হোম ভ্রমণ মালয়েশিয়া ভ্রমণ : সামান্য দেখা

মালয়েশিয়া ভ্রমণ : সামান্য দেখা

মালয়েশিয়া ভ্রমণ : সামান্য দেখা
322
0
১৫ পর্বের লিংক

পর্ব- ১৬

Wise men have come to you to give you of
their wisdom, I came to take of your wisdom;
And behold I have found that which is greater than wisdom,
It is a flame spirit in your ever gathering more of itself,
While you, heedless of its expansion, bewall
the withering of your days,
It is life in quest of life in bodies that fear the
grave,there are no graves here.
These mountains and plants are a cradle and stepping-stone.
[Kahlil Gibran : The Prophet 117]

1
হারমোনি স্ট্রিট

প্রয়োজনীয় সময় খুব দ্রুত চলে যায়। মালাক্কায় বেড়াতে এসে তা-ই মনে হলো। এত অল্প সময়ের জন্য মালাক্কায় ঘুরতে আসা সঠিক হয় নি। নির্ধারিত সময়ের শৃঙ্খলে নিজেকে খুব অসহায় মনে হলো। যা কিছু হলো, তা একেবারেই স্বল্প। ভাবছি, অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা না দেখেই ফিরে যেতে হবে। আজ দুপুরের খাবার গ্রহণের পর খুব ক্লান্ত ও ভারি ভারি লাগছে নিজেকে। আরিফ, আমি আর সৌরভদা ভাবছিলাম ফেরার সময় মালাক্কার বিখ্যাত হারমোনি স্ট্রিটের দিকে যাব। এর মধ্যে রেহমান নিজেই গাড়ি ঘুরিয়ে নিয়ে চলে হারমোনি স্ট্রিটের দিকে। রেহমান বলল যে, হারমোনি স্ট্রিটে গাড়ি পার্ক করা যাবে না। যে কারণে আমাদের যেকোনো এক জায়গায় নেমে যেতে হবে। তার কথা মতো আমরা নেমে গেলাম চিনা মন্দিরের গেটে। প্রথমে এখানে নেমে এ স্ট্রিটের মূল্য বুঝতে পারি নি। তাই দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ এদিক-ওদিক দেখার পর আমরা প্রবেশ করি মন্দিরের ভেতর। দেখলাম কিছু লোক প্রণাম করে চলে যাচ্ছে আর কিছু লোক প্রার্থনায় ব্যস্ত। যা-হোক দেখে ভালো লাগল। সব মিলিয়ে খুব শান্ত পরিবেশ।

2
চেং-হুন-তেন চিনা মন্দির

চমৎকার সুগন্ধিতে মন্দিরে চমৎকার এক পরিবেশ বিরাজিত। আগরবাতির মতোই কী যেন এখানে জ্বালানো হয়েছে। জ্বলছে আর কুণ্ডলিপাকানো সাদা ধোঁয়া উড়ছে। মন্দিরের অভ্যন্তরে দাঁড়িয়ে খানিকক্ষণ লক্ষ করলাম পূজা ও প্রার্থনার রীতি। একজনের কাছে জানতে চাইলাম, এ মন্দিরের নামও এখানে প্রতিষ্ঠিত দেবতার পরিচয়। এ চিনা ভদ্রলোক কিছুই বললেন না। বুঝলাম তিনি ইংরেজি ভাষা বুঝতে পারেন নি। তিনি ইঙ্গিত করেন অন্য একজনের দিকে। যা-হোক এ সুন্দর ও আধুনিক মন্দিরটি প্রতিষ্ঠিত হয় আঠারো শতকের প্রথমদিকে। মূলত, ১৬৪৬ সালে চিনা এক ক্যাপ্টেন এ মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। এ মন্দির নির্মিত হলে একইসাথে তাও, কনফুসিয়াস ও বৌদ্ধধর্মের প্রার্থনা করার সুযোগ তৈরি হয়।


হিন্দু মন্দির আর একইসাথে মসজিদের অবস্থান মালাক্কায় অসামান্য এক সম্প্রীতির বন্ধন তৈরি করেছে।


এখানে শুধু এ মন্দির নয়, পাশাপাশি একটি মসজিদ ও একটি হিন্দু মন্দিরও রয়েছে। ফলে, এ এলাকাকে বলা হয় হারমোনি স্ট্রিট। ঔপনিবেশিক বা উপনিবেশোত্তর-কালে মালয়েশিয়ায় বিভিন্ন বিভিন্ন নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে যে দ্বান্দ্বিক টেনশন ছিল না, তা কিন্তু নয়। ছিল, আবার নজিব তারেকের সময় এ দ্বন্দ্বের কিছুটা বুদ্বুদ লক্ষ করা যায়। অবশ্য তা অল্পকালের মধ্যেই প্রশমিত হয়ে যায়। স্মরণীয় যে, মালাক্কাতে এ ধরনের সাম্প্রদয়িক কোনো ঝামেলা ঘটে নি। মালাক্কায় বাসরত সকল জনগোষ্ঠীর মধ্যে চমৎকার সম্পর্ক এখনও বিরাজমান। এ চিনা মন্দিরের একেবারে কাছাকাছি রয়েছে একটি মসজিদ। এর নাম হলো কামপুঙ ক্লিং মসজিদ।

3
কামপুঙ ক্লিং মসজিদ

ভারতীয় মুসলিম বণিকরা এ মসজিদ নির্মাণ করেন ১৭৪৮ সালে। দক্ষিণ ভারতীয় এসব বণিকদের মালয়িরা বলত ক্লিং। এ থেকে এ মসজিদের নাম হয় কামপুঙ ক্লিং।

এ মসজিদের পাশেই অবস্থিত হিন্দু সম্প্রদায়ের শ্রী পয়োত্তা বিনয়াগর মূর্তি মন্দির। ১৭৮১ সালে অর্থাৎ, ডাচ উপনিবেশ আমলে চিত্তিগোষ্ঠীর প্রধান থাবিয়ানাগর চিত্তি এ মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। সে সময় ডাচ শাসকরা চিত্তিগোষ্ঠীর মন্দিরের জন্য জমি ও প্রয়োজনীয় সহায়তা দান করে।

4
শ্রী পয়োত্তা বিনয়াগার হিন্দু মন্দির

লক্ষণীয় যে, চিনা, হিন্দু মন্দির আর একইসাথে মসজিদের অবস্থান মালাক্কায় অসামান্য এক সম্প্রীতির বন্ধন তৈরি করেছে। এর ফলে হারমোনি স্ট্রিট বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের অনন্য এক উদাহরণ। এ তিনটি উপসনালয় মালাক্কায় শুধু জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে সম্প্রীতির উদাহরণই তৈরি করে নি। কীভাবে পরস্পর বন্ধনে এবং অন্যকে আঘাত না করে বসবাস করতে হয় এর প্রকৃষ্ট দৃষ্টান্ত তারা সৃষ্টি করেছে। এসব উপাসনালয়ের পাশাপাশি অবস্থান ও শান্তির সাথে যে বসবাস করা যায়; তা বিশ্বের মধ্যে এক অসামান্য উদাহরণ। এঅর্থে জেনে নিলাম হারমোনি স্ট্রিটের মূল্য কোথায়। হারমোনি স্ট্রিটকে স্থানীয়ভাবে বিভিন্ন নামে ডাকা হয় বা এর ভিন্ন ভিন্ন পরিচিতিও রয়েছে। যেমন : জালান থুকাং ইমাস, জালান তুকাং বেশি ও জালান তকং। একে আবার টেম্পল স্ট্রিটও বলা হয়ে থাকে। তবে বাইরের পর্যটকদের কাছে হারমোনি স্ট্রিট নামটি বেশি পরিচিত। এর আশেপাশে আরও কিছু মসজিদ, চিনা ও হিন্দু মন্দির রয়েছে, তবে মন্দির ও মসজিদের জন্য হারমোনি স্ট্রিটই বিখ্যাত।

হারমোনি স্ট্রিটে দাঁড়িয়ে থাকি আর নীরবে কিছুক্ষণ ভাবি; এত চমৎকার এক পরিবেশ এখানে বজায় রাখা হয়েছে। মূল্য দেওয়া হচ্ছে ভিন্ন ভিন্ন বিশ্বাস ও সংস্কৃতির। সাধারণ মানুষ যার যার ধর্ম ও সংস্কৃতিকে চর্চা করেও তারা একত্রে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান করতে পারে এমন চমৎকার উদাহরণ মালাক্কায় এখন বাস্তবে দেখছি। বৈচিত্র্যের মধ্যেই এমন বসবাস। চিন্তা করি, এ পৃথিবীর সবখানে যদি এমন হতো, তাহলে কি অর্থনীতি, সমাজনীতি ও রাজনীতি অচল হয়ে যেত? কেন মানুষ তা হলে জড়িয়ে যায় হিংসা, ক্রোধ ও লোভের জালে? দুনিয়াব্যাপী জাত-পাত, বর্ণ, সাম্প্রদায়িকতা নিয়ে কত আগুন জ্বলেছে ও জ্বলছে। একেবারে নিরর্থক মনে হয় এসব হিংসা ও দ্বন্দ্ব।

অল্প সময় হারমোনি স্ট্রিটে দাঁড়ালেও ভাবছিলাম এ স্বল্প সময়ে পুরো দুনিয়ার সাম্য, হিংসা আর মানুষের মিলন নিয়ে। ফলে, শাস্ত্র-সংহিতার সকল ছবিই আমার মাথায় সচল হয়ে ওঠে। দুনিয়াতে অনেক ব্যক্তিই অপ্রত্যাশিত হিংসার মুখোমুখি হয়েছেন। মালাক্কায় এখানে দাঁড়িয়ে যার কথা স্মরণ হলো—তিনি হলেন অমর্ত্য সেন। তাকে কে না জানে, কে না চিনে। তার একটি গুরুত্বপূর্ণ বই হলো আইডেনটিটি অ্যান্ড ভায়োলেন্স দ্য ইল্যুশন অব ডেসটিনি। বই-এর শুরু হয়েছে একটি তিক্ত অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়ে। ট্রিনিটি কলেজে তার অধ্যাপনাকালীন ঘটনা দিয়ে। একবার ভ্রমণের সময় হিথ্রো বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন অফিসার তার পরিচয় যেভাবে জানতে চেয়েছেন, তাতে তিনি অবাক হয়েছেন। অমর্ত্য সেনের উত্তরে ইমিগ্রেশন অফিসারের অসন্তুষ্টি প্রকাশের সূত্র ধরে এ বইয়ের পাঠ শুরু হয়েছে। এ বইয়ের বর্ণনায় তিনি স্পষ্ট বলেছেন—মানুষের মধ্যে পরস্পর গ্রহণ করার শক্তি জরুরি। মালাক্কার বিষয়টি মাথায় রেখে সেখান থেকে ফিরে এ বইটি আবার দেখছিলাম। সেন তার বইয়ের একটি অধ্যায়ে হান্টিংটন-এর বইক্ল্যাস অ্যান্ড সিভিলাইজেশন-এর প্রসঙ্গ উত্থাপন করেছেন। তার পর্যবেক্ষণ হলো—মানুষের মধ্যে সংযোজন বিয়োজনের চর্চা পরস্পরের প্রতি হিংসাত্মক আচরণের জন্ম দেয়। এটি ক্রমাগত অপরিহার্য হয়ে উঠেছে এসব হিংসাত্মক মানুষের জন্য। এক্ষেত্রে সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদই সমাধানের নিশানা দিতে পারে। পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ, অন্যকে গ্রহণ করার ক্ষমতা খুব গুরুত্বপূর্ণ। একইসাথে চিন্তার স্বাধীনতাও অপরিহার্য। অর্থাৎ, মানুষকে স্বাধীনভাবে জীবনচর্চায় ভাবতে ও পছন্দ করার সুযোগ দিতে হবে।  অপরকে গ্রহণ করতে পারলে মানুষের মধ্যে আর সংঘাত যে হবে না, তা নিশ্চিত বলা যায়।

বিশ্বাস, চিন্তা, ভাবনা, দর্শনের প্রতি পরস্পর শ্রদ্ধাবোধ প্রচলিত সংঘাত থেকে মানুষকে বিরত রাখতে সহায়তা করে। সমাজে ভারসাম্য রক্ষার জন্য প্রতিটি ব্যক্তির পছন্দ ও সংস্কৃতিকে মূল্য দিতে হয়। বিচিত্র বিশ্বাস ও সংস্কৃতিকে সম্মানের সাথে গ্রহণ, হিংসা বিদ্বেষ থেকে মানুষকে দূরে রাখে। এক্ষেত্রে তিনি সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। যা সাধারণত আমরা করি না। মালাক্কা শহরের মানুষ এ বিচিত্র বিশ্বাস, সংস্কৃতি, আচার-আচরণকে পরস্পর গ্রহণ করে কয়েক শ বছর ধরে বিচিত্রের মধ্যে ঐক্য স্থাপন করেছে। এ হারমোনি স্ট্রিট হলো এর বাস্তব প্রমাণ। মালাক্কায় বাসরত প্রতিটি নাগরিকের প্রতি মুগ্ধতা আরও বেড়ে যায় তাদের মানবিক গুণাবলিতে। হারমোনি স্ট্রিট থেকে ফিরে আসার সময় শুধু ভেবেছি—গোটা পৃথিবী যদি এভাবে হয়ে যেত।

হারমোনি স্ট্রিট থেকে বের হয়ে আসার পথে পুরনো একটি বাড়ি দেখতে পেলাম। আগে মালাক্কায় এ-রীতির ঘর তৈরি করত মালাক্কাবাসীরা। কাঠ দিয়ে এমন ঘর নির্মাণ করা হতো। আরও স্মরণ করি যে, এ ধরনের ঘর আমরা দেখতে পেয়েছিলাম মালাক্কার ঐতিহ্যিক জাদুঘরে। গ্রামে না গেলেও আমরা শহরেই তা দেখতে পেলাম।

5
মালাক্কার ঐতিহ্যবাহী ঘর

এখান থেকে চলে আসার সময় আবদুর রেহমান নিজ থেকেই বলল—ঝংকার স্ট্রিট ও চায়না মার্কেটের দিকে চলেন, ভালো লাগবে। মাল্লাকায় যারা আসে, তারা সবাই না কি একবার হলেও ওদিকে যায়। হেঁটে হেঁটে ঝংকার স্ট্রিটে পৌঁছে যাই আমরা। ঝংকার স্ট্রিটে পৌঁছার পর এর রূপ দেখে মনে হলো যে, আরেক চিনা বাজার। সাধারণত একে বলা হয় চায়না টাউন। ঝংকার স্ট্রিট চিনা অধ্যুষিত এলাকা। এখানে সাধারণত পুরনো এনটিকসের জিনিসপত্র, বিভিন্ন রেস্তোরাঁয় ঐতিহ্যবাহী খাবার এবং কুটির শিল্পের দোকান লক্ষণীয়। সন্ধ্যার পর এ ঝংকার স্ট্রিট জমজমাট হয়ে ওঠে। আমরা আবদুর রেহমানের কাছেও শুনেছি ঝংকার স্ট্রিট মূলত রাতের বাজার। রেহমান আরও বলল—রাতে অবস্থান না করলে আপনাদের মালাক্কায় আসাই ঠিক হয় নি। কিন্তু কী যে করি, সময় যে বাধা। সুতরাং, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই আমাদের ফিরে যেতে হবে।


আমরা যদি মালাক্কায় রাতে না থাকি, তাহলে মালাক্কার আসল সৌন্দর্য দেখা থেকে বঞ্চিত হব।


সাধারণত শুক্র ও শনিবার এ বাজার জমে ওঠে। এ দুদিন ঝংকার স্ট্রিটের সকল রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া হয়। প্রবেশ করতে হয় হেঁটে। তবে প্রতিদিনই সন্ধ্যার পর রাস্তায় হাতেবোনা খাদ্যদ্রব্যের দোকান বসে। এ দুদিন সাধারণ রেস্তোরাঁয় মানুষ প্রবেশ করে না; রাস্তায় তৈরি ও প্রদর্শিত খাবার-দাবারই তাদের পছন্দ। এসব খাবারই এ ঝংকার স্ট্রিটের অন্যতম আকর্ষণীয় বিষয়। বলা যায় যে, ঝংকার স্ট্রিটের এ চিনা বাজার স্ট্রিট ফুডের জন্য বিখ্যাত। বিশেষত, এখানের চিকেন রাইস বলের রয়েছে অশেষ খ্যাতি।

অনেক প্রাচীন বিল্ডিং রয়েছে এ চায়না টাউনে। অধিকাংশ গড়ে উঠেছে ১৭ শতকের প্রথম দিকে। এখানে এশিয়া তো আছেই, একই সাথে পর্তুগিজ, ডাচ ও চিনা স্থাপত্যরীতির বিল্ডিং লক্ষ করা যায়।

6
ঝংকার স্ট্রিট

ঝংকার স্ট্রিট চিনা অধ্যুষিত হওয়াতে এখানে চিনা কুটিরশিল্প, খাবার ও ড্রাগন, আলো দিয়ে সুন্দর এক অঞ্চল গড়ে তোলা হয়েছে। ঐতিহ্যের চমৎকারিত্ব এখানে প্রকাশিত বলে এ এলাকাকে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেছে। স্ট্রিটফুড কেউ পছন্দ করে থাকলে এখানে একবার আসতেই হয়। প্রতিদিন সন্ধ্যায় এখানে জমে ওঠে আড্ডা, পর্যটকদের ভিড়, বিশেষত শুক্রবার ও শনিবার সন্ধ্যা থেকে সারারাত আড্ডা, আনন্দে লীন থাকে এ ঝংকার স্ট্রিট। এজন্য আবদুর রেহমান বারবার জানতে চেয়েছে যে, আমরা রাতে থাকব কি না? থাকব না বলাতে সে বার বার অনুরোধ করেছে থেকে যাবার জন্য।  রেহমান বলেছে আমরা যদি মালাক্কায় রাতে না থাকি, তাহলে মালাক্কার আসল সৌন্দর্য দেখা থেকে বঞ্চিত হব। তা অবশ্য সমর্থন করেছে সৌরভদা।

7
ঐতিহ্যবাহী ভবন, ঝংকার স্ট্রিট

ঝংকার স্ট্রিটকে আবার ঝংকার ওয়াকও বলা হয়ে থাকে। পুরনো দ্রব্যাদির জন্য বিশ্বখ্যাত একটি জায়গা। ১৭ শতকের অনেক চিহ্ন এখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। ডাচ কলোনি প্রতিষ্ঠার পর এখানে চিনা ব্যবসায়ীরা এটি প্রতিষ্ঠা করে। পুরনো যারা, তারাই এখানে আগের তৈরি বাড়িগুলোতে বসবাস করেন। শুধু চিনা কুটিরশিল্পের দ্রব্যাদি নয়, এখানে উপনিবেশ আমলের জিনিসপত্রাদিও সহজে পাওয়া যায়। একঅর্থে এ ঝংকার স্ট্রিট এক চলমান জাদুঘর। ঝংকার স্ট্রিটে হাঁটছিলাম আর আশেপাশের দৃশ্যগুলো দেখে নিতে চেষ্টা করছিলাম। পুরনো ডাচ আমলের ভবনগুলোতে এখন মাসেজ সেন্টার, বার, জুয়েলারি, উপহার সামগ্রীর দোকান গড়ে উঠেছে। দেখতে দেখতে আমরা একটি পুরনো কুটিরশিল্পের দোকানে প্রবেশ করি। ভেবেছি এখানে কিছু এনটিকস জাতীয় দ্রব্যাদি পাওয়া যাবে। পেয়েছিলামও কিন্তু দাম দেখে আর কিনতে সাহস পাই নি। হতাশা নিয়েই ফিরতে হলো।

সন্ধ্যার আগেই ঝংকার স্ট্রিট থেকে আমরা বের হয়ে যাবার প্রস্তুতি গ্রহণ করি। হাঁটতে হাঁটতে প্রচুর ক্লান্তিবোধ করছি। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। আর এদিকে আমাদের ফেরার সময় হলো। সৌরভদা বলল—সে রাত ৯টা পর্যন্ত মালাক্কায় অবস্থান করবে। তবে বিশেষ প্রয়োজনে আরিফ ও আমাকে ফিরতে হবে কুয়ালালামপুরে।  এ জন্য আমাদের তাড়া আছে। আজ রাত পর্যন্ত সাথে থাকার জন্য সৌরভদা অনেক অনুরোধ করেছে, আমরা তো নিরুপায়, ফলে আমাদের কিছুই করার ছিল না। এবেলা ঝংকার স্ট্রিটেই আমাদের শেষ ভ্রমণ। এর মাঝে লক্ষ করি চিনা তরুণীরা পসরা নিয়ে আসা শুরু করেছে। এবং রাস্তায় পসরা সাজিয়ে বসাও শুরু হয়েছে।

8
পাতায় মোড়ানো চিনা খাবার

অধিকাংশই চিনা খাবারের আইটেম। এর মধ্যে পাতায় মোড়ানো একটি আইটেম আমাকে খুব আকৃষ্ট করল। কাছে গিয়ে খাবার বহনকারী মহিলার কাছে জানতে চাইলাম—এর নাম? তিনি যা বললেন তা বুঝতেই পারলাম না। দেখে মনে হলো এ খাবারটি বেশ জনপ্রিয় হতে পারে। দোকানি নিয়ে আসার সাথে সাথে কিছু বিক্রি হয়ে হয়ে গেল। একটু নেড়েচেড়ে দেখলাম খাবারটি সুস্বাদু হতে পারে। এটি মূলত চাল সিদ্ধ ও এর সাথে আরও কিছু উপাদান মিশিয়ে প্রস্তুত করা হয়েছে। চেহারা দেখে ভালো লাগল। এভাবে দেখলাম অনেক দোকানে খাবার আবার তৈরি করা হচ্ছে ও প্রদর্শনীর জন্য সুন্দরভাবে সাজানো হচ্ছে। সযত্নে এমনভাবে সাজিয়ে রাখা হচ্ছে, যাতে সহজেই খদ্দেরদের আকৃষ্ট করা যায়।

9
মালাক্কার স্ট্রিটফুড

কুয়ালালামপুর বাস টার্মিনাল দেখে যেমন বিমানবন্দর মনে হয়েছে, এখানেও তাই। সবই অটোমেশন করা। 


এসব দেখতে দেখতে কখন এসে পৌঁছালাম ঝংকার স্ট্রিটের মাথায় বুঝে উঠতে পারি নি। রাস্তার দুপাশে বিভিন্ন ধরনের খাবার আর খাবার। খাবারের পসরা দেখলেই বোঝা যায় ওখানে কেন এত লোক বেড়াতে আসে। রেহমানকে বললাম আমাদের নিয়ে চলেন বাস টার্মিনাল-এর দিকে। আমরা ছুটলাম ওইদিকে, সৌরভদা থেকে গেল ঝংকার স্ট্রিটেই।

বাস টার্মিনালে এসে প্রবেশ করি টিকেটের উদ্দেশে; কিন্তু এখানে আরেক নিয়ম। টিকেটের কাউন্টারে যাবার জন্য একটি টোকেন নিতে হয়। আগে টোকেন নিয়ে তারপর টোকেনের নাম্বার অনুযায়ী কাউন্টারে লাইনে দাঁড়াতে হয়। তবে এখানে কোনো জটলা হয় না। টোকেন নিয়ে নাম্বার অনুসারে আমরা টিকেট সংগ্রহ করি। তারপর পাঞ্চ মেরে যেতে হয় মূল প্লাটফরমে। মানুষ আছে কম না, তবে একধরনের নীরবতা বিরাজমান। কোনে হৈচৈ নেই, ধাক্কাধাক্কি নেই। কুয়ালালামপুর বাস টার্মিনাল দেখে যেমন বিমানবন্দর মনে হয়েছে, এখানেও তাই। সবই অটোমেশন করা। প্লাটফরমে এসে জানলাম কী কারণে জানি আমাদের নির্ধারিত বাস ছাড়তে একঘণ্টা দেরি হবে। তাও ডিজিটাল নোটিশবোর্ডে প্রদর্শিত হচ্ছে। কোনো কথাবার্তা বলতে হয় না। সবই জানা যায় সহজে। একঘণ্টা পর ওই বাস এসে নির্ধারিত প্লাটফরমে দাঁড়াল এবং আমাদের ডাকা হলো। যাত্রী বেশি ছিল না। এর মধ্যে অপেক্ষা করতে করতে আমরা কফি পান করি ও আড্ডায় কিছুটা সময় পার করে দেই।

বাস ছাড়ার পর আবার কিছুক্ষণ ইফতার-এর বিরতি দেওয়া হলো। এর মাঝে ইফতার হয়ে গেলে বাস ছেড়ে দিল কুয়ালালামপুরের উদ্দেশে। বাসে ওঠা ও ছাড়ার কিছুক্ষণ পর ঘুমিয়ে গেলাম। মনে হলো বাইরের এ আঁধারে প্রকৃতির কিছুই দেখা যাবে না। সেহেতু একটু ঘুমানো যেতে পারে। সত্যি কিছুক্ষণ পর অনুভব করলাম বেশ ঘুম পাচ্ছে। টিবিএস না আসা পর্যন্ত ভালোই ঘুম হলো। আমরা আনুমানিক রাত ১০টার দিকে টিবিএস-এ পৌঁছে গেলাম। এখান থেকে ফিরে এলাম পাদু সেন্ট্রাল-এ। এখানে একটি ম্যাকডোনাল্ডস-এ আমরা রাতের খাবার গ্রহণ করে হোটেলে এসে আবার আরিফের সাথে কিছুক্ষণ আড্ডা দিয়ে তাকে বিদায় দিতে হলো। আরিফ আর আমি ক্লান্ত। আবার আরিফেরও ইচ্ছা ছিল না আমার সঙ্গ ত্যাগের, কিন্তু ফিরতে হয় গন্তব্যে। কিছুটা বেদনা চেপে রেখে আরিফের বিদায় মেনে নিতে হলো। রাতে আর বেশি দেরি না করে ঘুমাতে গেলাম। ঘুম সহজে আসে না। ভাবছিলাম তাহলে টেলিভিশনে একটু চোখ রাখা যেতে পারে। কিন্তু মালয়েশিয়ার টেলিভিশনের যে দশা, এক্ষেত্রে বেশিক্ষণ আর টেলিভিশনে চোখ রাখা দায়। নেহাত সময় নষ্ট করা। এক ধরনের জোর করেই ঘুমানোর প্রচেষ্টা। ঘুম না এলেও কক্ষ অন্ধকার করে ভাবছি আগামীকাল কী কী করা যেতে পারে। সাথে আনা বই পড়তে শুরু করি। তাও মন বসে না। তখন এক ধরনের অস্থিরতা পেয়ে বসে। কালই এমন আরমদায়ক হোটেলকক্ষ ছেড়ে দিতে হবে, তা ভাবতেই আমার খারাপ লাগছে। এই ভাবতে ভাবতে একসময় ঘুম এলে আর কিছুই বলতে পারি না।


১৭ পর্বের লিংক

স্বপন নাথ

জন্ম ৪ মে ১৯৬৮; বড়লেখা, মৌলভীবাজার। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর, বাংলা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়; এমফিল, ভাষাবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

পেশা : শিক্ষকতা; উপপরিচালক (গবেষণা ও তথ্যায়ন), নায়েম, শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

প্রকাশিত বই :
প্রবন্ধ—
চিন্তা ও জগৎ : সাহিত্য সংস্কৃতি [প্রবাস প্রকাশনী, যুক্তরাজ্য ২০০৭]
কবিতার নন্দনবিশ্ব [অনিন্দ্য প্রকাশ, ঢাকা ২০১৭]
কথার বুনন [জিনিয়াস পাবলিকেশন্স, ঢাকা ২০১৯]
ছিন্ন কথামালা [জিনিয়াস পাবলিকেশন্স, ঢাকা ২০১৯]

কবিতা—
রৌদ্র ও বৃষ্টিতে মায়াহরিণ [ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ, ঢাকা ২০০৭]
জলৌকা চোখের চাতাল [ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ, ঢাকা ২০১০]
নির্জন বিচালির ডানা [কবি প্রকাশনী, ঢাকা ২০১৩]
নখের আউঠা [উৎস প্রকাশন, ঢাকা ২০১৪]
নানকার ধানবীজ [উৎস প্রকাশন, ঢাকা ২০১৫]
একলব্যের ছিন্ন আঙুল [নাগরী, সিলেট ২০১৬]
সংশয়ের বসতি [নাগরী, সিলেট ২০১৭]
গ্রাম বজ্রযোগিনী [জিনিয়াস পাবলিকেশন্স, ঢাকা ২০১৯]

ই-মেইল : rudro71@gmail.com