হোম নির্বাচিত আমি পপুলার নভেলিস্ট হতে চাই : মহিউদ্দীন আহ্‌মেদ

আমি পপুলার নভেলিস্ট হতে চাই : মহিউদ্দীন আহ্‌মেদ

আমি পপুলার নভেলিস্ট হতে চাই : মহিউদ্দীন আহ্‌মেদ
2.02K
0

এবারের বইমেলায় প্রকাশিত হলো তরুণ কথাসাহিত্যিক মহিউদ্দীন আহ্‌মেদের দুটি বই। দুটি বই-ই এসেছে ‌’মুক্তচিন্তা‌’ থেকে। গ্রন্থকার হিশেবে এই তার প্রথম আত্মপ্রকাশ। যদিও তিনি লেখালেখি করছেন দীর্ঘদিন হলো। তার বিভিন্ন লেখা পরস্পরে নানা সময়ে প্রকাশিত হয়েছে। বই দুটিকে উপলক্ষ করে লেখকের সঙ্গে কিছু কথা চালাচালি হলো ফেসবুক মেসেঞ্জারে। কৌতূহলী পাঠকের জন্য তুলে ধরছি এখানে…


সোহেল হাসান গালিব

এবারই প্রথম আপনার বই প্রকাশিত হলো। একটা নয়, একেবারে দুটো বই। আপনাকে ডাবল অভিনন্দন।

মহিউদ্দীন আহ্‌মেদ

হা হা হা, আপনাকেও ডাবল ধন্যবাদ।

সোহেল হাসান গালিব

একটা তো গল্পের। আরেকটা উপন্যাস। কোনটাতে আপনি বেশি এক্সাইটেড?

মহিউদ্দীন আহ্‌মেদ

আসলে এক্সাইটেড হয়তো গল্পটাতেই বেশি। তবে উপন্যাসেও এক্সাইটেড আছি। ব্যাপার হলো, আমি চাচ্ছিলাম গল্পের বইটা আগে হোক। তা এ চাওয়া আমার আরো বেশ কবছর আগে থেকেই। পাণ্ডুলিপিও রেডি ছিল। কিন্তু এবার প্রকাশক উপন্যাসে আগ্রহ প্রকাশ করলেন। কাজ সেভাবেই এগুচ্ছিল। কিন্তু আমি রিয়্যালাইজ করলাম, গল্প রেখে উপন্যাস বের হলে আমার মনোতৃপ্তিটা হবে না। ব্যাপারটা প্রকাশককে খুলে বললাম। উনি দুইটাই বের করার সিদ্ধান্ত নিলেন। আমার ভালো লাগা শুরু হলো। সেই ভালো লাগাতেই আছি এখনো।

সোহেল হাসান গালিব

গল্পের বইয়ে কোনো ঝুঁকি অনুভব করছেন কি? এই যেমন কম নজরে পড়া, একটু আন্ডার-মাইন্ড বা আন্ডার-রেটেড হওয়া। উপন্যাসের দিকে পাঠকের সরে যাওয়া। যেহেতু দুটো বই একই প্রকাশনা থেকে আসছে।

মহিউদ্দীন আহ্‌মেদ

মোটেও না। আমি বরং চাচ্ছি উপন্যাসটা বেশি চলুক।

সোহেল হাসান গালিব

কেন?

মহিউদ্দীন আহ্‌মেদ

কারণ তা হলে প্রকাশক আমার উপর একটু হলেও ভরসা পাবেন। আর গল্প যারা পড়ার তারা পড়বেন, এ বিশ্বাস আমার আছে।

সোহেল হাসান গালিব

শাদা শাদা মেঘ খণ্ড খণ্ড প্রেম—আপনার গল্পের বইয়ের নাম। নামে যে আভাস পাই, তাতে তো মনে হয় এর পাঠক-সম্ভাবনা ঢের। এসবই কি অসম্পূর্ণ বা অচরিতার্থ প্রেমের গল্প?

মহিউদ্দীন আহ্‌মেদ

প্রথমত আপনার মুখে ফুলচন্দন পড়ুক। দ্বিতীয়ত এখানে অসম্পূর্ণ বা অচরিতার্থ প্রেমের গল্প—ব্যাপারটা কেন ঢুকল বুঝলাম না। উপন্যাস বেশি বেশি চলুক বলেছি বলে?

সোহেল হাসান গালিব

তা নয়। নামের ভিতর দিয়ে আমার চোখে একটা ইমেজ ভেসে উঠল। শরতের ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘ আকাশে ছড়িয়ে আছে। আর খণ্ড খণ্ড প্রেমের গল্প জড়িয়ে আছে আমাদের জীবনকে। কোনো অখণ্ড প্রেমের মূর্তি হয়তো গড়ে ওঠে নি তার। সেজন্য বলা।

মহিউদ্দীন আহ্‌মেদ

ও আচ্ছা বুঝলাম এবার। তবে এটাকে ওই অর্থে অসম্পূর্ণ প্রেম বলা যাবে না। কেননা পূর্ণ প্রেমের সন্ধানই-বা কে জানে। এনি ওয়ে, দুটো বই নিয়ে আমার কোনো চাপ নেই। আমি বেশ ফ্রেশ আছি। আমার লেখার দায়িত্ব, আমি লিখেছি। যাদের পড়ার দায়িত্ব তারা পড়বেন।


আমার বইয়ে ১২টি গল্প আছে। এর প্রথমটি লেখা ১৯৯৮ সালে। শেষটি ২০১৭ সালে।


সোহেল হাসান গালিব

পড়ার আগে তাদের কিছু পূর্বাভাস দিন, যাকে বলে হাইলাইটস। উপন্যাসের আলোচনায় পরে আসছি। গল্পের বিষয়বস্তু সম্পর্কে একটু বলেন।

36331895_1981943445169190_5775503163574452224_n

মহিউদ্দীন আহ্‌মেদ

আমার বইয়ে ১২টি গল্প আছে। এর প্রথমটি লেখা ১৯৯৮ সালে। শেষটি ২০১৭ সালে। বলতে পারেন প্রায় দুই দশকের জার্নি। ফলে কত কিছুর আভাস যে আছে তা ম্যাসেঞ্জারে বলা টাফ। তবে একটা আভাস দেওয়ার লোভ সংবরণ করতে পারছি না। গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়কালে যা আমরা দেখেছি তার ইনার ফিলোসফি পাওয়া যাবে একটি গল্পে। গল্পের নাম ‘যদি সেনাবাহিনীর প্রধান হতাম‘। এ ছাড়াও আরো অনেক আভাস আছে। সেগুলো সিক্রেট রেখে দিচ্ছি।

সোহেল হাসান গালিব

বাহ্‌। তাহলে শুধু প্রেম নয়, এটা অন্তত ফাঁস হয়ে গেল!

মহিউদ্দীন আহ্‌মেদ

হ্যাঁ, তা তো বটেই। একটি গল্পের নামে বইয়ের নামকরণ করা হয়েছে। তার মানে তো এই না যে সবগুলো প্রেমের গল্প। ভিন্ন স্বাদের ১২টি গল্প। ১২টি নতুন গল্প।

সোহেল হাসান গালিব

আচ্ছা। গল্পের ক্ষেত্রে আপনার জন্য চ্যালেঞ্জিং ব্যাপার কোনটি? চরিত্র নির্মাণ, মনোবিশ্লেষণ, বয়ান তৈরি নাকি আইডিয়া? বা অন্য কিছু?

মহিউদ্দীন আহ্‌মেদ

আমার তো মনে হয় চরিত্র দাঁড়িয়ে গেলে বাকি সব পানির মতো সহজ। হ্যাঁ, চরিত্র আমার কাছে বেশি চ্যালেঞ্জিং! দ্বিতীয়ত আইডিয়া। আমি কী বলতে চাচ্ছি, তা যদি কোনো চরিত্র ধারণ করতে পারে তাহলে অন্য বিষয়গুলো ন্যাচারালি হয়ে যায়। আমি মুক্ত হয়ে পড়ি।

সোহেল হাসান গালিব

আপনার উপন্যাস তো একটা চরিত্র নিয়েই সম্ভবত—বিল্লাল হোসেন ওরফে বিল্যাই মিয়া। ধারণা করছি, চরিত্রই আপনার কাছে মুখ্য।

মহিউদ্দীন আহ্‌মেদ

না, তা কি আর হয়? জগৎ কি আর এইভাবে চলে? চলে না। ফুলের পাপড়ির ওপর যে কীটটি বসে থাকে সেও তো কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। বিল্লাল হোসেন ওরফে বিল্যাই মিয়া উপন্যাসে আরো বেশ কিছু চরিত্র আছে। গল্পকে খারিজ করা যাবে না।

সোহেল হাসান গালিব

মানে, আমি বলতে চাইছি, শেষ পর্যন্ত এটা চরিত্র-নির্ভর। কথাটা বলছি এ কারণে যে, সম্প্রতি চরিত্রের নামে উপন্যাসের চল কমে এসেছে। নাকি ভুল বলছি?

মহিউদ্দীন আহ্‌মেদ

আমি এ ব্যাপারটাই বলতে চেয়েছিলাম। সেদিক থেকে এটা চরিত্র-নির্ভর। ইউ আর রাইট। আপনি প্রশ্ন করতে থাকেন, আমি চা করে নিয়ে আসছি।


এটা কি ব্যক্তি-বিকাশের কাল? ব্যক্তি-চরিত্রের গল্পই কি আমাদের সমাজ-আখ্যান?


সোহেল হাসান গালিব

মানিক-বিভূতি-তারা-ওয়ালী-ইলিয়াস-শওকত ইত্যাদি কয়েকটা নাম নিলাম র‌্যান্ডমলি, অমিয়-কমল-দেবেশও আসতে পারত। এদের কিন্তু নাম-ভিত্তিক উপন্যাস খুব কম। নেই বললেই চলে। আপনি চরিত্রনামের দিকে গেলেন কেন? এটা কি ব্যক্তি-বিকাশের কাল? ব্যক্তি-চরিত্রের গল্পই কি আমাদের সমাজ-আখ্যান?

মহিউদ্দীন আহ্‌মেদ

আপনি যাদের নাম বললেন তাদের মধ্যে আমি ইলিয়াসের অনুরক্ত। আমার কিছু গল্পে তার ছাপ রয়ে গেছে শেষ পর্যন্ত। আমি ফেলি নি। রেখে দিয়েছি। তো, ইলিয়াসের চরিত্রগুলো কিন্তু একেকটা উপাখ্যান। মানে চরিত্রশাসিত গল্প। তো এখন প্রশ্ন হলো, আমি কেন নামনির্ভর হলাম! এইটার আসলে সঠিক উত্তর আমার জানা নেই। এমনকি গল্পটা কোত্থেকে এসেছিল মাথায়, তাও মনে নেই। আমি শুধু বিল্যাই মিয়াকেই দেখতে পাই। ঠিক সেভাবেই একটি চারুকলার ছেলেকে দিয়ে পোট্রেট আঁকিয়েছি। আমার বিশ্বাস পুরো মেলার মধ্যে বিলাই মিয়াকে সবাই আমার মতোই দেখতে পাবেন। যাহোক সেটা ভিন্ন কথা। আমি আসলে বাজার-কাটতি একটা উপন্যাস লিখতে চেয়েছিলাম। লিখেছি। বড় লেখকেরা নামসর্বস্ব উপন্যাস লিখেছেন কি লেখেন নাই সেটা আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়। তারাও গল্প লিখেছেন, আমিও একটি গল্পই লিখেছি।

সোহেল হাসান গালিব

বললেন, আপনি ইলিয়াসের অনুরক্ত। আবার চাইলেন বাজার-কাটতি উপন্যাস লিখতে। আপনি তো খুব ঘোড়েল মশাই! আচ্ছা যাক। আপনি আমাদের এই চরিত্রটা নিয়ে একটু বলেন। এখানে বিল্যাই বা বিড়াল এল কেন?

মহিউদ্দীন আহ্‌মেদ

এটা আমার সমাজ-বাস্তবতা। আমার বাস্তবতা। আপনি জীবনানন্দ দাশে অনুরক্ত বলেই জীবনানন্দের মতো ভাববেন, তা নয় কিন্তু। কারণ আপনি আপনার মতো। আমিও তাই। আমিও পাঠক তৈরি করতে চাচ্ছি। নতুন পাঠক।

সোহেল হাসান গালিব

আচ্ছা বেশ। আপনি আমাদের সেই চরিত্রটা নিয়ে একটু বলেন। সেখানে বিল্যাই বা বিড়াল এল কেন?

36294300_1981943455169189_6398305053928587264_n

মহিউদ্দীন আহ্‌মেদ

তার নাম ছিল বিল্লাল হুসেন। ভাগ্যদোষে বিল্যাই মিয়া হয়েছে। তবে সে একজন ছোটখাটো দার্শনিক। হেন কোনো বিষয় নাই যা নিয়ে সে ভাবে না। তার নাম-বৃত্তান্ত ফ্ল্যাপে দেওয়া আছে। পাঠকগণ চাইলে দেখে নিতে পারেন।

সোহেল হাসান গালিব

এইসব চরিত্রে, তাদের দার্শনিকতায় আপনার আমিত্ব কতখানি ভর করে? আপনি কি এসবের থেকে বিযুক্ত?

মহিউদ্দীন আহ্‌মেদ

না। আমি আছি, তাদের সাথে মিশে আছি। নিজে যে কথা বলতে পারি না তা এদের দিয়ে বলিয়েছি। হাসির আশ্রয় নিয়ে বলিয়েছি। কারণ আমরা স্বাধীন বটে, অনেক কথাই বলতে পারি না। ভয় পাই সদা।

সোহেল হাসান গালিব

হাসির আশ্রয় নিয়ে কেন? আপনি তাহলে উইট বা স্যাটায়ার ব্যাপারটাকে লেখকের জন্য একটা আড়াল হিসেবে ডিল করেন!

মহিউদ্দীন আহ্‌মেদ

আমি হাসির সিচুয়েশান ক্রিয়েট করি। এখন সেই হাসি নানা কারণেই আসতে পারে কিন্তু। স্যাটেয়ার তার মধ্যে একটি। বরং বলা চলে বিল্যাই মিয়াতে তীব্র স্যাটায়ার আছে। ও, এখানে আর একটা কথা না বললেই নয়। বিল্যাই মিয়াতে দারুণভাবে এসেছে ম্যাজিক রিয়েলিজম।


আমি লক্ষ করেছি, যাদের লেখা উইটি, তাদের যৌনতা বিষয়ে একটা সতর্ক সংযম আছে। সংকোচও হয়তো।


সোহেল হাসান গালিব

এ কারণেই কি আপনার লেখায় যৌনতার ডিটেইলিং কম? আমি লক্ষ করেছি, যাদের লেখা উইটি, তাদের যৌনতা বিষয়ে একটা সতর্ক সংযম আছে। সংকোচও হয়তো। হাস্যরসের সঙ্গে যৌনতা কি বেমানান? ইংরেজিতে ফান সেক্স কথাগুলি কিন্তু পাশাপাশি হরদম উচ্চারিত হয়। নাকি আমার অবজারবেশনই ভুল?

মহিউদ্দীন আহ্‌মেদ

আমার ব্যাপারে আপনার ধারণা আংশিক সত্য। কারণ, আগে আমি যৌনতার ডিটেইলিং-এ ঢুকতাম। আমার গল্পগ্রন্থে পাবেন। যেমন ৫৭৭ টাকা নামের একটি গল্প আছে, ডিটেইলিংয়ে। তবে বর্তমানে এ ব্যাপারে আমি লাজুক, যেহেতু আমি পপুলার নভেলিস্ট হতে চাই। আপনি তো জানেন, আমাদের পাঠক-ভোক্তা এসব পছন্দ করেন না। তাই না?

সোহেল হাসান গালিব

তাই কি? এই পর্নোগ্রাফির যুগেও পাঠক এত বৃহন্নলা? তর্কের খাতিরে তা যদি মেনেও নিই, একটা প্রশ্ন কিন্তু সামনে চলে আসে। আপনি কি কোনোভাবেই পাঠককে অস্বস্তিতে ফেলতে চান না?

মহিউদ্দীন আহ্‌মেদ

হ্যাঁ, চাই না। এ ব্যাপারে আরো বলব। এখন তো রাক ৪টা ৬ বাজে। দারুণ প্রশ্ন করেছেন। এটার উত্তর কাল দিব। স্যরি, এখন বিরতি দেন।

কালকে যেখানে শেষ হয়েছিল সেখান থেকেই শুরু করি। আমি আশলে চিন্তাভাবনা করে দেখেছি, একজন লেখকের জন্য পাঠকই সব। আর পাঠক যেখানে যৌনতাকে স্পর্শকাতর বিষয় হিসেবে দেখেন আমি তা খোলাশা করব কেন? আমার চালিকাশক্তি তো তারাই, নাকি? ফলে আমি কিছুটা সরে এসেছি। ওগুলো ছাড়াও আরো অনেক বিষয় আছে। এই যেমন ধরেন ফুড। ধরেন লাইফ-স্টাইল। ধরেন সংস্কৃতি। এগুলো তো জীবনেরই একেকটা অনুষঙ্গ। আপনি দেখেন, এইগুলো কিন্তু অতটা হাইলাইটেড হচ্ছে না, যতটা হাইলাইটেড হচ্ছে যৌনতা। তো আমি চাচ্ছি, পাঠকরা অস্বস্তিতে না পড়ুক। একটানে পড়ে যাক। কোনোরকম বোর না হয়ে শুধু পড়তে থাকুক। আনন্দ পাক।

সোহেল হাসান গালিব

কোনোরকম চিন্তার সংকটে না পড়ুক!

মহিউদ্দীন আহ্‌মেদ

হাহাহা। পড়লেও নিজে নিজে ওঠার শক্তিও অর্জন করুক।

সোহেল হাসান গালিব

স্ট্যাটাস্কু। অর্থাৎ আপনি ভ্যালু সিস্টেমকে আঘাত করতে চান না কোনোভাবেই।


শিল্পী তো গণসম্মতির অপেক্ষায় থাকেন না। তিনি সম্মতি আদায় করেন।


মহিউদ্দীন আহ্‌মেদ

আঘাতের ব্যাপারটা আবার ভিন্ন। আপনি যখন তাদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে যেতে পারবেন তখন আর আঘাত করতে হবে না। আপনার চাওয়াটা আপনা-আপনি পেয়ে যাবেন। মানে তাদের দলে থাকতে হবে। তাদের সাথে মিশতে হবে। তাদের চাওয়াকে অনার করতে হবে।

সোহেল হাসান গালিব

এটা তো পলিটিক্যাল লিডারের কথা হলো। শিল্পী তো গণসম্মতির অপেক্ষায় থাকেন না। তিনি সম্মতি আদায় করেন। হয়তো ধীরে ধীরে। কিন্তু নতুন অভিঘাত সৃষ্টি করতে গেলে তাকে আপত্তির মুখে পড়তেই হয়। অসন্তোষের শিকার হতে হয়।

মহিউদ্দীন আহ্‌মেদ

এইটা একটা চিরায়ত সত্য বটে। কিন্তু কোনোভাবেই কন্সট্যান্ট না। একেবারে ধ্রুব সত্য বলে কিছু নেই। তো, সেকারণে কৌশল চেঞ্জ হতে পারে লেখকের। হ্যাঁ, আমি স্বীকার করি, লেখকের নতুন অভিঘাত জরুরি। কিন্তু তা হতে হবে যুগোপযোগী। আমার মনে হয় আমি বোঝাতে পেরেছি।

সোহেল হাসান গালিব

না বুঝতে পারি নি। নতুন অভিঘাত যখন আসবে তখন প্রথাবদ্ধ মানুষ কেন প্রতিক্রিয়াশীল হবে না? তাদেরকে কিভাবে আপনি তুষ্ট করবেন? কফি বানায়া আসি। বলো।

মহিউদ্দীন আহ্‌মেদ

দ্যাটস গুড। আমি অবশ্য এক মগ চা নিয়েই বসেছি। টুক টুক করে খাচ্ছি। তো, কথা হলো, নতুন অভিঘাত আশলে কী? একদল লেখক বলছেন, তাদের অভিঘাতে সমাজ পরিবর্তিত হয়ে যাবে। আশলেই কি তা ঘটে? লেখক কি সমাজ পরিবর্তন করতে পারে? নাকি সমাজের ক্ষতগুলো শুধু দেখাতে পারে? কোনটা তাদের দায়িত্ব? যা হোক, আমি বলতে চাইছি, আপনি যদি কিছু বদলাতে চান, একা একা পারবেন না। কিছুটা পলিটিক্যাল লিডারের মতোই কাজ করতে হবে। এর মানে হলো, আপনার মতবাদ প্রতিষ্ঠা করতে হলে বৃহৎ জনগোষ্ঠীর দুয়ারে সেই মতবাদ আগে পৌঁছাতে হবে। এই যে একবার আপনি করে বলেন, একবার তুমি বলেন, এতে করে বলার সময় হাসি পায়। একবার মনে হয় আমি আপনার খুব দূরের লোক, আবার মনে হয় কত কাছের!

সোহেল হাসান গালিব

তুমি বলাটা অফ দ্য রেকর্ড।

মহিউদ্দীন আহ্‌মেদ

মজার আছে অবশ্য।

সোহেল হাসান গালিব

আপনাকে একটু উদাহরণ দিয়ে বলি। যেমন ধরেন, ঘরে-বাইরে উপন্যাস লেখার পর ব্যাপক সমালোচনার মধ্যে পড়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। আবার, পথের দাবী লিখে শরৎ নিষিদ্ধ হয়েছিলেন সরকারের কাছে। এমনকি রবীন্দ্রনাথও তিরস্কার করেছিলেন। ওদিকে জগদীশ গুপ্তের লেখা অস্বস্তিতে ফেলেছিল অনেককেই। কিন্তু নিমাই ভট্টাচার্য নিয়ে কারো কোনো অস্বস্তি নেই। তাকে হয়তো আমাদের সাহিত্যে আর দরকারও নেই।

মহিউদ্দীন আহ্‌মেদ

কালে কালে কত কিছুই তো হয়। কেউ হয়তো নিমাইকেই দরকারি মনে করতে পারে কোনো এক সময়। জীবনানন্দ দাশকে যেমন আমরা এখন মনে করছি। তাই না? ফলে এগুলো একটা পর্যায়ে গিয়ে আপেক্ষিক বিষয়। সে জন্যই আমি বলেছিলাম, লেখককে একদম সময়ের সাথে মিশে যাওয়ার কথা।

সোহেল হাসান গালিব

দুটো উদাহরণ এক নয় কিন্তু। জীবনানন্দ দাশের জনপ্রিয়তা ক্রমান্বয়ে বেড়েছে। নিমাইয়ের ক্ষেত্রে উল্টো। আপনার বক্তব্যে মনে হলো, নিমাইয়ের উদাহরণটাই আপনার পছন্দ!

মহিউদ্দীন আহ্‌মেদ

না, আমি সেটা বলি নি। বলেছি, নিজের সময়ে জীবনানন্দের উপেক্ষিত হওয়ার কথা। আর নিমাই এখানে একটা প্রতীক মাত্র। তার স্থলে ড. মাখ্রাজ খান নামক কোনো লেখকের নাম বসানো যেতে পারে। এবং আমি বলেছি সেরকম কেউ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে কোনো একটা সময়ে।

সোহেল হাসান গালিব

সাহিত্যে মরে গিয়ে পরে জনপ্রিয় হয়ে ওঠার উদাহরণ তো নেই। জীবনানন্দ তার সময়ে উপেক্ষিত ছিলেন, এটাও একটা ভুল প্রচারণা। তিনি জীবদ্দশাতেই পুরস্কৃত কবি। সেকালের তরুণদের কাছে কেমন জনপ্রিয় ছিলেন তা সুনীলের বর্ণনায় আমরা পাই। সেই জনপ্রিয়তা তিরিশের অন্য কবিদের কারো ছিল না। যা হোক, এই বিষয়টা অমীমাংসিতই থাক। এবার একটু অন্য প্রসঙ্গে আসি।

মহিউদ্দীন আহ্‌মেদ

ঠিক আছে। আমরা এ ব্যাপারে পরে না-হয় আরো কথা বলব।


এই প্রশ্ন শুনে হুমায়ূন বুঝে যান যে, হক ভাইয়ের উদ্দেশ্য ভালো না।


সোহেল হাসান গালিব

জনপ্রিয়তা নিয়ে যেহেতু কথা। যতদূর বুঝলাম জনপ্রিয় হয়ে ওঠাটা আপনার একটা প্রোজেক্ট। একটু কড়া শোনালেও, যা দাঁড়ালো, আপনি জনপ্রিয়তার জন্য শিল্পের সাথে আপোস করতে রাজি। যেহেতু আপনি ভিজুয়াল মিডিয়ায় কাজ করেন—কম্যুনিকেশন, মিডিয়ার ভাষা—এসবে আপনার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাও আছে। তাই আমার কৌতূহল, এ সময়ের পাঠক আশলে কী চায় বলে আপনার ধারণা।

মহিউদ্দীন আহ্‌মেদ

জনপ্রিয় আমি হতে চাই এটা সত্যি। কিন্তু আপোসের যে কথাটা বললেন সেটাতে দ্বিমত। কারণ আমি আমার গল্পটিই লিখব। আমার যা ভালো-লাগা তাই প্রকাশ করব। এখানে আপোসের ব্যাপারটা কোথায়? এমন তো না যে, কেউ বলল তার মনের মতো করে একটা গল্প লিখে দিতে, আমি লিখে দিলাম। ফলে নাটাইটা কিন্তু আমার হাতেই থেকে যাচ্ছে। আমি পাঠকের সাথে মিশে যাওয়ার কথা বলেছিলাম, তার মানে হচ্ছে তাদের চাওয়াকে ‘বোঝার’ কথা বলেছিলাম। আর যেটা বললেন ভিজুয়াল মিডিয়ায় কাজ করার কথা, সেটা দিয়ে পাঠকসমাজকে বোঝা যায় বলে মনে হয় না। হলে আরো ১০ বছর আগেই আমি প্রকাশনায় আসতাম। মানে হলো আমার ভয় আছে। তারা কী চায় আমি যদি জানতাম, তাহলে আমি সাহিত্য-দেবতাই হয়ে যেতাম। হুমায়ূন আহমেদও জানতেন বলে মনে হয় না।

সোহেল হাসান গালিব

আপনার টার্গেট রিডার কারা?

মহিউদ্দীন আহ্‌মেদ

এখানে কয়েকটা ধাপ আছে। যেমন টিন-রা, মধ্য-বয়স্করা এবং বৃদ্ধরা। আমি ধরতে চাই টিন এবং বৃদ্ধদের। তবে একটা কথা অফ দা রেকর্ড, যারা সরাসরি সাহিত্য করে তাদেরকে খুব একটা চাই না। কেন চাই না, সেই প্রশ্ন করলে এখন উত্তর দিব না। ওটা সিক্রেট থাকবে।

সোহেল হাসান গালিব

সে প্রশ্ন করব না। আপনাকেও আর বিরক্ত করব না। আপনার বই দুটি পাঠক-প্রিয়তা পাক। নিশ্চয়ই পরে কোনো সময় আরও আক্রমণাত্মক আলোচনা আমরা করতে পারব।

মহিউদ্দীন আহ্‌মেদ

তাহলে একটু আভাস দিয়েই তবে শেষ করি। একবার সৈয়দ হক হুমায়ূন আহমেদের সাক্ষাৎকার নিছিলেন। তিনি কয়েকটি ভালো ভালো প্রশ্ন করার পর এক পর্যায়ে জানতে চান, হুমায়ূন কিভাবে মেপে মেপে ৪ ফর্মার বই লেখেন। এই প্রশ্ন শুনে হুমায়ূন বুঝে যান যে, হক ভাইয়ের উদ্দেশ্য ভালো না। তখন হুমায়ূন পাল্টা প্রশ্ন করেন, হক ভাইরা কিভাবে গুণে গুণে ১৪ মাত্রার লাইন লেখেন। সাহিত্যকরা জল ঘোলা করতে ওস্তাদ। তাই বলেছি আমি তাদের চাই না। যা হোক, সাক্ষাৎকার দেওয়ার অভিজ্ঞতা আমার টেলিভিশনে থাকলেও আপনার মতো বুজুর্গ লোকের কাছে এই প্রথম। তার উপর আবার ম্যাসেঞ্জারে। ইট ওয়াজ টু মাচ টাফ ফর মি। বাট ফাইনালি আমি খুব এনজয় করেছি। বিশেষ করে নিজেকে আবিষ্কার করতে পেরেছি আপনার সাথে কথা বলে। সেটা কী? সেটা হলো, আমি পপুলার রাইটার হতে চাই। জানবেন, এটা আমার দুঃখ। আপনার জন্য শুভকামনা। কথা হবে আরো।

সোহেল হাসান গালিব

বুজুর্গ বলে যে ব্যাজস্তুতি করলেন, তা আমি নিলাম আনন্দচিত্তে। আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

সোহেল হাসান গালিব
গালিব

সোহেল হাসান গালিব

জন্ম ১৫ নভেম্বর ১৯৭৮, টাঙ্গাইল। বাংলায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর।
সহযোগী অধ্যাপক ও প্রশিক্ষণ বিশেষজ্ঞ, নায়েম, ঢাকা।

প্রকাশিত বই :
কবিতা—
চৌষট্টি ডানার উড্ডয়ন ● সমুত্থান, ২০০৭
দ্বৈপায়ন বেদনার থেকে ● শুদ্ধস্বর, ২০০৯
রক্তমেমোরেন্ডাম ● ভাষাচিত্র, ২০১১
অনঙ্গ রূপের দেশে ● আড়িয়াল, ২০১৪
তিমিরে তারানা ● অগ্রদূত, ২০১৭

প্রবন্ধ—
বাদ-মাগরিব (ভাষা-রাজনীতির গোপন পাঠ) ● অগ্রদূত, ২০১৮

সম্পাদিত গ্রন্থ—
শূন্যের কবিতা (প্রথম দশকের নির্বাচিত কবিতা) ● বাঙলায়ন, ২০০৮
কহনকথা (সেলিম আল দীনের নির্বাচিত সাক্ষাৎকার) ● শুদ্ধস্বর, ২০০৮।

সম্পাদনা [সাহিত্যপত্রিকা] : ক্রান্তিক, বনপাংশুল।

ই-মেইল : galib.uttara@gmail.com
সোহেল হাসান গালিব
গালিব