হোম ভ্রমণ মালয়েশিয়া ভ্রমণ : সামান্য দেখা

মালয়েশিয়া ভ্রমণ : সামান্য দেখা

মালয়েশিয়া ভ্রমণ : সামান্য দেখা
494
0

পর্ব- ১

যাব কি যাব না, এ অনিশ্চয়তার মাঝেই যেতে হলো মালয়েশিয়া। সে-দেশে যাবার বাসনা করেছিলাম কোনো এক সময়। সংবাদ মাধ্যমে, মানুষের গল্পকথায় মালয়েশিয়ার উন্নতির খবর জেনে ইচ্ছেটা তৈরি হয়। কিভাবে এতদূর এগুলো দেশটি তা দেখা। আর মাহাথিরের এত কৃতিত্ব কী কারণে। কিন্তু সময় আর সামর্থ্য এক না হওয়ায় যাওয়া হয় না কোথাও। অবশেষে এক ধরনের ঝামেলা মাথায় নিয়ে গেলাম। সময়টি ২০১৯ সালের মে মাস। পবিত্র রমজান চলমান। রমজান হওয়ায় নিজেও একটু দোনামোনার মধ্যে ছিলাম—যাব কি যাব না ভেবে। ইতোমধ্যে ঝড় ফণী ঝাপটা মেরে গেল। তারপরও যাবার সময় এক ধরনের ঝড়ের পূর্বাভাস। ব্যক্তিগত সমস্যায় মালয়েশিয়া নয়, ঢাকার বিমানবন্দরে প্রথমে না যাবারই সিদ্ধান্ত। আমার পাসপোর্টের মেয়াদে ঝামেলা ছিল। ট্যুর কোম্পানির একজন বলল, যাওয়া যাবে। অবশেষে নির্ধারিত দিন ১১ মে চলে যাই বিমানবন্দর। বেশ কিছু সময় বিমানবন্দরে অপেক্ষা। আমাদের দলের সদস্যদের ইমিগ্রেশন শুরু হলো। খুব ধীরে ধীরে কাজ হচ্ছে দেখে সবাই খুব বিরক্ত। আরও দ্রুত হওয়া প্রয়োজন বলেন সবাই। লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন কত দেশে যাবার জন্য কত মানুষ। মধ্যপ্রাচ্য, ইংল্যান্ড, আমেরিকা, সিঙ্গাপুরসহ নানা দেশে। আমরা যখন লাইনে, তখন বেশিরভাগই ছিল মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের যাত্রী। ইমিগ্রেশন চেকআপ দেরি হওয়াতে সবাই কিছুটা বিরক্ত হচ্ছিল। আমার সঙ্গী সবারই শেষ হলে আমাকে বসিয়ে রাখে ইমিগ্রেশন কর্মীরা। আমরা ম্যালিন্দো এয়ারলাইনসের যাত্রী। এয়ারলাইনসের সুপারভাইজরকে ডাকা হলো আমার সমস্যা সমাধানে। তার নাম তোফায়েল। তিনি আমাকে বোঝান যে আমার কী সমস্যা। তিনি বলেন—‘স্যার আপনাকে হয়তো আবার বাড়ি ফেরত যেতে হতে পারে, তারপরও আমি একটু চেষ্টা করে দেখি।’ তোফায়েল সাহেব আমাকে দেখিয়ে দেখিয়ে মালয়েশিয়ার ইমিগ্রেশন টিমের কাছে মেসেজ পাঠালেন আমার বিষয়ে। আমাকে বললেন একটু সময় অপেক্ষা করুন। আমি বললাম—কোনো সমস্যা নেই। সুপারভাইজরের চমৎকার ও অসামান্য ভদ্রজনোচিত ব্যবহারে আমি অত্যন্ত মুগ্ধ হই। মনে মনে ভাবি আর আমার বাইরে না গেলেও চলবে। এর মধ্যে তার মেসেজের উত্তরও চলে আসে। সবার ইমিগ্রেশন শেষ হলে আমাকে তোফায়েল সাহেব ফোন করে বললেন—‘আপনার বিষয়ে পজেটিভ উত্তর এসেছে, তবে আপনি মালয়েশিয়াতেই ভ্রমণ করতে পারবেন। ইন্দোনেশিয়া পারাপারের দায়িত্ব তারা নিচ্ছে না।’ আমার সঙ্গী দু-একজন বলল—‘সমস্যা নেই দেন’। তারপর সবার শেষেই আমার চেকআপ সারতে হলো। কিন্তু আমার আগে কেউ সিকিউরিটি জোনে যেতে পারল না। কারণ অনেক ভিড় ও লম্বা লাইন। অনেকক্ষণ দাঁড়াতে দাঁড়াতে মেঝেতে অনেকেই বসে পড়েছিলেন। এর মধ্যে লক্ষ করি সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনস-যাত্রীদের বেহাল দশা। বিমান ছাড়ার সময় হলেও চেক-আপ সম্পন্ন হচ্ছে না। কেউ কেউ ক্লান্তি সহ্য করতে না পেরে কোথায়ও হেলে দিয়েছেন শরীর। একসময় জটলা শেষ হলো। বিমানে বোর্ডিং করাতে সিঙ্গাপুরগামী যাত্রীদের নিয়ে দৌড়ঝাঁপ শুরু হলো। এখানে প্রমাণ পাওয়া গেল—আমরা এ কাজে কত অপরিপক্ব। আরও প্রমাণ পেয়েছিলাম মালয়েশিয়াসহ অন্য দেশ ভ্রমণে। সে আরেক ভিন্ন গল্প।


কুয়ালালামপুর থেকে লঙ্কাউই যাবার সরাসরি কোনো ব্যবস্থা নেই। বিমানে বা জাহাজে এখানের সাথে কুয়ালালামপুরের যোগাযোগ।


অবশেষে আমরা বিমানে উঠে বসতে পারলাম। প্রথমে লক্ষ করি, আমাদের দেশের বাসযাত্রীদের মতোই ম্যালিন্দো যাত্রীদের অবস্থা। নির্ধারিত টিকেট থাকা সত্ত্বেও যাত্রীদের জায়গা না পাওয়া ও অন্য আসনে বসা ইত্যাদি ঝামেলা। কিছু সময় গেলে তা বন্ধ হয়, কিন্তু কথার শব্দ থামে না। ম্যালিন্দো বিমান চলছে তবে যাত্রীদের হৈচৈ খেয়াল করার মতো। বোঝা গেল এরা সকলেই কাজ করেন মালয়েশিয়াতে। আন্তর্জাতিক কোনো বিমানে এরকম কোলাহল মানানসই মনে হলো না। সবই নীরবে সহ্য করতে হলো, কারণ তারা আমাদেরই আত্মীয়স্বজন। তারা কষ্ট করে বৈদেশিক মুদ্রা পাঠাচ্ছেন দেশে। ফলে, আমরা ভালো আছি। রাতের ভ্রমণ হলেও ঘুমাতে পরি নি যাত্রীদের অতিকথন ও কণ্ঠশৈলীতে। এ হৈচৈ-এর মধ্যেই টের পেলাম আমরা মালয়েশিয়ার কাছাকাছি পৌঁছে গেছি। তখন বিকট ঝাঁকুনি অনুভূত হয়। বেশ শক্ত ঝড়েরই আভাস। বিমানের ক্যাপ্টেন মনে হয় সেটাই বললেন, কারণ মালয় ভাষার ভাষ্য বুঝতে পারি নি। তবে বিমানের ঝাঁকুনি ও ওঠানামার বদৌলতে তাই মনে হলো। বিমানের ক্রুও বেল্ট বাঁধার জন্য ঘোষণা দিলেন। ঝড়ের এ পথটুকু অতিক্রমণের পর বিমানের জানালা দিয়ে লোকালয়ের আলো দেখা গেল। মনে হলো এতক্ষণ হয়তো আমরা কোনো সমুদ্র পথ অতিক্রম করছিলাম। ক্লান্তি খুব নেই, তবে শরীরে ঘুমের চাপ। ওই জানালা দিয়েই ভোরের আভাস দেখা গেল, তাই ঘুমানোর আর কোনো সুযোগ নেই। ঘড়ির কাঁটা দেখে বুঝলাম কুয়ালালামপুরের কাছাকাছি আছি।

খুব ভোরবেলা কুয়ালালামপুর বিমানবন্দরে পৌঁছে যাই। কুয়ালালামপুরে সামান্য বিরতিও নেই। ভোরবেলার বিরতি ভালোলাগার ছিল, কিন্তু সে সময়টুকুও নেই। নেমেই আবার দৌড় দিলাম লঙ্কাউই বিমানে ওঠার ইমিগ্রেশনের পথে। চোখে মুখে ক্লান্তি, টয়লেটে যাবারও কোনো সাড়া নেই। যা না থাকাটা এ সময়ে দরকারি ছিল। লঙ্কাউই-র পথে রওয়ানা দিতে হবে। অল্প সময়ের মধ্যেই আবার চেক-আপ সেরে কুয়ালালামপুর থেকে লঙ্কাউইমুখী বিমানের প্রবেশপথের দিকে চলতে হলো। একই বিমান—ম্যালিন্দো।

প্রচণ্ড ঘুমের চাপের ভেতর অল্প সময়ে পৌঁছে গেলাম লঙ্কাউই। উড়োপথে বিমান নামার সময়ই জানালা দিয়ে লক্ষ করি অপরূপ প্রকৃতির সৌন্দর্য। পাহাড় ও জলের কোনো মিলনস্থলে নামছি। গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টির মধ্যেই বিমান থেকে নামতে হলো। বিমানে কুয়ালালামপুর থেকে লঙ্কাউই মাত্র ৪৫ মিনিটের পথ। পরে জেনেছি কুয়ালালামপুর থেকে লঙ্কাউই যাবার সরাসরি কোনো ব্যবস্থা নেই। বিমানে বা জাহাজে এখানের সাথে কুয়ালালামপুরের যোগাযোগ। সড়কপথে অনেক দূর ঘুরে যেতে হয়, তাও না কি ফেরি পারাপার রয়েছে। যা-হোক সকালবেলায় পৌঁছে যাই লঙ্কাউই বিমানবন্দরে।

langkawi-airport 2
লঙ্কাউই বিমানবন্দর

বিমান থেকে নেমে অপেক্ষা ভ্রমণবাসের জন্য। যা আমাদের নিয়ে ঘুরে বেড়াবে যে ক-দিন এখানে থাকব। কিছুক্ষণ পর ইশারা পেলাম আগে বাড়তে হবে। নির্দেশনা অনুযায়ী ভ্রমণবাসে উঠে বসলাম। কিন্তু এ সকালবেলায় কোনো আবাসিক হোটেলে ওঠা যাবে না। কারণ, হোটেলের চেকআউট হলো দুপুর ১২টায়। কোনো হোটেলে অবস্থান নেওয়ার আগ পর্যন্ত আমাদের ঘুরে বেড়াতে হবে। এ কারণে ওই সময়ে কিছু স্থান দেখা ও পথে পথে ঘুরে বেড়ানো ছাড়া কোনো উপায় নেই। তা-ই হলো। ফলে ওই সময়টুকু কাজে লাগানো। সুতরাং, ভ্রমণবাস আমাদের নিয়ে যাচ্ছে কোথাও।


হিশাম খুব স্বচ্ছন্দে ইংরেজি ভাষায় বলে যাচ্ছে, আবার মাঝে মাঝে সে কিছু মিথের প্রসঙ্গ বর্ণনা করছিল।


বাসে পরিচয় হলো ভ্রমণগাইডের সাথে। লঙ্কাউই-এর অধিবাসী মো. হিশাম। হিশাম প্রথমেই আমাদের অভিনন্দন জানায় তার দেশে। প্রথম দর্শনেই মনে হলো সে যথার্থ একজন গাইড। সে কিছু বর্ণনা দিতে থাকে যে, কোথায় কোথায় কী কী আমরা দেখতে যাব। এ ক-দিন কোথায় কোথায় আমরা ভ্রমণ করব। হিশাম খুব স্বচ্ছন্দে ইংরেজি ভাষায় বলে যাচ্ছে, আবার মাঝে মাঝে সে কিছু মিথের প্রসঙ্গ বর্ণনা করছিল। হিশামের ইংরেজি উচ্চারণ ভালো না হলেও তার মধ্যে স্বতঃস্ফূর্ততা ছিল। সে খুব ধীরে ধীরে এ মালয়েশিয়ার সমাজ ও সুন্দর স্থানগুলোর বর্ণনা দিচ্ছিল। এর মধ্যে আমাদের দলের কোনো কোনো সদস্য তাকে অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্ন করেছিলেন। যা কোনোভাবেই যৌক্তিক বা প্রাসঙ্গিক ছিল না। সে প্রথমেই শুরু করেছিল লঙ্কাউই সম্পর্কে বর্ণনা দিয়ে। কিন্তু ভ্রমণকারীদের অস্থিরতা, বিচ্ছিন্ন আলোচনায় কিছুটা ছেদ পড়ল হিশামের কথায়।

আমাদের অভ্যাসবশত আমরা চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করি। এতে হিশাম বলতে গেলে কিছুই প্রকাশ করতে পারে নি। কিন্তু নিজেও মেনে নিতে পারছে না বুঝলাম। দলের কয়েকজন উলটো-পালটা প্রশ্নও জিজ্ঞেস করতে থাকেন হিশামকে। সে খুব বিরক্ত হচ্ছিল কিন্তু মেনে নিচ্ছিল না। সে পেশাদার গাইড বলে তার বিরক্তির প্রতিক্রিয়া নিজের ভেতরে চেপে রাখে। বুঝে নিলাম আমাদের দলভুক্ত কয়েকজন নিজেদের জাহির ও স্মার্ট প্রমাণ করতে এমন এলোমেলো কথা বলেছিলেন। নিজে লজ্জায় মাথা নুয়ে বসেছিলাম। আমার বিরক্তি দেখে আমাদের টিম লিডার কিছু শক্ত কথা বলতে বাধ্য হন। এলোমেলো কথা আর চিৎকারের কারণে হিশামের বর্ণনা আর স্বতঃস্ফূর্ত থাকে নি। সে কোনো রকমে সময় কাটানোর চেষ্টা করেছিল মাত্র। অথচ, আমরা নতুন হিসেবে কিছু তথ্য তার মাধ্যমে পেতে পারতাম। কিন্তু আমাদের জ্বালায় আর সে এগুতে পারল না।

TOUR GUIED HISAM 2
ট্যুর গাইড হিশাম

একটি আন্তর্জাতিক ভ্রমণকারী দলের জন্য গাইড যে মানের হওয়া দরকার তা হিশামের মধ্যে ছিল। সে সেভাবেই আচরণ করেছে। আবার কথার মাঝে মাঝে কৌতুকও করেছে সে। সে অনায়াসে বলেছে যে, কোনো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্রাজুয়েট হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করে নি। তার যা অর্জন সে অকপটে তা বলেছে। সময় কাটানোর আয়োজনে আমাদের নিয়ে যাওয়া হলো প্রথমেই একটি ওরিয়েন্টাল ভিলেজে। লংকাউইতে লামানপাদি, আন্ডার ওয়াটার ওলার্ল্ড, ওরিয়েন্টাল ভিলেজ, প্যানোরমা লংকাউই, তেলেগা জু, জিওফরেস্ট, ঈগল স্কয়ার, পেনাং বিচ, বারাবাসা বিচ, হোপিং আইলেন্ড, ইত্যাদি দেখতে দেখতে লংকাউই-এর সৌন্দর্য অনুধাবন করা যাবে।


২ পর্বের লিংক

স্বপন নাথ

জন্ম ৪ মে ১৯৬৮; বড়লেখা, মৌলভীবাজার। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর, বাংলা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়; এমফিল, ভাষাবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

পেশা : শিক্ষকতা; উপপরিচালক (গবেষণা ও তথ্যায়ন), নায়েম, শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

প্রকাশিত বই :
প্রবন্ধ—
চিন্তা ও জগৎ : সাহিত্য সংস্কৃতি [প্রবাস প্রকাশনী, যুক্তরাজ্য ২০০৭]
কবিতার নন্দনবিশ্ব [অনিন্দ্য প্রকাশ, ঢাকা ২০১৭]
কথার বুনন [জিনিয়াস পাবলিকেশন্স, ঢাকা ২০১৯]
ছিন্ন কথামালা [জিনিয়াস পাবলিকেশন্স, ঢাকা ২০১৯]

কবিতা—
রৌদ্র ও বৃষ্টিতে মায়াহরিণ [ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ, ঢাকা ২০০৭]
জলৌকা চোখের চাতাল [ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ, ঢাকা ২০১০]
নির্জন বিচালির ডানা [কবি প্রকাশনী, ঢাকা ২০১৩]
নখের আউঠা [উৎস প্রকাশন, ঢাকা ২০১৪]
নানকার ধানবীজ [উৎস প্রকাশন, ঢাকা ২০১৫]
একলব্যের ছিন্ন আঙুল [নাগরী, সিলেট ২০১৬]
সংশয়ের বসতি [নাগরী, সিলেট ২০১৭]
গ্রাম বজ্রযোগিনী [জিনিয়াস পাবলিকেশন্স, ঢাকা ২০১৯]

ই-মেইল : rudro71@gmail.com