হোম ভ্রমণ মালয়েশিয়া ভ্রমণ : সামান্য দেখা

মালয়েশিয়া ভ্রমণ : সামান্য দেখা

মালয়েশিয়া ভ্রমণ : সামান্য দেখা
174
0
১৩ পর্বের লিংক

 


পর্ব : ১৪

মালয়েশিয়া যাবার আগেই মালাক্কা ভ্রমণের ইচ্ছে ভাবনার মধ্যে ছিল। মনে মনে ভেবেছি, সুযোগ পেলে কোনো এক সময় চলে যাব। এর আগে সময় ও সামর্থ্যের শৃঙ্খলে ইচ্ছা পূরণ হয় নি। এবার হঠাৎ এ সুযোগটি আসে এবং কাজে লাগাই। তাও পুরোপুরি নয়, যা হওয়ার ভাবনা ছিল, তা এবার আংশিক হলো। আবার যদি কখনও এ সুযোগ আসে, তাহলে বাকিটুকু বাস্তবায়ন করা যাবে। বলে রাখা ভালো যে, কত বিবরণে, লেখালেখির তথ্যে মালাক্কা প্রণালির কথা এসেছে। আমার কথা নতুন কিছু নয়। রাজনীতি ও অর্থনীতির হিসাব নিকাশে এ অঞ্চল বিখ্যাত হয়ে আছে ইতিহাসের গহনে। এ বিষয়ে ইতিহাসের সকল তথ্য আমার জানা নেই। শুধু ইতিহাসে নয়, সাহিত্যেও কতভাবে রূপায়ণ করা হয়েছে সাগর, উপসাগর, দ্বীপমালা ও এ-সংশ্লিষ্ট সৌন্দর্য। এর কিছু চিহ্ন আমরা খুঁজে নিতে চেষ্টা করব—শুধু এ সামান্য বাসনা চিন্তার মাঝে রাখি।

মসজিদ সালাহ মালাকা দেখার পর ফিরছি শহরের পথে। আগেই বলেছি মালাকা ছোট, কিন্তু প্রাচীন ও সুন্দর শহর। আবার সমুদ্র বন্দর শুধু নয়, মালয়ভূমির প্রবেশদ্বার বলা যায়। প্রাচীন ও মধ্যযুগে সুমাত্রা, জাভা, আন্দামান আর মালাক্কায় মশলা উৎপাদন ও বাণিজ্যের কেন্দ্র হিসেবে এ অঞ্চল গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। অন্যদিকে নৌপথে বাণিজ্যিক যোগাযোগের জন্য মালাক্কার সুনাম অনেক প্রাচীনকাল থেকে বিদিত। এর ফলেই এখন মালাক্কা একটি পর্যটন শহর। আমরা দেখেছি বলে নয়, অনেকেই পরিচ্ছন্ন, নীরব, সুন্দর হিসেবে মালাক্কা শহরের প্রশংসা করেছেন। প্রাচীনকালে এর নাম ছিল মালেকা, কিন্তু মালাক্কা নামেই এখন পরিচিত সবার কাছে।

1
পর্তুগিজদের নির্মিত চার্চ টিলা থেকে দেখা মালাক্কা

আমরা কৈশোরে যখন প্রথম ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা পড়ি, তখন অনেক প্রণালির সাথে মালাক্কার নাম পাঠ করেছি। এ প্রসঙ্গে আমার দাদার কথা স্মরণ করছি। তার কাছেই আমি প্রথম পৃথিবী সম্পর্কে সাধারণ ধারণা লাভ করি। তিনি ইতিহাস ও ভূগোলে খুব উৎসাহী ছিলেন এবং ভূগোলবিদের মতো জানাবোঝা না থাকলেও এ সম্পর্কিত তথ্য জানতেন। সেকালে এরকম সনদহীন এক ব্যক্তি ভূগোল ও ইতিহাস নিয়ে ভাবেন, চিন্তা করেন—এমন লোক ছিল বিরল। এক্ষেত্রে তার কাছে আমার ঋণ অশেষ। সন্ধ্যায় তিনি প্রতিদিনই বেতারে বিবিসি, ভয়েস অব আমেরিকার সংবাদ শুনতেন। এখন যখন এসব লিখছি আর ভাবছি—সংবাদ শুনতে কেমন আকর্ষণ ছিল তার। সংবাদের সময়ে তিনি এসে উপস্থিত হতেন আমার কাছে। বেতারে সময় মতো স্টেশন ধরার কাজটি আমাকেই করতে হতো। আমি তার সাথে পাশে বসে সংবাদ শুনতাম। সে সময় দুনিয়ার নানা দেশ, রাজধানী, যুদ্ধ, আন্দোলন, সংগ্রাম ইত্যাদির নাম ও বর্ণনা বেতারে বর্ণিত হতো। সংবাদ শোনা শেষ হলে দেশ ও স্থানের পরিচয় তার কাছে জানতে চাইলে তিনি দেখিয়ে দিতেন মানচিত্রে। সে-সময় বাড়িতে মানচিত্রের অনেকগুলো বই ছিল। দাদার কাছেই প্রথম মালাক্কা প্রণালির বিবরণ শুনি। এবারে মালয়েশিয়া বা মালাক্কার আবহাওয়া, ভূমি, প্রকৃতি, কৃষি, ফসল, খাদ্যসামগ্রী, বাণিজ্য ও হাল আমলের সংস্কৃতির কিছু কিছু রূপ দেখে আমার মনে সন্দেহ জেগেছে যে, প্রাচীনকাল থেকে বাংলাদেশের সাথে মালাক্কার যোগাযোগ থাকা অমূলক কিছু নয়। ফলে, বাঙালি ও মালয়ের মধ্যে সম্পর্কটা প্রাচীন। এ বিষয়ে ইতিহাসও সাক্ষ্য দেয়। কারণ সকলেই একই সময়ে ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে ছিল। বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য, বিষয়বৈচিত্র্যে প্রায় কাছাকাছি।


ব্যবসা বা পণ্য আমদানি ও রপ্তানি ছাড়াও মালয়েশিয়াতে ইসলামের পত্তন ঘটে মালাক্কা দিয়ে।


নৃতাত্ত্বিক ভিন্নতা থাকলেও ঔপনিবেশিক শাসন, আন্দোলন, জীবনে বেঁচে থাকার তাগিদ প্রায় একইরকম। এ ছাড়াও প্রাচীন মহাকাব্যিক সংস্কৃতি উভয় জায়গাতেই সমভাবে প্রভাব বিস্তার করেছিল। উল্লেখ্য যে, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯২৭ সালে সিঙ্গাপুর, মালয়, ইন্দোনেশিয়া, জাভা, বালি, সুমাত্রা, থাইল্যান্ড ভ্রমণ করেছিলেন। বিভিন্ন স্থানে তাকে সংবর্ধনাও দেওয়া হয়েছিল। এ ভ্রমণের সঙ্গী হয়েছিলেন আচার্য সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়। ওই ভ্রমণ নিয়ে সুনীতিকুমার রবীন্দ্র-সংগমে দ্বীপময় ভারত ও শ্যামদেশ (১৯৪০) গ্রন্থও লিখেছেন। মালাক্কা দ্বীপের চমৎকার প্রকৃতি, মালয়, চিনা, তামিল, মুসলমানসহ বিচিত্র জাতিগোষ্ঠীর সহিষ্ণু বসবাস দেখে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও সুনীতিকুমার উভয়ই অভিভূত হয়েছেন। সে সময় মালাক্কায় বসবাসরত কয়েকটি সচ্ছল, প্রতিষ্ঠিত বাঙালি পরিবার দেখে সুনীতিকুমার আবেগায়িত অনুভূতিও প্রকাশ করেছেন তার লেখায়। ওই সময় বিশ্বকবির আগমনে সেখানের বাঙালি সম্প্রদায়ের আনন্দময় উপস্থিতি ও কবিকে শ্রদ্ধা জানাতে সংবর্ধনার আয়োজন করা হয়েছিল। এর বিস্তৃত বিবরণ তিনি এ গ্রন্থে লিখেছেন।

মালাক্কা ও সুমাত্রা দ্বীপের মধ্যে একটি ছোট প্রণালি হলো মালাক্কা। মালয়েশিয়ার বৈচিত্র্যময় ইতিহাসের শুরু এ মালাক্কা দিয়ে। বিদেশি, বিভাষীরা মালাক্কা দিয়ে প্রবেশ করে মালয়েশিয়ায়। বন্দর ব্যবহার, পণ্য বিনিময় ও বাণিজ্যের সুবিধা এবং পৃথিবীর মধ্যে সুন্দরতম একটি স্থান হওয়ার কারণে এখানে পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে লোকজন এসে অবস্থান গ্রহণ করে। শুধুই কী অন্যদের বাণিজ্যের ইতিহাসে আছে? আমাদের নেই। এ মালাক্কাসহ ওই এলাকার দ্বীপাঞ্চলের সাথে বাংলাভাষীদেরও যোগাযোগ ছিল, হয়তো অন্যদের মতো নয়। কাপড় ব্যবসার ফলেই মূলত এ যোগাযোগ স্থাপিত হয়। উল্লেখ্য যে, বাংলায় বস্ত্রশিল্পে ব্যবহৃত ধুনন যন্ত্রের ব্যবহার, রেশম উৎপাদন ও তা থেকে বস্ত্রাদি তৈরির কারিগরি উৎকর্ষের প্রসঙ্গ উল্লেখ করেছেন চিনা পর্যটক মা হুয়ান। বাংলায় গুরুত্বপূর্ণ এ ধুনন যন্ত্রের প্রসার ঘটেছিল চৌদ্দ শতকে। নৌবাণিজ্য বিশেষজ্ঞ সুশীল চৌধুরী, সমুদ্র-বাণিজ্যের প্রেক্ষিতে স্থল-বাণিজ্য (২০১৭) গ্রন্থে বিভিন্ন তথ্য উদ্ধৃত করে জানিয়েছেন,—‘প্রত্যেক বছর বাংলার বণিকরা গোটা পঞ্চাশেক জাহাজে করে কাপড় রপ্তানি করত তুরস্ক, সিরিয়া, পারস্য দেশ এবং আরব দেশ থেকে ইথিওপিয়া পর্যন্ত। এর কয়েক বছর পর আর এক পর্তুগিজ পর্যটক টোমে পিরেস বলেছেন যে বাংলার কাপড় ভারত মহাসাগরের পূর্ব প্রান্তের সব বন্দরে রপ্তানি হয়। তিনি আরও জানাচ্ছেন যে, বাংলা থেকে প্রত্যেক বছর একটি জাহাজ বছরে অন্তত একবার কখনও-বা দু’বার প্রধানত কাপড় নিয়ে মালাক্কা যেত। জাহাজে যে পরিমাণ পণ্য থাকত তার মূল্য আশি-নব্বই হাজার ক্রুজাডোজের মতো। এসব জাহাজ প্রধানত সাদা মিহি সুতোর কাপড় রপ্তানি করত, সঙ্গে থাকত সিনাবাফ, চৌতার, বেথিলা প্রভৃতি প্রায় কুড়ি রকমের মোটা কাপড়। বাংলায় মালাক্কা এবং পাসে (Pase) থেকে বছরে চার-পাঁচটা বাণিজ্যতরী আসত।

মালাক্কায় বাংলা কাপড় বেশ ভালো দামে বিক্রি হতো কারণ ভারত মহাসাগরের পূর্বাঞ্চলে এই কাপড়ের প্রচুর চাহিদা ছিল।’ তাছাড়া তিনি মালাক্কাসহ সংশ্লিষ্ট দ্বীপাঞ্চলে বাঙালিদের সুতা ও বস্ত্রশিল্প রপ্তানির কথা বলেছেন। এমনকি বিভিন্ন তথ্যে দেখা যায় যে, সমুদ্রপথে বহুদেশে বাংলা থেকে খাদ্যশস্য রপ্তানি হতো। আমরা আরও জানি, ভূপর্যটক ইবনে বতুতা বাংলার মসলিনের অতি প্রশংসা করেছিলেন। আমরা বিভিন্ন সূত্র থেকে বাঙালি ও মালয়দের মধ্যে প্রাচীনকালের সম্পর্ক লক্ষ করি। তা বাণিজ্য বা যেকোনো সূত্রেই হোক-না-কেন। মূলত, মালাক্কার উত্থান হয়েছে নৌ-বাণিজ্যের কারণেই। ভারতীয় ব্যবসায়ীরা এ সুযোগ গ্রহণ করে। ভারতের গুজরাটি মুসলমান, চিনা এবং বাঙালি সওদাগরেরা বাণিজ্য করতে যেতেন মালাক্কায়। তারা মূলত পণ্য বিনিময় করতেন। চিনারা কাপড় কিনতেন ভারতীয়দের কাছ থেকে আর ভারতীয় বণিকেরা সংগ্রহ করতেন চিনা তৈজসপত্র ও সেখানখার মশলা। ওই মশলার লোভে মালাক্কা আক্রান্ত হয়েছে বারবার। এ সূত্রেই পর্তুগিজসহ অন্য ইউরোপীয় বণিকরা শক্তি প্রয়োগ করে বাণিজ্য সুবিধার দখল নিতে। ওই সময় ভারত মহাসাগরেও পশ্চিমা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয়। তবে এক্ষেত্রে তারা বেশি লাভবান হতে পারে নি। কারণ, বাণিজ্য তাদের লক্ষ ছিল না, ছিল উপলক্ষ্য মাত্র। মাহাথির মোহাম্মদ এ প্রসঙ্গ মূল্যায়ন করেছেন যেভাবে—“The Indian and the Arabs, however behaved differently. Their communities were never big nor did they encroach into the trading activities of the locals. They tended to blend with the locals and intermarry when they wish to settle. They would eventually forget their own languages completely and would identity fully with the locals… The European behaved differently, arriving not in trading ships but in armed merchantmen. Nor did they believe in free trade. One of the Rulers of Macassar- now Ujung Pandang in Indoneisa- had to point out to the Dutch that `God made the land and the sea;the land be divided among men and sea he gave in common. It has never been heard that anyone be forbidden to sail the seas.’ European nations wanted monopolies and so began by setting up fortified trading stations. [A Doctor in the House]

স্মরণীয় যে, এদেশে নৌপরিবহন ও বাণিজ্যের ইতিহাস অনেক প্রাচীন। বাণিজ্য ব্যতীত শুধু যে ইউরোপীয়রা নৌপথে পরিভ্রমণ করেছে তা নয়। ভারতবর্ষসহ বিভিন্ন দেশে বিচিত্র রকমের নৌযান নির্মাণ ও এর ব্যবহার ছিল বলে ঐতিহাসিক তথ্য রয়েছে। প্রাচীন মিশর, মেসোপটেমিয়া আর এদিকে সিন্ধু-মহেঞ্জাদারো-হরপ্পায় খ্রিস্টপূর্ব যুগে নৌকা তৈরি, যোগাযোগ ও নৌবাণিজের উদাহরণ পাওয়া যায়। সমুদ্রে দিক নির্ণয়ের জন্য সেকালে দিকনির্দেশক যন্ত্রও আবিষ্কার করেছিলেন বণিক ও পর্যটকরা। আমাদের মধ্যযুগের মঙ্গলকাব্যেও বিভিন্ন ধরনের নৌকার উল্লেখ রয়েছে। যেমন বিজয়গুপ্ত বিরচিত মনসামঙ্গল-এর কথা এখনে উল্লেখ করা যায়।

প্রথমে তুলিলা ডিঙ্গা নামে মধুকর
শুধাই সুবর্ণে তার বসিবার ঘর
আর ডিঙ্গা তুলিলেক নাম দুর্গাবর।
তবে তোলে ডিঙ্গাখানি না গুজারেখি।
দ্বিপ্রহরের পথে যার মাথা কাঠ দেখি।
আর ডিঙ্গা তুলিলেক নাম শঙ্খচূড়
আশিগজ পানি ভাঙি গাঙ্গে লয় কূল।
তবে ডিঙ্গাখান তোলে নাম সিংহমূখী
সূর্য্যরে সমান রূপ করে ঝিকিমিকি।
আর ডিঙ্গা তুলিলেক নাম চন্দ্রযান
তাথে ভরা দিলে দুই কূলে হয় থান।
আর ডিঙ্গা তুলিলেক নামে চন্দ্রমূখী
তাতে চালু ভরা হাজার এক পুটী।

আমরা মালাক্কাতে চাঁদ সওদাগরের নয়, অন্য সওদাগরের নৌযান দেখারও চেষ্টা করবো। মালাক্কার প্রতিষ্ঠাতা যুবরাজ পরমেশ্বর যে চিনা রাজা মিং-এর কাছে নতি স্বীকার করে মালাক্কা পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন, সে মিং রাজার সাথেও বাংলার যোগযোগসূত্র আমরা খুঁজে পাই। বাণিজ্যের কারণেই এ যোগাযোগ স্থাপিত হয়েছিল। সেকালে জলপথে বাণিজ্যের জন্য জাহাজ শিল্প বিকশিত হয়েছে বলে তথ্য পাওয়া যায়। পর্তুগিজ পর্যটকদের বিবরণে লক্ষ করি, এশিয়ায় বিশেষত বাংলা অঞ্চল থেকে বস্ত্র ও অন্যান্য পণ্য প্রেরণ করা হতো এসব দ্বীপাঞ্চলে। পণ্যবহনকারী নৌযান চলাচলের বিবরণ থেকে বোঝা যায় সে সময় আমাদের দেশে জাহাজ তৈরি হতো। এ ছাড়াও পনেরো শতকে মিং রাজার কাছে থেকে উপহার এসেছে বাংলায়, এর প্রত্যুত্তরে বাংলা থেকেও দূত ও পণ্যসামগ্রী প্রেরণ করা হয়েছে। ওই সময় সমুদ্রপথে ব্যবহৃত জলযানগুলো নির্মিত হতো দেবদারু কাঠ দিয়ে।


 ১৪০০ সালে মালাক্কা সালতানাত প্রতিষ্ঠিত হয়। সালতানাতের শাসন চলে ১৫১১ সাল পর্যন্ত। 


ব্যবসা বা পণ্য আমদানি ও রপ্তানি ছাড়াও মালয়েশিয়াতে ইসলামের পত্তন ঘটে মালাক্কা দিয়ে। প্রাসঙ্গিক নানা কারণে, মালাক্কার পথে পথে ইতিহাসের উপাদান ছড়িয়ে আছে। এ সূত্রে ইউনেস্কো মালাক্কাকে বিশ্ব ঐতিহ্যের শহর হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে। সুতরাং, পুরো শহর ও সংলগ্ন এলাকাই ঘুরে দেখার মতো। কাছাকাছি দর্শনীয় স্থানগুলো অবস্থিত বলে বেশি পরিশ্রমও করতে হয় না। এবারে সেন্ট পল চার্চ পয়েন্টে যাবার আগেই দেখে নেই মিনারা তামিং সারি। ১১০ মিটার উচ্চতা সম্পন্ন একটি টাওয়ার। এতে আছে ঘূর্ণায়মান একটি প্লাটফর্ম। যেখান থেকে শহরের নান্দনিক সৌন্দর্য অবলোকন করা যায়। একসাথে ৬৬ জন দর্শক এ প্লাটফর্মে ওঠানামা করতে পারেন।

2
মিনারা তামিং সারি (টাওয়ার), মালাক্কা

আমরা টাওয়ারে উঠি নি, সময়ের চিন্তা করে। কাছ থেকে দেখে অবশেষে এসে যাই ইতিহাসের নিদর্শনগুলোর সামনে। ধ্বসে পড়া ও ক্ষয়ে যাওয়া সারি সারি ইটের জমাটবদ্ধতা প্রাচীনত্বের চিহ্ন বহন করে। এসব দেখলে জানতে ইচ্ছে করবে ফেলে আসা পেছনের ঘটনাবহুল ইতিহাস। ১৯৫৭ সালে মালয়েশিয়া স্বাধীন হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত মালাক্কা শাসন করেছে পর্তুগিজ, ডাচ, জাপানি ও ব্রিটিশরা। এর ফলে সেখানে ওই সময়ের অনেক নিদর্শন ইতিহাসের সাক্ষ্য হয়ে আছে। এখানে রয়েছে পর্তুগিজদের নির্মিত ভবন, ডাচদের নির্মিত সে-কালের লেন ও বাজার, সেন্ট পলস হিল, কয়েকটি জাদুঘর, মালাক্কা নদী, খামার, চিনা বাজার ও প্রাচীন শহরের যত স্মৃতিগাথা। সেন্ট পল চার্চ হিলে ওঠার আগে নিচেই বিশাল ফটকের মতো কিছু দেখতে পাই। এটি আসলে একটি দুর্গের ধ্বংসাবশেষ।

3
ফামোজা দুর্গ, মালাক্কা

ইতিহাসের এসব উপকরণ দেখে বুঝে নেই যে, মালাক্কা প্রণালির মাধ্যমেই মালাক্কা শহরে বহুভাষী ও বহুত্ববাদী সংস্কৃতির ভিত রচিত হয়। এ প্রণালির আয়তন প্রায় ৮০৫ কিলোমিটার। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এ প্রণালি মালয় ও সুমাত্রা দ্বীপের মধ্য দিয়ে প্রবহমান। ভারত মহাসাগর ও চিন সাগরকে সংযুক্ত করেছে। এ প্রণালির কারণেই মালাক্কা বন্দর হয়ে ওঠে গুরুত্বপূর্ণ। যা-হোক, সেন্ট পল চার্চ একটি উঁচু টিলায় অবস্থিত। সেখানে ওঠে ইতিহাসের চিহ্নগুলো দেখে নেই। পুরনো ভগ্ন চার্চ বিল্ডিং-এর চারপাশ দেখতে দেখতে পর্তুগিজ শাসন ও ইতিহাসের কথা মনে পড়ে।

4
সেন্ট পল চার্চ, মালাক্কা

সিঁড়ি দিয়ে উপরে  উঠার সময়ও দু-পাশে দেখা যায় ইউরোপীয় উপনিবেশের উপকরণ। চার্চের ভেতরে রয়েছে কিছু শিলালিপির নিদর্শন। চার্চটিলার চারপাশে ঘুরে ঘুরে দেখা যায় পুরনো সেই স্থাপনাগুলো। চার্চের সামনে দাঁড়াই, পুরনো ভবনের ক্ষয়িষ্ণু দাগগুলো কয়েকবার দেখে নিতে চেষ্টা করি। দেশি-বিদেশি অনেক পর্যটক এখানে আসে। ওইদিনও উপস্থিত হওয়া সকলেই ঘুরে ঘুরে দেখছে। পর্যটকরা মূলত এ ঐতিহাসিক শহরে এগুলো দেখার জন্যই কি আসে? নাকি ভিন্ন কিছু তারা খুঁজে? চার্চের ভগ্নাংশ দেখার পর আরিফ ও আমি চার্চের পেছনের দিকে যেতে চেষ্টা করি। পেছনে গিয়ে দেখি ওই টিলা থেকে শহরের কিছু অংশ ও সমুদ্র দেখা যায়। সেদিন রোদ ছিল প্রখর, তাই ওখান থেকেও সমুদ্রের ওপর রোদের ঝিকিমিকি দৃশ্য দেখা যাচ্ছিল। ভাবলাম এখান থেকে সমুদ্র খুব বেশি দূরে নয়। পেছন দিকে জাদুঘরের একটি নির্দেশনা আছে; কিন্তু ওদিকে দেখলাম রাস্তা বন্ধ। ফলে যাবার সুযোগ নেই। তবে চার্চের পেছনের দিকে সেন্ট পলের সুন্দর একটি স্ট্যাচু উঁচু ভিতের ওপর প্রতিষ্ঠিত। ইচ্ছে হলো একটি ছবি তুলে নেই। অনেক পর্যটক এখানে। লক্ষ করি, স্ট্যাচু থেকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে এক ইউরোপীয় তরুণ, কথা বলছে দু-ই তরুণীর সাথে। চেহারা দেখে বুঝি নি কোথা হতে তার আগমন। আমার নজর ছবি তোলার দিকে, সাথে আরিফ। তবে হঠাৎ কানে বাজল রিংগিতের দর কষাকষি। তখনই আবার ওদের দিকে খেয়াল করি আর তাদের দেখে নিতে চেষ্টা করি। এ তরুণী দু-টিকে মনে হলো চিনা হতে পারে। এক রাত কত রিংগিত, দু-রাত—এরকম কথা বিনিময় হচ্ছিল। অবশেষে তারা একমত হলে এখান থেকে একসাথেই কোথায় হারিয়ে গেল। আরিফ বলল—পর্যটক নগরী তো, তাই এসব বিষয় এখানে খুব সুলভ।

5
সেন্ট পলের ভাস্কর্য

চার্চ টিলা থেকে নামার সময় ভাবতে থাকি ইতিহাসের তথ্য নিয়ে। কতভাবে যে বিবর্তিত হয়েছে মালাক্কার কাহিনি। ১৪০০ সালে মালাক্কা সালতানাত প্রতিষ্ঠিত হয়। সালতানাতের শাসন চলে ১৫১১ সাল পর্যন্ত। ১৫১১ সাল থেকে ইউরোপীয় উপনিবেশের পত্তন হলেও এখানে ডাচ, ব্রিটিশ, চিন, ভারত, ইন্দোনেশিয়াসহ বিভিন্ন দেশ থেকে জনজাতি এসে গড়ে তুলে বহুজাতিক মিলনের শহর। এজন্যই এটাকে বলা হয় ইতিহাসের নগরী। এর প্রাচীন ইতিহাস থেকে জানা যায় ১৩৭৬ থেকে ১৩৯০ সালের মধ্যে এ শহর গড়ে ওঠে। এটি প্রতিষ্ঠা করেন সুমাত্রার যুবরাজ পরমেশ্বর। তিনি প্রথমে সিঙ্গাপুর (প্রাচীন নাম তেমাসেক)-এ অবস্থান নিয়েছিলেন। সিয়ামিজরা তাকে আক্রমণ করার পর তিনি আশ্রয় গ্রহণ করেন এ মালাক্কা দ্বীপে। মালাক্কা নামকরণের সাথে পরমেশ্বর সংশ্লিষ্ট একটি গল্পও প্রচলিত রয়েছে। তিনি একবার শিকারে গেলে ক্লান্ত হয়ে পথিমধ্যে এক গাছের ছায়ায় বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। ওই সময় এক হরিণ উপস্থিত হয়। পরমেশ্বরের সাথে থাকা কুকুরটি হরিণকে ধাওয়া করে। উলটো হরিণও কুকুরটিকে ধাওয়া করে। ফলে, ধাওয়া থেয়ে কুকুরটি পাশের নদীতে লাফ দেয়। এ ঘটনা থেকে তিনি কী যেন শিক্ষা নিয়ে মালাক্কায় স্থায়ীভাবে অবস্থানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। তিনি শিকারে যাবার পর যে গাছের নিচে বসে বিশ্রাম গ্রহণ করেছিলেন, এর নাম ছিল ‘মেলাকা’। এর নামানুসারে তিনি এ স্থানের নামকরণ করেন মেলাকা। পরবর্তীতে মেলাকার উচ্চারণ বিচ্যুতিতে পরমেশ্বর প্রতিষ্ঠিত শহরের নাম হয় মালাক্কা। তবে এখনও ওই মেলাকা নামের লিখনরূপটি সাইনবোর্ডসহ বিভিন্ন বিজ্ঞাপনে লক্ষ করা যায়। যদিও বলা হয় মালাক্কা কিন্তু লেখা হচ্ছে মেলাকা। উল্লেখ্য যে, চিনের শক্তিমান রাজা মিং-এর আনুগত্য স্বীকার করে নিলে পরমেশ্বর হন মালাক্কার প্রশাসক। এক পর্যায়ে তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। ওই সময় আরবদের সাথেও তার সম্পর্ক তৈরি হয়।


একপাশে ঐতিহ্যিক ও নৃতাত্ত্বিক জাদুঘর অন্যদিকে ক্রাইস্টচার্চ আর বিপরীত দিকে নদী ও অন্য স্থাপনাগুলো।


বাণিজ্যের জন্য মালাক্কা নগর ও বন্দর খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল এক সময় এবং এখনও বিদ্যমান। সেই প্রাচীন কাল থেকে বাণিজ্যিক যোগাযোগের ফলে বিভিন্ন দেশ থেকে লোকজনের আনাগোনা এখানে শুরু হয়। চিন ও ভারতের বিশেষত গুজরাটি বণিকরা এখানে যাতায়াত ও বাণিজ্য শুরু করে। আবার ভূরাজনৈতিক গুরুত্বের কারণে মালাক্কা বারবার আক্রান্ত হয়েছে। কে কাকে পরাজিত করবে আর দখল নেবে। উদ্দেশ্য ছিল—একদিকে সহজে সমুদ্রপথ ব্যবহার আর অন্যদিকে মশলা-পণ্যের প্রতি আগ্রহ। এ দখলে মঙ্গল, চিনা, জাপান কে ছিল না। এ নিয়ে দ্রোহ, যুদ্ধ তারপর চিনা মিং রাজবংশ জয়লাভ করেও এখানে সাম্রাজ্য বিস্তার করে। এক সময় তারা মালাক্কা প্রণালি ও ভারত মহাসাগরের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে ও আধিপত্য বিস্তারে সক্ষম হয়।

সকলেই জানেন একসময় নৌবাণিজ্যে পর্তুগিজদের আধিপত্য ছিল। শক্তি ও কৌশলের কারণে বিশ্বের নানা জায়গায় তাদের সাম্রাজ্যও বিস্তৃত হতে থাকে। ১৫০৯ সালে একজন বণিক ও পর্যটক দিয়াগো লোপেজ মালাক্কা ভ্রমণ করেন। সে সময় মালাক্কার সুলতান মাহমুদ শাহ তাকে অবস্থান করতে দেন নি। কিন্তু এর দু-বছর পর ১৫১১ সালে আবার এক পর্তুগিজ নাবিক আলফনসো আলবুর্কেকি কয়েকজন সঙ্গী নিয়ে মালাক্কা আক্রমণ করেন। সে সময় মালাক্কার সুলতান বাহিনীর সাথে পর্তুগিজ বাহিনীর তুমুল যুদ্ধ সংঘটিত হয়। সুলতান মাহমুদ পরাজয় মেনে নিয়ে মালাক্কা থেকে পলায়ন করেন। মালাক্কা চলে যায় পর্তুগিজদের নিয়ন্ত্রণে। সে সময় মিশনারিদের মাধ্যমে এখানে খ্রিস্টধর্মের প্রসার ঘটে। এরপর মালাক্কা তাদের দখলে থাকে প্রায় ১৩০ বছর। ১৬৪১ সালে আবার ডাচদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায় মালাক্কা। এ সময় ডাচরাও কিছু স্থাপনা নির্মাণ করেছিল। এর মধ্যে ডাচ কলোনি, স্কয়ার ও ক্রাইস্টচার্চ অন্যতম। ডাচদের পর মালাক্কায় ব্রিটিশ উপনিবেশ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৭৯৫ সালে।

যা-ই হোক সেন্ট পল চার্চ থেকে দেখলাম চমৎকার কয়েকটি রিকশা সামনে রাখা আছে। নেমে এসে আমি ও আরিফ রিকশার কাছে দাঁড়ালাম, রিকশা দেখার উদ্দেশে। কারণ, মালাক্কায় এ বিশেষ ধরনের রিকশার খুব সুনাম রয়েছে। কিন্তু মালয়েশিয়ার আর কোথাও এমন রিকশা পাওয়া যায় না। এ রিকশা শুধু মালাক্কায় রয়েছে। ফলে, মালাক্কা ভ্রমণে এলে একবার রিকশা ভ্রমণ করতেই হয়। রিকশা ভ্রমণে দর্শনীয় স্থানগুলো পরিদর্শন করে পর্যটকরা। খুব সুসজ্জিত ও রঙিন এ রিকশাগুলো। প্রতিটি রিকশায় গান শোনার জন্যও ব্যবস্থা রয়েছে। এগুলোর মধ্যে একটি রিকশা ছিল আলাদাভাবে রাখা ও এর ড্রাইভারকেও দেখলাম পাশে বসা। কাছে গিয়ে ভালোভাবে রিকশা দেখতে লাগলাম। ওই রিকশার ড্রাইভার জানতে চায়—আমরা তার রিকশায় শহরে ঘুরব কি না? আমি যখন না করেছি, তখন যে প্রতিক্রিয়া দেখাল, তাতে মনে হলো সে খুব রাগ করেছে। বুঝলাম এভাবে আমাদের রিকশা দর্শন সে পছন্দ করছে না।

6
মালাক্কার সুসজ্জিত রিকশা

আমরা আসলে রিকশা ভ্রমণ করতে চাই নি। দেখতে চেয়েছিলাম। এ সময় পানির জন্য খুব তৃষ্ণা অনুভব করি। সামনের খালি জায়গায় কিছু পানীয়র দোকান ছিল, সেখানে পানি পান করে আমরা চললাম ডাচ স্কয়ারের দিকে। আসলে সব একই জায়গায়, শুধু চক্রাকারে ঘুরলেই দেখা হয়ে যায় এ শহর। সেন্ট পল চার্চ থেকে সবই দেখা যায়, কিন্তু কিছুটা ঘুরে আসতে হলো ডাচ স্কয়ারে। গাড়িতে আসতে হলে ডাচ কলোনির গলি দিয়ে আসতে হয়। আমরা তাহলে আরেক পানাম নগরীতে প্রবেশ করলাম কি না। সোনারগাঁওয়ের পানাম নগরীর মতো এক গলি মনে হলো। তবে দেখতে পেলাম, পানাম নগরীর বিল্ডিংগুলোর মতো এখানের দেয়াল খসে যায় নি বা কোনো ধ্বসেপড়ার চিহ্ন চোখে পড়ে নি। আমি গাড়ি থামাতে বলেছিলাম, কিন্তু কী কারণে ড্রাইভার রেহমান আর গাড়ি থামাল না। গাড়ির জানালা দিয়ে ডাচদের নির্মিত নগরী দেখে আপ্লুত না হয়ে উপায় নেই। আফসোস বেড়েই গেল—আমরা কেন ব্যর্থ হলাম—এত সুন্দর পানাম নগরী পেয়েও রক্ষা করতে পারছি না।

7
ডাচ কলোনির গলি, মালাক্কা

রেহমানের কাছে শুনলাম এ গলির বিল্ডিংগুলো একসময় সাদাই ছিল। মালাক্কা ব্রিটিশদের করায়ত্ত হলে এ সব স্থাপনাগুলো লাল রঙের করা হয়। আমাদের দেশেও রেলওয়ের যত স্থাপনা ও বগি রয়েছে, একসময় সবগুলোই ছিল লাল রঙের। এ গলি দিয়ে আমরা পৌঁছে গেলাম ডাচ স্কয়ার-এ। অসামান্য এক সুন্দর জায়গা ডাচ স্কয়ার। চারদিকে শুধু লাল ইমারত আর মাঝখানে বাগান ও একটি চমৎকার ফোয়ারা শোভা পাচ্ছে। একপাশে ঐতিহ্যিক ও নৃতাত্ত্বিক জাদুঘর অন্যদিকে ক্রাইস্টচার্চ আর বিপরীত দিকে নদী ও অন্য স্থাপনাগুলো। এটি মূলত ছিল ডাচ গভর্নরের আবাসিক এলাকা। পরবর্তীতে ব্রিটিশরা এর নাম দেয় টাউন হল। জেনে নেই পর্তুগিজদের নির্মিত আরেকটি চার্চ অবশেষে ক্রাইস্টচার্চে রূপান্তর করা হয়েছে। মূলত, এ স্কয়ারেই পর্যটকদের মিলনমেলা বসে। স্কয়ারে আসার পর মনে হলো আমরা তো একই জায়গার মধ্যে ঘোরাফেরা করছি। আর এ চার্চটিলাকে কেন্দ্র করেই সব স্থাপনাগুলো আবর্তিত।

8
ডাচস্কয়ারে অবস্থিত ক্রাইস্টচার্চ

এখানে আসার পর আমাদের সঙ্গী সৌরভদাকে খুঁজে পাচ্ছিলাম না। কারণ, সৌরভদা ক্যামেরা নিয়ে এদিক-ওদিক ছবি তুলতে ব্যস্ত। আমি ও আরিফ সিদ্ধান্ত নিলাম আমরা প্রথমে স্কয়ারেই অবস্থিত বড় জাদুঘর (Stadthuys) দেখে তারপর অন্য দিকে যাব, তাতে যত সময়ই লাগুক। আর সাথে থাকা গাড়িটি এখানেই পার্ক করা থাকবে। আমরা বাকি সব হেঁটে হেঁটে দেখব। সবই রয়েছে কাছাকাছি। এর কাছেই মালাক্কা নদী। যার সুনাম রয়েছে সারা বিশ্বে। এ নদী মালাক্কা শহরকে ভিন্ন এক সৌন্দর্য দান করেছে। নদীর কারণেই মালাক্কাকে বলা হয়ে থাকে প্রাচ্যের ভেনিস। নদীর তীরেই বসতি গড়েছিলেন রাজা পরমেশ্বর ও পরবর্তীতে পর্তুগিজ নাবিকরা। এখানে যারা ঘুরতে আসে, তারা সবাই নদী ভ্রমণ করেন রাতের বেলা, ঝলমলে মালাক্কার রূপ দেখার জন্যে। নদীর ওপর একটি সেতু নির্মিত আছে—তান বুনসেং ব্রিজ। এ ব্রিজ উভয় পারের দুই অংশকে সংযুক্ত করেছে। একইসাথে সাক্ষী হয়ে আছে ঐতিহাসিক ঘটনাবলির। তবে যা-ই হোক না কেন নদীর তীরবর্তী স্থাপনা, রেস্টুরেন্ট, হোটেল ও চলাফেরার স্থানগুলো এত সুন্দরভাবে সাজানো হয়েছে, যেখানে চলাফেরাতে প্রাণ জুড়িয়ে যায়। কোনো ময়লা আবর্জনার বালাই নেই, এত পরিচ্ছন্ন। এর বাইরে আছে যত্ন ও যথাসাধ্য রক্ষণাবেক্ষণ। এ নদী নিজেই যেন এক চিত্রশালা। নদী ভ্রমণের মাধ্যমে মালাক্কার বিভিন্ন দৃশ্য ও দুপারের সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। আমরা সিদ্ধান্ত নেই যে জাদুঘর দেখে তারপর যাব মায়াবী নদীর কাছে।


১৫ পর্বের লিংক

স্বপন নাথ

জন্ম ৪ মে ১৯৬৮; বড়লেখা, মৌলভীবাজার। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর, বাংলা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়; এমফিল, ভাষাবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

পেশা : শিক্ষকতা; উপপরিচালক (গবেষণা ও তথ্যায়ন), নায়েম, শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

প্রকাশিত বই :
প্রবন্ধ—
চিন্তা ও জগৎ : সাহিত্য সংস্কৃতি [প্রবাস প্রকাশনী, যুক্তরাজ্য ২০০৭]
কবিতার নন্দনবিশ্ব [অনিন্দ্য প্রকাশ, ঢাকা ২০১৭]
কথার বুনন [জিনিয়াস পাবলিকেশন্স, ঢাকা ২০১৯]
ছিন্ন কথামালা [জিনিয়াস পাবলিকেশন্স, ঢাকা ২০১৯]

কবিতা—
রৌদ্র ও বৃষ্টিতে মায়াহরিণ [ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ, ঢাকা ২০০৭]
জলৌকা চোখের চাতাল [ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ, ঢাকা ২০১০]
নির্জন বিচালির ডানা [কবি প্রকাশনী, ঢাকা ২০১৩]
নখের আউঠা [উৎস প্রকাশন, ঢাকা ২০১৪]
নানকার ধানবীজ [উৎস প্রকাশন, ঢাকা ২০১৫]
একলব্যের ছিন্ন আঙুল [নাগরী, সিলেট ২০১৬]
সংশয়ের বসতি [নাগরী, সিলেট ২০১৭]
গ্রাম বজ্রযোগিনী [জিনিয়াস পাবলিকেশন্স, ঢাকা ২০১৯]

ই-মেইল : rudro71@gmail.com