হোম সাক্ষাৎকার নাজমুল আহসানের সাথে কথাবার্তা

নাজমুল আহসানের সাথে কথাবার্তা

নাজমুল আহসানের সাথে কথাবার্তা
273
0

সম্প্রতি উত্তরের হাওয়ার ব্যানারে জেব্রাক্রসিং থেকে প্রকাশিত হয়েছে কবি নাজমুল আহসান-এর প্রথম কবিতার বই ক্রমশ জলের দিকে। কবির প্রথম বই প্রকাশের পর পাঠকের মনের বিভিন্ন জিজ্ঞাসা নিয়ে তার মুখোমুখি হয়েছেন সমসময়ের এক তরুণ কবি অয়ন আহমেদ…


সা ক্ষা  কা 


অয়ন আহমেদ

প্রথম কবিতাগ্রন্থ প্রকাশের অনুভূতি বলুন।

নাজমুল আহসান

প্রথম প্রকাশের অনুভূতি সবসময় ব্যতিক্রম। এই অনুভূতি সমগ্র সত্তাকে নাড়া দেয়। স্মরণ করিয়ে দেয় সমগ্র জীবন, কবিতার পেছনে তার ক্ষরণ। কবি-বন্ধুদের কাছ থেকে অতটা সহযোগিতা পাব আশা করি নি। আমি উচ্ছ্বসিত, উদ্বেলিত।

অয়ন আহমেদ

কবিতায় কী কী বৈশিষ্ট্যের উপস্থিতি থাকলে সেটি কবিতা হয় বলে মনে করেন?

নাজমুল আহসান

আমি মনে করি, সমস্ত রচনার প্রথম গুণ হওয়া উচিত সহজতা। এবং অল্প কথায় পাঠককে গভীর অনুভূতির ভেতর নিবিষ্ট করা। কবিতায় এইসব গুণের সাথে যেটি থাকতে হয় বলে মনে করি তা হলো, শিল্পমান, দর্শন এবং সুখপাঠ্যতা। যেহেতু জ্ঞানের জন্য আমরা কবিতা পড়ি না তাই কবিতা পড়ে যদি আমি আনন্দ না পাই সেটি আমি কেন পড়ব! আনন্দের জন্য অবশ্য কবিতার বৈশিষ্ট্যগুলোকে ক্ষুণ্ন করা চলে না।


পাঠকের উপযোগী করতে যেয়ে কবিতাকে নিশ্চয়ই এত বেশি সহজবোধ্য করবেন না যাতে কবিতার শিল্প ও দর্শন মার খেয়ে যায়।


অয়ন আহমেদ

কবিতা উপলব্ধির জন্য কবি বা পাঠক কাকে বেশি ছাড় দিতে হবে বলে মনে করেন?

নাজমুল আহসান

ওরকম নিয়ম করে ভালো ফল বোধহয় হয় না। প্রচলিত আছে, বাংলাদেশে সবাই কম-বেশি লেখে। কথাটা মিথ্যে নয়। বাস্তবে দেখা যায় কবিতার বইয়ের বিক্রি কম, কিন্তু প্রকাশিত হচ্ছে বেশি। প্রশ্ন আসতে পারে এই দেশে এত কবি, তারা না পড়েই লিখছেন? উত্তরে না-ই বলতে হবে। সঙ্গত কারণেই বলতে হয় কবিতার যেমন লেখক আছেন; পাঠকও তেমনি কম নন। যারা কবিতা লেখেন তারা কবিতা অনেক বেশি পড়ছেন অন্য বইয়ের তুলনায়। আর যারা কবি নন; সাহিত্যানুরাগী তারা কেবল অন্যান্য বই কিনছেন, পড়ছেন—কবিতার বইয়ের কাছে যেতেও তারা নারাজ! কারণ কবিতা তারা বুঝেন না; এটা তাদের কাছে বিরক্তিকর কেবল নয় রীতিমতো ধূম্রজালও। কবিরাই কেবল কবিতার পাঠক। এ কারণেই কবিতার পাঠক কম, প্রকাশ বেশি। কবিতায় যিনি স্বতঃস্ফূর্ত নন তিনি যতই ছাড় দেন না কেন কবি বা কবিতার পাঠক হতে ব্যর্থ হবেন। যিনি কবি তিনি পাঠকের উপযোগী করতে যেয়ে কবিতাকে নিশ্চয়ই এত বেশি সহজবোধ্য করবেন না যাতে কবিতার শিল্প ও দর্শন মার খেয়ে যায়।

অয়ন আহমেদ

সমকালীন বাংলা কবিতা ও কবিদের বিষয়ে কিছু বলুন।

নাজমুল আহসান

সমকালে ভালো কবিতা হচ্ছে। অনেকের কবিতা আমি নিয়মিত পড়ি। মিডিয়ার কল্যাণে এত বেশি কবি ও কবিতা পাচ্ছি যে কারো কারো কবিতা পড়ে রীতিমতো বিস্মিত হই—এত ভালো কবিতা! পরে বিচার-বিশ্লেষণে অল্প কিছু কবিতাই কেবল ভেতরে জায়গা পাচ্ছে। অধিকাংশ কবিতাই বর্ণনা নির্ভর—একটা জায়গায় পৌঁছানোর বিষয়টি অনুপস্থিত। অবশ্য বর্ণনাও একটা শিল্প সেটিও সকলের থাকে না। মাঝে মাঝে খুব কষ্ট পাই এই দেখে যে, অসামান্য কাব্য প্রতিভা থাকার পরও কবিতা বিষয়ে সামান্য জ্ঞানের অভাবে অনেকের ভালো কবিতাগুলো ভালো কবিতা হয়ে উঠছে না। আমি অনেক কবিকে দেখছি বাহুল্যদোষে তারা দুষ্ট। যা কিছু কবিতা নয় কবিতা থেকে যদি তারা তা ছেঁটে ফেলতে জানতেন তাদের অনেক কবিতাই ভালো কবিতার আসনে জায়গা করে নিতে পারত।

অনেকের নিজের বই প্রচারের স্টাইল দেখে হাসি পায় এই জন্য যে, তার কথায় এবং আচরণে এটা পরিষ্কার যে, তিনি ভাবছেন তার গ্রন্থটি বাংলা সাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ—অথচ শিল্পের বিষয়টি পুরোপুরি কনফিউজিং—কবি বা শিল্পীরাই বোধকরি সবচেয়ে বেশি কনফিউশনে ভোগেন। তাই এমন ধারণা কবির জন্য নয় কেবল ভাঁড়ের জন্যই যুতসই। আমি আশাবাদী এ কারণে যে, আমাদের মাঝে Satisfaction আসে নি। যেহেতু অমাদের মাঝে অতৃপ্তি আছে আর এই অতৃপ্তিই আমাদের উন্নতির শিখরে নিয়ে যেতে পারবে বলে আমি প্রত্যাশা করি।

অয়ন আহমেদ

কবির কনফিউশনটা কেমন যদি বলতেন।

নাজমুল আহসান

কবিতায় ডিটারমিনেশনের কিছু নেই। আপনি ভাবতে পারেন আপনার কবিতা ভালো হয়েছে—এতটুকুই—এর বেশি নয় কিন্তু। কালের নিরিখে তা কতটুকু টিকবে হলফ করে কেউ বলতে পারবে না। কবিতা কবির কাছে অন্ধের হাতি দেখার মতো—কে এটাকে কিভাবে নেবে কে জানে।


পৃথিবীর বেস্ট সেলার বইগুলো লেখকদের কেউ কেউ নিজ কাঁধে বয়ে নিয়ে বিক্রি করেছেন।


অয়ন আহমেদ

কেউ বলছেন শহুরে জীবন কবির কবিতাকে আবেগহীন রুক্ষ করে দিয়েছে—কেউ বলছেন আবেগি কবিতার মৃত্যু অনিবার্য—আপনি কী বলেন?

নাজমুল আহসান

আবেগ সৃষ্টির প্রতীক। একে অস্বীকার করলে কিচ্ছু হবে না। আবেগি কবিতা বলতে তারা বোধকরি আবেগসর্বস্ব কবিতাকে বুঝান। শুধু আবেগনির্ভর কবিতার ব্যাপারে তাদের সাথে আমার দ্বিমত নেই। আবেগকে বাদ দিয়ে যে কবিতা সৃষ্টির প্রচেষ্টা তা তো কবি হওয়ার একান্ত বাসনা থেকে সৃষ্ট জোরপূর্বক প্রক্রিয়া—এ ধরনের কবিতার মৃত্যুও অনিবার্য বলে আমি মনে করি। হ্যাঁ, শহুরে কবি—যাদের প্রকৃতির কাছাকাছি যাওয়ার সুযোগ কম তাদের কবিতায় বুদ্ধিমত্তার সাথে রুক্ষতা যুক্ত হচ্ছে—দেখতে পাচ্ছি।

অয়ন আহমেদ

বর্তমানে আত্মপ্রচার আর পুরস্কারের যুগ চলছে। আপনার পাণ্ডুলিপিটিও উত্তরের হাওয়া থেকে সিলেক্টেড। এসব সিলেকশন বা পুরস্কার নিয়ে নানা নেগেটিভ কথাবার্তা শোনা যায়।

নাজমুল আহসান

নিন্দুকদের কাজ নিন্দা করা। নিন্দার মাধ্যমে মূলত তারা বোঝাতে চান এমন পুরস্কার তাদেরও প্রাপ্য। আবার তাদের কেউ যখন পুরস্কার পেয়ে যান তখন কিন্ত তাদের নিন্দা বন্ধ হয়ে যায়। এমন অনেক কবি অতীত হয়েছেন—বর্তমানে অনেকেই তাদেরকে নোবেল পাওয়ার যোগ্য ভাবছেন কিন্তু জীবদ্দশায় তাদের কারো কারো ভাগ্যে কবি হিসেবে স্বীকৃতিও মিলে নি—কেবল বিষোদগার আর তিরস্কারই তাদের নিয়তি ছিল। এখন আমরা স্বীকৃতি দিতে শিখেছি—ব্যাপারটা পজেটিভলি নেয়া উচিত। তবে অপাত্রে কন্যা দানের মতো পুরস্কারটি যেন অযোগ্যের হাতে না যায় সে বিষয়ে সিরিয়াস থাকা উচিত। আর আত্মপ্রচারের যে বিষয়টি তাকেও পজেটিভলি দেখা উচিত। নিন্দুকদের জ্ঞাতার্থে বলছি, পৃথিবীর বেস্ট সেলার বইগুলো লেখকদের কেউ কেউ নিজ কাঁধে বয়ে নিয়ে বিক্রি করেছেন—এমন দৃষ্টান্তও আমাদের সামনে রয়েছে।

অয়ন আহমেদ

অনেকের মতে কবিতা গ্রুপিং কিংবা সিন্ডিকেটের কবলে চলে গেছেএ বিষয়ে আপনি কী ভাবছেন?

নাজমুল আহসান

সিন্ডিকেট বা গ্রুপিং, সাহিত্য-উন্মাদনার জন্য ভালো। সিন্ডিকেট করে যদি কাউকে বয়কট করা হয় সেটি দুঃখজনক। এমন যদি কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী করে থাকেন তবে তিনি বা তারা নিজেদের বয়কটের রাস্তাটা উন্মোচন করে দিলেন।

অয়ন আহমেদ

সমকালে সাহিত্যে কেবল স্তুতিই হচ্ছে, সমালোচনা হচ্ছে না বললেই চলেআপনার কী মনে হয়?

নাজমুল আহসান

সমালোচক এবং যিনি সমালোচিত হচ্ছেন উভয়ের দৃষ্টিভঙ্গি বড় ফ্যাক্টর। সমালোচনা মানে কেবল নেগেটিভ তা তো নয়এর পজিটিভ-নেগেটিভ দুটি দিকই আছে। অনেকে সমালোচনা আন্তরিকভাবে নিতে পারেন না। কেউ কেউ ইন্টেনশনালি ব্যক্তিগত আক্রোশ থেকে সমালোচনা করেনসেরকম সমালোচনা আন্তরিকভাবে নেয়ার তো কোনো প্রশ্নই আসে না। আবার কেউ নিজের অযোগ্যতা হেতু নেগেটিভ সমালোচনা করেন কিংবা কবিকে যথোপযুক্তভাবে ফুটিয়ে তুলতে ব্যর্থ হনতাও তো আন্তরিকভবে গ্রহণ করা যায় না।

উভয় পক্ষের মনে রাখা উচিত যে, সমালেচনাও একটা শিল্প। এটি থাকার দরকার আছে। আধুনিককালে স্তুতিটাই বেশি হচ্ছে ঠিক। কেননা লেখা প্রকাশের এত এত অনলাইন সুবিধা যেটির অনেকগুলোতে লেখা প্রকাশে কারো অনুমতি নিষ্প্রয়োজন। এত ফ্রিহ্যান্ড লেখার সুবিধা পেতে পেতে একসময় তিনি আর সমালেচনা এক্সেপ্টই করতে পারেন না। এ ক্ষেত্রে প্রশ্ন তো আসতেই পারে আপনার সমালোচনা করে কেন আমি আপনার বিরাগভাজন হব।


জীবদ্দশায় কবি হিশেবে স্বীকৃতিই পান নি এমন অনেক কবি মৃত্যুর পর অমরতা লাভ করেছেন।


অয়ন আহমেদ

আপনার কাছে কবিত্বের আনন্দ-বেদনা কিরকম?

নাজমুল আহসান

কবিদের অনুভূতি বোধকরি অন্যদের চেয়ে তীক্ষ্ণ হয়। বেদনা হলো কেউ-ই কবিকে বুঝে নাএকজন কবিই অন্য একজন কবিকে ভুল বুঝে সবচেয়ে বেশি।

অয়ন আহমেদ

অনেক আগে থেকেই লিখছেন, লেখা প্রকাশে এত দেরি করলেন?

নাজমুল আহসান

এ দেশে অনেক কবিই তো আছেন। যিনি কবি, অপ্রকাশিত থাকলেও তিনি কবি। এত অসংখ্য কবির মাঝে আমি কবিতায় নতুন বার্তা বা পরিবর্তন আনতে পারি নিএ বোধ থেকে এতদিন লেখা প্রকাশ করি নি। এখন প্রকাশ করেছি কেবল প্রকাশের খাতিরেইএই গ্রন্থ নিয়ে আমার কোনো উচ্চাশা নেই।

অয়ন আহমেদ

আপনার পাণ্ডুলিপিটির প্রতি পাঠকের তো উচ্চাশা থাকবেই। যেহেতু এটি অসংখ্য পাণ্ডুলিপি থেকে ‘উত্তরের হাওয়া’ কর্তৃপক্ষ বাছাই করেছেন।

নাজমুল আহসান

অনেক বড় বড় পুরস্কার বিজয়ীদের অনেকে হারিয়ে গেছেন। আবার জীবদ্দশায় কবি হিশেবে স্বীকৃতিই পান নি এমন অনেক কবি মৃত্যুর পর অমরতা লাভ করেছেন, এমন দৃষ্টান্ত অনেক। পাঠকের উচ্চাশা থাকতেই পারে। পাঠকের প্রতি এবং ‘উত্তরের হাওয়া’র প্রতি আমার আস্থা এবং সম্মান দুটিই আছে।

অয়ন আহমেদ

জন্ম ১৯৮৬, বংশাল; ঢাকা।

শিক্ষা : বিএ অনার্স [ইংরেজি]।

পেশা : শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত ।

প্রকাশিত কবিতাগ্রন্থ —

রৌদ্রজলের কাল [জেব্রাক্রসিং, ২০১৮]
শহরটি কাচের উৎপ্রেক্ষার [তিউড়ি, ২০১৯]

ই-মেইল : ayonahmed0403@gmail.com

Latest posts by অয়ন আহমেদ (see all)