হোম ভ্রমণ মালয়েশিয়া ভ্রমণ : সামান্য দেখা

মালয়েশিয়া ভ্রমণ : সামান্য দেখা

মালয়েশিয়া ভ্রমণ : সামান্য দেখা
244
0
৭ পর্বের লিংক

পর্ব : ৮

মুশকিল হলো অনেক কিছু না-বোঝার ভার নিয়ে আমাকে চলতে হয়। নিজের যোগ্যতা নেই বুঝে ফেলেছি। কী আর করা, চোখ খোলা রেখে মুখ বন্ধ রাখাই ভালো। গীতিকার গুরুপদ গুপ্ত-র গানের মতো। আমার মনে হয় অনেকেই না-বুঝে অনেক কিছুতে হাহা-হিহি করি। অনেক সময় কোনো কোনো মজলিশে নিজেকে সমঝদার বোঝাতে অনর্থক হাসতে হয়, মাথা নাড়তে হয়। যেমন কারও বক্তৃতা শুনতে বা চিত্রশিল্পের প্রদর্শনীতে গেলে না-বুঝলেও বোঝাতে হয় কত যে বোদ্ধা আমি। এ নিয়ে সৈয়দ মুজতবা আলীর ‘আর্ট না অ্যাকসিডেন্ট’-এ কিছু বাচন রয়েছে। তিনি দুর্ঘটনাজনিত শিল্পের কথা সেখানে বলেছেন। কখনও প্রস্তুতকারক নিজেও বুঝে না যে কী সে তৈরি করেছে। এরকমই দশা হয়েছে আমার। আমি আসলে অংশত কিছু বুঝতে পারছি না। ‘কয়েক বছর আগে এক বিদগ্ধ বিদূষক চিড়িয়াখানায় শিম্পাঞ্জির আঁকা একখানি ছবি ওই রকম চিত্রপ্রদর্শনীতে পাঠিয়ে শহরের লোককে বোকা বানিয়েছিল—তখনও কেউ ধরতে পারে নি, ওটা বাঁদরের মশকরা। কিন্তু প্রশ্ন, এই ধরনের তামাশা চলবে কতদিন ধরে? এই যে স্পন্টানিস্টের দল কিংবা অন্য যে কোনো নামই এদের হোক—এরা আর কতদিন ধরে আপন ব্যবহার দিয়ে ইচ্ছায় প্রকাশ করবেন যে এদের আর্ট কোনো কিছু সৃজন করার দুরূহ শক্তি সাধনায় আয়ত্ত নয়, আকস্মিক দৈবদুর্বিপাকে বা অ্যাকসিডেন্ট বা ঘটনাকে এদেরই মতো উত্তম উত্তম ছবি আঁকতে পারে, শ্রেষ্ঠ গান গাইতে পারে, সার্থক কবিতা রচনা করতে পারে—এতদিন যা শুধু সরস্বতীর বরপুত্রেরাই বহু সাধনার পর করতে পারতেন? এই প্রশ্নটি শুধিয়েছেন এক সরল চিত্ত, দিশেহারা সাধারণ লোক—সুইডেনের কাগজে। উত্তরে আমি বলি, কেন হবে না? এক কোটি বাঁদরকে যদি এক কোটি পিয়ানোর পাশে বসিয়ে দেওয়া হয়, এবং তারা যদি এক কোটি বংশ পরম্পরা এগুলোর ওপর পিড়িং পাড়াং করে তবে কি একদিন একবারের তরেও একটি মনোমোহন রাগিণী বাজানো হয়ে যাবে না? সেও-তো অ্যাকসিডেন্ট?’ এখন আমি এ দৈবের বশে কত কিছু না বুঝেও বুঝদারি মারাচ্ছি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঠিকই বলেছেন, মহাবিশ্বে মহাকাশে, মহাকাল মাঝে/ আমি মানব একাকী ভ্রমি বিস্ময়ে/ ভ্রমি বিস্ময়ে’ যা-ই হোক, এখন বোকার মতো সমঝদারি চালাতে হবে।

আগের দিনের কথা মতো আমাদের প্রতিনিধি হোটেল পরিবর্তনের ব্যবস্থা নিলেন। এ অনুযায়ী আমরা ১৫ মে সকালে ৮ টার আগেই হোটেল আনকাসার হোটেল লবিতে উপস্থিত। একই সাথে সকালের নাস্তা সেরে নিলাম। আনকাসায় দেখি সামুদ্রিক মউরালা (কক্সবাজারে পৌষী বা অন্য হোটেলে ওই সামুদ্রিক কেচকি মাছের ফ্রাই পাওয়া যায়) মাছের শুটকি ফ্রাই আছে নাস্তার মেনুতে। দেখে আমার ভালোই লেগেছে—নাস্তার মেনুতে শুটকি ফ্রাই। বাহ! আমি তো গরিব মানুষ, ছোটবেলা থেকেই নানা রকমের শুটকি খেয়ে অভ্যস্ত। এদিকে আলুর বড় বড় টুকরো আধা-কাঁচা ভাজি করা। নিলাম রুটির সাথে শুটকি ও আলুভাজা। মজা হলো—না-বুঝে অনেকেই এ শুটকি প্লেটে নিয়েছে, কিন্তু খেতে পারে নি। আমি আনন্দের সাথে খেলাম। মালয়ী স্বাদ, ভালো লাগল। দুপুরে লাঞ্চের সময় হলে এ শুটকি বেশি খেতে পারতাম। কর্তৃপক্ষ তো আর জানে না যে, এখানে একজন শুটকি পাগলা লোক আছে।


মালয়েশিয়ার গোটা শিক্ষা ব্যবস্থায় ইসলাম ধর্মীয় বিধিবিধানের প্রভাব রয়েছে। কিন্তু বিজ্ঞানভিত্তিক ভাবনা, আধুনিকতা ও সমকালিক চাহিদাকে সমন্বিত করা হয়েছে।


তারপর হোটেল আনকাসা থেকে বিদায়। এখানে আর ফিরে আসব না। নতুন হোটেলে চেকইনের আগে গাড়ির মধ্যে আমাদের মালসামানা নিয়েই নানা জায়গায় ঘুরতে হবে। কারণ, সকালে হোটেলে চেকইন হবে না। সারাদিন ঘুরে তারপর সন্ধ্যায় নতুন হোটেলে উঠার পরিকল্পনা। কিন্তু না, আমাদের ভারি লাগেজ দেখে ড্রাইভার বলল—এত মালামাল নিয়ে গাড়ি চালানো যাবে না। কারণ আজ যেখানে যাব, ওই স্থানটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে অনেক উপরে। পাহাড়ি পথে আমাদের অনেক উপরে উঠতে হবে। ফলে, উঁচুপথে গাড়ি নাও পৌঁছাতে পারে মূল স্থানে। এখন কী করা। সিদ্ধান্ত হলো আমরা যে নতুন হোটেলে আজ রাত কাটাব ওখানের রিসিপশনে আমাদের মালামালগুলো রেখে তারপর বাইরে যাব। হোটেল আনকাসা থেকে কয়েক গজ সামনে গাড়িটা এগুলো, তো দেখি এ তো আরেক আনকাসা। এর নাম হলো—আনকাসা হোটেল অ্যান্ড স্পা।

1
আনকাসা হোটেল অ্যান্ড স্পা

এখানের চমৎকার লবি, রেস্তোরাঁ, রিসিপশন। চকচকে সুন্দর এক পরিবেশ। দেখলেই ভালো লাগে। তাহলে আগে কি ইচ্ছে করেই আমাদের প্রতিনিধি কম দামের হোটেল দিয়ে ম্যানেজ করতে চেয়েছে? আসলে তাই। একই কোম্পানির দুই শাখা, একই নাম। তবে সুযোগ সুবিধা এ হোটেলে বেশি। সংগত কারণেই আগেরটিতে ভাড়া ও অন্যান্য খরচ কম, এটিতে ভাড়া ও সংশ্লিষ্ট খরচ বেশি। নতুন হোটেলের এরিয়াও বড়। আনকাসার দু-টি শাখাই কুয়ালালামপুরের ব্যস্ততম এলাকা পাদু সেন্ট্রাল-এ অবস্থিত।

2
জালান পাদুসেন্ট্রাল

মূলত, ট্রাভেল-প্রতিনিধি কম দামের হোটেলে রেখে পার পেতে চেয়েছিল। কিন্তু সবার প্রতিক্রিয়া তাকে সে সুযোগ দেয় নি। মনে মনে ভাবলাম, আজকের রাতটি ভালোভাবে কাটানো যাবে। যাক, মালামাল গুছিয়ে রেখে বাসে উঠে জায়গা নিলাম। এখানে কিছুটা সময় নষ্ট হলো। এরই ফাঁকে আরিফকে জানিয়ে রাখলাম, আজ সারাদিন বাইরে থাকব। এ আরিফ আমার এক সজ্জন, মেধাবী বন্ধু। একজন অ্যাকাডেমিক ব্যক্তিত্ব বলতে যা বোঝায় আরিফ তা-ই। সে খুব নির্জনতা প্রিয় মানুষ। আরিফ এখন মালয়েশিয়ার সাইবার জায়াতে লিমককউইং ইউনিভারসিটি অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলজিতে উচ্চ শিক্ষায় গবেষণারত। লেখাপড়া, আচার আচরণে সে তুলনাহীন ব্যক্তি। যখন চূড়ান্ত হলো যে, আমি মালয়েশিয়া আসব, তখনও তাকে বলি নি এ খবর। লংকাউই পৌঁছার পর তাকে জানান দিয়ে রাখি। প্রসঙ্গত জানাচ্ছি, আমাকে সাধারণত কেউ মনে রাখে না বা আমার সাথে সম্পর্ক রাখে না বেশিদিন, এটা আমারই স্বভাব দোষে। আবার যারা আমার সাথে যোগাযোগ রাখতে চায়, তারা আমার অজ্ঞতা জেনে বুঝেই রাখে। এক্ষেত্রে আরফিকে বোকাই বলতে হবে। কারণ, আমার সাথে সম্পর্ক রক্ষা করাটা অত্যন্ত জটিল একটি কাজ। সেক্ষেত্রে আরিফ সফল হয়েছে। আমার সমূহ সীমাবদ্ধতা মেনে নিয়ে আরিফ তার মহত্ত্বে যোগাযোগ রেখে চলেছে। এতে কৃতিত্ব তারই। এজন্য আর কাউকে না বললেও তাকে একটু ইশারা দিয়ে রেখেছিলাম যে, আমি এসেছি। তাকে বললাম আজ আর দেখা হচ্ছে না, আগামীকাল অবশ্যই হবে।

আজ প্রথম গন্তব্য হলো, মালয়েশিয়ার ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভারসিটি। এক সময় পৌঁছে যাই সেখানে। বেশি সময়ও লাগে নি, মনে হয় ৪০ মিনিটের মতো সময় লেগেছে। একটু দেরিতে পৌঁছালাম। উদ্দেশ্য হলো এ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সাথে মত বিনিময়। ক্যাম্পাস ঘুরে দেখা, এখানের শিক্ষা ব্যবস্থা সম্পর্কে জানা। মনে রাখা দরকার এখন পর্যটন ভাবনা বদলে গেছে। তবে কিছু লোক আছে তারা এমনিতেই ঘুরে, কোনো উদ্দেশ্য নেই, জানারও নেশা নেই। আবার কিছু আছেন যারা শপিং করেই জীবনে পূর্ণতা আনে। ভাবছিলাম কিভাবে এ আসাটাকে কাজে লাগানো ও অর্থবহ করা যায়। পর্যটন নিয়ে কার একটি লেখায় পড়েছিলাম, ‘Tourism involves travelling to relatively undisturbed or uncontaminated natural areas with the specific object of studying, admiring and enjoying the scenery and its wild plants and animals as well any existing cultural aspects found in this areas.’

অভিজ্ঞতা সমৃদ্ধ করা। এক্ষেত্রে এবেলা আমার ঘোরাঘুরির কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। যারা এ ধারণাকে ধারণ করেন না তাদের বিষয় আলাদা। সুতরাং, মালয়েশিয়ায় এ লক্ষ্য নিয়ে এ শিক্ষায়তনে বেড়াতে আসা। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে প্রবেশের পথে খুব আনন্দ পাচ্ছিলাম প্রকৃতি অবলোকনে। আবার সেই পাথরের পাহাড় আর সবুজ প্রকৃতির নির্মলতা। এত চমৎকার প্রকৃতি দেখে প্রাণ জুড়িয়ে গেল। ক্যাম্পাস এত পরিচ্ছন্ন, এখানে বসবাস ও চলাচলে ভালো লাগবেই। পাহাড় ও সমতলের সমন্বয়ে ক্যাম্পাস গড়ে তোলা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে উঁচু টিলাভূমি। লক্ষণীয়, এসব উঁচুভূমির বৈশিষ্ট্য বজায় রেখেই প্রতিটি ভবন নির্মিত হয়েছে। গাড়ি থামল প্রি-গ্রাজুয়েশন ভবনের সামনের রাস্তায়। এখানে উঁচু টিলায় আরেকটি ভবন, উঠতে গেলে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে হয়। মানে মাটি কাটাকাটি হয় নি। ১৫৩ জন শিক্ষার্থী নিয়ে শুরু হওয়া এ বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন প্রায় ৩০ হাজার শিক্ষার্থী লেখাপড়া করেন। ১৪টি অনুষদের মাধ্যমে অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম এখন চলমান। তবে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের আরও ৬টি ক্যাম্পাস রয়েছে বিভিন্ন স্থানে। ইসলামি করণের অন্তর্গত বলে সেভাবেই এখানে ক্রীড়া, সংস্কৃতি ও অন্যান্য সুবিধা প্রদান করা হচ্ছে। এ ছাড়া আইসিটি-র ওপর খুব গুরুত্বারোপ করা হয়। সবার জন্যই আবাসনের ব্যবস্থা রয়েছে। তবে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে কক্ষ খালি থাকা সাপেক্ষে বরাদ্দ দেওয়া হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে বিদেশি শিক্ষার্থী ও গবেষককে বিবেচনা করা হয়। এখানে স্থাপন করা হয়েছে ইইইউএম মেডিক্যাল সেন্টার, বিশাল খেলার মাঠসহ উচ্চশিক্ষায় যেসব সুবিধা প্রয়োজন সবই এখানে শিক্ষার্থীও শিক্ষকদের প্রদান করা হয়।

মালয়েশিয়ার এ ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় একটি লক্ষ্যকে সামনে রেখে। মালয়েশিয়ার সেলাঙ্গর-এ প্রায় ৭০০ একর জমিতে প্রতিষ্ঠিত এর মূল স্থাপনা। অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কনফারেন্স (ওআইসি) সরাসরি এ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় অর্থায়ন করেছে। এখনও ভূমিকা রয়েছে ওআইসি ও এর অধিভুক্ত নানা দেশ। ১৯৮৩ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে মালয়েশিয়ার উচ্চ শিক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে এ প্রতিষ্ঠান। এর মূল বাণী ওআইসির মাধ্যমে নির্ধারিত জ্ঞানের ইসলামিকরণ (Islamization of Knowledge) এ বাণীকে সামনে রেখে বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে থাকে। পাঠদানের মাধ্যম হলো আরবি ও ইংরেজি। কিন্তু নিজস্ব মালয় ভাষা এখানে প্রায়-নিষিদ্ধ। স্মরণ রাখা ভালো মালয়েশিয়ার গোটা শিক্ষা ব্যবস্থায় ইসলাম ধর্মীয় বিধিবিধানের প্রভাব রয়েছে। কিন্তু বিজ্ঞানভিত্তিক ভাবনা, আধুনিকতা ও সমকালিক চাহিদাকে সমন্বিত করা হয়েছে। বিশেষত মুসলিম উম্মাহর মধ্যে নেতৃত্ব তৈরি ও জ্ঞানচর্চার লক্ষ্যে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা। একটি ভিন্ন ও মহৎ দৃষ্টিকোণ থেকে আন্তর্জাতিক ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিশন-এ বলা হয়েছে :  IIUM aims at becoming an international centre of educational excellence which seeks to restore the dynamic and progressive role of the Muslim ummah in all branches of knowledge.

3
আন্তর্জাতিক ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের একাংশ

উল্লেখ করা যায়, ১৯৫৭ সালে মালয়েশিয়ার স্বাধীনতা অর্জিত হয়। এর আগে প্রথাগত মাদরাসা শিক্ষা প্রচলিত ছিল বলে জানা যায়। স্বাধীনতার পর চালু হয় মালয় ভাষা কেন্দ্রিক শিক্ষা। এরপর ক্রমান্বয়ে ইসলামি শিক্ষার সাথে ইংরেজি ভাষাও গুরুত্ব পেতে থাকে। ১৯৭০ সালের পর থেকে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরেও চালু হয় ইংরেজি শিক্ষা। মালয় ভাষার সাথে ইংরেজি ভাষার প্রয়োগ ও একই সাথে ইসলামি শিক্ষা ব্যবস্থা মালয়েশিয়ার সমাজে দ্বান্দ্বিক পরিবেশের জন্ম দেয়। বিশেষত, জাতীয় ঐতিহ্য ও সেক্যুলার এবং মাদরাসা শিক্ষার মধ্য দিয়ে তৈরি হওয়া নাগরিকের মধ্যে ব্যবধান ও জটিলতা তৈরি হয়। এক সময় আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে দেশীয় ও ইসলামি শিক্ষার দ্বন্দ্ব অনুভব করেন, সেখানের চিন্তাবিদরা। দ্বান্দ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরির ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যেও এ ব্যবধান বেড়ে যাওয়া লক্ষ করা যায়। এ বিশ্ববিদ্যালয়েরই শিক্ষা ইন্সটিটিউটের এক শিক্ষক প্রফেসর রোজনানি হাশিম, তার এক গবেষণায় বলেছেন :

‘Based on this historical background, it was clear that there were problems with the dualistic educational system. Surely the conflicting world views had contributed to the conflicts even among the Muslims in governance, politics, law, economics, education and much more. It was clearly evident then that the religious educational system had not been able to produce leaders and professionals. Their education had not prepared them to understand human behaviours, the political, social and economic development of society, and also modern technology in addition to being critical, creative and scientific in solving problems. It was more for preparing preachers who can guide the community in religious practices, knowledge and values or fill in the role of imams in prayers and social, religious functions. Similarly, the secular educated Muslim leaders and professionals lacked religious commitment and practiced separation of religion and state, and did not give much thought to the tenets of Islam such as serving alcohols in public functions or ridiculing Islam laws.’


এ পরিবর্তনেও সেই মাহাথির মোহাম্মদ। তিনি এ দ্বিধা-দ্বৈততার অবসান ও মানবসম্পদ সৃষ্টিতে নতুনভাবে চিন্তা ভাবনা করেন।


তারা ভাবেন কিভাবে সমন্বিত শিক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করা যায়। বিশেষভাবে ৭০-এর পর মালয়েশিয়ায় ইসলামি শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে আধুনিক শিক্ষার সমন্বয়ে ব্যাপক চিন্তা করেন তারা। তারা ভাবেন—মাল্টিডিসিপ্লানারি শিক্ষা এ ইসলামি শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যেও সম্ভব যদি সেভাবে কারিকুলাম তৈরি ও সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি করা যায়। এ চেতনা থেকে তারা ওই পথে অগ্রসর হন। এ চিন্তায় বড় একটি কারণ ছিল বেকারত্ব ও কর্মসংস্থান। বাজারের চাহিদা ও এ আলোকে গ্রাজুয়েট তৈরি করা। সমকালীন বিশ্বের চাহিদা বিবেচনায় বর্তমান মালয়েশিয়ার শিক্ষাক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন আনা হয়েছে। এর মধ্যে আবার জনগণের মানসিক অবস্থান ও ঐতিহ্যও বিবেচনায় ছিল। এ পরিবর্তনেও সেই মাহাথির মোহাম্মদ। তিনি এ দ্বিধা-দ্বৈততার অবসান ও মানবসম্পদ সৃষ্টিতে নতুনভাবে চিন্তা ভাবনা করেন। ইসলামি শরিয়াকে সমুন্নত রেখে তিনি বিজ্ঞানচিন্তাকে অন্তর্ভুক্ত করেন। আধুনিক শিক্ষার সব ফ্যাকাল্টিকে ইসলামি শিক্ষার মধ্যে নিয়ে আসেন। বলা বাহুল্য যে, শিক্ষাসহ জাতীয় উন্নয়নে মাহাথির একটি আমব্রেলা কনসেপ্ট হিসেবে ব্যবহার করেন—ইসলামিকরণ প্রত্যয়। মালয়েশিয়ায় বসে বসে মাহাথিরের বিশেষ এ-ইসলামিকরণ নিয়ে ভাবছিলাম আর খোঁজ করছিলাম কোথাও কিছু পাওয়া যায় কি না। আবার এ পাঠের সাথে দরকার নিবিড় পর্যবেক্ষণ। আমি, মো. নুরি, আহমদ তেজমিজি আবদুল্লাহ, আবদুল করিম আলি ও ফৌজিয়া জাকারিয়া—এ চারজনের একটি লেখা থেকে জেনে নেই তার ভাবনার কিছু অংশ। মালয়েশিয়ার শিক্ষা বিষয়ে কারও ভুল বোঝাবুঝির যাতে কোনো অবকাশ না থাকে, এজন্য ড. মাহাথির তার দর্শনগত চিন্তাকে জাতির সামনে স্পষ্ট করে দিয়েছেন। ফলে, বহুজাতিক ও বহুভাষিক মানুষের দেশ মালয়েশিয়ার জনগণ তা সাদরে গ্রহণ করেছে। মাহাথিরের ব্যাখ্যা :

‘What we mean by Islamisation is the inculcation of Islamic values in government. Such inculcation is not the same as implementation of Islamic laws in the country. Islamic laws are for Muslims and meant for their personal laws. But laws of the nation, although not Islamic-based, can be used so long as they do not come into conflictwith Islamic principles’.

ফলে, মালয়েশিয়ার শিক্ষাব্যবস্থাকে ভেতর থেকে না বুঝলে সমস্যা আছে। এটা সাম্প্রদায়িকীকরণ নয়, বা শিক্ষাকে রক্ষণশীলতায় আবৃত করা নয়। ফলে, মালয়েশিয়ার বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থাকে খুব নিবিড় পর্যবেক্ষণ ছাড়া কেউ অনুধাবন করতে পারবেন না বলেই আমার মনে হয়েছে। মোদ্দা কথা এটা মাহাথিরীয় অভিনব কৌশল। এর আলোকে তিনি মালয়েশিয়ার কারিকুলাম ও ব্যবস্থাপনার পরিবর্তন আনয়ন করেন। মাহাথির-তার স্বীয় চিন্তা থেকেই প্রতিষ্ঠা করেন আন্তর্জাতিক ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়, মালয়েশিয়া। মাহাথির বলেই দিয়েছেন যে, ‘Malaysia is an Islamic state in a moderate understanding’ মাহাথির লক্ষ করেন, শুধু ইসলামি শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে আধুনিক বিশ্বের সাথে তাল মেলানো যাবে না। ওখান থেকে লিডারশিপ তৈরি হওয়া সম্ভব নয়। কারণ, রাজনীতি, অর্থনীতি আর বাস্তব জীবন এক জটিল দুনিয়া। ফলে, জাগতিক কোনো সমস্যার সমাধান প্রচলিত শিক্ষা থেকে আশা করা যায় না। যা থেকে শুধুই ইসলামিক স্কলার তৈরি হচ্ছে কিন্তু সমকালিন বিশ্বের জ্ঞানচর্চা না থাকায় পুরো মুসলিম বিশ্ব পিছিয়ে গেছে গবেষণা ও নতুন জ্ঞান সৃষ্টির ক্ষেত্রে। এছাড়াও সমাজে বৈষম্য তৈরি হচ্ছে প্রচলিত নানামুখী শিক্ষার কারণে। মাহাথির ভাবলেন জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার সাথে কিভাবে ধর্মীয় শিক্ষাকে সমন্বিত করা যায়।

বলছিলাম ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা। এখানে রাষ্ট্র ও সমাজের চাহিদার প্রতি লক্ষ রেখে বিভিন্ন ধরনের শিক্ষা, জ্ঞানচর্চা চলমান। ফলে, এ বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম বিস্তৃত হয়েছে বিশ্বব্যাপী। মালয়েশিয়ার অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে যেমন শরিয়াকে গুরুত্ব দেয়া হয়ে থাকে। এ বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামাইজেন-এর ভিশনে সমন্বিত করা হয়েছে ইসলামি আদর্শের বিশ্ব ভাবনা ও মূল্যবোধের সাথে বৈশ্বিক জ্ঞানচিন্তাকে। এক্ষেত্রে বৈশ্বিক পরিবর্তন পরিস্থিতি এবং কর্মদক্ষতার বিষয়টিও সামনে এসেছে। কারণ এখন নলেজ-ইকোনমি (K-economy)-র যুগ। মালয়েশিয়ার জনগণকে মাহাথির এ বার্তাটি পৌঁছে দিতে সক্ষম হয়েছেন। এ আলোকে বিশ্ব বিদ্যালয়ের সুনির্দিষ্ট লক্ষ ও উদ্দেশ্য সম্পর্কেও বলা হয়েছে।

‘…the goal of producing professionals who are balanced and religious in a positive sense could be achieved sooner or later. Another contribution to the cause of Islamic studies disciplines was through the establishment of the International Islamic University Malaysia whose major goals are Islamisation, Integration, Internationalization and comprehensive excellence.’

ফলে, ইসলামি শিক্ষা মাধ্যমেও ইংরেজি ভাষা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এক্ষেত্রে সৌদি আরব, মিশর ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের অবদান রয়েছে। প্রথাগত ইসলামি শিক্ষা ব্যবস্থা আগে থেকে চালু থাকলেও মূলত এর প্রসার ও উন্নয়ন ঘটে ১৯৭০ সালের পর। ক্রমান্বয়ে ওই ধর্মভিত্তিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণ প্রাথমিক ও মাধ্যমিক-এ রূপান্তর হতে থাকে। এ-ই যে ইসলামিকরণ, তা কিন্তু একদেশদর্শী কোনো কর্মসূচি নয়। এখানে মাহাথির মোহাম্মদের কৃতিত্বের অবশ্যই স্বীকৃতি দিতে হবে। তিনি তার বিশ্বাস, ঐতিহ্য অনুসারে কখনোই একপেশে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন নি। এ কঠিন সিদ্ধান্ত তাকে নিতে হয়েছে দেশের প্রয়োজনে, সমাজ ও সামাজিক ঐতিহ্যের আলোকে। তিনি অকপট বলেছেন তার জন্ম ও বেড়ে ওঠা এক ইসলামি ঐতিহ্যের পরিবেশে। তার ব্যক্তিগত বিশ্বাসের গড়নটিও সেভাবে নির্মিত হয়েছে। তবে অন্যান্য ধর্মের ব্যক্তিবর্গের সাথে তার বন্ধুত্ব রয়েছে। কখনোই তিনি তাদের সাথে ধর্ম নিয়ে কথা বলেন নি বা তর্ক করেন নি। তার কিছু কথা আমরা তার স্মৃতিকথা থেকে পাঠ করতে পারি। যেখানে অনুসরণীয় কিছু কথা বলেছেন মাহাথির।

Islam was and is to me a religion that tolerates the existence of other religions and their followers. … In Malaysia we may not be applying is regarded as Shariah Law in every case to avoid injustice. …Similarly our tolerance of other religions is also in keeping with the teachings of Islam. Indeed in everything that the government has done Islamic princioles were upheld. … Islam and the Islamisation of the Malasian administration were not causes of contention before. What is the fact is that during the period when Malasia asopted Islamic values and declared itself and Islamic country, there was peace and stability and the country developed and grew as never before. Unfortunately many `learned’ Muslims are not quite happy with tolerance as taught by the quran. They would like Islam to be stricter, more severe and violently opposed to other religions. [A Doctor in the House, 477-478]

ফলে, সার্বিক বিবেচনায় তার এ-ইসলামিকরণ কর্মসূচিতে ব্যতিক্রম রয়েছে। এমনকি এ নিয়ে তিনি বিরোধীপক্ষ ও সংখ্যালঘু রাজনৈতিক নেতৃত্বের সাথে বৈঠক ও তাদের অভিমত গ্রহণ করেছেন। এতে ওই বিরোধী পক্ষ কোনো বিরোধিতাও করে নি। এ অনুযায়ী সমন্বিত ইসলামিকরণের পদক্ষেপ তিনি গ্রহণ করেন ও সফল হন। সুতরাং, আন্তর্জাতিক ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা বা অন্যক্ষেত্রেও মাহাথিরীয় দৃষ্টিভঙ্গি মূল্যায়নে কোনো সরলীকরণ বিবেচনা গ্রহণযোগ্য হবে না। একমাত্র মাহাথির মোহাম্মদের মতো একজন মহান ব্যক্তির ক্ষেত্রেই এ তুলনা প্রযোজ্য।

এসব বিষয়ে জানার জন্যই মূলত ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ে যাই। যদিও কিছুই আমরা জানতে পারি নি। যা কিছু জানতে পেরেছি, তা ভিন্ন ভিন্ন উৎস থেকে। এই যে জানতে পারব না, তা তো আগে বুঝি নি। বা জানাতে তারা প্রস্তত নন, তাও বুঝি নি। ফলে, একটি আবেগ আমার মনের মাঝে ছিল, কিন্তু সবসময় তো আর পরিস্থিতি নিজের অুনকূলে থাকে না। আর বিশ্বের সর্বত্রই ভালো মাল মশলার সাথে আবর্জনাও চালান হয়ে যায়। ক্যাম্পাসে পৌঁছাতে দেরি হওয়াতে নির্ধারিত মতবিনিময় শুরু হয় ১১ ঘটিকার পরে। প্রথমে সমাজবিজ্ঞান অনুষদের অফিস সহায়ক এক মহিলা আমাদের অভ্যর্থনা জানান। একটি ছোট হলঘরে আমাদের বসার ব্যবস্থা। কিছুক্ষণ পর এলেন এ বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ শাখার এক কর্মকর্তা হামজা। যিনি আমাদের উদ্দেশে কথা বলবেন তিনিও কাজে ব্যস্ত ছিলেন। রমজানের কারণেও কিছুটা বিলম্ব হয়েছে। তাই আপ্যায়নেরও বিষয় ছিল না। কিছুক্ষণ পর এলেন বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত এক বাংলাদেশি শিক্ষক। আর কেউ নয়।

সেখানে ল্যাপটপ ও সাউন্ড সিস্টেমের ব্যবস্থা ছিল। স্থানের দিক থেকে বসার একটু সমস্যা থাকলেও সহসাই ঠিক হয়ে গেল সব। যথারীতি পরিচিতিপর্বে জেনে নিলাম তার নাম ও পরিচয় : ড. আবদুল কুদ্দুস, তিনি বাংলাদেশেরই মানুষ, ১৯৯৬ সাল থেকে এ বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত আছেন। তিনি পাবলিক পলিসি বিষয়ে এ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াচ্ছেন। একে একে পরিচিতপর্ব শেষে তিনি পাওয়ার পয়েন্টের মাধমে স্বল্প সময়ের মধ্যে ইসলামিক ইউনিভারসিটির পরিচয়, প্রতিষ্ঠা, প্রশাসনিক কাঠামো, মাননিয়ন্ত্রণ, শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক ও ব্যবস্থাপনা তুলে ধরেন। যা আমার কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে নি। তার কথায় জনাব কুদ্দুস কোনো বাংলা শব্দ খরচ করেন নি। তার পুরো উপস্থাপনা ছিল ইংরেজি ভাষায়। কারণ, এ বিশ্ববিদ্যালয়ে আরবি ও ইংরেজি ভাষা বাধ্যতামূলক, মালয় ভাষা চলে না। তবে কথায় কথায় ব্যস্ততার জানান দিচ্ছিলেন তিনি। জনাব কুদ্দুসের বয়ান থেকেই তার মালয়েশিয়ায় অবস্থান ও সেখানে চাকরি নিয়ে চলে যাওয়া নিয়ে কিছু প্রশ্ন আমার মনে উঁকি দিয়েছিল, কিন্তু দেশের ভাই ‘শুকুর মামুদ’ বলে আর করি নি।


ইসলামাইজেশন মানে পুরোপুরি ইসলামি শিক্ষা নয়। যা কিছু শিখছি বা পড়ছি, জেনে নিচ্ছি এবং ইসলামের মূল অঙ্গীকারের ভেতর দিয়ে। তা শিখছি ইসলামের বিধিবিধানের মধ্যে থেকেই। 


অল্প সময়ে তার কথা শেষ হলে আমাদের প্রশ্ন তিনি জানতে চেয়েছেন। ৫ জনের মতো বললেও আমি আর সুযোগ পাই নি। তবে তার উপস্থাপনায় এ বিশ্ববিদ্যালয় ও মালয়েশিয়ার শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে তেমন কিছুই আসে নি। কার কী মনে হয়েছে জানি না, ব্যক্তিগতভাবে আমার মনে হয়েছে—একটি কর্তব্য তিনি পালন করেছেন মাত্র, এর বেশি কিছু নয়। তবে কৃতজ্ঞ যে, এ সামান্য সময়টুকু তিনি দিয়েছেন। শিক্ষা, ক্যাম্পাস, ব্যবস্থাপনা জানার অতৃপ্তি থেকেই গেল। আর একটি বিষয় বিশ্ববিদ্যালয় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কেউ এ সভায় ছিলেন না। মালয়ভাষী কেউ থাকলে আরও বেশি খুশি হতাম। আমাদের সাথে কথা বললেন আমাদেরই লোক। তাও অধিক ব্যস্ততায় মধ্যে। জনাব কুদ্দুস সাহেবের গিবত করছি না, আমার যা অনুমিত হয়েছে তাই বলছি। তথ্য পরিবেশনের চেয়ে তার কথায় কৃত্রিমতা ছিল বেশি। প্রায় তথ্যের জন্য তিনি বারবার হামজার কাছ থেকে জেনে নিচ্ছিলেন। এক্ষেত্রে এমন হতে পারে যে, তিনি এ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কাঠামো এবং মালয়েশিয়ার শিক্ষা ব্যবস্থা সম্পর্কে অবগত নন, বা তিনি মনে করেন এটি তার জানার বিষয় নয়। এমনও হতে পারে তিনি জানেন কিন্তু বিস্তৃত বা এর চেয়ে বেশি কিছু বলতে চান নি। যা হয়তো ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা যেত। এক কথায় মৌলিক তথ্য তেমন তার কাছে পাই নি। তবে তিনি তার ভাষণে সুন্দর কিছু কথা বলেছেন, এর সারার্থ হয়, যেমন : ইসলামাইজেশন মানে পুরোপুরি ইসলামি শিক্ষা নয়। যা কিছু শিখছি বা পড়ছি, জেনে নিচ্ছি এবং ইসলামের মূল অঙ্গীকারের ভেতর দিয়ে। তা শিখছি ইসলামের বিধিবিধানের মধ্যে থেকেই। এখানে ফার্মাসি এবং খাদ্য ও পুষ্টিবিজ্ঞান পড়ানো হচ্ছে। এ সূত্রে হালাল খাদ্যের বৈশিষ্ট্য নির্দেশ করে দেওয়া হচ্ছে। ফলে, শুধু তা তারাই অনুসরণ করছেন না, কোনো কোনো দেশও এ তথ্য থেকে উপকৃত হচ্ছে।

অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রাষ্ট্র, সমাজ ও বাজারের চাহিদা ব্যতীত কোনো কোর্স এ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো হয় না। এমনকি ইসলামিক স্টাডিজও পড়ানো হচ্ছে ওই চাহিদা বিবেচনায় রেখে। এখন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে ভাবা হচ্ছে মানব সম্পদ তৈরির ইন্ডাস্ট্রি হিসেবে। যতটুকু পেয়েছি, ততটুকুর জন্য জনাব আবদুল কুদ্দুস সাহেবের কাছে কৃতজ্ঞ। এটুকু না হলে আরও অসন্তুষ্টি থেকে যেত। নিজে তো বোকার চেয়ে বোকা, তাই অনেক কিছুই বুঝে উঠতে পারি না, এটা আমার নিজের সমস্যা। এ পর্যায়ের শেষে তারাপদ রায় লিখিত স্টুপিডেন্ট গল্পের কথা মনে হলো। যেখানে তিনি উল্লেখ করেছেন, লেখক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের বলা একটি গল্প। তা হলো, এক বৃদ্ধ হাঁটাচলা করতে পারতেন না। তাকে সারাক্ষণই বিছানায় পড়ে থাকতে হতো। তবে তিনি খুব জ্ঞানী ব্যক্তি ছিলেন। এ অবস্থায় স্বজনেরা তার জন্য বেডপ্যানের ব্যবস্থা করেছিলেন। একদিন সকালে দেখা গেল তিনি বেডপ্যানে মলত্যাগ না করে বিছানায় করে ফেলেছেন। ওই বৃদ্ধব্যক্তির বড় ছেলে তাকে জানতে চাইল—বাবা এটা কি করেছ? জ্ঞানী বৃদ্ধ লোকটি জবাব দিলেন, ‘সরি স্লিপ অব টাং’। আমারও হয়ে গেল স্লিপ অব টাং দশা।

আবার যদি মূল ক্যাম্পাস ঘুরে ঘুরে দেখতে পারতাম, তা হলে আরও ভালো লাগত। অবশেষে চলমান গাড়ি থেকে যা দেখা যায়, তা দেখে দেখতে ফিরতে হলো। সুন্দর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে চলেছি প্রকৃতির সান্নিধ্যে, লক্ষ জেনটিং হাইল্যান্ড।


[চলবে]

স্বপন নাথ

জন্ম ৪ মে ১৯৬৮; বড়লেখা, মৌলভীবাজার। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর, বাংলা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়; এমফিল, ভাষাবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

পেশা : শিক্ষকতা; উপপরিচালক (গবেষণা ও তথ্যায়ন), নায়েম, শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

প্রকাশিত বই :
প্রবন্ধ—
চিন্তা ও জগৎ : সাহিত্য সংস্কৃতি [প্রবাস প্রকাশনী, যুক্তরাজ্য ২০০৭]
কবিতার নন্দনবিশ্ব [অনিন্দ্য প্রকাশ, ঢাকা ২০১৭]
কথার বুনন [জিনিয়াস পাবলিকেশন্স, ঢাকা ২০১৯]
ছিন্ন কথামালা [জিনিয়াস পাবলিকেশন্স, ঢাকা ২০১৯]

কবিতা—
রৌদ্র ও বৃষ্টিতে মায়াহরিণ [ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ, ঢাকা ২০০৭]
জলৌকা চোখের চাতাল [ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ, ঢাকা ২০১০]
নির্জন বিচালির ডানা [কবি প্রকাশনী, ঢাকা ২০১৩]
নখের আউঠা [উৎস প্রকাশন, ঢাকা ২০১৪]
নানকার ধানবীজ [উৎস প্রকাশন, ঢাকা ২০১৫]
একলব্যের ছিন্ন আঙুল [নাগরী, সিলেট ২০১৬]
সংশয়ের বসতি [নাগরী, সিলেট ২০১৭]
গ্রাম বজ্রযোগিনী [জিনিয়াস পাবলিকেশন্স, ঢাকা ২০১৯]

ই-মেইল : rudro71@gmail.com