হোম ভ্রমণ মালয়েশিয়া ভ্রমণ : সামান্য দেখা

মালয়েশিয়া ভ্রমণ : সামান্য দেখা

মালয়েশিয়া ভ্রমণ : সামান্য দেখা
221
0
১১ পর্বের লিংক

পর্ব- ১২

আরিফ নিয়ে চলে আমাকে বইয়ের সন্ধানে। জানা নেই কোথায় যেতে হবে। সেও নিশ্চিত নয় বুকশপের ঠিকানা কোথায়। আমরা চলেছি বুকশপ ও বইয়ের সন্ধানে। চমৎকার কয়েকটি সরণি পার হয়ে গেলাম একটি শপিং এলাকায়। খুব পরিচ্ছন্ন শপিংমল। এ শপিংমলে প্রবেশ করেই দেখি সবকিছুতে নারীদের আধিক্য। মনে হলো—এ এক নারীর দেশ, এখানে পুরুষ আছে কী নেই তা বোঝা যায় না। সকল দোকানেই শুধু নারী। আমরা ঘুরছি বাংসার ভিলেজে। বিশাল বড় এক শপিংমল। এ শপিংমলের দু-টি অংশ, দ্বিতীয় লেবেলে মাঝখানে সেতু দিয়ে সংযোগ তৈরি করা হয়েছে।

1
বাংসার ভিলেজ শপিংমলের অভ্যন্তরে একাংশ।

ঘুরতে থাকি একটি থেকে অন্য লেবেলে। বুকশপ আর খুঁজে পাই না। অলংকার, শোপিস, ফ্যাশন আর খাবারের দোকানই বেশি। ফ্যাশন ডিজাইনের দোকানগুলো বেশ আকর্ষণীয়। অবশেষে পেয়ে গেলাম এমপিএইচ বুকশপ। প্রবেশ করে কিছুটা হতাশ। সমস্যা হলো এখানে শিশুদের স্কুল সামগ্রীই বেশি। বই বলতে যা বোঝায় তা খুব একটা নেই। এ বুকশপে রয়েছে প্রথাগত কিছু বই। পেলাম মুরাকামি, কোয়েলো, ইশিগুড়ো, সিডনি শেলডন, স্তেফান কিংসহ এমন লেখকদের বই। ইদানীং যেগুলো তরুণরা বেশি পড়তে চায়। মালয়েশিয়ান, চীনা কয়েকজন লেখকের বই এখানে দেখলাম। যেগুলো ইংরেজি ভাষায় লিখিত। বোঝা গেল মালয়রা ইংরেজি ভাষায় লিখিত সাহিত্য পড়ে ও চর্চা করে। ইংরেজির গুরুত্ব রয়েছে সেখানে। ভারতীয় ক্লাসিকসহ শশি থারুর, অরুন্ধতি রায়ের কিছু বই দেখলাম। আর যা বাকিসব দেশেই সুলভে পাওয়া যায়। এমপিএইচ থেকে বের হলে কাছেই আরেকটি গিফট আইটেমের দোকান দেখলাম। তারাও আহ্বান জানাল দেখার জন্যে। ওখানেও ভালো লাগছে না। কড়ি পর্যাপ্ত থাকলে প্রতি জায়গাতেই ঢুঁ মারা যায়। আমরা ঘুরতে থাকি। আর কোনো বুকশপ পাওয়া যায় কী না এই মনে করে।


ঐতিহাসিকভাবে মালয় উপদ্বীপে ও শ্যাম দেশের সমাজে মহাভারত ও রামায়ণের একটি বিশেষ প্রভাব রয়েছে।


আরিফ আর আমি একাট্টা এখন বইয়ের সন্ধানে। কিন্তু চাহিদা অনুযায়ী বুকশপের খোঁজ আর তেমন পাই নি। মালয় সাহিত্য নিয়েও আমরা খোঁজ করছি। কিন্তু তাও তেমন এখানে নেই। এ বিষয়ে আমাদের দু-জনেরই আগ্রহ আছে। মালয় সাহিত্য জনগণের সামনে আসে মূলত ষাটের দশকে। সেই থেকে মালয়েশিয়াতে সাহিত্য চর্চা চলছে চারটি ভাষায় : মালয়, ইংরেজি, চীনা ও তামিল ভাষায়। কারণ, মালয়েশিয়ানরা চর্চা করছে স্বীয় মালয় ও ইংরেজিতে। চীনা ও তামিল জনগোষ্ঠী সেখানে রয়েছে। ফলে, মালয়েশিয়ার সাহিত্য বিচারে ভাষার বৈচিত্র্য অবশ্যই বিবেচনায় রাখতে হয়। লক্ষণীয়, ঐতিহাসিকভাবে মালয় উপদ্বীপে ও শ্যাম দেশের সমাজে মহাভারত ও রামায়ণের একটি বিশেষ প্রভাব রয়েছে। তেমনি সাহিত্যেও এর প্রভাব অস্বীকৃত নয়। বিশেষত মালয় লোকসাহিত্যে এমন প্রভাবের কথা বলেন অনেকেই। মালয় সাহিত্য ও শ্রমবাজার নিয়ে পরে জানতে চেষ্টা করব।

এমপিএইচ ব্যতীত আর কোনো বুকশপ আছে কী না এর সন্ধানে আরিফ ও আমি ঘুরছিলাম। এখানে জুতা, ফ্যাশনের দোকানগুলো ক্রেতাদের খুব আকৃষ্ট করে। মনে হলো সবই যেন মেয়েদের জন্যই তৈরি হয়েছে। আরিফ আমার জন্য একটু চিন্তান্বিত হয়ে গেল। বুকশপের সন্ধান দিতে পারছে না এই ভেবে। যা হোক বাংসার ভিলেজ-এর আরেকটি অংশে পেয়ে গেলাম সিলভারফিশ বুকস। চমৎকার একটি বইয়ের দোকান।

2
সিলভারফিশ বুকশপ।

বুকশপে প্রবেশ করে দেখতে থাকি। কিন্তু যা বুঝলাম এখান থেকে বই কেনার মতো সামর্থ্য আমাদের নেই। যেসব বই এখানে পেলাম তা গুরুত্বের দিক থেকে অবশ্যই প্রয়োজনীয়। এখানে পৃথিবীখ্যাত অনেক বই সংগ্রহে রাখা আছে। মালয়, চীনা, ভারতীয়, প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের ক্লাসিক বইগুলো এখানে পাওয়া যায়। বিশেষত যারা প্রাচীন ইতিহাস, ঐতিহ্য নিয়ে গবেষণা করতে চায়, তারা এ বুকশপের সহায়তা নিতে পারে। পুরোটাই এনটিকস দিয়ে ভর্তি। পুরনো, হারিয়ে যাওয়া, বা এখন আর মুদ্রিত পাওয়া যায় না এমন বইগুলো এখানে তারা সযত্নে রেখেছে। ফলে, আজকের মতো আমি আর আরিফ একধরনের ব্যর্থই বলতে হবে। যাক, দেশে ফিরে যাবার আগে আবার আসব বাংসার ভিলেজ, মনে মনে এটাই ভাবছি। আরিফ বলল, চলেন যাই বুকিত বিনতাং, ওখানে ইফতার সেরে নেব। অল্প সময়ে পৌঁছে গেলাম আবার বুকিত বিনতাং।

বুকিত বিনতাং-এর যে সড়কে আমরা প্রবেশ করেছি, আহ্ সে এক ঝলমলে পরিবেশ। সন্ধ্যা হচ্ছে প্রায়। আলো জ্বলে উঠেছে চারদিকে। সেখানে প্রচুর চীনা ও ভারতীয় দোকানপাট, রয়েছে মালয়ও। প্রথমে আমরা সাধারণ এক দোকানে প্রবেশ করি। এখানেও এক বাংলাদেশি তরুণের সাথে দেখা। সেখানে ফ্রিজে দেখি সাধারণ পানি, কোমল পানীয়, বিয়ার, ওয়াইন, হুইস্কি একই সাথে রাখা। আরিফ বলল, ইফতারের সময় হয়ে গেছে, তো আমরা একটি করে পানি ও জুস ড্রিংক নিতে পারি। আমি বললাম, হাঁ তাই করি। মজা করে আরিফকে বললাম, আমরা অন্য কোনো ড্রিংকস নিতে পারি কি? আরিফ দ্রুতই ইফতার গ্রহণে চেষ্টা করছে। সে বলল, ইফতার সেরে নেই। তবে তা-ই হোক। কারণ ইফতারের সময় অতিবাহিত হচ্ছে। জুস পান করেই আরিফ ও আমি প্রবেশ করি খুব ব্যস্ততম একটি স্ট্রিট-এ। জালান আলোর ফুড স্ট্রিট।

3
জালান আলোর ফুডস্ট্রিটের সমাগম

প্রচুর স্ট্রিট ফুড এখানে পাওয়া যায়। জমজমাট একটি এলাকা। যদিও বেশ চওড়া রাস্তা এখানে। সন্ধ্যার পর এ রাস্তাটি দোকানিদের দখলে চলে যায়। খদ্দেরদের কাছেও এটি কোনো সমস্যা নয়। সকলেই এমন পরিবেশে উপভোগ করতে আসে। এ ভিড়ের মধ্যেই তারা আনন্দে খাবার গ্রহণে আগ্রহী। মূল দোকানগুলোর সামনের খালি জায়গা বসার চেয়ারেই দখলকৃত। আর বাহারি পসরা নিয়ে আহ্বান করছে দোকানিরা। এ স্ট্রিটের আশেপাশেই না কী কুয়ালালামপুরের এলিটদের বসবাস। মালয়েশিয়ার যারা ক্ষমতাবান ও আর্থিকভাবে সচ্ছল, তারা এ এলাকাতেই বাস করে। সন্ধ্যার আলো জ্বলতেই ঝলমলে হয়ে ওঠে আলোর স্ট্রিট। পসরা সাজাতে শুরু করে দোকানিরা। কয়েকটি ট্রলিও রয়েছে। যেগুলো চলমান খাবারের দোকান। সবমিলিয়ে এক জমজমাট পরিবেশ। খাবার দোকানের পাশেই রয়েছে কয়েকটি মাসেজ পার্লার ও অন্যান্য লোভনীয় দোকানের পসরা। প্রতিটি দোকানের কর্মীরা খুব যত্নে-আদরে ডাকাডাকি করে।

4
মাসেজ পার্লার ও স্পা

ডাক শুনে ওদিকে না তাকিয়ে থাকবার জো কারও নেই। মাসেজ করার ইচ্ছে হয়তো কারও নেই, কিন্তু ওদিকে ফিরে তাকিয়ে অন্তত দেখার ইচ্ছে হবেই। এমনভাবে আহ্বান জানায়, তাতে না তাকিয়ে আসার সুযোগ নেই। মাসেজ দোকানের দরজায় দাঁড়িয়ে যারা খদ্দেরকে আহ্বান করে, তারা এক ধরনের, আবার যারা ভেতরে কাজ করে, তারা আরেক ধরনের। আমাদের আগ্রহ হলো এ জালান আলোর মার্কেট, খাদ্যের রকমারি ও পরিবেশন পর্যবেক্ষণ করা। আরিফ বলল, এটি কুয়ালালামপুরের খুব জনপ্রিয় জায়গা। সকলেই এখানে আড্ডা দিতে ও রকমারি খাবারের স্বাদ গ্রহণে আসে। এ যে, আনন্দ-উৎসবের হাতছানি, ভোগবাদী দুনিয়ার এ আকর্ষণ কে বা অস্বীকার করতে পারে।


কিছুই দেখা হলো না, কিছুই বোঝা হলো না। বৃথাই অর্থ খুঁজে বেড়াই আর বঞ্চিত হই কিছু বোধের বেড়াজাল মাথায় নিয়ে।


একটু এগুতেই শুনলাম আবার মাসেজের চিৎকার। মাসেজ-এর পরপর কয়েকটি দোকান। দেখে লোভও হচ্ছে। ভাবছি মাসেজ করানো যায় কি না। আবার ভাবছি কী দরকার। মনে মনে ভাবছিলাম মাসেজ করালে শরীরটা ঠিক হয়ে যেত। কারণ, কয়েকদিন থেকে খালি ঘুরছি আর ঘুরছি। চীনা কখনও থাই বুলিতে নারী কর্মীরা দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে মাসেজ মাসেজ, হেপি… বলে চিৎকার করছে। তাদের পোশাক পরিচ্ছদ নিঃসন্দেহে আকর্ষণীয়। খদ্দের আকর্ষণ করতে যা প্রয়োজন, তা-ই তারা করছে। আরিফ যদিও বাস করছে মালয়েশিয়ায়, তারপরও সে আর আমি এসবে একেবারেই অনভিজ্ঞ। এজন্য শুধু তাকিয়ে দেখা ছাড়া আমাদের ভাবনায় কোনো ইচ্ছে না জাগানোই ভালো। তাকে জিজ্ঞাসা করি—কী মাসেজ করাবে বা করাবো সে বলে, আজ না করি, সময় নেই তো, তাই আপাতত বাদ দেই, আরেকবার এলে অভিজ্ঞতা গ্রহণ করবেন।

আরিফকে বলি, বড় ব্যর্থতায় গেল এ জীবন। কিছুই দেখা হলো না, কিছুই বোঝা হলো না। বৃথাই অর্থ খুঁজে বেড়াই আর বঞ্চিত হই কিছু বোধের বেড়াজাল মাথায় নিয়ে। আরিফ জানায়—আমাদের সীমাবদ্ধতা কত বেশি। আমরা ইফতার শেষ করে আলোর স্ট্রিটে হাঁটতে হাঁটতে আমাদের দৈনন্দিন জীবন নিয়ে কিছু গল্প বিনিময় করি। কোথায় আজকের মালয়েশিয়া আর আমরা কোথায়। তখন অনেক আগে পড়া গুলজার-এর এক শায়ের মনে হলো ।

দেখো আহিস্তা চলো, ঔর ভী আহিস্তা জরা
দেখ্‌না সোচ্ সমঝকর্‌ জরা পাঁও রাখ্‌না
জোর সে বজ্‌না উঠে পয়রোঁ কি আওয়াজ কঁহী
কাঁচ কে খাব হ্যায় বিখরে হুয়ে তনহাই মেঁ
খাব টুটে না কোই, জাগ না যায়ে দেখো
জাগ জায়েগা কোই খাব তো মর যায়েগা।

অর্থাৎ, দেখো, ধীরে চলো, আরও আস্তে। দেখো, ভেবেচিন্তে পা রাখো। সতর্ক থেকো যেন পায়ের সজোরে শব্দ না হয়। এ নির্জনতায় কাচের সব শব্দেরা ঘুমিয়ে আছে। তোমার পায়ের শব্দে যেন স্বপ্নগুলো ভেঙে না যায়, জেগে না ওঠে। আহারে!

এখানেও স্ট্রিট ফুড আর আমাদের দেশের স্ট্রিটফুড। দু-য়ের বৈশিষ্ট্য নিয়ে ভাবি—কত তফাত। এখানে সন্ধ্যা হলেই লোকজনের জমায়েত বাড়তে থাকে। আর আমাদের দেশে অসুস্থ হওয়ার ভয়ে মানুষ রাস্তার খাবার খেতে চায় না। আমার মনে হলো এ যেন রাস্তায় আয়েজিত ফুড ফ্যাস্টিবাল। এ হলো কুয়ালালামপুর শহরের নিত্যদিনের ঘটনা। আলোর স্ট্রিটে প্রতিদিনের উৎসবের আমেজে আড্ডা।

5
জালান আলোর ফুডস্ট্রিটের আয়োজন

মানুষ খাবার খাচ্ছে আর চুটিয়ে আড্ডা দিচ্ছে। বাহারি খাবারের আয়োজন। চীনা, মালয়, ভারতীয়, পশ্চিমা খাবারের অনন্য এক প্রদর্শনী। আমার মনে হয়েছে যে, এখানে এলে স্ট্রিটফুডের সাথে বিভিন্ন খাবারের ধরন, রান্নাশৈলী, স্বাদ, রং ও নমুনা সম্পর্কে একটি সাধারণ ধারণা লাভ করা সম্ভব। খুব জনপ্রিয় কিছু খাবার এখানে পাওয়া যায়। যেমন : বারবিকিউ চিকেন উইং, চিকেন ও বিফ সাতয়, অয়স্তার অমলেট, গ্রিলফিশ, চরখুবাই তিউ, কোকোনাট আইসক্রিম, রজাক (সালাদ), ফ্রাইডবি হুন, সেনদল, বানানা লিফ, নাসি দাগাং, হক্কেইনমি, সাংগার নুডলস, নাসি কান্দার, চারসিউরাইস, তানজুং তুয়ালাং, নাসি লেমাক ইত্যাদি। এগুলো মালয়ের নিজস্ব খাবার। তবে এগুলোর মধ্যে অনেক বিবর্তন এসেছে। বিশেষত ইন্দোনেশিয়া ও চীনা প্রভাবে। যেমন নাসি দাগাং বেশ প্রিয় একটি খাবার। নিত্যদিন ছাড়াও কোনো অনুষ্ঠানে এ খাবার পরিবেশন করা হয়।

6
নাসি দাগাং

আইসক্রিম বিষয়টি সবদেশেই দেখি খুব পছন্দের। এদেশেও পছন্দের দিক থেকে কোকোনাট আইসক্রিমের জুড়ি মেলা ভার। খুব চমৎকার দেখতে এবং স্বাদও না কি অতুলনীয়। আমি তো কোল্ড খাদ্য সহ্য করতে পারি না। আইসক্রিম প্রিয় কেউ পেলে তাকে শুধিয়ে বলতাম, ‘একবার খেয়ে নাও’। কী আর করা।

7
কোকোনাট আইসক্রিম

এমন খাবারের সমাহার দেখে কার না লোভ জাগে। প্রসঙ্গত, সেনদল মালয়দের কাছে খুব প্রিয় একটি ডেজার্ট খাবার। আমাদের দেশে যেমন চটপটি ও ফুচকা বিক্রি হয়, মালয়েশিয়াতে এখানে-সেখানে এখাবারটি পাওয়া যায়। নারকেল, দুধ, সেমাই, নুডলস প্রভৃতি উপকরণ দিয়ে এটি তৈরি করা হয়। মূলত, তরুণদের কাছে খুব প্রিয় এ খাবার। শুনেছি মালয়েশিয়া ছাড়া থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়াতেও সেনদল অতি জনপ্রিয় খাবারের মধ্যে অন্যতম একটি।

8
সেনদল

বলাবাহল্য যে, মালয়েশিয়ান খাদ্যে বৈচিত্র্য এসেছে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর একত্রে বসবাসের কারণে। মূলত চীনা, মালয়, ইন্দোনেশীয় ও ভারতীয় মিশ্রণে এ বৈচিত্র্য তৈরি হয়েছে। এর সাথে মিশেছে মধ্যপ্রাচীয় রীতি ও রুচি। সম্প্রতি পশ্চিমা ও ইউরোপীয় ধারাও এসে মিশেছে। ফলে, মালয় খাবারের প্রতি সারাবিশ্বের মানুষের আকর্ষণ সৃষ্টি হয়েছে। জাতিবৈচিত্র্যের কারণে মালয়েশিয়ানদের বড় পাওনা হলো খাবারের বৈচিত্র্য। আর তা অল্পদেশেই পাওয়া যাবে। মালয়েশিয়ান খাবারের মধ্যে যেমন কারি মিও কারি লাকসা তৈরি হয় নারকেল দুধ, নুডলস, মরিচ, মশলা, লেমনগ্রাস, মাংস, সিফুড ও সবজি দিয়ে। কারি লাসকা তৈরি করা হয় চীনা নুডলস, ভারতীয় কারি আর মালয় হার্বাল উপাদান সহযোগে। এমন রীতি ও বিচিত্র স্বাদ আর কোথাও পাবার কথা নয়। বিচিত্র সংস্কৃতি ও খাদ্যাভ্যাস সে-দেশের সংস্কৃতিকে দান করেছে সৌন্দর্য ও ঐশ্বর্য।


মালয়েশিয়ায় কর্মরত বাংলাদেশের শ্রমিক ভাইদের কষ্ট, জীবনের ছোট ছোট বেদনা আমরা বুঝেও বুঝি না, জেনেও জানি না।


মালয়েশিয়ার সমাজে যেমন ভাষার বৈচিত্র্য রয়েছে, তেমনি বিচিত্র খাবারের বদৌলতে মালয় ভাষার অনেক শব্দ আমাদের জানা হয়ে যায়। আমার মনে হয় এটি ভাষা শেখার একটি সহজ পদ্ধতি। খাদ্যের শংকরায়ন বৈশিষ্ট্য ভাষার মধ্যেও লক্ষণীয়। সাংস্কৃতিক জীবনে খাবার গ্রহণ ও পরিবেশন অনিবার্য একটি বিষয়। এ কারণে খাবারের মাধ্যমে একটি দেশের সংস্কৃতি সম্পর্কেও সাধারণ ধারণা লাভ করা যায়। আমরা মালয়েশিয়া ভ্রমণে সে সুযোগ নিতেই পারি। সুতরাং, খাবারের মধ্যে যে ইাইব্রিড ভাব ও বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান তা মালয়েশিয়ান সমাজের এখন এক অনিবার্য বৈশিষ্ট্য। এটাকে বলা হচ্ছে ‘হাইব্রিড-মাল্টি কুইজিন’। যেসব খাবার তারা আনন্দের সাথে তৈরি করছে ও খাচ্ছে। এসব খাবারই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে দিনে দিনে। খাদ্য বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমে একটি জনগোষ্ঠীর নৃ-বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত করা যায়, আবার এর আন্তঃসংযোগ, মিশ্রণ, প্রভাব এবং মিশ্রণ থেকে তৈরি হওয়া নতুন বস্তু ও এর নামও সহজে জানা হয়ে যায়। যা আমরা একটি নতুন খাবার হিসেবে গ্রহণ করি। এর মাধ্যমে পরস্পর জানা বোঝারও সুযোগ রয়েছে। ফলত, মালয়েশিয়ার সমাজে ফিউশন যেমন ঘটেছে, তেমনি তা হয়েছে খাদ্যের ক্ষেত্রেও। মালয়েশিয়ানরা গর্বের সাথে এ মিলিত ভাবধারা ও খাদ্যের হাইব্রিড সংস্কৃতিকে গ্রহণ করেছে। আমরা মালয়েশিয়াতে লক্ষ ও উপলব্ধি করেছি বহুত্ববাদী সমাজে মানুষের মন, মানসিকতা, বিনিময়ের ভাব, সম্প্রীতি ও সহিষ্ণুতার সংস্কৃতিকে। এক্ষেত্রে সংস্কৃতি আর মাল্টিলিঙ্গুয়াল বিষয়ে কাজ করার একটি ভালো এলাকা হলো মালয়েশিয়া। আলোর স্ট্রিটে হাঁটার সময় লক্ষ করি—এক তরুণ ববমার্লির গান গাইছে। কী তার উদ্দেশ্য জানি না। তবে তার গায়কী শুনতে ভালো লাগছিল। কোনো সাহায্য, না এমনিতেই বোঝা গেল না। ভালো লাগার ফলে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে তার গান শুনলাম।

9
ববমার্লির গান গাইছে এক তরুণ শিল্পী

এ তরুণের গান শুনে চলে গেলাম মধুমিতা ও অভিসার সিনেমা হলের স্মৃতিতে। আমাদের তারুণ্যে ঢাকায় পাশ্চাত্যের মুভি দেখার জন্য এ দু-টি সিনেমা হল ছাড়া আর তেমন বিকল্প ছিল না। মুভি শুরুর আগে হল কর্তৃপক্ষ ম্যাডোনা, জর্জ মাইকেল, লায়নরিচি, জ্যাকসন, ববডিলান আর ববমার্লির গান শুনাত। কিছু কিছু গানের সুর ও কথা সেই থেকে মনে গেঁথে আছে। আজ কুয়ালালামপুরের তরুণ এক শিল্পী মনে করিয়ে দিল ববমার্লির গানের কথা। তার রোমান্টিক গানের সুর। ববমার্লির আসল নাম হলো—নেস্তা রবার্ট মার্লি। প্রেম, দুঃখের দহনে তার গানের বৈশিষ্ট্যে দ্রোহ ছিল ব্যতিক্রম। কেননা বব সহজপথে সংগীতের জগতে প্রতিষ্ঠা পান নি। অনেক বাধা বিপত্তি অতিক্রম করেই গানের প্রচার, রেকর্ড ও বাজারজাত করতে হয়েছে। যা-হোক শ্রোতাদের কাছে তিনি চিরকালীন হয়ে আছেন। আজ এ পথিক তরুণ শিল্পী ববমার্লির সে বিখ্যাত গানটি পথিক শ্রোতাদের শুনিয়ে দিল।

No woman no cry, no woman no cry
I said no woman no cry, no woman no cry

Yes, I remember when we used to sit
In the government yard in Trench town
And georgey would make the fire light
with the burning through the night
and we would cook corn meal poridge
Which I’d share with you ya
And my feet is my only carriage
So I’m gonna push on through

Everything’s gonna be alright
Everything’s gonna be alright
Everything’s gonna be alright

Everything’s gonna be alright
Everything’s gonna be alright
Everything’s gonna be alright

Everything’s gonna be alright
Everything’s gonna be alright
Everything’s gonna be alright

No woman no cry, no woman no cry
I said no woman no cry, no woman no cry.

এ গানটি শেষ হলে আরেকটু এগিয়ে দেখি আরেকজন গান শুনাচ্ছে। তবে নিজের কণ্ঠে গেয়ে নয়। মালয়েশিয়ায় এ প্রথম দেখলাম একজন লোক সাহায্য চাচ্ছে। এ ভিখারি অবশ্য আমাদের দেশের ভিখারিদের মতো নয়। তার সামনে একটি শূন্য বাক্স রাখা আর গান শোনাচ্ছেন রেকর্ডার থেকে। রেকর্ডার থেকে থেমে থেমে কখনও মালয় কখনও ইংরেজি ভাষার গান শোনা যাচ্ছে। তিনি কিছু আবেদন জানাচ্ছেন। পাশ্চাত্যে যেভাবে ভিক্ষা চায় কেউ, সেরকম। একটি খালি বাক্স, এগিয়ে দেখি কিছু রিংগিত তলানিতে জমা আছে। আমরা এগুতে থাকি স্ট্রিটফুডের এ সমাবেশের বাইরের দিকে। পেয়ে গেলাম ফলের দোকান। মালয়েশিয়ার জাতীয় ডরিন ফল সুন্দরভাবে রাখা আছে বিভিন্ন দোকানির কাছে। ডরিনফল খেতে লোভ জেগেছিল, কিন্তু আরিফ বলল, ভিন্ন এক গন্ধ আছে ওই ফলে, তাই সে খেতে পারে না। তখন একা কি আর খাওয়া যায়। সুতরাং, ডরিন ফলের স্বাদ নেওয়া হলো না।

10
বিখ্যাত ডরিনফল

আলোর জালানের ঝলমলে পরিবেশে আমরা এতক্ষণ মোহিত ছিলাম। মোহ এক সময় ভাঙতে হয়। যে মোহ বেশিক্ষণ ধরে রাখা মুশকিল।বুকিতবিনতাং-এর ব্যস্ততম বাণিজ্যিক এলাকায় একটি রেস্তোরাঁয় আমরা খাবার সেরে নেই। ওখানে আবার পরিচয় হলো দু-জন বাংলাদেশি ভাইয়ের সাথে, তারা এ রেস্তোরাঁয় কাজ করেন। এক ফাঁকে কথা বলে নিলাম তাদের জীবন, চাকরি, সংকট, কিভাবে থাকা ইত্যাদি। সব শুনে ভালো-মন্দ দুটোই অনভব করি। শুনে কী হবে, তাদের যাপিত জীবনের সমস্যাগুলোর সমাধান করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। মালয়েশিয়ায় কর্মরত বাংলাদেশের শ্রমিক ভাইদের কষ্ট, জীবনের ছোট ছোট বেদনা আমরা বুঝেও বুঝি না, জেনেও জানি না। ছোট ছোট বেদনার কথা কেউ জানে না। আমাদের খোঁজ করা প্রয়োজন, বাংলাদেশের শ্রমিকদের প্রতি মালয়েশিয়া সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি এবং যাদের দোকানে, কোম্পানিতে কাজ করে, তারা কেমন আচরণ দেখায় অথবা এসব বাংলাদেশি মানুষের সাথে সাধারণ মালয়েশিয়ানরা কেমন আচরণ করে। কিছু ভালো লাগা, আবার খুব পীড়াদায়ক উদাহরণও রয়েছে। ভালোলাগার বিষয়গুলো বাদ রেখে মনে মনে ভাবি এ মানুষগুলোর পক্ষে কথা বলার কি কেউ নেই এ দুনিয়াতে। দলিত মানুষের কথাকার মনোরঞ্জন ব্যাপারীর কথামালায় স্বস্তি আসে, তবে বাস্তবতার বিপরীত ছায়া ঘিরে রাখে সকল সময়। সাহিত্যের বার্তায় এমন বিষয়াবলিকে বৈশ্বিক সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে কথকের জবানিতে মনোরঞ্জন বলেন, ‘আমি এই যে কাগজ কুড়ানো ছেলেটা, একে মাত্র একজন মানুষ বলে দেখছি না, এ হচ্ছে বিশ্ব মহামণ্ডেলের আর্তমানবাত্মার একটা অনুতুল্য অংশ। গোটা মানব জগতের কাছে তেমন কিছু নয়। মরুভূমিতে যেমন এককণা বালু কিছু না। কিন্তু কিছু না হয়েও ওই বালুকণা, সেও কিন্তু মরুভূমিরই অংশ। হাজার মাইল দূরে গেলেও তার ওই পরিচয় সাথে থাকে। তাকে তুই তৃষ্ণার জল দিয়েছিস। মানবিক ব্যবহার দিয়েছিস। সেটাকে আমি কোনো দয়া বা সহমর্মিতা বলব না—সহমর্মিতা বা উপক্রিয়া বলতে পারি। আর একটু এগিয়ে, ইষ্টাপত্তিও বলতে পারি। নাম যাই দিই কিন্তু সেটা পাবার পূর্ণ অধিকারী এইরকম সব মানুষই। আজ আমরা সেই খাদের কিনারায় এসে দাঁড়িয়েছি। একটা ভয়াবহ অভিসম্পাত নেমে আসা এখন মাত্র সময়ের অপেক্ষা। যেকোনো দিন যা কিছু ঘটে যেতে পারে। যা আমরা কল্পনায়ও আনতে পারছি না। বলা যায় না গোটা মানব সমাজ ধ্বংসও হয়ে যেতে পারে। মানুষের সীমাহীন লোভ-লালসা—অনেককে বঞ্চিত করে একার থলি ভরে নেওয়া প্রবৃত্তির মধ্যে সেই ধ্বংসের বীজ লুকানো আছে।’ [ছেঁড়া ছেঁড়া জীবন, ১৯৮]

সুতরাং, আমি ব্যক্তিগতভাবে আইনের মধ্যে থেকেও বলি—মানবিকতার আবার বৈধতা লাগে? মানবতা নিজেই বৈধতার ভিন্ন আইন। মানবিক দৃষ্টিতে অন্তত কেউ কিছু বলুক। তাদের শ্রমেই তো এ সভ্যতার নির্মাণ। আমি ভেতরে ভেতরে অসহায়ত্ব বোধ করি। মুহূর্তে মায়া ধরে যায়। ভেবে পাই না কী বলার আছে আমার। ঘুরছি, ফিরছি আনন্দ করছি, কিন্তু মাঝে মাঝে কষ্টের বহর বেড়ে যায়। অপ্রকাশিত কষ্টবোধ নিয়ে আরিফ ও রাতের আলোর ফোয়ারায় ফিরছি আবাসিক হোটেলের দিকে। আলোর যাত্রা বাষ্পের মতো শেষ হলেও কষ্টের বহমানতায় আমরা অন্তহীন পরিব্রাজক।


১৩ পর্বের লিংক

স্বপন নাথ

জন্ম ৪ মে ১৯৬৮; বড়লেখা, মৌলভীবাজার। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর, বাংলা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়; এমফিল, ভাষাবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

পেশা : শিক্ষকতা; উপপরিচালক (গবেষণা ও তথ্যায়ন), নায়েম, শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

প্রকাশিত বই :
প্রবন্ধ—
চিন্তা ও জগৎ : সাহিত্য সংস্কৃতি [প্রবাস প্রকাশনী, যুক্তরাজ্য ২০০৭]
কবিতার নন্দনবিশ্ব [অনিন্দ্য প্রকাশ, ঢাকা ২০১৭]
কথার বুনন [জিনিয়াস পাবলিকেশন্স, ঢাকা ২০১৯]
ছিন্ন কথামালা [জিনিয়াস পাবলিকেশন্স, ঢাকা ২০১৯]

কবিতা—
রৌদ্র ও বৃষ্টিতে মায়াহরিণ [ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ, ঢাকা ২০০৭]
জলৌকা চোখের চাতাল [ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ, ঢাকা ২০১০]
নির্জন বিচালির ডানা [কবি প্রকাশনী, ঢাকা ২০১৩]
নখের আউঠা [উৎস প্রকাশন, ঢাকা ২০১৪]
নানকার ধানবীজ [উৎস প্রকাশন, ঢাকা ২০১৫]
একলব্যের ছিন্ন আঙুল [নাগরী, সিলেট ২০১৬]
সংশয়ের বসতি [নাগরী, সিলেট ২০১৭]
গ্রাম বজ্রযোগিনী [জিনিয়াস পাবলিকেশন্স, ঢাকা ২০১৯]

ই-মেইল : rudro71@gmail.com