হোম ভ্রমণ মালয়েশিয়া ভ্রমণ : সামান্য দেখা

মালয়েশিয়া ভ্রমণ : সামান্য দেখা

মালয়েশিয়া ভ্রমণ : সামান্য দেখা
178
0
১২ পর্বের লিংক

পর্ব- ১৩

We have come to this place for pomp and ranks!
We seek refuge from the evil of the event!
Travelers of the path of love, from the borders of not-being
We traveled this throughfare—to the state of being.
We saw the tract of fruit; from Eden
We came, demanding this miracle weed.
With such treasures, the ward of the Holy Spirit,
As beggers, we’ve come to the door of our king.
Oh ship of grace, where is the charity of your anchor;
Born sinful—we come to the sea, filled with caritas.
O clouds wash away with your rains our misdeeds,
We have arrived for judgement with blackened sheets.
Hafez, toss away your woolen sack with equanimity;
We have followed the caravan—with the fire of sighs. [Hafez, 93]

আসলেই তো আমরা ভালোবাসায় বিচ্যুত হয়েছি। এখনও তাড়িত হই ওই ভালোবাসায়, কোনো এক নিরুদ্দেশের টানে। তা-ই আমরা ছুটে চলি অজানা সন্ধানে। আমরা তো এক অতিন্দ্রীয় প্রেমের কাঙাল। আমাদের কথাই বলেছেন কৃতি কবি হাফিজ। এজন্য তার কবি ও কবিতার সম্মেলনে বলা হয় দিওয়ান-ই হাফিজ। যা-হোক আমরাও চলেছি এক অজানা সন্ধানে, অধরাকে ধরতে।

জালান আলোর স্ট্রিট আর বুকিতবিনতাং-এর রাতে খাবার শেষে ক্লান্ত হয়ে ফিরি হোটেল আনকাসায়। আরিফ রাতে থাকতে না পারার কারণে তাকে যেতে হলো এক বাংলাদেশি বন্ধুর বাসায়। মন না চাইলেও গভীর রাতে তাকে বিদায় দিতে হলো। এরপর ঘুমানোর আগে কিছুক্ষণ টেলিভিশনের পর্দায় চোখ রাখার চেষ্টা করি। হায়রে মালয় টেলিভিশন। নির্ধারিত কয়েকটি চ্যানেল ছাড়া আর কোনো চ্যানেল নেই। তা হলে তথ্য অধিকারের দিক থেকে আমরা অনেক ভালো আছি। আমাদের দেশের বাণিজ্য, উৎপাদন আর আয়ের বিবেচনায় আমরা অনেক বেশি উপভোগ করছি অন্তত এ বিষয়ে। কিছুক্ষণ বইয়ের পাতায় চোখ রাখার চেষ্টা করি। তাও হয় না। কারণ, ক্লান্তিতে একেবারে কাহিল। নিশ্চিত ঘুম। ঘুমেই অচেতন।


বাস টার্মিনালের বিভিন্ন দিকে দৃষ্টি ঘুরাচ্ছি আর অবাক হচ্ছি। কোনো ময়লা নেই, এত পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন! 


পরদিন অর্থাৎ, ১৭ মে সকালে হোটেল লবিতে নির্ধারিত সকালের নাস্তা সেরে নিলাম। কিছুক্ষণ পর আরিফের ফোন—‘কী খবর রেডি হয়েছেন?’। আরিফ সময় মতো এসে হাজির। আমি আরিফকে বলি নাস্তা সেরে নিতে। আমরা আজ যাব মালাক্কা। মালাক্কা মালয়েশিয়ার খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থান। এর অনেক গল্পও শুনেছি। যেখানে মালয়েশিয়া থেকে যেতে বাসযোগে সময় লাগে ২ঘণ্টারও কম। ভাবলাম দিনটা কাজে লাগানো দরকার। আমরা প্রথমে বাসযোগে টিবিএস [Terminal Bersepadu Selatan—TBS] এ যাবার চেষ্টা করেছি। কিন্তু আমার তো বাসে ভ্রমণের কার্ড নেই। উদ্দেশ্য হলো টিবিএস থেকে আবার বাসেই মাল্লাকায় রওয়ানা দেওয়া। পাদু সেন্ট্রাল থেকে টিবিএস যাবার বাসে আরিফ তার কার্ড পাঞ্চ করার পর তাকে বসার অনুমতি দিলেও আমাকে বাস ড্রাইভার নামিয়ে দিল। বুঝলাম এখন ব্যবস্থাপনার ধরন। আমরা একটি কার্ড সংগ্রহ করতে চেষ্টা করি। মালয়েশিয়ার সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি ক্ষুদ্রাংশের মাঝেও যে ভেজাল আছে, আরিফ তা জানত না। রাস্তায় এক ড্রাইভারের কাছ থেকে ২০ রিংগিতের বিনিময়ে একটি কার্ড কিনলাম। কিন্তু এ লোকটা আমাকে যে ঠকেছে, তা পরে বুঝলাম। কারণ, এ কার্ডে যা ব্যালেন্স ছিল, তা পর্যাপ্ত নয়। ফলে, কাজ হয় নি। যে বাসে আমরা এটি পাঞ্চ করেছিলাম, সে ড্রাইভারও খারাপ আচরণ করল আমাদের মন্দ লোক মনে করে। ফিরে দেখি কার্ড বিক্রি করা ড্রাইভারও উধাও হয়েছে। না হলে তাকে ধরতে পারতাম। ফলে, আমরা বাসে ভ্রমণ করতে পারলাম না। টিবিএস যেতে হলো ট্যাক্সি নিয়ে। অবশ্য ট্যাক্সি ভাড়াও বেশি নয়। অল্প ভাড়াতেই আমরা পৌঁছে গেলাম টিবিএস।

1
টিবিএস, কুয়ালালামপুর

সময় স্বল্পতার জন্য আরিফ নাস্তাও করতে রাজি নয়। বলল—কোথাও রাস্তায় ফাস্টফুড খেয়ে নেবে। সে আমার চেয়ে আরও বেশি তৎপর। টিবিএস-এর পরিবেশ দেখে আমার চোখ একেবারে এলোমেলো। হায়রে এটা কি বাসস্টেশন না কি বিমানবন্দর। মালয়েশিয়া ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্র আমাকে বলেছিল—টিবিএস-এর মতো এত সুন্দর অনেক দেশের বিমানবন্দরও নেই। সত্যি তাই। দেখেই অবাক হচ্ছি। আমরা ট্যাক্সি থেকে নেমে আবার এক কোণায় লিফটে লেবেল ৪-এ ওঠে আবার লেবেল ২-এ টিকেট কাউন্টারের মুখোমুখি হলাম। কোনোভাবেই আমরা দেরি করছি না এ জন্য যাতে আমরা বেশি জায়গা ভ্রমণ করতে পারি। বাস টার্মিনালের বিভিন্ন দিকে দৃষ্টি ঘুরাচ্ছি আর অবাক হচ্ছি। কোনো ময়লা নেই, এত পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন! মানুষ আসছে, যাচ্ছে কোনো ধাক্কাধাক্কি নেই। টিবিএস থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে যাতায়াতের সুবিধা রয়েছে। জানা যায় যে, ২০১৩ সালে মালায়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী উদ্বোধন করেন এ টার্মিনাল। টার্মিনাল এলাকায় প্রবেশ করেই আমরা বিস্মিত। হৈচৈ কিছুই নেই, শান্ত নীরবতা। এত পরিচ্ছন্ন বাস টার্মিনাল হয় কী করে? বুঝে নেই নির্মাণ করেই টার্মিনালকে ছেড়ে দেওয়া হয় নি, চাহিদা অনুযায়ী যত্ন করাও হচ্ছে।

এ টার্মিনালে বাস থামা ও ছেড়ে যাবার জন্য ৬০টি প্লাটফর্ম রয়েছে। রয়েছে ট্যাক্সি ও অন্য গাড়ি রাখার নির্ধারিত স্থান। একই সাথে প্রায় দুই লাখ লোক এখানে চলাফেরা করতে পারবে। এ টার্মিনাল থেকে মালয়েশিয়ার উত্তর-দক্ষিণ সবদিকেই যাতায়াত করা সম্ভব। এর লাগোয়া রয়েছে সেন্ট্রাল রেলস্টেশন। ওভারপাস দিয়ে রেলস্টেশনে যাবার পথও রয়েছে। ফলে, দেশের সব স্থানের সাথে যোগাযোগের কেন্দ্র হিসেবে টিবিএসকে বিবেচনা করা হয়।

2
কুয়ালালামপুর রেলস্টেশনের একাংশ

এ দুই স্টেশনের সাথে সংযোগ রাখা হয়েছে। টার্মিনালের ভেতরে ব্যবস্থাপনাও খুব সুন্দর। যথাস্থানে নির্দেশনা দেওয়া আছে। যা অনুমান বা দেখে নিলাম—এ টার্মিনাল সমতুল্য বিমানবন্দর অনেক দেশে আছে কি না সন্দেহ। একজন যাত্রীর জন্য যা যা সুবিধা প্রয়োজন, সবই এখানে রয়েছে। এখানে রয়েছে ব্যাংকের এটিএম বুথ, যাত্রীদের জন্য অপেক্ষা-কক্ষ এবং পর্যাপ্ত ওয়াশরুম। যথাস্থানে খাবারের দোকানও রয়েছে। রয়েছে কফি শপ। এদিকে আরিফ সকালে কিছুই খায় নি। সে-কারণে একটি দোকান থেকে আরিফ একটি স্যান্ডউইচ ও পানি নিয়ে এল। রমজানের কারণে কিছুটা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তবে এ সামান্য খাবার সাথে নিতে অসুবিধা হয় নি। কারণ, এ নিয়ে সাধারণ মানুষ কিছু ভাবে না। টার্মিনালে প্রায় ৪১টি কাউন্টার রয়েছে। সবগুলোই কেন্দ্রীয়ভাবে অটোমেশনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত। কাউন্টার থেকে টিকেট নিয়ে আবার প্লাটফর্মের দিকে যেতে হয়।

3
বাসটার্মিনালে টিকেট কাউন্টার

টিকেটে প্লাটফর্ম ও বাস নম্বর উল্লেখ থাকে। ইলেকট্রনিক ডিসপ্লেতে সময়, কত নম্বর প্লাটফর্ম থেকে কত নম্বর বাস ছেড়ে যাবে তা প্রদর্শিত হতে থাকে। কিছুক্ষণ আগে যেটি চলে গেছে, সেখানে উল্লেখ থাকে ডিপার্চার। প্লাটফর্মে নির্ধারিত বাস এলেই ঘোষণা দেওয়া হয় ও বোর্ড-এ ভেসে ওঠে বোর্ডিং চলমান। যদি কখনও দেরি হয়, সেক্ষেত্রে বোর্ডে জানানো হয় দেরি হওয়ার সম্ভাব্য সময়। একই সাথে মাইক্রোফোনে সবকিছুই ঘোষণা দেওয়া হয়। ফলে একজন সাধারণ যাত্রীরও কোনো অসুবিধা হয় না। সবকিছু মিলিয়ে মনে হয় না যে, আমরা কোনো বাস স্টপেজে আছি। মনে হয় বিমানবন্দরে আছি। আমরা টিকেট করতে যাই। একটি খালি কাউন্টার দেখে সেখানেই দাঁড়ালাম। সেখানে দেখলাম ছোট্ট এক কিউ। খুব বড় অপেক্ষমাণ লাইন নয়। কাউন্টারের তরুণী জানায় যে, এ-মুহূর্তে যে বাসটি ছেড়ে যাচ্ছে, তাতে কোনো আসন নেই, তবে আরও আধ ঘণ্টা পরে যেটি ছাড়বে সেটাতে আসন রয়েছে। আরিফ তার আইডি কার্ড দেখাল, আর আমি পাসপোর্ট। চেকআপ শেষ ও টিকেট পেয়ে আমরা নির্দেশিত প্লাটফর্মের দিকে যাই। টিকিট পাঞ্চ করে তারপর একটি গেট পার হবার পর আবার পাঞ্চ করেই নির্ধারিত প্লাটফর্মে যেতে হয়। এখানে ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ একেবারেই নেই। বাসে বসা নিয়ে কোনো ঝামেলা নেই। বাসে ওঠে বসে গেলাম। এসি বাস, সময় মতো ছেড়ে দিল মালাক্কার উদ্দেশে।


রাবার চাষ ও রপ্তানির দিক থেকে বিশ্বে মালয়েশিয়ার অবস্থান প্রথম। 


কুয়ালালামপুর শহর ছেড়ে যাবার পর রাস্তার দু-পাশে সবুজ বৃক্ষ আর পাহাড় বনবনানী দেখে চোখ ফেরানো দায়। ভাবছিলাম বাসে একটু ঘুমানো হয়তো যাবে। কিন্ত দু-পাশের প্রকৃতি দেখে আর ঘুমাতে ইচ্ছে হলো না। প্রকৃতির দিকে তাকানোই এখন বড় কাজ। মাঝে মাঝে লক্ষ করছি ছোট গ্রামের মতো দেখতে, যেখানে মানুষের বসবাস রয়েছে। তবে এগুলোকে ঠিক গ্রাম বলা মুশকিল। এ গ্রামগুলোতে সুন্দর সুন্দর ইমারত। অনন্য সুন্দর বাড়িঘর। এদিকে বাস যে চলেছে, তা বোঝার উপায় নেই। চমৎকার রাস্তা, হর্ন বাজাতে বা ব্রেক কষতে হয় না ড্রাইভারকে। আমরা যে বাসে বসে আছি, তাতে ঝাঁকুনি টের পাওয়া যায় না। রাস্তা থেকে অনতিদূরে গ্রাম, পাম বাগান, বনসম্পদের প্রাচুর্য দেখে প্রাণ জুড়ে যায়। কখনও দেখা যায় পাম বাগানের সারি, আবার কখনও রাবার বাগান। জেনে নেই আগেই যে, অনেক শ্রমিকের সাথে বাংলাদেশ থেকে আগত শ্রমিকরাও এসব বাগানে কাজ করেন।

4
পাম বাগান

প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যায় যে, মালয়েশিয়ার মূল জমির প্রায় ৬০ শতাংশই বনভূমি। এর মধ্যে অবশ্য শ্রেণি বিন্যাসও রয়েছে। তবে মালয়েশিয়াতে বনজ সম্পদ ধ্বংস প্রক্রিয়া নগণ্য বলা যায়। এক সময় বলা হতো যে, মালয়েশিয়াতে শুধু রাবার ও পামওয়েল উৎপাদিত হয়। এটা এক সময় ছিল। এখন দেশটি খনিজ সম্পদে এগিয়ে রয়েছে। অবশ্য স্বীকার্য যে, টিন, পাম ও রাবার উৎপাদনে মালয়েশিয়া বিশ্বের অন্যতম একটি দেশ। পৃথিবীতে মোট টিন উৎপাদনের ৪০ শতাংশ মালয়েশিয়া উৎপাদন করে থাকে। এছাড়াও বৈদ্যুতিক যন্ত্রাংশ তৈরি ও রপ্তানিতে মালয়েশিয়া প্রতিযোগী হয়ে উঠেছে। বিশেষত রাবার, পামওয়েল, নারকেল ও কলা উৎপাদনে সামনের সারিতে রয়েছে মালয়েশিয়া। পামওয়েলের ভোক্তা দেশ হিসেবে সামনে রয়েছে ইন্দোনেশিয়া, ভারত, ইউরোপিয়ান ইউনিয়নভুক্ত দেশসমূহ ও চীন। একটি তথ্যে দেখা যায়, ২০১৮ সালে বিশ্বে মোট ৭২.০৮ মিলিয়ন টন পামওয়েল উৎপাদিত হয়েছে। এর মধ্যে ২৭ শতাংশ অর্থাৎ ১৯.৫২ মিলিয়ন টন উৎপাদন করেছে মালয়েশিয়া। পামওয়েল উৎপাদনে দেশ হিসেবে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে মালয়েশিয়া। আবার রাবার চাষ ও রপ্তানির দিক থেকে বিশ্বে মালয়েশিয়ার অবস্থান প্রথম। রাবার শিল্পে মালয়েশিয়ার অবদান ৬৩ শতাংশ। গুণ ও মানের দিক থেকেও মালয়েশিয়ার রাবারের সুনাম রয়েছে। যে রাবার থেকে চিকিৎসার কাজে ব্যবহৃত গ্লাবস তৈরি হয়। উল্লেখ্য যে, বিশ্বের সেরা ও উন্নত গ্লাবস তৈরি হয় মালয়েশিয়াতে। শুধু ২০১৭ সালে মালয়েশিয়া ২২৮বিলিয়ন গ্লাবস উৎপাদন করেছে। আশির দশকে আমাদের দেশেও রাবার চাষ শুরু হয়। যেটুকু জানা যায়, মূলত তাদের কাছ থেকেই আমরা রাবার বৃক্ষ নিয়ে আসি এবং প্রথমত চা-বাগানগুলোতে ও এর আশেপাশে চাষাবাদ শুরু করি। তখন অনেকেই মনে করত মালয়েশিয়াতে মনে হয় শুধু রাবার ও পাম উৎপন্ন হয়। প্রকৃতিবিদরাও মনে করতেন মালয়েশিয়াতে অন্য কোনো গাছ নেই, বাগান নেই। কিন্তু না, সেখানে বৃক্ষবৈচিত্র্য দেখে আমরা নিজেরাই অবাক।

5
রাবার বাগান

প্রকৃতি দেখা ও এসব ভাবতে ভাবতে যাচ্ছি। বাসে কোনো কথা নেই, অহেতুক শব্দ নেই, খুব আনন্দদায়ক ভ্রমণ। ভাবছিলাম বিশ্ব পর্যটক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অন্যসাহিত্য ছাড়াও এক্ষেত্রে ভ্রমণসাহিত্য আমরা স্মরণ করতেই পারি। যে-কোনো বিষয়ে তার বর্ণনা যে অনন্য তা আমরা সকলেই জানি। রবি ঠাকুর ও অন্য কোনো পর্যটকের মতো বর্ণনা করতে পারলে আমার পর্যবেক্ষণের বিষয়গুলো আরও প্রাণবন্ত হয়ে উঠত নিঃসন্দেহে। পাঠকরাও উপকৃত হতেন। কিন্তু সে ক্ষমতা আমার নেই, ফলে আমি সেভাবে বর্ণনাও করতে পারছি না। রবীন্দ্রনাথ যেখানেই ভ্রমণ করেছেন, সেখানের সূক্ষ্ম বিষয়ও তার লেখা থেকে বাদ যায় নি। আমরা নানা সূত্র থেকে জেনে যাই তিনি প্রচুর রেলভ্রমণ করেছেন। আসা-যাওয়ার পথে যা-কিছু দেখেছেন রবীন্দ্রনাথ তা এক ভিন্ন দৃষ্টিতে বিবৃত করেছেন, যা হয়ে উঠেছে রসাত্মক। চিত্রাঙ্গদা লেখার আগে তিনি রেলগাড়িতে বসেই তার চিন্তায় এর প্লট ভেবে নিয়েছিলেন। একবার শান্তিনিকেতন থেকে কলকাতা যাবার পথে রেললাইনের দু-পাশের প্রকৃতি দেখে লিখেছিলেন, ‘আর কিছুকাল পরেই রৌদ্র হবে প্রখর, ফুলগুলি তার রঙের মরীচিকা নিয়ে যাবে মিলিয়ে—তখন পল্লীপ্রাঙ্গণে আম ধরবে গাছের ডালে ডালে, তরুপ্রকৃতি তার অন্তরের নিগূঢ় রসসঞ্চয়ের স্থায়ী পরিচয় দেবে আপন অপ্রগল্‌ভ ফল-সম্ভারে। সেই সঙ্গে কেন জানি হঠাৎ আমার মনে হলো সুন্দরী যুবতী যদি অনুভব করে যে সে তার যৌবনের মায়া দিয়ে প্রেমিকের হৃদয় ভুলিয়েছে তা হলে সে তার সুরূপকেই আপন সৌভাগ্যের মুখ্য অংশে ভাগ বসাবার অভিযোগে সতিন বলে ধিক্কার দিতে পারে। এ যে তার বাইরের জিনিস, এ যেন ঋতুরাজ বসন্তের কাছ থেকে পাওয়া বর, ক্ষণিক মোহ-বিস্তারের দ্বারা জৈব উদ্দেশ্য সিদ্ধ করবার জন্যে।’ [অমিত্রসূদন ভট্টাচার্য : রেলভ্রমণে রবীন্দ্রনাথ] এ ছুটেচলা ট্রেনে বসে কবি ভেবেছেন এ চিন্তার টুকরো নাটকে রূপ দেবেন। অবশেষে তা-ই হলো। এরপর চিত্রাঙ্গদা রচনার শুরু। কিছুক্ষণ পর একজনকে উচ্চ শব্দে ফোনে কথা বলতে শুনলাম। তার উচ্চারণে বাংলা কথা শুনে ও চেহারা দেখে মনে হলো জাতে বাঙালি। বেশ উচ্চ স্বরে কথা বলছিল ফোনে। উচ্চারণে মনে হলো ভারতীয় বাঙালি। তিনি নিজে আগ্রহী হয়ে প্রথমে আরিফের সাথে কথা বলেন। তিনি জানান—কলকাতা থেকে এসেছেন। যাচ্ছেন—মালাক্কা, ঘুরবে, সন্ধ্যা পর্যন্ত থাকবে ইত্যাদি। তারপর আবার ফিরবে কুয়ালালামপুর। নাম জানা গেল সৌরভ সাহা। সৌরভ জানতে চাইলেন—আমরা কী কারণে যাচ্ছি ওদিকে। কথা শুনে তিনি প্রস্তাব দিলেন যে, আমরা যদি একসাথে একটি ট্যাক্সি ভাড়া করি, তাহলে ভ্রমণটা সাশ্রয়ী হবে এবং আমরা অল্প সময়ে পুরো এলাকা একসাথে ঘুরে দেখতে পারব। আমি বললাম—বাস থেকে নামি তারপর দেখি কী করা যায়। আরিফের সাথে পরামর্শ করে রাজি হয়ে গেলাম। তারপর আমরা গল্প গল্প করতে করতে পৌঁছে গেলাম মালাক্কা শহরের বাস টার্মিনালে।

মালাক্কা খুব বড় শহর নয়, তবে ঐতিহাসিক। পরিকল্পিতভাবেই শহরকে সাজানো হয়েছে। টার্মিনালে বাস যখন প্রবেশ করছে, তখন আশেপাশের বাড়িঘর দেখে মনে হলো, মালাক্কা উন্নত একটি শহর। অগোছালো কিছু মনে হয় নি। বরং এ শহরটি যেন আরও বেশি পরিকল্পিত। শহরে এসেছি বলে মনে হলো না। এত শান্ত শহর হয় কী করে। মানুষের চলাফেরা আছে, কিন্তু গাড়ির চলার শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। মানুষ এত শব্দহীন কিভাবে হয় জানা নেই। বাস থেকে নেমে সামনের দিকে বের হওয়ার পথে যেতে থাকি। টার্মিনাল থেকে বের হওয়ার পথেই রয়েছে ট্যাক্সি বুকিং। আমি, আরিফ আর সৌরভ এ তিনজন মিলে একটি ট্যাক্সির সাথে কথা বলে নিলাম। ওখানে প্রচুর ট্যাক্সি রয়েছে। যাদের কাজই হলো পর্যটকদের নিয়ে ঘুরে বেড়ানো। আমরা ঘণ্টা হিসেবে ভাড়া সাব্যস্ত করে নিলাম। ট্যাক্সিতে উঠে বসার পর গল্প শুরু হলো। সৌরভ সাহা কথাবার্তায় খুব আন্তরিক মানুষ, পেশায় ইঞ্জিনিয়ার, আইবিএম কোম্পানিতে কাজ করেন। আমরা পরস্পর আরও কিছু প্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত তথ্য বিনিময় ও পরিচয়পর্ব সেরে নিলাম। মনে হলো সৌরভ সাহা খুব রসিক মানুষ। তাকে কোম্পানির কাজে বিভিন্ন দেশে যেতে হয়, এর ফাঁকে তিনি ওই দেশের দর্শনীয় স্থানগুলো দেখার চেষ্টা করেন। চমৎকার তার আইডিয়া। তিনি আমাদের জানিয়ে দেন কোম্পানির কাজে এ মাসেই তিনি আরও কয়েকটি দেশ ভ্রমণে যাচ্ছেন। তার মতো এরকম মানুষ পাওয়া যায় খুব কমই। বাণিজ্যের কাজে বিভিন্ন স্থানে অনেককে যেতে হয় নানা জায়গায়। কিন্তু ওই দেশের ঐতিহ্য, স্থাপত্য, সংস্কৃতি বোঝাপড়া করার লোক সাধারণত পাওয়া যায় না। আমি প্রথম তাকেই দেখলাম।


টিলার পাদদেশে ইতিহাসের সাক্ষ্য হয়ে নিথর পড়ে আছে আরও কিছু পুরনো ধ্বংসাবশেষ আর ফটকের খণ্ডাংশ।


গাড়ি চলেছে সামনে। এরপর আমরা আমাদের গাড়ির চালকের সাথে পরিচিত হই। তার নাম আবদুর রেহমান, তামিলভাষী মুসলমান। তিনি জানান, তার বাবা এদেশে কাজ করতে এসে বিয়ে করেন আর ফিরে যান নি তামিলনাড়ুতে। তিনি আরও জানান, মালাক্কা এমনকি কুয়ালালামপুরেও অধিকাংশ ড্রাইভার হলো তামিলভাষী। কথা বলতে বলতে রেহমান বিভিন্ন স্থানের আলোকচিত্র সজ্জিত একটি বিজ্ঞানপত্র আমাদের সামনে তুলে ধরেন। রেহমান জানতে চান কোথায় কোথায় আমরা যেতে চাই? দেখে মনে হলো আমরা এত বেশি জায়গা ভ্রমণ করতে পারব না। আমরা কোনো রাস্তা চিনি না, ধীরে ধীরে গাড়ি চলেছে শহরের রাস্তা ধরে। রেহমান আমাদের পেয়ে মনে হলো খুব আনন্দিত। রমজানের কারণে এ সাধারণ মৌসুমী বেকারত্ব। পর্যটক তেমন নেই। রেহমানের কাছে মালাক্কার বিভিন্ন বিবরণ অবিচল শুনেই যাচ্ছি। তিনি বললেন প্রথমেই নিয়ে যাবেন একটি সাধারণ সমুদ্রতীরে যেখানে এক নীরব জায়গা ও মসজিদ রয়েছে। রেহমান নিয়ে যাচ্ছেন সে-মসজিদের দিকে। অল্প সময়ের মধ্যে আমরা পৌঁছে গেলাম সমুদ্র তীরে। আপাত গন্তব্যের দিকে যাবার সময় দেখতে পেলাম জবাফুল। অনেকেই জানেন আশা করি মালয়েশিয়ার জাতীয় ফুল হলো জবা। প্রথমে এটি শুনে অবাক হয়েছিলাম। পরে বুঝলাম তা হওয়ার পেছনেও যুক্তি রয়েছে। মালয়েশিয়া পর্যটনের অফিসিয়াল লগো হচ্ছে এ জবা ফুল।

6
মালয়েশিয়ার জাতীয় ফুল জবা

২০০৭ সালে মালয়েশিয়াতে অনুষ্ঠিত কমনওয়েলথ গেইমস-এর লগো হিসেবেও তা ব্যবহৃত হয়। ১৯৫৭ সালে মালয়েশিয়ার স্বাধীনতা অর্জনের পর জাতীয় পরিচিতির প্রতীক হিসেবে জাতীয় ফুল নির্ধারণে কয়েকটি ফুলের প্রস্তাব করা হয়। উপস্থাপিত কয়েকটি ফুলের মধ্যে ১৯৬০ সালে জবা নির্বাচিত হয় জাতীয় ফুল হিসেবে। এ নির্বাচনে বলা হয়েছে—এটি সহজলভ্য, স্বল্পযত্ন বা যত্ন ছাড়াই মালয়েশিয়ার গ্রামাঞ্চলে পাওয়া যায়। এ ছাড়া এ ফুল সহজেই দর্শককে আকর্ষণ করে। রবীন্দ্রনাথ সর নামে এক লেখকের লেখায় পড়েছিলাম জবা ফুল প্রাচীনকাল থেকেই বিভিন্ন অঞ্চলে অত্যন্ত জনপ্রিয়। এ ফুল বিভিন্ন রং ও প্রকারের হয়ে থাকে। এর ইংরেজি নাম : সু-ফ্লাওয়ার [shoe flower]। জবার নাম সু-ফ্লাওয়ার নাম হলো কেন? জানা যায়, একসময় বিভিন্ন রঙের ব্যবহার সুলভ ছিল না। ইংরেজরা জবাফুল পিষে বের করা রং দিয়ে জুতা রঙিন করত। এ থেকে এর নাম হয়ে যায় সু-ফ্লাওয়ার। অনেকে বলে থাকেন চায়নারোজ। চিনারা জবাকে গোলাপফুল বলেও ডাকে। মালয়েশিয়াতেও নানা রঙের জবাফুল পাওয়া যায়।

এক সময় আমরা ওই মসজিদের সামনেই উপস্থিত হলাম। মালাক্কায় সুন্দর এ মসজিদের নাম ‘মসজিদ সালাহ মালাকা’। সমুদ্রপাড়ে নির্মিত এ মসজিদ দেখতে মনে হয় এটি জলের উপর ভাসমান। অনন্য স্থাপত্যশৈলীর এ মসজিদ ২০০৬ সালে সকলের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। মসজিদের সামনে রয়েছে বিশাল এক বাগান। মসজিদে অতিথিদের জন্য ঠান্ডা পানি ও শরবত পরিবেশনের ব্যবস্থা রয়েছে। সামাজিক অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য রয়েছে মসজিদসংলগ্ন বিশাল এক হল রুম। উভয় দিকের দরজাগুলো খোলা আর মুক্ত ব্যালকনি তৈরি করা হয়েছে। যাতে ওখানে দাঁড়িয়ে সমুদ্র ও ঢেউয়ের সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়।

7
মসজিদ সালাহ মালাকা

আমরা ঘুরে ঘুরে দেখছিলাম এ মসজিদ ও এ সংলগ্ন বিভিন্ন স্থান। এর মধ্যে নামাজের সময় হলে রেহমান ও আরিফ নামাজ পড়ে নিল। তারপর ভাবছিলাম মালাক্কার অন্য গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলো পরিদর্শন করতে পারি। কারণ মালাক্কা ঐতিহাসিকভাবে খ্যাত একটি জায়গা। আমরা শৈশবে ও কৈশোরে মালাক্কা প্রণালির কথা বারবার পড়েছি। মালয়েশিয়ার প্রবেশমুখ ও বাণিজ্যিকভাবে অন্যতম একটি স্থান হচ্ছে মালাক্কা। রেহমান জানতে চাইলেন এখন আমরা কোথায় যাব? আমরা তো জানি না, বললাম—আপনি কোনো সুন্দর ও দর্শনীয় জায়গার দিকে নিয়ে চলেন। আমি না বুঝেই বারবার বলছিলাম পর্তুগিজদের গির্জায় আমাদের নিয়ে চলেন। আমরা তো জানতাম না যে, সবগুলো স্থানই পরস্পর সন্নিকটে অবস্থিত। রেহমান নিয়ে গেলেন খ্যাত সে-ই পর্তুগিজ গির্জার দিকে। অতি অল্প সময়ে আবারও একই রাস্তা ধরে এলাম গির্জার প্রবেশ পথের সামনে। গাড়ি থেকে নেমে দূর থেকে দেখলাম উঁচুটিলার উপর এক প্রাচীন স্থাপত্য। আর টিলার পাদদেশে ইতিহাসের সাক্ষ্য হয়ে নিথর পড়ে আছে আরও কিছু পুরনো ধ্বংসাবশেষ আর ফটকের খণ্ডাংশ। ক্ষমতার দাপট এরকমই ভেঙে পড়ে এক সময়। মালাক্কায় যা হয়েছে পর্তুগিজ দখলদারদের।

জলপথে চলেছ যারা, পৃথিবীভ্রমণ, নৌকা টলমল
স্থলপথে চলেছ যারা, পৃথিবীভ্রমণ, চেতনা এলোমেলো
শূন্যপথে চলেছ যারা, পৃথিবীভ্রমণ, কর্কট হৃদয়ে আলো
ব্যবহারবস্তু ডাকে আমাদের, জীবনকে চায়—চলো-চলো-চলো—
[ শৈলেশ্বর ঘোষ : চলো]


[চলবে]

স্বপন নাথ

জন্ম ৪ মে ১৯৬৮; বড়লেখা, মৌলভীবাজার। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর, বাংলা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়; এমফিল, ভাষাবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

পেশা : শিক্ষকতা; উপপরিচালক (গবেষণা ও তথ্যায়ন), নায়েম, শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

প্রকাশিত বই :
প্রবন্ধ—
চিন্তা ও জগৎ : সাহিত্য সংস্কৃতি [প্রবাস প্রকাশনী, যুক্তরাজ্য ২০০৭]
কবিতার নন্দনবিশ্ব [অনিন্দ্য প্রকাশ, ঢাকা ২০১৭]
কথার বুনন [জিনিয়াস পাবলিকেশন্স, ঢাকা ২০১৯]
ছিন্ন কথামালা [জিনিয়াস পাবলিকেশন্স, ঢাকা ২০১৯]

কবিতা—
রৌদ্র ও বৃষ্টিতে মায়াহরিণ [ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ, ঢাকা ২০০৭]
জলৌকা চোখের চাতাল [ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ, ঢাকা ২০১০]
নির্জন বিচালির ডানা [কবি প্রকাশনী, ঢাকা ২০১৩]
নখের আউঠা [উৎস প্রকাশন, ঢাকা ২০১৪]
নানকার ধানবীজ [উৎস প্রকাশন, ঢাকা ২০১৫]
একলব্যের ছিন্ন আঙুল [নাগরী, সিলেট ২০১৬]
সংশয়ের বসতি [নাগরী, সিলেট ২০১৭]
গ্রাম বজ্রযোগিনী [জিনিয়াস পাবলিকেশন্স, ঢাকা ২০১৯]

ই-মেইল : rudro71@gmail.com