হোম সাক্ষাৎকার ঋতুপর্ণ ঘোষের সাক্ষাৎকার

ঋতুপর্ণ ঘোষের সাক্ষাৎকার

ঋতুপর্ণ ঘোষের সাক্ষাৎকার
0

‘হীরের আংটি’র [১৯৯২] মাধ্যমে চলচ্চিত্র জগতে নীরবে পা রেখেছিলেন ঋতুপর্ণ ঘোষ। শিশুতোষ এই চলচ্চিত্রটির বাণিজ্যিক মুক্তি সম্ভব হয় নি বলে থেমে থাকেন নি। ১৯৯৪ সালে মা-মেয়ের মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব নিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্র ‘উনিশে এপ্রিলে’র মাধ্যমে সাড়া ফেলে দিলেন।

সত্যজিৎ রায়ের মৃত্যুর পর বাংলা চলচ্চিত্রে সে-সময় এক ধরনের শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছিল। চলচ্চিত্রের ‘বুদ্ধিবৃত্তিক ধারা’ এবং ‘বাণিজ্যিক ধারা’র মধ্যে দূরত্ব বেড়ে চলেছিল। এই দুই ধারার মধ্যে সংযোগ স্থাপন করেছিলেন ঋতুপর্ণ ঘোষ। ‘উনিশে এপ্রিলে’র মাধ্যমে বাঙালি মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে সিনেমা হলে ফিরিয়েছিলেন তিনি। এরপর ২০১৩ সাল পর্যন্ত নির্মিত উনিশ চলচ্চিত্রের জন্য তিনি পেয়েছিলেন বারোটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। বৈচিত্র্যময় গল্প এবং স্বতন্ত্র নির্মাণভঙ্গির জন্য বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে বিশেষ স্থান দখল করে আছেন তিনি।

২০০৮ সালে ঋতুপর্ণ ঘোষ নির্মিত একমাত্র ইংরেজি চলচ্চিত্র ‘দ্য লাস্ট লিয়ারে’র মুক্তির আগে তাঁর সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছিলেন তৃষা গুপ্তা। এতে উঠে এসেছে তাঁর জীবন এবং চলচ্চিত্র ভাবনার নানা দিক। সাক্ষাৎকারটির নির্বাচিত অংশ ২০০৮ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর ‘তেহেলকা’ [Tehelka] পত্রিকার ৩৮তম সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল। সাক্ষাৎকারটি ‘পরস্পরে’র পাঠকদের জন্য ইংরেজি থেকে অনুবাদ করা হলো। বাংলায় অনুবাদের জন্য সাক্ষাৎকারগ্রহীতা তৃষা গুপ্তার অনুমতি গ্রহণ করা হয়েছে।

1
ঋতুপর্ণ ঘোষ [৩১ আগস্ট, ১৯৬৩– ৩০ মে,২০১৩]

তৃষা গুপ্তা 

ভারতীয় নির্মাতাদের মধ্যে আপনি অল্প কয়েকজনের একজন—যিনি সব সময় চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য নিজে লেখেন। চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরুর আগেও কি আপনি লেখালেখি করতেন?

ঋতুপর্ণ ঘোষ

আগে আমি একটা এড এজেন্সিতে কপিরাইটার হিসেবে কাজ করতাম। কাজেই সেই সময়েও লেখালেখি আমার পেশা ছিল। তবে নিজের চলচ্চিত্রের জন্যই প্রথম চিত্রনাট্য লিখি। অন্য কারো চিত্রনাট্য নিয়ে কাজ করতে আমি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি না, একইসাথে অন্য কারোর জন্য চিত্রনাট্য লিখতেও ভালো লাগে না।


আমি মনে করি, বেনেগাল ভারতীয় চলচ্চিত্র রেনেসাঁর শেষ ব্যক্তি।


তৃষা গুপ্তা 

সিনেমার সেটে যাওয়ার আগে ওই চলচ্চিত্রের কতটুকু আপনার মাথায় থাকে?

ঋতুপর্ণ ঘোষ

মূলত চিত্রনাট্য লেখার সময়েই আমি চলচ্চিত্রটাকে ধারণ করি। যখনই একটা লাইন লিখি, সাথে সাথে ঠিক করে ফেলি এটা কিভাবে পরিচালনা করতে হবে। পরিচালনা করাটা অনেকটা কৌশল নির্ভর, অন্যদিকে লেখার কাজটা স্রোতের মতো প্রবাহমান, আপনা আপনি আসতে থাকে। আগে কিছু লোক থাকত, যারা চিত্রনাট্যের সংলাপ ঠিকমতো বলার কাজে সেটে সাহায্য করত। এখন আর সেটারও প্রয়োজন অনুভব করি না। চিত্রনাট্য নিয়ে আমি কখনও খুঁতখুঁতে নই। যখন আমি বলি যে, “তোমরা চাইলে কোনো পরিবর্তন আনতে পারো”—আমার সহকারী পরিচালকরা চমকে ওঠে। আমি লিখেছি বলে যে চিত্রনাট্যে কোনো ধরনের পরিবর্তন আনা যাবে না, এমনটা আমি বিশ্বাস করি না।

2
‘চোখের বালি’ [২০০৩] চলচ্চিত্রের পোস্টার

তৃষা গুপ্তা 

আপনার যে সব চলচ্চিত্র অন্য লেখকের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত হয়েছে, যেমন ‘চোখের বালি’ কিংবা ‘দহন’—এদের তুলনায় যে সব চলচ্চিত্র আপনার কাহিনি থেকেই নির্মিত, যেমন ‘তিতলি’ কিংবা ‘উৎসব’ নির্মাণের সময় কি বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেছেন?

ঋতুপর্ণ ঘোষ

না, ঠিক এমন না। যেকোনো উপন্যাস থেকে আমি শুধু এর নির্যাসটুকু নিই। এর বর্ণনাভঙ্গি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে অনুসরণের কোনো প্রয়োজনীয়তা দেখি না, শুধু মূল অনুভবটিকে ধারণের চেষ্টা করি। যেমন, ‘চোখের বালি’ লেখা হয়েছে ১৯০২ সালে এবং আমি এটির চলচ্চিত্ররূপ দিয়েছি ২০০৩ সালে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজেও কিন্তু ‘চোখের বালি’র সমাপ্তি নিয়ে সন্তুষ্ট ছিলেন না। সব বাসনা-কামনার অবলুপ্তি ঘটিয়ে বিধবা বিনোদিনী বেনারসে চলে যাচ্ছে, এমন এক পরিস্থিতিতে ‘চোখের বালি’র সমাপ্তি ঘটেছে। অন্যদিকে আমার চলচ্চিত্র তার স্বাধীনতাকে দেখাতে চেয়েছে… বিনোদিনী বিদায় নেওয়ার আগে আশালতাকে একটি চিঠি লেখে যেখানে সে তার দেশের কথা বলে। এখানে ‘দেশ’ বলতে কিন্তু রাষ্ট্রকে বোঝানো হয় নি, বরং তার সমাজ এবং পরিপার্শ্বকে নির্দেশ করা হয়েছে। এছাড়া বিনোদিনীর জন্য এখানে আমি লাল রঙের শাল ব্যবহার করেছি। ১৯০২ সালে ‘লাল’ ছিল কামনার রং, কিন্তু গোটা বিশ শতক আমাদেরকে দেখিয়ে গেল যে, লাল বিদ্রোহের রং-ও বটে। কাজেই ২০০৩ সালে আমি যখন লাল রং ব্যবহার করছি, তাতে কামনার সাথে বিদ্রোহকেও বোঝাচ্ছি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যেহেতু গত ১০০ বছর দেখে যেতে পারেন নি, কাজেই এখানে আমি তাঁর থেকে এগিয়ে থাকছি।

3
‘চোখের বালি’তে বিনোদিনীর চরিত্রে ঐশ্বরিয়া রাই এবং আশালতার চরিত্রে রাইমা সেন

তৃষা গুপ্তা 

যেহেতু আপনি কলকাতায় বেড়ে উঠেছেন—এর চিত্রকলা, সাহিত্য এবং চলচ্চিত্রের সংস্কৃতি আপনার চলচ্চিত্র নির্মাতা হওয়ার পেছনে কতটুকু ভূমিকা পালন করেছে?

ঋতুপর্ণ ঘোষ

অনেক বেশি। আমার বাবা-মা দু’জনই ছবি আঁকতেন, কাজেই খুব ছোটবেলা থেকে আমি চিত্র প্রদর্শনীগুলোতে যেতাম। এখন আমি বুঝতে পারি, আমার ‘দেখার চর্চা’ শুরু হয়েছিল সেই সময়েই। আমি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পড়তাম, তবে আমাদের বাড়িতে মাতৃভাষার চর্চা ছিল খুব বেশি। যখন ৬ বছরে পা দিলাম, তখন বাবা আমায় বাংলায় লেখা একটা ‘মহাভারতে’র কপি দিয়েছিলেন এবং আমাকে পুরো একটা অধ্যায় একবার জোরে পড়ে শুনিয়েছিলেন। আমি যদি কোনো শব্দের অর্থ না জানতাম, যেমন ‘ব্যূহ’ (চক্রব্যূহ); জিজ্ঞাসা করলে বাবা বলতেন, “শুনতে থাকো, বুঝতে পারবে।” আমার অভিধান দেখার অভ্যাসটাও বাবা তৈরি করেছিলেন। আর শিখিয়েছিলেন—পেন্সিল বাদে অন্য কিছু দিয়ে যেন বই না দাগাই। এখনও আমি যখন পত্রিকা পড়ি তখন আমার হাতে একটা পেন্সিল থাকে। সাউথ পয়েন্ট স্কুল থেকে আমি গেলাম যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে। নানা ধ্যানধারণা ও মতামতের মানুষের জন্য সেটা ছিল একটা পীঠস্থান। কলকাতা যেহেতু বামপন্থিদের শহর ছিল, কাজেই বামপন্থি হওয়া সে-সময়ে অনেকটা ফ্যাশনে পরিণত হয়েছিল। অর্থনীতির ছাত্র হিসেবে আমার স্পেশাল পেপারের জন্য তখন মার্ক্স পড়লাম। বিভিন্ন চলচ্চিত্র উৎসবেও গেলাম। তবে সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্র দেখেই আমার প্রথম নির্মাতা হওয়ার শখ জাগে। আমি আগেও তাঁর কিছু চলচ্চিত্র দেখেছি, তবে ১৯৭৫ সালে যখন কলকাতায় দূরদর্শন এল, তখন সত্যজিৎ রায়ের সবগুলো চলচ্চিত্র একবারে দেখার সুযোগ হলো। টেলিভিশনের কাছে এজন্য আমি আলাদাভাবে কৃতজ্ঞ।

তৃষা গুপ্তা 

আপনি সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্রের কথা বললেন। ষাটের দশক পর্যন্ত বাংলা চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় ধারা এর মান ধরে রাখতে পেরেছিল। এরপর গত কয়েক দশকে কী পরিবর্তন হলো?

ঋতুপর্ণ ঘোষ

দেখুন… বাঙালি পরিচালক, যেমন, তপন সিংহ এবং তরুণ মজুমদারকে জনপ্রিয় ধারায় ফেলা হয়েছে কারণ তাদের জন্য আমরা আলাদা কোনো স্থান পাই নি। তবে তাদের চলচ্চিত্রও কিন্তু বাস্তবঘনিষ্ঠ। সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক কিংবা মৃণাল সেন যেভাবে বাস্তবতাকে দেখিয়েছেন, তারা তার থেকে আরেকটু ভিন্নভাবে দেখিয়েছেন। এখন একজন অভিনেতাকে তার নৈপুণ্যের পরিচয় দিতে গেলে নির্দিষ্ট ধারার চলচ্চিত্রে অভিনয় করতে হয়। আগে কিন্তু এমন ছিল না। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় এ বছর যখন ‘শ্রেষ্ঠ অভিনেতা’ হিসেবে ‘জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার’ পেলেন [২০০৬ সালে নির্মিত ‘পদক্ষেপ’ চলচ্চিত্রের জন্য]; তখন আমি বলেছিলাম, “বিকল্প ধারার যেসব চলচ্চিত্রে তিনি অভিনয় করেছেন—সেগুলোর সব বাদ দিলেও জনপ্রিয় ধারার চলচ্চিত্রে তাঁর অভিনয়ের জন্য তিনি এই পুরস্কার পেতে পারতেন।” একই লেখকের একই রকম গল্পই কিন্তু চলচ্চিত্রে রূপ নেয়: অজয় করের ‘সপ্তপদী’ এবং সত্যজিৎ রায়ের ‘জলসাঘর’—দু’টোই কিন্তু তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের গল্প অবলম্বনে নির্মিত, শুধুমাত্র নির্মাণ ভঙ্গিটি ভিন্ন। আমার মনে হয়—বাংলা চলচ্চিত্র যখন সাহিত্য থেকে দূরে সরে গেল, আমাদের সংস্কৃতির সাথে চলচ্চিত্রের গাঢ় সম্পর্কটিও বিচ্যুত হলো। চলচ্চিত্র যে সব সময় সাহিত্য থেকে নির্মিত হবে এমন নয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজে বলেছিলেন, গল্প থেকে বদলে গেলেই এটা সত্যিকার সিনেমা হয়ে ওঠে। কিন্তু বাংলা চলচ্চিত্রে গত কয়েক দশকে নতুন কিছু আসে নি। পরিচালকরা গতানুগতিক নির্মাণভঙ্গিকেই অনুসরণ করছে—শুধু গল্পগুলো সময়ের সাথে আরও খারাপ হয়েছে।

তৃষা গুপ্তা 

বর্তমানে ভারতে যারা চলচ্চিত্র নির্মাণ করছেন, তাদের কার কার কাজ আপনার ভালো লাগে?

ঋতুপর্ণ ঘোষ

আমি দূরদর্শনে হিন্দি এবং বাংলা দু’ ভাষার সব ধরনের চলচ্চিত্র দেখতে দেখতেই বড় হয়েছি। চলচ্চিত্র নিয়ে আমার তেমন বাছ-বিচার নেই। হয়তো আমি সব ধরনের চলচ্চিত্র বানাই না, তাই বলে চলচ্চিত্র দেখতে আমার কোনো আপত্তি নেই। অন্য চলচ্চিত্রও যেমন আনন্দ নিয়ে দেখি, ‘রক অন’ কিংবা ‘তারে জামিন পার’ও একই রকম তৃপ্তি নিয়ে দেখি। ফারহান আখতারের কাজ যেমন ভালো লাগে, একই সাথে ফারহা খানের কাজও ভালো লাগে। নাসিরউদ্দিন শাহ’র প্রথম সিনেমা ‘য়্যু হোতা তো ক্যা হোতা’ [২০০৬] আমার বেশ ভালো লেগেছিল। বিশাল ভরদ্বাজের কাজও আমি পছন্দ করি। ‘হানিমুন ট্রাভেলস’, ‘মিথ্যা’—এই চলচ্চিত্রগুলোও আমার ভালো লাগে। সঞ্জয় লীলা বানশালীকে আমি একজন গুরুত্বপূর্ণ নির্মাতা হিসেবে বিবেচনা করি… যদিও তাঁর কিছু চলচ্চিত্রের সাথে আমার মত মিলবে না। এছাড়া প্রিয়ান, মনি রত্নম, আদুর গোপালকৃষ্ণন, অপর্ণা সেন, শ্যাম বেনেগালের কথাও আলাদাভাবে উল্লেখ করতে হবে। আমি মনে করি, বেনেগাল ভারতীয় চলচ্চিত্র রেনেসাঁর শেষ ব্যক্তি।


আমরা গতানুগতিক ধারার বাইরে অনেক চলচ্চিত্র নির্মাণ করি, তবে সেগুলো মানুষের কাছে পৌঁছাতেও চাই গতানুগতিক ধারাতেই।


তৃষা গুপ্তা 

বাঙালি অভিনেতাদের নিয়ে কাজ করতে করতে আপনি বোম্বের অভিনেতাদের নিয়েও কাজ করলেন এবং বাংলা ভিন্ন অন্য ভাষায় দু’টো চলচ্চিত্রও নির্মাণ করলেন। ‘রেইনকোট’ এবং ‘দ্য লাস্ট লিয়ার’-এ কি এমন কোনো আলাদা অনুষঙ্গ আছে যার জন্য এ দু’টো যথাক্রমে হিন্দি এবং ইংরেজিতে নির্মাণ করতে হলো?

4
‘রেইনকোট’ [২০০৪] চলচ্চিত্রের পোস্টার

ঋতুপর্ণ ঘোষ

‘দ্য লাস্ট লিয়ার’ শুধুমাত্র ইংরেজিতেই বানানো সম্ভব ছিল। তবে ‘রেইনকোট’ চাইলে বাংলাতেও বানানো যেত। অন্যভাবে ভাবলে, হয়তো সেটাই করা উচিত ছিল। কিন্তু আমি যদি শুধু বাঙালি অভিনেতাদের নিয়েই কাজ করি, তবে অনেক গুণী অভিনেতাদের সংস্পর্শ থেকে আমি বঞ্চিত হব। আমার মনেও হয়েছে যে, হিন্দিভাষী অভিনেতাদের দিয়ে বাংলায় কাজ করানোর থেকে হিন্দিতে চলচ্চিত্র নির্মাণ সহজ হবে। যেমন ধরুন, ‘সানগ্লাস’ চলচ্চিত্রে নাসিরুদ্দিন শাহর হিন্দি এবং বাংলা—দু’ভাষাতেই কথা বলার একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। কিন্তু উনি বাংলা বলতে না পারায় শুধুমাত্র হিন্দি দিয়েই কাজ চালাতে হয়েছে। আমি মনে করি, আমাদের বহু ভাষায় চলচ্চিত্র নির্মাণ বাড়ানো প্রয়োজন। যখন আমরা চলচ্চিত্রের বৈচিত্র্য নিয়ে কথা বলি, তখন শুধু আন্তর্জাতিক মানের ভারতীয় চলচ্চিত্র নির্মাণের কথা বললে চলবে না। আমাদের দেশের মধ্যেই কী বিশাল বৈচিত্র্য! ‘রোজা’ সিনেমাটার কথাই ভাবুন, যেখানে একটি তামিল মেয়ে কাশ্মিরে এসে যোগাযোগ করতে ব্যর্থ হয়ে প্রতীকী ভাষায় কথা বলা শুরু করে—হিন্দি ডাবিংয়ে এই বেদনার চিত্রায়ণটুকু কিন্তু আর ছিল না। ভারতীয় চলচ্চিত্রের এই বিচিত্র জগৎকে দর্শকের কাছে পৌঁছানোর সম্ভাবনা নিয়ে কেউ ভাবে নি। আমরা গতানুগতিক ধারার বাইরে অনেক চলচ্চিত্র নির্মাণ করি, তবে সেগুলো মানুষের কাছে পৌঁছাতেও চাই গতানুগতিক ধারাতেই। আমার মনে হয়, চলচ্চিত্রের প্রোডাকশনে যে ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলে, তার এক-পঞ্চমাংশও যদি মার্কেটিংয়ে দেওয়া হতো, তবে আমাদের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি অন্য রকম হতে পারত।

তৃষা গুপ্তা 

আপনার বেশিরভাগ চলচ্চিত্রই নারীকেন্দ্রিক… পুরুষ চরিত্র প্রায়শই অনুপস্থিত, দুর্বল অথবা নিষ্ঠুর প্রকৃতির। যেমন: ‘দহন’, ‘বাড়িওয়ালি’, ‘অন্তরমহল’, ‘শুভ মহরৎ’। এমন চরিত্রায়ণের কারণটা কী?

ঋতুপর্ণ ঘোষ

এখন আমার মনে হয়, আমি ‘দহনে’র নারী চরিত্রগুলোকে বেশি মহিমান্বিত করে ফেলেছি এবং পুরুষ চরিত্রগুলো এখানে একেবারেই উদারতা পায় নি। তবে হ্যাঁ, আমি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থাকে চলচ্চিত্রে তুলে আনতে পছন্দ করি। বলতে দ্বিধা নেই, আমি পুরুষতন্ত্রের ঘোর বিরোধী। ‘বাড়িওয়ালি’তে কিরণ খের অভিনীত বনলতা চরিত্রের সাথে ‘দ্য লাস্ট লিয়ার’ চলচ্চিত্রের হ্যারির কিন্তু খুব বেশি পার্থক্য নেই… যদিও একজন নারী এবং অন্যজন পুরুষ। পুরুষতন্ত্রের শৃঙ্খলাবদ্ধ শক্তি এবং রাজনীতির বিপরীতে দু’জনেই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে।

5
‘বাড়িওয়ালি’ [২০০০] চলচ্চিত্রের পোস্টার

তৃষা গুপ্তা 

শিল্পকলার জগৎটা, বিশেষ করে চলচ্চিত্র এবং খ্যাতিলাভের দিকটি আপনার চলচ্চিত্রে ঘুরেফিরে আসে… ‘উনিশে এপ্রিল’ থেকে শুরু করে ‘তিতলি’, ‘বাড়িওয়ালি’, ‘শুভ মহরৎ’, এমনকি ‘দ্য লাস্ট লিয়ারে’ও এসেছে।

ঋতুপর্ণ ঘোষ

খ্যাতির সাথে যে ক্ষমতা আসে এবং সেই ক্ষমতার পিছনের মানুষের দুর্বল অবস্থা নিয়ে কাজ করতে আমি পছন্দ করি… যদিও এই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার কথা মানুষ এড়িয়ে যেতে চায়। আমি যেহেতু ‘শো বিজনেসে’র সাথে যুক্ত, এই জায়গার শক্তি, ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ এবং ঝুঁকির দিকগুলো আমি ভালো বুঝি।

তৃষা গুপ্তা 

আপনার চলচ্চিত্রগুলোর একটা সমালোচনা অনেকে করে থাকেন যে, আপনার নির্মাণগুলো যথেষ্ট ‘সিনেম্যাটিক’ না, অথবা সেগুলো অনেকটা ‘নাটকের চলচ্চিত্রায়ণ’। এই জিনিসটাকে কিভাবে দেখেন?

ঋতুপর্ণ ঘোষ

মানুষের একটা ধারণা আছে যে, আপনি যদি আউটডোরে শুটিং করেন, তবে এটা সিনেমা, কিন্তু ইনডোরে শুটিং করলে সেটা ‘নাটক’। এই সংজ্ঞানুসারে, কুরোসাওয়ারগুলো সিনেমা হবে, কিন্তু বারিমনেরগুলো সিনেমা না। যেটাকে আপনারা ‘চেম্বার ড্রামা’ বলেন, সেটাও যে অসাধারণ চলচ্চিত্র হতে পারে তা কিন্তু বারিমন করে দেখিয়েছেন৷ আমি বলছি না যে, ‘আমি বারিমন’, কিংবা আমার ‘রেইনকোট’ অসাধারণ একটা চলচ্চিত্র। কিন্তু চলচ্চিত্রের সমালোচনা করার সময় সবগুলোকে একই নিয়মে বিচার করা উচিত বলে আমি মনে করি।

তৃষা গুপ্তা 

আপনার নির্মিত কোন চলচ্চিত্রগুলোর উপর বেশি দুর্বলতা রয়েছে?

ঋতুপর্ণ ঘোষ

যে চলচ্চিত্রগুলো সমালোচিত হয়েছে, কিংবা যেগুলো দর্শকেরা যথেষ্ট পরিমাণে দেখে নি— চলচ্চিত্র নির্মাতাদের সেগুলোর সাফাই গাওয়ার একটা প্রবণতা থাকে। এদিক থেকে আমি বলব, ‘অন্তরমহল’ খুব শক্তিশালী একটা সিনেমা… ‘অসুখ’ চলচ্চিত্রটা মানুষ কম দেখেছে… এবং ‘দোসর’। এছাড়া ‘দ্য লাস্ট লিয়ার’ও হতে পারে।


আমি সার্বজনীন আবেদন নিয়ে কিছু বানাতে চাইলাম, আমাকে স্বভাবতই শেক্সপিয়ারের দ্বারস্থ হতে হলো। 


তৃষা গুপ্তা 

আপনি শিশুতোষ চলচ্চিত্র ‘হীরের আংটি’ [১৯৯২] বানিয়েছিলেন, এছাড়া সম্প্রতি রহস্য সমাধান নিয়ে ‘শুভ মহরৎ’ বানিয়েছেন। চলচ্চিত্রের এই ধারাটি নিয়ে আপনি কি সামনেও কাজ করবেন?

6
‘শুভ মহরৎ’ [২০০৩] চলচ্চিত্রের পোস্টার

ঋতুপর্ণ ঘোষ

রাঙা পিসীমাকে [‘শুভ মহরৎ’ এ রাখী গুলজার অভিনীত চরিত্র] নিয়ে আমি একটি পূর্ণ গোয়েন্দা সিরিজ বানাতে চেয়েছিলাম। প্রথাগত চিন্তাভাবনার বাইরে গোয়েন্দা গল্প নির্মাণ খুবই কঠিন একটা কাজ, যেটা আমি ‘শুভ মহরৎ’-এ করার চেষ্টা করেছি। ধূসর চরিত্র, পুলিশি হস্তক্ষেপ—সবকিছুকে আমি দূরে রাখার চেষ্টা করেছি। গোয়েন্দা জানে যে, কে অপরাধ করেছে। কিন্তু সে জেনেও চুপ করে থাকে। আমি পরিকল্পিতভাবেই অপরাধী এবং গোয়েন্দা—দুই চরিত্রেই নারীদের রেখেছি, কারণ তারা জিনগতভাবেই সহনশীল হয়। প্রচলিত গোয়েন্দা কাহিনিগুলোতে যেটা হয়—একজন শিকারি এবং অন্যজন শিকার, তাদের মধ্যে বুদ্ধিমত্তা ভিন্ন আর কোনো সম্পর্ক নেই। এই ধারণার বাইরে যাওয়ার চেষ্টা করেছি। যে মানুষটিকে নিয়ে আপনার এত আগ্রহ, তার প্রতি আবেগের এত ঘাটতি থাকা কি সমীচীন?

7
‘দ্য লাস্ট লিয়ার’ [২০০৭] চলচ্চিত্রের পোস্টার

তৃষা গুপ্তা 

উৎপল দত্তের ‘আজকের শাহজাহানে’র চলচ্চিত্ররূপ দেওয়ার সিদ্ধান্ত ‘দ্য লাস্ট লিয়ার’ [২০০৭]-এ কেন নিলেন? চলচ্চিত্রটি নাটক থেকে কতটা ভিন্ন?

ঋতুপর্ণ ঘোষ

কলেজে পড়াকালীন সময়ে আমি ‘আজকের শাহজাহান’ দেখে খুব মুগ্ধ হয়েছিলাম। তাছাড়া থিয়েটারের সাথে চলচ্চিত্রের সম্পর্ক নিয়ে যে প্রশ্ন থেকে যায়, তা নিয়ে আমার আগ্রহ রয়েছে। আমি এখানে উৎপল দা’কে বাংলার বাইরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছি। হিন্দি চলচ্চিত্র যারা দেখে তারা তাকে একজন কমেডি অভিনেতা হিসেবে চেনে। কিন্তু একজন নাট্যকার হিসেবেও তিনি যে কতটা শক্তিশালী তা অনেকের জানা নেই। মূল নাটকটা বার্ধক্যজনিত জটিলতা নিয়েও। সম্রাট শাহজাহান এবং তাঁর কন্যা জাহানারার মাঝে যে সম্পর্ক, তা এখানে লিয়ার এবং কর্ডেলিয়ার মাঝে প্রতিধ্বনিত হয়েছে। যখন আমি সার্বজনীন আবেদন নিয়ে কিছু বানাতে চাইলাম, আমাকে স্বভাবতই শেক্সপিয়ারের দ্বারস্থ হতে হলো। আর এভাবেই ‘দ্য লাস্ট লিয়ারে’র জন্ম হলো।