হোম ভ্রমণ মালয়েশিয়া ভ্রমণ : সামান্য দেখা

মালয়েশিয়া ভ্রমণ : সামান্য দেখা

মালয়েশিয়া ভ্রমণ : সামান্য দেখা
280
0
৩ পর্বের লিংক

পর্ব : ৪


পক্ষীরাজের ভূমিতে


কবি শামসুর রাহমান স্বর্ণপ্রভ হে ঈগল শব্দগুচ্ছে কবিতার পঙ্‌ক্তি লিখেছেন। ঈগল যে পাখিদের রাজা তা কবি শামসুর রাহমানও বলেছেন। আমরা লংকাউই দ্বীপে রাজ গোত্রীয় পাখিরা কেমন আছে তা দেখব। তবে এটি সরলভাবে বলা যায়—রাজাদেরই রাজ্য লংকাউই। শিশুতোষ রচনায় খ্যাত কীর্তি সুকুমার রায় এ পক্ষীরাজ প্রজাতির পরিচয় দিয়েছেন সংক্ষেপে। হয়তো অনেকেই পড়েছেন। এ বছরের ১৩মে আমরা প্রথমেই গেলাম সে রাজার রূপ দেখতে ঈগল স্কয়ারে। এভাবেই ওইদিন সকালে যাত্রা শুরু। খোঁজ পেলাম লংকাউই-এর একটি দ্বীপে রয়েছে ঈগলের সংরক্ষিত আবাসভূমি। এ সূত্রেই এ দ্বীপের নাম-পরিচিতি। ঈগল সংশ্লিষ্ট বলেই এ ভূমির নামকরণ হয়েছে লংকাউই। এ ঐতিহ্যে লংকাউই শহরে কুয়া জেটির কাছে জলের উপর একটি কাঠামো ও ১২মিটার উচ্চতা সম্পন্ন ঈগলের বড় একটি ভাস্কর্য নির্মাণ করা হয়েছে। মালয়েশিয়া এ ঐতিহ্য ধারণ করে পক্ষীরাজার স্বীকৃতি দিয়েছে।


সিংহকে আমরা পশুরাজ বলি—সুতরাং ঈগলকেও পক্ষীরাজ বলা উচিত।


সুকুমার রায়ের সিন্ধু ঈগল রচনাটির কথা স্মরণ করি। লংকাউই দ্বীপে যে পরিবেশে ঈগলের বসবাস তা সুকুমার রায়ের রচনার সাথে মিলে যায়। সুকুমার রায় লিখেছেন,—‘সমুদ্রের ধারে যেখানে ঢেউয়ের ভিতর থেকে পাহাড়গুলো দেয়ালের মতো খাড়া হয়ে বেরোয় আর সারা বছর তার সঙ্গে লড়াই করে সমুদ্রের জল ফেনিয়ে ওঠে, তারই উপরে অনেক উঁচুতে পাহাড়ের চূড়ায় সিন্ধু ঈগলের বাসা। সেখানে আর কোনো পাখি যেতে সাহস পায় না—… ঈগলবংশ রাজবংশ—পাখির মধ্যে সেরা। সিন্ধু ঈগলের চেহারাটি তার বংশেরই উপযুক্ত—মেজাজটিও রাজার মতো। সিংহকে আমরা পশুরাজ বলি—সুতরাং ঈগলকেও পক্ষীরাজ বলা উচিত;… সারাদিন তারা আকাশে উড়ে উড়ে বেড়ায়। বেড়াতে বেড়াতে কোথায় গিয়ে ওঠে, মনে হয় যেন সে মেঘের রাজ্যে চলে গিয়েছে, পৃথিবীর উপর বুঝি তার কোনো দৃষ্টি নেই। কিন্তু ঈগলের চোখ বড় ভয়ানক চোখ। ঐ উুঁচতে থেকেই সে সমস্ত দেখছে—কিছুই তার চোখ এড়াবার জো নেই। ঐ যে কত পাখি জলের ধারে খেলছে আর মাছ ধরছে, তার মধ্যে একটা মেছো-চিল ঘুরে ঘুরে শিকার খুঁজছে—ঈগল পাখির চোখ রয়েছে তারই উপর।’

সুকুমার রায়ের বর্ণনার মতোই এখানে ঈগলের অবস্থান। তবে এখনও মানুষের মাঝে ঈগলমার্কা সুন্দর চোখের সাক্ষাৎ হলো না, এটাও ভাবি। সে চোখ জোড়া ঈগলের মতো ছোঁ মেরে নিয়ে যাবে ভেতরে নাচানাচি করা রূপকথার ইঁদুর। পর্যটন এলাকায় না পাওয়ার কথা নয়। অনেক ঘুরছি পাই নি, ভেতরে ভেতরে একটা আক্ষেপ রয়ে যাবে কি না। কত সুন্দরী রূপসীরা এখানে সেখানে বেড়াতে যায়। বিদেশের মাটিতে এসে এরকম সকল সৌন্দর্যের মাঝে তা যদি না পাওয়া যায় তবে কপাল মন্দই বলতে হবে। দেখা মিলে নি তা নয়, তবে আকাঙ্ক্ষার সাথে মিলে নি। যা দেখেছি এখনও আকৃষ্ট করতে পারে নি। এ সুন্দর প্রকৃতির মধ্যে কী একটা যেন খুঁজে বেড়াচ্ছি…।

1
ঈগলস্কয়ারে স্থাপিত ঈগল ভাস্কর্য

ঈগলের ঐতিহ্যকে বাস্তবে কাজে লাগিয়েছে মালয়েশিয়া। তাও সাধারণ ঈগল পাখির ভাস্কর্য নির্মাণ করে। আমাদের আছে পাখি, নদী, হাওড়, জল, পাহাড়, সমুদ্র, বালি, পাথর ও প্রকৃতি। নিজেকে প্রশ্ন করি, আমরা কী করেছি। তাদের উদ্দেশ্য ছিল, ঈগলকে কেন্দ্র করে একটি ভ্রমণকেন্দ্র গড়ে তোলা। এটাও ব্র্যান্ডিং-এর অংশ। তাই ভূমির বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় ঈগলের থিমটাকেই বেছে নেয়া হয়েছে। পুরো স্কয়ারে জমির পরিমাণ প্রায় ১৯ একর। সামান্য এ পাখি বিষয়কে কেন্দ্র করে থিমপার্ক নির্মাণ করা যায়, তা কেউ এভাবে ভাবতে পারে নি। শুধু ভাস্কর্য স্থাপন নয়, বিশেষত ঈগল-ভাস্কর্য স্থাপিত জয়গাটিকে সমুদ্রের জলের সাথে এমনভাবে মেলানো হয়েছে যা অনন্য এক নির্মাণশৈলীতে প্রকাশিত। গাণিতিক বিদ্যার এক অসামান্য প্রকাশ। পর্যাপ্ত আলোর প্রক্ষেপণে স্থানটি হয়ে উঠেছে ভিন্ন ও আকর্ষণীয়। সেখানে পার্ক ও শপিংমল তৈরি করা হয়েছে। গাড়ি পার্কিং-এর জন্য রয়েছে বিশাল জায়গা। সিফুডসহ নানা ধরনের রেস্তোরাঁ আলোকিত করে আছে এ স্কয়ার। এ স্কয়ার নির্মাণের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন করেছেন কেদা প্রদেশের অধিবাসী, বর্তমান মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ।

লংকাউই নামের উৎসে আছে এ ঈগল। আদি মালয় ভাষায় হেলং শব্দের অর্থ ঈগল আর কাউই শব্দের অর্থ হলো লালচে-বাদামি (রেডিশ-ব্রাউন)। এ থেকেই লংকাউই নামের উৎপত্তি। এখানে স্থাপিত ঈগলের রঙও করা হয়েছে রেডিশ-ব্রাউন। আগেই বলা হয়েছে লংকাউই নামের সাথে এ ঈগল-এর একটি সম্পর্ক রয়েছে। ফলে, লংকাউই নামের অর্থই হলো ঈগলের আবাসভূমি। এখানে স্থাপিত ঈগলের ভাস্কর্য লংকাউই নামেরই প্রতিফলন। এর পেছনেও ইতিহাসের সত্যতা রয়েছে। মালয়েশিয়ার মতো ঈগলের অভয়ারণ্য আর কোথাও আছে কি না আমাদের জানা নেই। হয়তো আর কোথাও নেই। মিথ সংশ্লিষ্ট ইতিহাসের সূত্র ধরেই একমাত্র মালয়েশিয়ার এ লংকাউই দ্বীপে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে ঈগলদের খাবার পরিবেশন করা হয়।

2
ঈগল স্কয়ারের নির্মাণশৈলী

ঈগল স্কয়ারের কাছে আন্দামান চ্যানেলের কুয়া জেটিতে নোঙর করা আছে সারিবদ্ধ জাহাজ, স্টিমার, স্থানীয় নৌকা, স্পিডবোট। আমরা চললাম কুয়া জেটির দিকে। প্রথমে বুঝতে পারি নি কোথায় যাচ্ছি। সবার গতিবিধি আর স্পিডবোট ড্রাইভারদের কথা শুনে মনে হলো স্পিডবোড দিয়েই যেতে হবে বারবাসা সৈকত ও হোপিং দ্বীপে। যেখানে দাঁড়িয়ে আছি এ স্থানটিও অনেক উপভোগ্য। চ্যানেলের স্বচ্ছ নীলাভ জল চোখের দৃষ্টি কেড়ে স্থির করে রাখে।

3
লংকাউই চ্যানেলে ভাসমান নৌযান

ঈগল স্কয়ার দেখে আমরা রওয়ানা হলাম বারবাসা ও হোপিং দ্বীপের উদ্দেশ্যে। এ কুয়া থেকে বারবাসা পর্যন্ত স্পিডবোটে যেতে সময় লাগতে পারে আনুমানিক আধঘণ্টা। ড্রাইভারদের সাথে বোঝাপড়া হলে ১০/১১ জন ভাগ হয়ে আমরা স্পিডবোটে উঠে বসলাম। সে কি এক অপরূপ দৃশ্য। স্পিডবোট গতিতে চলেছে। আমাদের বোটের চালক হলো মালয়ভাষী মোহাম্মদ সুয়ামি। আবহাওয়া এমনিতেই গরম, প্রচণ্ড রোদও ছিল সেদিন। তবে জলে ভাসমান অবস্থায় খারাপ লাগছে না। কিছুক্ষণ পর বৃষ্টি এলে আংশিক ভেজা হলো। আহারে বৃষ্টি বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় নি।


রাজনীতিতে প্রবেশকালে জেনেছিলাম আন্দামানে নিক্ষিপ্ত বিপ্লবীদের জীবন। 


সমুদ্রের এ চ্যানেলের বিশাল জলরাশির মধ্যে মনে হয় সারাজীবন কাটিয়ে দেয়া যায়। প্রতিদিন বোটে যদি ঘোরা যায় তাও মন্দ হবে না। এত স্বচ্ছ জল ও ছোট ছোট ঢেউ কার না ভালো লাগে। নিশ্চয়ই প্রেমিক যুগলেরা এখানে বিকাল-সন্ধ্যাটা উপভোগ করতে আসে। কুয়া জেটিতে ছোট ছোট খাবারের দোকানগুলো দেখে কিছুটা আঁচ করা যায়। অনুমান করি পৃথিবীতে এমন জায়গা খুব একটা নেই। যৌবনের উদ্দমতার সাথে এরকম সৌন্দর্য সত্যিই মানানসই। প্রতিদিনের বিকাল এখানেই কাটানো যায়। জীবনের শৃঙ্খলা আর ব্যাকরণ খুঁজে নিতে সব সৌন্দর্যবোধই শেষ। অতিরিক্ত চাপাচাপি, নিয়ম-বিধি, রীতির কারণে শারীরিক মৃত্যুর আগে কবেই মরে গেছি। সকলেই দেখছে আমি বেঁচে আছি, জীবন আছে; আসলে বেঁচে নেই। এটাকে বাঁচা ও জীবন বলে না। চারদিকে জলের বিস্তৃতি আমাকে নতুনভাবে স্মরণ করিয়ে দিল।

কতক্ষণ পর পর এক একটি দ্বীপের মতো উঁচু টিলাভূমি আবার জল। এগুলো সবই দ্বীপ। গাছগাছালিতে পরিপূর্ণ। মাঝে মাঝে মাটি দেখা গেলেও মনে হলো পাহাড়গুলোর মাটি ফসিলে পরিণত হয়েছে।

4
ফসিলে পরিণত হওয়া পাহাড়

স্পিডবোড ছুটছে আর জল উড়ছে, মাঝে মাঝে ঢেউয়ের তাল। এ সমুদ্রের জল স্পর্শ করে বেশ রোমাঞ্চিত মনে হলো নিজেকে। বালক বেলায় এ আন্দামান সাগরের বিবরণ আমরা ভূগোলে পড়েছি। তরুণ বয়সে জেনেছি, ব্রিটিশ উপনিবেশ বিরোধী বিপ্লবীদের ত্যাগ-তিতিক্ষার স্মৃতিধন্য এ আন্দামান। রাজনীতিতে প্রবেশকালে জেনেছিলাম আন্দামানে নিক্ষিপ্ত বিপ্লবীদের জীবন। এখন এসব কেউ না জানলেও রাজনীতির কিছু হয় না। রাজনীতি করতে এখন আর এসব জানতে হয় না। শুধু দাপট, মিছিল, সমাবেশের সঙ্গী হলেই হয়। যা-হোক জলের মধ্যে ভাসমান নির্জন দ্বীপে বন্দিদের নির্যাতন করা হতো। এ ছাড়াও মশলা নিয়ে কাড়াকাড়ি, দ্বন্দ্বের জন্য স্মরণীয় আন্দামান সাগর। হয়তো কত মানুষ মূল বাসস্থানে জীবন নিয়ে ফিরে যেতে পারে নি। বন্দিত্ব-কালের মধ্যেই মিশে গেছে এ সাগরের জলে। এমন কল্পনা করতে করতে ইতিহাসের ঘটনাবলি উঁকি দিল মনে। সেসব মনে হওয়াতে স্পিডবোটে বসে হাত বাড়িয়ে আন্দামানের ঢেউ ও জল স্পর্শ করে ভালো লাগল। আন্দামানের জলের ঢেউ জাগিয়ে দিল উপনিবেশের স্মৃতিচিহ্ন।

‘হঠাৎ যেন একটানে সকল দৃশ্য সরিয়ে নিল—সমুদ্র।
আকাশটাকে নামিয়ে এনে মাটির উপর গড়িয়ে দিল—সমুদ্র।
কিংবা যেমন আড়াল থেকে চোখের সামনে দৃশ্যপটে
হঠাৎ গুলিবিদ্ধ হরিণ
শূন্যলোকে লাফিয়ে ওঠে,
তেমনি করেই পাতাল ফুঁড়ে
হঠাৎ বিশ্বভুবন জুড়ে
চোখের সামনে লাফিয়ে উঠল—সমুদ্র।’

[দীঘায়, হঠাৎ : নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী]

পৌঁছে গেলাম বারবাসা। বারবাসা সৈকত তেমন বড় নয়। ছোট হলেও পরিচ্ছন্ন। সৈকতের স্বচ্ছ জল পর্যটককে আকর্ষণ করতে যথেষ্ট। জলের কাছে দাঁড়ালেই দেখা যায় নানা রকমের সামুদ্রিক মাছ কিলবিল করছে। এ স্বচ্ছ জলে নেমে অনেকেই লাফালাফি ও স্নান করতে উৎসাহী হবে। এর মাঝে কয়েকজন তরুণ-তরুণী কোথা হতে এসেছে তা বুঝতে পারি নি। সাঁতারের জন্য ঝটপট কাপড় পরিবর্তন করে নিল।

5
বারবাসা সমুদ্রসৈকত

এ ছাড়া সৈকত সংলগ্ন বনাঞ্চল খুবই আকর্ষণীয়। সৈকত সংলগ্ন হলেও তার পরিবেশ নষ্ট করা থেকে বিরত থাকে সবাই। সৈকতে রয়েছে প্রচুর বানর। বানরদলের সৌজন্যতা, অভ্যর্থনা আর তাদের আন্তরিকতা ছিল অনেক আনন্দের। বানরদলের কয়েকটি আমাদের কাছে আসে। এ সুযোগে কয়েকটি বানরের ছবি তুলি। তারা মূলত পর্যটকদের কাছে আসে খাবারের নেশায়। চমৎকার কিছু সময় কাটাই আমরা সেখানে। বানর দেখলে আমরা সাধারণত দুষ্টুমি শুরু করি। বারাবাসা সৈকতে বানরদলের সাথে খারাপ ব্যবহার করলেও তারা দুষ্টুমি করে নি। এ ছাড়াও এখানে বিস্কুট, চায়ের ২/৩টি দোকান রয়েছে। এগুলোতে আছে কোমল পানীয়, ডাব, বিস্কুট এবংচা সামগ্রী। একটি দোকানে নারিকেল ও মেহগনি ফলের খোলা শুকিয়ে একটি শোপিস তৈরি এবং একপাশে ঝুলিয়ে রাখা আছে। শুকনো নারিকেলের গায়ে কোমল পানীয়ের মুখের ছিপি ও লকেটসহ চেইন লাগিয়ে সুন্দর একটি ইমেজ তৈরি করা হয়েছে। নারিকেলের খোলায় লিখা আছে ট্রাই মি। এটি অতি সাধারণ বস্তু হলেও আমার কাছে মনে হলো—শিল্পরুচির নান্দনিকতা এতে প্রকাশিত হয়েছে। এটা অবশ্য ডাব বিক্রি করা ও বিজ্ঞাপনের এক অনন্য কৌশল।

6
ঝুলানো শোপিস

সকালের একটা সময় পর্যন্ত এখানে কাটানোর পর আমরা ফিরে চলি ঈগল পয়েন্ট ও হোপিং দ্বীপের দিকে। ফিরে আসার সময় ঈগলের আবাসভূমি পর্যবেক্ষণ করতে আমাদের সুযোগ ঘটে। স্পিডবোট আমাদেরকে ঈগলইটিং পয়েন্টে নিয়ে গেল ঈগল দেখার জন্যে। আমরা দেখলাম উড়ে উড়ে এর মধ্যে কয়েকটি ঈগল এসেছে খাবারের সন্ধানে। কয়েকটি ঈগল দ্বীপ সংলগ্ন জলে এসে ছোঁ মেরে মাছ ধরে নিচ্ছে। এ স্থানটিকে বলা হয় সিঙ্গাবেসার বা ঈগলইটিং পয়েন্ট।


গবেষকরা বলছেন, গবাদি পশুর মাংস ইদানীং আর ঈগল খাচ্ছে না। ঈগলের সংখ্যাও নাকি দিন দিন কমে যাচ্ছে।


ঈগল আবার পরিবেশ বান্ধব পাখিও বটে। মনে পড়ে, আমরা শৈশব ও কৈশোরে বাড়ির পাশে কালো দিঘির পারে ঈগল সমাবেশ দেখতাম। কিন্তু বড় হলে আর দেখা পাই নি। গবাদি পশু মারা গেলে আশেপাশের গ্রামের লোকজন দিঘির পারে রেখে যেত। পরদিন দেখা যেত হাড্ডি ছাড়া মৃত পশুর আর কিছু নেই। ঈগলের দল এসে সব শেষ করে দিত। বড় হলে ঈগলের দল বেধে না আসা আর পত্রপত্রিকার খবর পড়ে অবাক হই। গবেষকরা বলছেন, গবাদি পশুর মাংস ইদানীং আর ঈগল খাচ্ছে না। ঈগলের সংখ্যাও নাকি দিন দিন কমে যাচ্ছে। বলা হচ্ছে গবাদিপশুকে যে পরিমাণ অ্যন্টিবায়োটিক ও মোটাতাজাকরণ ট্যাবলেট খাওয়ানো হচ্ছে, এগুলোর প্রতিক্রিয়ায় পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। ঈগল এসব পশুর মাংস খেলেই মারা যাচ্ছে। ফলে, এ বিষাক্ত মাংস তারা আর পছন্দ করছে না। মনে মনে তা-ই ভেবেছিলাম যে, এখানে অন্তত ঈগল দেখা যাবে।

7
ঈগলপয়েন্টে কাক্সিক্ষত ঈগল

ঈগল নিয়ে অনেক মিথ ও কাহিনি প্রচলিত রয়েছে। এরকম একটি কাহিনি ঈশপের গল্পে পাওয়া যায়। ঈগলের কৃতজ্ঞতাবোধের গল্প। একবার এক ঈগল এক শিকারির ফাঁদে পড়ে ছটফট করছিল। এ দৃশ্য দেখে এক কৃষকের মায়া জাগে। তারপর কৃষক বন্দি ঈগলকে মুক্ত করে দিল কৌশলে। অনেকদিন পর ওই কৃষক ক্লান্ত হয়ে একটি দেয়ালের পাশে বসে বিশ্রাম করছিল। এ দেয়ালের এমন ভগ্নদশা ছিল যে, যেকোনো সময় ধ্বসে পড়তে পারে। একদিন সেই দেয়াল ঘেঁষে বসেছিল কৃষক। ঈগল সেই উপকারী কৃষককে অনুসরণ করছিল। হঠাৎ দেয়ালের ভেঙে পড়া দেখে ঈগল কৃষকের মাথায় থাকা টুপি নিয়ে উড়ে গেল। ঈগল যে দিকে উড়ছে সেদিকে কৃষকও দৌড়াতে লাগল। যখন কৃষক উঠে দৌড় দিল তখন দেয়ালটির ধ্বসে পড়া শুরু হলো। কিছু দূর যাবার পর ঈগল কৃষকের টুপিটি উপর থেকে ছেড়ে দিল মাটির দিকে। কৃষক ভাবল—অল্পের জন্য রক্ষা; ঈগল যদি টুপি না নিত, তা হলে অবশ্যই সে মারা যেত ওই দেয়ালের নিচে চাপা পড়ে। কৃষকের মনে পড়ল, কোনো একদিন শিকারির কাছ থেকে ওই ঈগলকে বাঁচানোর ঘটনা। এভাবে ঈগল নিয়ে কমবেশি অনেক গল্পই হয়তো সবখানে আছে। লংকাউই যেহেতু ঈগলের ভূমি, সেহেতু এখানে রূপকথা ও গল্প থাকাটাই স্বাভাবিক।

পশ্চিমা দেশগুলোর কোনো কোনো মুভিতে আমরা ঈগলের উপস্থিতি লক্ষ করি। এখানে এসে মনে পড়ে গেল আমাদের দেশের ঈগলশূন্যতার কথা। একটি ডাকের কথাও আছে—মুরব্বিরা বলতেন, ‘যে দেশে ঈগল নাই সে দেশে বিচার নাই’। উল্লেখ করতে হয়, মালয়েশিয়াতে ঈগল সরকারিভাবে পোষা হচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে খাবার দেয়া হয়ে থাকে। ঈগলের দেশে মালয়েশিয়ার জনগণ তাহলে এজন্য কী সুবিচার পাচ্ছে। তা অবশ্য ভিন্ন মিথ-সম্পর্কিত জটিলতা। স্মরণ করি ঈগল নিয়ে কবি আলফ্রেড টেনিসনের একটি কবিতা :

‘He clasps the crag with crooked hands;
Close to the sun in lonely lands,
Ring’d with the azure world, he stands.
The wrinkled sea beneath him crawls;
He watches from his mountain walls,
And like a thunderbolt he falls.’

[The Eagle]

পর্যটনের জন্য যে স্পিডবোটগুলো ঈগলইটিং পয়েন্টে যায়, সেগুলোর ইঞ্জিনের শব্দ বন্ধ করলে ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব ঈগলের ওড়াউড়ি। লক্ষ করি স্পিডবোটের ড্রাইভারগণ খবই সচেতন, তারা সেখানে পৌঁছার পর ইঞ্জিন বন্ধ করে দেয়। এখানে বাসরত ঈগলেরা এ ধরনের শব্দের সাথে খুব পরিচিত। কারণ প্রতিদিন যে পরিমাণ বোটের শব্দ তারা শুনে অভ্যস্ত, তাতে তারা বুঝে নিয়েছে—কেন লোকজন এখানে আসে। ঈগলেরা অনেক সময় মনে করে তাদের জন্য খাদ্য নিয়ে আসা হয়েছে। তবে লংকাউই-এর বোটম্যানরা এসব ঈগলের আচরণ খুব ভালো বুঝে।

৫ পর্বের লিংক

স্বপন নাথ

জন্ম ৪ মে ১৯৬৮; বড়লেখা, মৌলভীবাজার। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর, বাংলা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়; এমফিল, ভাষাবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

পেশা : শিক্ষকতা; উপপরিচালক (গবেষণা ও তথ্যায়ন), নায়েম, শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

প্রকাশিত বই :
প্রবন্ধ—
চিন্তা ও জগৎ : সাহিত্য সংস্কৃতি [প্রবাস প্রকাশনী, যুক্তরাজ্য ২০০৭]
কবিতার নন্দনবিশ্ব [অনিন্দ্য প্রকাশ, ঢাকা ২০১৭]
কথার বুনন [জিনিয়াস পাবলিকেশন্স, ঢাকা ২০১৯]
ছিন্ন কথামালা [জিনিয়াস পাবলিকেশন্স, ঢাকা ২০১৯]

কবিতা—
রৌদ্র ও বৃষ্টিতে মায়াহরিণ [ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ, ঢাকা ২০০৭]
জলৌকা চোখের চাতাল [ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ, ঢাকা ২০১০]
নির্জন বিচালির ডানা [কবি প্রকাশনী, ঢাকা ২০১৩]
নখের আউঠা [উৎস প্রকাশন, ঢাকা ২০১৪]
নানকার ধানবীজ [উৎস প্রকাশন, ঢাকা ২০১৫]
একলব্যের ছিন্ন আঙুল [নাগরী, সিলেট ২০১৬]
সংশয়ের বসতি [নাগরী, সিলেট ২০১৭]
গ্রাম বজ্রযোগিনী [জিনিয়াস পাবলিকেশন্স, ঢাকা ২০১৯]

ই-মেইল : rudro71@gmail.com