হোম ভ্রমণ মালয়েশিয়া ভ্রমণ : সামান্য দেখা

মালয়েশিয়া ভ্রমণ : সামান্য দেখা

মালয়েশিয়া ভ্রমণ : সামান্য দেখা
299
0
৬ পর্বের লিংক

পর্ব- ৭

লংকাউই থেকে ফেরার সময় মন খুব বিষণ্ন ছিল, হয়তো সবারই। মন খারাপের মধ্যে লক্ষ করি আমাদের দলের এক নারী সদস্য হঠাৎ পড়ে গেছেন এয়ারপোর্টের ওয়েটিং রুমে। তার নাকি মাথা ঘুরছিল কী কারণে। তারপর মাথায় পানি দেয়া হলো এবং যত্ন নিয়ে বিমানের আসনে বসানো হলো। এর আগে তিনি তার কষ্ট নিজে সহ্য করেছেন, কিন্তু বিমান ছাড়ার মুহূর্তে অসুস্থতাবোধ প্রকাশ করেন। আসলে তিনি গতকাল থেকেই অসুস্থ। তবে অসুস্থতার কারণ জানতে পারি নি। যা হোক বিমানে উঠে তাকে সুবিধা মতো আসনে বসানো হলো। সঙ্গীরাও তার প্রতি আন্তরিকভাবে খুব নজর রেখেছিলেন।

প্রথমেই হোচট খেলাম আসনে বসতে গিয়ে। আমি চেকইনের সময় বিমানের স্টাফকে অনুরোধ জানিয়ে জানালার আসন নিশ্চিত করেছিলাম। তবে দেরিতে উঠেছি ওই অসুস্থ সদস্যের জন্য। এসে দেখি আমারই দলের নীতিবাদী এক সদস্য আমার আসনে দখল নিয়ে বসে আছেন। তাকে কেমন করে বলি যে আপনি আপনার আসনে বসেন। অন্য কেউ হলে বলতাম না। যেহেতু তিনি নীতিবাদী ও আচারেও সেরকম, তাই লজ্জা ছেড়ে জানতে চাইলাম—আপনার আসন কোথায়? তিনি উঠতে চান নি। উঠতে না চাওয়ার কারণে আমিও একটু একাট্টা হয়ে গেলাম। তো আমি আবারও অনুরোধ করি, বললাম—আপনি আপনার জন্য নির্ধারিত আসনে গেলে আমার সুবিধা হয়। এ বিষয়ে আমি অনুদার থেকে গেলাম আজ। জানালায় বসার কারণটি হলো, সবার মধ্যে থেকেও বিচ্ছিন্ন থাকার চেষ্টা।

উড়াল দিয়ে মনে হলো লংকাউই-এ অবস্থান এত দ্রুত শেষ করা ঠিক হয় নি। এক বেদনা নিয়ে লংকাউই ত্যাগ করতে হলো। আহা! লংকাউই-র প্রকৃতি, ঢেউ খেলানো দৃশ্য মুহূর্তেই চোখের সীমানা থেকে হারিয়ে গেল। আরেকটি অভাববোধ ব্যক্তিগতভাবে আমাকে খুব পীড়া দিচ্ছে। ভ্রমণে ক্যামেরা এক আবশ্যক প্রয়োজনীয় উপাদান। যা না হলে ভ্রমণ কখনোই অর্থপূর্ণ হয় না। ভূপর্যটক রামনাথ বিশ্বাস, অন্নদাশঙ্কর রায় বা সৈয়দ মুজতবা আলী ক্যামেরার কোনো কেরামতি দেখান নি বা উদাহরণ দেন নি। তারা তো ভ্রমণের গুরু। কিন্তু আজকালের দুনিয়া তো পরিবর্তন হয়ে গেছে। কোনো বিষয়ই দৃশ্যমান না হলে মানুষের কাছে আনন্দ লাগে না। এ উপাদানটি সঙ্গে না থাকায় দৃশ্য ও বিষয় আলোর চাহিদা অনুযায়ী আমি ধারণ করতে পারছি না।


চললাম কুয়ালালামপুর শহরের দিকে। রাস্তার দু-পাশে সবুজ আর সবুজ। কখনও পাম বাগান, আর নানা গাছের সারি। আমাদের ক্লান্তি আছে, কিন্তু কোনো দুর্বলতা তৈরি হয় নি।


বিমান চলছে আকাশপথে আর আমি ভাবছি আমার সীমাবদ্ধ সামর্থ্যের কথা। সব কোলাহলের মধ্যে নিজের হিসেবটি মেলাচ্ছি। এত সীমাবদ্ধতা নিয়ে ভ্রমণে আসা ঠিক নয় অন্তত আজকের যুগে। মোবাইল ক্যামেরা আর কবিবন্ধু মুজিব রহমানের দেয়া ছোট ক্যানন ক্যামেরা দিয়ে ফটোগ্রাফি করছি। মনের মতো হচ্ছে না। কত দৃশ্য ধারণের জন্য পেয়েছি, শুধু ক্যামেরার কারণে মিস করেছি। বাকি দিনগুলো আমি তাহলে কি করতে পারি। এ ছাড়া আমার আর সামর্থ্য নেই। এখন কিনতে গেলে সে ডলারও নেই। বিমানে বসে বসে জুতসই ক্যামেরার অভাব চিন্তা স্মরণ করিয়ে দিল গদ্যশিল্পী মামুন হুসাইনের পরামর্শ। যিনি শুধু কথাকার নন, বিশ্বসাহিত্যের নিবিড় পাঠকও। সাহিত্যের নির্জন, নিবিষ্ট পরিব্রাজক। বলা প্রয়োজনহীন, তার কথাসাহিত্য নতুন অনেক ব্যঞ্জনা তৈরি করে, আলোকচিত্র যেমন। গত বছর জুলাই মাসে একটি কাজে রাজশাহী গেলে তার সাথে সাক্ষাৎ করি। তিনি অনেকগুলো বইয়ের সাথে তারাকোভস্কি-র বায়োগ্রাফি ও সুজান সনটাগ-এর অন ফটোগ্রাফি পড়তে বলেন। অন ফটোগ্রাফি পুরোটা শেষ করতে পারি নি মালয়েশিয়া যাবার আগে। কয়দিন পর পর পড়ার কারণে। তবে পুরোটা উলটে পালটে দেখছিলাম। লংকাউই ভ্রমণের সময় এ বইটির কথা খুব মনে পড়ছে ওই ক্যামেরা ও আলোকচিত্রের ক্ষমতার কথা ভেবে। আমিও একজন আলোকচিত্রী হতে পারতাম। সে সম্ভাবনাও ছিল। ক্যামেরা কেনার সামর্থ্য হয় নি কোনোকালে, এখনও নয়। একসাথে অনেক টাকা সঞ্চয় করতে পারি না। আপাতত কাজ চালাচ্ছি—ছবি তোলা আর কী, ওই মোবাইল আর কার্যকরহীন ক্যানন দিয়ে। আলোকচিত্র নিয়ে সনটাগ-এর প্রতিটি ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ মনে হচ্ছিল আমার। তবে এখন পর্যন্ত যা ছবি তুলেছি, মনে হয় খারাপ করি নি। আমার নিজের এ নিরর্থক জীবনের অসহায়ত্ব ও এর মানচিত্র দৃশ্যমান হয়ে উঠেছিল আমার করোটিতে। কারও সাথে এ বিষয়টি বিনিময় করতে পারছিলাম না। নিশ্চিতভাবে জানি না আমি, দলের সাথে আছেন এমন কেউ সনটাগ-এর পাঠক। হয়তো আছেন, কিন্তু আলাপের সুযোগ পাই নি। আলোকচিত্র নিয়ে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ, আলোকচিত্রের কলা-কৌশলের সাথে নন্দনতত্ত্ব, রাষ্ট্র, রাজনীতি, সমাজনীতি, পুঁজির ভূমিকা, সমাজে এর প্রভাব, প্রয়োজনীয়তা এবং পেইন্টিং ও চলচ্চিত্রের সাথে তার সাদৃশ্য ও ব্যবধান ইত্যাদি নানা বিষয় সনটাগ বিশ্লেষণ করেছেন। অল্প সময়ের বিমান যাত্রায় নিজের অভাববোধের সুযোগে আমার ভাবনাটা দখল করে নিয়েছিল আলোকচিত্র প্রসঙ্গ। অযথা কারও সাথে কথা বলে বিরক্ত করি নি এবং নিজের ভাবনাটাও মন্দ হয় নি। মাঝে মধ্যে নিজের সাথে নিজের সংলাপ থেকে কিছু সৃষ্টি হয়ে যায়। সারা জীবনে আমরা নিজেকে সময় দেই খুবই কম। এ সুযোগে নিজের মধ্যে ছিলাম মাত্র ৪০ মিনিট। সুজান তার বইয়ের এক জায়গায় লিখেছেন :

Because each photograph is only a fragment, its moral and emotional weight depends on where it is inserted. A photograph changes according to the context in which it is seen: thus Smith’s Minamata photographs will seem different on a contact sheet, in a gallery, in a political demonstration, in a police file, in a photographic magazine, in a general news magazine, in a book, on a living-room wall. Each of these situations suggests a differentuse for the photographs but none can secure their meaning. As Wittgenstein argued for words, that the meaning is the use—so for each photograph. And it is in this way that the presence and proliferation of all photographs contributes to the erosion of the very notion of meaning, to that parceling out of the truth into relative truths which is taken for granted by the modern liberal consciousness.

যা-ই হোক যা আছে তা নিয়েই দেখি। এ ভাবনা শেষ হতেই কুয়ালালামপুর এসে পৌঁছাই। বিমান থেকে নেমে চারতলা তারপর গ্রাউন্ড লেবেলে নেমে অপেক্ষা। বিমানবন্দর তেমন আকর্ষণীয় নয়। কিন্তু সব সুবিধাই তারা রেখেছে। ভেতরটা দেখলে খারাপ লাগবে না। তবে পরিচ্ছন্নতা অনন্য এক ভালোলাগার বিষয়। নিজের মতো সবই সাজাচ্ছে তারা। অনেকেই বলে মালয়েশিয়া এখন ইউরোপ। সত্যি তা-ই। কিছুক্ষণ পর একজন গাইড এসে আমাদের বাস স্টপেজ-এর দিকে নিয়ে গেল। গাইডের নাম হাসান। প্রথম দর্শনেই বুঝলাম সে হিশামের মতো হবে না। সেখানে আমাদের জন্য নির্ধারিত বাস এলে আমরা ওঠে গেলাম বাসে। গাইড হাসান আমাদের উদ্দেশে কিছু বলল, কিন্তু তার অস্পষ্ট উচ্চারণে ভাষা বুঝতে কষ্ট হলো। এখানে হিশামকে খুব মিস করছিলাম।

হাসানের ভাষা—না-মালয়, না-আরবি, না-ইংরেজি, না-কোনো উপভাষা কিছুই বোঝা গেল না। বিরক্তিকর মালয় টোনে ইংরেজি প্রকাশে ওই ভাষার বেহাল দশা। অবশেষে হাসানকে বোঝানো গেল তার কিছু বলার দরকার নেই। কারণ, আমরা কোনোভাবেই তার কথা বুঝতে পারছিলাম না। চললাম কুয়ালালামপুর শহরের দিকে। রাস্তার দু-পাশে সবুজ আর সবুজ। কখনও পাম বাগান, আর নানা গাছের সারি। আমাদের ক্লান্তি আছে, কিন্তু কোনো দুর্বলতা তৈরি হয় নি। ছুটে চলেছি। তো একজন পিছন থেকে বললেন কেউ একজন আবারও খুব অসুস্থবোধ করছেন। আর কেউ না, আগের অসুস্থ সদস্যই। হাসানকে বলা হলো কোথাও যেন বাস থামানো হয়। সে বলল ক্লিনিক না পাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে। এর মাঝে না কি তিনি বমিও করেছেন। একটু কষ্টের মধ্যেই পড়ে গেলাম। দলের যে কেউ অসুস্থ হলে আসলে আনন্দ আর থাকে না। কিছুদূর গেলে একটি ক্লিনিক পাওয়া গেল। আমাদের মতো রাস্তায় রাস্তায় ফার্মেসি বা ক্লিনিক সেখানে পাওয়া যায় না। বাংলাদেশের যে কোনো স্থানে ছোট একটি বাজার হলে অন্তত একটি ওষুধের দোকান পাওয়া যায়। কিছুক্ষণ চলার পর একটি মার্কেটে ছোট একটি ক্লিনিক পাওয়া গেল। মূলত, এটি দাঁতের চিকিৎসালয়। ভাবলাম, দন্ত চিকিৎসক এখন অন্যরোগের চিকিৎসা করবেন। দেখি তিনি কী পরামর্শ দেন।

যা-হোক ডাক্তার, নার্স সবই পাওয়া গেল। প্রায় একঘণ্টার মধ্যেই এখানে চিকিৎসা পরামর্শ সেরে আবার আমরা রওয়ানা দিলাম। কী যে গন্তব্য তাও ভুলে গেছি টেনশনের কারণে। ডাক্তারকে বোঝানোর জন্য তার সাথে আরেকজন মহিলাকে ভেতরে পাঠানো হলো। ভেতর থেকে ফেরত এলে সঙ্গীকে দেখলাম খুব বিরক্ত। কারণ, ডাক্তারও নাকি রোগীর অসচেতনতার জন্য বিরক্ত হয়েছে। ডাক্তার দেখানোর পর রোগী কিছুটা আরামবোধ করছেন মনে হলে আমরা গন্তব্যের দিকে যাত্রা শুরু করি।গাইড বলল—প্রথমেই আমাদের পুত্রাজায়া সিটি মানে মালয়েশিয়ার নতুন রাজধানী দেখাবে, যেখানে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ও রয়েছে। ছুটে চলল বাস। আবার বিমানবন্দর থেকে কুয়ালালামপুর যেতে পুত্রাজায়ার অবস্থান আগে।

বলে রাখা ভালো, কুয়ালালামপুর শহরের ভিড় বেড়ে যাওয়া, ট্রাফিকের ঘনত্ব, নানা ধরনের ব্যস্ততার কারণে প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক রাজধানী পুত্রাজায়া নির্মাণ করেন বহুত্ববাদী মালয়েশিয়ার নির্মাতা ড. মাহাথির মোহাম্মদ। পুত্রাজায়া নির্মাণের পেছনে মাহাথিরের পরিকল্পনা তার স্মৃতিকথায় তিনি লিখেছেন। কুয়ালালামপুর শহরে প্রতিদিন সরকারি কর্মচারীদের অনেক কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়। বাণিজ্য, পণ্য আদান-প্রদান সব বন্ধ হয়ে যায় শুধু যানজটের কারণে। মাহাথির এমন একটি শহরের স্বপ্ন দেখেছেন, যেখান কোনো যানজট এবং পরিবেশদূষণ থাকবে না। সকল সরকারি কর্মচারী একই এলাকায় বসবাস করতে পারবে। পুত্রাজায়া হবে পার্ক, গাছগাছালি, লেক, জলাধার, প্রশস্ত রাস্তাসহ বাগিচা শহর। রাস্তায় থাকবে ফুল ও সৌন্দর্য প্রকাশের বৃক্ষসমূহ। এটি হবে মালয় জাতির রুচি ও মর্যাদার প্রতীক। এভাবেই তিনি পুত্রাজায়া শহরের পরিকল্পনা করেন এবং সফল হন। এর প্রমাণও পাওয়া যায় পুত্রাজায়ার প্রতিটি স্থানে। মাহাথির বলেছেন :

 A Doctor in the House-এ—‘Putrajaya is a beautiful, functional city. When I visited the Versailles Palace outside of Paris. I heard the guide proudly extol its beauty. But when the Sun King Louis XIV built it, the people of Paris had no bread to eat. When we built Ptrajaya, Malaysian had full stomachs. It was not built at the cost of neglecting their needs. It expressed the people’s own pride, not their laeder’s vanity.’

মাহাথিরের এ কথাটি যে কোনো রাষ্ট্রনায়ক বা সমাজকর্মী ভেবে দেখতে পারেন। আমরা খেয়াল করি, একজন নেতা হিসেবে তার গভীরতা, দায়িত্ববোধ ও জাতির মর্যাদার বিষয়ে নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গিকে। পুত্রাজায়া নির্মাণ করা হয়েছে একেবারে সুপরিকল্পিতভাবে। দেখলেই মনে হয় যে, নিয়ম নীতির কোনো ব্যত্যয় ঘটে নি। ফলে, পুত্রাজায়ায় কোনো ট্রাফিক জ্যাম বা হৈ চৈ নেই। পুরো শহরকেই মনে হয় একটি পার্ক। শুধু প্রশাসনিক, বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত ও পলিসি লেবেলের কাজগুলো এখানে হয়ে থাকে। হাটবাজার, পণ্যপরিবহন, আর যত বাজারি হৈচৈ সবই হয় কুয়ালালামপুরে। গাইড একদিকে সেসব বিবরণ দিয়ে যাচ্ছেন আর আমরা আমাদের তথ্য জানার সাথে মিলিয়ে যাচ্ছিলাম। খুবই পরিকল্পিতভাবে নির্মিত হলেও পুত্রাজায়াকে কৃত্রিম বলে মনে হয় না। কথা বলতে বলতে আমরা পৌঁছে গেলাম এক উঁচু টিলায়। আমরা পুত্রাজায়া কনভেনশন সেন্টারে পৌঁছার অল্পসময় পর হঠাৎ অন্ধকার, এই আলো এই আঁধার। রোদের আর তেজ নেই। আবহাওয়ার এ খেলা দেখে অবাকই হতে হয়। সোনালি রোদ, তাপ তখন উধাও। মুহূর্তের মধ্যে ভারি মেঘলা আকাশ, অতঃপর কিছুক্ষণ পর এল বৃষ্টি। সেখানে তোলা আলোকচিত্রের মধ্যে মেঘাবৃত আকাশ ও বৃষ্টির চিহ্ন রয়েছে। গাড়ি থামলো পুত্রাজায়া কনভেশন সেন্টারের পাশে। পুত্রাজায়া আন্তর্জাতিক কনভেনশন সেন্টার’-এর স্থান পছন্দেই রয়েছে অভিনবত্ব। চারদিকে নিচু আর মাঝখানে এ উঁচু একটি টিলার উপরে এটি নির্মাণ করা হয়েছে। অসামান্য এক স্থাপত্যশৈলী। বিশাল এলাকাজুড়ে এর অবস্থান। চারদিকে বাগান, গাছপালা বেষ্টিত একটি ইমারত। এটি এখন মালয়েশিয়ার অনন্য একটি স্থাপত্য।

1
পুত্রাজায়া কনভেনশন সেন্টার (পিসিসি)

পিসিসি-র পাশে দাঁড়িয়ে পুত্রাজায়ার সৌন্দর্য অবলোকন করা যায়। আমরাও একটি সুন্দর জায়গা থেকে পুত্রাজায়ার স্থাপনা ও লেক ইত্যাদির একাংশ দেখে নিলাম। কনভেশনের সেন্টার ওইদিন বন্ধ ছিল, ফলে ভেতরে আর প্রবেশ করা হয় নি। দু-একজন কর্মচারী দেখা গেল। আর তেমন কেউ নেই। পিসিসি-র নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০০১ সালে এবং সম্পন্ন হয় ২০০৩ সালে। তা বাহ্যিকভাবে দেখতে অত্যন্ত আকর্ষণীয়। উপরে ছাদের অংশটি অনেকটাই ঈগলের সামনের অংশের মতো। দু-পাশে বিস্তৃত দু-টি ডানা মাঝখানে ধারালো তার ঠোঁট। এভাবেই এর স্থাপত্য দেখানো হয়েছে। চারপাশ স্বচ্ছ কাচে আবৃত, যাতে সহজেই আলো কনভেনশনের কক্ষগুলোতে প্রবেশ করতে পারে। এ সেন্টারে একত্রে ১৫,০০০ হাজার দর্শক বসার জন্য আসন তৈরি করা হয়েছে। উল্লেখ্য যে, কনভেনশন হলটি নির্মাণের পর দশম ওআইসি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।


এ আধুনিক মালয়েশিয়া দেখলেই মনে হবে একজন সৃজনশীল মানুষের মৃত্যু নেই। 


কনভেনশন হলের চারপাশ দেখার পর গাড়ি চলেছে পুত্রাজায়া শহরের বিভিন্ন রাস্তা ধরে। গাইড বলল এখন রাস্তার পাশে কর্মরত যত শ্রমিক দেখবেন তারা বেশিরভাগই বাংলাদেশি। গাইড এও বলল যে, বাংলাদেশি শ্রমিকরা খুবই পরিশ্রমী ও সৎ। একদিকে গর্ববোধ করলাম আবার অন্যদিকে ভেতরে ভেতরে কষ্টও হলো যে, আমাদের ভাইয়েরা এখানে এসে পরিচ্ছন্নতাকর্মীর কাজ করছে, এ রোদ ও বৃষ্টিতে। আমরা আরও উন্নত হলে এখানে এ রোদ-বৃষ্টির মধ্যে এসব কাজ করতে হতো না। কষ্ট করে তারাই মূল্যবান বৈদেশক মুদ্রা দেশে পাঠাচ্ছে আর আমরা এত কষ্টের টাকা যথেচ্ছ ব্যবহার করছি। পুত্রাজায়ার সুন্দর সরকারি ও বাণিজ্যিক ভবন দেখতে দেখতে চললাম এগিয়ে। প্রতিটি ভবনের সামনেই বিশাল ফাঁকা জায়গা। সুন্দর ঘাস, বাগান, সারি সারি চমৎকার বৃক্ষ দিয়ে সাজানো খোলা জায়গাগুলো। এসব বাগানে কাজ করছে বিভিন্ন দেশের শ্রমিক। বুঝলাম অধিকাংশই বাংলাদেশের লোক। ঘুরতে ঘুরতে থেমে গেলাম মালয়েশিয়া-প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সামনে।

3
পিসিসি থেকে দেখা পুত্রাজায়া

মালয়েশিয়া বেড়াতে এলে নিশ্চয়ই এ জায়াটি ভ্রমণে কেউ ভুলবেন না। একজন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও সংলগ্ন এলাকায় এমন কী দেখার থাকতে পারে, কিন্তু এটি দেখার জন্যই প্রস্তুত করা হয়েছে। এটি শুধু একজন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় নয়। পর্যটকদের জন্য অবশ্যই দর্শনীয় স্থান। কার্যালয়টি একটু উঁচু টিলায় অবস্থিত। কার্যালয়ের সামনে বিশাল গোলচত্বর। গোলচত্বর থেকে প্রবেশপথটি উপরের দিকে ওঠে গেছে। চারপাশে বনবীথিকায় সজ্জিত একটি অনন্য জায়গা। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় হলেও সিকিউরিটির কোনো তৎপরতা লক্ষ করি নি। অবাক হতে হয় বৈ কি, মনে হলো একটি পর্যটন এলাকা। কার্যালয়ের চারপাশে নাগেশ্বর, চাপা, পাম, ঝাউসহ বিভিন্ন ধরনের গাছগাছালিতে ছায়াঘেরা বাগান। মূল প্রবেশপথের পাশেই রয়েছে চমৎকার একটি লেক, মসজিদ ও বিপণীকেন্দ্র। এখানে বেড়াতে এলে যে কেউ বাজারও করতে পারেন।

4
মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী ড. মাহাথির মোহাম্মদের কার্যালয়

এখানে এখন কাজ করেন আধুনিক মালয়েশিয়ার নির্মাতা ড. মাহাথির মোহাম্মদ। মালয়েশিয়ার জনগণ বলেন—মাহাথির মোহাম্মদের অফিস। ওই জায়গাটা দেখেই আবেগাপ্লুত হতে হয়। খোলামেলা জায়গা, এত পর্যটক। বিশাল চওড়া রাস্তা ধরে প্রবেশ পথ। গোলচত্বরের বামপাশে সুন্দর একটি মসজিদ।

5
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সংলগ্ন মসজিদ

কড়া রোদের তেজ তারপরও পর্যটকদের কমতি নেই। এখানে এলেও হিসেব করা যাবে কত নিবিড় পরিকল্পনা ও দূরদর্শী চিন্তা ভাবনায় নতুন একটি রাজধানী-নগর গড়ে তোলা হয়েছে। সর্বত্রই যেন মাহাথির-ভাবনার ছোঁয়া। এ আধুনিক মালয়েশিয়া দেখলেই মনে হবে একজন সৃজনশীল মানুষের মৃত্যু নেই। রাজনীতিতেও যে সৃজনশীলতার মহৎ স্বাক্ষর রাখা যায় এটি তার প্রমাণ। এখানে না এলে কেউ বুঝবেন না।

পুত্রাজায়ার সৌন্দর্য দেখতে দেখতে ফিরে এলাম কুয়ালালামপুরের ব্যস্ততম এলাকা বুটিক বিনতাং-এ। এটি কুয়ালালামপুরের মূল জায়গা। শুনেছিলাম এখানে একটি বাঙালি রেস্তোরাঁ রয়েছে নাম রসনা বিলাস। আমাদের বাসটি অনেক কষ্টে এ রাস্তায় প্রবেশ করে। ওই গলিতেই অবস্থিত সেই রসনাবিলাস রেস্তোরাঁ। আমাদের বাংলাদেশি প্রতিনিধির কাছে গল্প শুনেছি এ হোটেলের। মালিক নাকি দেশের কোনো এক আসনে সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। মালয়েশিয়াতে তার নাকি খুব সুনাম।

6
বুকিত বিনতাং-এর ব্যস্ততম একটি এলাকা

বাংলা খাবারের হোটেল কুয়ালালামপুরে, ভাবতে ভালো লাগে। আরও শুনলাম বাংলাদেশের সম্মানীয় লোকজন, রাজনৈতিক অনেক নেতৃবৃন্দ এ রেস্তোরাঁয় আতিথেয়তা গ্রহণ করেছেন। গল্প শুনে আমাদের ভেতরে আলাদা এক আবেগ কাজ করেছে। বাংলাদেশি নমুনায় খাবার গ্রহণ করব। দুপুরে অসম্ভব ক্ষুধা নিয়ে গেলাম সে-রেস্তোরাঁয়। স্থান খুব বড় নয়, তবে কেবিনের একটি অংশ রয়েছে। ওখানে আমাদের বসানো হয় নি। ওটা না কি ভিআইপিদের জন্য সংরক্ষিত। বুঝলাম, মালিক পক্ষ আমাদেরকে শ্রমিকই ভেবেছে। ফলে আর ভেতরে বসায় নি। কিন্তু উনি জেনেছেন যে, আমরা সরকারি কর্মকর্তা বাংলাদেশ থেকে শিক্ষা সফরে গেছি। আমাদের উপস্থিতির সময় তিনি ওখানে ছিলেন। মালয়েশিয়ার ব্যস্ততম একটি এলাকার রেস্তোরাঁয় তেল চটচটে দাগসম্বলিত মেলামাইনের প্লেটে পরিবেশন করা হলো খাবার। একেবারে গুলিস্তানি নিম্নস্তরের রেস্টুরেন্টগুলোর কায়দা। তাতে সমস্যা নেই, মালয়েশিয়ার মতো স্থানে মেলামাইনের ময়লা প্লেট দেখে অবাক হলাম। যে দু-জন পরিবেশন করল তাদের পরনে এত ময়লা টি-শার্ট আরও বিস্ময়কর। তা দেখে খাবারের রুচি নষ্ট হয়ে গেল। তার কথাবার্তা আর খাবার পরিবেশনের ক্রিয়া দেখে একজনকে নম্র সুরে একবার ধমক দিলাম। সে উত্তর দিল—‘ভাই, আমি হলাম এ হোটেলের মালিকের ছোট ভাই, আপনাদের জন্য এ রমজান মাসে কাজ করছি, না হয় করতাম না।’ তার কথা শুনে আরও অবাক না হয়ে উপায় আছে। দুপুরে খাবারের মেনু ছিল ভাত, লাউ সবজি আর মোরগের মাংস। আমাদের আগের ব্যাচে যারা বসেছেন তারা কিছুটা পেয়েছেন। আমরা আর পাই নি। আমরা কয়েকজন অপেক্ষা করে সামান্য খাবার পেলাম। না পেলাম ভালো সবজি, না পেলাম মোরগের মাংস।


ক্যামেরা তাক করি দূরের আলোর দিকে। আহা! মহাকাশে গোল চাঁদের মতো দেখাচ্ছে।


ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণ আর খুব বিরক্তি নিয়ে চলে আসি আমাদের জন্য নির্ধারিত হোটেল আনকাসা ইন্টারন্যাশনাল-এ। অনেকক্ষণ লাগল চেক ইন হতে। তারপর তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে কিছু সময় বিশ্রাম। আবার যেতে হবে ডিনার ও ইফতারে। প্রথমেই বিপত্তি বাধল এ হোটেলের কক্ষ নিয়ে। আমি শুধু নই সবাই বিরক্ত। কক্ষগুলো খুবই ছোট নড়াচড়া করা যায় না। আর খোলামেলা বাতাস প্রবেশের কোনো ছিদ্রও রাখা হয় নি। তবে কি আমাদের ঠকানো হচ্ছে স্টার হোটেলের কথা বলে। ইফতারের সময় আমরা হোটেল বদলানোর বিষয়ে কথা বললাম প্রতিনিধির সাথে। তিনি বললেন—ব্যবস্থা করবেন। আবার আমরা উপস্থিত ইফতারে ওই রসনাবিলাস হোটেলে। দুপুরে খেয়ে ভালো লাগে নি। কিন্তু সন্ধ্যার ইফতারে রেস্তোরাঁটি সরগরম। এখানে বাংলাদেশি শ্রমিক যারা রয়েছে তাদের বেশিরভাগই এ হোটেলের খদ্দের। তারা অল্প দামে খাবার পাচ্ছে এখানে, এ হলো সুবিধা। এখানে বসে মনেই হয় না বিদেশে আছি। বাংলায় সব কথাবার্তা, চেঁচামেচি।

দুপুরে ক্ষুধার জ্বালায় কেউ টের পায় নি কোথায় কী খাচ্ছি। কিন্তু এখন সবাই একটু বিরক্ত। আবার সেই একই ধরনের খাবার। ইফতারের মেনুও ভালো ছিল না। একজন একটু পেয়েছে তো আরেকজন অন্য আইটেম পায় নি। লংকাউইতে যে পরিমাণ ও ভালো মানের খাবার সবাই খেয়েছে, হঠাৎ এখানে এ স্কেল একেবারে নিচে নেমে গেল। তারপর আমাদের গাইডকে নিয়ে বসে সবাই বলল এখানে আর খাবেও না, আর যে হোটেলে রাখা হয়েছে এটা বদলাতে হবে। ওখানে থাকার মতো কোনো পরিবেশ নেই। এ নিয়ে কতক্ষণ দেনদরবার, তর্ক-বিতর্ক। এর মধ্যে এল ঝমঝম তুমুল বৃষ্টি। ভিজলাম কতক্ষণ বৃষ্টিতে। মালয়েশিয়ার বৃষ্টিতে ভিজতে হবে তা-ই মনে করে।

ইফতার ও রাতের খাবার শেষে হেঁটেই ফিরছিলাম হোটেল আনকাসার দিকে। বৃষ্টি হচ্ছে। টিম লিডারকে স্মরণ করিয়ে দিলাম আগামীকালের জন্য উপহার কিনতে হবে। ফলে, আমাকেই যেতে বলা হলো, সাথে আরও এক সদস্য যাবেন। কী আর করা। গিফট কিনতে ঢুকে পড়ি চায়না টাউনে। কানে বাজল শুধুই চায়না ভাষার শব্দাবলি। কতক্ষণ ঘুরলাম, কিন্তু কিছুই পেলাম না।পাশে একটি ভারতীয় দোকান থেকে গিফট কিনে ফিরে এলাম হোটেলে। আমার কক্ষটি ছিল পাদু সেন্ট্রাল মূল রাস্তার উপরে, ফলে অপর পাশের বিল্ডিংগুলোর আলো এসে পড়ছে জানালার কাচে। জানালার কাচে প্রতিফলিত হওয়া আলো দেখে ভাবছিলাম—কেমন ভিন্ন কিছু দেখাচ্ছে। কক্ষের আলো নিভিয়ে দেই। আর ক্যামেরা তাক করি দূরের আলোর দিকে। আহা! মহাকাশে গোল চাঁদের মতো দেখাচ্ছে। ক্লিক করতেই অসামান্য একটি ইমেজ পেলাম। বাহ! যা দিয়ে আগামীকাল অন্যদের বোকা বানানো সম্ভব। এ ছাড়া আর কী করার আছে আমার, এ ঢং ছাড়া।


৮ পর্বের লিংক

স্বপন নাথ

জন্ম ৪ মে ১৯৬৮; বড়লেখা, মৌলভীবাজার। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর, বাংলা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়; এমফিল, ভাষাবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

পেশা : শিক্ষকতা; উপপরিচালক (গবেষণা ও তথ্যায়ন), নায়েম, শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

প্রকাশিত বই :
প্রবন্ধ—
চিন্তা ও জগৎ : সাহিত্য সংস্কৃতি [প্রবাস প্রকাশনী, যুক্তরাজ্য ২০০৭]
কবিতার নন্দনবিশ্ব [অনিন্দ্য প্রকাশ, ঢাকা ২০১৭]
কথার বুনন [জিনিয়াস পাবলিকেশন্স, ঢাকা ২০১৯]
ছিন্ন কথামালা [জিনিয়াস পাবলিকেশন্স, ঢাকা ২০১৯]

কবিতা—
রৌদ্র ও বৃষ্টিতে মায়াহরিণ [ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ, ঢাকা ২০০৭]
জলৌকা চোখের চাতাল [ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ, ঢাকা ২০১০]
নির্জন বিচালির ডানা [কবি প্রকাশনী, ঢাকা ২০১৩]
নখের আউঠা [উৎস প্রকাশন, ঢাকা ২০১৪]
নানকার ধানবীজ [উৎস প্রকাশন, ঢাকা ২০১৫]
একলব্যের ছিন্ন আঙুল [নাগরী, সিলেট ২০১৬]
সংশয়ের বসতি [নাগরী, সিলেট ২০১৭]
গ্রাম বজ্রযোগিনী [জিনিয়াস পাবলিকেশন্স, ঢাকা ২০১৯]

ই-মেইল : rudro71@gmail.com