হোম ভ্রমণ মালয়েশিয়া ভ্রমণ : সামান্য দেখা

মালয়েশিয়া ভ্রমণ : সামান্য দেখা

মালয়েশিয়া ভ্রমণ : সামান্য দেখা
206
0
১৪ পর্বের লিংক

পর্ব- ১৫

One of the fundamental objectives of the museum is to educate, and it is only the museum that has the capacity and the ability to impart cultural education effectively as it houses the tools and materials for doing so in its collections. In modern society, the museums enrich the educational process by exposing children and indeed the public to their history in a positive way; they assist our future generations to understand and appreciate their history and culture and take pride in the achievements of their forebearers. Museums possess materials and information that can and should be used in enriching and improving the school curriculum in various disciplines. What is important is for the educational planners to work closely with museum experts on how the educational resources that are available in the museum can be integrated into the curriculum and the learning process at all levels. On its part, the museum should develop educational programmes for the various tiers of the school system, namely, primary schools, secondary schools, teacher training colleges, technical colleges and universities, among others. A properly articulated museum education programme will become an essential component in the overall educational system of society. Educational visits to the museums should be developed and encouraged to cater for all interest groups, and as we approach the turn of the century, it has become very necessary and important for our museums to ensure that they become children-friendly. [Emmanuel N. Arinze: The Role of the Museum in Society]

1
ঐতিহাসিক ও নৃতাত্ত্বিক জাদুঘর, মালাক্কা

একটি ঘরের মাঝে দুনিয়া দেখে নিতে জাদুঘরই আমার জন্য উপযুক্ত।


সমাজে জাদুঘরের উপযোগিতা নিয়ে একটি জনবক্তৃতায় উপর্যুক্ত কথাগুলো বলেছিলেন কমনওয়েলথ জাদুঘর সমিতির সভাপতি ইমানুয়েল। কিন্তু আমি নিশ্চিত করে নিজেও জানি না জাদুঘর ভ্রমণে কী হয়। তারপরও ওই জাদুঘরেই বার বার যাই, দেখি।অন্যদের ভাষায়—সময় নষ্ট করি। একধরনের নিরর্থক ঘোরাফেরা। আসলে প্রতিটি বিষয়ের মূল্য প্রতিজনের কাছেই আলাদা। এক্ষেত্রে আমার একান্ত অনুভব—সামর্থ্য নেই স্বল্প সময় ও খরচে বেশি স্থানে যাওয়া ও দেখা, ফলে একটি ঘরের মাঝে দুনিয়া দেখে নিতে জাদুঘরই আমার জন্য উপযুক্ত।

মালাক্কার এ জাদুঘরে প্রবেশের আগে কী যেন এক ভালো লাগার আনন্দ অনুভব করি। আর মালাক্কা যেন জাদুঘরের নগরী। এখানে বিষয়ভিত্তিক কয়েকটি জাদুঘর রয়েছে। এখন আমরা ঐতিহাসিক জাদুঘরে উপস্থিত। এ ঐতিহ্যিক জাদুঘরের সিঁড়িতে আরিফ ও আমি আলাদাভাবে নিজেদের ছবি তুলে নেই।

2
জাদুঘরের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে আরিফ

সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠার পর অভ্যর্থনায় সাক্ষাৎ হলো একজন বয়স্ক ব্যক্তি ও এক তরুণীর সাথে। ওই তরুণীর কাছে জানতে চাই এখানে জাদুঘর সম্পর্কিত কোনো স্যুভেনির পাওয়া যায় কি না। সে আমার কথা বুঝেছে কী না জানি না। তবে একটি কোনায় একটি বুকশেলফ দেখিয়ে দিল। সেখানে কয়েকটি জার্নাল রাখা ছিল, এর মধ্য হতে একটি হাতে নিলাম। মনে হলো এখানে আর কিছু পাব না, এটাই নিতে হবে। ওগুলো পুরনো ইস্যু হলেও দেখে মনে হলো তা মূল্যবান হতে পারে। যা-হোক এরপর জাদুঘরের প্রথম গ্যালারিতে প্রবেশ করি। শুরুতেই রয়েছে সুলতানি ও উপনিবেশ আমলের কিছু উপকরণ। মালয় সালতানাতের শাসক এবং পর্যায়ক্রমিক ঔপনিবেশিক আমলের নাবিক ও দখলদার পর্তুগিজ, ডাচ, ব্রিটিশ, জাপানি যোদ্ধাদের ভাস্কর্যও কিছু পেইন্টিং রাখা আছে। এরপর আমরা দেখতে পেলাম সেকালের অস্ত্র, শিকারযন্ত্র, বাড়ি ঘরে ব্যবহৃত তৈজসপত্র ও অন্যান্য উপকরণ।

3
সুলতানি আমলে ব্যবহৃত অস্ত্র

মালাক্কার জাদুঘরে এসব অস্ত্র দেখে চলে যাই পৃথিবীর ইতিহাসের গহিনে। আমার ভাবনায় সে-ই ছবি ভেসে উঠল যা মানব সভ্যতার নয়। এর বিপরীতে মানুষের দ্বান্দ্বিক ইতিহাসের কাহিনি। গ্রহণযোগ্য না হলেও মানব সভ্যতার ইতিহাস নিয়ে আমার চিন্তায় বাধ্য হয়ে উল্টো ধারণা তৈরি করতে হয়েছে। এ তো অস্ত্রের নমুনাই যদি দেখতে হয় নানা জায়গায়, তাহলে এ সভ্যতার কী অর্থ তা আমার বোধে আসে না। আবার যুদ্ধের ইতিহাসেই তো আমাদের যত আস্ফালন, গৌরব এবং অবস্থান। মালাক্কার জাদুঘর দিয়ে কোনো কথা নয়। এখন পর্যন্ত দেশে বা বিদেশে যেসব জাদুঘর আমার দেখা হয়েছে, সবগুলোতেই আর কিছু থাকুক বা না-থাকুক; প্রাক-প্রাচীন, প্রাচীন, মধ্য ও আধুনিক যুগে ব্যবহৃত অস্ত্রের একটি গ্যালারি অনিবার্যভাবেই পেয়েছি। অস্ত্রের রূপ, নমুনা দেখানো উদ্দেশ্য হলেও একইসাথে এগুলো রাখা হয়েছে ইতিহাসের তথ্য জানাতে। সাধারণ বা সমরাস্ত্র যা-ই হোক, এগুলো থেকে মানব চরিত্রের পঞ্জিকা উদ্ধার ও রচনা করা যায়। একদিকে টিকে থাকা, নিরাপত্তা, খাদ্য সংগ্রহ, স্থানান্তর, হিংস্র প্রাণীদের আক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে অস্ত্রের ব্যবহার শুরু। তবে মানব সমাজে নিজেদের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে পরস্পর দ্বন্দ্ব-যুদ্ধ চলমান থাকায় অস্ত্রের ব্যবহার মনে হয় কখনোই কমবে না। বরং দিনে দিনে বেড়েই চলেছে। সুতরাং, একটি সাধারণ সিদ্ধান্তে আসা যায় যে, কোনো জাদুঘর থেকেই অস্ত্রের গ্যালারি বাদ দেওয়া যাবে না। যখন রাজ্য, রাষ্ট্র, ভাষা, ক্ষমতা, ভূগোল, অর্থ, বাণিজ্য, শিক্ষা, দখল, অবস্থানিক দখল, উত্তরাধিকার চেতনা দেখা দিল—তখন থেকে অনিবার্য যুদ্ধের আবর্তে পড়ে গেল পৃথিবীর মানুষ।

এগুলো শুধু যে সামরিক প্রয়োজনে ব্যবহৃত হয়েছে, তা কিন্তু নয়। এ থেকে সহজেই বোঝা যায়, মানুষের হিংসা, বিদ্বেষ তার সহজাত। আলো-আঁধারি এ খেলার মধ্যে আবার মূল্যবোধের অবক্ষয় চলছে বলার প্রয়োজন আছে কি না—আমাদের জানা নেই। ফলে, ইতিহাসের শিক্ষাই হলো—মানুষ নিজের জন্য এমন বিপজ্জনক নিয়তি নিজেই নির্মাণ করে চলেছে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, মালাক্কায় সুলতানি আমলের পতনের পর বারবার আক্রান্ত হওয়ার ফলে এখানে অস্ত্র ব্যবহার একটু বেশি হয়েছে। ফলে বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র এ জাদুঘরে শোভাবর্ধন করছে। মানব বিকাশের আদিপর্বে অর্থাৎ, প্রস্তর যুগে যে সকল অস্ত্র ব্যবহৃত হতো, এ থেকে শুরু করে নিকট অতীতের অস্ত্রগুলো জাদুঘরে রক্ষিত আছে। পাথরের তৈরি অস্ত্র এবং বর্শা, বল্লম, ছুরি, তরবারি, কামান তো আছেই। মালাক্কা ও মালয়ের সাথে প্রাচীনকাল থেকেই চিনের যোগাযোগ ছিল। একসময় মালাক্কায় জাপানিরাও আক্রমণ করেছে। সংগত কারণে এখানে কিছু চিনা ও জাপানি সরঞ্জামাদি দেখতে পেলাম। অস্ত্রের বিকল্প কোনো কিছু আসবে কি না, ভাবার বিষয়। সুন ঝু যথার্থই বলেছেন :

অস্ত্র যেমন রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য একই সাথে জীবনের নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজন, আবার এ-অস্ত্র মৃত্যুকেও অনিবার্য করে তুলে। ফলে, এ উপাদানকে কোনো হিসেবেই অবহেলা করা যায় না।

এ জাদুঘরে বিভিন্ন গ্যালারি দেখতে দেখতে দেখতে আমরা জেনে নেই যে, শুধু দখল বা সাম্রাজ্য বিস্তারের জন্য মালাক্কায় যুদ্ধ হয় নি। বাণিজ্যিক সুবিধা, পণ্য পরিবহন এবং সমুদ্রপথে সাধারণ যোগাযোগের জন্য বারবার মালাক্কা জলদস্যুদের দ্বারা আক্রান্ত হতো। এ ক-বছর আগেও মালাক্কা প্রণালিতে জলদস্যুদের আক্রমণ ভয়াবহ আকার ধারণ করে। তারা মালামাল এবং সম্পদ লুণ্ঠনে পণ্যবাহী জাহাজ ও নৌকায় আক্রমণ চালাত। এক পর্যায়ে সেখানের জলদস্যুরা ভিন্নপথ অবলম্বন করে। মাঝে মাঝে তারা জাহাজের পণ্য লুট না করে অপহরণ করত জাহাজের কাপ্তান ও কর্মকর্তাদের। এ কৌশলে দাবি করত মোট অঙ্কের মুক্তিপণ। পরে অবশ্য সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করলে তা নিয়ন্ত্রিত হয়। মালাক্কা প্রণালিতে জলদস্যুদের আক্রমণ ঠেকাতে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ছাড়াও ২০০৪ সালে জাপান, কোরিয়া, ভারত, বাংলাদেশ ও শ্রীলংকা একযোগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফলে, এরপর থেকে সেখানে দস্যুবৃত্তিও কমে আসে।


মালাক্কার রাস্তায় যে ধরনের রিকশা চলে, তার অনেক আধুনিকায়ন হয়েছে যন্ত্রে ও শব্দে।


মালয়েশিয়ার জীবন যাপন, প্রাচীনকালের নৃতাত্ত্বিক জীবন ও বিবর্তন, কৃষিশিল্পের বিভিন্ন উপকরণ, ভৌত উপকরণ ও কাঠামো, শিক্ষা ব্যবস্থা, রাজনীতি ও ভূমি ব্যবস্থার রূপান্তর ইত্যাদি সবই জাদুঘরে রাখা হয়েছে। মালয়েশিয়ায় শিক্ষা ব্যবস্থার বিবর্তনকে আলাদা গ্যালারিতে দেখানো হয়েছে। আমাদের দেশেও ব্যাংক ব্যবস্থা চালু বা এর সুবিধা জানাবোঝার আগে খানিকটা সচ্ছল প্রায় পরিবারেই সিন্দুকের ব্যবহার ছিল। এখনে পেলাম একটি বিশাল সিন্দুক। হয়তো অস্ত্র, অর্থ, ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি রাখা হতো। সম্পদের নিরাপত্তায় পর্তুগিজরা তা ব্যবহার করত।

4
পর্তুগিজদের ব্যবহৃত সিন্দুক

আরও কিছু দ্রব্যাদি দেখে মনে হলো আগের কৃষি উপকরণসমূহ ব্যবহারে আমরা আর মালয়েশিয়া প্রায়ই একই অবস্থানে ছিলাম। এখন দিনে দিনে বিবর্তন ঘটেছে নানাক্ষেত্রে। পুরনো প্রাকৃতজ উপাদানের আর ব্যবহার এখন নেই। আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হচ্ছে সেখানের কৃষিতেও। কিন্তু প্রাচীন কৃষি উপকরণগুলো প্রায় একই রকম। অনেক উপকরণের মধ্যে আমাদের দৃষ্টি কেড়ে নিল জাদুঘরে রক্ষিত ধানভাঙার যন্ত্রটি। বিশেষত আমি এর নির্মাণশৈলী ও দক্ষতা দেখে বিস্মিত হয়েছি। যখন এত যন্ত্র বা কৌশলের উন্নয়ন ঘটে নি, সেকালে এমন চমৎকার একটি যন্ত্র কাঠ দিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে। যার নির্মাণশৈলীও আমাদের চমৎকৃত করে।

5
ধানভাঙার যন্ত্র

যা এক সময় এখানের কৃষকরা ব্যবহার করতেন। মানুষের এমন জ্ঞান ও সৃজনশীলতার নমুনা দেখে আপ্লুত হই, ভালো লাগে। কুয়ালামপুরের জাতীয় জাদুঘরে মালয়েশিয়াতে নৌবাণিজ্যের অন্যতম বাহন নৌকার রেপ্লিকা দেখেছিলাম। মালাক্কায় নৌযানের বিভিন্ন ধরন থাকাটাই স্বাভাবিক। ফলে, এখানে কয়েকটি ভিন্ন ভিন্ন নমুনার নৌকা দেখতে পেলাম। কোথায় কোন ধরনের নৌকা চালানো যায়, সে অনুযায়ী নৌকা নির্মাণের উপাদান এখানে আমরা দেখেছি। জাদুঘরের ভেতরে রাখা আছে একটি পালতোলা নৌকার নমুনা। উল্লেখ্য যে, জাদুঘরে নানা রকমের নৌকা সংরক্ষণ করা হয়েছে। এ থেকে বোঝা যায় যে, এশিয়ার এ অঞ্চলে নৌবাণিজ্যের গুরুত্ব ও নৌযান তৈরির ঐতিহ্য প্রাচীনকালের। এ ধরনের নৌকা ব্যবসা ছাড়াও ব্যবহার হতো যোগাযোগের অন্যতম উপায় হিসেবে।

6
পালতোলা নৌকার রেপ্লিকা

জাদুঘরের মূল ভবনের ভেতরের বারান্দায় আরও দুটি নৌকা দেখে আমরা অবাকই হলাম। বিশেষত আকৃষ্ট করে এসব নৌকার নির্মাণশৈলী। সে-ধরনের নৌকা আমাদের দেশেও তৈরি হতো এবং প্রাচীনকালে এগুলো ছিল খুব জনপ্রিয়। পাখির শরীরের গঠনের মতো একটি নৌকা দেখতে পেলাম। ময়ূরপাখির শারীরিক অবয়বের মতো নৌকাটি নির্মিত। দেখে মনে হলো আমাদের দেশে যাকে এক সময় বলা হয় ময়ূরপঙ্খি নাও।

7
ময়ূরপঙ্খি নাও

তা ছাড়াও দেখতে পেলাম একটি গাছ দিয়ে নির্মিত একটি নৌকা। আগে আমাদের দেশেও একটি গাছ দিয়ে একটিমাত্র ডিঙি নৌকা তৈরি হতে দেখেছি। যাতে পেরেক বা বাটাম দিয়ে বিভিন্ন কাঠের অংশ জোড়া লাগানোর প্রয়োজন হতো না। ওই বিশেষ ধরনের গাছও আমাদের দেশে আগে পাওয়া যেত। এখন আর ওই প্রজাতির বৃক্ষ সচরাচর চোখে পড়ে না।

8
একক গাছে নির্মিত ডিঙি নৌকা

নদী দেখে মনে হলো—মালাক্কায় একইসাথে চলছে নদী শাসন ও সংরক্ষণ।


দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনে বিভিন্ন উপকরণ তৈরিতে মানুষ সবসময়েই সৃজনশীলতার পরিচয় দিয়েছে। এশীয় অঞ্চলের জনমানুষ যে প্রচীনকালে আরও বেশি নিবিড় ছিল তা কয়েকটি উপাদান থেকে অনুমিত হয়। নৌকার পরেই বারান্দায় দেখলাম হাতে টানা একটি রিকশা রাখা আছে সযত্নে। এ টানা রিকশা একমাত্র কলকাতা শহরেই এখন দেখা যায়। এখন যন্ত্রচালিত রিকশা মালাক্কা শহরের আকর্ষণীয় একটি উপাদান। টানা রিকশা দেখে মনে হলো—মালাক্কায় আগে থেকেই এমন রিকশা যানবাহন হিসেবে প্রচলিত ছিল। এখন মালাক্কার রাস্তায় যে ধরনের রিকশা চলে, তার অনেক আধুনিকায়ন হয়েছে যন্ত্রে ও শব্দে। কিন্তু আগের রিকশার ধরন দেখে মনে হলো আগেরটিও নির্মাণশৈলীতে কম ছিল না। বর্তমানে প্রচলিত রিকশাগুলোতে ব্যাটারি ও ইঞ্জিন লাগানো হয়েছে এবং গান শোনার ব্যবস্থাও সংযোজিত হয়েছে। তবে আগেরগুলোতেও মানুষ তার স্বীয় বুদ্ধিমত্তার প্রমাণ রেখেছে। নিঃসন্দেহে এর আসন ও পুরো নির্মাণশৈলী প্রশংসার দাবি রাখে।

9
হাতে টানা রিকশা

মাছ শিকারের হাতেবোনা সরঞ্জাম দেখে অবাক হয়েছি। কারণ, মাছ শিকারের যে প্রাচীন পদ্ধতি আর যেসব ফিশিং-ট্র্যাপ এখানে রাখা আছে, সবগুলোর সাথে আমরা পরিচিত। মালাক্কার মাছ শিকারের ফাঁদগুলোও বাঁশ দিয়ে তৈরি। এখনও আমাদের গ্রামাঞ্চলের নদী খাল বিল এলাকায় এগুলো দিয়ে মাছ ধরা বা শিকার করা হয়। যে কয়েক ধরনের সরঞ্জাম আমরা দেখছি এতে এশিয়ার মানুষের সমবৈশিষ্ট্য ও সাদৃশ্য আমাদের আপ্লুত না করে পারে না।

10
মাছ শিকারের ফাঁদ

জাদুঘরে মালাক্কার পুরনো একটি ঘরের কাঠামো রাখা আছে। আগে বসবাসের জন্য মালাক্কায় এমন বাড়িঘরই নির্মাণ করা হতো। যা কাঠের তৈরি। ঘরটি একটি মাচানের উপর স্থাপিত। একটি ঘরের পুরো কাঠামো জাদুঘরে রাখা। এ ধরনের ঘরে পরিবারের সদস্য বেশি হলেও একসাথে বসবাস করতে পারে। মালাক্কায় এমন ঘরের নির্মাণশৈলীতে নান্দনিকতার চিহ্ন লক্ষণীয়। প্রতিটি কক্ষ থেকে অন্য কক্ষে যাবারও সুন্দর ব্যবস্থা ও ধাপ তৈরি করা হতো। আমরা মালাক্কা শহরে এমন বাড়ি-ঘরের নিদর্শন দেখেছি। যদিও এখন ইট-সিমেন্টের বিল্ডিং তৈরি করা হচ্ছে। তবে এমন ঘর মালাক্কারই অনন্য ঐতিহ্য।

11
গৃহনির্মাণ শৈলী

জাদুঘরে অনেকক্ষণ অবস্থানের পর আমি আরিফকে বললাম ক্লান্তি লাগছে—চলো নদীর কাছে যাই। ওখানে গিয়ে আরও কিছুক্ষণ ডাচ স্কয়ারের মোড়ে একটি বেঞ্চিতে বসে থাকি। কিছুক্ষণ বিশ্রামের পর মনে হলো অন্যদিকে একটু ঘুরে আসা যেতে পারে। আমরা নদীর তীর দিয়ে হাঁটতে থাকি। যেতে যেতে সাক্ষাৎ ঘটে আরও দুটি জাদুঘরের। একটি সামুদ্রিক জাদুঘর ও অন্যটি সাবমেরিন জাদুঘর। মালাক্কায় আরও কয়েকটি জাদুঘর রয়েছে। সামুদ্রিক জাদুঘরের সামনে রয়েছে বিশাল এক নৌকা। যা একমাত্র মালাক্কাতেই দেখা যায়। এটি হলো মালাক্কার এক আকর্ষণীয় নিদর্শন। এ-সম্পর্কিত তথ্যে জানা যায় এ নৌকার মাধ্যমেই পর্তুগিজরা মালাক্কায় প্রথম নোঙর রাখে। ইতিহাসের উপাদান হিসেবে নৌকাটিকে যত্নেই রাখা হয়েছে মনে হলো। তারপরও মনে হলো এটিও কখন ক্ষয়ে ক্ষয়ে হারিয়ে যায়, তা বলা মশকিল।

12
পর্তুগিজ নাবিকদের ব্যবহৃত নৌকা

মালাক্কা শহরের বিভিন্ন এলাকা, স্থান ও জাদুঘরগুলো পরিকল্পিতভাবেই তৈরি করা হয়েছে। আবার আমার মনে হলো এগুলো সবই একই স্থানে ও জাদুঘরে সংরক্ষণ করা যেত। পর্যটনকে আকৃষ্ট করতে এমন আলাদা আলাদা জাদুঘরের স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। এগুলো দেখতে দেখতে খুব ক্লান্তি চেপে ধরে। আবারও আমরা মালাক্কা নদীর পাশে কিছু সময় বসে পার করি। এ নদী দেখে মনে হলো—মালাক্কায় একইসাথে চলছে নদী শাসন ও সংরক্ষণ। ফলে নদী তীরবর্তী অঞ্চল খুব সুন্দরভাবে সাজানো হয়েছে। আর রাস্তায় যেমন ময়লা নেই, তেমনি নদীতে কেউ ভুলেও ময়লা আবর্জনা ফেলে দেয়, তা দেখে মনে হয় নি।

13
মালাক্কা নদী

কলাপাতার মধ্যে খাবার গ্রহণে ইনডিজেনাস ভাব থাকলেও আমার কাছে নিরাপদই মনে হয়।


নদী তীরে বসেই সময় পার করতে ইচ্ছে হয়েছিল। কিন্তু পেটে যে ক্ষুধা। আর ক্ষুধার যন্ত্রণায় অপেক্ষা করা যাচ্ছে না। আমাদের দুপুরের খাবার গ্রহণ করতেই হবে। কিন্তু আমরা ঘুরার নেশায় সময় নিয়ন্ত্রণ করতে পারি নি। আমি আরিফ আর সৌরভদা মিলিত হলাম আবার ডাচস্কয়ারে। এখন আমাদের গন্তব্য ক্ষুধা নিবৃত্তি। সংগত কারণে আমরা খুঁজছিলাম ভারতীয় রেস্তোরাঁ। ড্রাইভারকে বললাম একটি ভারতীয় রেস্তোরাঁয় নিয়ে যেতে। ড্রাইভার আমাদের নিয়ে চলে একটি মন্দিরের কাছাকাছি এক স্থানে। সেখানে না কি ভারতীয় ভালো রেস্তোরাঁ রয়েছে। আবদুর রেহমান আমাদের নিয়ে এল চিনা ও ভারতীয় জনজাতির মিলনকেন্দ্রের একটি এলাকায়। তবে মন্দির, কিছু ফেস্টুন, সাইনবোর্ড দেখে মনে হলো এখানে ভারতীয়দের প্রভাবই বেশি। গাড়ি থেকে নেমে যেখানে দাঁড়ালাম, এর পাশেই রয়েছে একটি হনুমান মন্দির। এ গলির হাল দেখে মনে হলো এ এলাকাটি ভারতীয় জনজাতি অধ্যুষিত এলাকা। এর কাছেই দেখলাম একটি তোরণ। সেখানে কী এক দেবতার মূর্তি স্থাপিত বুঝতে পারি নি। বুঝলাম দক্ষিণ ভারতীয়দের পূজিত দেবতাদের মূর্তি এখানে স্থাপন করা হয়েছে। আমরা চলে আসি সর্বানা রেস্তোরাঁর সামনে। রেস্তোরাঁয় প্রবেশ করেই দেখি প্রচুর ভিড়, কোনো খালি জায়গা নেই। জায়গা না পেয়ে আমরা বারান্দায় কিছুক্ষণ অপেক্ষা করি। অবশেষে জায়গা হলে একটি টেবিলে আমাদের বসিয়ে দেওয়া হয়। পরিবেশক একজন আমাদের কাছে হিন্দিতে জানতে চায় আমরা ভেজ না ননভেজ। আমরা বললাম ননভেজ। অর্থাৎ, আমরা নিরামিষভোজী নাকি আমিষপ্রিয়। আমাদের তো দুটোই প্রিয়, তা-ই আমরা আমিষ, নিরামিষ খাবার দিতে বললাম, কারণ হলো দুটো মিলিয়ে আমরা খেতে চেয়েছি। আমাদের প্রথমে সুন্দর তিনটি কলাপাতা দেওয়া হলো টেবিলে। তারপর পাপড়সহ নানা জাতের খাবার একে একে পরিবেশনে আমরা সত্যি মুগ্ধ। দক্ষিণের কিছু খাবার আমার ভীষণ প্রিয়; বিশেষত দোসা, সবজি, টকজাতীয় কিছু চাটনি, সালাদ, ডাল আরও কিছু। সর্বানা রেস্তোরাঁয় পেয়ে গেলাম কিছু পছন্দের খাবার। তবে এবার দোসা খেতে ইচ্ছে হলো না। যা-ই খাই না কেন কলপাতায় প্রথমেই পরিবেশন করা হলো কয়েকটি ফলের টুকরো। খেতে ভালোই লাগল। এরপর একে এক এল ভাত, সবজি, ভাজি, ডাল ও চিকেনকারি। একটু মশলা বেশি মনে হলেও খেতে মন্দ লাগে নি। খেতে খেতে দেয়ালে সর্বানা রেস্তোরাঁর উদ্বোধনী ফলক দেখে নিলাম। যেখানে লেখা আছে—মালয়েশিয়ার সাবেক এক স্বাস্থ্যমন্ত্রী এ রেস্তোরাঁ উদ্বোধন করেছিলেন। আজ দুপুরে ভিন্ন কায়দায় খাবার গ্রহণে বেশ আনন্দ পেলাম। শৈশব ও কৈশোরে পূজা, পার্বন, মিলাদে কলাপাতায় প্রচুর খেয়েছি। আগে গ্রামীণ জনপদে এবং আমাদের এলাকায় ডেকোরেটার্স ছিল না। আবার প্রচুর থালা বাসনেরও ব্যবস্থা ছিল না। তবে পাড়া প্রতিবেশীদের জোগানে যেকোনো অনুষ্ঠান সুন্দরভাবেই সম্পন্ন করা যেত। অন্যদিকে ব্যক্তিগত উদ্যোগে কেউ কেউ প্রচুর প্লেট ও অন্যান্য বাসনপত্রাদি কিনে সংরক্ষণ এবং কারও প্রয়োজন হলে সরবরাহ করতেন, ভাড়াও দিতেন। এমন সহযোগিতায় প্রচুর আন্তরিকতা ছিল। কলাপাতায় খাবার গ্রহণে মনে পড়ে গেল সে দিনগুলোর কথা, কাহিনি। আমার মনে হয় কলাপাতায় খাবার গ্রহণ স্বাস্থ্যকর। নানান জাতের, নানান প্রকারের মানুষ রেস্তোরাঁয় খেতে আসে। এর মধ্যে যেকোনো ধরনের সংক্রামক রোগী থাকাটাই স্বাভাবিক, যা আমরা জানি না। ফলে, একজনের ব্যবহৃত প্লেট অন্যজনের ব্যবহারে রোগ সংক্রমিত হওয়ার সম্ভাবনা থেকেই যায়। সে কারণে কলাপাতার মধ্যে খাবার গ্রহণে ইনডিজেনাস ভাব থাকলেও আমার কাছে নিরাপদই মনে হয়।

14
সর্বানা রেস্তোরাঁয় কলাপাতায় খাবার গ্রহণ : সৌরভ, আরিফ ও লেখক

দুপুরের খাবার খেয়ে খুব ভারি ভারি লাগছে। শরীর আর চলে না। আরও তো বাকি আছে দেখার, কী করা যায় ভাবছিলাম। এবার আমরা তিনজন ধীরে ধীরে চললাম হারমোনি স্ট্রিটের দিকে। যেতে যেতে মনে পড়ে গেল জীবনানন্দের কবিতার চরণ।

‘চঞ্চল শরের নীড়ে কবে তুমি—জন্ম নিয়েছিলে কবে,
বিষণ্ন পৃথিবী ছেড়ে দলে দলে নেমেছিলে সবে
আরব সমুদ্রে, আর চীনের সাগরে—দূর ভারতের সিন্ধুর উৎসবে।
শীতার্ত এ-পৃথিবীর আমরণ চেষ্টা ক্লান্তি বিহ্বলতা ছিঁড়ে
নেমেছিলে কবে নীল সমুদ্রের নীড়ে।

ধানের রসের গল্প পৃথিবীর—পৃথিবীর নরম অঘ্রান
পৃথিবীর শঙ্খমালা নারী সেই—আর তার প্রেমিকের ম্লান
নিঃসঙ্গ মুখের রূপ, বিশুষ্ক তৃণের মতো প্রাণ,
জানিবে না, কোনোদিন জানিবে না; কলরব ক’রে উড়ে যায়
শত স্নিগ্ধ সূর্য ওরা শাশ্বত সূর্যের তীব্রতায়।’
[জীবনানন্দ দাশ : সিন্ধুসারস]


১৬ পর্বের লিংক

স্বপন নাথ

জন্ম ৪ মে ১৯৬৮; বড়লেখা, মৌলভীবাজার। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর, বাংলা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়; এমফিল, ভাষাবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

পেশা : শিক্ষকতা; উপপরিচালক (গবেষণা ও তথ্যায়ন), নায়েম, শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

প্রকাশিত বই :
প্রবন্ধ—
চিন্তা ও জগৎ : সাহিত্য সংস্কৃতি [প্রবাস প্রকাশনী, যুক্তরাজ্য ২০০৭]
কবিতার নন্দনবিশ্ব [অনিন্দ্য প্রকাশ, ঢাকা ২০১৭]
কথার বুনন [জিনিয়াস পাবলিকেশন্স, ঢাকা ২০১৯]
ছিন্ন কথামালা [জিনিয়াস পাবলিকেশন্স, ঢাকা ২০১৯]

কবিতা—
রৌদ্র ও বৃষ্টিতে মায়াহরিণ [ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ, ঢাকা ২০০৭]
জলৌকা চোখের চাতাল [ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ, ঢাকা ২০১০]
নির্জন বিচালির ডানা [কবি প্রকাশনী, ঢাকা ২০১৩]
নখের আউঠা [উৎস প্রকাশন, ঢাকা ২০১৪]
নানকার ধানবীজ [উৎস প্রকাশন, ঢাকা ২০১৫]
একলব্যের ছিন্ন আঙুল [নাগরী, সিলেট ২০১৬]
সংশয়ের বসতি [নাগরী, সিলেট ২০১৭]
গ্রাম বজ্রযোগিনী [জিনিয়াস পাবলিকেশন্স, ঢাকা ২০১৯]

ই-মেইল : rudro71@gmail.com