হোম সাক্ষাৎকার কথাসাহিত্যিক হামীম কামরুল হকের সাক্ষাৎকার

কথাসাহিত্যিক হামীম কামরুল হকের সাক্ষাৎকার

কথাসাহিত্যিক হামীম কামরুল হকের সাক্ষাৎকার
558
0

কথাসাহিত্যিক হামীম কামরুল হকের জন্ম ২২ জানুয়ারি, ১৯৭৩। লেখালেখি করছেন নব্বই দশকের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে। লিখে চলেছেন গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ ও সমালোচনা-সাহিত্য; করেছেন অনুবাদ ও গবেষণামূলক কাজও। প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা দশের অধিক। এর ভেতরে উপন্যাস : রাত্রি এখনো যৌবনে [২০০৮, কাগজ প্রকাশন], গোপনীয়তার মালিকানা [২০১০, ভাষাচিত্র], আবছা আলোয় দেখা কয়েকটি মুখ [২০১৭, কথাপ্রকাশ]। দুটো নভেলার সংকলন : গোলাপের সিঁড়ি [২০১২, ত্রৈবিদ্য]। ছোটগল্পগ্রন্থ : শূন্যপরান ও অন্যান্য গল্প [২০১৩, রোদেলা], অক্ষরপুুরুষ ও অন্যান্য গল্প [২০১৭, গ্রন্থকুটির], আচ্ছন্নতার বাগান [২০১৮, গ্রন্থকুটির]। প্রবন্ধ : ছোটগল্প লেখকের প্রস্তুতি ও অন্যান্য বিবেচনা [২০১৭, কথাপ্রকাশ]। গবেষণাগ্রন্থ : মৃত্যুক্ষুধা : গতি প্রকৃতি ও পাঠবিবেচনা [২০০০, নজরুল ইন্সটিটিউট], জাদুবাস্তববাদ [২০১৬, সংবেদ]। সম্পাদনা : লেখার শিল্প, লেখকের সংকল্প [মুহম্মদ সাইফুল ইসলামের সহযোগে, ২০১৭, দ্বিতীয় সংস্করণ, সংবেদ]। ২০০৭ সালে রাত্রি এখনো যৌবনে উপন্যাসের পাণ্ডুলিপির জন্য পেয়েছেন ‘কাগজ তরুণ কথাসাহিত্য পুরস্কার’।


সা ক্ষা  কা 


 মুহিম মনির

কেমন আছেন স্যার?

হামীম কামরুল হক

ভালো আছি। ভালো থাকার চেষ্টাটেষ্টা আর করি না। ভালো থাকি। ডু অর ডু নট। ট্রাইফ্রাই আর করব না। করব, নয়তো করব না। এই আর কী!

মুহিম মনির

লেখালেখি কেমন চলছে?

হামীম কামরুল হক

লেখার জন্য সময় করে উঠতে পারি না। উঠতে পারলেই একটা দুটো লাইন কি অর্ধপৃষ্ঠা কি বেশি হলে এক দুই পৃষ্ঠা লিখতে পারি। এটাকে লেখা বলে না। লেখার অনুশীলন বলে। লেখার সময় যদি কল্পনা কাজ না করে তাহলে সেটা লেখা হয়ে ওঠে না। আমি বাস্তব মানি, সাহিত্যে বাস্তববাদও মানি, কিন্তু অভিজ্ঞতার বাইরে কিছু লিখতে পারব না—এতে একেবারে বিশ্বাস করি না। কল্পনাই হলো সৃষ্টির সবচেয়ে বড় অনুঘটক। আইনস্টাইন বলেছিলেন, ‘কল্পনা জ্ঞানের চেয়ে বড়।’ এ থেকে বুঝে নিতে পারো।

মুহিম মনির

লিখছেন তো নব্বই দশকের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে। কিন্তু আপনার প্রথম গল্প ‘অপৌরাণিক’ প্রকাশিত হয়েছে ২০০৫ সালে। মাঝখানের এই দীর্ঘ সময় কি তবে প্রস্তুতিতেই কেটেছে?

হামীম কামরুল হক

হ্যাঁ। আমি নিজেকে তৈরি করতে অনেক সময় নিয়েছি হয়তো। আসলে দরকার হলো দুটো জিনিস; এক, নিজে কতটা তৈরি—সেটা সময় মতো বোঝা এবং দুই, সাহস নিয়ে আত্মপ্রকাশ করা। সাহস না থাকলে একশটা গুণের অধিকারী হলেও কিছু হয় না। সাহস হলো একশ একটা গুণের এক নম্বর গুণ। সমস্ত গুণের শীর্ষ গুণ হলো সাহস। বা বলা হয় : সাহস হলো সমস্ত গুণের কালমিনেশান। ফিনিশিং টাচ। সাহসই হলো আলাউদ্দীনের আশ্চর্য প্রদীপ। এর ছোঁয়াতেই ইচ্ছার দৈত্য বিশাল বিরাট হয়ে ওঠে। বিপুল কাজ করার শক্তি অর্জন করা যায়। আর লেখকের সেই সাহস কেবল বীরত্ব দেখানোর সাহস নয়। ইংরেজিতে বলে ‘গাটস’ সেই গাটস-টা থাকা চাই লেখকের। কোনোকিছুর জন্য যে-মানুষ দিন রাত ছোঁকছোঁক করে, তার লেখক না হয়ে অন্য কিছু হওয়াই ভালো। পুরস্কার, স্বীকৃতি, টাকা, জৈবিক বাসনাপূরণ, নেশা, ক্ষমতা প্রভৃতিতে মেতে থাকা লেখকের ধ্বংস অনিবার্য, আবার এগুলোর প্রতি কোনো টান নেই, তিনিও বোধ করি ক্ষয়ে যাবেন। মূল ব্যাপার হলো নিয়ন্ত্রণ, পরিমিতিবোধ। আমাদের পরিমিতিবোধের ব্যাপক অভাব আছে, কী জীবনে, কী সাহিত্যে।


লেখার সঙ্গে যুক্ত হতে হলে মুক্ত হতে হয়। মুক্তমানুষ হতে হয়।


মুহিম মনির

লেখার শিল্প লেখকের সংকল্প নামে তো আপনার একটি বই আছে। আসলে ‘লেখকের সংকল্প’ বলতে কেমন সংকল্প?

হামীম কামরুল হক

লেখক একটির পর একটি রচনা লেখার চিন্তা করবেন। এটাকে তিনি তার প্রকল্প বা প্রোজেক্ট হিসেবে নেবেন। যেমন, তলস্তয়ের ৩৫/৩৬ বছর বয়সের প্রকল্প হলো ওয়ার অ্যান্ড পিস। সেটি তিনি দীর্ঘসময় নিয়ে সম্পন্ন করেন। এভাবে তিনি একটার পর একটি বড় কাজ করেছেন। উপন্যাস লিখেছেন আসলে তিনটা : ওয়ার অ্যান্ড পিস, আনা কারেনিনা এবং রেজারেকশান। এছাড়ও বিপুল লিখেছেন। ছোটলেখাগুলি হলো ছোট ছোট প্রকল্প। এই প্রকল্পগুলি কিভাবে ইতিটানা হবে এজন্য চিন্তা করা, কাজ করাটা দৃঢ় সংকল্প ছাড়া হয় কি?

মুহিম মনির

লেখালেখি আর শব্দ নিয়ে খেলাখেলির মধ্যে কি তবে বিস্তর পার্থক্য?

হামীম কামরুল হক

অবশ্যই বিরাট পার্থক্য আছে লেখা ও খেলার ভেতরে। তবে লেখার গভীরে ঢুকতে পারলে, এর গভীরতম আনন্দ নিতে পারলে, লেখার প্রচণ্ড স্নায়বিক পরিশ্রমটাও খেলার মতো আনন্দময় হয়ে ওঠে। কিন্তু জীবন ও সাহিত্য কোনোটাই খেলার বিষয় নয়। মহাকবি ফেরদৌসী তার শাহনামায় বলেছেন, জীবনকে খেলা হিসেবে না নিতে। এটা কেবল তিনিই বলেন নি, সত্যিকারের লেখক মাত্র এটা বোধ করতে বাধ্য হন। তার নৈতিক মেরুদণ্ডটি ভেঙে দিলে বা গেলে তিনি আর লেখকই থাকেন না। লেখা একটি চরম নৈতিক কাজ। এতে ক্রিয়াশীল থাকার জন্য অনেক কিছু ছেড়ে দিতে হয়, জীবন থেকে বাদ দিয়ে দিতে হয়। আগে শুনতাম অনেক কিছু ‘ত্যাগ’ করতে হয়। এই ত্যাগটা কিভাবে হয় যারা লেখক নন, তাদের বোঝার সাধ্য নেই বোধ করি। একেবারে ভেতর থেকে বুঝতে হয়। লেখার সঙ্গে যুক্ত হতে হলে মুক্ত হতে হয়। মুক্তমানুষ হতে হয়। এই মুক্তিটা কী? যা যা মানুষকে ভেতর থেকে কাজ করতে বাধা দেয়, সেসবের হাত থেকে মুক্ত হলেই আসলে মুক্তি। বাহ্যিক জীবিকা, প্রতিকূল পরিস্থিতির বিপরীতে লেখাটাকে চালু রাখা তখন কোনো ব্যাপার নয়। যে কারণে কঠিন গরিব দশায় থেকেও আগের লেখকরা লিখতে পারতেন। কারণ ভেতরে কোনো বাধা ছিল না। আজ লেখকদের খুব কম ব্যক্তিই গরিবি হালে পড়ে থাকেন। ন্যূনতম যোগ্যতা, বুদ্ধি ও সাহস থাকলে দুটো ডালভাত খাওয়ার, পরার ব্যবস্থা—এ যুগেই যদি কোনো লেখক না-করতে পারেন তো তার সম্পর্কে আর কীই বলা যায়! তো আজকের লেখকদের বেশিরভাগই আমরা ভেতর থেকে মুক্ত নই। অনেক কিছুর সঙ্গে ‘ধান্দায় বান্ধা বন্ধ বদ্ধ’ দশা আমাদের।

মুহিম মনির

একটি শিল্পসম্মত রচনায় লেখকের নির্লিপ্ততা কতটুকু গুরুত্ববহ বলে মনে করেন?

হামীম কামরুল হক

নিরাবেগ নির্লিপ্ত দশা দিয়ে কী করে লেখে কেউ আমি ঠিক জানি না। ভাষা বা প্রকাশভঙ্গি নিরাবেগ হতে পারে। কিন্তু আবেগহীন মন লিখতে পারে কিনা আমি জানি না। বরং মনে হয় শিল্পের প্রতি, সৃষ্টির প্রতি গভীর ভালোবাসা ও আবেগই লেখককে লিখতে সহায়তা করে; এবং এও মনে হয়, সেই বিশুদ্ধ আবেগ যত বেশি হবে, তত বেশি করে নিরাবেগভাবে লেখাটা সম্পন্ন করা সহজ হবে।

মুহিম মনির

রবীন্দ্রনাথের ‘পোস্টমাস্টার’ এবং ‘নষ্টনীড়’ গল্পের পরিধিতে কিংবা হাসান আজিজুল হকের ‘আত্মজা ও একটি করবী গাছ’ এবং ‘জীবন ঘষে আগুন’ বা ‘বিধবাদের কথা’ গল্পের বিস্তৃতিতে বিস্তর ফারাক। আবার ওয়ালীউল্লাহর থেকে ইলিয়াসের প্রায় গল্পই বেশ বড়ো। হাসানের কোনো কোনো গল্প তো উপন্যাস নামেও বিক্রি হচ্ছে এখন, যা সম্ভবত তার আগুনপাখি প্রকাশের আগে হয় নি। এই যে পরিধি বা বিস্তার, এটি আদৌ কোনো রচনার জেনরা নির্দেশ করে কি?

হামীম কামরুল হক

তাই বলে তো তিন লক্ষ শব্দে একটি ছোটগল্প হবে না, হবে কি? আবার একটি বাক্য দিয়েও ছোটগল্প হয়—ঘুম থেকে উঠে দেখলাম জানালার পাশে সেই ডায়নোসরটা এখনও বসে আছে—এমন ধরনের এক বাক্যের ছোটগল্প আছে। কিন্তু সব কিছুর একটা কাঠামো থাকে। সে কেউ মানতে পারে, নাও মানতে পারে। গ্যোয়েটের ‘ফাউস্ট’ বিশাল বড় নাট্যকর্ম ব’লে তা নিয়মিত মঞ্চায়ন করার সমস্যা কতটা সেটা যাদের বোঝার তারা বোঝেন। সিনেমা হলে ছবি দেখার স্বাদ আর ঘরে বসে কম্পিউটারের স্ক্রিনে দেখার স্বাদ কি এক? দেখলে তো দেখাই যায়। আমরা তা-ই দেখি। সত্যজিৎ রায়কেও বিদেশের অনেক সিনেমা ভিসিআর-এ নাকি দেখতে হয়েছে। তার মতো প্রতিভা সেখান থেকে যেটুকু নেওয়ার নিতে পেরেছেন। সবাই তা পারে না। মানুষের যেমন একটা কাঠামো আছে, একটা মাথা, তাতে দুটো চোখ, ইত্যাদি ইত্যাদি, তেমন করে লেখার মতো প্রাকৃতিক জৈবিক স্নায়বিক বিষয়ের ছকহীন এক একটা ছক আছে বলেই মনে হয়। লেখালেখি আর যাই হোক গোঁয়ারতুমির বিষয় নয়। ‘আমি কিছুই মানব না’ জাতীয় মানসিকতা দিয়ে লেখার কাজটার ক্ষতিই হয়। এটা কিছুটা প্রাকৃতিক এবং অনেকটাই সাংস্কৃতিক [মানে নিজের চর্চায় করে ওঠে, ক্রম উন্নয়ন ঘটানোর]। ওই যথাক্রমে এক ভাগ প্রেরণা ও নিরানব্বই ভাগ সাধনা বা পরিশ্রমের কাজ বলেই মনে করি।


সবচেয়ে সহজভাবে লেখার জন্য সবচেয়ে কঠিন পরিশ্রম করতে হয়।


মুহিম মনির

‘শেষ হইয়াও হইল না শেষ’ কথাটিকে তো ছোটগল্পের মূল বৈশিষ্ট্য মনে করা হয়। এ বিষয়ে আপনার মন্তব্য?

হামীম কামরুল হক

না হয় না। এর বেশি কিছু বলবার নেই? কেবল আধুনিক গল্প লেখকদের লেখা পড়লেই তার উত্তর পাবে, স্বয়ং রবীন্দ্রনাথও আসলে এটা কি সব সময় মেনেছেন? মানেন নি। লেখক যেখানে ইতি টানতে চাইবে, টানাটা শৈল্পিক মনে করবে, সেখানেই গল্পের ইতি।

মুহিম মনির

আপনার ছোটগল্প লেখকের প্রস্তুতি ও অন্যান্য বিবেচনা বইটি আমি একাধিকবার পড়েছি। ছোট্ট একটি বই; অথচ কী চমৎকার গ্রন্থনা! বইটির এক জায়গায় বলেছেন, ‘আদতে আত্মমুকুরে পৃথিবী ও জীবনকে দেখাটাই গল্পের জায়গা জমি এবং সেখানে খোঁড়াখুঁড়ির ফসলই ছোটগল্প।’ এই যে আত্মমুকুরে পৃথিবী ও জীবনকে দেখা, এ ব্যাপারে এখনকার তরুণ লেখকেরা কতটুকু সার্থক হচ্ছে বলে মনে করেন আপনি?

হামীম কামরুল হক

তরুণদের একটা সমস্যা, ভাষাগত। ভাষাই হলো লেখার মূল। সেটাই আয়ত্ত করতে কঠিন শ্রম দিতে হয়। সবচেয়ে সহজভাবে লেখার জন্য সবচেয়ে কঠিন পরিশ্রম করতে হয়। তরুণদের বিষয়, চরিত্র বা বুনন কৌশল তাক লাগানোর মতো থাকলেও ভাষাগত দক্ষতাটা স্বাভাবিকভাবেই থাকে না, তবে বঙ্কিম মানিকের মতো মানুষেরা অল্প বয়সেই সেসব আয়ত্ত করেছিলেন। এটা তারুণ্য বা বয়সের স্তরের বিষয় নয়। এটা কারো দ্রুত হয়, কারো দেরিতে হয়।

মুহিম মনির

স্বতন্ত্র স্বর সৃষ্টির অভিপ্রায়ে অনেকে লেখাকে জটিল করে তোলেন, দূরান্বয়ের পর দূরান্বয় যোগ করে বাক্যের দৈর্ঘ্য বাড়ান। অথচ ভেঙে ভেঙে সরল বাক্যে বললেও ভাবার্থে কোনো ব্যাঘাত ঘটতো না। এই প্রবণতা আসলে কতটা শক্তিমত্তার পরিচায়ক?

হামীম কামরুল হক

দু ধরনের দৌড় আছে—একশ মিটার, দুশো মিটার, চারশ মিটার—মানে স্বল্পপাল্লার দৌড়। আর আছে দূরপাল্লার দৌড়। লেখকমাত্রই লম্বা দৌড়ের ঘোড়া। ফলে, তিনি যাই লিখুন ছোট ছোট বাক্যে কি বড় বড় বাক্যে তিনি কতটা দৌড়াতে পারছেন এবং ঠিক মতো জায়গা মতো দৌড় শেষ করতে পারছেন কিনা, ইতি টানতে পারেন বা ফিনিশিং দিতে পারছেন কিনা—সেটাই হলো প্রশ্ন। এখানেও নিজের লেখার ক্ষমতা অপব্যবহার ঠেকানোর জন্য নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ মোদ্দা কথা ‘চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স’ দরকার।

মুহিম মনির

‘নানান মতবাদের নামে গল্প থেকে এর আসল রস বাদ দিয়ে নির্মিত হচ্ছে ছোটগল্প। সেখানে না আছে গল্প, না আছে গদ্যের স্বাদ।’ কথাটির সূত্র ধরেই যদি জানতে চাই, ছোটগল্পে নিরীক্ষার ব্যাপারটিকে কিভাবে দেখেন আপনি?

হামীম কামরুল হক

আমি যেমন বঙ্কিম পড়ি, বাংলা ভাষাটা লেখার ভাষা হিসেবে কী অসামান্য, কী অতুলনীয়, সেই স্বাদ পেতে। বাংলা ভাষার জন্য গর্ব হয় বঙ্কিম রবীন্দ্রনাথ প্রমথ চৌধুরীর মতো লেখকদের লেখা পড়তে গিয়ে। বর্তমানকে বুঝতেও তাদের লেখা পড়া চাই। সাহিত্য বাংলা ভাষায় কী চেহারায় ছিল সেটা জেনে রাখা তো ভালো। কারণ তারা যে যে বিষয়ের ওপর লিখেছেন, সেগুলির কম-বেশি বদল ঘটেছে, তাদের আগের অনেক কিছুই আর নেই। কিন্তু তাদের ভাষার স্বাদ, টেস্ট, মনের জিভ দিয়ে চাখলে বোঝা যায়, কী এ জিনিস। আমি অনেক দিন খবরের কাগজ পড়ি নি। কারণও ছিল। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো ইউ জি কৃষ্ণমূর্তি বলেছিলেন :

আপনি আজ থেকে কুড়ি বছর আগের খবরের কাগজ নিয়ে কেবল তারিখ, আর প্রতিটি খবরে থাকা নাম স্থান বদলে বসিয়ে দিন, দেখবেন একালের খবরের কাগজের সঙ্গে কোনো তফাত নেই।

তখন মনে হলো দুরো, তাহলে আর পত্রিকা পড়া কেন। কিন্তু হঠাৎ মনে হলো : খবরের কাগজ কেবল তথ্য জানার জন্যই নয়, ভাষার সঙ্গে নিত্য থাকার জন্য দরকার। বর্তমানের প্রতিদিনের ভাষার দ্যোতনাটা খবরের কাগজের পাওয়া যায়। এবং নিজের লেখার ভাষা যাতে খবরের কাগজের ভাষার চেয়ে আলাদা কিছু করে রাখা যায়, তাও আয়ত্ত করতে হয়। তবে একটি প্রজন্মে ৩০০ জন লিখতে এলে তিনচার জনও যদি টিকে যান, তাই বিরাট ব্যাপার। তিন চারজন তরুণ আমর মনে হয়, ভাষাগত সীমাবদ্ধতা পার হয়ে উঠতেই পারবেন। ভাষা নিয়ে কাজ করতে গেলেই ধরা পড়ে, সব কথা লিখে বোঝানো যায় না। এই যে ভাষার ক্ষমতা সীমাবদ্ধ—কিন্তু এই সীমাবদ্ধতা নিয়েই ভাষাকে অসীমের পথে বিরাট মুক্তির দিকে নিয়ে যাওয়া যায়।


সাহিত্যের মন্দিরে সবাই পূজা দিতে যায় না। আর সাহিত্যের দেবতা সবার পূজা গ্রহণও করেন না। 


মুহিম মনির

আমরা যারা সবে লিখতে এসেছি, একজন অগ্রজ হিসেবে এবার তাদের উদ্দেশে কিছু বলুন।

হামীম কামরুল হক

ওই যে কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর কবিতার কথায় বলি, ভালোবাসা থাকলে সব হবে। সাহিত্যকে অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে, স্বার্থহীন ভালোবাসার মতো ভালোবাসা হলেই সাহিত্যের পথে থাকা সম্ভব। নইলে যে দিনকাল পড়েছে তাতে সাহিত্য আর হায়ার ফিজিক্স অতি উন্নতমানের মেধার দাবি করবে। সাহিত্যের মন্দিরে সবাই পূজা দিতে যায় না। আর সাহিত্যের দেবতা সবার পূজা গ্রহণও করেন না। সাহিত্য উপাসনা আরাধনা সাধনার বিষয় না হলে, অনেক ত্যাগ তিতিক্ষার বিষয় না হলে এটা না করেও অনেক কাজ করার আছে। অনেকেই এই যা যা বললাম ত্যাগ, তিতিক্ষা, সাধনা আরাধনা—এসবকে বুর্জুয়া বিষয় মনে করেন। তাদের কপালে সরসী মা লিখো, না লিখো। হা হা হা। সুতরাং সাহিত্যের যদি কেউ পড়তে লিখতে আনন্দ পান, একে ভালোবাসেন, সেই তরুণ সাহিত্যই করবেন। আমার বলায় না বলায় তিনি যোগও দেবেন না, সটকেও পড়বে না। পড়ুন লিখুন, আনন্দ-বেদনায় সবসময় সাহিত্যের সঙ্গে থাকুন। কাব্যদেবী বলে না, তাকেই সাহিত্য বলি, তো তাকে ভালোবাসুন। একদিন তিনি আপনার ভালোবাসায় সাড়া দেবেনই। জগতের প্রকৃত ভালোবাসা কোনো দিন ব্যর্থ হয় না। তা দান্তেকে দিয়ে ডিভাইন কোমেদিয়া লেখায়। প্রেয়সীকে পাওয়াই তো ভালোবাসার একমাত্র সার্থকতা নয়, তাকে ভালোবেসে নিজের ভেতরে কাজ করার সৃষ্টির যে প্রেরণা পাওয়া হয়, সেটা কম পাওয়া নয়। সাহিত্যকে ভালোবেসে কাব্যদেবীকে না পেলে আরো অনেক কিছু পাওয়া হতে পারে। তা এখানে ব্যাখ্যেয় নয়।

মুহিম মনির

আসছে বইমেলায় আপনার কী কী বই পাচ্ছি আমরা?

হামীম কামরুল হক

তিনটা বই প্রকাশিত হতে পারে। এর ভেতরে দুটো উপন্যাস, মঙ্গলবারের জন্য অপেক্ষা প্রকাশ করবে পেন্সিল নামের একটি প্রকাশনী আর চারু তাপসের আবেগ ও অর্জন প্রকাশ করবে দেশ পাবলিকেশন্স। আরেকটি বই আন্দাজি কথা জয়কলি প্রকশনা সংস্থার প্রকাশ করার কথা রয়েছে।

মুহিম মনির

আজকের আড্ডায় বেশ সমৃদ্ধ হলাম, স্যার। অসংখ্য ধন্যবাদ আপনাকে।

হামীম কামরুল হক

তোমাকেও অনেক অনেক ধন্যবাদ।

মুহিম মনির

২০শে জ্যৈষ্ঠ [৩ জুন] নাচোল, চাঁপাইনবাবগঞ্জ।

লেখাপড়া : এমবিবিএস [পঞ্চম বর্ষ]; এম আব্দুর রহিম মেডিকেল কলেজ, দিনাজপুর।

লেখালেখি : শৈশবে লেখালেখির হাতেখড়ি হলেও বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকা, লিটলম্যাগ আর ওয়েবম্যাগে নিয়মিত লিখছেন ১৪২৪ বঙ্গাব্দের শুরু থেকে। কথাসাহিত্য তার সাহিত্যচর্চার মূলক্ষেত্র।

ই-মেইল : muhimmonir@gmail.com