হোম সাক্ষাৎকার ইতালো ক্যালভিনোর সাথে আলাপ

ইতালো ক্যালভিনোর সাথে আলাপ

ইতালো ক্যালভিনোর সাথে আলাপ
382
0

ইতালো ক্যালভিনোর জন্ম ১৯২৩ সালের ১৫ অক্টোবর, ক্যুবাতে। মৃত্যু : সেপ্টেম্বর ১৯, ১৯৮৫। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে বেড়ে ওঠা ক্যালভিনো পেশায় ছিলেন সাংবাদিক, ছোটগল্পকার, ঔপন্যাসিক—যাকে গণ্য করা হয় বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও গুরুত্বপূর্ণ ইতালিয়ান লেখক হিশাবে। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে ইতালীয় সাহিত্যে যে বিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছিল, ক্যালভিনো ছিলেন তাদের মধ্যে অগ্রগামী। তুরিনের এনাউদির প্রকাশনা সংস্থা, যাকে ধরা হতো ইতালির এন্টি-ফ্যাসিস্ট কেন্দ্রের মধ্যে অন্যতম সার্কেল হিশাবে—সেখানে যোগ দেয়ার আগে ক্যালভিনো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইতালিয়ান রেজিস্ট্যান্সে সরাসরি অংশগ্রহণ করার অভিজ্ঞতা লাভ করেন। পরবর্তীতে কম্যুনিস্ট রাজনীতিতে কিছুকাল সক্রিয় থাকার পরেও তা থেকে নিজেকে অব্যাহতি দেন আদর্শিক আশাভঙ্গের জন্যে। লক্ষণীয় এই যে, পশ্চিমের ভূগোলের অন্যতম আরেক লেখক মিলান কুন্ডেরার ভেতরেও দেখা গিয়েছিল কম্যুনিস্ট পার্টির সাথে এই বিভেদন। ক্যালভিনোকে পড়ার অন্তত একটা প্রেক্ষাপট এখান থেকে পাওয়ার আশা করা যায়, যদিও তা এক ধরনের সংকীর্ণ পাঠ। কারণ ক্যালভিনোকে পড়ার অন্যতম শর্ত : সূত্রহীন-প্লটহীন উপন্যাস আর ফ্যান্টাসি নামের উদ্ভাবনী কৌশলের সাথে নিজেকে মিলায়ে নেয়ার। বোধ করি,  ক্যালভিনোর ফর্মের নানাবিধ লিকুইফ্যাকশনের সাথে তার সময় এবং প্রস্তাবিত বাস্তবতাপাঠের সংযোগ আবিষ্কার করা সম্ভব। এরজন্যেই ইতালিয়ান ফোকটেইলস বা ফ্যান্টাসিই তার অন্যতম অ্যালিগরিকল আশ্রয় হয়ে ওঠে, যাকে দূরতম নক্ষত্রের প্রভাবে রাজনীতি বলাটাও অসমীচীন হয়ে ওঠে না।

তবে সাহিত্যে রাজনীতির স্থান নিয়ে তার মনোভাব সরাসরি পাওয়া যায় তার ‘দ্য ইউজেস অফ লিটারেচার’ বইতে, যেখানে তিনি বলেছিলেন : ‘এক কথায় বলতে গেলে সাহিত্যের রাজনৈতিক ব্যবহারে সম্ভাব্য দুইটা ভুল তরিকা আছে। একটা হচ্ছে, রাজনীতি যে সত্য ধারণ করে, সাহিত্যের উচিত সেই সত্যকেই প্রকাশ করা। এর মানে দাঁড়ায়, রাজনৈতিক মূল্যবোধই মৌলিক বস্তু—যার সাথে সাহিত্যকে শুধু খাপ খাইয়ে নিতে হবে। এই অভিমত স্বরূপ—সাহিত্য শুধু আলঙ্কারিক এবং বাহুল্যময়। কিন্ত একই সাথে এই ধারণাটা রাজনীতিকে ধরে নেয় অটল এবং আত্মবিশ্বাসী হিশাবে। আমার মতে, রাজনীতি সম্পর্কে এমন ধারণা পোষণ করা সর্বনাশা চিন্তা। রাজনীতিবিষয়ক এমন শিক্ষা প্রক্রিয়া শুধু ঠুনকো সাহিত্য এবং ঠুনকো রাজনীতির লেভেলেই কল্পনা করা যায়’।

রাজনীতি নিয়ে আধুনিকবাদী সাহিত্যিকদের ভাবপ্রক্রিয়া একপ্রকারের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হওয়ায় আধুনিক-উত্তর সাহিত্য চিন্তার অন্যতম প্রযোজক ক্যালভিনোর সাথে রাজনীতির সম্পর্কবিচার তাই গুরুত্বপূর্ণ সমসাময়িক বিতর্ক ও আলোচনা। সেই সাথে তার সাহিত্যিক করণকৌশলও সমান মনোযোগের দাবিদার। বর্তমানের অসমাপ্ত সাক্ষাৎকারে ক্যালভিনো মূলত আলোচনা করেছেন তার বেড়ে ওঠা, লেখালেখি, তারুণ্য, বই, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী ইতালি প্রভৃতি নিয়ে।

সাক্ষাৎকার  নিয়েছেন উইলিয়াম উইবার এবং ড্যামিয়েন প্যাটিগ্রু। বাঙলায়ন করেছেন শফিউল জয়।


সা ক্ষা  কা 


প্রশ্ন

আপনার লেখালেখিতে ডেলিরিয়ামের কোনো স্থান আছে কি?

ক্যালভিনো

ডেলিরিয়াম? আমার ধারণা আমি সবসময়ই র‍্যাশনাল। আমি যাই বলি বা লিখি না কেন, তার সবই একটা কার্যকারণ, স্পষ্টতা এবং যুক্তি অনুসরণ করে। আপনি ভাবতে পারেন আমি নিজের এই ঝোঁকের প্রতি খুব একটা সজাগ না, বরং কিছুটা বাতিকগ্রস্ত হয়তোবা। যদি এই প্রশ্নের উত্তর আমাকে দিতেই হয়, তাহলে হাঁ—আমি ডেলিরিয়স। লেখার সময় মনে হয় আমি ঘোরগ্রস্ত হয়ে গেছি। জানি না কিভাবে এরকম উদ্ভট জিনিশ লিখি। আপনি ভাবতে পারেন আমি ফেইক, খুব একটা বিশ্বাসযোগ্য কেউ না। ফলে প্রশ্নটা এভাবে শুরু করলে কেমন হয়—আমার কোন অংশটা আমি লেখায় প্রকাশ করি? সেক্ষেত্রে কার্যকারণ, ইচ্ছা, রুচি এবং আমি যেই সংস্কৃতির অংশ, সেসবকেই আমি লেখায় প্রকাশ করি। একইসাথে, আমার মানসিক বিকার বা যেটাকে ডেলিরিয়াম বলা যায় তার উপর আমার নিয়ন্ত্রণ নাই।

প্রশ্ন

আপনার স্বপ্নের ধরন সম্পর্কে বলেন। ফ্রয়েড এবং ইউঙ—এই দুইজনের ভেতরে আপনি কার প্রতি বেশি আগ্রহী?

ক্যালভিনো

ফ্রয়েডের খোয়াবনামা পড়ার পর যে স্বপ্ন দেখেছিলাম রাত্রিবেলা, পরেরদিন সকালে আমার তা নিখুঁতভাবে মনে ছিল। ফলে, ফ্রয়েডের প্রক্রিয়া অনুসরণ করে আমার স্বপ্নের অনুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করা সম্ভব হয়েছিল। মনে হয়েছিল এটা আমার জন্যে নতুন একটা কালের সূচনা করতে যাচ্ছে এবং স্বপ্নের কোনো কিছুই আমার কাছে আর অস্পষ্ট থাকবে না। কিন্তু আসলে সেটা হয় নাই। ওই প্রথমবারই ফ্রয়েড আমার আধাচেতনের অন্ধকার আলোকিত করেছিল। এরপর সব আগের মতোই চলতে থাকে, বেশিরভাগ সময়েই কিছু মনে থাকে না। বা মনে থাকলেও নিজের স্বপ্ন নিয়ে প্রাথমিক কিছুও আমার পক্ষে বোঝা সম্ভব হয় না। আমার স্বপ্নের প্রকৃতি বুঝতে ফ্রয়েডীয় বিশ্লেষণ ইউঙিয়ান বিশ্লেষণের থেকে অপেক্ষাকৃত কার্যকর—তা হলফ করে বলতে পারি না। ফ্রয়েড পড়া হয় কারণ সে চমৎকার একজন পুলিশ থ্রিলার লেখক যাকে প্যাশনেটলি অনুধাবন করা যায়। ইয়ুঙও পড়া হয়, কারণ তার মিথ এবং সিম্বল নিয়ে কাজ যে-কোনো লেখকের জন্যে কৌতূহলের বিষয়। যদিও সে ফ্রয়েডের মতো ভালো লেখক না, তবে আমি দুইজনের লেখাই পড়েছি।


যুদ্ধের পর ইতালির থিয়েটারের নতুন কিছু দেয়ার সক্ষমতা ছিল না। ইতালীয় কথাসাহিত্য তখন প্রসারিত হচ্ছিল, ফলে আমি কথাসাহিত্যে মনোনিবেশ করি।


প্রশ্ন

ট্যারো কার্ডের শাফলিং থেকে পাণ্ডুলিপির বণ্টন—আপনার লেখায় দৈবক্রম এবং ভাগ্য এই দুইটা ইমেজ ঘুরেফিরে প্রায়ই আসে। লেখার প্রক্রিয়ায় দৈবক্রম কি আপনার জন্য কোনো ভূমিকা পালন করে একটা ধারণা হিশেবে?

ক্যালভিনো

আমি যত বই লিখেছি, এর মধ্যে ট্যারো বইদ্যা ক্যাসেল অফ ক্রসড ডেস্টিনিস সবচেয়ে সুচারুভাবে পরিকল্পিত লেখা। এই বইয়ের কোনোকিছুই দৈবক্রমের উপর ছেড়ে দেয়া না। আমার সাহিত্য সৃষ্টিতে দৈবক্রমের কোনো স্থান আছে বলে আমি বিশ্বাস করি না।

প্রশ্ন

আপনান লেখার অভ্যাস সম্পর্কে জানতে চাচ্ছি। কিভাবে লিখতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন?

ক্যালভিনো

আমি হাতেই লিখি এবং প্রচুর কাটাছেঁড়া চলে লিখতে গেলে। বলা যায়, যা ফাইনালি লিখি তার থেকে বেশি কেটে বাতিল করি। যেমন, কথা বলার সময় আমার শব্দ হাতড়ায়া বের করতে হয়, লেখালেখির ক্ষেত্রেও তাই। ফলে পাণ্ডুলিপির ভেতরেও ছোট-ছোট অক্ষরে সংযোজন-বিয়োজন চলতেই থাকে। মাঝে মাঝে এমন হয় যে, নিজের লেখা নিজেই পড়তে পারি না—তখন ম্যাগনিফাইং গ্লাস দিয়ে খুঁজে বের করে বুঝতে হয় কী লিখেছিলাম। আমার হাতের লেখা দুই ধরনের—একটা খুবই ছোট অক্ষরের, আরেকটা বড়। যখন কপি করার দরকার হয় অথবা কী লিখব সেটা নিয়ে মোটামুটি নিশ্চিত থাকি, তখন বড় অক্ষরে লেখা হয়। ছোট ছোট অক্ষরের লেখা অপেক্ষাকৃত কম মানসিক দৃঢ়তার সাক্ষী এবং সেগুলা নিজের পক্ষেও পড়ে উদ্ধার করা বেশ কঠিন কাজ।

লেখালেখির পাতাগুলা সবসময়ই বাতিল করা আর পরিমার্জিত বাক্যে ভরা থাকে। এক সময় আমি একাধিক হাতে লেখা খসড়া করতাম। এখন একটানে এলোমেলোভাবে প্রথম খসড়া হাতে লেখার পরই অক্ষরের মর্ম উদ্ধার করতে করতে টাইপ করে যাই। পরে যখন টাইপ স্ক্রিপ্টটা আবার পড়ি—দেখি সম্পূর্ণ একটা নতুন লেখা বের হয়ে আসছে, যেটাকে আবার পরিমার্জন করতে হয়। এই দফায় কাটাছেড়া টাইপ রাইটার দিয়েই চলে, মাঝে মাঝে হাতে। ফলে পেইজের এমন অবস্থা হয় যে, তা পড়ার উপায় থাকে না। ফলে আবার টাইপ করি। যেসব লেখকেরা কোনো প্রকারের কাটাছেঁড়া ছাড়াই লিখতে পারেন তাদের প্রতি একটা ঈর্ষা আছে আমার।

প্রশ্ন

আপনি কি প্রতিদিনই কাজ করেন না কী কোনো নির্দিষ্ট দিন-ক্ষণ মেনে চলেন?

ক্যালভিনো

প্রতিদিন কাজ করার কথা ভাবতে বেশ ভালো লাগে। কিন্তু প্রতিদিন সকালে আমি কাজ না করার নিত্য নতুন বাহানা তৈরি করি। যেমন : বাইরে যেতে হবে, কেনাকাটা করতে হবে, পত্রিকা কিনতে হবে। ফলে সকালটা নষ্ট করা একটা নিয়মই হয়ে গেছে এবং গড়িমসি করতে করতে বিকালের দিকেই লিখতে বসা হয়। আমি দিনের বেলার লেখকদের তালিকায় পড়ি, কিন্তু সকাল নষ্ট করার জন্য বিকালের লেখক হয়ে গেছি। রাত্রিবেলায়ও লেখা যায়, কিন্তু তাতে সারারাত জেগে থাকতে হয়। ফলে সেটা যথাসম্ভব  এড়ানোর চেষ্টা করি।

প্রশ্ন

আপনি কি খুব পরিকল্পিতভাবে নির্দিষ্ট একটা লেখা নিয়ে অগ্রসর হন? না কী অনেক কিছু একসাথে চলতে থাকে একই সময়ে?

ক্যালভিনো

একইসাথে একাধিক প্রজেক্টই বেশি করা হয়। আমার মাথায় প্রায় বিশটা বই লেখার একটা লিস্ট আছে, কিন্তু দেখা যাবে আচমকা একটা বই নিয়ে লেখা শুরু করে দিয়েছি। আমি আসলে উপলক্ষের ঔপন্যাসিক। আমার অনেক বই-ই সংক্ষিপ্ত লেখা অথবা ছোটগল্পের একত্রিত বিন্যাস। অথবা সেগুলার ভেতর একটা সামগ্রিক কাঠামো আবিষ্কার করা গেলেও তা ভিন্ন ভিন্ন লেখার সমাবেশ। একটা আইডিয়া নিয়ে সমগ্র বইটা সাজানো আমার কাছে অপরিসীম গুরুত্ব বহন করে। একটা বই নির্মাণে, রূপরেখা তৈরি করতে আমি প্রচুর সময় ব্যয় করি। প্রায়ই দেখা যায়, যেখান থেকে শুরু করেছিলাম সেগুলা হয়তো শেষ পর্যন্ত রাখা হয় না। আসলে শেষ পর্যন্ত ছাপার অক্ষরে লিখিত রূপে যা থাকে সেটাই বই।

যে-কোনো বইয়ের কাজ শুরু করতে বেশ দেরি হয় আমার। একটা উপন্যাসের আইডিয়া মাথায় এলে কীভাবে সেটা না লেখা যায় সেটার সকল সম্ভাব্যতা নিয়ে ভাবি। গল্পের বই বা শর্টটেক্সট হলে সেগুলা শুরু করার আলাদা আলাদা সময় থাকে। আর্টিকল, এমন কী সংবাদপত্রের জন্যে লেখা আর্টিকল গোছায়া আনতেও দেরি হয় আমার, তবে একবার শুরু হয়ে গেলে তরতর করে আগায়। বলা যায়, আমি বেশ দ্রুতই লিখি কিন্তু মধ্যকার ব্ল্যাঙ্ক পিরিওডের সময়টাও দীর্ঘ। ব্যাপারটা চৈনিক চিত্রকরের গল্পটার মতো—সম্রাট তাকে বললেন একটা কাঁকড়া আঁকতে। চিত্রকর উত্তর দিলেন—আমার দশ বছর সময়, একটা বিশাল বাড়ি আর বিশজন ভৃত্য লাগবে। দশ বছর চলে যাওয়ার পর সম্রাট কাঁকড়ার কথা জিগ্যেস করলে চিত্রকর আরও দুই বছর সময় চাইলেন। এরপর সেটাও শেষ হলে বললেন আরও এক সপ্তাহ সময় দিতে। এবং দেখা গেল শেষে তিনি নিজের কলম তুলে নিয়ে একটানে কাঁকড়াটা আঁকা শেষ করে ফেললেন।

প্রশ্ন

আপনি কি একগুচ্ছ বিচ্ছিন্ন আইডিয়া নিয়ে লেখা শুরু করেন না কী একটা বৃহত্তর ধারণাকে ধীরে ধীরে পূর্ণতা দেন?

ক্যালভিনো

আমি একটা ছোট ইমেজ দিয়ে শুরু করে সেটাকে বিস্তৃত করি।

প্রশ্ন

তুর্গেনিভ বলেছিলেন, ‘লেখার নির্মাণশৈলীর দিকে খুব বেশি গুরুত্ব দেয়ার থেকে খুব কম গুরুত্ব দেয়াকেই আমি বেছে নেই। কারণ নির্মাণশৈলীর দিকে মনোযোগী হলে সেটা আমার বলার সত্যতায় হস্তক্ষেপ করতে পারে’। আপনার লেখার প্রেক্ষিতে এই মন্তব্য সম্পর্কে অভিমত জানতে চাচ্ছি।

ক্যালভিনো

বলা যায় অতীতে, বিশেষ করে গত দশ বছরের লেখালেখিতে আমার বইয়ের নির্মাণরীতি খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা পর্যায়, হয়তো একটু বেশি-ই। কিন্তু শুধু যখন অনুভব করি একটা শক্ত কাঠামো দাঁড় করাতে পেরেছি যেটা একাই দৃঢ়ভাবে দাঁড়াতে পারে, তখনই সেটা পূর্ণাঙ্গতা পায়। আমি যখন ইনভিজিবল সিটিস লেখায় হাত দিলাম, আমার একটা আবছা ধারণা ছিল পুরা বইটার ফ্রেইম আর নির্মাণশৈলী নিয়ে। কিন্তু আস্তে আস্তে ডিজাইনটা এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল যে, সেটাই পুরা বই এগিয়ে নিয়ে প্লট না থাকা বইটার প্লট হয়ে উঠল। দ্য ক্যাসেল অফ ক্রস ডেস্টিনিস নিয়েও এটা বলা যায় যে, নির্মাণশৈলী আর বিন্যাসটাই আসলে বই। এরপর কাঠামোর প্রতি অবসেশনটা প্রায় পাগলামির পর্যায়ে চলে গেল। ইফ অন অ্যা উইন্টার্স নাইট অ্যা ট্র্যাভেলার বইটার অস্তিত্ব একটা নির্ভুল, স্বতন্ত্র স্পষ্টতা সম্পন্ন কাঠামো ছাড়া সম্ভব না। আমার ধারণা এক্ষেত্রে আমি সফল, যেটা আমার জন্যে তৃপ্তিদায়ক। এই ধরনের প্রচেষ্টা নিয়ে পাঠকের বিচলিত হওয়ার কিছু নাই। যেভাবেই আমি আমার কাজকে সন্নিবেশিত করি না কেন, বই পড়ে উপভোগ করাটাই মুখ্য।

প্রশ্ন

আপনার বেশ কয়েকটা শহরে থাকা হয়েছে। রোম থেকে প্যারিস, প্যারিস থেকে তুরিন এবং সমুদ্রের কাছে এই বাড়িতেও আপনার নিয়মিত যাতায়াত। পরিপার্শ্ব কি আপনার লেখায় কোনো ধরনের প্রভাব ফেলে?

ক্যালভিনো

না, কোনো প্রভাব ফেলে না। নির্দিষ্ট একটা জায়গার প্রাত্যহিক জীবনের অভিজ্ঞতা হয়তো কী লিখছেন সেটাকে প্রভাবিত করে, কিন্তু ব্যাপারটা এমন না যে আপনি এখানে বা ওইখানে লেখার কারণে তা পরিবর্তিত হয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে যে বইটা লিখছি সেটা তুস্কানির এই বাড়িটার সাথে কিছুটা সম্পর্কিত, যেখানে কয়েক বছর ধরেই গ্রীষ্মটা কাটাচ্ছি। কিন্তু তাই বলে অন্য কোনো জায়গায় গিয়েও লিখতে সমস্যা হবে না।

প্রশ্ন

হোটেলের রুমে লিখতে পারবেন?

ক্যালভিনো

আমি একসময় বলতাম শূন্য, নামহীন হোটেল রুম হচ্ছে লেখালেখির আদর্শ জায়গা। হোটেল রুমে চিঠির উত্তর দেয়ার তাগাদা থাকে না (বা উত্তর না দেয়ার কোনো অনুতাপও নাই)। আর তেমন কোনো কাজও তো নাই। সেদিক থেকে দেখলে, হোটেল রুমই আদর্শ জায়গা। কিন্তু ঐকান্তিক পরিবেশটা জরুরি, তবে নিজের কাছে বিষয়বস্তু পরিষ্কার থাকলে হোটেল রুমে বসেও লেখা সম্ভব।

প্রশ্ন

ভ্রমণের সময় কাগজ এবং নোট সঙ্গে রাখেন?

ক্যালভিনো

হ্যাঁ, আমি প্রায়শই লেখার নোট এবং রূপরেখা সাথে নিয়ে চলাফেরা করি। গত দশ বা ততোধিক বছর ধরে রূপরেখার ব্যাপারটা অবসেশনের পর্যায়ে চলে গেছে।

প্রশ্ন

আপনার বাবা-মা দুইজনেই বিজ্ঞানী ছিলেন। তাদের কি ইচ্ছা ছিল না আপনিও বিজ্ঞানী হোন?

ক্যালভিনো

আমার বাবা ছিলেন অ্যাগ্রোনমিস্ট, মা বোট্যানিস্ট। তারা উদ্ভিদ জীবনের সাথে, প্রকৃতির সাথে, প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। তবে বাচ্চাদের প্রচলিত প্রথা অনুসারেই বাবা-মার পেশাগত দিকে যে আমার আগ্রহ নাই, তারা সেটা অনুধাবন করেছিলেন। এখন আফসোস হয় আমি সেভাবে তাদের জ্ঞানের অধিকারী হতে পারি নাই। আরেকটা কারণ হতে পারে আমার জন্মের সময় তারা বেশ বয়স্ক ছিলেন। আমি যখন জন্মাই আমার মায়ের বয়স তখন চল্লিশ, বাবার পঞ্চাশ। ফলে স্বাভাবিকভাবেই একটা দূরত্ব ছিল।

প্রশ্ন

লেখালেখির শুরুটা কখন?

ক্যালভিনো

শৈশবে আমার কোনো ধারণাই ছিল না আমি কী হতে চাই, তবে বেশ আগেই লেখালেখি শুরু করেছিলাম আমি। তবে লেখালেখিতে প্রবেশের আগে ছবি আঁকাই ছিল আমার প্যাশন। আমি ক্লাসমেট, শিক্ষকদের ক্যারিকেচার আঁকতাম। বলতে পারি, কোনো ট্রেনিং ছাড়াও বেশ ভালোই আঁকতাম। ছোট থাকতে মা আমাকে একটা ড্রয়িং কোর্সে ভর্তি করিয়ে দিয়েছিলেন। আমার প্রকাশিত সর্বপ্রথম যেকোনো কিছু ছিল ড্রয়িং।আমার বয়স তখন এগারো, স্কুলের ম্যাগাজিনে ছাপা হয়েছিল সেটা। আমি ছিলাম তাদের সর্বকনিষ্ঠ ছাত্র। সেই ড্রয়িংটার কোনো কপি খোঁজাখুঁজির পরেও পাই নাই। ছোটবেলায় কবিতাও লেখা হয়েছে। ষোল বছর বয়সে থিয়েটারের জন্যে লেখার চেষ্টা করেছিলাম। এটা ছিল আমার প্রথম প্যাশন, কারণ সেই সময়টায় বাইরের দুনিয়ার সাথে আমার যোগাযোগের মাধ্যম ছিল রেডিও। রেডিওতে অনেক নাটক শোনা হতো। ফলে নাটক লেখা দিয়েই লেখালেখির শুরু আমার। আসলে আমার বেশ কিছু নাটক এবং গল্পের ইলাস্ট্রেটর এবং লেখক দুই’ই ছিলাম আমি। কিন্তু লেখালেখিতে তৎপর হওয়ার পর বুঝতে পারলাম আমার আঁকাআঁকির নিজস্ব কোনো স্টাইল নাই। ফলে আঁকা ছেড়ে দিলাম। কেউ কেউ হয়তো কোনো মিটিং এর সময় এক টুকরা কাগজে ডুডল বা ছোটখাটো আঁকাআঁকি করে, আমি নিয়ন্ত্রিতভাবে সেটাও বাদ দিয়ে দিয়েছি।

প্রশ্ন

থিয়েটার কখন ছাড়লেন?

ক্যালভিনো

যুদ্ধের পর ইতালির থিয়েটারের নতুন কিছু দেয়ার সক্ষমতা ছিল না। ইতালীয় কথাসাহিত্য তখন প্রসারিত হচ্ছিল, ফলে আমি কথাসাহিত্যে মনোনিবেশ করি। সময়টায় বেশ কিছু লেখকের সাথে পরিচয় হয় এবং এরপরই উপন্যাস লেখায় হাত দেয়া। লেখালেখিটা মানসিক ক্রিয়া কৌশলের বিষয়। কেউ যদি তার নিজের অভিজ্ঞতা, চিন্তা উপন্যাসের মাধ্যমে প্রকাশের সূচনা করে—অন্য কোনো ফর্মের সাহিত্য অভিব্যক্তিতে কিছু বলার কোনো উপাদান বাকি থাকে না তার। আমার গদ্য লেখার প্রক্রিয়া কবির কবিতা লেখার নিকটবর্তী। আমি শত শত পৃষ্ঠার উপন্যাস লেখার ঔপন্যাসিক না। একটা আইডিয়া বা অভিজ্ঞতাকে আমি ক্ষুদ্র সিন্থেটিক টেক্সটে কেন্দ্রীভূত করি, যেগুলা পাশাপাশি আরও টেক্সটের সাথে সন্নিবেশিত হয়ে একটা সিরিজ নির্মাণ করে। অভিব্যক্তি এবং শব্দের সাথে ছন্দ, ধ্বনি এবং ইমেজের সম্পর্কের বিষয়ে স্বতন্ত্র মনোযোগ দেই আমি। আমার মতে, ইনভিজিবল সিটিস বইটা কবিতা এবং উপন্যাসের মধ্যবর্তী কোনো স্থানে। এটাকে কবিতার চরণে লেখা হলে তা হতো খুব গতানুগতিক, আখ্যানধর্মী কবিতা… অথবা সম্ভবত গীতিকবিতা। কারণ গীতিকবিতাই আমার সবচেয়ে প্রিয় এবং মহান কবিদের গীতিকবিতাই আমার সবচেয়ে বেশি পড়া হয়।

5
ইতালো ক্যালভিনো

প্রশ্ন

তুরিনের সাহিত্যবিশ্বের সাথে আপনার পরিচয় কিভাবে? আরও নির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে জুলিও এউনাউদির প্রকাশনা সংস্থাকেন্দ্রিক গোষ্ঠী এবং সেছারে পাভিসে, নাতালিয়া গিন্সবুর্গের সাথে পরিচয়টা কিভাবে সম্ভব হয়েছিল? আপনার বয়স তো তখন বেশ কম ছিল।

ক্যালভিনো

আমি প্রায় ভাগ্যক্রমেই তুরিন গিয়েছিলাম। আমার সমগ্র জীবন শুরু হয় যুদ্ধের পরে। এর আগে সাররেমোতে আমি যেকোনো প্রকারের সাহিত্যিক এবং সাংস্কৃতিক সার্কেল থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলাম। যখন সাররেমো ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম, আমি নিশ্চিত ছিলাম না তুরিন যাব না কী মিলান যাব। আমার লেখার প্রথম পাঠক ছিলেন পাভেছে এবং এলিও ভিত্তরিনি। দু’জনই বয়সে আমার থেকে এক দশকের বড় ছিলেন। পাভেছে থাকতেন তুরিনে, আর ভিত্তরিনি মিলানে। বেশ বড় একটা কাল সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছিলাম আমার মুভ করা নিয়ে। যদি মিলানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতাম, তাহলে হয়তো পুরা ব্যাপারটাই অন্যরকম হতো। মিলান ছিল আরও সচল, প্রাণবন্ত শহর। সেই তুলনায় তুরিন শহর হিশাবে বেশ গম্ভীর এবং অনাড়ম্বর। ফলে তুরিনকে বেছে নেয়াটা ছিল নৈতিক সিদ্ধান্ত। তুরিনের সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক ঐতিহ্যের সাথে নিজেকে মেলাতে পেরেছিলাম সেই সময়টায়। তুরিন ফ্যাসিবাদবিরোধী ইন্টেলেকচুয়ালদের শহর এবং আমার ভেতরের প্রটেস্ট্যান্ট প্রবলতা সেই ফ্যাসিবাদ বিরোধীতা দ্বারা বিমুগ্ধ ছিল। এটা ইতালির সবচেয়ে প্রভাবশালী প্রটেস্ট্যান্ট কেন্দ্র, বলা যায় ইতালিয়ান বস্টন। সম্ভবত এরকম একটা নৈতিক সিদ্ধান্ত নেয়াটা ছিল আমার জন্যে পূর্বনির্ধারিত—তার কারণ আমার নামের শেষাংশ (ক্যালভিন ইতালিয়তে ক্যালভিনো) এবং আমার নিরাভরণ পারিবারিক ঐতিহ্য। ছয় বছর বয়সে সাররেমোতে যে এলিমেন্ট্রি স্কুলে ভর্তি হয়েছিলাম, সেটা ছিল একটা ব্যক্তিগত প্রটেস্ট্যান্ট ইন্সটিট্যুশন। সেখানের শিক্ষকরাও আমাকে ধর্মগ্রন্থের বেশ ভালো তালিম দিয়েছিলেন। ফলে আমার ভেতরে একটা অন্তর্দ্বন্দ্ব কাজ করেছে—আমি অপেক্ষাকৃত কেয়ার ফ্রি, যত্নহীন ইতালির সাথে বিরোধ অনুভব করতাম। যেসব ইতালিয়ান চিন্তাবিদ ইতালির দুর্ভাগ্যের সাথে প্রটেস্ট্যান্ট রিফর্মেশনের অনুপস্থিতিকে কারণ হিশাবে মনে করতেন, তাদের সাথে একাত্ম বোধ করাটা স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু আমার প্রবণতা অবশ্যই পিউরিট্যানদের মতো না। আমার বংশনাম ক্যালভিনো হতে পারে, কিন্তু আমার প্রদত্ত নাম ইতালো।

প্রশ্ন

আপনার কি মনে হয় বর্তমানের তরুণ প্রজন্মের বৈশিষ্ট্য আপনাদের তরুণ প্রজন্মের থেকে আলাদা? বয়সের সাথে কি তরুণদের কার্যক্রম নিয়ে এক ধরনের বিরূপতা পোষণ করার প্রবণতা খুঁজে পান নিজের ভেতরে?

ক্যালভিনো

প্রায়ই আমি তরুণদের প্রতি বেশ ক্ষিপ্ত হই এবং দীর্ঘ বয়ানের কথা ভাবি যেটা কখনোই করা হয় না শেষ পর্যন্ত। কারণ, প্রথমত বয়ান প্রচার করা অপছন্দ আমার। দুই, কেউ আমার কথা শুনবে না। ফলে তরুণদের সাথে কিভাবে কম্যুনিকেট করা যায় এটা নিয়ে ভাবা ছাড়া আমার তেমন কিছু করার নাই। আমাদের প্রজন্ম এবং তাদের প্রজন্মের মধ্যে কিছু একটা হয়েছে। অভিজ্ঞতার ধারাবাহিকতায় একটা ছেদ পড়েছে; হয়তোবা আমাদের ভেতর কোনো কমন পয়েন্টস অফ রেফ্রেন্স নাই। সত্য বলতে, যদি আমার তারুণ্যের কথা চিন্তা করি—আমিও কোনো প্রকারের সমালোচনা, অনুযোগ বা পরামর্শ পাত্তা দিতাম না। ফলে এখন আমার কোনো অধিকার নাই কথা বলার।

প্রশ্ন

আপনি পরিশেষে তুরিনে আসার সিদ্ধান্ত নিলেন। তুরিনে আসার পরপরই কি এউনাউদির প্রকাশনা সংস্থায় কাজ শুরু করে দিয়েছিলেন?

ক্যালভিনো

বেশ দ্রুতই বলা যায়। পাভেছে আমাকে এউনাউদির সাথে পরিচিত করে দেয়ার পরই সে আমাকে বিজ্ঞাপনী অফিসে নিয়োগ করে। এউনাউদি ছিল ফ্যাসিবাদবিরোধীতার একটা কেন্দ্র। জায়গাটার এমন একটা পটভূমি ছিল যাকে একাত্ম করে নিতে প্রস্তুত ছিলাম, যদিও আমার আসলে সেই অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যাওয়া হয় নাই। একজন বহিরাগতের পক্ষে ইতালির বিভিন্ন সংখ্যক কেন্দ্রের গড়ে ওঠা এবং তাদের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের ঐতিহ্য অনুধাবন করাটা বেশ মুশকিলের ব্যাপার। আমি এসেছিলাম লিগুরিয়া থেকে যার কোনো উল্লেখযোগ্য সাহিত্যিক ঐতিহ্য অনুপস্থিত ছিল। যেসব লেখকের পেছনে কোনো স্থানীয় সাহিত্যিক ঐতিহ্য নাই তারা নিজেদেরকে আগন্তুক ভাবাটাই স্বাভাবিক। শতাব্দীর প্রথমার্ধের সাহিত্যিক সার্কেলগুলা ছিল ফ্লোরেন্স, রোম এবং মিলানকেন্দ্রিক। তুরিনের, বিশেষ করে এউনাউদির ঝোঁকটা ছিল সাহিত্যের থেকে ইতিহাস এবং সামাজিক প্রতিকূলতাকেন্দ্রিক। কিন্তু একমাত্র ইতালিতেই এইসব সমগুরুত্ববাহী। পরবর্তী বছরগুলাতে একটা আন্তর্জাতিক পরিবেশ আমার কাছে অভিপ্রেত হয়ে ওঠে—ব্যাপারটা ছিল আন্তর্জাতিক প্রেক্ষিতে ইতালিয়ান হয়ে ওঠার। এমন কী লেখক হয়ে ওঠার আগে পাঠক হিশাবেও আমি বিশ্বব্যাপী ফ্রেমে সাহিত্যে আগ্রহী ছিলাম।


ইনভেনশনের উপর ভিত্তি করে লেখা বইগুলা অপেক্ষাকৃত আন্তরিক, কারণ তার সাথে আমার দৃশ্যমান কোনো সংযোগ থাকে না।


প্রশ্ন

কাদের লেখা পড়ে আপনি সবচেয়ে বেশি উপভোগ করেছেন? আপনার উপর কোন কোন লেখকেরা গভীর ছাপ ফেলতে সমর্থ হয়েছিল?

ক্যালভিনো

শৈশবের এবং তারুণ্যের শুরুর দিককার পড়া বেশ কিছু বই আবার পড়ে প্রায়ই বিস্মিত হতে হয়। কারণ এসব বই পড়ার পর নিজের ভেতরের বেশ কিছু জিনিশ আবিষ্কার করেছি, যেগুলা নিজের কাছেই বিস্মৃত ছিল। তবে সেগুলার প্রভাব অগোচরেই আমি ধারণ করে আসছিলাম। উদাহরণস্বরপ, বেশ কিছুদিন আগে যখন ফ্লবেয়ারের দ্য লেজেন্ড অফ সেইন্ট জুলিয়ান হসপিটল্যার আবার পড়া হয়, তখন অবাক হয়ে লক্ষ করলাম, গথিক ট্যাপেস্ট্রির মতো প্রাণীজগতের ধারণা আমার প্রথম দিককার কথাসাহিত্যে কতটা প্রভাবশালী ছিল। ছেলেবেলার পড়া স্টেভেনসন এখনো আমার স্টাইল, লাইটনেস, আখ্যানগতি এবং প্রাবল্যের আদর্শ হিশেবে রয়ে গেছেন। শৈশবের পাঠাভ্যাসের কিপলিং, স্টেভেনসন এখনো আমার আদর্শ। এরপর স্টেন্দ্যালেরদ্য চার্টারহাউজ অফ পার্মা-র নাম আসবে।

প্রশ্ন

পাভেছে এবং এউনাউদি হাউজের সবার সাথে তো একধরনের কমরেডশিপ ছিল, তাই না? আপনি আপনার পাণ্ডুলিপি তাদেরকে পড়তে দিতেন মন্তব্যের জন্যে।

ক্যালভিনো

হ্যাঁ। ওই সময়ে আমি প্রচুর ছোটগল্প লিখছিলাম যেগুলা পাভেছে এবং নাতালিয়া গিন্সবুর্গকে দেখাতাম লেখার পর। নাতালিয়াও তখন তরুণ এবং সেখানেই কাজ করত। এছাড়া মিলানে ভিত্তরিনির কাছেও নিয়ে যেতাম। তুরিন থেকে মিলান ছিল দুই ঘণ্টার পথ। আমি তাদের মন্তব্য গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতাম। এক পর্যায়ে পাভেছে আমাকে বললেন, এখন আমরা সবাই জানি ছোটগল্প লেখার সক্ষমতা তোমার আছে, এবার উপন্যাসে ডুব দাও। জানি না সেটা ভালো না কী খারাপ উপদেশ ছিল, কারণ তখন আমি ছোটগল্পকার ছিলাম। গল্পের ফর্মে যা বলার তার সব যদি বলা হয়ে থাকত ততদিনে, তাহলে আরও কিছু গল্প লেখার কথা ছিল আমার, যেগুলা কখনো লেখা হয়ে ওঠে নাই আর। যাই হোক, আমার প্রথম উপন্যাস প্রকাশিত হলো এবং ঔপন্যাসিক হিশাবে সফল হলাম। তারপর বেশকিছু বছর চেষ্টা করলাম আরেকটা লেখার। কিন্তু সাহিত্যিক পরিমণ্ডল ইতোমধ্যে নিও-রিয়্যালিজম বলে সংজ্ঞায়িত হয়ে গেছিল, যার সাথে সম্পৃক্ত হতে চাই নাই। পরিশেষে ফ্যান্টাসির দিকে ফিরেদ্য ক্লোভেন ভিসকাউন্ট লেখা হলো, যেখানে স্বরূপে নিজেকে প্রকাশ করলাম। ‘ফিরে’ বললাম কারণ সম্ভবত ফ্যান্টাসিই আমার আসল জায়গা। ইতালির যুদ্ধ ও উত্থানপতনের  কারণে সাময়িকভাবে আমি সাগ্রহে অন্যদিকে কাজ করেছিলাম, কিন্তু শেষমেশ আমার একান্ত উদ্ভাবনীর ফ্যান্টাসিতেই ফিরে আসা হয়।

প্রশ্ন

ঔপন্যাসিকেরা কি মিথ্যাবাদী? যদি না হয়ে থাকে, তারা কেমন ধরনের সত্য বলেন?

ক্যালভিনো

প্রত্যেক মিথ্যার গভীরে যে সত্যটা থাকে, ঔপন্যাসিকেরা সত্যের সেই অংশটাই বলেন। একজন সাইকো অ্যানালিস্টের কাছে আপনার সত্য বা মিথ্যা বলাটা গুরুত্বপূর্ণ না। কারণ, মিথ্যাও তার কাছে সত্য ভাষণের মতো কৌতূহল উদ্দীপক, প্রাণবন্ত এবং উন্মোচক।

যেসব লেখকেরা তাদের সম্পর্কে, জীবন ও জগৎ সম্পর্কে সম্পূর্ণ সত্য বলার দাবি করেন, তাদের নিয়ে আমি সন্দিহান। আর যে লেখকেরা নিজেদের অকপট মিথ্যাবাদী বলে উপস্থাপন করেন, তাদের মধ্যে খুঁজে পাওয়া সত্যকে শ্রেয়তর মনে হয়। ‘ইফ অন অ্যা উইন্টার্স নাইট অ্যা ট্র্যাভেলার ফ্যান্টাসিতে এভাবেই সত্যকে খুঁজতে চেয়েছি, কারণ অন্য কোনোভাবে তা সম্ভব ছিল না।

প্রশ্ন

যা লেখা সম্ভব না কী যা লেখা উচিত—লেখকদের ক্ষেত্রে আপনি কোনটাতে বিশ্বাস করেন?

ক্যালভিনো

যা লেখা সম্ভব, লেখকেরা তাই লেখেন। লেখালেখি হচ্ছে এমন একটা ক্রিয়া যেটা নিজের ভেতরের সত্তাকে প্রকাশ করার মাধ্যমে কার্যকরী হয়ে ওঠে। একজন লেখক নানা ধরনের সীমাবদ্ধতার ভেতরে থাকেন। সাহিত্যিক সীমাবদ্ধতার কথা ধরা যাক। সনেটের লাইন সংখ্যা বা ক্ল্যাসিকাল ট্র্যাজেডির রীতি সাহিত্যিকদের অনুসরণ করতে হয়। এটা তার সৃষ্টি কাঠামোর অংশ, যার মাধ্যমে লেখক তার ব্যক্তিসত্তাকে প্রকাশ করাতে স্বাধীন। কিন্তু ধর্মীয়, নৈতিক, দার্শনিক, এবং রাজনৈতিক কর্তব্যের মতো নানাবিধ সামাজিক সীমাবদ্ধতাও আছে। এগুলা সরাসরি সৃষ্টির উপর চাপিয়ে দেয়া চলে না, তা অন্তরাত্মা দ্বারা পরিশোধিত হয়ে আসতে হয়। এই বহুবিধ দায়িত্ব যদি লেখকের অন্তর্গত ব্যক্তিসত্তার অংশ হয়ে থাকে, তাহলে সেটা তার সৃষ্টির জন্যে শ্বাসরোধী হয়ে ওঠে না।

প্রশ্ন

একবার বলেছিলেন আপনি হেনরি জেমসের একটা গল্প লিখতে চান। এমন আরও কেউ আছে যাদের লেখা নিজের বলে দাবি করবেন?

ক্যালভিনো

হ্যাঁ, আমি জলি কর্নার’- এর কথা একবার বলেছিলাম। এখন কী বলব? সম্ভবত অ্যাডেলবার্ট ফন চামিসুর ‘পিটার স্লিমিল’।

প্রশ্ন

আপনি কি মডার্নিস্টদের দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন?

ক্যালভিনো

আমার লেখক কাফকা এবং আমার প্রিয় উপন্যাস অ্যামেরিকা

প্রশ্ন

ইতালিয়ান গদ্য ঐতিহ্যের যে-কোনো লেখকের থেকে  কনরাড, জেমস, এমন কী স্টেভেনসনের মতো ইংরেজ লেখকদেরকে আপনি নিজের নিকটবর্তী মনে করেন। এটা কি সত্য?

ক্যালভিনো

আমি সবসময়ই জ্যাকোমো লেপার্দির প্রতি অনুরক্ত ছিলাম। একজন অসাধারণ কবি হওয়া ছাড়াও সে স্টাইল, হিউমার, কল্পনা এবং অসামান্যতার দিক থেকে অনন্য সাধারণ গদ্যকার।

প্রশ্ন

আপনি অ্যামেরিকান এবং ইতালিয়ান লেখকদের সামাজিক অবস্থানের পার্থক্য নিয়ে আলোচনা করেছেন। আপনার মতে- ইতালিয়ান লেখকেরা যেখানে প্রকাশনা সংস্থার সাথে জড়িত, সেখানে অ্যামেরিকান লেখকেরা একাডেমিক প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত।

ক্যালভিনো

উপন্যাসের সেটিং হিশাবে বিশ্ববিদ্যালয় খুবই পানসে, যেমনটা প্রায়ই অ্যামেরিকান উপন্যাসে দেখা যায় [নবোকভ এখানে বিশাল ব্যতিক্রম]। এমনকি এই সেটিং প্রকাশনা সংস্থার সেটিঙের থেকেও বেশি পানসে, যেমনটা কিছু ইতালিয়ান উপন্যাসে লক্ষণীয়।

photo 2
ইতালো ক্যালভিনো

প্রশ্ন

এউনাউদির অভিজ্ঞতা নিয়ে কিছু বলুন। সেটা কি আপনার মননশীল কাজের ক্ষেত্রে বাঁধা হয়েছে কখনো?

ক্যালভিনো

এউনাউদি হচ্ছে এমন পাবলিশার যার ইতিহাস, বিজ্ঞান, কলা, সমাজতত্ত্ব, দর্শন, এবং ক্ল্যাসিক—সব কিছুতেই দখল আছে। কথাসাহিত্য এখানে সবার শেষে আসবে। সেখানে কাজ করা একটা এনসাক্লোপেডিক বিশ্বে বাস করার মতো অভিজ্ঞতা।

প্রশ্ন

র‍্যান্ডমনেসের ভেতরে মানুষের বিন্যস্ত হওয়ার সংগ্রাম আপনার বেশিরভাগ লেখার থিম হিশাবে ব্যপ্ত। বিশেষ করে ইফ অন অ্যা উইন্টার্স নাইট অ্যা ট্র্যাভেলার-এর সেই পাঠকের কথা ভাবছি, যেখানে পাঠক তার বইয়ের পরবর্তী অধ্যায় খুঁজে বেড়ায় পড়ার জন্যে।

ক্যালভিনো

জগতের বাছাই প্রক্রিয়া আর মানুষের সেটাকে অর্থপূর্ণ করার অবসেশনের বিরোধ আমার লেখায় বারবার ঘুরেফিরে এসেছে।

প্রশ্ন

আপনার লেখায় আপনি রিয়্যালিস্টিক এবং ফ্যান্টাস্টিক্যাল মোডের ভেতরে ক্রমাগত আসা-যাওয়া করেছেন। দুইটাই কি উপভোগ্য আপনার কাছে?

ক্যালভিনো

যখন সম্পূর্ণ ইনভেনশনের উপর ভিত্তি করে একটা বই লিখি, তখন দৈনন্দিন জীবনের আটপৌরে কার্যক্রম এবং চিন্তাগুলা নিয়ে লেখার জন্যে একটা তাড়না বোধ করি। সেই মুহূর্তে আমি ওই বইটাই লেখতে চাই যেটা লিখছি না। অন্যদিকে, যখন আত্মজীবনীমূলক কিছু লেখা হয় যেখানে সাধারণ জীবনের ঘটনাপ্রবাহ থাকে, তখন আমার মনোভাবটা থাকে ঠিক বিপরীত। ইনভেনশনের উপর ভিত্তি করে লেখা বইগুলা অপেক্ষাকৃত আন্তরিক, কারণ তার সাথে আমার দৃশ্যমান কোনো সংযোগ থাকে না।

প্রশ্ন

অ্যামেরিকায় আপনার উপন্যাস কেমন সমাদৃত হয়েছে?

ক্যালভিনো

এটা আশ্চর্যকর যে, ইনভিজিবল সিটিস উপন্যাসটা অ্যামেরিকায় সবচেয়ে বেশি সমাদর লাভ করেছে। আশ্চর্যকর কারণ, ইনভিজিবল সিটিস নিশ্চিতভাবেই আমার সহজপাঠ্য বইগুলার তালিকায় থাকবে না।ইতালিয়ান ফোকটেইলস-ও বেশ সাফল্য পেয়েছে। এটা ইতালিতে প্রকাশ হওয়ার পঁচিশ বছর পর অনূদিত হয়। ইনভিজিবল সিটিস যেখানে বিজ্ঞজন, রসিক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিবর্গ দ্বারা আদৃত হয়েছে, সেখানে ইতালিয়ান ফোকটেইলস-এর সাফল্যের ধরনটা জনসমাদরের। ইউএসএতে আমার ইমেজটা একজন ফ্যান্টাসি, উপাখ্যান রচয়িতার।


রাজনীতি প্রায় কখনোই তার আদর্শ সাধন করে না। অপরদিকে, সাহিত্য তার নিজের ক্ষেত্রে কিছুটা হলেও অর্জন করতে পারে।


প্রশ্ন

ইউরোপ ব্রিটিশ এবং অ্যামেরিকান সংস্কৃতি দ্বারা সমাচ্ছন্ন—এটার সাথে আপনি একমত পোষণ করেন?

ক্যালভিনো

না। আমার উগ্র স্বদেশভক্তি নাই। ভিনদেশি সংস্কৃতির জ্ঞান যে-কোনো সংস্কৃতির জন্য অপরিহার্য বস্তু—আমার মনে হয় না সেটা কখনোই খুব বেশি হয়ে থাকে। কোনো সংস্কৃতি যদি স্বীয় মননশীল শক্তিকে জাগিয়ে রাখতে চায় তাহলে তাকে অবশ্যই ভিনদেশি প্রভাবের প্রতি উদার হতে হবে। ইতালিতে ফ্রেঞ্চ সাহিত্য সবসময়ই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক উপাদান হিশাবে সচল ছিল।অ্যামেরিকান সাহিত্যও আমার জীবনে একটা ছাপ ফেলেছে। পো ছিল আমার প্রথমদিককার আগ্রহের একজন—তার কাছে থেকে জেনেছি উপন্যাস কী। পরে আবিষ্কার করলাম হাথর্ন পো’র থেকে প্রায়ই মহান ঔপন্যাসিক। সবসময় না, প্রায়ই। মেলভিলের বেনিতো সেরেনো একটা পারফেক্ট উপন্যাস, মবি ডিকের থেকেও মূল্যবান। আমার লেখার প্রথম হাতেখড়ি হয় পাভেছের ছায়ায়, যে ছিলেন মেলভিলের ইতালিয়ান অনুবাদক। আমার প্রথমদিককার সাহিত্যিক আদর্শ ছিলেন ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের মাইনর কিছু অ্যামেরিকান ঔপন্যাসিক—স্টিভেন ক্রেন, অ্যামব্রোস বিয়র্স। চল্লিশের দশকে আমার সাহিত্যিক বিকাশের সময় হেমিংওয়ে, ফকনার, ফিটজেরাল্ড প্রভাবশালী ভূমিকা রেখেছেন। ওই সময়টাতে ইতালিতে অ্যামেরিকান সাহিত্যের প্রতি একধরনের মোহ কাজ করছিল। এমনকি স্যারোয়েন, কডওয়েল, কেইনের মতো খুবই মাইনর লেখকদেরকে স্টাইলের মডেল হিশাবে গণ্য করা হতো। এরপর ছিল নবোকভ, আজ পর্যন্ত আমি যার গুণগ্রাহী। আমার এটা স্বীকার করতেই হবে—অ্যামেরিকান সাহিত্যের প্রতি আমার আগ্রহের চালিকাশক্তির কারণ ছিল সেই সমাজে যা হচ্ছে, তার চল কয়েক বছর পর ইউরোপেও শুরু হবে। ফলে সেদিকে তাকালে একটা পূর্বাভাস পাওয়া যেত। এভাবে দেখলে, সল বেলো, ম্যারি ম্যাককার্থি, গোর ভিডালের মতো লেখকরা গুরুত্বপূর্ণ কারণ উঁচুমানের গদ্য রচনার ভেতরে প্রকাশিত সমাজের সাথে তাদের সংযোগ ছিল। একই সাথে, আমি সবসময়ই নতুন কিছুর জন্যে অপেক্ষা করি—ফলে মধ্য পঞ্চাশে জন আপডাইকের আবিষ্কার সম্ভব হয়েছিল।

প্রশ্ন

যুদ্ধোত্তর সংকটকালে আপনি সবটা সময় ইতালিতেই ছিলেন। তারপরেও, দ্য ওয়াচার  উপন্যাসিকার কথা বাদ দিলে আপনার গল্পে সেই সময়ের রাজনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে খুব কমই ধারণা পাওয়া যায়,  যদিও সেই সময়টায় আপনি রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন।

ক্যালভিনো

দ্য ওয়াচার উপন্যাসিকা অ্যা ক্রনিকল অফ দ্য নাইন্টিন ফিফটিজ নামের একটা টিলজির অংশ হওয়ার কথা ছিল। আমি বেড়ে উঠেছি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কালে। এর ঠিক পরবর্তী সময়ের ভয়ংকর ট্রমাটা বুঝে ওঠার চেষ্টা করছিলাম। বিশেষ করে জার্মান দখলদারিটা, যার ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে আমাদের। এসবের ফলে আমার প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের প্রথমভাগে রাজনীতি খুব গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার ছিল। সেই সময়েই কম্যুনিস্ট  পার্টিতে যোগদান করি, যদিও অন্যান্য দেশের কম্যুনিস্ট পার্টির থেকে ইতালীয় কম্যুনিস্ট পার্টির ধাঁচটা আলাদা ছিল। তারপরেও ঠিক আমার সাথে যায় না এমন অনেক ব্যাপার নিয়েই বাধ্যবাধকতা বোধ করেছি। পরবর্তীতে আমার কাছে এটা খুব স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, রাশান আদর্শে (অথবা মিথ বলাই ঠিক হবে) ইতালিতে সত্যিকার গণতন্ত্র কখনোই কায়েম করা সম্ভব না। এই বিরোধটা এমন পর্যায়ে গিয়ে ঠেকল যে কম্যুনিস্ট দুনিয়ার সাথে আমি সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন বোধ করা শুরু করলাম। শেষপর্যন্ত সেই বিচ্ছিন্নতার বোধটা রাজনীতিতে গিয়েও ঠেকল। এটা ভালো হয়েছিল, কারণ সাহিত্যকে রাজনীতির পরে স্থান দেয়া মস্ত বড় ভুল। কারণ রাজনীতি প্রায় কখনোই তার আদর্শ সাধন করে না। অপরদিকে, সাহিত্য তার নিজের ক্ষেত্রে কিছুটা হলেও অর্জন করতে পারে, এবং লং রানে এর কিছু প্রায়োগিক ফলাফলও পাওয়া সম্ভব। এখন আমি বিশ্বাস করি, গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারগুলো খুব ধীরগতিতেই অর্জন করা হয়।

প্রশ্ন

ইতালির মতো একটা দেশে যেখানে সব বড় লেখকেরাই মুভির জন্যে লিখেছে অথবা পরিচালনা করেছেন, আপনি সেখানে সিনেমা থেকে সবসময় নিজেকে দূরে সরিয়ে রেখেছেন। কিভাবে এবং কেন?

ক্যালভিনো

তরুণ বয়সে আমি সিনেমাভক্ত ছিলাম, নিয়মিত মুভি দেখতে যাওয়া হতো। কিন্তু আমি দর্শকই ছিলাম সবসময়। পর্দার অপর পাশে কী চলছে তা নিয়ে কখনো আগ্রহ বোধ করি নাই। এটা জানলে হয়তো সিনেমার জন্যে শিশুসুলভ আগ্রহটা আর থাকত না। আমি জাপানি আর সুইডিশ ফিল্ম পছন্দ করি কারণ সেটা অনেক দূরবর্তী।

প্রশ্ন

আপনি কখনো বোরড হয়েছেন?

ক্যালভিনো

হ্যাঁ, আমার শৈশবে। কিন্তু শৈশবের বোরডম বিশেষ ধরণের বোরডম এটা বলতেই হবে। এই বোরডম স্বপ্নালু; ভিন্ন কোনো স্থান, ভিন্ন কোনো বাস্তবতা অভিমুখী। প্রাপ্ত বয়সে বোরডমটা হচ্ছে পুনরাবৃত্তির এমন একটা কিছুর ধারাবাহিকতা যার থেকে চমকপ্রদ কিছু আশা করার নাই। এখন যা ভয় লাগে সেটা হচ্ছে নিজের সাহিত্যকর্মের ভেতরে পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা। এরজন্যেই প্রত্যেকবারই নতুন কোনো চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হওয়া উচিত। এমন কিছু খুঁজে বের করা উচিত যা অভিনব, এবং আমার সক্ষমতার কিছুটা বাইরে।

শফিউল জয়

জন্ম ১৯ এপ্রিল, ১৯৯৩; ঢাকা। অনুবাদক। পড়াশোনা করছেন গটিংগেন বিশ্ববিদ্যালয়ে, ভারতবর্ষের উপনিবেশিকতা নিয়ে।

ই-মেইল : joyshafiul@gmail.com