হোম ভ্রমণ মালয়েশিয়া ভ্রমণ : সামান্য দেখা

মালয়েশিয়া ভ্রমণ : সামান্য দেখা

মালয়েশিয়া ভ্রমণ : সামান্য দেখা
264
0
৮ পর্বের লিংক

পর্ব : ৯

ও মেয়েটি ভেবে দ্যাখো, যদিও তোমার প্রেম, স্বামী ছিল
চুমু খেয়েছিলে তুমি এ-কবিকে
পাখাহীন দগ্ধ ছোট ঘরে—মনে করে দ্যাখো।
মনে করে দ্যাখো তুমি চেয়েছিলে শান্ত বাথরুম
বলেছিলে? ‘থেকে যাই’।— মনে করে দ্যাখো।
এ কবির কবিতাও অযথা পছন্দ করেছিলে—
ঠোঁট দিয়ে চাপছিলে এই ঠোঁট
মেলে ধরেছিলে বুক—ও মেয়েটি, মনে করে দ্যাখো।
[ভাস্কর চক্রবর্তী]

কবির কথা স্মরণ করছি এ কারণে যে, মনে মনে অনেক সৌধ নির্মাণ করা যায়। তা-ই করেছিলাম প্রকৃতির পথে। নাগালে পেলেই কি সব অর্জন হয়? হয় না, জীবন বড় বিচিত্র। ঝরাপাতার মতো ছেড়ে দিতে হয় জীবনের কত কামনা-বাসনা। আর প্রতিটি পদক্ষেপে যেন ফালতু কিছু সতর্কতা। সভ্যতারই নামে আবার সভ্যতাবিমুখী কত না বিস্তার। এ স্ববিরোধিতা নিয়ে কত না গর্ব। না-হলে খাদে পড়ে যাওয়া খুবই স্বাভাবিক। পথ চলতে চলতেই জানাবোঝা হয় অনেক। চলছি আবারও প্রকৃতির কাছে। আগেও বলেছিলাম যেখানে যা কিছু করা প্রয়োজন মালয়েশিয়া তা-ই করছে। বিশেষত পর্যটন খাতে। আমাদের হয়তো সকলেরই স্মরণ আছে ১/১১, ২০০১-এর ঘটনার পর পৃথিবীর রাজনীতি পালটে যায়। এ তো নিকট অতীতের ঘটনা। ইতিহাসে এমন ঘটনা কালের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী আরও ঘটেছে। তবে ১/১১-এর ঘটনার প্রভাব সর্বত্রই ছুঁয়ে যায়। বাণিজ্য, অভিবাসন, বিশেষত পর্যটন শিল্পে মারাত্মক মোড় পরিবর্তন ঘটে। থমকে দাঁড়ায় সবকিছু। অনাকাঙ্ক্ষিত সন্ত্রাস ছড়িয়ে পড়ে সারা বিশ্বে। আর্থ-রাজনৈতিক আঘাত আসে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে। মালয়েশিয়াসহ নানা দেশ এর বাইরে থাকে নি। সারাবিশ্বে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ফলে, সে-সময় ঘরের বাইরে চলাফেরায় কেউ নিরাপদ মনে করত না। এ কারণে দেশে দেশে মানুষের চলাচল সীমিত হয়ে পড়ে। ওই সময় মালয়েশিয়া বুদ্ধিমত্তার সাথে চালু করে ইসলামি ট্যুরিজম। এর মাধ্যমে নিসর্গ, প্রযুক্তি ও শিল্পখাতে উন্নয়ন দিয়ে আকৃষ্ট করে সারাবিশ্ব। এর ফাঁকে বিভিন্ন প্যাকেজ ও সুবিধা অফার করে সারাবিশ্বে। এ দিয়ে মালয়েশিয়া যে এগিয়ে আসে আর ফিরে তাকাতে হয় নি। মালয়েশিয়া তার সৌন্দর্য, খাবার, আতিথেয়তা, বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ ও সংস্কৃতি এবং অগ্রসরমান প্রযুক্তি ইত্যাদির উদাহরণে বিশ্বেকে আহ্বান জানাতে সমর্থ হয়। এর ফলে বর্তমানে মালয়েশিয়া পর্যটন সংস্কৃতিতে কয়েক ধাপ এগিয়ে রয়েছে।


জেনটিং-এ যাবার পথটাই অনেক আনন্দের। পথের দু-পাশে কী এক মায়াবী পরিবেশ, মাঝখানে নীরব রাস্তা। 


আজ যাচ্ছি জেনটিং, যে জায়গাটি পর্যটকদের কাছে খুব আকর্ষণীয় এক এলাকা। জেনটিং যাবার পথে আমি কী এক প্রয়োজনে গাইড হাসানকে—‘ব্রাদার হাসান’ বলে সম্বোধন করেছিলাম, তখন সে উত্তর দেয় নি। বরং তার চোখে মুখে বিরক্তির ভাব লক্ষ করেছি। আমি বুঝতে পারি নি কী আমার অপরাধ বা সমস্যা কী। তা লক্ষ করেছেন আমাদের প্রতিনিধি। বুঝলাম, হাসান আমার ওপর কী কারণে বিরক্ত। তবে কারণ বুঝতে পারি নি। ওই প্রতিনিধি এক সময় আমার কানে ফিসফিস করে বলেছেন হাসানকে আর ‘ব্রাদার হাসান’ বলবেন না। কি সমস্যা? যা ঘটেছে, তা আমার জানা ছিল না। তিনি বলেন,—মালয়েশিয়াতে কেউ অমুক ভাই, অমুক আপা সম্বোধন পছন্দ করে না। নাম ধরে ডাকলে তারা সন্তুষ্ট হয়। তখন থেকে তাকে ‘মি. হাসান’ বলেই চালিয়েছি।

কুয়ালালামপুর শহর থেকে প্রায় ৫০ কিমি দূরে জেনটিং হাইল্যান্ড অবস্থিত। জেনটিং-এর পথে যাবার সময় পাহাড়ি আঁকাবাঁকা ও পরিচ্ছন্ন রাস্তা এবং নিসর্গ দেখে আশ্বস্ত হলাম। দু-পাশের বনবনানী দৃষ্টি টেনে নেয়। জেনটিং-এ যাবার পথটাই অনেক আনন্দের। পথের দু-পাশে কী এক মায়াবী পরিবেশ, মাঝখানে নীরব রাস্তা। এ নিবিড়, ঘন নিসর্গের পথে বার বার যেতে ইচ্ছে করবেই। মাঝে মাঝে সবুজ পাহাড় তার পুরো সৌন্দর্য যেন প্রকাশ করছে। আর হাতছানি দিয়ে ডাকছে। এসব থাকলে আর পর্যটনের দেশ বানাতে কে আর অপেক্ষা করে। এমন দৃশ্য দেখতে দেখতে একসময় পৌঁছে গেলাম জেনটিং টারমিনাল। যেখান থেকে উঁচু স্কাই এভিনিউতে ক্যাবল কারে যেতে হয়। এ স্থানটি বাস বা রেল স্টেশনের মতোই। রয়েছে গাড়ি পার্কিং-এর নির্ধারিত স্থান। আছে আরাম দায়ক বসারও জায়গা। একটি বড় সুরম্য ছাউনি তৈরি করা আছে। রয়েছে উপরে ওঠা-নামার অ্যালিভেটর। প্রতিদিন অনেক পর্যটক এখানে আসা-যাওয়া করে; কিন্তু অদ্ভুত বিষয় হলো, কোনো ময়লা আবর্জনা নেই। পরিচ্ছন্ন, চমৎকার সুন্দর পরিবেশ। গোটা পরিবেশ পর্যটকদের অভ্যর্থনা জানাতে প্রস্তুত। উপরে ওঠে পাওয়া যায় একটি ছোট শপিংমল। এর মধ্য দিয়ে ক্যাবলস্টেশনে যেতে হয়। ওখানের নিরাপত্তা রক্ষীরা সবসময় প্রস্তুত ও সচেতন। লোকজন যেতে আসতে যেন কিছু কেনাকাটা করে, এমনভাবে শাপিংমল বানানো হয়েছে। এত লোকজনের মধ্যে এর ব্যবস্থাপনা আর এর টয়লেটগুলোর কাম্য পর্যায়ের পরিচ্ছন্নতা দেখে মনে হয় অনেক কিছু। কোথায় পড়ে আছি আমরা, আর কোথায় পৌঁছে গেছে তারা, তা কি আর বলতে হয়। আবহাওয়া উষ্ণ হলেও শুরু হয় বৃষ্টি। বৃষ্টি বৃষ্টি পরিবেশ ভালোই লাগছে। শীতল হলাম খানিকটা।

69469341_909819782730331_1500204279464460288_n
জেনটিং টারমিনাল

জেনটিং পৌঁছে সময় নষ্ট না করে যখন টিকেট কেটে ক্যাবল কারে উপরে উঠছি তখন ভালোই লাগছিল। বৃষ্টি ঝরা আর ক্যাবল যাত্রীরা জড়োসড়ো হয়ে বসে আছি কারে। পরপর কয়েকটি মেঘের গর্জন তখন এক ভয়ার্ত পরিবেশ সৃষ্টি করে। ওই সময় ক্যাবল চলমান ছিল শূন্যতায়। মালয়েশিয়াতে যাবার পর এত উচ্চ নিনাদের শব্দ শুনি নি। মনে হলো এই বুঝি বজ্রপাত হলো। অন্যদিকে পাহাড়ের গায়ে জমা বৃষ্টি, তা অন্য এক ভুবন। প্রচুর বৃষ্টি, একইসাথে তুমুল বাতাস। ফলে, বাইরের প্রকৃতির অনন্য সৌন্দর্য দৃশ্যমান হলেও অস্পষ্ট লাগছিল। ঝাপসার মধ্যে দেখছিলাম অনেক ইমারত সেখানে গড়ে উঠেছে। অনেক শ্রমের ফলেই যোগাযোগ ব্যবস্থা ও এসব আবাসিক ভবন তৈরি হয়েছে। যত উপরে উঠছিলাম, শুনছিলাম ভেসে আসা মিউজিকের ভারি শব্দ। বুঝলাম যেখানে যাচ্ছি সেখান থেকেই আসা বর্ষিত শব্দ।

70036808_2125250781102047_6337496047958360064_n
জেনটিং-এর বৃষ্টিস্নাত ক্যাবলকার

স্কাইভিউ আসলেই উঁচু এক স্থান। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে বেশ উঁচু। অসামান্য সুন্দর এ জেনটিং। মালয়েশিয়া সরকার এরকম পর্যটন স্থান তৈরিতে এ অবস্থানের একটি শীর্ষ বিন্দু বেছে নেয়। আর মানুষ তো উপরে উঠতে পছন্দ করে। জেনটিং-এর পাহাড়, ক্যাবল কার ভ্রমণ, থিমপার্ক, থ্রি ডি মুভি, ক্যাসিনো, হোটেল, মোটেল, শপিংমল বা উপরের স্টেশন সবই চমৎকার ও আকর্ষণীয়। ক্যাবল কার ছাড়াও গাড়ি নিয়ে উপরে ওঠার জন্য পাহাড় কেটে আঁকাবাঁকা রাস্তা তৈরি করা হয়েছে। ভিন্ন এক অ্যাডভেঞ্চার দুনিয়া জেনটিং। বলে রাখা ভালো যে, ৭০ দশক পর্যন্ত এ পাহাড় ছিল দূষণ ও হৈচৈ মুক্ত একটি এলাকা। একেবারে ভর্তি ছিল জঙ্গলে। কিন্তু আনন্দ আশ্রম বানাতে দুনিয়ার সর্বত্রই প্রকৃতিকে সংহার করা হয়েছে। পর্যটনশিল্পের বিকাশে পুরোপুরি প্রকৃতিকে বজায় রাখা যায় নি।

69539574_496607487569321_1336426924381044736_n
জেনটিং-এর প্রকৃতি

এর মধ্যেও জেনটিং-এ সুরক্ষিত রাখার চেষ্টা আছে। তবে এখানে এত পর্যটকের আনাগোনা, তাই কতটুকু বজায় আছে তা বলতে পারব না। ভাবছি, সব ভেসে গেছে—পাথর, পাহাড়, ফ্লোরাফোনা। যন্ত্রদানবের চাপে কিছু নেই। কৃত্রিম দুনিয়া বানিয়ে ব্যবসা চলছে শুধু। ক্যাবল কার অবশেষে থামার পর দেখি সুন্দর একটি প্লাটফরম। উপরের স্টেশনে পৌঁছার পর মনে হলো এ তো এক রেলস্টেশন। মানুষ কেবল নামছে আর উঠছে সেখানে। কাফকার প্যাসেঞ্জার গল্পের মতো মনে হলো—কেউ কারও দিকে তাকাবার সময় নেই। ছুটছে কেবল কী এক আনন্দের হাওয়ায়। আবার নিজের খুপরিতে ফিরে গেলে সকলেই কেমন চুপসে যায়। এ স্টেশনে প্রচুর লোকজন, হাল্লাগোল্লা, শব্দের চাপে-তাপে কিছুই বোঝা যায় না। অত্যাধুনিক লাইট-সাউন্ডের কেরামতি। স্কাইভিউতে আরেক জগৎ দৃশ্যমান। এ ভূগোলে দারিদ্র্য বলে যে কিছু আছে, তা বোঝার উপায় নেই। যেন এক সুখের উদ্যান। ওই দৃশ্য দেখলে মনে হয় পৃথিবী শুধুই আনন্দের এক জায়গা।


আমার ভেতরে হালকা এক শিহরন। এমন সুন্দরী বিদেশির সাথে আড্ডা মারছি। পুলকিত না হয়ে যাই কোথায়।


স্টেশন থেকে নামতে হয় নিচের তলায়, তবে প্লাটফরমের বাইরে গেলেই লাইট-সাউন্ডের রকমারি দেখা যায়। চারটি লেবেলে ওঠা-নামার জন্য লিফট, অ্যালিভেটর, সিঁড়ি সবই আছে। নিচে নেমে ঘুরতে হয় শপিংমলে। আর শিশুসহ সকলের জন্যই তৈরি করা হয়েছে ভিন্নজগৎ। প্রতিটি মেঝেতে রয়েছে কিছু না কিছু। শিশুদের জন্য থিমপার্ক, আদিম দুনিয়া সবই আছে। এ কৃত্রিম জগৎ ঘুরে ঘুরে দেখে আমার ভালো লাগে নি। তবে ঝলমলে দুনিয়ার জন্য সত্যি আকর্ষণীয়। আমি ভাবছিলাম, এমন স্থাপনা তৈরি করা হয়েছে বিশাল এক এলাকার প্রকৃতি নষ্ট করে। শুধু তাই নয় পাশেই লক্ষ করলাম আরেকটি বিল্ডিং নির্মাণাধীন। হয়তো কিছু একটা হচ্ছে। এর পাশে তৈরি করা হয়েছে মার্বেল পাথরের বিশাল এক ভাস্কর্য। তা দিয়ে কী বোঝানো হচ্ছে তা আমার কাছে স্পষ্ট নয়। শিল্পীই বুঝাতে পারবেন, নিজে বুঝে নিলাম—শীর্ষত্ব নির্দেশ করছে।

69924465_2332923000291309_1904061076509556736_n
পাথরের ভাস্কর্য

যা বলছিলাম, এসব ইমারত নির্মাণ আর এত আয়োজনের প্রভাব পড়েছে বহুদূর পর্যন্ত। জানা যায় এ থিমপার্ক নির্মাণের পর থেকে এখানের জীববৈচিত্র্য হুমকির সম্মুখীন হয়েছে। সত্যমিথ্যা আমি বলতে পারব না। তবে এখানের পরিস্থিতি দেখে তা সত্য বলে অনুমান করি। অনেকেই বলেছেন, জেনটিং-এর পাহাড়ে এখনও বিভিন্ন ধরনের অর্কিড পাওয়া যায়। এবং এটি নির্মাণের আগে জেনটিং ছিল বিভিন্ন ধরনের অর্কিডের রাজ্য। বিশেষত এখানের ভবনগুলো নির্মাণের মাধ্যমে প্রকৃতির অনেক কিছুই হারিয়েছে মালয়েশিয়া। ওখানের অনেকেই মনে করেন যে, জেনটিং-এর এসব আয়োজনে পরিবেশ দূষণ হচ্ছে, এবং এর প্রতিক্রিয়ায় এখানের ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে। এ বিষয়ে আলাপ করে জেনেছি, নির্মাণকাজের বদৌলতে এখানের আবহাওয়া ও পরিবেশে পরিবর্তন এসেছে এবং এর প্রভাব পড়েছে সেখানের প্রাকৃতজ গাছগাছালি, অর্কিড আর প্রাণীজগতের ওপর। এর ফলে কয়েক প্রজাতির প্রাণী আর দেখা যায় না। তবে আমরা যে পাথরের বৈচিত্র্য লংকাউই-এর জিওফরেস্টে দেখেছিলাম, এখানেও তা লক্ষণীয়। মনে হয় সে এক পাথরের দেশ। এখানেও সেই রূপান্তরিত শীলার বৈচিত্র্য রয়েছে। এখানে পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব তৈরি হলেও জেনটিং-এর অবস্থান ও আয়োজন যে কোনো ব্যক্তির পছন্দ হতে বাধ্য।

উল্লেখ্য যে, মালয়েশিয়াতে যে কয়েকটি পর্যটন এলাকা রয়েছে এর মধ্যে লংকাউই আর এ জেনটিং হাইল্যান্ড অন্যতম। বিশেষত এ জেনটিং-এ পর্যটকদের জন্য কোনো বাধা নিষেধ প্রযোজ্য নয়। পর্যটকরা এদেশীয় নিয়মের মধ্যে থেকেও ইচ্ছেমতো আনন্দ করতে পারে। মূলত, এখানে আসে সবাই আনন্দ করতেই। তারকাসমৃদ্ধ হোটেলগুলো পরিপূর্ণ থাকে সবসময়। আগে থেকে বুকিং না রাখলে সমস্যাও হতে পারে। সকল সুবিধার সাথে এখানে ক্যাসিনো তৈরি করা হয়েছে। যারা ঘরের বাইরে গিয়ে অন্যরকম সময় কাটাতে চায়, তারা মালয়েশিয়া প্রবেশ করেই জেনটিং চলে আসে।

স্কাই এভিনিউতে ঘুরতে ঘুরতে কিছুটা ক্লান্তিবোধ করছি। এর সাথে ক্ষুধাও আছে। কী করা, আমার সাথে থাকা দু-একজনের কাছে কিছু খেয়ে আসার অনুমতি নিলাম। স্কাই এভিনিউ ক্যাবলস্টেশনের পাশে রয়েছে বেশ কয়েকটি খাবারের দোকান।সেখানে খোঁজ করি রুটি জাতীয় কিছু পাওয়া যায় কি না। এখানের দোকানগুলোতে বেশিরভাগই চায়নিজ খাবার। ভাবছিলাম মালয় খাবার পেলে মন্দ হতো না। চায়না খাবার খেতে আমার একটু সমস্যা হয়। সারিবদ্ধ দোকানগুলোর শেষ মাথায় পেয়ে গেলাম মালয় খাবার। রুটি চিকেন আর সস দিয়ে একটি খাবার তারা তৈরি করে মালয়রা। খেতে খারাপ লাগে না। আবার এটি সাশ্রয়ীও বটে। ওখানে রুটি চিকেন আর এক গ্লাস কফি সংগ্রহ করে নিলাম। ক্ষুধার যন্ত্রণায় এ খাবারই খুব প্রিয় মনে হলো। ফাস্টফুড-এর দোকানের পাশে দেয়াল ঘেঁষে আবার বসার জায়গা আছে। খালি জায়গা পেয়ে বসে গেলাম। আমার পাশে বসেছিল কয়েক জোড়া তরুণ-তরুণী। আমার ধারণা একই সাথে খাওয়া হলো আবার চুটিয়ে প্রেম করাও হলো। ওরা খুব আনন্দে রয়েছে। আর এর মাঝে আমি একা নিঃসঙ্গ বসে আছি। সময়ও কম, কিন্তু এর মধ্যে একজন কথক পেয়ে গেলাম। সামনেই লক্ষ করি এক তরুণী, তারও কোনো সঙ্গী নেই মনে হলো। আমার থেকে একটু দূরে বসল, কিছু একটা খাবার হাতে নিয়ে। আমার দিকে কয়েকবার তাকিয়ে নিচু করে নিল মাথা। কারণ, আমার দিকে তাকাবার কিছু নেই। বরং যে কেউ আমার চেহারা দেখে বিরক্ত হতে পারে। বুঝলাম সে কিছু বলতে চায়। ভাবছি আমার কপালই খারাপ এ জন্য যে, কথা বলা শুরু হলেই তো ডাক পড়বে চলে যাবার। ওর সাথে কি কথা বলা যায়, এমন ভাবনা মাথায় খেলছিল। কী করব ভেবে পাচ্ছি না। ওকে কিছু বলব কি না, লোভও সামলাতে পারছি না। আবার যদি উলটো কিছু মনে করে। কারণ, আমার নাগালের ভেতরেই সুন্দর অপেক্ষমাণ।

আবার ভাবছি কিছু জানতে চাইলে বিরক্ত হয় কি না—দোনামোনায় পড়ে গেলাম। কিছুক্ষণ পর সে নিজে থেকেই শব্দ উচ্চারণ করল—হ্যালো! হয়তো তার একাকিত্ব ভুলতে। ‘আই এম সিনথি, ফ্রম ইন্দোনেশিয়া। নাইস টু মিট ইউ। ম্যা আই ইনট্রোডিউস উইথ ইউ?’ আমিও বললাম, নাইস, হোয়াই নট, অফকোর্স, উই আর টকিং অ্যাবাউট সামথিং। দিজ ইজ স্বপন, ফ্রম বাংলাদেশ, থ্যাংক ইউ। সে হাসল। আমার পাশে একটু জায়গা নিয়ে বসে গেল।

আবার জানতে চাইলাম—ডু ইউ নো বাংলাদেশ? উত্তর পজিটিভ, সে জানে। সে জানায় ইন্দোনেশিয়া থেকে এখানে এসেছে ঘুরতে। একাই এসেছে। তারপর একটু পরিচয় জানাজানি। নামের আগে পিছে কিছু আছে কি না জানতে চাই নি আমরা। আমাদের দেশে হলে কেউ আমার চৌদ্দগোষ্ঠীর চৌহদ্দি জানতে চাইত। আর সৌজন্যবোধের বেয়াদবিতে মেয়েটির বাবা মা, চাচা চাচি, খালু, খালা; কোথায় কে আছে সব জিজ্ঞাসা করত। যা-ই হোক ওসবে আমি সচেতন ছিলাম। আমি তার ব্যক্তিগত তথ্য জানতে চাই নি। মনে মনে সংকোচবোধ করছিলাম, কী এমন কথা বলি তার সাথে। তারপর একসময় আমাদের গল্প জমে উঠল। আমার ভেতরে হালকা এক শিহরন। এমন সুন্দরী বিদেশির সাথে আড্ডা মারছি। পুলকিত না হয়ে যাই কোথায়। অনেক গল্প। তার দেশের সুন্দর সুন্দর স্থান, জিনিসপত্র, লেখাপড়া, প্রেম ও দাম্পত্য ইত্যাদি। অল্প সময়ে যেন বিশ্বকে জানার চেষ্টা। অনুমতি নিয়ে জানতে চাই তার কোনো বয়ফ্রেন্ড আছে কি না? এতক্ষণে সে সশব্দে হেসে ওঠে। তার হাসিটা জানিয়ে দিল— আমার মতো আর বোকা বোধহয় নেই কোথাও। হাসিটা দেখে চমৎকৃত না হয়ে উপায় নেই। উত্তরে সে জানায় ওটা তো থাকবেই। আছে, তবে এ ভ্রমণে তার সাথে আসে নি। আসার সময় তার ফ্রেন্ড বলেছে, অন্য এক সময়, অন্য কোনো দেশে বেড়াতে তারা একসাথে যাবে। এবার যেন একাই মালয়েশিয়া ঘুরে যায়।আমি ভাবি—মেয়েটার সাহস কত! একাই বেড়াতে এসেছে। আমরা ছেলেরাই সাহস করি না, আর মেয়ে।

তো যাক, তারা পারে, আমরা পারি না। অনেক আলাপের মধ্যে মানুষের সম্পর্ক, ধর্ম, জেন্ডার সবই আলাপে আসে। অতি অল্প সময়ে আমরা খুব খোলামেলা আলাপ করতে পেরেছি। আরেকটি সুবিধা পেয়েছি এ কারণে, সে ইন্দোনেশিয়ার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পোস্টগ্রাজুয়েশন লেবেলের শিক্ষার্থী। ফলে, আমাদের সংলাপে আনন্দ ছিল। আমি অবাক হয়েছি, তার কথাবলার ধরন শুনে। আমার ভাগ্য ভালো যে, এ-রকম জ্ঞানপিপাসু এক তরুণীর সাথে দেখা হয়েছে। না-হলে ওই সীমাবদ্ধ কথামালার মধ্যে ঘুরপাক করতাম।

সিনথি অনেক হবি বা পছন্দের কথা জানায়। কফি পান করতে করতে এসব শেয়ার করি আমরা দু-জনে। মুভির কথা আলোচনায় এলে সে অনায়াসে ‘টাইটানিক’ ও ‘পারফিউম’ মুভির কথা বলে। আরও কত কী। আমিও বলি—দেখেছি। তারপর জানতে চাইলাম—এখানে কবে, কেন এল। সে শুধু ভ্রমণ করতেই এসেছে। বই পড়ার কথা বললে, জানতে চাই কোন লেখকের লেখা তার প্রিয়। অনেক নামই সে বলে। অকপটে জানায় স্বদেশীয় কবি-লেখকদের লেখা পছন্দ করে না। তবে আর কারণ জানতে চাই নি। এর মধ্যে সিনথি বলল—ভিএস নাইপলের লেখা এক সময় সে পছন্দ করত। সে পড়েছেও কয়েকটি বই। আমি প্রথমে অবাকই হলাম। আমি বললাম, আমি ভিএস নাইপল তেমন একটা পড়ি নি, খুব সামান্যই। তার লেখা কয়েকটি ফিকশন, প্রবন্ধ, আরা সাক্ষাৎকার। সে খুশি হলো আমার কথা শুনে। আমি তাকে বললাম—তুমি হয়তো জান কি না, জীবনের শেষ বয়সে মৃত্যুর কিছুদিন আগে বাংলাদেশে নাইপল এসেছিলেন। সে বলে উঠল—ওয়াও! আমাকে সিনথি জিজ্ঞেস করে—‘ডিড ইউ টকড উইথ হিম?’ উত্তরে কী বলব ভেবে পাই না। যা বুঝিয়ে বললাম—‘দেখো, আমি আমার দেশে এলিট কেউ নই। আর বুদ্ধিজীবী শ্রেণিরও কেউ না। আমি নাইপলের ভক্ত হই বা না হই, ন্যূনতম যোগ্যতা না থাকলে এমন লোকের সাথে কথা বা সাক্ষাতের সুযোগ থাকে না। আর আয়োজনে জড়িত রয়েছেন এমন কারও সাথে খাতিরদারি না থাকলে এসব অনুষ্ঠানে যাওয়া হয় না। তাই আমি কেবল টেলিভিশনের পর্দায় তার উপস্থিতি দেখে ও পত্রিকা পড়ে সন্তুষ্ট থেকেছি। সে বলে ‘ওহ ওকে, নো প্রবলেম, অলসো আই ডোন্ট নো অ্যাবাউট নাইপল এজ এ পারসন, বাট আই এম এ রিডার, দিজ ইজ ইমপরটেন্ট, ওকে।’ তারপর কী মনে করে বলল—

‘ইউ আর ইন্ডিয়ানস আর ভেরি কনজারভেটিভ, ইজ নট ইট?’ আমার রাগ হলো, সিনথির কথা শুনে। আমি বললাম—‘আই এম নট এন ইন্ডিয়ান, এ বাংলাদেশি, বাট ওয়ানস আপন এ টাইম, বাট ইটস এ পাস্ট ইস্যু, দিজ ইজ অ্যানাদার হিস্টরি।’ আমি আরও বললাম তুমি এত লেখাপড়া করো, আর জান না যে, বাংলাদেশ একটি স্বাধীন দেশ। তো আমার মেজাজ মনে হয় সে বুঝতে পেরেছে। তখন সে রসিকতা শুরু করে। সে নাইপলের হাফ এ লাইফ থেকে কিছু গল্প বলা শুরু করে। নাইপলের ত্রিনিদাদ, ইন্ডিয়া, তার দাদা ও বাবার কথা। এমন সময় আমার দিকে হাত নেড়ে দলের এক সদস্য বলছে, ‘চলে আসেন আমরা যাব’। আমি বললাম—আসছি একটু অপেক্ষা করুন। এ গ্রন্থের যেটুকু শেষে বলল, তা বুঝে নিলাম, পুরো অংশ হুবহু সে বলতে পারে নি। উচ্চারিত বাক্যের রেশ ধরে ওই অংশটি পরে আমি খুঁজে নিলাম মূল বই থেকে, শুধু সিনথির সম্মানার্থে—‘I began to live with a new idea of sex, a new idea of myself. We are all born with sexual impulses, but we are not all born with sexual skill, and there are no schools where we can be trained. People like me have to fumble and stumble on as best they can, and wait for accidents to take them to something like knowledge…’ [V.S.Naipaul: Half ALife]

সিনথি বিনয়ের সাথে বলল—‘ভেরি স্যরি, আই কানট রিউইনড দিজ চাপ্টার, প্লিজ ফরগিভ মি, সো ইউ উইল সার্চ দিজ ইউর লেজার টাইম অলসো আই হোপ উই মাস্ট রিমেমভার টুডেজ মেমোরেবল ডায়লোগ, মিটিং, ইটিসি।’ আমি বললাম—‘ইয়েস ইটস ট্রু, আই উইল কিপিং মাইসেলফ দিজ মেমোরেবল মুমেন্ট অ্যান্ড ডিসকাশনস, স্পেশালি ইউ।’


ভূগোল আর পরিবেশ-পরিস্থিতির কারণেই আমাদের জীবন বড় আড়ষ্ট ও সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।


সিনথিকে বেঞ্চিতে একা রেখেই আমাকে ফিরতে হচ্ছে। তার সাথে মুহূর্তের পরিচয়, কথা আমাকে ভাবিয়ে তুলেছে। এ এক বিশাল অর্জন আমার। আমার জন্য আজ অসাধারণ একটি দিন। এভাবে এখানে এক অজানা পরিবেশে হঠাৎ এক তরুণীর সাথে কথা হবে ভাবি নি। আবার কথাগুলো নিছক বৈষয়িক বিষয়ে গেজানো নয়। নিরর্থকও নয়। জানি, অধিকাংশ ব্যক্তিই কথা বলতে জানে না। একটি বৃত্তের মধ্যে আবদ্ধ থেকে কী সব আজেবাজে শব্দ বলে। এগুলোকে কথা বলে না। কিছু ধ্বনি, কিছু শব্দ। যেসব জীবনে কিছু ঝামেলা তৈরি করে। আজকের ঘটনাটি মিরাকল। সারা জীবনের জন্য স্মৃতিময় কয়েকটি মুহূর্ত। আর সিনথির সাথে দেখা হবে না কোনোদিন আমি নিশ্চিত। কিন্তু তার আলাপ, রসিকতা, জ্ঞান আমাকে নাড়া দেবে জীবন ভর। আমার বিশ্বাস তারও মনে থাকবে দীর্ঘদিন। বিদায় নিতে মনটা একটু বিষণ্ন হয়েছিল বৈকি। বিদায় নিতে উভয়ই বলেছি—এ সাক্ষাৎ মনে থাকবে, ভালো লাগল। বলার জন্য বলেছি সিনথিকে—সি ইউ অ্যাগেইন! কিন্তু তা অসম্ভব।

সামনে এগিয়ে যখন ফিরে তাকাচ্ছি, সে হাত উঁচিয়ে হাসছিল। হয়তো তার দিকে আমার ফিরে ফিরে তাকানো ক্রিয়াকে বোকামির কাজ ভেবে থাকতে পারে। নীরদ সি চৌধুরী তার আমার দেশ আমার শতক বইয়ের একটি প্রবন্ধে মানবিক হাহাকারের কথা উল্লেখ করেছেন। বিবরণটি এরকম যে, চলতে চলতে বিভিন্ন ধরনের লোকজনের সাথে আমাদের সাক্ষাৎ হয়। কেউ আপন হয়, কেউ হয় না। ওই যে হারানো বিষয় আর ফিরেও পাওয়া যায় না। ভূগোল আর পরিবেশ-পরিস্থিতির কারণেই আমাদের জীবন বড় আড়ষ্ট ও সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। মুষ্টিবদ্ধ হাত খুলতে গিয়ে খুলতে পারি না। কী এক স্ববিরোধী জীবন, যা তৈরি হয়েছে দেয়ালঘেরা পাঁচিলে। আর এ জন্য সকলকে নিজের মতো ভালোবাসতে ও ধারণ করতে পারি না। এ হাহাকার বোঝাতে তিনি এক ইংরেজ কবির কবিতার আশ্রয়ী হয়েছিলেন :

I wish I loved the Human race;
I wish I loved its silly face;
I wish I liked the way its walks;
I wish I liked the way it talks;
And when I’am introduced to one
I wish I thought What Jolly Fun!

জেনটিং হাইল্যান্ড-এ ওই সময়টুকু এ পর্যন্ত সেরা সময় বলেই মনে হলো আমার কাছে। সিনথি আর আমার মধ্যে যখন আড্ডা জমে উঠেছে তখনই বিদায় বলতে হলো। আমরা এমন কিছু সুন্দর আলাপ করেছি, যা মুগ্ধ রাখবে অনেকদিন। হঠাৎ ঘটে যাওয়া এমন ঘটনাকে আমার কাছে মনে হলো শুধু—বিস্ময়। বিস্ময়, যন্ত্রণা আর মুগ্ধতা নিয়ে নীরবে ফিরছি বাটুকেভ-এর পথে।

[চলবে]

স্বপন নাথ

জন্ম ৪ মে ১৯৬৮; বড়লেখা, মৌলভীবাজার। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর, বাংলা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়; এমফিল, ভাষাবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

পেশা : শিক্ষকতা; উপপরিচালক (গবেষণা ও তথ্যায়ন), নায়েম, শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

প্রকাশিত বই :
প্রবন্ধ—
চিন্তা ও জগৎ : সাহিত্য সংস্কৃতি [প্রবাস প্রকাশনী, যুক্তরাজ্য ২০০৭]
কবিতার নন্দনবিশ্ব [অনিন্দ্য প্রকাশ, ঢাকা ২০১৭]
কথার বুনন [জিনিয়াস পাবলিকেশন্স, ঢাকা ২০১৯]
ছিন্ন কথামালা [জিনিয়াস পাবলিকেশন্স, ঢাকা ২০১৯]

কবিতা—
রৌদ্র ও বৃষ্টিতে মায়াহরিণ [ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ, ঢাকা ২০০৭]
জলৌকা চোখের চাতাল [ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ, ঢাকা ২০১০]
নির্জন বিচালির ডানা [কবি প্রকাশনী, ঢাকা ২০১৩]
নখের আউঠা [উৎস প্রকাশন, ঢাকা ২০১৪]
নানকার ধানবীজ [উৎস প্রকাশন, ঢাকা ২০১৫]
একলব্যের ছিন্ন আঙুল [নাগরী, সিলেট ২০১৬]
সংশয়ের বসতি [নাগরী, সিলেট ২০১৭]
গ্রাম বজ্রযোগিনী [জিনিয়াস পাবলিকেশন্স, ঢাকা ২০১৯]

ই-মেইল : rudro71@gmail.com