হোম চলচ্চিত্র আলেহান্দ্রো ইনারিতুর সঙ্গে আলাপ

আলেহান্দ্রো ইনারিতুর সঙ্গে আলাপ

আলেহান্দ্রো ইনারিতুর সঙ্গে আলাপ
187
0

আলেহান্দ্রো গঞ্জালেজ ইনারিতুর জন্ম ১৫ই আগস্ট, ১৯৬৩; মেক্সিকো সিটি, মেক্সিকো। তিনি একাধারে চলচ্চিত্র পরিচালক, প্রযোজক এবং গল্পকার। বর্তমান পৃথিবীতে নন্দিত ও প্রশংসিত সেরা চলচ্চিত্র নির্মাতাদের অন্যতম হলেন ইনারিতু। তিনি বেশি পরিচিত মানুষের অবস্থাভিত্তিক তিক্ত এবং আন্তর্জাতিক গল্প নিয়ে ছবি তৈরির দক্ষতার জন্য। তার প্রজেক্ট সমালোচকদের কাছ থেকে প্রশংসা কুড়িয়েছে এবং আন্তর্জাতিক সম্মানজনক পুরস্কারে সমাদৃত হয়েছে। তিনি পরপর দু’বার সেরা পরিচালকের পুরস্কার পান তার Birdman ও The Revenant ছবির জন্য।

The Talks একটি সাক্ষাৎকারের অনলাইন সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন। ২০১৬ সালের জানুয়ারির ২৭ তারিখে এই ম্যাগাজিনটি ইনারিতুর সাক্ষাৎকারটি প্রকাশ করে। সাক্ষাৎকারটি বাঙলায়ন করেছেন কায়সার আহমদ।


সা ক্ষা কা


 প্রশ্ন

মি. ইনারিতু, একজন চলচ্চিত্র নির্মাতাকে কি তার ছবির মধ্যে বেঁচে থাকতে হবে?

আলেহান্দ্রো ইনারিতু

আমি মনে করি, প্রত্যেকটা ছবিই যা কিছুই ঘটুক না কেন, কোনো একভাবে আপনার সত্তার বিস্তৃতি। আমি যে কয়টা ছবি বানিয়েছি তার প্রত্যেকটা আমার সত্তার বিস্তৃতি। আমি অনুভব করি, ছবিগুলো বাস্তবতার সাথে মিশ্রিত হতে থাকে। তারপর হঠাৎ সেখানে একটি অপার্থিব ঝাপসা রেখা অদৃশ্য হয়ে যায় এবং চলচ্চিত্রে বস্তুতপক্ষে যা ঘটতে থাকে তা আপনার জীবনকে ঘিরে ফেলতে শুরু করে খুবই বাস্তবভাবে। ওটাই আমার জীবনে ঘটেছে বহুবার।

প্রশ্ন

কোন ছবিটা সুনির্দিষ্টভাবে?

আলেহান্দ্রো ইনারিতু

এইবারের ছবিটা হচ্ছে The Revenant। এই ছবির থিমের বাস্তবতা আসলেই আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের অংশ হয়ে যায়। পানি ভয়ানক রকম ঠান্ডা ছিল; একদিন আমরা হিমাঙ্কের নিচে মাইনাস ৪০ ডিগ্রি সে. তাপমাত্রায় ছিলাম। চরিত্রগুলোর শারীরিক বাস্তবতা আমাদের জীবনে এসে উপস্থিত হয় এবং আমাদের নিজস্ব বাস্তব অভিজ্ঞতার সাথে তা মিশে যায়।

প্রশ্ন

আপনি এরকম চরম পরিস্থিতিতেও ছবির শুটিং করতে কেন প্রতিজ্ঞাবদ্ধ?

আলেহান্দ্রো ইনারিতু

আমি এরকম বুনো পরিবেশে বেড়িয়ে যেতে পেরে, ঐতিহ্যে ফিরে যেতে পেরে খুবই খুশি হয়েছিলাম। এগুলো হচ্ছে সিনেমার শেকড় যেখানে ঘটনাগুলো ঘটে এবং আমরা শুটিং করি খুবই বাস্তব কিছু স্থানে। এবং এই জায়গাগুলোতে আমরা এখনো সেট নির্মাণ করে অথবা ডিজিটালভাবে আবিষ্কার করে আমাদের চারপাশে কিছু কৃত্রিম জগৎ সৃষ্টি করি নাই। তারপর হঠাৎ খাঁটি প্রাকৃতিক উপাদানের বাস্তবতা ও জটিলতা এবং বাস্তব আলো… আমার কাছে এটা পরিষ্কার যে, একজন কম্পিউটার এক্সপার্ট অথবা সেট ডিজাইনার যত ভালোই হোক না কেনো তিনি কোনোভাবেই ওই বাস্তবতা তৈরি করতে পারবেন না।


কখনো কখনো আপনি ঈশ্বর এবং কখনো কখনো আপনি একটা প্রাণী।


প্রশ্ন

কেন পারবেন না?

আলেহান্দ্রো ইনারিতু

শুধুমাত্র এর সৌন্দর্য ও জটিলতার কারণেই যে পারবেন না তা নয়। তদুপরি এটা এই সিনেমা নির্মাতাদেরকে যে মানসিক অবস্থা দান করে তার জন্যও পারবেন না। আপনি জানেন কি এটা সমস্ত সিস্টেমের মধ্যে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে! সে অর্থে বলতে গেলে বলতে হয়, আমি আসলে এই অভিজ্ঞতাটাকে ভালোবাসি। চলচ্চিত্র নির্মাণের দীর্ঘ ও দুঃসাহসিক যাত্রা নিজেই সিনেমায় পরিণত হয়েছিল। আমরা শিকারিতে পরিণত হয়েছিলাম, আপনি জানেন! এর অনুভূতিটা ছিল মহৎ এবং এটা ছিল একটা বিশাল আবেগময় অভিজ্ঞতা ও শারীরিক অভিজ্ঞতা।

প্রশ্ন

আপনার কথা শুনে হেরজগের Aguirre, the Wrath of God মুভিটার কথা মনে পরে গেল যেখানে তিনি বিশ্বাস করতেন যে, চরম প্রতিকূল পারিপার্শ্বিকতায় পেরুর রেইন ফরেস্টে ছবির শুটিং করলে তা চলচ্চিত্রে ফুটে উঠবেই।

আলেহান্দ্রো ইনারিতু

হ্যাঁ। হেরজগের Aguirre অথবা Fitzcarraldo আমাকে প্রভাবিত করেছে। অথবা আকিরা কুরোসাওয়া একটা ছবি বানিয়েছিলেন যার নাম ছিল Dersu Uzala অথবা এমনকি Apocalypse Now আমার উপর প্রভাব বিস্তার করেছে। ওই ছবিগুলো ছিল প্রকৃতির বিরুদ্ধে মানুষের সংগ্রামের এবং সেখানে সেই প্রাকৃতিক ভূদৃশ্য রয়েছে যেগুলো কিনা কোনো না কোনোভাবে চরিত্রগুলোর আবেগময় অবস্থাকে পরিচালিত করে। আমি সত্যি সত্যিই সেই ছবিগুলোকে ভালোবাসি।

প্রশ্ন

কিন্তু ওভাবে ছবি শুটিং করলে তার জন্যে মূল্য দিতে হয়। Aguirre নির্মাণের সময় হেরজগ এবং ক্লাউস কিনস্কি শেষমেষ পরস্পর পরস্পরকে প্রায় মেরেই ফেলেছিলেন চরম মানসিক চাপের কারণে।

আলেহান্দ্রো ইনারিতু

হ্যাঁ, একবার যখন আপনি সেখানে যাবেন তখন আপনি উপলব্ধি করবেন যে, এটা দশগুণ কঠিন একটা কাজ। এই ছবিটা হচ্ছে আমার একটা সরল মনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ফলশ্রুতি। আমি সেই সিদ্ধান্তটা নিয়েছিলাম কারণ আমি ছিলাম একেবারেই অন্ধ। আপনি আসলেই আরাম করার সমস্ত সুযোগ পরিত্যাগ করেন এবং প্রতিদিনই যুদ্ধ করেন। ঐটাই হচ্ছে মুড। এটা হচ্ছে পর্বতে আরোহণ করার মতো—যখন আপনি দড়ি ছাড়া কোনো দেয়াল বেয়ে উপরে উঠছেন এবং যখন আপনি মাঝামাঝি জায়গায় আছেন, তখন যে কোনো ভুল হলেই আপনি জানেন যে আপনি পড়ে যাবেন এবং মারা যাবেন। ওইরকমটাই ছিল ওই ছবিটার নির্মাণের প্রতিদিনকার অনুভূতি।

প্রশ্ন

শুনতে ভয়ানক লাগছে।

আলেহান্দ্রো ইনারিতু

আমি কতটা ক্ষ্যাপাটে তা শুনে কিছুটা ভয় লাগারই কথা। সব কিছুই নষ্ট হয়ে যেতে পারত খুব সহজেই… সেখানে প্রতিদিনই কতই-না চ্যালেঞ্জ থাকত। আপনি আপনারই কাজের একটা প্রাণীতে পরিণত হন। কখনো কখনো আপনি ঈশ্বর এবং কখনো কখনো আপনি একটা প্রাণী। এবং এখানে আপনি শুধুমাত্র একটা প্রাণী যে কিনা তার নিজস্ব সৃষ্টিকে রক্ষা করছে। এবং আর্থিক ঝুঁকি, এত উচ্চাভিলাষী একটা প্রজেক্টের যে কোনো জিনিস ভুল পথে যেতে পারত। লক্ষ্যমাত্রা এত উঁচুতে স্থির করা হয়েছিল যে আমরা তার ফাঁদে পড়ে গিয়েছিলাম। আমি আমার নিজের নিয়মের ফাঁদে নিজেই পড়ে গিয়েছিলাম। পিছনে ফিরে যেতে পারছিলাম না—আমি একটা দেয়ালকে আঘাত করেছিলাম। এবং আমি যদি শেষ করতে না পারি, অথবা আমি যেভাবে শেষ করতে চেয়েছিলাম সেভাবে শেষ করতে না পারি, তাহলে সেটা হবে একটা বিরাট বিপর্যয়। এটা হচ্ছে ম্যারাথন দৌড়ের মতো—আপনি আর কোনোভাবেই থামতে পারবেন না; আপনাকে শেষ করতেই হবে। আপনি অনুভব করছেন যে, আপনি অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছেন, কিন্তু তারপরও আপনাকে শেষ করতেই হবে!

প্রশ্ন

ক্যারিয়ারের কারণে আপনি অবশ্যই দাম্পত্য জীবনের উপর কঠিন হয়েছেন।

আলেহান্দ্রো ইনারিতু

আশা করি আমি শীঘ্রই ডিভোর্স পেতে যাচ্ছি না! [হাসি]। এটা কঠিন ছিল। চলচ্চিত্র নির্মাণ অনেক কিছু দাবি করে। এটা আপনাকে অনেক জ্বালাতন করবে। এবং আপনি সেই সমস্ত লোকদের কাছ থেকে দূরে থাকবেন, আপনাকে যাদের অনেক প্রয়োজন। আর সেগুলোই হচ্ছে অন্যতম কঠিনতর অংশ।

প্রশ্ন

গত বছর আপনি যখন Birdman-এর জন্য যখন অস্কার পুরস্কার পেলেন তার আগে থেকেই আপনি The Revenant-এর উপর কাজ করে যাচ্ছিলেন। আপনি কি বলতে পারতেন না যে একটু জিরিয়ে নেই?

আলেহান্দ্রো ইনারিতু

আমি দুটো ম্যারাথনে দৌড়িয়েছি। এজন্য আমার এখন থামা দরকার। সত্যি বলতে কি, Birdman ছবিটা নিয়ে কী হয়েছে সেটা বুঝার ফুরসত আমার হয় নি। এটা একটা উদ্ভট পরিস্থিতি এবং আমি মনে করি, আমাকে কয়েক মাস বিশ্রামে থাকতে হবে এবং তখন আমি বুঝতে পারব গত আড়াই বছরে আমার জীবনে কী ঘটেছে। দুটো ছবির মাঝখানে আমি সাধারণত দুই থেকে তিন বছর সময় নিয়ে থাকি। তাহলে যে বিষয়টা নিয়ে এখন আমার একমাত্র চিন্তা হতে পারে সেটা হচ্ছে আগামী তিন বছর বিশ্রামে থাকা। আমার আসলেই এটা খুব দরকার।

প্রশ্ন

এই উচ্চাভিলাষী ছবিগুলোকে সম্ভব করে তুলতে হলে কি আরনন মিলচানের মতো ধনকুবেরদের প্রয়োজন হয় যিনি Birdman এবং The Revenant ছবির প্রযোজনা করেছেন এবং এর আগে Once Upon a Time in America এবং Brazil-এর মতো ছবিকে আর্থিকভাবে সহায়তা করেছেন।

আলেহান্দ্রো ইনারিতু

অবশ্যই। আপনার অবশ্যই এমন একজন ব্যক্তির প্রয়োজন যার সেরকম আবেগ আছে, সেরকম সুনির্দিষ্ট রুচি আছে, যে একজন শিল্পপ্রেমিক এবং ভালো অর্থে কিছুটা ক্ষ্যাপাটে—এরকম একটা ছবিকে বাস্তবে রূপ দিতে গেলে এর সব কয়টিই আপনার প্রয়োজন হবে।


যখন সব কিছুই মুনাফা দ্বারা পরিচালিত হয় তখন সিনেমা পণ্যে পরিণত হয় অথবা কোনো আরামদায়ক দ্রব্যে পরিণত হয় যা কাউকে বিরক্ত করে না এবং তা না করেই যথাসম্ভব সর্বোচ্চ সংখ্যক দর্শক পায়


প্রশ্ন

বাকিরা সবাই কি টাকার জন্য খুব বেশি চিন্তা করে?

আলেহান্দ্রো ইনারিতু

সে কারণেই ওই সমস্ত ছবিগুলো আর তৈরি হচ্ছে না। কারণ আজকে যে সমস্ত লোকেরা এর সাথে জড়িত তাদের অধিকাংশই হলো বিনিয়োগকারী এবং তাদের এখানে আসার একমাত্র কারণ হচ্ছে মুনাফা। এবং যখন সব কিছুই মুনাফা দ্বারা পরিচালিত হয় তখন সিনেমা পণ্যে পরিণত হয় অথবা কোনো আরামদায়ক দ্রব্যে পরিণত হয় যা কাউকে বিরক্ত করে না এবং তা না করেই যথাসম্ভব সর্বোচ্চ সংখ্যক দর্শক পায়…। এজন্য বর্তমানে আমরা যে অবস্থায় আছি তা বিপজ্জনক। এটা শুধুমাত্র মুনাফা। পূর্বে অবস্থা এর চেয়ে ভিন্ন ছিল এরকম ভাবার মতো সরল আমি নই। সব সময়ই এরকম ছিল। তবে বর্তমানে অবস্থা পূর্বের চাইতে অনেক অনেক বেশি খারাপ।

প্রশ্ন

আমরা একটু পেছনে ফিরে যাই, আপনি কি The Revenant-এর মতো ছবি একইভাবে আবারও করবেন?

আলেহান্দ্রো ইনারিতু

এই ছবিটা করার জন্য আমি একেবারেই অনুতপ্ত নই। আমি মনে করি, আমি যা কিছুর মধ্যে দিয়ে গিয়েছি তা যথার্থ ছিল। আমি খুবই গর্বিত। কিন্তু আমি ওটা আর করব না। [হাসি]। এটা ছিল মারাত্মক কঠিন। ভীষণ, ভীষণ প্রয়োজনীয়। এটা নিজেকে রক্ষা করার একটি কর্মে, একটি সৎ কর্মে পরিণত হয়েছিল। চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে আমি কিছু কিছু মুহূর্তের মধ্যে দিয়ে গিয়েছি যা ছিল খুবই প্রয়োজনীয় এবং চ্যালেঞ্জপূর্ণ…

প্রশ্ন

আপনি ওই সমস্ত মুহূর্তগুলোতে কিভাবে আশা খুঁজে পান?

আলেহান্দ্রো ইনারিতু

যখন আপনি আশা হারিয়ে ফেলেন এবং আপনি বুঝেন যে, কিছু জিনিস কখনোই সম্ভব হবে না, আপনি সেগুলোকে যেভাবে কল্পনা করেছিলেন, কিন্তু আপনি চেষ্টা অব্যাহত রাখেন। হঠাৎ একটা জিনিস উল্টে যায় এবং সমস্ত কিছুই আবার অনুকূলে আসে। এবং হঠাৎ যে কাজটা হচ্ছিল না সেটা আবার হতে থাকে। আপনি যখন কোনো একটি দিনের ভয়ঙ্কর ভয়ঙ্কর কঠিন মুহূর্তের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছেন এবং অনেক হতাশা আপনাকে ঘিরে ধরেছে, কারণ কোনো কিছুই সঠিকভাবে হচ্ছে না, কিন্তু আপনি হাল ছেড়ে দিচ্ছেন না, এবং হঠাৎ সেটা হয়ে যায়! সেটাই একটা অলৌকিক ব্যাপার।


ঈদসংখ্যা ২০১৯

কায়সার আহমদ

জন্ম ২৮ সেপ্টেম্বর ১৯৬৭; ঢাকা। বিএ (সম্মান), এমএ, ইংরেজি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। পেশা অধ্যাপনা।

ই-মেইল : kaiser.ahmad1@gmail.com