হোম ভ্রমণ মালয়েশিয়া ভ্রমণ : সামান্য দেখা

মালয়েশিয়া ভ্রমণ : সামান্য দেখা

মালয়েশিয়া ভ্রমণ : সামান্য দেখা
270
0
১০ পর্বের লিংক

পর্ব- ১১

A museum is usually regarded as a public building which showcases objects of artistic, cultural, historical or scientifc interest, through permanent or temporary exhibitions. Museums have a story to tell people; the story that is presented may be influenced by archaeologists in order to convey a message that they think is important. By providing a floor to disseminate information, museums play and important role in raising awareness, which in turn assists the preservation of cultural heritage.… Sometimes museums present objects to the public because they are beautiful (aesthetical value) orvaluable (economical value). This is often the practice in art museums. For objects in archaeologicalmuseums, archaeologists customarily provide detailed context to create valuable meaning for artefacts.’ [UNICEF]

খুব সকালে নাস্তা শেষে হোটেল চেকআউটের প্রস্তুতি নিচ্ছেন সকলে। আমিও প্রস্তুতি নিয়ে একসাথে বেরিয়ে আসি এবং আগের রাতে যে কক্ষে ছিলাম তা আবার আমার জন্য বরাদ্দ দেওয়ার জন্য বলি। এজন্য হোটেল ম্যানেজমেন্ট-এর সাথে কথাও হয়। তারপর মনে হলো সবাই চলেছেন শপিং করতে। এভাবেই বাইরে যাবার প্রস্তুতি ও রিসিপশনে বোঝাপড়া। সবাই চলে গেল যে-যার মতো ঘুরতে। আবার শপিং থেকে ফিরে এসে দুপুরে এখান থেকে সবাই বিদায় নেবে। তারা চলে যাবেন ইন্দোনেশিয়ার বালি দ্বীপে। আজ ১৬ মে থেকে আমি একাই থাকছি মালয়েশিয়া। একা হওয়ার সুবিধা ও অসুবিধা দুটোই আছে। একা হলে নিজের মতো এদিক-ওদিক ঘোরা যায়। ভাবছি একাকিত্ব কাজে লাগানো দরকার।

ফলে, আমি সেভাবে আরিফকে আসতেও বলি। দলের অধিকাংশই গেলেন বুকিত বিনতাং এলাকায়। বিচ্ছিন্নভাবে বের হলেও অনেকের সাথে আবার দেখো হলো হানিফা ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে। এটি ভারতীয় মালিকাধীন বড় শপিংমল। শুনেছি কুয়ালালমপুর শহরে এখানেই সবচেয়ে কম দামে সব পণ্য পাওয়া যায়। এখানে চকলেট থেকে শুরু করে সকল দ্রব্যই রয়েছে। নেই যে কোনটি তা খুঁজে পাই নি। ফলে, এখানে মানুষের ভিড়ও প্রচুর। তামিলভাষী বা দক্ষিণ ভারতের প্রচুর লোক এখানে দেখতে পেলাম। সম্ভবত দোকানের মালিকানা ভারতীয় হওয়ার কারণে। দেখলাম অনেকেই ব্যাগভর্তি চকলেট কিনে নিচ্ছেন।

1
হানিফা ডিপার্টমেন্টাল স্টোর-এর একাংশ

হানিফার সামনে কিছু বসার জায়গা তৈরি করা আছে। ইট সিমেন্টের গোলাকার বেঞ্চ। পার্কে যেরকম তৈরি করা হয়। হালকা সদাই শেষে ক্লান্ত হয়ে স্টোরের সামনের বেঞ্চিতে বসে আছি। নানা রং ও ঢঙের লোকজনের চলাফেরা দেখতে বেশ মজাই লাগে। বিচিত্র ধরনের মানুষের বিচিত্র গতিশীলতা। মাঝে মাঝে চোখে পড়ে বাংলাদেশি চেহারার লোক। দেখে ভালো লাগে। মনে মনে খুঁজি পরিচিত জন। হঠাৎ যদি কারও দেখা মেলে এ আশায়। কতক্ষণ বসে থাকার পর দেখলাম পিঠে ঝুলানো একটি ব্যাগ নিয়ে এক তরুণ এদিক-ওদিক ঘুরছে। তার চোখে মুখে ক্লান্তি, ভয় আর অনিশ্চিতি প্রকাশিত। চারদিকে তাকাচ্ছে। রঙিন ছোট প্যাকেটের কী যেন হাতে আর সামনে কাউকে পেলে কি যেন জিজ্ঞেস করছে। কত যে শুধানো, কিন্তু সকলেই তাকে এড়িয়ে যাচ্ছে। মনে হলো সে বাংলাদেশি হতে পারে। আমার সামনে এসে আমাকে মালয় ভাষায় যা জিজ্ঞাসা করেছে, আমি বুঝি নি।পরে ইংগিতে বুঝলাম জানতে চেয়েছে—মোবাইল সিম কিনব কি না। তার কণ্ঠে মালয় বুলি হলেও বাংলা স্বরভঙ্গির কারণে আমি নিশ্চিত হই সে বাংলাদেশি।


বহুলোকের সাথে ঘুরেছি, তারা জাদুঘরে না গিয়ে শুধু যায় শপিংমলে বা অন্য কোথাও। জাদুঘরে যাবার সাথি খুব কমই পেয়েছি। কোথাও ভ্রমণে গেলে দলছুট হয়েই ওই এলাকার জাদুঘরে আমি একা একাই ঘুরেছি।


আমার কথা বলতে ইচ্ছে হলো। জানতে চাই আপনি কি বাংলাদেশি? উত্তর পেলাম—হাঁ। জানতে চাই—বাড়ি কোথায়? সে বলল, হবিগঞ্জের মাধবপুর এলাকায়। শুনে দরদ লাগে, মায়া হয়। তার নাম শিহাব। আমি তার আরও কিছু তথ্য জেনে নেই। এখন এখানে কি করছেন? সে উত্তরে জানায় একটি মোবাইল কোম্পানির এজেন্ট হয়ে সিম বিক্রির কাজ করছে। এখন যদি সে সিম বিক্রিতে সাফল্য দেখাতে পারে, তা হলে ভালো কিছু করতে সুযোগ পাবে। সে জানায়, এভাবে হেঁটে হেঁটে আর তাকে সিম বিক্রি করতে হবে না। তার খবরাখবর নিতে নিতে একটু আপন হয়ে যাই। লক্ষ করি তার এলাকায় আমার কয়েকজন পরিচিতকে সে চিনে। কথা বলতে বলতে মুহূর্তে পরস্পর আপন হয়ে গেলাম। আমি শিহাবকে তুমি বলে সম্বোধন করি। এতে সে বিরক্ত না হয়ে বরং খুশি হয়। আমি শিহাবকে বলি, আমাকে তুমি কি একটি বইয়ের দোকানে নিয়ে যেতে পার? সে সহাস্যে উত্তর দিল, চলেন। তারপর কয়েকটি দোকান আমরা ভ্রমণ করি। কিন্তু আমার চাহিদা মতো বই না পেয়ে ফেরত আসি আবার সেই হানিফার সামনে। এর মধ্যে দেখি আমার সাথি কয়েকজন চকলেট, ইলেকট্রিক সামগ্রী, বোরকা, স্কার্ফসহ কিছু কাপড়ও কিনে নিয়েছেন। আমি আর আজ তেমন কিছুই কিনি নি। শিহাব-এর সাথে আরও কিছুক্ষণ আড্ডা দিলাম। তার মোবাইল নম্বর নিয়ে ফেরার পথে একইসাথে আমি খুঁজে বেড়াই কুতারায়া মার্কেট ও বাস স্টেশন। প্রথমে আমি বুঝতে পারি নি যে এ স্থানটি আমার অতি কাছেই অবস্থিত। ওখানে সবাই বলেছে—কুতারায়া হলো গুলিস্তানের মতো। কুতারায়া নিয়ে অনেক গল্প শুনেছি। এখান থেকে সব জায়গায় মালয়েশিয়ার বিভিন্ন গন্তব্যে যাওয়া সহজ। চাইলে শস্তা কেনাকাটা করা যায়।

অল্প সময়ের মধ্যে দলের সদস্যদের বিদায় জানিয়ে হোটেলে আমার কক্ষটি বুঝে নিতে যাই। তখনই বুঝলাম গতকালের কক্ষটি আমাকে দেওয়া হচ্ছে না। আমার নামে নতুন একটি কক্ষ বরাদ্দ হয়েছে। মুশকিল হলো আমি আরিফকে কথা দিয়েছি যে, আজ একসাথে রাত কাটাব এবং এ অনুযায়ী একটি ডাবল বেডের কক্ষ আমি নিচ্ছি। হোটেল ম্যানেজমেন্ট এ দাবি খেয়াল না করে একটি সিঙ্গল কক্ষ আমার নামে বরাদ্দ দেয়। আমি জানতে চাই এখন আবার সেরকম কক্ষ দেওয়া যাবে কি না? তারা বললো, না। সব কক্ষই বুকড। আগে বললে ব্যবস্থা করা যেত। কিন্তু আমি তো আগে বলেছি। এ কথোপকথনের মধ্যে অভ্যর্থনায় এক জুটি এসে হাজির। চমৎকার সুন্দর যুবক যুবতী। অভ্যর্থনায় থাকা তরুণীটি কিছুই জানতে চাইল না। কম্পিউটারে ক্লিক করে শুধু রেজিস্ট্রেশন করে নিল। আমি ইচ্ছে করে বোকার মতো তাদের কাছেই দাঁড়িয়ে রইলাম। এ দাঁড়িয়ে থাকার দু-টি উদ্দেশ্য। প্রথমত, এ জুটিকে দেখা। এত সুন্দর যুবক-যুবতীর সাবলীল আচরণ লক্ষ করা। দ্বিতীয়ত, হোটেলকর্মী তাদের কাছে কী কী বিষয়ে জানতে চায়, তা জানা। লক্ষ করি, তাদের ব্যক্তিগত কোনো তথ্য যেটুকু প্রয়োজন ওই পর্যন্তই সে জেনে নিয়েছে। আমাদের দেশে শুনেছি এক ধরনের হোটেলে কোনো দম্পতি অবস্থান করতে গেলে তাদের মধ্যে কী ধরনের সম্পর্ক এটিও জানতে চাওয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে নাকি দাম্পত্য সম্পর্কের প্রমাণও দেখাতে হয়। কত মানুষকে কতভাবে যে নাজেহাল হতে হয় এর সব খবর কী আমরা রাখি। তবে অবস্থার যে অনেক পরিবর্তন হয়েছে, সে খবরও আমার কাছে রয়েছে। বিশেষভাবে উন্নত হোটেলে সেবার মান অনেক বেড়েছে। ফলে, বাংলাদেশে এখন পর্যটনখাতে ক্রম-উন্নতি ঘটছে। তবে মালয়েশিয়ার হোটেলকর্মীদের আচরণের সাথে আমাদের দেশের কর্মীদের যে পার্থক্য তা আঁচ করতে পেরেছি। ওরা অনেক বেশি প্রফেশনাল। ওই যুবক-যুবতী দু-জন কক্ষ বুঝে নিয়ে চলে গেল।

এ সুযোগে আমি আবারও জানতে চাইলাম কোনো ডাবলবেডের কক্ষ ম্যানেজ করা যাবে কি না?বুঝালাম যে, আমার সাথে আরেক গেস্ট থাকবে। হোটেলকর্মী সরি বলে জানায়—সম্ভব হচ্ছে না। আমি ভাবলাম এর একটি কারণ হতে পারে আমি বিশেষ সুবিধায় চলমান ট্যারিফ থেকে কম দিয়ে হোটেলে অবস্থান করছি। অতএব আমাকে না দিয়ে অন্য কাউকে দিলে সে বেশি ভাড়া পাবে। অন্যটি হলো, আমার টিমের সবাই চেক আউট হলেও আমি থেকে গেলাম কেন? এক্ষেত্রে আমাকে আলাদা বিবেচনায় রাখা। তাদের ভাবনা যে কী, জানি না। না হলে কি আর করা। হোটেল কক্ষে ফ্রেশ হয়ে আবার চলে গেলাম লাঞ্চ করতে। ভাবলাম এত গরমের মধ্যে আর দূরে কোথাও যাব না। গেলাম আনকাসা হোটেলের পাশেই অবস্থিত নান্দুস-এ। আমি খাবারের অর্ডার দেওয়ার পর বসে আছি। হঠাৎ একদল কিশোর বয়সী শিক্ষার্থীর সমাবেশ ঘটল সেখানে। এদের চ্যাঁচামেচিতে ভাবলাম এখানে আর বসা যাবে না। তো ম্যানেজারকে বললাম আমার খাবারটা পার্সেল করে দিতে। খাবারের প্যাকেট নিয়ে সোজা চলে এলাম হোটেল কক্ষে। একা একা ভাবছি কী করব, আর কী বলব আরিফকে। কাল যে তাকে থাকার কথা বলেছি। আবার একটু পর তো আরিফ চলেও আসবে। লজ্জায় পড়ে গেলাম। ভাবলাম আরও একটি সিঙ্গল কক্ষ দিলেও সে থাকতে পারবে। কিন্তু কোনো কক্ষই তো খালি নেই। ভাবনার ভেতরেই খাবার সেরে নিলাম।

নতুন কক্ষটি মূল রাস্তার উপরে হওয়াতে রুমের ভেতর থেকে পাদু সেন্ট্রাল-এর রাজপথ, মানুষ, মেট্রোরেল, বাস সবই দেখা যায়। জানালা খুলে দিলে প্রচুর বাতাস আসে। এক কথায় খুবই আনন্দমুখর আরামদায়ক হোটেল কক্ষ। এ পরিবেশ দেখে খুবই ভালো লাগছে। কিন্ত খারাপ লাগছে আরিফের কাছে কথা রাখতে পারছি না ভেবে। ভাবতে ভাবতেই আরিফের ফোন। বললাম রুমে আছি তুমি চলে আসো। তারপর সিদ্ধান্ত নেই কোথায় আজ বিকালে যাচ্ছি। আরিফ আসার পর তার কাছে ক্ষমা চেয়ে বললাম যে, আজ তো চেকআউটের সময় আমাকে ডাবলবেডের কোনো রুম দিল না। কোনোভাবে কি ভিন্ন ব্যবস্থা করা যায়? সে বলল, ‘কোনো সমস্যা নেই, ওটা হয়ে যাবে। কোথায় যাওয়া যায় বলুন।’ সে সবকিছু মেনে নিল। বললাম—আমার দুটো ইচ্ছে, এক জাদুঘর দেখা, আর দ্বিতীয় বুকশপে যাওয়া। আরিফ বলল—কুতারায়া পেয়েছেন কি? বললাম না। সে জানায়—আপনার হোটেলের কাছেই কুতারায়া। সম্ভবত হোটেল থেকে দেখা যাবে। ওইভাবে সে খোঁজও নিয়েছে। সে জানায় যে, জানালা খুললেই দেখা যাবে কাঙ্ক্ষিত স্থান। সত্যি তাই জানালার পর্দা সরিয়ে আরিফের নির্দেশনা মোতাবেক দেখে নেই রুম থেকে কুতারায়ার ভবনগুলো। নানা কারণে এটি বিখ্যাত স্থান। সকল বাংলাদেশি মালয়েশিয়ায় গমনের পর প্রথম কুতারায়ায় জায়গা নেয়, তারপর ওখান থেকে চলে যায় বিভিন্ন স্থানে। রাতের কুতারায়া থাকে আরেক রকম। শুনলাম সেখানে মানুষও না কি কেনাবেচা হয়। বিপদ-আপদ, ব্যস্ততার জন্য এ এলাকাটির গুরুত্ব অন্যরকম। বাংলাদেশিদের মিলনস্থল এ কুতারায়া। এখানে না কি মাঝে মাঝে অপ্রীতিকর ঘটনার জন্ম হয় অভিবাসীদের কারণে। আর বাংলাদেশিরা এখানে আসা-যাওয়া বেশি করে, ফলে বাংলাদেশিদের জন্য নিরাপদ জায়গাও বটে। শুনলাম, অপরাধপ্রবণ এলাকা হিসেবেও কুতারায়ার খ্যাতি রয়েছে। এ কারণে মালয়েশিয়ার নিরাপত্তাকর্মীরা এ স্থানটিকে নজরদারিতে রাখে সবসময়।

আরিফও খুব আনন্দবোধ করছে আমাকে পেয়ে। বহুদিন পর আমার সাথে তার সাক্ষাৎ। আমি আরিফকে বলি—জাদুঘরে যাব। আরিফ বলল, জাদুঘরে এর আগে যায় নি। বুকশপের বাজারে সে আগেও গেছে। নতুন কোনো স্থানে গেলে আমার জাদুঘর দেখতে ইচ্ছে করে। বহুলোকের সাথে ঘুরেছি, তারা জাদুঘরে না গিয়ে শুধু যায় শপিংমলে বা অন্য কোথাও। জাদুঘরে যাবার সাথি খুব কমই পেয়েছি। কোথাও ভ্রমণে গেলে দলছুট হয়েই ওই এলাকার জাদুঘরে আমি একা একাই ঘুরেছি। আজ খুব তাড়াহুড়ো করেই গেলাম জাদুঘরে। কারণ দেরি হলে আবার বন্ধ হয়ে যেতে পারে। একটি ট্যাক্সি ডেকে চলি ন্যাশনাল মিউজিয়ামের পথে। সেদিকে যাবার পথেই দেখলাম ট্যাক্সটাইল মিউজিয়ামের নামফলক। না, ওখানে আর থামি না। ন্যাশনাল মিউজিয়ামে গেলেই বুঝব আর বাকিগুলোতে যাওয়া দরকার কি না। আমরা তো চিনি না। ট্যাক্সি ড্রাইভার পৌঁছে দিল জাদুঘরের সামনে।

3
মিউজিয়াম নেগারা (ন্যাশনাল মিউজিয়াম)-রমূল ফটক

জাদুঘরের সামনে লোকজন তেমন নেই। নীরব নিস্তব্ধ একটি এলাকা। জাদুঘরের বাইরে সযত্নে রাখা আছে একটি রেলের স্টিম ইঞ্জিন। ভেতরে গিয়ে লক্ষ করি, কয়েকজন স্টাফ আর কয়েকজন দর্শনার্থী মাত্র। টিকেট কাউন্টারে টিকেট সংগ্রহ করে আমরা ভেতরে প্রবেশ করি। তারপর একেবারে ভিন্ন এক পরিবেশ। একেবারে প্রবেশমুখেই রাখা হয়েছে কিছু যন্ত্রাংশের কাঠামো। কিছু বোঝানো হচ্ছে, তবে আমরা বুঝি নি। মাইক্রোফোনের খুচরা অংশও আছে। আমার কাছে মনে হলো ড্রাগনের প্রতিরূপ। অবশ্য আমি বুঝতে পারি নি কী বোঝানো হচ্ছে। মালয় ভাষায় কী লেখা আছে তাও বুঝি নি। তবে এসব কাঠামো বা ভাস্কর্যের শিল্পবৈশিষ্ট্য আকর্ষণীয় নিঃসন্দেহে।

4
জাতীয় জাদুঘরের প্রবেশমুখেই রয়েছে এমন ভাস্কর্য

তারপর আমরা গ্যালারিতে প্রবেশ করি। বুঝে নিতে চেষ্টা করি—বিচিত্র নৃতাত্ত্বিক, সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যের বহুভাষিক একটি দেশ মালয়েশিয়া। এখানে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীসমূহ স্বীয় সংস্কৃতি, আত্মপরিচিতি ও ভাষার চর্চা করে থাকে। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, মালয় জাতির আদি বৈশিষ্ট্যের সাথে পর্যায়ক্রমে মিশেছে চীনা ও ভারতীয় সংস্কৃতি। এছাড়াও মালয় সংস্কৃতির ওপর প্রভাব রয়েছে সেমেটিক ও ইউরোপীয় সংস্কৃতির। রাজনৈতিকভাবে এসব সংস্কৃতির মধ্যে একটা আন্তঃসংযোগের সেতু তৈরি করা হয়েছে। বিভিন্ন নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে আত্তীকরণও ঘটেছে। এ আন্তঃসংস্কৃতির সংযোগে গড়ে উঠেছে মালয় বা মালয়েশিয়ান সংস্কৃতি। রাজনীতি ও সংস্কৃতিতে মালয়ভাষী মুসলিম জনগোষ্ঠীর প্রভাবই এখানে কার্যকর। তাদের বলা হয় ভূমিপুত্র। তাদের ভাষা হলো বাহাসা মালয়েশিয়া। এ মালয়জাতির উৎস হচ্ছে ওরাংআসিল আদিবাসী। আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বসবাস মূলত সাবা সারওয়াক ও বর্নিও দ্বীপে। এ আদিবাসীদের অনেকে এখন খ্রিস্টীয় সংস্কৃতি পালন করে। এ সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য মালয়েশিয়ার পর্যটনের এক আকর্ষণীয় অঙ্গ। এর ভবিতব্য আমরা কিছুই জানি না, তবে বর্তমানে সংস্কৃতির বহুত্ববাদ তারা ভালোভাবেই মেনে চলেছে। জাতীয় জাদুঘরে রক্ষিত নানা উপকরণ এসব বিষয়ের ইংগিত দেয়। জাদুঘরে প্রদর্শনীর শুরু হয়েছে সেই আদি সংস্কৃতি, ভৌগোলিক ও জাতি গঠনের ইতিহাস দিয়ে। ধীরে ধীরে আমরা দেখতে পাই বর্তমান মালয়েশিয়াকে। জাদুঘরে মালয়েশিয়ার ইতিহাস, ঐতিহ্য, ভূগোল, শিল্পকর্ম, চারুকলা ও সংস্কৃতির বিবর্তন বিভিন্ন উপকরণের মাধ্যমে দেখানো হয়েছে। পরিধি ছোট হলেও মালয়েশিয়ার ইতিহাস ও ঐতিহ্য মোটামুটি ধরে ফেলা যায়।

5
প্রাচীন মালয়ের প্রত্ন নিদর্শন

কুয়ালালামপুর শহরের মধ্যেই অবস্থিত এ জাদুঘর। এ শহরের দামানসারা সড়কে লেকগার্ডেনে এর অবস্থান। এটাকে মালয় ভাষায় বলা হয় মিউজিয়াম নেগারা। দর্শনার্থীদের জন্য খোলা থাকে সকাল ৯টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত। ১৯৬৩ সালে এ ন্যাশনাল মিউজিয়াম প্রতিষ্ঠার পর নানাভাবে সম্প্রসারিত হয়েছে। গ্যালারির পরিধিও বাড়ানো হয়েছে। বিষয়ভিত্তিক বিভাজনে চারটি গ্যালারিতে ভাগ করা হয়েছে। মালয়েশিয়ার ইতিহাসের উপাদান, মানুষের বসতি, নৃতাত্ত্বিক বৈচিত্র্য, আধুনিক মালয়েশিয়ার নির্মাণ সবই স্থান পেয়েছে। এ চারটি বিভাজনের প্রথমেই রয়েছে প্রাগৈতিহাসিক গ্যালারি। যেখানে দেখা যায় মালয়েশিয়ার প্রত্ন-ইতিহাস ও ঐতিহ্য। লক্ষ করি, এ জনপদে কত হাজার বছর আগে মানুষের গতিবিধি শুরু হয়েছিল। এ গ্যালারিতে আছে পাথর ও মাটি পরিচিতি, পাথরের তৈরি দ্রব্যাদি, পুরনো তৈজসপত্র, ঘর গেরস্থালির দ্রব্য, প্রাত্যহিক জীবনের প্রাচীন উপকরণ, কৃষিযন্ত্র, শিকার ও মাছ ধরার ফাঁদ এবং প্রাচীনকালে ব্যবহৃত পোশাক এবং অস্ত্র। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এশিয়া অঞ্চলের বিভিন্ন দেশের প্রাচীন উপকরণে বেশ মিল রয়েছে।

6
মৃত ব্যক্তির সৎকার যাত্রায় ব্যবহৃত উপকরণ

দেখা মেলে গাছের ছাল দিয়ে তৈরি দুর্লভ পোশাকের, যা আকারেও বেশ বড়। এ জাদুঘরের সুবাদে আমরা মালয়েশিয়ার ইতিহাস-ঐতিহ্য সম্পর্কে সাধারণ ধারণা লাভ করতে পারি। চলতে থাকি ইতিহাসের পথ ধরে। চলতে চলতে পরিভ্রমণ করি মালয় ইতিহাসের বিভিন্ন ধাপে। সেই হাজার হাজার বছর আগে চীনা জনগোষ্ঠীর একটি অংশ মালয় উপদ্বীপে যাত্রা শুরু করেছিল বলে প্রত্ন ও নৃতত্ত্ববিদরা প্রমাণ পেয়েছেন। সারাওয়াকসহ বিভিন্ন স্থানে সে ধরনের উপাদানও পাওয়া গেছে। প্রাচীনত্বের উপকরণ থেকে জানা যায় আদি মালয় মানববসতি গড়ে ওঠে পেরাকে। শিকার যন্ত্র ও অস্ত্র দেখে এখানে হোমোইরেকটাস বৈশিষ্ট্যকালীন মানবপ্রজাতির বসতির কথা ভেবেছেন মালয়েশিয়ার নৃতাত্ত্বিকরা। এ মানবগোষ্ঠীকে বলা হয় পিকিং মানব বা জাভা মানব।

7
প্রাচীন ও মধ্যযুগে ব্যবহৃত অস্ত্র

সম্প্রতি মালয় প্রত্নবিদরাও কিছু উপাদান আবিষ্কার করেছেন, যেমন : বৃক্ষ, পশু ও পাথর কাটার অস্ত্র। প্রাক-ইতিহাস পর্বের বিভিন্ন উপাদান পাওয়ার পর তারা নিশ্চিত হন যে, প্রস্তরযুগে এখানে মানববসতি গড়ে ওঠে। এসব কিছু দেখে মনে হলো যে, মানববসতি অনেক প্রাচীন। এ অঞ্চলে মানুষ এত বেশি আসা-যাওয়া করত কেন, এর কারণ খুঁজে পাওয়া যায় উপকরণগুলো থেকে। প্রাচীনত্বের উদাহরণ হিসেবে কিছু কিছু দ্রব্য ও গুহাবাসী মানুষের রেপ্লিকাও রাখা হয়েছে।

8
গুহা জীবন

ওসব খুঁজে পেতে ৫০ ও ৬০-এর দশকে মালয়েশিয়ায় প্রত্ন-অনুসন্ধান চালানো হয়। সারওয়াক এলাকার নিআসহ বিভিন্ন গুহাতে বিভিন্ন উপাদান প্রত্নতাত্ত্বিকরা আবিষ্কার করেন। এ থেকে ধারণা করা হচ্ছে অস্ট্রেলিয়া, পাপুয়া নিউগিনি ও আন্দামানের প্রাচীন উপকরণের সাথে এসবের সাদৃশ্য রয়েছে। উদ্ধারকৃত নানা উপাদানের সূত্রেই গবেষকরা বলেছেন এত প্রাচীনত্বের কথা। প্রত্ন-মালয় বলতে আমরা যা বুঝি এ-ধারার সূচনা হয়েছে খ্রিস্টপূর্ব ১০০০ বছর আগে। পর্যায়ক্রমে এর সাথে নানা জাতিগোত্রের ধারাও মিশেছে। প্রত্ন-মালয়ের উৎস হিসেবে চীনের ইউনানকে বিবেচনা করা হয়। ইউনান থেকে প্রোটোমালয় জাতির উৎপত্তি বলে নৃতাত্ত্বিকরা মনে করেন। সে সময় মেকং নদী দিয়ে নাবিকরা মালয় উপদ্বীপে যাতায়াত করত। তারা ধান উৎপাদন করত এবং তাদের মূল খাদ্য ছিল ভাত। ফলে, এসব অঞ্চলে ওই খাদ্য সংস্কৃতির বিকাশ সাধনে এ জাতিগোষ্ঠীর ভূমিকা রয়েছে। স্বভাবত, বিভিন্ন দিক থেকে আসা নৃগোষ্ঠীর মধ্যে আন্তঃসম্পর্ক সূচিত হয়। সম্প্রতি নৃতাত্ত্বিকদের গবেষণায় এমন সমর্থনও রয়েছে। লোহা ও তাম্র যুগে শ্যাম, কম্বোডিয়াও ভিয়েতনাম থেকেও কিছু লোকের এখানে আগমন ঘটে। অনিবার্যভাবে বিভিন্ন সংস্কৃতির মিশ্রণ ঘটেছে। সেভাবেই গড়ে উঠেছে মালয়দ্বীপপুঞ্জ। সে-সময় থেকেই মালয়েশিয়া ছিল সামুদ্রিক বাণিজ্যের ক্রসরোড। এ কারণে এখানে মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, প্রাচ্য, জাভা ও চীনা লোকজন নিয়মিত আসা-যাওয়া করত। মালয় জাতির বিকাশে আগত জাতিগোষ্ঠীর সংমিশ্রণকে স্বীকার করতেই হয়।

9
নৌযানের রেপ্লিকা

দ্বিতীয় ধাপে আছে মালয় কিংডম গ্যালারি। যেখানে পঞ্চদশ শতকে মালাক্কায় রাজকীয় শাসনাবলি, মশলার বাণিজ্য-বিপণন এবং সালতানাতের ইতিহাস প্রদর্শিত হয়েছে। এ গ্যালারিতে মূলত সুলতানি শাসনামলের ইতিহাস এবং বর্তমান মালয়েশিয়ার একটি সংযোগ সূত্র দেখানো হয়েছে। ভূরাজনৈতিকভাবে একটু সুবিধায় মালয়েশিয়ার অবস্থান। ফলে, সমুদ্রপথে যেকোনো দিক থেকে মালয়েশিয়াতে প্রবেশ করা যায়। রাজনৈতিক ঐতিহ্যে এ-ভূখণ্ড অত্যন্ত বৈচিত্র্যময় উত্তরাধিকার বহন করে। মালয় উপদ্বীপে হিন্দু ও বৌদ্ধ শাসন তারপর মুসলিম শাসন এবং ক্রমান্বয়ে পর্তুগিজ, ডাচ ও ব্রিটিশ উপনিবেশ প্রতিষ্ঠিত হয়। এছাড়া জাপানিজরাও সাম্রাজ্য বিস্তার করেছিল। বর্তমান মালয়েশিয়ার জনগোষ্ঠীর অধিকাংশই ইসালামি ঐতিহ্যের অংশীদার। পঞ্চম ও ষোড়শ শতকে মালাক্কা দ্বীপের মধ্য দিয়ে ইসলামের যাত্রা শুরু হয়। এ থেকে মালয়েশিয়াতে ইসলামের বিস্তৃতি ঘটে। মালাক্কা দ্বীপে বিশেষত সুলতান ইসকান্দার শাহ-র আমলে যে ইসলাম ধর্মের প্রসার ঘটে। অনেক লোকই সে সময় ধর্মান্তরিত হয়। ওই সময়ে বাণিজ্যে মালাক্কার পরিচিতি বিস্তৃত হতে থাকে। ভৌগোলিক কারণে মালাক্কা হলো মালয়েশিয়ার প্রবেশদ্বার। এখানে ইসলামের বিকাশ সাধিত হলে বিভিন্ন দেশের মুসলিম নাবিক ও ব্যবসায়ীরা মালাক্কায় আগমনে উৎসাহ বোধ করে। মশলার টানে তারা আরও বেশি আকৃষ্ট হয়। এর ফলে মালাক্কা ও মালয়েশিয়ার অন্যান্য অঞ্চলেও ইসলামের প্রসার ও প্রচার ঘটে। এ গ্যালারিতে মালয় উপদ্বীপের সংগ্রাম ও সুলতানদের ক্ষমতা গ্রহণের কিছু চিত্রও প্রদর্শিত হয়েছে। এ-কিংডমের প্রতিষ্ঠা সম্পর্কে একটি ফলকে বর্ণনা দেওয়া হয়েছে :

The early Malay kingdoms in the Peninsula were influenced by other states that arose in the nearby region. Chinease sources mention a well-known kingdom in Indochina called Funan, which existed from the thired century AD in the Mekong Vally in modern southern Cambodia, close to modern Vietnam. Funan developed in to the biggest empire in Indochina in the early centuries AD, with a capital called Vyadhapura and a port city Oc-Eo. Artefacts discovered at the site of Oc-Eo show that the port was visited by merchants from Rome, Other countries around the Mediterranean, India, and also from parts of the Malay Archipelago. Another wellknown kingdom was Champa, which lasted from late in the 2nd century to early in the 19th, in what is now central Vietnam. Early in its existence appears in the chinease record as ‘Lyn Yi’.


১১টি রাজ্য নিয়ে ১৯৪৮ সালে ফেডারেল রাষ্ট্র গঠিত হয়। দেশটি ১৯৫৭ সালে স্বাধীনতা লাভ করে। ১৯৬৩ সালে ফেডারেল মালয়েশিয়াতে আরও দু-টি রাজ্য—সাবা সারওয়াক ও সিঙ্গাপুর অন্তর্ভুক্ত হয়। কিন্তু ১৯৬৫ সালে আবার সিঙ্গাপুর আলাদা রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে।


তৃতীয় হলো কলোনিয়াল গ্যালারি। এ-গ্যালারিতে রয়েছে মালয়েশিয়াতে পরপর চারটি উপনিবেশ প্রতিষ্ঠার ধারাবাহিক উপস্থাপন ও বিভিন্ন উপকরণ। পর্তুগিজরা যে নৌযানে করে মালাক্কা দ্বীপে আগমন ও প্রবেশ করে এর একটি রেপ্লিকা রাখা হয়েছে। এছাড়া সে আমলে ব্যবহৃত অস্ত্রসহ বিভিন্ন উপাদান প্রদর্শিত হয়েছে। গ্যালারি দেখে দেখে থেকে বের হওয়ার পথে লক্ষ করি গেটের মতো ইট-সিমেন্টের কাঠামো। প্রথমে বুঝি নি তা গেট কি না। আবার ঘরের মধ্যে গেট কিভাবে বসানো যায়। উপরের দিকে ছাদস্পর্শিত ও দু-পাশে দেয়ালে লাগানো বিশাল এক কাঠামো। এ ফটক এখানে কিভাবে যে স্থাপন করা হলো, তা দেখে অবাক হই। এটি মূলত মালাক্কায় পর্তুগিজদের নির্মিত একটি ফটক, জাদুঘরের এ গ্যালারিতে প্রতিস্থাপন ও বসানো হয়েছে।

10
পর্তুগিজদের নির্মিত ফটক

১৫১১ সাল থেকে মালয়েশিয়ায় উপনিবেশের বিস্তার—পর্তুগিজ, ডাচ, ব্রিটিশ ও জাপানিদের উপনিবেশ তৈরির চিহ্ন এবং সেই থেকে বর্তমান মালয়েশিয়া পর্যন্ত ইতিহাসের পর্বান্তর লক্ষ করি। কিভাবে পর্তুগিজরা মালাক্কাতে তাদের উপনিবেশ স্থাপন করেছিল। একই সাথে যুদ্ধ ও হিংসাত্মক ঘটনাবলি এবং সুলতানি শাসনের পরাজয়ের কারণ আমরা জেনে নিতে পারি এ গ্যালারি দেখে।

11
পর্তুগিজ শাসন প্রতিষ্ঠার চিত্রকর্ম ও বিবরণ

চতুর্থ গ্যালারি হলো আধুনিক মালয়েশিয়া। স্বাধীন মালয়েশিয়ার বিকাশ ও ধারাবাহিক উন্নয়ন আমরা দেখে নিতে পারি। গ্যালারিতে মালয়েশিয়ার স্বাধীনতা প্রাপ্তি, রাজনৈতিক বিভিন্ন পর্ব, কাঠামোবদ্ধ হওয়া, বিকাশমান উন্নয়ন ইত্যাদি প্রদর্শিত হয়েছে। এছাড়া মালয়েশিয়ার জনসাধারণের উৎপাদন সম্পর্ক, বিয়েসহ সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, কৃষি, শিকার, প্রাত্যহিক জীবনযাত্রা প্রভৃতির দৃষ্টান্ত এখানে দৃশ্যমান করা হয়েছে। এখানে স্থান পেয়েছে মালয়েশিয়ার প্রাকৃতিক সম্পদ, প্রাত্যহিক জীবন, ঘর-গেরস্থালির কিছু তৈজসপত্র। এছাড়াও দেখি মালয়েশিয়ার স্বাধীনতা অর্জনের ইতিহাস, উপনিবেশ বিরোধী সংগ্রাম, কমিউনিস্ট রাজনীতির উত্থান ও পতন এবং বর্তমান মালয়েশিয়ার রূপান্তর ইত্যাদি। লক্ষণীয়, ১১টি রাজ্য নিয়ে ১৯৪৮ সালে ফেডারেল রাষ্ট্র গঠিত হয়। দেশটি ১৯৫৭ সালে স্বাধীনতা লাভ করে। ১৯৬৩ সালে ফেডারেল মালয়েশিয়াতে আরও দু-টি রাজ্য—সাবা সারওয়াক ও সিঙ্গাপুর অন্তর্ভুক্ত হয়। কিন্তু ১৯৬৫ সালে আবার সিঙ্গাপুর আলাদা রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে।

12
স্বাধীন মালয়েশিয়া ঘোষণার আলোকচিত্র

জাদুঘরের গ্যালারি দেখতে দেখতে একটি জায়গায় এসে থমকে দাঁড়াই। একজন কমিউনিস্ট নেতার প্রতিকৃতি ও তার দণ্ডাদেশের বর্ণনা। ইতিহাস যা বলে—একসময় মালয়েশিয়ায় কমিউনিস্টরা খুব শক্তিশালী ছিল। দল হিসেবে মালয়েশিয়ার কমিউনিস্ট পার্টি বা কমিউনিস্ট পার্টি অব মালয়েশিয়া (সিপিএম) নামে পরিচিত। উপনিবেশের বিরুদ্ধে কমিউনিস্টরা বিদ্রোহ করেছে এবং ওই আন্দোলনে অনেকে জীবন দিয়েছে। কিন্তু নিয়তি ছিল সবসময়ই তাদের বিপক্ষে। বিশেষত ব্রিটিশ উপনিবেশের বিপক্ষে গেরিলা নেতা চি পেং-এর নেতৃত্বে মালয়েশিয়ার কমিউনিস্ট পার্টি কার্যকর ভূমিকা রাখে। মালয়েশিয়াতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় শুরু হওয়া এ কমিউনিস্ট আন্দোলন ষাটের দশক পর্যন্ত সক্রিয় ছিল। সেসময় প্রতিবেশী দেশগুলোতেও কমিউনিস্ট পার্টিগুলো ছিল তৎপর। ফলে, মালয়েশিয়াতেও বামপন্থি আন্দোলন ছিল প্রবল।

13
একজন কমিউনিস্ট বিদ্রোহীর লাশ বহন করছে ব্রিটিশ বাহিনী

১৯৫৭ সালে স্বাধীন মালয়েশিয়া প্রতিষ্ঠার পর কমিউনিস্ট আন্দোলন কিছুটা স্তিমিত হয়ে আসে। তথ্যে জানা যায়, দেশ স্বাধীন হলেও ওই মুক্তি আন্দোলনে কামিউনিস্ট পার্টির গুরুত্বপূর্ণ অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়া হয় নি। এ ছাড়া তাদের ওপর দমননীতিরও সমাপ্তি ঘটে নি। ১৯৪৮ সাল থেকে এ অঞ্চলে সামাজিক ন্যায়বিচার ও স্বাধীনতার জন্য বামপন্থিরা সংগ্রাম করে এসেছে। কিন্তু যে মুক্তির জন্য তারা প্রাণ দিয়েছে, তা বাস্তবায়ন হয় নি। অন্যদিকে ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়াসহ বিভিন্ন দেশে কমিউনিস্ট আন্দোলন জোরদার ছিল বলে মালয়েশিয়ার কমিউনিস্ট আন্দোলন দমনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ কয়েকটি পশ্চিমা রাষ্ট্রও শক্তি জোগায়। বিপরীতে কমিউনিস্টরা তাদের প্রচলিত আন্দোলন অব্যাহত রাখে। প্রসংগত, উপনিবেশ বিরোধী সংগ্রামে সিপিএম ব্রিটিশ বাহিনীর সাথে সরাসরি যুদ্ধে লিপ্ত হয়। বিদ্রোহী গেরিলারা ১৯৫২ সালে ব্রিটিশ হাই কমিশনারকে হত্যা করে। এ হত্যাকাণ্ডে স্বাধীনতা আন্দোলনে নতুন মাত্রা যুক্ত হয়। স্বাধীনতার পর ষাটের দশকে সিঙ্গাপুরের স্বাধীনতা ও ভিন্ন আঙ্গিকে মালয়েশিয়ার বিনির্মাণকে সিপিএম সমর্থন করে নি। ওই সময় রাষ্ট্রীয় চাপ ও নির্যাতনের প্রতিবাদে তারা সর্বাত্মক বিদ্রোহের ডাক দেয় এবং সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। এ সময়ে মালয়েশিয়াতে জাতিগত সংঘাতও প্রবল হয়ে ওঠে। ষাটের দশকে জরুরি অবস্থা চলাকালে পুনরায় বিদ্রোহের আহ্বান জানায় মালয়েশিয়ার কমিউনিস্ট পার্টি। রাষ্ট্রীয় প্রতিরক্ষা বাহিনির সাথে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে। ঘাত-প্রতিঘাতের পর একসময় তাদের নিরস্ত্র করা সম্ভব হয়। ওই সময় কোয়ালিশন প্রক্রিয়ায় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে কয়েকটি আসনেও কমিউনিস্টরা জয়ী হয়।

অনেক ঘটনার পর মালয়েশিয়ার প্রথম প্রধানমন্ত্রী বামপন্থিদের উপনিবেশবিরোধী সন্ত্রাসবাদী ধারাকে স্বীকৃতি প্রদান করেন। তিনি তাদের নিরস্ত্রীকরণের মধ্য দিয়ে মূল ধারায় ফিরিয়ে আনতে সমর্থ হন। আবার ৭০ ও ৮০-র দশকে বামপন্থিদের ব্যাপক আন্দোলন মালয়েশিয়ার রাজনীতিকে প্রভাবিত করে। পুনরায় সশস্ত্র আন্দোলনের ডাক দেয় সিপিএম। কিন্তু সিপিএমও দ্বিধাবিভক্ত হয়ে অন্তর্দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে। এর একটি অংশ সমর্থন করে ইউএমএনও দলকে। অন্যদিকে আরেকটি অংশ বং কি চক-এর নেতৃত্বে আত্মসমর্পণ করে। আমরা লক্ষ করি, উপমহাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের সাথে মালয়েশিয়ার বাম আন্দোলনের সাদৃশ্য রয়েছে। অনেক উত্থান পতনের পর ১৯৮১ সালে ফলপ্রসূ আলোচনার মাধ্যমে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে আসেন মাহাথির মোহাম্মদ। ১৯৮৯ সালে শান্তিচুক্তির মাধ্যমে সশস্ত্র আন্দোলনের অবসান হয়। অন্যদিকে দমন-পীড়নের কারণে বিপ্লবী চরিত্রে কমিউনিস্টরা আর দাঁড়াতে পারে নি। এরপর মালয়েশিয়ার কমিউনিস্ট পার্টি সশস্ত্র আন্দোলন থেকে সরে আসে। উল্লেখ্য যে, ব্রিটিশ উপনিবেশের বিপক্ষে বামপন্থিদের সশ্রস্ত্র আন্দোলন জনগণ মেনে নিলেও স্বাধীনতার পর আর তা গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে নি। বিশ্বব্যাপী পরিবর্তন, মালয়েশিয়ায় পুঁজির ব্যাপক উত্থানে কমিউনিস্ট পার্টি রণকৌশলে রাজনীতির মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

সব মিলিয়ে অনন্য সুন্দর একটি জাদুঘর দর্শন হলো। ভালো লাগার পরও তৃষ্ণা রয়ে গেল অনেক। আমার ভাবনায় মালয়েশিয়ার এ জাতীয় জাদুঘর আরও সমৃদ্ধ হওয়ার কথা ছিল। আমি ব্যক্তিগতভাবে আরও বেশি আশা করেছিলাম। কারণ, মালয়েশিয়া এখন অর্থনৈতিকভাবে উন্নত একটি রাষ্ট্র। ঐতিহ্যগতভাবে অনেক জাতিগোষ্ঠীর সম্মিলনের একটি ভূমি। মালয়েশিয়া নৃতাত্ত্বিক ও ভাষিক বৈশিষ্ট্যে বৈচিত্র্যময় একটি দেশ। এ জাদুঘর সেসব উপাদানে আরও সমৃদ্ধ থাকার কথা। যা দেখেছি তা প্রতুল নয়। কৃষি ও প্রচলিত গ্রামের কোনো উপকরণও তেমন নেই। নতুন মালয়েশিয়াকে ভাবতে গিয়ে সেসব ঐতিহ্যের অনুপস্থিতি কি না জানতে পারি নি। উপাদান সংরক্ষণে কোনো দর্শন বা আইডিয়া কাজ করেছে কি না, তা জানারও সুযোগ ছিল না। কাঙ্ক্ষিত সে-উপকরণগুলো আর কোথাও আছে কি না, তাও আমার জানা নেই। এসব খুঁজে পেতে আরও গভীরে যেতে হবে—আরও দূরে। একটি কারণ জেনেছি—দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অব্যবহিত পরে মূল মিউজিয়াম ধ্বংস হয়ে যায়। ধ্বংসের পর এভাবেই তৈরি হয়েছে এ জাদুঘর। আপাতত জাতীয় জাদুঘর থেকে আমি আর আরিফ এবার চললাম বাংসার ভিলেজ-এর পথে।


১২ পর্বের লিংক

স্বপন নাথ

জন্ম ৪ মে ১৯৬৮; বড়লেখা, মৌলভীবাজার। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর, বাংলা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়; এমফিল, ভাষাবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

পেশা : শিক্ষকতা; উপপরিচালক (গবেষণা ও তথ্যায়ন), নায়েম, শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

প্রকাশিত বই :
প্রবন্ধ—
চিন্তা ও জগৎ : সাহিত্য সংস্কৃতি [প্রবাস প্রকাশনী, যুক্তরাজ্য ২০০৭]
কবিতার নন্দনবিশ্ব [অনিন্দ্য প্রকাশ, ঢাকা ২০১৭]
কথার বুনন [জিনিয়াস পাবলিকেশন্স, ঢাকা ২০১৯]
ছিন্ন কথামালা [জিনিয়াস পাবলিকেশন্স, ঢাকা ২০১৯]

কবিতা—
রৌদ্র ও বৃষ্টিতে মায়াহরিণ [ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ, ঢাকা ২০০৭]
জলৌকা চোখের চাতাল [ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ, ঢাকা ২০১০]
নির্জন বিচালির ডানা [কবি প্রকাশনী, ঢাকা ২০১৩]
নখের আউঠা [উৎস প্রকাশন, ঢাকা ২০১৪]
নানকার ধানবীজ [উৎস প্রকাশন, ঢাকা ২০১৫]
একলব্যের ছিন্ন আঙুল [নাগরী, সিলেট ২০১৬]
সংশয়ের বসতি [নাগরী, সিলেট ২০১৭]
গ্রাম বজ্রযোগিনী [জিনিয়াস পাবলিকেশন্স, ঢাকা ২০১৯]

ই-মেইল : rudro71@gmail.com