টা রিহার্সেল করতে। প্রথম এক বছর গেল এই কাটাছেঁড়া, পড়া। ওরা প্রত্যেকে সেলিম আল দীনের ফুল স্ক্রিপ্ট মুখস্থ করেছে। মাসের পর মাস লেগেছে। কান্নাকাটি করেছে।

সেলিম আল দীন

আমার তো মনে হয় অদূর ভবিষ্যতে আর কখনোই আমার নাটক মঞ্চস্থ হবে না। এটা দেখার পর কেউ আর সাহসও করবে না।

শিমূল ইউসুফ

আমরা আরেকটা কাজ করেছি যে, পুরো নাটকটা সবাইকে মুখস্থ করতে হবে। কে কখন কোন ন্যারেশন বা কোন জায়গাটা করবে, এটা আমরা আগে ডিজাইন করি নি। কাজেই পুরো নাটক  চৌদ্দজন ছেলেমেয়ে সবার মুখস্থ। এভাবে একটা সুবিধা হলো, নেরেশনগুলো সবাইকে ভাগ করে দিতে পারলাম এবং তারাও বলতে পারল। তারপর বাচ্চু ওদেরকে দিয়ে ব্লকিং ও ফিজিক্যাল কাজটা করালো। ফিজিক্যাল কাজটা মানে মঞ্চ অভিনেতাকে দাঁড় করানো। সেট, লাইট, মিউজিক সবই প্রয়োজন, কিন্তু অভিনেতা না দাঁড়ালে কিছুই দাঁড়ায় না। সে জায়গাটায় তরুণদের নিয়ে আমাকে চ্যালেঞ্জ করতে হয়েছে।

নাসির উদ্দীন ইউসুফ

আমি মঞ্চে বাচ্চাদের একদম আনতে চাই না। কারণ তাদের পেছনে দুজন লোককে খাটতে হয়। একটা ঠুনকো বিষয় হলেও বাচ্চাকে হ্যান্ডেল করা টাফ। ধর্ষণের বর্ণনায় আমি ভাবলাম একটা পুতুল ব্যবহার করব এবং ওর মুখে একটা লাল স্কচটেপও মেরে দেব। এভাবে ভাবতে ভাবতে আমি সিদ্ধান্ত নিলাম যে, পুতুলটা মুস্তফা মনোয়ার সারের কাছে চাইব। স্যার আমাকে বললেন, তুমি যে আমার কাছে চেয়েছ, কিন্তু তুমি তো বলছ না তুমি কেমন চাও। বললাম, আমি দুটো বেণি চাচ্ছি। লাল ফিতার দুটো বেণি আমার ছোটবেলার স্মৃতি। আর মেয়েটাকে বাঙালি ঢং দিলে আমার কোনো অসুবিধা নাই। কারণ দেশটা বাংলাদেশ। আপনারা খেয়াল করলে দেখবেন কয়েকটা সাধারণ জিনিস আছে। যেমন মেয়েটা যখন পেইন্টিংটা করছে, তার জিভ কেটে নেয়ার পর তখন যে কোরিওগ্রাফ বা মিউজিক, সেটা শিমূলের করা। তখন বেহাগের সুর বাজবে এবং পেছনে একটা পেইন্টিং দাঁড়িয়ে যাবে। তখন গোয়ার্নিকা দাঁড়াবার কথা। কিন্তু সেটা দাঁড় করাতে পারি নি। ঢালী আল মামুন তখন বলল, গোয়ার্নিকাকে ভেঙে ব্যবহার করবে। তাই হলো। গোয়ার্নিকার প্রজেকশনের আলো তখন গায়ে এসে পড়ল। এই ডিকনস্ট্রাকশন আমার ভালো লেগেছে।

সাপ্তাহিক ২০০০

নিমজ্জনে কস্টিউমটা শুধু সাদাকালোর মধ্যে রেখেছেন। এর ব্যাখ্যাটা কী? সামগ্রিকতা না অন্য কিছু?

শিমূল ইউসুফ

বাচ্চু যে আইডিয়াটা দিল তাতে ভেতরের ইনার যেটা থাকবে, সেটা একটা কালো, একটা সাদা। প্রথমে আমি ওটা সিলেক্ট করে দিলাম। কিন্তু তারপরে আমি কী দেব সেটা ঠিক বুঝতে পারছিলাম না। পরে আমি দেখলাম যে, আমি যদি সেলাইবিহীন কাপড় দেই তাহলে ভালো। আমার জীবনে একটা ঘটনা ঘটে গেছে যে, আমার ছেলে সম্রাট মারা গেল জুলাইয়ের ৫ তারিখে। সেখান থেকেই আমার মৃত্যু বিষয়ে একটা চিন্তা-ভাবনা এল। সেটা আমার মাথায় ঘুরতে লাগল, মানে সেলাইবিহীন কাপড়। এবং পরে দেখলাম এটা অসম্ভব কার্যকর। কারণ, এটা সহজেই খুলে ফেলতে এবং পরে ফেলতে পারছে। একটা কাপড়েও সেলাই নেই। সব কাপড়ই সুতি ও খদ্দর ব্যবহার করেছি। কিন্তু এখানে কোনো দেশ, কোনো জাতি, কোনো কিছুই নির্দিষ্ট নেই। যে কারণে আমি এটা করেছি। শুধু লিমার বাউল এবং সোহরাব-রোস্তমের দৃশ্যে রঙিন কাপড় ব্যবহার করেছি।

সেলিম আল দীন

এটা পিটার ব্রুক অন্যভাবে করেছে। সব দেশের কস্টিউম ব্যবহার করেছে। আর বাচ্চু কোনো দেশের কস্টিউম ব্যবহার না করে অন্য একটা জায়গায় গেছে।

শিমূল ইউসুফ

মিউজিক নিয়ে আমি আরেকটু বলতে চাই। নাটকটা আমার প্রায় দেড়শবার পড়া হয়েছে। তা ছাড়া সেলিম ভাইয়ের চেষ্টাটাও আমি বুঝি। আমার প্রথম থেকে মনে হয়েছে প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্য দুটোকে যদি আমি মেলাতে যাই, তাহলে আমাকে পিওর ক্লাসিক্যাল মিউজিক এবং ওয়েস্টার্ন ক্লাসিক্যাল মিউজিক—এ দুটোকে এক করতে হবে। যে কারণে কিছু গান একেবারে পিওর ক্লাসিক্যাল মিউজিকের ওপরে আছে। ওয়েস্টার্ন ক্লাসিক্যাল মিউজিকের মধ্যে গিটার, এন্থেসাইজার সব ক্লাসিক্যাল মিউজিকের মধ্যে দিয়ে ভেঙেও রিদমটা গণসংগীতের রিদমে রেখেছি। কিছু গণসংগীতও আছে, যেটা সেলিম ভাই অনুবাদ করেছেন। যেমন জারার গান, তুতসিদের গান—এসব। আবার সচরাচর গণসংগীতও না। আর একেবারে শেষের যে গানটা ‘ফেলে এলাম, ফেলে এলাম’, এটা সেলিম ভাই ঢাকা থিয়েটারের ৩০ বছর পূর্তি উপলক্ষে কার্ডে লিখেছিলেন। ‘বাদলধারা সাঙ্গ হলে বিদায় সুর বাজে’—এ গানটা আমার খুব মজা লেগেছে। সেলিম লিখেছে একেবারেই রবীন্দ্রসংগীতের ‘বাদলধারা হলো সারা, বাজে বিদায় সুর, গানের পালা শেষ করে দে, যাবি অনেক দূর’। আমি বললাম, কোনোমতেই আমি যদি রবীন্দ্রসংগীতের ধারে-কাছে না যাই, তাহলে আমাকে অবশ্যই পিওর ক্লাসিক্যালের দিকে আশ্রয় নিতে হবে। মজার ব্যাপর হচ্ছে, অনেকে ভাবে এটা নজরুলসংগীত। আসলে এটা আমার কম্পোজ করা।

নাসির উদ্দীন ইউসুফ

মিউজিকের শেষেও দেখবেন রবীন্দ্রনাথের ব্যবহার আছে যে, ‘যেতে যেতে একলা পথে’-য় সেটার ব্যবহার দেখেছেন। এবং তা খুব ভেঙে ভেঙে করা। যেমন ‘আকাশ ভরা সূর্য-তারা’—এখানে তাল এবং সুর কিন্তু ঠিক আছে। লয়টা বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। ওয়েস্টার্ন রিদমটা আনার জন্য।

অরুণ সেন

আমার মনে হচ্ছে যে, আমার স্মৃতিতে আসছে রবীন্দ্রনাথের ‘আকাশ ভরা সূর্য-তারা’, অনেকেই একটু অন্যভাবে করেছে। রবীন্দ্রনাথের অনেক গানই ওরা তাল, লয়, পরিবর্তন করে করেছে। ব্যাপারটাকে একটু অন্যভাবে করার চেষ্টা করেছে।

নাসির উদ্দীন ইউসুফ

আরেকটা বিষয়, আমাদের যে ড্রামের শব্দ সেটা কিন্তু ওয়েস্টার্ন না। এটা ধামার শব্দ।

সাপ্তাহিক ২০০০

নিমজ্জনের চিন্তাটা কোন জায়গা থেকে শুরু হয়েছিল, মানে বিশেষ কোনো প্রণোদনা…

সেলিম আল দীন

আমাদের ঢাকা থিয়েটার ২০০১ সালে ‘ঔপনিবেশিক শিল্পনীতির অবলেশ আর রাখা উচিত নয়’ এ নিয়ে একটা সভা করেছিল। তাতে শাহাদত চৌধুরীও ছিল। প্রায় দেড়শ কবি, সাহিত্যিক, শিল্পী ছিলেন। তখন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, মান্নান সৈয়দ, রফিক আজাদ, মোহাম্মদ রফিক, সুভাষ চক্রবর্তী, যোগেন সেন, দেবেশ রায় ছিলেন। প্রত্যেকটা মিডিয়ার সঙ্গে একটা রিলেশনের ব্যাপার আছে। লেনদেনের ব্যাপার আছে। ঢাকা থিয়েটার এ কাজটা করতে পেরেছিল। তখন এ সম্মেলনের কারণে আমাদের মধ্যে একটা নতুন জগৎ তৈরি হয়ে গেল। এবং আমার শিল্পরীতির ক্ষেত্রেও একটা নতুন চিন্তা উদ্ভাবনের প্রয়োজন হলো। তখন মনে আছে, একদিন আমি চাঁদপুর গিয়েছিলাম। সেখানে প্রচণ্ড ধূলিঝড়ের মধ্যে আমার সঙ্গীকে আর খুঁজে পাচ্ছি না। তখন ওই সময় হুট করে বিষয়টা আমার মাথায় এসে ঢুকল। ফোর রিয়েলিজমের চিন্তাটা এসে ঢুকাল। একের পর এক ঘটনা ঘটে যাচ্ছে। তখন আস্তে আস্তে লিখতে শুরু করলাম।

শিমূল ইউসুফ

সেলিম ভাই নাটকটি লেখার পরেই কিন্তু ডাকাতিয়া নদীতে লঞ্চডুবি হয়েছিল। অনেক লোক মারাও গিয়েছিল। সেলিম ভাই আসলে অদ্ভুতভাবে ফোর রিয়েলিজমে বিশ্বাস করেন।

সেলিম আল দীন

ফোর রিয়েলিজম আসলে এক ধরনের ফোর শ্যাডো। আমরা নরমালি নাটকের সংলাপের মধ্যে আগামীর ছায়াসম্পাত করি। এখন এখানে যা ঘটছে তার ওপর নির্ভর করে আমি নিশ্চিত হতে পারি যে তাহলে আগামীতে এই ঘটনাটা ঘটবে। আমি যে শহরে যাচ্ছি সে শহরের শুরুটা যদি ইনফার্নোটা এ রকম হয়, সে ইনফার্নো থেকে বেরিয়ে আমি ঠিক আরেকটা ইনফার্নোতে ঢুকে পড়ব। সামনে যে বাস্তবতাটা অনিবার্য হয়ে থাকে সেটাই সম্মুখ-বাস্তবতা। এটা কৃষ্ণকুমারী-তে পাওয়া যাবে না। আবার চিরকুমার সভা-য় আছে। রুবাইয়েতের নাটকেও আছে।

সাপ্তাহিক ২০০০

আপনারা যে বর্ণনাত্মক রীতির কথা বলেন, সেটা তো নিমজ্জনে নেই…

নাসির উদ্দীন ইউসুফ

এটার সঙ্গে আমি একেবারেই একমত না। আমাদের লোকনাটকে প্রচুর বডি ল্যাঙ্গুয়েজের কাজ আছে। আমাদের ঝুমুর যাত্রায় বডি ল্যাঙ্গুয়েজ আছে। অবাক হয়ে যাই ‘ছুকরা’-এর বডি ল্যাঙ্গুয়েজ দেখে। এখানে আমি কিন্তু বলতে পারি না, আমি লোকনাটক থেকে নিয়েছি। একেবারে মিথ্যা কথা হবে। আমি নিয়েছি একেবারেই আমাদের ক্লাসিক্যাল ধারা থেকে। কিন্তু ব্যবহারটা হচ্ছে অন্য জায়গায়। আমি কিন্তু নির্দিষ্ট কোথাও থেকে কিছু নিই নি। নানা সময়ে নানা ইমেজ আমার মধ্যে তৈরি হয়েছে। নাটকের সফলতা নির্ভর করে তার ভিজ্যুয়াল নির্মাণের ওপর, এটা আমি বিশ্বাস করি। কারণ আমি বলেছি, থিয়েটার ইজ নাথিং বাট ভিজ্যুয়াল পোর্ট্রেট।

সাপ্তাহিক ২০০০

আমরা তো নিজেদের অভিজ্ঞতা, বিশ্লেষণ, পর্যবেক্ষণ জানালাম। অরুণদা আপনার অভিজ্ঞতা জানতে চাই।

অরুণ সেন

আমি বাংলাদেশের মানুষ না হয়েও ওটা পড়তে পড়তে এবং সেদিন দেখতে দেখতে মনে হয়েছে এটা যেন বাংলাদেশেরই ঘটনা। অন্যগুলো যেন উপমান হিসেবে আসছে। উপমেয়টা আসলে আমাদের ইমিডিয়েট অভিজ্ঞতা। এবং প্রত্যেক দৃশ্যে মনে হয় এটা যেন বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা। যখন লেখককে রিমান্ডে নেয়া হয় তখন মনে হয় এটা সাম্প্রতিক বাস্তবতা।
আমার মনের মধ্যে এখনো ঘুরপাক খাচ্ছে। বাংলাদেশের অভিজ্ঞতায় বলতে হয়, দেশের যে যন্ত্রণা, সে যন্ত্রণাটাই উঠে এসেছে। এবং যন্ত্রণাটাই প্রধান হয়ে উঠছে। সেটা আমার কাছে বড় ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে সবচেয়ে বড় ব্যাপার, নাটকটা সচেতনতার জায়গায় কাজ করেছে। এই উদ্দেশ্যটা সফল হয়, তা হলেই-বা কম কী? হয়তো হত্যা-গণহত্যার ইতিহাসের মধ্যে থেকে এ দেশে নতুন কোনো সিদ্ধান্ত হবে।

 

সাপ্তাহিক ২০০০ ॥ ৩০ নভেম্বর ২০০৭

সোহেল হাসান গালিব ও নওশাদ জামিল সম্পাদিত কহনকথা বই থেকে