হোম ভ্রমণ মালয়েশিয়া ভ্রমণ : সামান্য দেখা

মালয়েশিয়া ভ্রমণ : সামান্য দেখা

মালয়েশিয়া ভ্রমণ : সামান্য দেখা
230
0

৫ পর্বের লিংক


পর্ব- ৬

চলতে চলতে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়-এর আরণ্যক উপন্যাসে বন-জঙ্গলের কথা ভাবছিলাম। প্রকৃতিকে মানব জীবনের অনুষঙ্গ হিসেবে তিনি দেখিয়েছেন এ উপন্যাসে। ওখানেই ফিরে যাবার তাড়না, কিন্তু রক্ষার কোনো উদ্যোগ তেমন চোখে পড়ে না। তার বর্ণনা স্মরণ করা যায়—‘কাছেই বনের মধ্যে কোথায় একটা ঝরনার কল মর্মর সেই শৈলমালাবেষ্টিত বনানীর গভীর নিস্তব্ধতাকে আরো বাড়াইয়া তুলিয়াছে।… বুদ্ধদেব নববিবাহিতা তরুণী পত্নীকে ছাড়িয়া যে-রাত্রে গোপনে গৃহত্যাগ করেন, সেই অতীত রাত্রিতে এই গিরিচূড়া গভীর রাত্রির চন্দ্রালোকে আজকালের মতোই হাসিত; তমসাতীরের পর্ণকুটিরে কবি বাল্মীকি এক মনে রামায়ণ লিখিতে লিখিতে কবে চমকিয়া উঠিয়া দেখিয়াছিলেন সূর্য অস্তাচল চূড়াবলম্বী, তমসার কালো জলে রক্তমেঘস্তূপের ছায়া পড়িয়া আসিয়াছে, আশ্রমমৃগ আশ্রমে ফিরিয়াছে, সেদিনটিতেও পশ্চিম দিগন্তের শেষ রাঙা আলোয় মহালিখারূপের শৈলচূড়া ঠিক এমনি অনুরঞ্জিত হইয়াছিল, আজ আমার চোখের সামনে ধীরে ধীরে যেমন হইয়া আসিতেছে। সেই কতকাল আগে যেদিন চন্দ্রগুপ্ত প্রথম সিংহাসনে আরোহণ করেন; গ্রিক হেলিওডোরাস গরুড়ধ্বজ-স্তম্ভ নির্মাণ করেন; রাজকন্যা সংযুক্তা যেদিন স্বয়ংবর-সভায় পৃত্থীরাজের মূর্তির গলায় মাল্যদান করেন; সামুগড়ের যুদ্ধে হারিয়া হতভাগ্য দারা যে রাত্রে আগ্রা হইতে গোপনে দিল্লি পলাইলেন; চৈতন্যদেব যেদিন শ্রীবাসের ঘরে সংকীর্তন;… হাজার হাজার বছর নিশ্চিহ্ন হইয়া গিয়াছে অতীতের ঘন কুজ্ঝটিকায়,… দেশ জয় করিল, সাম্রাজ্য পত্তন করিল, ভেনাস দ্য মিলোর মূর্তি, পার্থেনন, তাজমহল, কোলোঁ ক্যাথিড্রাল গড়িল, দরবারি কানাড়া ও ফিফথ সিম্ফোনির সৃষ্টি করিল এরোপ্লেন, জাহাজ, রেলগাড়ি, বেতার, বিদ্যুৎ আবিষ্কার করিল—অথচ পাপুয়া, নিউগিনি, অস্ট্রেলিয়ার আদিম অধিবাসীরা, আমাদের দেশের ওই মুণ্ডা, কোল, নাগা, কুকিগণ যেখানে সেখানেই কেন রহিয়াছে এই পাঁচ হাজার বছর?’


বিভূতিভূষণের লেখা থেকেই সমর্থন পেয়ে যাই ওখানে জীবনবীজ ও আশ্রয়ের সম্পর্ক রয়েছে।


মজার বিষয় হচ্ছে সবখানেই মানুষ বেড়াতে গেলে জল ও জঙ্গল দেখতে চায়। প্রাচীনকালে তান্ত্রিক, ঋষিরাও স্তব করতেন জঙ্গলে। ধ্যান, জ্ঞানচর্চা, কোনো নতুন তত্ত্বকথার উদ্ভাবনে অথবা নগরে কোনো বিপর্যয় দেখা দিলে ওই জঙ্গলই ছিল আশ্রয়। এর কি কোনো মৌল কারণ আছে? বিভূতিভূষণের লেখা থেকেই সমর্থন পেয়ে যাই ওখানে জীবনবীজ ও আশ্রয়ের সম্পর্ক রয়েছে। জীবনকে পুনর্বিবেচনার সুযোগ বিদ্যমান। আবার সেই জল বা বন থেকে বেরিয়ে এলেও লবণাক্ত স্বেদ, গন্ধ আর বনের বৈশিষ্ট্য দু-টোই আমাদের অস্তিত্বে বিদ্যমান। তবে আমরা অনেক উলটো কাজ করে চলেছি। মানব সভ্যতার নানা ধাপে ধাপে মানুষ জীবনের অনিশ্চয়তা কাটাতে প্রকৃতি থেকে খাদ্য সংগ্রহে অত্যাচার শুরু করে। ধীরে ধীরে দখল করে নিল প্রকৃতির শক্তিকে। ক্রমাগত মানুষ সভ্যতার নির্মাণে নিজের অনেক সুযোগ সুবিধা তৈরি করেছে। নগর নির্মাণ করেছে। কিন্তু প্রকৃতির কোল ছেড়ে এল মানুষ, সেখানে আর প্রকৃতির আপন থাকল না। এর ফলে প্রকৃতিও প্রতিশোধ নিতে শুরু করে। এ প্রসঙ্গে রবার্ট রেডফিল্ড-এর কথাগুলো মনে পড়ে। তিনি তার The Primitive World and Its Transformatione বইয়ে বলেছেন :

‘The precivilized society was like the present day primitive society in those characteristics- isolation, smallness, homogeneity, persistence in the common effort to make a way living under relatively stable circumstances- to which we have already attended, and therefore it was  like the parallel societies which we can observe today in that its fundamental order was matter of moral conviction.’

আমাদের মনস্তরের কাঠামোতে ওই জল ও জঙ্গল যৌগের প্রাগৈতিহাসিকতাই ক্রিয়া করে। সাগর দেখতে দেখতে অনেকেই বললেন—এবার পাহাড় দেখতে যাব। তেনজাংরো সমুদ্র সৈকত থেকে চললাম ডরিন জলপ্রপাত লগ্ন পাহাড়ের দিকে। সবার অভিমত একই, তাই চলছি ঝরনার দিকে। কিছুক্ষণ যাবার পরই আমরা জঙ্গলের রাস্তায় প্রবেশ করি। আবহাওয়া খুবই উষ্ণ। তাতানো রোদ। গাড়ির ভেতর না থাকলে শরীর যেন একেবারে পুড়ে যায়। এ জন্য পাহাড়ি রাস্তায় চলতে ভালো লাগছে, ছায়াঘন পথে যাচ্ছে গাড়ি। শীততাপ হলে কী হবে বাইরের গরমে গাড়ির চামড়াও উত্তপ্ত। চারদিকে নীরব নির্জন পথ ধরে চলতে চলতে বেশি দূর নয়। আমরা পৌঁছে যাই ডরিন জলপ্রপাত- এ। ঘন জঙ্গল, গাছ-গাছালিতে আবৃত একটি জায়গা। জলপ্রপাত অংশের রাস্তায় প্রবেশদ্বারে কিছু দোকানঘর রয়েছে। এগুলোতে আছে ঠান্ডা পানীয় আর শোপিস। যা পর্যটকরাই কিনে থাকেন। আপাতত কিছু না নিয়ে জলপ্রপাতের রাস্তায় প্রবেশ করি।

লংকাউই-এর উত্তরে কুয়া শহর থেকে প্রায় ১৬ কিমি দূরে অবস্থিত সবচেয়ে উঁচু পাহাড় গুনাং রায়া। এ পাহাড়েই সেই ডরিন জলপ্রপাত। আমরা আজ এখানেই উপস্থিত। যখন বেশি বৃষ্টিপাত হয় তখন এ জলপ্রপাতটি পূর্ণরূপে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। পর্যটকদের সমাগমও বেড়ে যায়। আমরা গেলাম মে মাসে তখন এ জলপ্রপাতের যৌবন রূপটি দেখতে পাই নি। শুনেছি মালয়েশিয়ার মধ্যে প্রকৃতি ও জলপ্রপাতের হিসেবে এটি সবচেয়ে সুন্দর স্থান। ঘন জঙ্গলে পরিবেষ্টিত একটি জলপ্রপাত। খুব নির্জন, একা এলে ভয় লাগারই কথা। বিভিন্ন প্রজাতির গাছপালায় সমৃদ্ধ পাহাড়। বিশাল বিশাল বৃক্ষ, লতাগুল্ম, বাঁশবনে ভর্তি। ফলে, বনভোজন বা বেড়ানোর জন্য এ স্থানটিকে মালয়রা সবসময়ই প্রাধান্য দিয়ে থাকে।

1
ডরিন জলপ্রপাত

আমি একটু স্মরণ করতে চাই আমার শৈশব, সেই দুরন্ত সময়। যে মাধবকুণ্ডে ছুটে গেছি বারবার, সেই মাধবকুণ্ড জলপ্রপাতের কথা। আমরা বাড়িতে কাউকে না বলে অনেক সময় সেই গা ছমছম করা পাথারিয়া পাহাড়ে ছুটে যেতাম। পাহাড়ের পথে চলতাম দুঃসাহসে। তখন পাহাড়ে ওঠার কোনো সিঁড়ি বা খাজকাটা রাস্তা কিছুই ছিল না। তারপরও ডানপিঠে বালকবেলায় সাহস করেছি। নানা ধরনের পশুপাখির ভয় করি নি। কিন্তু বিপজ্জনক ছিল খুব সে সময়। না ছিল রাস্তা, না ছিল কোনো নিরাপত্তা। তবুও আনন্দ ছিল, না চিনে কত যে সুস্বাদু বনজ ফল খেয়েছি। পাহাড়, জলপ্রপাত, ঝরনা এ তিনে মিলে এক অসাধারণ স্থান মাধবকুণ্ড। সেখানে এখন বন, ফল, পাখি কোনোটাই নেই।

লংকাউই-এর এ প্রপাত, পাহাড়, ঝরনার সাথে আমাদের বিশেষত মাধবকুণ্ডের একটি তুলনামূলক হিসেব করা যেতে পারে। এখানেও ওই জায়গায় যেতে সুন্দর একটি রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু পাহাড়, মাটি, জঙ্গল, গাছপালা কিছুই ধ্বংস করা হয় নি। পাহাড়টি দেখলেই বোঝা যায়, এখানের গাছগুলো পুরনো। কখনও ঝড়ে বা এমনিতে গাছ পড়ে যাচ্ছে, তাতে কেউ হাত দেয় না। অনেক পুরনো গাছ মাটিতে পড়ে ফসিল হয়ে যাচ্ছে। তবুও কারও এদিকে আগ্রহ নেই। সমস্ত পরিবেশ দেখে বোঝা যায় মালয়েশিয়াতে বাগান থেকে গাছ কেউ চুরি করে নিয়ে যায় না। প্রকৃতি তার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য নিয়েই বিদ্যমান। মালয়েশিয়ার জনগণের প্রকৃতি সচেতনতা দেখে মুগ্ধ হই। মূলত, তারা টেকসই ফরেস্ট ডেভেলপমেন্ট-এর আওতায় প্রকৃতির স্থিতি বজায় রেখেছে।

মাধবকুণ্ডে ইট সিমেন্ট গেছে, রাস্তা হয়েছে, বাজার তৈরি হয়েছে, পর্যটনের বিশ্রামঘর হয়েছে, ওখানের প্রকৃতি শাসন করা হচ্ছে। তবে সেই মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত এখন মৃত। তা বললে অনেকেই রাগ করতে পারেন। ওখানে নিসর্গ মৃত। সবচেয়ে মজার হচ্ছে—ইকো পার্কের নামে পাহাড় কেটে তার স্বীয় চেহারা ধ্বংস করা হয়েছে। প্রাকৃতজ বন শিকড়সহ উচ্ছেদ, পরিষ্কার করে অর্থলগ্নি বনায়ন হয়েছে। মাধবকুণ্ডে জলপ্রপাতে যাবার রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছে। আশেপাশের বন ধ্বংস করে সেখানে পর্যটনের রেস্টহাউস এবং চারপাশে সেগুনগাছের বনায়ন করা হয়েছে। কত বিস্ময়ের বিষয়, প্রকৃত বন শেষ করে সেগুন, মেহগনি, একাশিয়া গাছের বনায়ন। ইকোব্যালেন্স আছে বৈ কি? মাধবকুণ্ড নেই, আছে কৃত্রিম পর্যটন। এ নিয়ে নিসর্গবিদ দ্বিজেন শর্মার দুঃখ ছিল অনেক। হয়তো তার লেখা অনেকেই পড়ে থাকবেন। দ্বিজেন শর্মা লিখেছেন : ‘কিশোরবেলা থেকেই মাধবকুণ্ড আসছি। সত্তর বছরের পরিবর্তন আমার দেখা। …শুরু হয় সামাজিক বনায়ন। ঝাড়গুলি উপড়ে ফেলে এখন চলছে দারুবৃক্ষের চাষ। অনুমান করি, তাতে থাকবে একাশিয়াসহ বিদেশি গাছও। শুনে হতবাক। হাজার ফিটের অধিক উঁচু বিস্তীর্ণ পাহাড়ে এই ধরনের উদ্যোগকে তুঘলকি কাণ্ড ছাড়া আর কী ভাবা যায়? যেখানে স্বাভাবিক অরণ্যের পুনর্জন্ম প্রয়োজন সেখানে চির-খুঁড়ে গাছের আবাদ বানানো পাহাড়ের স্থিতি ও পরিবেশের জন্য বিপর্যয়ী হবে তা বলাই বাহুল্য। আমরা ঘর থেকে বেরিয়ে দূরের পাহাড় দেখি। সেই গাঢ় নীল এখন ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। সবটাই এখন খালি, ধসের চিহ্ন স্পষ্ট। গোটা ব্যাপারটা সম্পর্কে ভেবে কোনোই ইতিবাচক সম্ভাবনা আঁচ করতে পারি না। এই বিশাল এলাকা এখন বনশূন্য হলে বন্য প্রাণী ও পাখিরা যাবে কোথায়? আমরা প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য সুরক্ষা নিয়ে কত কথা বলি, কিন্তু কার্যত চলি উল্টো পথে। কেন এমনটি ঘটে? এই অসংগতির উৎস কোথায়? আমার পক্ষে সেদিন অকুস্থলে যাওয়া সম্ভব হয় নি, তাই বাস্তব চিত্রের সঠিক বর্ণনা দিতে পারলাম না। ভারাক্রান্ত মনে বাড়ি ফেরার পথে গোটা ব্যাপারটিকে একটি দুঃস্বপ্ন ভেবেই হাঁটতে থাকি।’

যা বলতে চাই, ডরিন জলপ্রপাতে বন ধ্বংস করা হয় নি। জলের ধারাকেও শাসন করা হচ্ছে না। তবে এ জলপ্রপাত আহামরি কিছু নয়। যে পাহাড় থেকে এ জলধারার উৎপত্তি এটি খুব সুন্দর। একটু এগুতেই দেখলাম একটি ঝরনা স্বচ্ছ জলের ধারায় বয়ে চলেছে। স্বচ্ছ ঝরনার রূপ অতি সহজেই চোখ কেড়ে নেয় তার দিকে। চমৎকার পরিবেশ দেখেই মন জুড়িয়ে যায়। খুবই পরিচ্ছন্ন, কাদামাটি, ধুলাবালি ছড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। মূল প্রবেশপথ পেরিয়ে একটু এগুলেই জলপ্রপাতের শব্দ শোনা যায়, কিন্তু মূল প্রপাতটি বেশ উপরে ও দূরে। প্রবেশপথেই একটি সাইনবোর্ড, তাতে লেখা আছে ফরেস্ট বলতে কী বোঝায়। আমার দলের সদস্যরা কিছুটা পেছনে রয়েছেন। চারদিকে ঘন বনবনানী দেখে একটু ভয়ও পেলাম। কিন্তু আবার সাহসে একাই এগিয়ে চলি সামনের দিকে। খুব নীরব পাহাড়, কেউ আছে বলে মনে হলো না। কোনো সিকিউরিটিও চোখে পড়ল না। আমাদের হাতে সময় ছিল একেবারেই কম। জলপ্রাপত থেকে বয়ে আসা ঝরনার শীতল জলে দিয়ে মুখ ধুয়ে নিলাম। অন্য এক অনুভূতি যা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। শীতল অনুভূতি ও ঝরনার স্বচ্ছ সৌন্দর্য সত্যিই অবাক করে দেয়। কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত ছন্দে ছন্দে ঝরনার এমন সৌন্দর্য প্রকাশ করেছিলেন।

‘ ঝর্না! ঝর্না! সুন্দরী ঝর্না!

শৈলের পৈঠেয় এস তনুগত্রী
পাহাড়ে বুক-চেরা এস প্রেমদাত্রী,
পান্নার অঞ্জলি দিতে দিতে আয় গো,
হরিচরণ-চ্যুতা গঙ্গার প্রায় গো,
স্বর্গের সুধা আনো মর্ত্যে সুপর্ণা!
ঝর্না!’
[সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত : ঝর্না]


ডরিন জলপ্রপাতে মালয়েশিয়া সরকারের পরিবেশবান্ধব দৃষ্টিভঙ্গি লক্ষ করা গেল। 


এগুতে থাকি আর চারদিকে লক্ষ রাখি। ভাবলাম প্রপাতটি দেখতে হলে অনেক দূর যেতে হবে। উপরের দিকে যেতে সিদ্ধান্ত নিয়ে দেখি পাহাড়ের গা ঘেঁষে সিঁড়ি ও ধাপগুলো তৈরি করা হয়েছে এ পাহাড়েরই পাথর দিয়ে। এখানে কোনো ইট, সিমেন্ট রড ব্যবহার করা হয় নি। পুরো সিঁড়ির এ পথটি সেভাবেই তৈরি। পাহাড়ের গা ঘেঁষে সিঁড়ি দিয়ে উপরে চলেছি।

2
জলপ্রপাতের কাছে যাবার সিঁড়ি

অবশ্য সিঁড়িপথে পা পিছলে যেতে পারে এজন্য সতর্কতা সম্বলিত নোটিশ দেওয়া আছে। কতক্ষণ পরপর দাঁড়ানোর জন্য পাথরের প্লেট দিয়ে প্লাটফরম তেরি করে দেওয়া আছে। যাতে কিছুক্ষণ হাঁটার পর বিশ্রাম নেওয়া যায়। একসময় পৌঁছে গেলাম সেই প্রপাতের কাছাকাছি। সশব্দে জল পড়ছে উপর থেকে। ওখানে যেতে পা পিছলে যেতে পারে, এজন্য আমি আর নিচে নামি নি। আমার সঙ্গী কয়েকজন জলপড়ার স্থানটি স্পর্শ করে নিলেন। চমৎকার একটি জলপ্রপাত যদিও খুব বড় নয়।

3
জলপ্রপাতের একপাশে দাঁড়িয়ে লেখক

এ জলপ্রপাতের একটি বৈশিষ্ট্য হলো উপর থেকে নেমে আসা জল ১৪টি ধাপ অতিক্রম করে। কখনও কোনো ধাপে এসে ঝরনা লুকিয়ে গেছে পাথর ও পাহাড়ের খাঁজে। আবার বেরিয়ে গেছে ঝরনা হয়ে। ফলে মনে হয় ছোট ছোট ১৪টি জলপ্রপাত। মনে হবে লাফ দিয়ে দিয়ে নেমেছে ঝরনা। প্রতিটি বাঁকা ধাপে আলাদা আলাদা প্রপাত তৈরি হয়ে গেছে। পাথরের পথ ধরে নেমে এসেছে প্রপাতের জল।

4
ঝরনার একটি ধাপ

জলপ্রপাতটি আলাদা করে দিয়েছে পাহাড়ের দু-অংশ। সমস্যা নেই। দু-পারের যোগাযোগে কাঠ দিয়েই তৈরি হয়েছে সংযোগ সেতু। এ সেতু দিয়ে প্রথমে পার হয়ে মূল সিঁড়িতে যেতে হয়। তারপর উপরে উঠার চেষ্টা। আমিই প্রথম উপরে উঠলাম অনেক কষ্ট করে। কয়েকজন এলেন পেছনে। কয়েকজন আর উপরে উঠতে পারেন নি। তারপর একেবারে নিচের স্তরে হলো স্বচ্ছ জলের ঝরনা। বলে রাখা ভালো যে, এখানে পাহাড় কেটে নির্মিত কোনো সাধারণ বা ভিআইপি গেস্ট হাউস খুঁজে পাওয়া গেল না। আমাদের দেশে এমন মনোরম জায়গায় গেস্ট হাউস ও বিনোদনকেন্দ্র নির্মিত হওয়ার রেওয়াজ আছে। পরিবেশের বাঁচামরা তোয়াক্কা করতে হয় না। ডরিন জলপ্রপাতে মালয়েশিয়া সরকারের পরিবেশবান্ধব দৃষ্টিভঙ্গি লক্ষ করা গেল। মালয়েশিয়ার কোথাও ইকোপার্ক ও সামাজিক বনায়নের নামে বনবিরোধী তৎপরতা লক্ষ করা যায় নি।

5
ঝরনার উপর পাহাড়ের দু-অংশের সংযোগ সেতু

জলপ্রপাত থেকে ফেরার পথে বাসের মধ্যে কেউ কেউ গান গাওয়ার চেষ্টা করছেন। কিন্তু এ চেষ্টা আর বেশি সফল হয় নি। কারণ সারাদিন ঘোরাঘুরির পর সবাই ক্লান্ত। ফিরতে হবে ইফতারের উদ্দেশে। আধঘণ্টা চলার পর হোটেলের কাছাকাছি আসতেই আমাদের কাছে সংবাদ এল যে, আজ আর আমাদের ইফতারি আবাসিক হোটেল আদিয়াতে হচ্ছে না। অন্য কোনো এক রেস্তোরাঁয় ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং সেখানেই ডিনার হবে। ঠিক কী কারণে কর্তৃপক্ষ তা বাতিল করেছে তা জানা যায় নি। তবে আমরা দু-একজন বুঝে নিয়েছিলাম। আমরা একটু সন্দেহ করেছি এবং ভাবনাও মনের মাঝে ছিল, তার বাস্তব প্রমাণও পেলাম আজ। কারণ, গতকাল হোটেল আদিয়া ইন্টারন্যাশনাল-এ ছিল বুফে ইফতার ও ডিনার। আবাসিক অতিথি হিসেবে সেখানে আজও ইফতার হওয়ার কথা। ইফতারের স্থান বদলির কারণ উদ্ধারে মনোযোগ দিতেই হলো। কারণ অতিথি হিসেবে এ ঘটনা ছিল আমাদের জন্য অপমানজনক। আমাদের টিম লিডার ইফতার শেষ করে বললেন—অবশ্যই আদিয়া কর্তৃপক্ষের কাছে জানতে চাইব কেন আমাদের ইফতার ও ডিনার বাতিল করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে যা জেনেছি তা কোনো গুরুতর কারণ নয়। বুঝে নিলাম, ইফতার থেকে আমাদের সরিয়ে রাখতেই হোটেল কর্তৃপক্ষ এ কৌশল গ্রহণ করেছে। পরোক্ষ সূত্রে যা জানতে পারি যে, আমরা নাকি বুফে খাবারের নিয়ম মানি নি। তা না মেনে ইচ্ছেমতো খাবার গ্রহণ ও নষ্ট করেছি। কোনো কোনো খাবার একাধিকবার নেওয়ার ফলে হোটেল কর্তৃপক্ষ নিশ্চয়ই ভয় পেয়েছে কিনা। এ আতঙ্ক থেকে আজ আমাদের ইফতার ও ডিনার বাতিল করেছে। আমরা এতে অপমানিতবোধ করেছি, কিন্তু কিছুই করার ছিল না। তা-ই আমাদের ট্যুর গাইড আগে থেকেই অন্য একটি হোটেলে ব্যবস্থা করেছেন।


লংকাউই-এর এত সুন্দর প্রকৃতি, শান্ত, নির্জনতা কোথাও পাব না।


আবাসিক হোটেলে ফিরে খুব তাড়াহুড়ো করে ফ্রেশ হলাম। নিচে ডাক এল যত তাড়াতাড়ি নামতে হবে। ইফতার-স্থলে নেওয়ার জন্য গাড়ি অপেক্ষা করছে। দ্রুত নেমে চললাম ওই রেস্তোরাঁর দিকে। যাই হোক নতুন রেস্তোরাঁয় ইফতার ও ডিনার সেরে ফিরে এলাম হোটেল আদিয়া ইন্টারন্যাশনাল-এ। আজ যেখানে ইফতার ও ডিনার হলো সেখানে কয়েকজনের চেহারা দেখে মনে হলো, নিশ্চয়ই এরা মধ্যপ্রাচ্যের কোনো দেশের লোক। এখানে সাক্ষাৎ হলো হোটেলে কাজ করেন এক বাংলাদেশি যুবক জয়নালের সাথে। তিনি মাদারিপুরের লোক, প্রায় ১১বছর হলো মালয়েশিয়াতে আছেন। তার সাথে কথা বলে ভালো লাগল। তিনি জানান এ হোটেলের মালিক ইয়ামেনি। জানতে চাইলাম ঈদের সময় দেশে যাবেন কি না? উত্তর দিলেন—না এই কিছুদিন হলো বাংলাদেশ থেকে ঘুরে গেছেন।

আহারে আজ তাড়াতাড়ি গোছাতে হবে সবকিছু। পরদিন (১৪ মে ২০১৯) খুব ভোরবেলা ওঠা লাগবে। সকালেই কুয়ালালামপুরের উদ্দেশে যাত্রা, লংকাউই থেকে সোয়া ১০টায় আমাদের ফ্লাইট। এজন্য সকাল ৮টার মধ্যেই প্রস্তুত হয়ে ছুটতে হবে বিমানবন্দরের উদ্দেশে। আদিয়ার সামনে থেকে বিমানবন্দরের উদ্দেশে সকাল ৮টায় বাস ছাড়বে। এভাবেই প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম রাতে। কিন্তু হোটেল আদিয়া ছেড়ে যেতে ইচ্ছে হচ্ছিল না। মজার ব্যাপার হলো এখানে পরিবেশ, হোটেল, সবমিলিয়ে প্রেমে পড়ে গেলাম। তা-ই আর ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করছে না। গতকাল রাতেও আমার তাই মনে হয়েছে।

হোটেল আদিয়া ইন্টারনাশনাল-এর সার্ভিস, কক্ষ, লবি, সকালের নাস্তা অসাধারণ আয়োজন। শুধু ইফতার সংশ্লিষ্ট অপমানের অংশ ছাড়া। আমরা সকলেই তাদের আতিথেয়তায় মুগ্ধ হয়েছিলাম। আমি একা হলে হোটেল না ছেড়ে আরও দু-একদিন থেকে আসতাম। যেখানে শান্তি সেখানেই তো অবস্থান করা ভালো। লংকাউই-এর এত সুন্দর প্রকৃতি, শান্ত, নির্জনতা কোথাও পাব না। তারপরও ছাড়তে তো হবেই। কোথাও যেন একটি বিচ্ছেদের ভার আমার ভাবনায় ক্রিয়া করে। রাতে দেখি অনেকক্ষণ ঘুম আসে না। বিছানার এপাশ-ওপাশ ছটফট করি। কার, কী জন্য এখানে থাকার বাসনা। আসলে কিছু নয়, বিষয়টি খুব সামান্য। আমার এ ভাবনাটি কেউ হয়তো পাত্তা দেবে না। লংকাউই একই সাথে নিসর্গময় শহর ও গ্রাম এবং নির্জন মানুষের জন্য উপযুক্ত জায়গা। নির্ভেজাল জীবন কাটানোর এক অপূর্ব স্থান। এ দু-দিনের অভিজ্ঞতায় আমার তা-ই মনে হয়েছে। এখানে সেরকম উপার্জনের আয়োজন নেই, পরিবেশন দূষণ নেই, কিন্তু শান্তি আছে। নানা বর্ণ, গোত্রের মানুষ কী আনন্দে সময় পার করছে। আমার এরচেয়ে অতিরিক্ত কী দরকার। নিছক একান্ত নিজস্ব ভাবনাগুলো করোটির মধ্যে লাফালাফি করছিল।

২০১৯-এর ১৪ মে খুব সকালে ইচ্ছের বিপক্ষে প্রস্তুতি নিতে হলো। সকলে নাস্তার টেবিলে অনেকের সাথে সাক্ষাৎ। সকাল ৮টার দিকেই রওয়ানা দিলাম লংকাউই বিমান বন্দরের উদ্দেশে। আমাদের ভ্রমণগাইড হিশাম যথাসময়ে গাড়ি নিয়ে উপস্থিত। সে ব্যক্তি হিসেবে কী ধরনের মানুষ জানি না। এখন পর্যন্ত যা পেয়েছি তার তুলনা সে নিজেই। অসীম ধৈর্যশীল এক মানুষ। তার কথা বারবার বলতেই হয়। হিশাম সামগ্রিকভাবে খুব পেশাদার ব্যক্তি। লংকাউই বিমান বন্দরের দিকে যেতে যেতে আমাদের উদ্দেশে সে তার বিদায়ী কথাগুলো বলে যাচ্ছিল। তার উচ্চারিত শব্দ, বাক্যগুলো পেশাদারিত্বের হলেও ভালোবাসায় ব্যঞ্জনাময়। যে কথাগুলো খুব সুন্দরভাবে হিশাম বলেছে বিদায় বেলায় : ‘আমি বাংলাদেশে একবার গিয়েছিলাম বিশ্ব ইজতেমা উপলক্ষে। ঘুরে দেখেছি কিছু জায়গা। টঙ্গিতে ছিলাম, টঙ্গির মানুষদের সাহায্য পেয়েছি। আমার মনে হয়েছে, বাংলাদেশের মানুষ খুব ভালো, অত্যন্ত অতিথিসেবক’।আশ্চর্য—এ দু-দিনে কখনও সে বাংলাদেশ ভ্রমণের বিষয়টি বলে নি। মনে হলো বিদায়বেলায় প্রকাশের জন্য মাথায় সঞ্চিত রেখেছিল আন্তঃবন্ধনের কথা সকল। হিশাম জানায়, ইজতেমায় এত মানুষ দেখে সে বিস্মিত হয়েছে। ওই সময় টঙ্গির মানুষের আন্তরিকতায় সে মুগ্ধ হয়েছে। তার ভালো লেগেছে টঙ্গি শহর। আজ সে নিজেই বলল—আবার সুযোগ পেলে সেখানে আসতে পারে। এলেও হয়তো ব্যস্ততায় আমাদের সাথে তার দেখা হবে না। বাংলাদেশের এ টঙ্গিতে এলেও এত মানুষের ভিড়ে আমাদের কথা তার মনে উঁকি দেবে কি না, জানি না। হিশাম আমাদের বিদায় জানায়। শেষবারের মতো শুভেচ্ছা বিনিময় করে বিমানবন্দরে চেক-ইন লবির দিকে চলতে থাকি। জানি না এ হিশাম, সুয়ামি কারও সাথে এ জীবনে আবার দেখা হবে কি না। কিন্তু কর্মব্যস্ততায় আর কিছু মনে না এলেও তাদের কথা স্মরণে আসবে বারবার। লংকাউই আমাকে শিখিয়ে দিয়েছে নিরর্থক হৈচৈ আর ভালোবাসার কোনো মানে হয় না। নাই বা হলো কথা, এ হৃদয়জ ভালোবাসা থাক চিরদিন।

‘মানুষ মানী জ্ঞানী প্রধান হয়ে গেছে; তবুও হৃদয়ে
ভালোবাসার যৌন-কুয়াশা কেটে
যে-প্রেম আসে সেটা কি তার নিজের ছায়ার প্রতি?
জলের কলরোলের পাশে এই নগরীর অন্ধকারে আজ
আঁধার আরও গভীরতর ক’রে ফেলে সভ্যতার এই অপার আত্মরতি;
চারি দিকে নীল নরকে প্রবেশ করার চাবি
অসীম স্বর্গ খুলে দিয়ে লক্ষ কোটি নরকীটের দাবি
জাগিয়ে তবু সে-কীট ধ্বংস করার মতো হয়ে
ইতিহাসের গভীরতর শক্তি ও প্রেম রেখেছে কিছু হয়তো হৃদয়ে।’
[জীবনানন্দ দাশ : অনন্দা]


৭ পর্বের লিংক

স্বপন নাথ

জন্ম ৪ মে ১৯৬৮; বড়লেখা, মৌলভীবাজার। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর, বাংলা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়; এমফিল, ভাষাবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

পেশা : শিক্ষকতা; উপপরিচালক (গবেষণা ও তথ্যায়ন), নায়েম, শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

প্রকাশিত বই :
প্রবন্ধ—
চিন্তা ও জগৎ : সাহিত্য সংস্কৃতি [প্রবাস প্রকাশনী, যুক্তরাজ্য ২০০৭]
কবিতার নন্দনবিশ্ব [অনিন্দ্য প্রকাশ, ঢাকা ২০১৭]
কথার বুনন [জিনিয়াস পাবলিকেশন্স, ঢাকা ২০১৯]
ছিন্ন কথামালা [জিনিয়াস পাবলিকেশন্স, ঢাকা ২০১৯]

কবিতা—
রৌদ্র ও বৃষ্টিতে মায়াহরিণ [ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ, ঢাকা ২০০৭]
জলৌকা চোখের চাতাল [ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ, ঢাকা ২০১০]
নির্জন বিচালির ডানা [কবি প্রকাশনী, ঢাকা ২০১৩]
নখের আউঠা [উৎস প্রকাশন, ঢাকা ২০১৪]
নানকার ধানবীজ [উৎস প্রকাশন, ঢাকা ২০১৫]
একলব্যের ছিন্ন আঙুল [নাগরী, সিলেট ২০১৬]
সংশয়ের বসতি [নাগরী, সিলেট ২০১৭]
গ্রাম বজ্রযোগিনী [জিনিয়াস পাবলিকেশন্স, ঢাকা ২০১৯]

ই-মেইল : rudro71@gmail.com