হোম সাক্ষাৎকার কবি মজিদ মাহমুদের সঙ্গে আলাপ

কবি মজিদ মাহমুদের সঙ্গে আলাপ

কবি মজিদ মাহমুদের সঙ্গে আলাপ
1.43K
0

মজিদ মাহমুদ আশির দশকের একজন গুরুত্বপূর্ণ কবি, প্রাবন্ধিক ও কথাসাহিত্যিক। তাঁর প্রকাশিত কাব্য— মাহফুজামঙ্গল (১৯৮৯), গোষ্ঠের দিকে (১৯৯৬), বল উপখ্যান (২০০০), আপেল কাহিনী (২০০১), ধাত্রী ক্লিনিকের জন্ম (২০০৫), সিংহ ও গর্দভের কবিতা (২০১০), দেওয়ান-ই-মজিদ (২০১১), গ্রামকুট (২০১৫); প্রবন্ধ ও গবেষণা— নজরুল তৃতীয় বিশ্বের মুখপাত্র (১৯৯৭), কেন কবি কেন কবি নয় (২০০১), ভাষার আধিপত্য ও বিবিধ প্রবন্ধ (২০০৫), নজরুলের মানুষধর্ম (২০০৫), উত্তর-উপনিবেশ সাহিত্য ও অন্যান্য (২০০৯), রবীন্দ্রনাথের ভ্রমণ-সাহিত্য (২০১১), সাহিত্যচিন্তা ও বিকল্পভাবনা (২০১১), রবীন্দ্রনাথ ও ভারতবর্ষ (২০১৩), সন্তকবীর শতদোঁহা ও রবীন্দ্রনাথ (২০১৫), ক্ষণচিন্তা (২০১৬); গল্প-উপন্যাস— মাকড়সা ও রজনীগন্ধা (উপন্যাস, ১৯৮৬), সম্পর্ক (গল্প, ২০১৯); শিশু-সাহিত্য— বৌটুবানী ফুলের দেশে (১৯৮৫), বাংলাদেশের মুখ (২০০৭); অনুবাদ— অজিত কৌড়ের গল্প (২০১৬), মরক্কোর ঔপন্যাসিক ইউসুফ আমিনি এলালামির ‘নোমাড লাভ’ (যাযাবর প্রেম)। এছাড়া তিনি ‘পর্ব’ নামে একটি সাহিত্য-চিন্তার কাগজ সম্পাদনা করেন।

সম্প্রতি, ২৫ মার্চের গণহত্যা বিষয়ে বাংলা একাডেমি আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি ছিলেন আমন্ত্রিত বক্তা। অনুষ্ঠানের দুতিন দিন আগে ফেসবুকে তার বিরুদ্ধে কেউ কেউ জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি ও অর্থনীতির সাথে যুক্ত থাকার অভিযোগ তোলে। এমনকি অনুষ্ঠানস্থলে শারীরিকভাবে তাকে লাঞ্ছনার হুমকি প্রদান করা হয়। এতে নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করে বাংলা একাডেমি। অবস্থাদৃষ্টে কবি মজিদ মাহমুদ এ অনুষ্ঠানে যোগদান করা থেকে বিরত থাকেন।

এই বিব্রতকর পরিস্থিতিতে আমরা পরস্পর-এর পক্ষ থেকে কথা বলেছি অভিযুক্তের সঙ্গে। খোলাখুলি জানতে চেয়েছি তাঁর সম্পর্কে। এবং তা জানাতে চাইছি পরস্পরের পাঠকদের…

– গালিব


সোহেল হাসান গালিব

মজিদ ভাই, আপনাকে স্বাধীনতা দিবসের শুভেচ্ছা জানাই। যদিও আজ ৩০ মার্চ। স্বাধীনতার এই মাসে আমরা পরস্পরের পক্ষ থেকে আলাপ জুড়েছি এমন একজন লেখকের সাথে, যার বিরুদ্ধে স্বাধীনতা বিরোধী চক্রের দোসর বলে অভিযোগ উঠেছে। আমার তো মনে হয়, মার্চ মাসেই এ আলাপ সেরে নেয়া ভালো। আপনি কী বলেন?

মজিদ মাহমুদ

হাসালেন গালিব। সত্যিই হাসি পাচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় আমার বয়স ছিল পাঁচ বছর। পুরো পরিবারই ছিল মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে। আমাদের বাড়িতে মুক্তিযুদ্ধের একটি স্থানীয় ক্যাম্পও ছিল। পুরো এলাকাটিতেই বলা চলে কোনো রাজাকার ছিল না। সেই রোষে গ্রামটি জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছিল। নগর পুড়িলে দেবালয় কি এড়ায়? এরপরে আমরা সপরিবার শরণার্থী হয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে অনেক দিন অন্য গ্রামে ছিলাম। দেশ স্বাধীনের পরে ফিরে আসি। মুক্তিযুদ্ধের আগে থেকেই আমাদের বাড়িটি এলাকার একটি তথ্যকেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। কারণ গ্রামটি ছিল দরিদ্র, আমাদের বাড়িতে একটি অতিরিক্ত ঘর ছিল, যেটিকে আমরা খানকা ঘর বলতাম। তাছাড়া বাড়ির চারদিকে চারটি ঘর থাকায় মাঝখানে একটি বিরাট উঠান ছিল—সেখানেও অনেক লোক বসতে পারত। বাড়িতে একটি রেডিও ছিল। এলাকায় খুব বেশি লোক লেখাপড়া জানত না, আমার অগ্রজ সহোদররাই স্কুল-কলেজগামীদের অন্যতম। ফলে মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সরাসরি তাদের যুক্ত হওয়া সহজ হয়েছিল। বাবাও খুব সাহসী ও ন্যায়পরায়ণ ছিলেন। আপনি শুনলে আশ্চর্য হবেন, আমার বড় দুই ভাই-ই কবিতা লিখতেন। মেজ ভাইয়ের কবিতা তো এলাকায় খুব পপুলার ছিল; কবিয়ালরা হাটে হাটে গেয়ে বেড়াতেন। তার ‘শেখ মুজিবের মুক্তি চাই’, ‘সোনার বাংলা স্বাধীন হলো’ এসব কবিতা এখনো এলাকার অনেকের মুখস্থ আছে। আমাদের সেই পিতৃভিটাতে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিতে এখনো একটি পাঠাগার রয়েছে। প্রতিদিন বিকালে মেজ ভাইয়ের নেতৃত্বে তখন স্বাধীনতার পক্ষে মিছিল বের হতো; রঙিন কাগজের মালা ছাড়াও আমাদের ছোটদের আকৃষ্ট করার জন্য বঙ্গবন্ধুর গলায় চকলেটের মালা থাকত। মিছিল শেষে এটি ছিল আমাদের উপরি পাওয়া। যদিও আপনার প্রশ্নের ধরন বুঝতে আমার কষ্ট হচ্ছে না, তবু আপনার দিক থেকে আরও ক্লিয়ার হওয়া দরকার।


আমার আশলে এডওয়ার্ড কলেজে পড়া হয় নি। আমি সরকারি শহিদ বুলবুল কলেজের ছাত্র ছিলাম।


সোহেল হাসান গালিব

আশলে আমি আগেই দুঃখ প্রকাশ করে রাখি, আজকের এই সাক্ষাৎকার কিছুটা জেরামূলক হয়ে উঠতে পারে বলে। আপনি হয়তো অনুমান করতে পারবেন, আমাদের সুহৃদ, বন্ধুবান্ধবের মধ্যেও বেশ কৌতূহল ও সংশয় তৈরি হয়েছে অভিযোগটা নিয়ে। ফলে, তাদের জিজ্ঞাসাগুলিও নিশ্চিতভাবেই আমার মাধ্যমেই উঠে আসবে এখানে। যেমন একটা কথা বলা হচ্ছে, আপনি যখন পাবনা এডওয়ার্ড কলেজের ছাত্র, সে সময়ে আপনি ছিলেন শিবিরের সভাপতি।

মজিদ মাহমুদ

বাহ! ভালোই তো। অভিযোগের যা বহর, মূর্খরা কবে না বলে বসে আমার আহ্বানে ভারত-বিভাগ হয়েছিল। হ্যা, বিষয়টা বেশ আলোচিত। বাংলা একাডেমি গণহত্যা দিবসে এবার আমাকে অলোচক হিশাবে থাকার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। একাডেমির আমন্ত্রণপত্র তাদের ওয়েব-সাইটে প্রচার হওয়ার পরে জনৈক ব্যক্তি ফেসবুকে প্রথম এই প্রচারণা শুরু করে। কেন যেন একটি সংঘবদ্ধ প্রচারক দল বেশ কয়েক বছর ধরে নীরবে সক্রিয় ছিল। সুন্দরী মেয়ে আর সৃষ্টিশীল মানুষকে সবকিছু আমলে নিলে চলে না। অবশ্য এটি আমার দৃষ্টিগোচর হওয়ার পরে আমি ফেসবুকে যখন বিষয়টি সামনে নিয়ে আসলাম, তখন সেই ব্যক্তি তার ফেসবুক আইডি সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়। পরে সে আবারও আবির্ভূত হয়ে আগের অভিযোগ থেকে সরে এসে একটি গোঁজামিল ধরনের ব্যাখ্যা দিতে চেষ্টা করে। বলে সে এসব শুনেছে। সে কেবল এডওয়ার্ড কলেজে আমাকে শিবিরের সভাপতিই বানায় নি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদলের নেতাও বানিয়েছে। আশলে অভিযোগকারী খুবই কাঁচা এবং অপোগণ্ড ধরনের। কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ করার আগে কিছুটা জেনেটেনে নিলে ভালো হয়। সবকিছুতেই বড্ড তাড়া। আমার আশলে এডওয়ার্ড কলেজে পড়া হয় নি। আমি সরকারি শহিদ বুলবুল কলেজের ছাত্র ছিলাম। কবি ওমর আলীর জন্য ওই কলেজে ভর্তি হয়েছিলাম। চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ার সময় কবিতা লিখতে শুরু করি। কবিতাই ছিল আমার ধ্যানজ্ঞান। আর সেই জন্যই ওমর আলীর টানে বুলবুল কলেজে ভর্তি হওয়া। ওমর আলী নিজেকে জনসন, আর আমাকে বসওয়েল বলতেন।

সোহেল হাসান গালিব

আপনার শিক্ষাজীবন সম্পর্কে আরেকটু বিস্তারিত বললে ভালো হয়। মানে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়। আমি যতদূর জানি আপনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েও কিছুদিন পড়াশোনা করেছেন।

মজিদ মাহমুদ

এইচএসসি পরীক্ষার পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে ভর্তি হওয়ার চেষ্টা করেছিলাম। ফরম-টরম তুলেছিলাম। পরীক্ষাও দিয়েছিলাম। বাড়ি থেক রাজি হলো না; বলল, ডাক্তারি-ইঞ্জিনিয়ারিং হলে কথা ছিল। বাংলায় যখন পড়বা, ঢাকায় কেন! আমি সাইন্স থেকে এসএসসি ও এইচএসসি করি। তখন ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ারের একটা বাজার ছিল। কিন্তু ততদিনে আমি পুরোদস্তুর একজন কবি হয়ে উঠেছি। ফলে ওসব পড়া বৃথাই। কয়েক মাস এডওয়ার্ড কলেজের বাংলা বিভাগে ঘোরাঘুরিও করেছিলাম বটে। কিন্তু বাড়ির অসহযোগিতায় মন ভেঙে গিয়েছিল; তারা কিছুতেই চাইত না আমি কবি হই, বাংলা পড়ি, চট গায়ে ঘুরি। বড় ভাই এক সময় কবিতা লিখলেও বাবা-মার কাছে আমায় নিয়ে যথেষ্ট বিপত্তি করত। তাই ভাবলাম, পাসকোর্সে পরীক্ষা দিয়ে বিসিএস-টিসিএস করা যায় কিনা। সে সময় এরকম একটা প্রবণতা ছিল। অনেকেই শুধু বিএ পাস করে ম্যাজিষ্ট্রেট হয়েছিল। কিন্তু হলো না। পাস করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রিলিমিনারি করতে গেলাম। সেখানেও মন বসল না। কয়েক মাস ছিলাম বটে, ক্লাস করার চেয়ে ক্যাম্পাসে আড্ডা দিয়ে কবিতা গেয়ে সময় পার করেছি। রাজশাহী ক্যাম্পাসটা খুব সুন্দর। বিশেষ করে বিকালে ছেলেরা দলবেঁধে মেয়েদের হলের সামনে মেলা বাঁধিয়ে দিত। সেও সইল না। এক বন্ধুর স্ত্রীকে ঢাকা বিশ্বিবদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় সহায়তা করতে এসে ওর হলো না, আমিই ভর্তি হয়ে গেলাম। পাসটাস করার অনেক পরে বেসরকারি ইস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে লিঙ্গুইস্টিক পড়েছিলাম।

সোহেল হাসান গালিব

আপনি এইচএসসি পাস করেছিলেন কোন কলেজ থেকে?

মজিদ মাহমুদ

স্কুলও বেশ কয়েকটা ছিল। এসএসসি পর্যন্ত অন্তত গোটা চারেক। এসএসসি পাস করি রাধানগর মজুমদার একাডেমি পাবনা (আরএমএকাডেমি) থেকে। এইচএসসি পাস করি সরকারি শহিদ বুলবুল কলেজ থেকে। ওই বছরই কলেজ প্রথম সরকারি হয়েছিল।

সোহেল হাসান গালিব

আপনার যখন প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয়, তখন আপনি কিসে পড়েন? প্রথম বইটি কবে বেরিয়েছিল?

মজিদ মাহমুদ

প্রথম কবিতা কবে প্রকাশিত হয়েছিল, খুব একটা মনে নেই। তবে ৮/৯ বছর বয়স থেকেই নিয়মিত লিখি। স্কুল থেকেই কোথাও না কোথাও ছাপা হতো। নিয়মিত দেয়াল-পত্রিকা প্রকাশ করতাম স্কুলে। আমার প্রথম বই প্রকাশিত হয় এইচএসসি পরীক্ষার পরে, ১৯৮৫ সালে। নাম বৌটুবানী ফুলের দেশে—কিশোর-কবিতার বই। ওই একটিমাত্র বই আমি লিখেছি এখন পর্যন্ত, অপেক্ষাকৃত ছোটদের জন্য। তবে বইটি আমি সারাজীবন বয়ে চলেছি। ওই নামে আমার প্রতিষ্ঠিত শিশুদের জন্য একটি স্কুল রয়েছে।


আমার মেজ ভাই আব্দুল খালেক বিশ্বাস। যিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা। তার বইয়ের সংখ্যা অন্তত বিশটা।


সোহেল হাসান গালিব

আপনার সহোদরদের মধ্যেও লেখার অভ্যাস ছিল, এমনটা বলেছেন শুরুতে। তাদের কি কোনো বই বেরিয়েছে?

মজিদ মাহমুদ

অনেক বই। আমার মেজ ভাই আব্দুল খালেক বিশ্বাস। যিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা। তার বইয়ের সংখ্যা অন্তত বিশটা। তিনি মূলত নাটক ও গানের লোক। বাংলাদেশ বেতারের তিনি তালিকাভুক্ত গীতিকার। এক সময়ে পত্র-পত্রিকায় কলামও লিখতেন। পুলিশ বিভাগের চাকরিসূত্রে পুলিশের বিষয়াদি নিয়ে বই লিখেছন। ঈশ্বরদী উপজেলার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস লিখেছেন। সিনেমা বানিয়েছেন, সিনেমায় অভিনয় করেছেন। এমনকি বাংলা একাডেমি প্রকাশিত লেখক চরিতাভিধানে তার পরিচিতিও রয়েছে। বড় ভাই আরো বেশি লিখতেন। আমরা ছোটবেলায় দেখেছি বাকশো-ভর্তি তার কবিতা-গল্প-উপন্যাস। কিন্তু বই খুব একটা বের হয় নি। মালা নামে একটা প্রেমের কবিতার বই বেরিয়েছিল।
মনে রাখবেন তারা আমার সহোদর হলেও বয়সে অনেক বড়। বিশেষ করে বড় ভাইয়ের সব কাজ প্রায় পাকিস্তান পর্বে। আমার মনে হয় আমার বড় ভাইয়ের বই তখন ছাপানোর ব্যবস্থা করা গেলে আজ তিনি পরিচিত লেখক থাকতেন। আমি প্রায়ই ভাবি ওই গ্রামে বসে তারা এসব লেখার অনুপ্রেরণা কোথায় পেয়েছিলেন। তবে বংশের একটি ধারা ছিল, আমার দাদা যাকে আমরা কেউ দেখি নি, তিনি নাকি মনসামঙ্গলের পালা গাইতেন।

সোহেল হাসান গালিব

তারা কি আজকের এই পরিস্থিতির কথা জানেন যে, তাদেরই এক সহোদরকে শিবির-বান্ধব বলে অভিযোগ করা হচ্ছে?

মজিদ মাহমুদ

বড় ভাই খুব মুমূর্ষু। ব্যাংক কর্মকর্তা ছিলেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরে যারা অগ্রণী ব্যাংকে অফিসার হিশাবে যোগদান করেছিলেন তিনি তাদের একজন। মেজ ভাই জানেন। মর্মাহত হয়েছেন। প্রতিবাদ জানিয়েছেন। সোসাল মিডিয়ায় উপস্থিত ছিলেন। মামলা করায় আমার অনীহা জানানোর পরেও তিনি নিজে বাদি হয়ে থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেছেন। তাছাড়া তার ঠিকানা না জানায় তিনি মামলা করতে পারেন নি।

সোহেল হাসান গালিব

মামলা করার ব্যাপারে আপনার অনীহার কারণ কী? এটাকে উদারতা ভাবার পাশাপাশি গোপন কোনো দুর্বলতা ভাবার সুযোগও তো আছে। সেটা কি ভেবেছেন?

মজিদ মাহমুদ

আমি তো আর মামলাবাজ লেখক নই। অতীতে কেউ আমার বিরুদ্ধে কিংবা আমি কারো বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাই নি। মামলা কারো বিরুদ্ধে করা মানে নিজেও তার সঙ্গে চলা। আমাদের দেশে মামলা তো রাতারাতি নিস্পত্তি হবার নয়। তাছাড়া যে অভিযোগটি করেছে, তারা নিঃসন্দেহে দুষ্ট লোক। তাদের পক্ষে যে কোনো বে-আইনি কাজ করা সম্ভব। আইনের প্রতি যাদের ন্যূনতম শ্রদ্ধা নেই তাদের সঙ্গে পারা আমার কম্ম নয়। প্রতিকার চাইতে গিয়ে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। তাছাড়া কোথাকার কে বলল, তাকে আমি গুরুত্বপূর্ণ করে তুললাম, সেটি উচিত হবে বলে আমি বিবেচনা করি নি। তাছাড়া এদেশে সব লেখককের বিরুদ্ধেই এসব কখনো না কখনো করা হয়েছে। প্রকৃত লেখকের জন্য পরিণামে এসব খুব একটা খারাপ কিছু হয় না। তারা হয়তো কারো দ্বারা ব্যবহৃত হয়েছে; কিংবা বাংলা একাডেমির পক্ষে আমাকে ডাকা তারা বিবেচনা মনে করে নি। কারণ এখন অনেকেই ভাবে রাষ্ট্রের যে কোনো প্রতিষ্ঠানে কেবল প্রকাশ্য রাজনৈতিক দলের কর্মীদেরই বৈধ অধিকার রয়েছে। তার যোগ্যতা অভিজ্ঞতা ও কর্মের কোনো মূল্য নেই।
গোপন বলে তো একজন লেখকের কিছু থাকে না। আর প্রতিষ্ঠান তো সরকারেরই নিয়ন্ত্রণাধীন। সরকার চাইলেই সে-সব উদ্ঘাটন করতে পারে। আর ব্যক্তি হিসাবে তো আমি দুর্বলই; অন্তত যারা এ ধরনের হটকারীর আশ্রয় নিতে পারে তাদের তুলনায়।

সোহেল হাসান গালিব

এই যে হুট করে একজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হলো, অমনি বাংলা একাডেমি তা আমলে নিল, এই উদাহরণটা কি ভালো হলো? এখন যে কোনো লেখকের বিরুদ্ধে যে কেউ এই ধরনের নিন্দাশর নিক্ষেপে উৎসাহী হয়ে উঠবে, সত্যতা প্রমাণের বালাই না রেখে। এই গোষ্ঠীকে তো জবাবদিহির আওতায় আনা দরকার ছিল মনে হয়। তা না করে প্রকারান্তরে বাংলা একাডেমি তো উশকানিদাতা হিশেবে দাঁড়িয়ে গেল। এবং কিছুটা আপনিও। নাকি?

মজিদ মাহমুদ

আমি তো একজন ব্যক্তি। ইতিহাসে আমিই এ ধরনের প্রথম লেখক নই। প্রতিদিনই এ ধরনের লেখক-নিপীড়নের ঘটনা ঘটছে—নানা স্বার্থান্বেষী পক্ষ থেকে। বাংলা একাডেমি হয়তো এর প্রতিকার করতে পারত। বাংলা একাডেমির বর্তমান মহাপরিচালকের সামনেই তো আমার তিন দশকের লেখকজীবন। বাংলা একাডেমির বর্তমান সভাপতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার সরাসরি শিক্ষক ছিলেন। আমি প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর থেকে তারা বিগত তিন দশক যাবৎ আমাকে কাছ থেকে জানেন। সুতরাং তাঁদের উচিত এ ব্যাপারে একটি ব্যবস্থা নেয়া কিংবা আমায় একটি ব্যাখ্যা দেয়া। আমার যদি এমন কোনো ইমেজ থাকত তাহলে গণহত্যার মতো এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আমাকে আমন্ত্রণ জানায়! তারা আমাকে কবি ও গবেষক হিসাবে মূল্যায়ন করেন! আমি কোনো রাজনীতির সঙ্গে থাকলে তো তারা জানতেন।
প্রকৃতপক্ষে  তাদের হাতেও এর প্রতিকার আছে কিনা আমার জানা নেই। তারাও হয়তো নীরবে আমার দশাপ্রাপ্ত।

সোহেল হাসান গালিব

এখন সাক্ষাৎকারগ্রহীতাও কি ঝুঁকির মধ্যে পড়ছেন না!

মজিদ মাহমুদ

আমরা একটি অস্থির সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। একটি পক্ষ আরেকটি পক্ষের প্রতি সহানুভূতিশীল নয়। প্রতিপক্ষের যৌক্তিক কোনো দাবির জন্যও তারা সামান্য ছাড় দিতে নারাজ। ১৯৭২ থেকে ১৯৯২ পর্যন্ত এই বিশ বছর ছিল আমাদের সক্রিয় ছাত্রত্বের কাল। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হওয়া এবং একটি যুদ্ধোত্তর সময়ের ভঙ্গুর অর্থনীতি ও সামরিক শাসনের কালে আমাদের বেড়ে উঠতে হয়েছে। এখন যেসব তরুণের বয়স তিরিশের নিচে তারা এখন পছন্দ মতো দলীয় সরকারের আমলে বসবাস করছে। এমনকি ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার প্রথমবার ক্ষমতায় আসার পর দ্বিদলীয় ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বাইশ বছর অতিক্রান্ত হয়ে গেছে। ফলে বর্তমান ক্যাথলিকদের পোপের চেয়ে একটু কট্টর হওয়াই স্বাভাবিক। একটি ঝড়ের পরে স্বার্থসংশ্লিষ্ট অনেক তৃণ উড়ে যায়। জাতির এই মহান ইস্যুকে লাভজনক ব্যবসায় থেকে দূরে রাখাই উত্তম।
তো, ঝুঁকি কোথায় নেই? প্রতিদিন সড়ক দুর্ঘটনায় বহু লোক প্রাণ হারাচ্ছে, আগুনে দগ্ধ হচ্ছে, রোগ-শোকে কষ্ট পাচ্ছে—এসবের সঙ্গে না হয় এটিও যুক্ত হলো। তবে আমার মনে হয় সাক্ষাৎকারগ্রহীতা সাক্ষাৎকারদাতার মতো এতটা ভীরু নয়।


আমি ‘নজরুল ও জিয়া’ রচনায় দলীয় কর্মী বিবেচনায় কোথাও বলি নি, জিয়ার ঘোষণায় কিংবা নেতৃত্বে দেশ স্বাধীন হয়েছে; কিংবা বঙ্গবন্ধুর প্রসঙ্গ এড়িয়ে গিয়েছি।


সোহেল হাসান গালিব

হা হা হা। সাক্ষাৎকারদাতাকে কিছুটা আপসকামী এবং কৌশলী বলেও সন্দেহ হয় বটে। যেমন, বিএনপির আমলে তিনি লিখলেন ‘নজরুল ও জিয়া’, আবার আওয়ামী জামানায় লিখে বসলেন ‘নজরুল ও বঙ্গবন্ধু’।

মজিদ মাহমুদ

আমি কর্মস্থল থেকে বিনা-বেতনে ছুটি নিয়ে নজরুল ইন্সটিটিউটের গবেষণাবৃত্তির অধীনে ‘নজরুল: তৃতীয় বিশ্বের মুখপাত্র’ শিরোনামে একটি গবেষণা সন্দর্ভ রচনা করি। ১৯৯৭ সালে সেটি ইন্সটিটিউট থেকে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। এই গবেষণা-কর্মের তত্ত্বাবধায়ক হিসাবে ছিলেন আমার শিক্ষক কবি মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান এবং ওই প্রকল্পে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান স্যারও ছিলেন। সেই থেকে নিরবচ্ছিন্নভাবে আমি নজরুল-সাহিত্য নিয়ে কাজ করে যাচ্ছি। সত্যি কথা বলতে কি নজরুলের সাহিত্য-দর্শনই আমার জীবন-দর্শনের কিছুটা অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নজরুল-সাহিত্যে সকল কিছুর ঊর্ধ্বে মানব-কেন্দ্রিকতা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ, সত্য বলতে পিছপা না হওয়া। নজরুলকে নিয়ে এর পরেও আমি নজরুলের মানুষধর্ম নামে বই রচনা করেছি। ১৯৯৯ সালে নজরুল-জন্মশতবর্ষে সাংস্কৃতিক ঐক্যজোট আয়োজিত বছরব্যাপী অনুষ্ঠানে আমি জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রে প্রবন্ধ পড়েছিলাম। এ ছাড়া বাংলা একাডেমি ও নজরুল ইন্সটিটিউটের জার্নালে নজরুলকে নিয়ে আমার একাধিক প্রবন্ধ আছে। কোলকাতার দেশ প্রকাশন থেকে বেরিয়েছে আমার নজরুল সাহিত্যে উত্তর-উপনিবেশ ও সাম্প্রদায়িতা। এছাড়াও নজরুলকে নিয়ে পত্রপত্রিকায় আমার অসংখ্য লেখা ছড়িয়ে রয়েছে। তারই ধারাবাহিকতায় ‘নজরুল ও জিয়া’ এবং ‘নজরুল ও বঙ্গবন্ধু’ প্রবন্ধ দুটি। এ দুটি প্রবন্ধই মূলত নজরুলকে নিয়ে। নজরুল জীবনী রচনার ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধুর অবদান ঐতিহাসিক সত্য। বঙ্গবন্ধুই নজরুলকে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম ঢাকায় নিয়ে আসেন; কবির শেষজীবনে সুখস্বাচ্ছন্দ্যের জন্য সুব্যবস্থা করেন। বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হবার পরে ১৯৭৬ সালে নজরুলের মৃত্যুকালে জিয়াউর রহমান ছিলেন সম্ভবত উপ-সামরিক প্রশাসক। জিয়াউর রহমান বিদ্রোহী কবির লাশ নিজ হাতে কবরে নামান। এটি নজরুল-জীবনের ইতিহাসের অংশ। আমি ‘নজরুল ও জিয়া’ রচনায় দলীয় কর্মী বিবেচনায় কোথাও বলি নি, জিয়ার ঘোষণায় কিংবা নেতৃত্বে দেশ স্বাধীন হয়েছে; কিংবা বঙ্গবন্ধুর প্রসঙ্গ এড়িয়ে গিয়েছি। আমি বরং বলেছি, জিয়া ছিলেন বঙ্গবন্ধুর অধীনে একজন সেনাপতি। রবীন্দ্রনাথের সাম্রাজ্যে যেমন নজরুল, বঙ্গবন্ধুর সাম্রাজ্যে তেমন জিয়া। নজরুল সারাজীবন অসংখ্য জাতীয় নেতা নিয়ে কবিতা রচনা করেছেন, এমনকি বালগঙ্গাধর তিলকসহ হিন্দু-মুসলিম অনেক কট্টরপন্থি জাতীয় নেতাদের নিয়ে কবিতা রচনা করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ও জীবনানন্দ দাশও এ ব্যাপারে পিছিয়ে ছিলেন না। সুতরাং যারা এ ধরনের অনপেক্ষ রচনাগুলো কলুষিত করতে চান তারা মূলত ইতিহাস রচনার আলোগুলো মুছে ফেলতে চান। আপনি কি এমন কোনো প্রকৃত লেখকের নাম বলতে পারবেন, যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর এই দীর্ঘ সময় সাহিত্যের জগতে পদচারণা করেছেন অথচ তাদের সাহিত্যে আমি যা রচনা করেছি তার অস্তিত্ব নেই? তারা এখনো বর্তমান সরকারকে কাছ থেকে সহায়তা দান করছে। বিএনপির আমলেও তো আজকের অধিকাংশ নজরুল-বিশেষজ্ঞগণই নজরুল ইন্সটিটিউটের কাজে জড়িত ছিলেন, এখনো আছেন।
আমার আপসকামিতা তখনই বলতে পারতেন যদি আমি তথ্য প্রয়োগের ক্ষেত্রে দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগ করতাম; কিংবা এইসব রচনা আমি নিজের স্বার্থসিদ্ধিতে ব্যবহার করে থাকতাম। একজন লেখক যেমন নিজের তাগিদে লেখেন তেমনি পত্রপত্রিকার প্রয়োজনে ও অনুরোধে লেখেন—এ দুটি রচনার ক্ষেত্রে তাই ঘটেছে। তবে এর প্রতিপাদ্য বিষয় নিয়ে আমার কোনো অনুশোচনা নেই। আমাদের পাবনা অঞ্চলে সেলিম জাহাঙ্গীর নামে এক মুক্তিযোদ্ধা পাকসেনাদের সাথে সম্মুখযুদ্ধে শহিদ হন; আমি তাকে নিয়েও কবিতা লিখেছি। তিনি তো আর কোনো নেতা ছিলেন না। এ রকম কাল-নিরপেক্ষ অসংখ্য কবিতা আমার ছড়িয়ে আছে। স্বাধীনতার ইতিহাস অর্থবহ করে তুলতে হলে বঙ্গবন্ধুর পাশাপাশি আমাদের জাতীয় বীরদের কৃতিত্বকেও স্মরণ করতে হবে।
তবে নজরুল-গবেষক হিশাবে দুর্ভোগ আমায় ছাড়ে না। আমার নিজ এলাকায় আমার ও আমার পরিবারের অবদানের কথা স্বীকার করেও তাদের কেউ কেউ মসজিদের জন্য আমার দেয়া অনুদান গ্রহণের বিরুদ্ধেও অবস্থান নেয়। অথচ তারা খ্রিস্টানদের দেশে ছেলেমেয়ে পাঠাচ্ছে, মদ ও শুয়োরের মাংসের দোকানে কাজ করছে, খ্রিস্টানের কাছে বেচাকেনা করছে, শরিকদের বঞ্চিত করছে, গোপনে সুদের ব্যবসা করছে, ব্যাংকে অর্থ জমাচ্ছে, সুদ খাচ্ছে, দুর্নীতি করছে, হত্যা করছে, মিথ্যা বলছে—তারা দিব্যি ভালো আছে। আর আমাকে বলতে হচ্ছে, ‘যবন না আমি কাফের ভাবিয়া খুঁজি টিকি দাড়ি, নাড়ি কাছা।’

সোহেল হাসান গালিব

মসজিদে আপনার অনুদান গ্রহণ করতে চায় না! এই ব্যাপারটা একটু খুলে বলবেন?

মজিদ মাহমুদ

মসজিদ-কেন্দ্রিকও তো একটা ক্ষমতাবলয় আছে, নাকি? অধিকাংশ সময় তারা ভুলে যায় মক্কা-মদিনার বিশাল মসজিদের চেয়ে মহানবির খেজুরের পাতার মসজিদ ছিল দামি। এখন অধিকাংশ মসজিদের প্রাপ্ত অর্থের সঙ্গে একটা বাণিজ্যও থাকে। যারা প্রশ্ন করে, শিক্ষা নিয়ে কাজ করে, নারীদের বাল্যবিবাহের বিরোধিতা করে, নারী পুরুষের সম-অধিকারের কথা বলে, যৌক্তিক সমাজ গঠনের কথা বলে, বাংলা শিক্ষার কথা বলে, সহ-শিক্ষার কথা বলে, নিয়মিত মসজিদে যায় না, দাড়িটুপি নেই, পহেলা বৈশাখ পালন করে, অথচ সমাজের প্রতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণ আছে, তাদের তো ঘায়েল করার উপায় এসবই। অর্থাৎ আপনি আমাদের মতো নন, আপনি আদার (আদার ভিক্টোরিয়ান)। তাছাড়া আমাদের গ্রামে আমার পৃষ্ঠপোষকতায় পহেলা বৈশাখের একটি মেলা নিয়েও অনেকে অসন্তুষ্ট। অনেকে মনে করে পহেলা বৈশাখ একটি বেদাতি কাজ। অথচ তারা পহেলা বৈশাখে সরকারি ভাতা নিতে অস্বীকার করে না। অবশ্য সবাই এক রকম নয়। আমি আশলে বলতে চাচ্ছি, আপনি যেখানেই কাজ করুন না কেন, সমাজের কেউ না কেউ তার বিরোধিতা করবে। একটা গ্রাম জাগানোর স্বপ্ন থেকেই কিন্তু আমার এ পথে আসা। প্রত্যেকের মধ্যে যে সুপ্ত ক্ষমতা আছে তা জাগিয়ে তোলা, যুক্তির পথে।

সোহেল হাসান গালিব

সামাজিক-অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রসঙ্গ যখন এলই তখন আপনার পরিচালিত প্রতিষ্ঠান ‘ওসাকা’ নিয়ে একটু জানতে চাই। দৈনিক জনকণ্ঠের ৬ এপ্রিল ২০১০ তারিখে প্রকাশিত ‘যুদ্ধাপরাধীদের মিথ্যাচার ॥ ক্ষমতাসীনরা উদাসীন’ শিরোনামের একটি লেখায় হাবিবুর রহমান স্বপন অভিযোগ করছেন :
‘এনজিওগুলোতে জামায়াতের অবস্থান সুদৃঢ়। পাবনার বড় দু’টি এনজি হচ্ছে আসিয়াব ও ওসাকা। এ দু’টি এনজিওর কর্ণধার হচ্ছেন একজন আমলা। এক সময় পাবনা এডওয়ার্ড কলেজের ছাত্রশিবিরের প্রতিষ্ঠাতা নেতা শরিফুল আলম জিন্নাহ এই এনজিও দু’টির চেয়ারম্যান ও পরিচালক। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আনোয়ারুল ইকবালের সচিব ছিলেন শরিফুল আলম জিন্নাহ। এই সময়ই তিনি বিভিন্ন দাতা সংস্থার সঙ্গে আসিয়াব ও ওসাকার যোগসূত্র তৈরি করে দেন। মোটা তহবিল পেয়ে জামায়াত সমর্থিত এই সংগঠন দু’টি কাজ করছে। এদের সকল কর্মী জামায়াতের সক্রিয় সদস্য।’
এ ব্যাপারে আপনার বক্তব্য কী? আপনি কি এর কোনো প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন?

মজিদ মাহমুদ

এটি কোনো রিপোর্ট নয়। এটি এক ব্যক্তির মন্তব্য-কলাম। যা এর আগে আমার চোখে পড়ে নি। তিনি কিছু না জেনে কিংবা বিদ্বেষপ্রসূত হয়ে বলেছেন। কারও কিছু বলা আর বস্তুনিষ্ঠ প্রতিবেদন এক জিনিস নয়। ওসাকার সাথে কখনো তার কথিত ব্যক্তিনামের কেউ চেয়ারম্যান কিংবা পরিচালক ছিলেন না। তাছাড়াও তিনি বলেছেন, একজন সরকারি কর্মকর্তার কথা। তিনি যদি নিজেও অবৈধভাবে কিছু করতেন তাহলে তো সরকারই ব্যবস্থা নিত। তাছাড়া বলুন তো, সাংবাদিকতার কোনো এথিকসে একজন কারো সম্বন্ধে এ ধরনের ঢালাও মন্তব্য করতে পারে, কারো আত্মপক্ষ সমর্থন ছাড়া?
ধরুন, হাবীবুর রহমান স্বপন নামে এক ব্যক্তি সম্বন্ধে আমি জানি, এক সময় পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার একটি বিদেশি তহবিলে পরিচালিত এনজিও ‘সমতা’য় চাকরি করতেন; মিডিয়ার দায়িত্বে ছিলেন। তারা নানাভাবে এই এনজিও থেকে সুবিধা গ্রহণ করেছেন। দুর্নীতি ও এর পরিচালক সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হওয়ার পরে এটি আর টিকে থাকতে পারে নি। আমি তার ব্যাপারে আরো শুনেছি, সে শুরুতে জামায়াত ইসলামের মুখপাত্র দৈনিক সংগ্রামের রিপোর্টার ছিলেন; দৈনিক দেশের রিপোর্টার ছিলেন। এমনকি সমতার দুর্নীতির সঙ্গেও জড়িত ছিল বলে অভিযোগ আছে। বলা হয়ে থাকে, সমতার পরিচালক সড়ক দুর্ঘটনায় মারাত্মক আহত হলে, তাদের সংকট তৈরি হলে এই ব্যক্তি তখন সোচ্চার হয়ে ওঠেন। অথচ এক দশক ধরে সমতার মিডিয়া সমন্বয়কারী হিসাবে সংস্থার দুর্নীতি থাকলে কিভাবে নীরব থাকলেন। এসবই আমার শোনা, এটি তো রিপোর্ট নয়। তবে তার ব্যাপারে সমতার পুরনো স্টাফরা এ কথা বলে থাকে, তার দৌরাত্ম্যে সাধারণ কর্মচারীরা কাছে ভিড়তে পারত না। রিপোর্ট হতে হলে বিষয়ের বস্তুনিষ্ঠ তথ্য থাকতে হবে এবং আক্রান্ত পক্ষের ভাষ্য নিতে হবে। শোনা কথা রিপোর্ট হতে পারে না। ব্যক্তিগত রাগদ্বেষ কোনো সংবাদ প্রতিবেদনের বিষয় হতে পারে না।
আমার কর্মরত ওসাকা (অর্গানাইজেশন ফর সোশ্যাল অ্যাডভান্সমেন্ট অ্যান্ড কালচারাল অ্যাক্টিভিটিজ) ১৯৯৬ সালে আমার পিতৃভিটায় একটি গ্রন্থন্থাগার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে কাজ শুরু করে। এর নামের সঙ্গে সংস্কৃতির ব্যাপারটি রয়েছে। এটি একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন হিশাবে শুরু হয়েছিল। ১৯৯৮ সালে যখন দেশে ভয়াবহ বন্যা হলো তখন ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য কিছু করার তাগিদ থেকেই তথাকথিত এনজিও ধরনের কাজে যাওয়া। ব্যক্তিগত অর্থ, পারিবারিক অর্থ, বন্ধুদের চাঁদা এসব দিয়েই শুরু হয়েছিল। ১৯৯৮ সালে সমাজসেবা অধিদপ্তরের রেজিস্ট্রেশনের অধীনে পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের অর্থায়নে আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ শুরু করে। এর সকল তথ্য কেবল ধারাবাহিকভাবে নথিবদ্ধ নয়, সমস্ত নিয়ন্ত্রক অথরিটির কাছে রক্ষিত। এর একমাত্র তহবিলের উৎস বাংলাদেশ সরকার, যা পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে এসে থাকে; আর এ প্রতিষ্ঠানের প্রধানগণ দেশের খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ কিংবা সরকারের অবসরপ্রাপ্ত সচিবগণ। ওসাকা বাংলাদেশ সরকারের মাইক্রো ক্রেডিট অথরিটির নিয়ন্ত্রণাধীন একটি প্রতিষ্ঠান।
আমাদের দেশে সাধারণ মানুষজন এনজিও সম্বন্ধে কম ধারণা রাখে। তারা ভাবে এটি ব্যক্তিমালিকানার ব্যবসা। কিন্তু খুব কম লোকই জানে ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গ এনজিও তৈরি করলেও এটি সম্পূর্ণ অলাভজনক জনগণের সম্পত্তি।
আর এটি তো একদিনে গড়ে ওঠে নি। বিগত দুই দশকের বেশি সময় ধরে তিলে তিলে তৈরি হয়েছে, বহুলোকের কর্মসংস্থান হয়েছে, স্থানীয়ভাবে শিক্ষাস্বাস্থ্যে অবদান রাখছে। সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রম এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আর ওসাকায় শতভাগ তো দূরের কথা একজনও জামায়াত-শিবিরের কর্মী-সমর্থক নেই। প্রকাশ্য দু’একজন আওয়ামী লীগকর্মী পাওয়া যেতে পারে, শুরু থেকেই। আসলে এনজিও-তে রাজনীতি করার সুযোগ নেই।


যার নাম করা হচ্ছে সে কি আমার শ্বশুর না বাপ লাগে! তার যে সন্তান এই অভিযোগ করছে তাকে জিজ্ঞাসা করেন, সঠিক তথ্য জানতে পারবেন।


সোহেল হাসান গালিব

কেউ একজন ফেসবুকে লিখেছে, জামায়াত-নেতা মুজাহিদ ফাঁসিতে যাওয়ার আগে তার সমুদয় অর্থ ওসাকায় ডেসপাচ করে গেছে। আপনার বা আপনার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তার সম্পর্ক আদতে কেমন ছিল?

মজিদ মাহমুদ

ভালোই তো! টাকার কথা শুনে প্রলুব্ধ হচ্ছেন নাকি!

সোহেল হাসান গালিব

হা হা হা…

মজিদ মাহমুদ

আশলে কি, আমাদের দেশে ধর্ষককে জেরা না করে ধর্ষিতাকে দ্বিতীয়বার জেরার মাধ্যমে তার ভয়াবহ স্মৃতিগুলো আবারও মনে করে দেয়া হয়। আপনিও ওইসব আইনের প্রতি সামান্য শ্রদ্ধাহীন দুষ্টলোককে প্রশ্ন না করে আমাকে প্রশ্ন করছেন। আপনাকে তো আগেই বলেছি, ওসাকা সরকারের পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের ফান্ড ছাড়া অন্য কোনো ফান্ডে কাজ করে না। যার নাম করা হচ্ছে সে কি আমার শ্বশুর না বাপ লাগে! তার যে সন্তান এই অভিযোগ করছে তাকে জিজ্ঞাসা করেন, সঠিক তথ্য জানতে পারবেন। দেশের প্রচলিত আইন-কানুনের প্রতি সামান্য শ্রদ্ধবোধ থাকলে এ ধরনের অভিযোগ কেউ করতে পারে! এরা কত নোংরা, কত ভয়ঙ্কর! কথিত ব্যক্তির টাকা দেবার ক্ষমতা ছিল কিংবা দিয়েছে, সেটি তো কেবল তার উত্তরাধিকারীদের পক্ষেই জানা সম্ভব। আমি কেমন করে জানব? আমি, আমার পূর্ব-পুরুষ কিংবা আমার সংস্থা এই নামের কোনো ব্যক্তিকে কখনো দেখে নি। কথিত ব্যক্তি কি পর্যায়ের নেতা ছিলেন, কিংবা কোন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন তাও আমার পক্ষে স্মরণ করা সম্ভব নয়। তিনি কিভাবে কাউকে টাকা দিতে পারেন তাও আমার জানা নেই। তার বিচার চলাকালে পত্রিকায় তখন তার সম্বন্ধে যা জেনেছিলাম এতদিনে তাও ভুলে গেছি। যারা তার শোক ভুলতে পারে নি, অভিযোগকারী হয়তো তাদের দলের।
গালিব, আমার মনে হয়, আমাকে যেভাবে জেরা করলেন, ওই কথিত ব্যক্তির অস্তিত্ব থাকলে তাকে, এমনকি বাংলা একাডেমিকেও এভাবে একটা ইন্টারভিউ করতে পারেন।

সোহেল হাসান গালিব

বিষয়টা আমি মাথায় রেখেছি। আমার আগ্রহও আছে। হয়তো কখনো সুযোগ মিলে যাবে। ইনফ্যাক্ট আমি চাই, সবকিছু নিয়ে খোলামেলা কথা বলার একটা পরিবেশ তৈরি হোক। সে যাক, প্রসঙ্গে ফিরি। কোথাও কোথাও এমন অভিযোগও উঠেছে যে, শরিফুল আলম জিন্নাহর সাথে আপনার ঘনিষ্ঠতা বা সখ্য রয়েছে। আশলে তার সম্পর্কেও আমরা বিশেষ কিছু জানি না। একটু বিস্তারিত বলবেন কি?

মজিদ মাহমুদ

এই প্রশ্ন অবান্তর। শরিফুল আলম জিন্নাহ বাংলাদেশ সরকারের একজন বিসিএস কর্মকর্তা। আমি যতদূর জানি তিনি তার সময়ের অন্যান্য আমলাদের মতোই এরশাদের আমল থেকে বর্তমান সরকারের আমল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। আমলারা নিঃসন্দেহে দলীয় সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে পরিবর্তিত হন না। আর নিঃসন্দেহে কোনো আমলা দলও করেন না। করলে কেউ সরকারে থাকতে পারেন না। আর তিনি এডওয়ার্ড কলেজে শিবিরের সভাপতি ছিলেন, সেটি আমার জানার কথা নয়। কারণ আমি তার সময়ে উক্ত কলেজে পড়াশোনাও করি নি। আর আমাদের বয়সের পার্থক্যও বিস্তর। শুনেছি আমি যখন অষ্টম শ্রেণিতে পড়ি তখন তিনি এডওয়ার্ড কলেজে ইন্টারমিডিয়েটের ছাত্র ছিলেন। আর আমি যখন অন্য একটা কলেজে ইন্টারমিডিয়েটর ছাত্র তিনি তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। স্কুলও আমাদের এক নয়, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ও এক নয়। ফলে কথিত সাংবাদিক কী বলতে চেয়েছেন তার কোনো মাথামণ্ডু বোঝার সাধ্য আমার নেই। সরকারি কর্মকর্তা হিসাবে কিংবা এদেশের নাগরিক হিসাবে যদি তাকে কখনো আমার সঙ্গে কথিত সাংবাদিক দেখে থাকেন আর সেটি যদি আমার অপরাধ হয় তাহলে কথিত স্বপন সাহেবের সঙ্গেও আমাকে একাধিকবার দেখা গেছে। মাত্র মাস কয়েক আগে অন্য একজন সরকারি কর্মকর্তার সঙ্গে স্বপন সাহেব শ্যামলী পর্যন্ত আমার গাড়িতে লিফট নিয়েছিলেন। ইভেন, একবার বাসে ঢাকায় আসার পথে অ্যারিস্টোক্র্যাট রেস্টুরেন্টে জোর করে তিনি আমার লাঞ্চ-বিল দিয়েছিলেন। তাহলে কি তিনিও আমার বন্ধু দাবি করবেন!

সোহেল হাসান গালিব

ব্যাপারটা কি এমন, জিন্নাহ, হাবীব ও আপনি একসময় বন্ধুভাবাপন্ন ছিলেন, পরে শত্রুতাপন্ন হয়েছেন?

মজিদ মাহমুদ

না, ব্যাপারটি মোটেও তেমন নয়। হাবীব বা স্বপন নামে যার কথা আসছে বলে আমি মনে করছি, তাকে আমি ১৯৯৮ সালের আগে কখনো দেখি নি কিংবা নাম শুনি নি, অর্থাৎ আমার বত্রিশ বছর বয়সের আগে। কারণ, তার বাড়ি সম্ভবত পাবনা জেলার সাঁথিয়া উপজেলায়, যেটি সাজাপ্রাপ্ত জামায়াত-নেতার এলাকা। উক্ত স্বপন তখন সম্ভবত ঢাকার কোনো একটি দৈনিকের উপজেলা প্রতিনিধি ছিলেন এবং সাঁথিয়ার বিষ্ণুপুর এলাকায় ‘সমতা’ নামের এনজিও-র মিডিয়া সেলে চাকরি করতেন। সমতা মূলত জমি অধিকার নিয়ে কাজ করত। ফলে তাদের সঙ্গে জমি-দখলদারদের মামলা-মোকাদ্দমা লেগেই থাকত। থানা-পুলিশের দরকার হতো। স্বপন সাহেব সমতার পক্ষ থেকে এই কাজগুলো করতন বলে শুনেছি। সমতার একটি নেটওয়ার্কও ছিল, যেখানে প্রশিকা ও ডিএফআইডি ফান্ড করত; এমনকি ১৯৯৮ সালে ওসাকা ওই নেটওয়ার্কের পার্টনার ছিল। তখনই প্রথম হাবীব স্বপন সাহেবের সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটে। তিনি আমার চেয়ে বয়সে প্রায় বছর দশেকের বড়, আমার তিরিশ হলে তার তখন চল্লিশ হওয়ার কথা। কিন্তু তখন আমার মনে হতো, তিনি আমাকে গুরুত্ব দেন; কারণ, একজন কবি-লেখক হিশাবে সবাই আমাকে কিছুটা গুরুত্ব দিতেন। আমার পাবনা ত্যাগের অন্তত এক দশক পরে তিনি পাবনা সদরে বসবাসের জন্য আসেন বলে আমার ধারণা; আর সেটিও সমতার চাকরিসূত্রে। কারণ পাবনাতে আমার স্কুল-কলেজের অধ্যয়নকালে এই নামের কাউকে চিনতাম না। আমি যতদূর মনে করতে পারি, সেই সময়ে দুএকবার আমি সাঁথিয়ার সমতা অফিসে নানা কারণে গেছি। তখন তাকে দেখেছি এবং বলতে শুনেছি, ‘নিজামী আমার মামা, অধ্যাপক আবু সাইয়িদ আমার চাচা’। অবশ্য এটা কোনো দোষের নয়, আমি কেবল স্মৃতিচারণের স্বার্থে বলছি। এমনকি সমতা এনজিও-র নির্বাহী পরিচালক কাদের মাস্টার সাহেব, যিনি যে কোনো অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বপন সাহেব ও সাংবাদিকদের সামনে এ কথা বলতেন—সাঁথিয়া উপজেলার একজন নির্বাহী কর্মকর্তা, যিনি এক সময়ে শিবির-নেতা ছিলেন (তার নাম মনে নেই)—তার কল্যাণেই মূলত তাদের (সমতা’র) আজকের এই সমৃদ্ধি। অবশ্য তিনিও জামায়াতের নিন্দা করতেন, হয়তো তখন ১৯৯৮ সাল বলেই। আমার পাবনা ত্যাগের বছর দশেক পরে স্বপন সাহেব পাবনায় আসলেও চলতি পথে দু’একবার দেখা হয়েছে। তখনও তিনি আমায় যথেষ্ট গুরুত্ব দিতেন বলে মনে হতো। এমনকি ২০০১ সালে নতুন সরকার ক্ষমতায় আসলে তিনি আমাকে পাবনার এক সাংবাদিকের বিটিভি-তে নিয়োগ ঠেকানো এবং একজনকে নিয়োগ প্রদানের জন্য সুপারিশ করেন। তিনি হয়তো জানতেন না, আমি কতটা ক্ষমতাহীন। আমার কথায় কেউ নিয়োগ দেনও না, ঠেকানও না। এটা জানার পর থেকেই হয়তো তিনি আমার ব্যাপারে হতাশ হয়েছেন। আমি প্রায়ই এ কথা শুনে থাকি, তিনি আমার সম্বন্ধে ভালো ধারণা পোষণ করেন না। এর কারণ অবশ্য আমি আবিষ্কার করতে পারি নি। হয়তো তিনি ভেবেছেন, সমতার মতো তিনি ওসাকারও মিডিয়া কনসালটেন্ট হবেন, কিন্তু আমাদের সেই সুযোগ নাই। তাছাড়া ব্যক্তিটি একটু অকৃতজ্ঞ টাইপের। তার চাকরিদাতা আব্দুল কাদের মাস্টার অসুস্থ হয়ে পড়লে তার বিরুদ্ধে নানা উল্টাপাল্টা রিপোর্ট প্রকাশ করে মৃত্যুর আগে তার জীবন আরো দুর্বিষহ করে তোলে। অথচ তার রিপোর্ট সত্য হলে তিনি নিজেও ছিলেন তার দুষ্কর্মের সহযোগী।
আর শরিফুল আলম—আগেই বলেছি, তিনিও আমার সহপাঠী ছিলেন না; এমনকি একই স্কুল-কলেজে আমরা পড়াশোনাও করি নি। তবে তিনি পাবনা জেলা স্কুলের একজন ভালো ছাত্র ও সজ্জন ব্যক্তি হিশাবে পরিচিত ছিলেন। শহরে তার পারিবারিক থাকার জায়গা না থাকায় তিনি তার শিক্ষক কিংবা যেসব বাড়িতে লজিং থাকতেন কিংবা যেখানে তার পাত পাড়া থাকত, তারা প্রায় সবাই জেলা সদরে আওয়ামী রাজনীতির পরিবার বলে বিবেচিত। একটু খোঁজ-খবর নিলে এখনো জানা যাবে। আমরা একই শহরে বেড়ে উঠেছি বলে এসব গল্প আমরা জানতাম। তাছাড়া ওই সময়ে জামায়াত-শিবির দরিদ্র পরিবারের মেধাবী ছাত্রদের টার্গেট করত। অবশ্য আশির দশকের রাজনীতির সঙ্গে এখনকার মনোপলিটিক্সের কোনো মিল খুঁজে পাওয়া যাবে না। শরিফুল আলম ঢাকায় বিভিন্ন দপ্তরে সরকারি কর্মকর্তা হিসাবে থাকায়—বিশেষ করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় কিংবা অন্য কোনো দপ্তরে, যেখানে দাপ্তরিক প্রয়োজনে অনেকেই গিয়ে থাকবেন—যতদূর শোনা যায়, দল ও মতের বাইরে থেকে তিনি সরকারি দায়িত্বের মধ্য দিয়ে তা করে দিতে চেষ্টা করেন। আমিও দাপ্তরিক প্রয়োজনে একই জেলার মানুষ হিশাবে তার কাছে দু’একবার গিয়ে থাকব। তার কাছে যারা গিয়েছে তারা কি সবাই কথিত পার্টির সদস্য? তিনি সরকারি চাকুরে হিশাবে রাজনীতি করে থাকলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে একজন উপদেষ্টার পিএস হিশাবে থাকতে পারতেন বলে মনে হয় না। অবশ্য প্রত্যেকের জন্য বিষয়টি আলাদা; ব্যক্তির সুকৃতি ও দায় ভিন্ন-ভিন্নভাবে বিবেচিত। কোনো গণতান্ত্রিক সরকারের আমলে সুনির্দিষ্ট অপরাধ প্রমাণিত না হলে কেউ দেশ ছেড়ে চলে যায় না।
তবে চূড়ান্ত কথা, ১৯৮৪ সালে বিসিএস করা প্রশাসনিক ক্যাডারের একজন কর্মকর্তা ১৯৯২ সালে এম.এ পাস করা আমার মতো এক ছন্নছাড়া কবির বন্ধু, এ কথা ভাবাও তো স্পর্ধার। তাছাড়া বাংলাদেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামোয় এটা নির্ণয় করা খুব কঠিন—কে কার আত্মীয়, কে কার বন্ধু।


বন্দে আলীর নামে পুরস্কার চালু করেছিলাম—আজ থেকে পঁয়ত্রিশ বছর আগে সেই পুরস্কারের মূল্যমান ছিল পাঁচ হাজার টাকা।


সোহেল হাসান গালিব

বেশ। অনেক তথ্য জানা হলো। আপনার উত্তরটা পড়তে পড়তে হঠাৎ মনে পড়ল একসময় আপনি বন্দে আলী মিয়াকে নিয়ে পাবনায় কিছু সাংগঠনিক তৎপরতা চালিয়েছিলেন। সেটা ঠিক কোন সময়ে? সে সময় আপনার সাথে কারা ছিল?

মজিদ মাহমুদ

আমাদের পাবনা শহরের বাড়ির খুব সন্নিকটে ছিল কবি বন্দে আলী মিয়ার বাড়ি। কবি বন্দে আলী মিয়া যখন মারা যান ১৯৭৯ সালে, তখন আমি অষ্টম শ্রেণির ছাত্র। আমি খুব শৈশব থেকে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, একজন লেখক হব, তাই বন্দে আলী মিয়ার বিষয়টি আমাকে বেশ আলোড়িত করেছিল। এত কাছ থেকে একজন কবির এত কিছু জানা—খুবই রোমাঞ্চকর ব্যাপার। যেহেতু তার কবিতা প্রথম শ্রেণি থেকেই পাঠ্যবইয়ে ছিল, সেহেতু তিনি আমার কাছে একজন স্বপ্নের মানুষ ছিলেন। সশরীরে তার সঙ্গে আমার আলাপ না থাকলেও তার দুই স্ত্রী ও বহু পুত্রকন্যার সঙ্গে ওই বয়সেই আমার খুব ভাব জমে গিয়েছিল। রাধানগর বাড়িতে বন্দে আলী মিয়ার দু’জন স্ত্রী এবং তাদের ছেলেমেয়ে বসবাস করতেন। বন্দে আলী মিয়ার আরও একটি পরিবার ছিল, যাদের বসবাস ছিল সান্তাহার স্টেশনের কাছে। আর বন্দে আলী মিয়া রাজশাহী বেতারে চাকরি করতেন। কবির অনেক ছেলেমেয়ে ছিল। এক মেয়ে রাজশাহীতে থাকতেন, এক ছেলে ঢাকায় বাড়ি করেছিলেন। এদের সবার সঙ্গে আমার পরিচয় ছিল। কবির ছেলে-মেয়ে নাতি-নাতনির সঙ্গে আমার যথেষ্ট ভাব জমে উঠেছিল। রঞ্জু নামে কবির এক ছেলে ছিল অটিস্টিক। তাঁর আগে পড়ি বইতে এমন একটি বাক্য ছিল—‘ছ’-তে ছাতা মাথায় রঞ্জু চলে।’ ওই বয়সে সবটাই ছিল রোমাঞ্চকর।
সপত্নীক হলেও কবির দুই স্ত্রীর মধ্যে ছিল খুব ভাব। ওই সময়ে তারা বার্ধ্যক্যে উপনীত হলেও তারা খুব সুন্দরী ছিলেন। তারা প্রায়ই আমাদের রাধানগরের বাড়িতে একসঙ্গে আসতেন। আমার মা ও ভাবিকে মজা করে বলতেন, ‘তোমাদের কবিকে একটু সাবধানে রেখো। কবিরা হলেন আল্লাহ’র নবি; আমাদের কবি তো চাদর ভেবে মশারি কাঁধে নিয়ে বাজারে চলে যেতেন।’ তারা সত্যিই আমাকে পুত্রবৎ স্নেহ করতেন, তাদের বাড়িতে গেলে না খাইয়ে আসতে দিতেন না।
এইসব নানা কারণে ১৯৮৫ সালে আমি ‘বন্দে আলী মিয়া স্মরণ পরিষদ’ নামে একটি সাহিত্য-সাংস্কৃতিক সংগঠন গড়ে তুলি। এই সংগঠনের আমি ছিলাম প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক আর এর সভাপতি ছিলেন আবু জাফর মোহাম্মদ মোহসীন। তখন তিনি ছিলেন গ্রাম থিয়েটারের সভাপতি। খান বাহাদুর ওয়াসিউদ্দিনের ছেলে, বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ট সহযোগী প্রয়াত সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুস সামাদ আজাদের আপন শ্যালক এবং পাবনার তৎকালীন আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা রফিকুল ইসলাম বকুলের মামা। আমরা সবাই তাকে মামা বলতাম। আবু জাফর মোহসীন ছিলেন এক অদ্ভুত প্রকৃতির মানুষ। তার মতো কোনো মানুষ আমি বাকি জীবনে দেখি নি। তার চেহারা ও স্বভাবে আমার মনে হতো তিনি এদেশীয় লোক নন। কেবল তাকে কেন্দ্র করে আমি ১৯৮৮ সালে ‘গ্রিক নগরীর বন্যা সমস্যা’ নামে একটি নাটক রচনা করি। যে নাটকটি প্রায় এক মাস জাফর মামা ও তার দলের প্রযোজনায় পাবনার পথে ঘাটে বনমালী ইন্সটিটিউটে মঞ্চস্থ হয়েছিল। সেই জাফর মামার অর্থায়নে ও সভাপতিত্বে আমি ‘বন্দে আলী মিয়া স্মরণ পরিষদ’ পরিচালনা করতাম। সেই সময়ে পাবনার টমটম স্ট্যান্ডে স্মরণ পরিষদের একটি অফিস ছিল। আমরা বন্দে আলী মিয়ার জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকীতে অনেক বড় বড় অনুষ্ঠান করেছি। বন্দে আলীর নামে পুরস্কার চালু করেছিলাম—আজ থেকে পঁয়ত্রিশ বছর আগে সেই পুরস্কারের মূল্যমান ছিল পাঁচ হাজার টাকা। কবি ওমর আলী ও কবি আবু হেনা মোস্তফা কামালসহ বেশ কয়েকজন পাবনার কবিকে এই পুরস্কার প্রদান করা হয়। আমার তখনকার এইসব অত্যাচার জাফর মামা নীরবে সহ্য করতেন। বলতেন, ব্যাটা তুই যা ভালো বুঝিস…। আমাদের বয়সের পার্থক্য তিরিশ বছরের কম নয়। তবু বাসায় গেলে বলতেন, আমার বন্ধু এসেছে। জাফর মামা ১৯৯০ সালের দিকে আকস্মিক মারা গেলেন। কোনো মৃত্যুতে আমার এতটা কষ্ট হয় নি। তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে স্মরণ পরিষদের সঙ্গে আমার সরাসরি ছেদ ঘটে। তবে পরবর্তীকালে শহরের আয়কর উপদেষ্টা এডভোকেট আব্দুল আজিজ সাহেব এর সভাপতিত্বের ভার গ্রহণ করেন। তিনিও পারিবারিকভাবে আওয়ামী রাজনীতির সঙ্গে জড়িত; তাকে আমরা আজিজ চাচা বলে ডাকতাম। তার পুত্র ড. হাবীবুল্লাহ তখন বেশ ছোট ছিলেন, সেও এখন পাবনা প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। বন্দে আলী স্মরণ পরিষদের সঙ্গে তখন কবি লতিফ জোয়ার্দ্দার, কথাসাহিত্যিক মির্জা তাহের জামিল ও শিশু-সাহিত্যিক ইসলাম হোসেন ইন্দাসহ অনেকেই জড়িত ছিলেন। এমনকি বাংলা একাডেমির লেখক প্রকল্প থেকে তাদের বইও বেরিয়েছে। বন্দে আলী স্মরণ পরিষদ নিয়ে আমাদের অনেক মজার স্মৃতি আছে, কোনো এক সময়ে সুযোগ পেলে বলব। তবে এটি মনে রাখতে হবে, এটি ১৯৮৫ সাল, যখন কেবলই আমি এইচএসসি পাস করেছি; ফলে আমাকে নিয়ে গসিপ করাটা আমার সরবতার বাইরের ব্যাপার।

সোহেল হাসান গালিব

আপনার সরবতার আরেকটি দিকে এখনও আমরা প্রবেশ করি নি। সেটি হলো সাংবাদিকতা। আপনি ‘দৈনিক বাংলা’য় চাকরি করেছিলেন। লোকমুখে শুনেছি, বিএনপির সময় এখানে আপনি জয়েন করেন এবং বিএনপি ক্ষমতা হারাবার সঙ্গে সঙ্গে আপনিও চাকরিটি হারান। প্রকৃত ঘটনাটা আপনার মুখেই শুনতে চাই।

মজিদ মাহমুদ

আমি যখন ‘দৈনিক বাংলা’য় জয়েন করি তখন বিএনপি বা আওয়ামী লীগের আমল বলে কোনো আলাদা আমল তৈরি হয় নি। একার্থে বলা চলে এরশাদের শেষ আমল; যখন থেকে আমি সাহিত্য করার কারণে, সাহিত্য ও ফিচার পাতায় কন্ট্রিবিউটর হিশাবে কিছুটা কাজ করার সুবাদে বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষে দৈনিক বাংলায় যোগদানের সুযোগ তৈরি হয়। হয়তো তখন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসলে একই ঘটনা ঘটত। সে সময়ে আমরা যারা লেখালেখি শুরু করেছিলাম, দৈনিক বাংলা ছিল তাদের জন্য একটি স্বপ্নের জায়গা। আজকে যেসব কাগজ দেখেন তার কোনোটাই তখন ছিল না, দৈনিক ইত্তেফাক ও দৈনিক সংবাদ বাদে। যেখানে কবি আহসান হাবীব, হাসান হাফিজুর রহমান, শামসুর রাহমান, নির্মল সেনসহ অনেক গুণীজন সহকারী সম্পাদক হিশাবে চাকরি করতেন। নির্মল সেনকে আমরা কলিগ হিসাবে পেয়েছিলাম। আমাদের সঙ্গে অনেকেই তখন জয়েন করেছিলেন, এমনকি তারা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার ইয়ারমেট ছিলেন, যাদের অনেকের সঙ্গে আগেই পরিচয় ছিল। ওই সময়ে আমার সেইসব কলিগ, যারা দৈনিক বাংলায় চাকরি জয়েন করেছিলেন, ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পরে তাদের অধিকাংশই দাবি করলেন তারা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ করতেন, এবং অধিকাংশ পরবর্তীকালে সাংবাদিকতার রাজনীতিতেও যথেষ্ট নাম করেছেন। এমনকি সে সময়ে আমিও বলা চলে সেখানকার কর্মরত একমাত্র সাংবাদিক সহ-সম্পাদক থেকে সহকারী সম্পাদক হিসাবে পদোন্নতি পেয়েছিলাম। তবে এ পদোন্নতি অবশ্যই পুরোপরি রাজনৈতিক বিবেচনায় নয়। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পরে দৈনিক বাংলায় সম্পাদকীয় বিভাগে একটা ভ্যাকুয়াম তৈরি হয়। সরকারি কাগজের নিয়ম অনুসারে সরকারের পক্ষে তখন লেখার মতো সহকারী সম্পাদকের অভাব অনুভূত হয়। তখন অনেকেই সহকারী সম্পাদক হওয়ার জন্য সম্পাদক বরাবর দরখাস্ত করেন। আমি ছিলাম তাদের মধ্যে সবচেয়ে কনিষ্ঠ। তখন আমি সাহসে ভর দিয়ে আমার সুহৃদ এক ঊর্ধ্বতন সাংবাদিক—যিনি আমার চাকরি হওয়ার পেছনে ভূমিকা রেখেছিলেন, তিনি তখন বিএনপি করার দায়ে কিছুটা কোণঠাসা—তাকে জিজ্ঞাসা করায় তিনি বললেন, আমার বিবেচনায় এই হাউজে একজনও যদি সহকারী সম্পাদক হওয়ায় যোগ্যতা রাখে তাহলে সেটি আপনি। এতে আমি সমর্থন ও সাহস পেয়ে গেলাম এবং শেষশেষ সহকারী সম্পাদক হিশাবে আমাকে প্রমোশন দেয়া হলো। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পরে অনেকে নতুন করে জয়েন করা সত্ত্বেও আমার পদোন্নতি হয়। আমি যদি রাজনীতি করি বলে বিবেচিত হতাম, তাহলে কি তা সম্ভব ছিল? আশলে দুএকজন ছাড়া তখনো সাংবাদিকতায় দলীয় রাজনীতির অনুপ্রবেশ ঘটে নি। সাংবাদিকরা তখন একটি ফোরামের অন্তর্ভুক্ত ছিল। সে সময়ে দৈনিক বাংলায় সহকারী সম্পাদক হিসাবে কাজ করতেন নির্মল সেন, সালেহ চৌধুরী, কবি মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ, সৈয়দ আব্দুল কাহ্হার, কণিকা মাহফুজ, ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী—এঁরা সবাই ছিলেন খ্যাতিমান লেখক। এটি আমার জীবনে সবচেয়ে উজ্জ্বল ঘটনা যে আমি তাদের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলাম। আর আওয়ামী লীগ আমলে দৈনিক বাংলা থেকে কারো চাকরি যায় নি। সরকারের দেড় বছর চলার পরে ১৯৯৭ সালের শেষ দিকে আওয়ামী লীগের নির্বাচনি মেন্যুফেস্টো হিশাবে কাগজটি সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়া হয়। নিয়মানুযায়ী সবাইকে দেনা-পাওনা বুঝিয়ে দেয়া হয়। এতে আওয়ামী লীগ কিংবা বিরোধী কারো জন্য আলাদা কিছু ঘটে নি; নগর ও দেবালয় দুটিই তখন পুড়ে যায়। সুতরাং আপনার প্রশ্নটি সঠিক তথ্যের বরখেলাপ। বরং পরবর্তীকালে বিএনপি আমলে আমার দৈনিক বাংলার প্রমোশন ও লেখালেখি কিছুটা নেতিবাচক ফল বয়ে আনে। যেহেতু আমি সরাসরি দল না করেও টিকে থাকার সংগ্রাম করেছি সেহেতু সব সরকারের সময়ে আমি কিছু সুবিধা ও কিছু অসুবিধা ভোগ করেছি। কারণ আমি ভাবতে চেয়েছি, লেখক হিশাবে আমার এক ধরনের কাজ আর পেশাদারিত্বের জায়গায় আরেকটি কাজ। আমি বহুবার স্বেচ্ছায় প্রাতিষ্ঠানিক চাকরি ছেড়েছি, ষোড়শ বিসিএস-এ শিক্ষকতায় কোয়ালিফাই করার পরেও চাকরি করি নি, মুড়াপাড়া ডিগ্রি কলেজ থেকে চাকরি ছাড়ি, ইউডিএ থেকে চাকরি ছাড়ি, বিএসএস, অর্থনীতি প্রতিদিনের চাকরি থেকে অব্যাহতি নিই—এমনকি কর্তৃপক্ষের যথেষ্ট আন্তরিকতা থাকার পরেও। অর্থাৎ চাকরির ক্ষেত্রে আমাকে, খুব একটা দলনির্ভর না হয়েও, কখনো কোনো বড় ধরনের সমস্যায় পড়তে হয় নি।


আমি ঢাবি-তে ছাত্র অবস্থায় কী ধরনের রাজনৈতিক মত ধারণ করতাম তা তো আমার তখনকার সহপাঠী আর শিক্ষকগণের ভালো জানার কথা।


সোহেল হাসান গালিব

দৈনিক বাংলার প্রসঙ্গ ধরেই আরেকটু বলি, এমনটা অনেকেই বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকা অবস্থায় আপনি ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। আমি বলছি না, ছাত্রদল করা হারাম বা খারাপ কিছু। কিন্তু মনে হচ্ছে ‘শুনা কথায় গুনা বেশি’। তাই আশল ব্যাপারটা জানতে চাচ্ছি।

মজিদ মাহমুদ

আমার সম্বন্ধে আর কী কী শোনা যায় গালিব! কিছুক্ষণ পরে হয়তো বলবেন, আমি ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসায় হেফাজতে ইসলামের সভাপতি ছিলাম। মনে হচ্ছে আমার মতো দশভুজা এই বাংলা সাহিত্যে আর একটিও নেই। কৈশোরে শরৎচন্দ্রের পথের দাবী-র সব্যসাচীর মতো বহুরূপী বিপ্লবী হতে ইচ্ছে করত। মজার ব্যাপার আমার সহোদরাদের কেউ কেউ আমাকে নাকি এই চরিত্রে কল্পনা করতেন। আশলে হয়েছে কি, আমরা যারা সরাসরি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত না থেকে ভেড়ার দেশে বাছুর পরামানিক হয়েছি তাদের নিয়ে এই সমাজের সমস্যা অনেক। কারণ ব্যক্তির সকল কৃতিত্ব আজ তথাকথিত রাজনৈতিক জার্গনের মধ্যে হারিয়ে যেতে বসেছে। পান্ডারা মনে করে ওদের অনুমোদন ছাড়া কেউ কবি হতেও পারবে না। ১৯৭২ থেকে ১৯৯২ পর্যন্ত এই দুই দশকের শিক্ষাকালে এ দেশে যে কেউ রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে থেকে নিজেকে মেলে ধরতে পারত। আমি যখন ঢাকায় পড়তে এলাম তখন যদিও এরশাদের কাল তবু শেষের দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদলের বেশ প্রভাব। হলগুলোতে ছাত্রদলের সংখ্যাধিক্য থাকলেও ছাত্রলীগও কম ছিল না। তাছাড়া এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে তাদের সমন্বিত কর্মসূচি ছিল। মাহফুজামঙ্গল-এর মতো কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের পরে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ায় কবি হিশাবে এবং শেষপর্বে ভালো ছাত্র হিশাবে শিক্ষক ও সহপাঠীরা একটু প্রীতির চোখে দেখতেন। এমনকি আমাদের অনেক শিক্ষক বিভিন্ন ক্লাসে মঙ্গলকাব্য পড়ানোর সময়ে আমার মাহফুজামঙ্গল কাব্যটির নাম উল্লেখ করতেন; বিভিন্ন ক্লাসের ছাত্ররা যখন এ কথা আমায় জানাত, তখন বিশেষ আনন্দ অনুভূত হতো। আমি ঢাবি-তে ছাত্র অবস্থায় কী ধরনের রাজনৈতিক মত ধারণ করতাম তা তো আমার তখনকার সহপাঠী আর শিক্ষকগণের ভালো জানার কথা। আমার কয়েকজন সহপাঠী ছিলেন যারা তখনো ছাত্রলীগের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার কমিটিতে ছিলেন। কিছুদিন আগে তাদের একজন বাংলাদেশ শিশু একাডেমীর পরিচালক থাকার সময়ে শিশুদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আমাকে বিচারক হিশাবে, অতিথি হিশাবে ডেকেছেন। সুতরাং আমার যদি রাজনৈতিক পরিচয় থাকত তাহলে আমার সহপাঠীরা এ ধরনের ঝুঁকি নিতেন না। তবে এ কথা ভাবা সমীচীন হবে না যে ছাত্রদলে আমার বন্ধু ছিল না। যদিও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে এতটা দলীয়করণ হওয়া উচিত নয় বলে আমি মনে করি। তাছাড়া তখনো রাজনৈতিক ছাত্রদের কাছেও ভালো ছাত্র ও কবি-সাহিত্যিক-শিল্পীদের আলাদা গুরুত্ব ছিল। আমাদের পর্যায়ে রাজনৈতিক দল করা বলতে তো তাই বোঝায় যে, সক্রিয়ভাবে কোনো দলের সদস্য থাকা। আমি যদি কোনো দল করতাম কিংবা কোনো দলমতে বিশ্বাসী হতাম তাহলে সেই দল ও মতের চিন্তার আওতায় নিজেকে সুখী করে তুলতাম। অতীতে এ প্রশ্নগুলো দলীয় রাজনীতি ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের মাথাব্যথার কারণ ছিল না। আমি আশলে চিন্তার দিক থেকে লিবারাল ডেমোক্র্যাট টাইপের। যদিও কার্ল মার্ক্সসহ যাবতীয় চিন্তার সংশ্লেষের দ্বারা আকীর্ণ। আর স্বভাবের দিক দিয়ে জীবনানন্দ দাশীয়—পরিচিত মানুষ দেখলেও অন্য পথে ঘুরে যেতে পছন্দ করি।

সোহেল হাসান গালিব

খুবই ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হচ্ছে, ঢাকার শিল্পাঞ্চলে একটা প্রগতিশীল তিরন্দাজ বাহিনী তৈরি হয়ে গেছে, কোনো না কোনোভাবে কাউকে প্রতিক্রিয়াশীল সাব্যস্ত করতে পারলেই হলো। অমনি খেলা জমে যায়। আমি দেখেছি, আমাদের এখানে প্রতিক্রিয়াশীল চিহ্নিত করার দুটো তরিকা আছে। প্রথমত, লেখকের বংশে কোনো জামাত-শিবিরের টাচ আছে কিনা। দ্বিতীয়ত, ফরহাদ মজহারের সঙ্গে কানেকশন পাওয়া যায় কিনা। পরিবারে তো সেই টাচ নেই দেখলাম, তো, আপনার সঙ্গে ফরহাদ মজহারের সম্পর্ক কেমন?

মজিদ মাহমুদ

আমি ফরহাদ মজহারের স্কুলের ছাত্র নই। তার চিন্তার ধরনের সঙ্গে আমার চিন্তার মিল দুর্লক্ষ্য। তবে তিনি চিন্তা করতে পারেন বলে স্বীকার করি। কিন্তু তার চিন্তার আর্টিকুলেশন প্রায়ই আমার কাছে ভুল বলে মনে হয়। আমার ক্ষণচিন্তা বইতে তার দু’একটি রাজনৈতিক চিন্তাকে আমি খণ্ডন করার চেষ্টা করেছি। আমিও ইতিহাসের আলোকে মানবজাতির বিবর্তনগুলো দেখতে পছন্দ করি, কিন্তু সমাজরাষ্ট্র পরিচালনার জন্য এমন কোনো থিওলজিক্যাল কমান্ডমেন্টের পক্ষে আর্গুমেন্ট করি না, যা পরিণামে একটি জট পাকিয়ে যেতে পারে। তবে ফরহাদ মজহারের স্কুলের অনেকের সাথেই আমার পরিচয় আছে। আমি প্রথমদিকে ফরহাদ মজহারের নাম শুনি ১৯৯০ সালের দিকে, তখন আদাবরের কোনো এক জায়গায় তার অফিস ছিল। তরুণ কবি-সাহিত্যিকদের অনেকেই সেখানে যাতায়াত করতেন, সম্ভবত তার ‘প্রতিপক্ষ’ বলে একটি কাগজ ও প্রকাশনা ছিল, শুনেছি এখনকার লব্ধপ্রতিষ্ঠ অনেকেই সেখানে যেতেন। আমি কারো নাম বলতে চাচ্ছি না, কারণ ফরহাদ মজহার নিজেও এখন বেশ চাপে আছেন। কালে কালে জেনেছি এখনকার দুএকজন দুঁদে পণ্ডিতসহ ঢাকার অনেক কবি-সাহিত্যিকের চিন্তার জাইগোট গঠনে তার ভূমিকা আছে। আমি এটিকে মোটেও দোষের দেখি নি। একজন চিন্তকের কাজ চিন্তা উশকে দেয়া, হয়তো তিনি কিছুদিন কিছুটা পেরেছিলেন। তবে আমার কখনো ফরহাদ মাজহারের খানকায় যাওয়া হয় নি। তার সঙ্গে আমার সশরীরে ঢাকায় কখনো পরিচয় ঘটে নি। সম্ভবত ২০১৪ সালের দিকে মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে এক আন্তর্জাতিক সেমিনারে তার সঙ্গে পরিচয় ঘটে। তিনি সেখানে স্পিকার হিশাবে উপস্থিত ছিলেন, তার বিষয় ছিল আন্তর্জাতিক সন্ত্রাস ও বিশ্বব্যাপী মুসলিম জঙ্গিবাদের কারণ। তার আলোচনার মূল ইমফ্যাসিস ছিল, এসব সন্ত্রাস মূলত পশ্চিমা-স্পন্সর্ড। বিশেষ করে আমেরিকা এসবের জন্য দায়ী। তার আলোচনায় পাকিস্তানি এক মহিলা এমন প্রতিক্রিয়া জানালেন যে, প্রায় মারামারি অবস্থা। ওই মহিলা যা বললেন তার অর্থ দাঁড়ায়—‘আপনাদের মতো বুদ্ধিজীবীদের জন্যই আজ মুসলমানদের এই দশা। কারণ নিজের ঘরের দিকে না তাকিয়ে আপনারা সর্বদা অন্যের ঘরের জুজু খোঁজেন, কারণ পাকিস্তানে স্বয়ং মুসলমানদের এক দল অন্য দলের উপরে মসজিদে বোমা ফেলছে, কাদিয়ানিদের সুন্নিরা অমুসলিম আখ্যা দিয়ে মারছে, আপনারা সেগুলোর স্থানীয় সমাধান না খুঁজে পশ্চিমা কারণ খোঁজায় ব্যস্ত আছেন।’ ওই যাত্রায় ফরহাদ মজহারের সঙ্গে বেশ কিছুটা সময় কথা হয়েছিল। দেখলাম তিনি আমার লেখালেখি সম্বন্ধে কিছুটা জ্ঞাত, আমার দুএকটি বইয়ের নামও তিনি জানেন। আমি তাকে সৌজন্যের খাতিরে বলেছিলাম দেশে ফিরে তার সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তুলব। কিন্তু আর হয়ে ওঠে নি, আমার স্বভাবদোষে। নিজেরই মুদ্রাদোষে আমি হতেছি আলাদা। তারপর একটি দুঃখজনক ঘটনার শিকার হয়ে এই চিন্তক কবি (যদিও তার চিন্তা আমি প্রায়ই অপছন্দ করি) প্রায় জনসম্মুখ থেকে অন্তরীণ হয়ে আছেন। তার অপহরণের সময়ে অনেকের মতো আমি তার পক্ষে দুএকটি সতর্ক ফেসবুক স্ট্যাটাস দিয়েছিলাম। আমি ব্যক্তিগতভাবে তার চিন্তাকে পছন্দ না করলেও তার চিন্তা করার প্রক্রিয়া অবাধের পক্ষপাতী। যদিও ফরহাদ মজহারের এককালের তথাকথিত শিষ্যদের অনেকের দ্বারা আমি নীরব নিগ্রহের শিকার।


মুক্তিযুদ্ধের বিষয়গুলো আরো সতর্কতার সঙ্গে ব্যবহার করা উচিত; একজন ব্যক্তিরও মুক্তির চেতনা ব্যাহত হতে পারে।


সোহেল হাসান গালিব

এই ঝাপসা জায়গাগুলি, আশা করি, আমার মতো আমার বন্ধুদের কাছেও অনেকখানি পরিষ্কার হবে। হয়তো এবার বাংলা একাডেমির এই ঘটনাটা না ঘটলে, এসব তলিয়ে দেখার প্রণোদনাও আসত না। সেদিক থেকে এই কেলেঙ্কারি আপনার জন্য শাপে বরই হলো, আমার মনে হয়। তবে, একটা বিস্ময় কিন্তু থেকেই যাচ্ছে। সেটি হলো, একজন লেখক হিশেবে বাংলা একাডেমি আপনাকে মুক্তিযুদ্ধের সাহিত্যের ওপর আলোচনা করতে না ডেকে কেন পঁচিশে মার্চের গণহত্যার ওপর আলোচনা করতে আহ্বান জানালো? এবং আপনিইবা কেন তাতে সাড়া দিতে গেলেন?

মজিদ মাহমুদ

এটা তো বাংলা একাডেমির ব্যাপার। বাংলা একাডেমি কোন আলোচনার জন্য কাকে যোগ্য মনে করবে সেটি তো তাদের সিদ্ধান্ত। বাইরের বিপ্লবী গার্ড যদি সেটি নির্ধারণ করে দেয় তাহলে তো তাদের সন্তোষ বিধান করেই বাংলা একাডেমিকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আমি কবিতার লোক হওয়া সত্ত্বেও যারা আমার প্রবন্ধের সঙ্গে পরিচিত তারা জানেন যে, নানা বিষয়ে আমার আগ্রহ—বিকল্পচিন্তা উপস্থাপন এবং সাহিত্যের আন্তঃযোগাযোগের বিষয়গুলো তুলে ধরা আমার অন্যতম কাজ। যেমন এর আগেও অধ্যাপক শামসুজ্জামান খান সাহেব মহাপরিচালক থাকার সময়ে আমাকে বাংলা একাডেমির একুশে বইমেলায় ‘প্রযুক্তির উন্নয়ন ও ছাপা বইয়ের ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক সেমিনারে আলোচক হিশাবে রেখেছিলেন। সেই সেমিনারে আমি ছাড়া সবাই ছিলেন কম্পিউটার সায়েন্সের লোক; এমনকি বর্তমানে এ বিষয়ক মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার সাহেব অতিথি হিশাবে ছিলেন। তখনও প্রশ্ন উঠতে পারত, আমাকে সাহিত্যের আলোচনায় না রেখে কেন প্রযুক্তি ও ছাপাখানায় রাখা হলো? বই ও ছাপাখানা প্রযুক্তিনির্ভর হলেও তা মূলত লেখকদের জন্যই বেশি লাগে। আমি বরং এ ধরনের আমন্ত্রণে আনন্দিত ও সম্মানিত বোধ করি যে, আমার নানা ধরনের চিন্তাশীলতার প্রতি আমন্ত্রকদের আস্থা রয়েছে। তাছাড়া আমার বিষয়ে যারা সম্যক অবহিত, তারা জানেন, মুক্তিযুদ্ধে আমাদের পরিবারের সরাসরি অংশগ্রহণ ছাড়াও সাহিত্যিক অবদান আছে, সেটা যত ছোটই হোক না কেন। মুক্তিযুদ্ধের কথা-সাহিত্য ও কবিতা নিয়েও আমার কাজ আছে। বর্তমান মহাপরিচালক একজন কবি হিশাবে হয়তো একই সঙ্গে গণহত্যার বহুকৌণিক বিষয়গুলো উপস্থাপন করতে চেয়েছেন। তাছাড়া মুক্তিযুদ্ধের সময়ে আমরা যত শিশুই হই না কেন একটি মহা-দুর্যোগের মধ্য দিয়ে কিন্তু আমাদেরও যেতে হয়েছে। যে কোনো যুদ্ধে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ হলো শিশু, বৃদ্ধ ও নারী। তাই সাহিত্য, তথ্য ও তত্ত্বের বাইরে শিশু হিশাবে আমাদেরও গণহত্যা ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে এদেশের অধিকাংশ মানুষেরই রয়েছে স্ব-স্ব মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি। যারা যুদ্ধের মধ্য দিয়ে, দুর্ভিক্ষ ও মড়কের মধ্য দিয়ে যায় নি তারা জীবনের খুব সামান্যটিই দেখেছে। প্রতিদিন বাঁচা-মরার সন্ধিক্ষণে আমরা এ দেশের অধিকাংশ মানুষের মতো নয় মাস অতিক্রম করেছি। বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে ঘটে যাওয়া নানা জেনোসাইড ও তার কারণ সম্বন্ধে অল্পবিস্তর পড়াশোনা আছে। সুতরাং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কেবল পরিচিত কয়েকজন মানুষের জ্ঞানকাণ্ডের বিষয় নয়। ফলে আমি তো মনে করি আমাকে আমন্ত্রণ করে বাংলা একাডেমি সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। আর আমিও পৃথিবীর ভয়াবহতম একটি গণহত্যা নিয়ে কথা বলতে পারার সুযোগের জন্য খুবই উদ্গ্রীব ছিলাম এবং যে নিজেই শৈশবে সেই গণহত্যার কাল অতিক্রম করে আজ চিন্তাহত্যার কালে প্রবেশ করেছে।

সোহেল হাসান গালিব

একটা ব্যাপার প্রায় এক দশক ধরে দেখতে পাচ্ছি, সেটা হলো, লেখা বাদ দিয়ে লেখকের কুল-ঠিকুজি বের করার চেষ্টা। ব্যক্তিগতভাবে আমি নিজেও ২০০৮ সাল পর্যন্ত কখনো রাজনৈতিক মতাদর্শ নিয়ে কোনো টেনশন বা টানাপড়েন অনুভব করি নি। এইসব ফণা ও ফণীমনসার বাইরে থেকে লেখালেখি করেছি। এরপর হঠাৎ করেই দেখলাম, ‘যবন না আমি কাফের’-এর মতো পলিটিকাল ডাইকোটমির মধ্যে পড়ে গেছি। লেখকের স্বাধীনভাবে চিন্তাচর্চা বা লেখালেখি করে যাবার কোনো সম্ভাবনা আপনি দেখেন কিনা, এই দেশে?

মজিদ মাহমুদ

আমার উপরে হাওয়ায় যা ভাসিয়ে দেয়া হলো—যা কখনো বিচ্ছিন্ন পেজা পেজা মেঘ আকারে শরৎ-আকাশে ভাসতেছিল—তা-ই হয়তো বৃষ্টি হয়ে নেমেছে। আশা করি ঈর্ষাকাতর পরান্নভোজীরা ভেসে যাবে এতে। মুক্তিযুদ্ধের বিষয়গুলো আরো সতর্কতার সঙ্গে ব্যবহার করা উচিত; একজন ব্যক্তিরও মুক্তির চেতনা ব্যাহত হতে পারে। যেমন ধরুন এই ঘটনায় আমার নিজস্ব মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ব্যাহত হয়েছে। আমার মনে হয়েছে, একটি সুবিধাবাদী দুর্বৃত্ত গ্রুপ এ কাজটি করেছে। প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধের প্রতি যাদের শ্রদ্ধা আছে তারা এ কাজ করতে পারেন না। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সংক্ষুদ্ধ ব্যক্তি আইনের আশ্রয় নিতে পারে। যারা আইনের বাইরে স্বাধীন প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা ব্যাহত করতে চায়, সরকারের উচিত তাদের শাস্তি দেয়া। হঠকারীরা স্পর্শকাতর জায়গাগুলো ব্যবহার করে ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে চায়। যেমন বাংলা একাডেমি আমাকে আমন্ত্রণ জানালো অথচ নাম না জানা লোকদের হুমকির ফলে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারল না; কিংবা কোনো ব্যাখ্যা হাজির করতে পারল না। তার ফলে যে কেউ এর পরে বাংলা একাডেমিতে যেতে অসম্মানের আশঙ্কা করতে পারে এই কারণে যে, বাংলা একাডেমি তার নিজস্ব সিদ্ধান্তের উপর স্থির থাকতে পারবে না। এর থেকে মুক্তির উপায় আমার জানা নেই। আমার জানা নেই উদ্ধারের উপায়! আমাদের তরুণদের অবশ্যই সঠিকভাবে মুক্তিযুদ্ধের শিক্ষা দিতে হবে। বিপুল আত্মত্যাগ ও দীর্ঘ সংগ্রামের মাধ্যমে এ দেশ স্বাধীন হয়েছে। সেই যুদ্ধে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অফিসার ও জওয়ানরা যেমন আত্মত্যাগ করেছিলেন, তেমনি অসংখ্য সাধারণ মানুষ জীবনবাজি রেখে হাতিয়ার তুলে নিয়েছিলেন—তারাও যেন অসম্মানিত না হন। কথা বলার স্বাধীনতা, লেখকের স্বাধীনতা নিশ্চিত না হলে দেশ চিন্তাশূন্য হয়ে পড়বে। ইংরেজ কবি শেলি কবিদের পার্লামেন্টের বাইরের আইন-প্রণেতা হিশাবে উল্লেখ করেছেন। এই আইন প্রণেতাদের যেন-তেন আইনের দ্বারা নিগৃহীত না করলে মানুষের চিন্তাজগতের মঙ্গল। এই অভিযোগের খেলা থেকে উত্তরণের জন্য কবি-সাহিত্যিকদেরই এগিয়ে আসতে হবে, আকাশ থেকে দেবদূত এসে তা করবে না।

সোহেল হাসান গালিব

অনেক ধন্যবাদ আপনাকে। বেশ খোলাখুলি আলাপ করা গেল। তাতে অভিযোগ-খণ্ডন কতটুকু হলো জানি না। জানি না নতুন কোনো সংশয়ের সম্ভাবনা, বিস্ময় ও কৌতুক অপেক্ষা করছে কিনা। তবে আশা করি, ভবিষ্যতে আমরা শিল্প-সাহিত্য নিয়েই বেশি কথা বলতে পারব। তা নিয়েই বরং আমাদের তর্ক ও সমালোচনা, বাহাস ও বিতণ্ডা জমে উঠুক।

মজিদ মাহমুদ

লেখকজীবনে একটু আড়াল রাখতে চেয়েছিলাম, একটু আড়াল থাকা উচিত। ভেবেছিলাম লেখকের জীবন মূলত লেখার জীবন। তবু লেখক তার পাঠকের কাছে যতটা খোলামেলা হতে পারে আর কোনো শিল্প ততটা পারে না। লেখকজীবনে কোনোটাই তুচ্ছ নয়; সকল অভিজ্ঞতাই তার শিল্পের কাঁচামাল। একজন লেখককে কখনো নিজেকে গিলোটিনে স্থাপন করেও দেখতে হয়। লেখক হলো মার-খাওয়াদের জীবন। লেখক মূলত মৃতদের জগতের বাসিন্দা। কেন যেন আপনার ‘পরস্পর’-এর কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে চ্যাপলিনের মঁসিয়ে ভেঁর্দুর কথা মনে পড়ছে—‘আই নেভার টেস্টেড রাম’ বলেই প্রথমবারের মতো এক পেগ গলাধ করে তিনি মাথা ঢুকিয়ে দিচ্ছেন গিলোটিনে, আর বলছেন, It’s all business. আমাকে এতটা গুরুত্ব না দিলেও চলত। আপনাকে ধন্যবাদ।

সোহেল হাসান গালিব
গালিব

সোহেল হাসান গালিব

জন্ম ১৫ নভেম্বর ১৯৭৮, টাঙ্গাইল। বাংলায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর।
সহযোগী অধ্যাপক ও প্রশিক্ষণ বিশেষজ্ঞ, নায়েম, ঢাকা।

প্রকাশিত বই :
কবিতা—
চৌষট্টি ডানার উড্ডয়ন [সমুত্থান ২০০৭]
দ্বৈপায়ন বেদনার থেকে [শুদ্ধস্বর ২০০৯]
রক্তমেমোরেন্ডাম [ভাষাচিত্র ২০১১]
অনঙ্গ রূপের দেশে [আড়িয়াল, ২০১৪]
তিমিরে তারানা [অগ্রদূত ২০১৭]

প্রবন্ধ—
বাদ-মাগরিব (ভাষা-রাজনীতির গোপন পাঠ) [অগ্রদূত ২০১৮]

সম্পাদিত গ্রন্থ—
শূন্যের কবিতা (প্রথম দশকের নির্বাচিত কবিতা) [বাঙলায়ন ২০০৮]
কহনকথা (সেলিম আল দীনের নির্বাচিত সাক্ষাৎকার) [শুদ্ধস্বর ২০০৮]

সম্পাদনা [সাহিত্যপত্রিকা] : ক্রান্তিক, বনপাংশুল।

ই-মেইল : galib.uttara@gmail.com
সোহেল হাসান গালিব
গালিব