হোম মুক্তগদ্য বেণীমাধব

বেণীমাধব

বেণীমাধব
882
0

নাম কী তোমার?
বেণীমাধব।
তোমার মা?
বেণীমাধব।
তোমার বাবা?
বেণীমাধব।
আর সবাই? ভাইবোন?
সকলেই বেণীমাধব।
পিতামহের নাম কী ছিল?
বেণীমাধব।
মাতামহ?
বেণীমাধব।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাম জানো?
হ্যাঁ, বেণীমাধব।
তার একটি ভালো বইয়ের নাম বলো।
বেণীমাধবগুচ্ছ।
তলস্তয়কে চেনো? দস্তয়ভস্কি?
এরা তো আরো বেণীমাধব।
কাদম্বরী দেবী?
শুনেছি, লোকে ইনাকেও বেণীমাধব ডাকত।
রবিশংকর বল নামে কাউকে মনে পড়ে কি?
অসম্ভব মনে পড়ে। ইনি এক সাংঘাতিক বেণীমাধব। ইনি বলতেন, ‘কিসসা করার ক্ষমতা আল্লা যাকে দেয়, তার জীবন জাহান্নাম করে দেয়।’
কিসসা জিনিসটা কী?
এটাও একপ্রকার বেণীমাধবই।
কেমন?
যেমন কিসসা, কলা, কবিতা।
আর কবুতর?
কবুতরকেও বেণীমাধবের দলে ফেলে দেয়া যায়। তবে, এরা ততটা অতিশয় বেণীমাধব না।
অতিশয় বেণীমাধব না আবার কেমন?
বাদ দাও।
কী?
অতিশয়োক্তি।
তাহলে বেণীমাধবের কী হবে?
কিছুই হবে না। আমরা প্রায় প্রত্যেকে একটা করে বেণীমাধব বুকে নিয়ে শুয়ে থাকি। ঘুমাতে যাই।
তখন ভিতরকার বেণীমাধবটি কী করে?
কী করে আর, সেও হয়তো ঘুমায়। অথবা ঘুমায় না।
একটা লোক একইসাথে ঘুমায় আবার ঘুমায় না, এটা কী করে সম্ভব? ‘কোনো জিনিসের পক্ষে একইসাথে হওয়া ও না-হওয়া অসম্ভব।’ বেণীমাধবটি কি ত্রিশঙ্কু অবস্থায় আছে?
না।
তবে?
তবে কিছু না।
বেণীর কী হলো পরে?
কী আর হবে, পুতুল-পুতুল খেলা হলো, মেঘে-মেঘে বেলা হলো।
পুতুলখেলা জিনিসটা কী?
পুতুলখেলা তো পুতুলখেলাই।
কে পুতুলখেলা?
বেণীমাধব।
তাহলে রবীন্দ্রনাথ?
ইনিও এক পুতুলখেলা।
দস্তয়ভস্কি? গোগল?
এরা তো আরো আগে পুতুলখেলা।
এখন?
এখন কিছু না।
কেন কিছু না?
কিছু না কিছু না।
তাহলে বেণী এখন কী করবে? কোথায় যাবে?
সে এক গভীর রাতের কথা ভাবতে-ভাবতে নদীতীর ধরে হাঁটতে পারে। নদীর কথা ভেবে পাখির কাছে চলে যেতে পারে। পাখির কথা রেখে তৃষ্ণার্ত ঘোড়ার কাছে, ঘোড়া ছেড়ে যজ্ঞডুমুরের কাছে, যজ্ঞের ডুমুর পেছনে ফেলে কোনো তারাবাইন মাছের কাছে চলে যেতে পারে। কিন্তু কোত্থাও সে যায় না, সে পড়ে থাকে তার উদ্ভট আঁধারের কাছে।
এই মুহূর্তে বেণী কী করছে?
এই মুহূর্তে সে এক অতিকায় হুলো-বিড়ালের সাথে কথা বলছে।
সে কি, বিড়ালের সাথে মানুষ কিভাবে কথা বলে?
মানুষের সাথে বিড়াল যেভাবে কথা বলে। মানুষের সাথে মানুষ যেভাবে কথা বলে।
কিভাবে?
কোনোভাবে না।
কেন?
কথা বলার আবার ভাব কী!
ভাব না থাক, ভঙ্গিমা তো আছে।
তা আছে।
কী আছে?
ঐ তো, ভঙ্গিমা আছে।
কিসের?
কথা বলার।
কথা জিনিসটা আসলে কী?
কথা তো কথাই।
সেটা আবার কীরকম?
মানুষ যেরকম মানুষ। পাখি যেরকম পাখি। আপেল যেরকম আপেল। গাছ, নদী, ফুল, পাহাড় যেরকম গাছ-নদী-ফুল-পাহাড়। রং যেরকম রঙিন। শাদাকালো যেরকম শাদাকালো। আকাশ যেরকম বিশদ। উপগ্রহ যেরকম উপগ্রহ। জবাফুল যেরকম জবাফুল।
কত্ত কথা রে…
হ্যাঁ, অনেক কথা।
কথার পিঠে কথা?
হ্যাঁ। দিগন্ত বিস্তৃত কথা।
মাঠের পরে মাঠ?
হ্যাঁ।
শূন্যতার পর শূন্যতা?
হ্যাঁ।
অন্ধকারের পর অন্ধকার?
হ্যাঁ।
তাহলে মাঠের ওপারে কী?
ওপারেও মাঠ।
শূন্যতার ওপারে?
অপার শূন্যতা।
অন্ধকারের ওপারে?
অধিক অন্ধকার।
শূন্যতায় কথা প্রস্ফুটিত হয় কী রূপে?
ঢেউ-রূপে। তরঙ্গ-আকারে।
মাঠের মধ্যে কথারা কিভাবে শুয়ে থাকে?
মাঠের কথারা ঘাসের বেদনা হয়ে শুয়ে থাকে। নৈঃশব্দ্য ভাষা তাদের।
অন্ধকারে কথারা কী প্রকার?
অন্ধকারে কথারা ভুতগ্রস্ত। তখন তাদের আর আকার-প্রকার নাই।
তারপর হুলো-বিড়ালটির কী হলো?
বেণীর সাথে কথা শেষ হতেই বিড়ালটি মরে গেল।
এত সহজে?
মৃত্যুর চেয়ে সহজ কী আছে আর।
তারপর?
তারপর কথায়-কথায় রাত।
তারপর?
রাত পেরিয়ে সকাল।
সকালে বেণী কী করে?
বটগাছের ডালে বাঁধা এক টুকরা লালকাপড়ের ছবি তুলে আনে।
দুপুরে?
দুপুরে বেণীকে কোথাও দেখতে পাওয়া যায় না। সে কী করে তা জানার উপায়ও থাকে না।
বিকেলে কি বেণী হাঁটতে বের হয়?
না। বিকেলটা তার নিজস্ব। এবিষয়ে সে কিছুই বলতে চায় না।
সন্ধ্যার পরে?
সন্ধ্যা হলে বেণী নিমগাছের ডালে ঝুলে থাকা বিড়ালের হাসি পর্যটন করতে যায়।
রাতে?
রাতেই বেণী বেশি সপ্রতিভ। কিন্তু আঙুল গুনে দেখে দিনতারিখ কিছু ঠিক নাই, আত্মীয়-পরিজন এমনকি রবীন্দ্রনাথের নাম পর্যন্ত ভুলে গেছে। রাত গভীর হলে বেণীর খুব ঘুম পায়। কিন্তু না-ঘুমিয়ে বেণী তখন পড়ে।
কী পড়ে সে?
‘আর চোখে জল’।
আর চোখে জল কীরকম?
কেঁদে-কেঁদে নদী ভাসানো। তারপর সাঁতরে পেরিয়ে যাওয়া সে অশ্রু-সরোবর।
এ-জীবনে বেণী আর কী করতে চায়?
সে আসলে প্রতিদিন-প্রতিঘণ্টায় বনমোরগের ডাক শুনতে চায়।
শুনতে কি পায়?
কোনোদিন পায় কোনোদিন পায় না।
এতে কি তার খুব দুঃখ হয়?
খুব দুঃখ হয় এমন না। তবে দুঃখ হয়।
কীরকম দুঃখ?
কোনো-কোনো দিন বনমোরগের ডাক শুনতে না-পারার দুঃখ।
আর?
কোনো-কোনো দিন বনমোরগের ডাক শুনতে পারার দুঃখ।
ভেতরে-ভেতরে বেণী এতটা নরম?
তার তো জলের শরীর, জ্বরের দেহ। তৃণ আর তরলেরে সকলে পায়, কাষ্ঠ আর কঠিনেরে পায় না কেহ।
এত কাছে তবু এতটা দূর?
হ্যাঁ। বেণী তো পেরিয়ে যেতেই চেয়েছে এতদিন ধরে এত গান-সুর।
কোন গান তার?
যে গানে অতল পারাপার।
তখন নীলকণ্ঠ পাখির কী হলো?
পাখিরে সে উড়াইয়া দিয়াছে/ নিজেই হইয়াছে পাখি/ কণ্ঠে বিষ তুলিয়া নিয়া/ নিজেরে দিয়াছে ফাঁকি/
শূন্যস্থানে রাতভর বেণী কী বসায়?
আরো শূন্যতা, অধিক শূন্যতা…
তারপর?
তারপর অতিকায় এক শূন্য।
অশ্বডিম্ব?
তাছাড়া আর কী?
শুকিয়ে যাওয়া নদীটি কী করে?
হিংসা আর হিংস্রতায় টগবগ করে। লোভ আর লালসায় লকলক করে। পাপে আর দ্বেষে জ্বলজ্বল করে।
এত হিংস্রতার কারণ? হিংসাই বা কেন?
হিংস্রতার কারণ হিংস্রতা। হিংসার কারণ হিংসা।
এসবের কোনো মীমাংসা নেই।
ইদিপাস কমপ্লেক্স জানো না?
জানি।
ইগো?
জানি।
ইমাগো?
জানি।
ইনি কোন দিকে যায়?
ইনার কোনো বিশেষ দিক নেই তবে নিশানা পরিষ্কার। ইনি যেদিকে যায় সেদিকেই যায়। পাগলা কুত্তা লেলিয়ে দিয়েও ইনাকে আটকানো যায় না। ইনি মহাউন্মাদ। ইনি পরাক্রম। ইনি মহা ছলাকলা।
উন্মাদের নিশানা এত পরিষ্কার?
উন্মাদও নিজের ভালো বোঝে।
উন্মাদ কি পাগলের অধিক কিছু?
ততোধিক।
কত?
যত পর্যন্ত গোনা যায় না আর।
তারপর?
তারপর ভরাট নদীটি গর্জিয়া উঠিল।
তারপর?
তারপর সঞ্চারিল প্রাণ, আছে যত গান।
আবার গান?
গান তো প্রস্ফুটিত ফুলের ন্যায় ফুটিয়া রহিয়াছে জনমভর বেণীর উঠানে। বেণীরে আর কে পায় তখন।
কেউ পায় না?
না।
কেউ না?
না।
বেণী কি তবে নিজেরেও হারায়?
না।
বেণী জাগিয়া থাকে বেণীর নিজের ভেতর।
বেণীর ভেতরে কী আছে আর?
কিছু নাই। আবার সব আছে।
যেমন?
খেলা আছে ধুলা আছে, কাব্য আছে কলা আছে, ধরা আছে ছোঁয়া আছে, ভুত আছে ভবিষ্যৎ আছে, জীবন আছে মৃত্যু আছে, আকাশভরা তারা আছে, তারাভরা আকাশ আছে, ঘুড়ি ও লাটাই আছে, বড়শি ও ছিপ আছে। মসলার বন আছে। মীর ও গালিব আছে।
এতকিছু নিয়ে বেণী ঘুমায় কিভাবে?
বেণীকে কখনো ঘুমাতে দেখেছে একথা তার সবচেয়ে কাছের শত্রুও বলতে পারে না।
তার ঘুম নাই?
আছে।
ঘুমায় না কেন?
ঘুমায় তো।
জেগে?
হ্যাঁ।
বেণীর স্বপ্ন?
তারাও জেগে ঘুমায়। ঘুমিয়ে-ঘুমিয়ে জাগে।
বেণীর ছায়া?
ছায়া তার অতন্দ্র প্রহরী।
তার চোখ?
চোখের কাছে অনেক ঋণ।
তার মুখ?
মুখে শতাব্দীর জড়তা।
বেণী কোনো কথাই বলে না?
বলে।
কী?
বলে যে ‘কিচ্ছু বলার নাই’।
বেণী তাহলে বাঁচে কিভাবে?
ঘোড়ায় চড়ে।
কী খায়?
হাওয়া।
কাজ নাই?
হাঁটে।
কোথায়?
রেললাইন ধরে।
কতদূর?
যতদূর চোখ যায় না।
পাথরের ওপর হাঁটতে বেণী কষ্ট অনুভব করে না?
রক্ত অনুভব করে।
রক্ত?
হ্যাঁ।
কোথায়?
কোথায় না।
কোথায় কোথায়?
সর্বত্রই।
বিশ্বের সবখানে?
হ্যাঁ। ভুবনভরা রক্তধারা।
আকাশ?
আকাশভরা রক্ততারা।
বেণী রে, ও বেণী…
কী?
আজ এই রইল।
কেন?
রক্ত এত আলো এত খর রৌদ্র, চোখ পুড়ে যায়।
তাহলে থাক। না?
হ্যাঁ। আর না।

মাহবুব অনিন্দ্য

জন্ম ০১ ডিসেম্বর, ১৯৮৪; পাটেশ্বরী, কুড়িগ্রাম। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে ২০০৯ থেকে সেখানেই নিয়োজিত আছেন শিক্ষকতায়।

প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ—
ঘাসফুল অপেরা [চৈতন্য, ২০১৬]
অপার কলিংবেল [বেহুলাবাংলা, ২০১৮]

ই-মেইল : mahbubanindo@gmail.com

Latest posts by মাহবুব অনিন্দ্য (see all)