হোম ভ্রমণ মালয়েশিয়া ভ্রমণ : সামান্য দেখা

মালয়েশিয়া ভ্রমণ : সামান্য দেখা

মালয়েশিয়া ভ্রমণ : সামান্য দেখা
138
0
৪ পর্বের লিংক

পর্ব : ৫

‘One morning, as Gregor Samsa was waking up fromanxious dreams, he discovered that in bed he had beenchanged into a monstrous verminous bug. He lay on his armour-hard back and saw, as he lifted his head up a little, hisbrown, arched abdomen divided up into rigid bow-like sections. From this height the blanket, just about ready to slideoff completely, could hardly stay in place. His numerouslegs, pitifully thin in comparison to the rest of his circumference, flickered helplessly before his eyes.’ [F Kafka : The Metamorphosis]

বারবাসা থেকে হোপিং দ্বীপের দিকে যেতে আরেকটি সুন্দর দ্বীপ চোখে পড়ে। আমরা দূর থেকে দেখার চেষ্টা করি। বারবাসা সৈকত থেকে আসার পথে সমুদ্র চ্যানেলের জলে খানিকট দূরে থামল স্পিডবোট; থামলে তা আবার দেখি। চমৎকার একটি দ্বীপ। যেখান থেকে দেখে নিলাম প্রেগনেন্ট আইল্যান্ড। নাম শুনে প্রথমে অনেক কিছু ভেবেছি; কিন্তু সরল কাহিনি শুনে আর জটিল চিন্তা মাথা থেকে হারিয়ে যায়। মানুষের সৃজনশীলতার উদাহরণগুলো মানতেই হবে। এ নামকরণের ক্ষেত্রেও তা-ই। পৃথিবীতে এলাকা, ভূমি, বস্তু, ব্যক্তিনামের কত বাহার। কত যে মিথ, পুরাণ, রূপকথা প্রচলিত, তা কি আর বলতে হয়। সবকিছু বাদ রেখে মালয়েশিয়ানরা নাম রেখেছে প্রেগনেন্ট দ্বীপ। নামকরণের ক্ষেত্রে বস্তুর গঠন, বৈশিষ্ট্য ও জনপ্রতিক্রিয়া কাজ করে বলে শুনেছি। এখানেও এর প্রমাণ পেলাম। দূর থেকে দেখা দ্বীপের একটি পাহাড়ের গঠন ঠিক গর্ভবতী মায়ের মতো। ওই সাদৃশ্য দেখে না কি নাম রাখা হয়েছে প্রেগনেন্ট আইল্যান্ড।

1
প্রেগনেন্ট আইল্যান্ড

বারবাসা থেকে হোপিং দ্বীপে যেতে বেশি সময় লাগে নি। হোপিং জেটিতে নেমে অল্প জায়গা হাঁটলেই পাহাড়ের বনবনানী। যেতে যেতে শিলা হয়ে যাওয়া মাটি দেখে অবাক হতে হয়। সামনেই মূল জায়গায় প্রবেশের টিকেট কাউন্টার ও ছোট ছোট স্ন্যাকসের কয়েকটি দোকান। মিউজিকসহ নানা শব্দ মিলে জমজমাট পরিবেশ। এখানে রয়েছে জিও ফরেস্ট। এ দায়াং বানটিং জিও ফরেস্ট দেখে মালয়েশিয়ার প্রকৃতি ও গাছপালা নিয়ে আমার আগের ধারণা বদলে যায়। উঁচু পাহাড়ে উপরের দিকে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে হয়। সিঁড়িগুলো পরিবেশবান্ধব। সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামার সময় চারপাশে দেখা যায় প্রচুর বানর লাফাচ্ছে আর খেলাধুলা করছে। এ হাঁটার পথ মাটি কেটে সিমেন্ট বা কখনও এখানের পাথর দিয়ে তৈরি করা আছে। কিছু দূর উপরে ওঠে আবার সিঁড়ি দিয়ে নামতে হয় নিচের দিকে। একটু এগিয়েছি দেখি বানর দল এগিয়ে আসছে। রাস্তার চারপাশে বিশাল বিশাল গাছ পড়ে আছে, অনেক পুরনো বলেই আমার ধারণা। দেখে মনে হলো কেউ এখানে গাছ কাটাকাটি বা চুরি করে না।

বানরদলের কয়েকটি একেবারে কাছে এসে এলোমেলো দৌড়াচ্ছে আর লাফাচ্ছে। উপরে ওঠে আবার সিঁড়ি দিয়ে নামছি এমন সময় কখন যে আমার ব্যাগে টানাটানি করেছে একটি বানর, আমি টের পাই নি। নামছি আর দেখছি অসংখ্য বানর সিঁড়ি ও আশেপাশে বসে আছে, কতগুলো দৌড়াচ্ছে, লাফাচ্ছে। কারও হাতের খাবার নিয়ে চলে যাচ্ছে। বানরদলের পারিবারিক সদস্য, জোট দেখে সত্যিই অবাক। এ দৃশ্য সত্যিই উপভোগ্য ছিল। বানর সম্বন্ধে যাদের অভিজ্ঞতা নেই, তাদের ক্ষেত্রে এ দৃশ্য বোঝা মুশকিল। নিচের দিকে নামছি, তবে সামনে কী আছে তা জানা নেই। গাইডের কাছে জিজ্ঞাসায় জানতেও চাই নি। তাই নেমেই চলেছি। সবাই লাইন ধরে যাচ্ছে। গন্তব্য কোথায়, নিজে জানি না। নামছি, হঠাৎ করে চোখ আমার ঝলসে গেল। কয়েকজনের একটি দল দেখে মনে হলো ওরা চায়না থেকে এসেছে। দলে মেয়েদের সংখ্যাই বেশি। এর মাঝে একজনকে দেখে জলপরির মতো মনে হলো। পুতুলের মতো দেখতে। কারণ সদ্য জল থেকে উঠে এসেছে। সারা গায়ে খুব স্বল্প কাপড়। থাকলেও যা, না থাকলেও সমস্যা নেই। সৌন্দর্যের কি কোনো মাত্রা আছে? পাতলা দু-টুকরো কাপড় ওর গায়ে আর শরীরের সব অঙ্গ ও ভাঁজই দৃশ্যমান। টপ টপ করে জল ঝরছে শরীর থেকে। যেন জীবন্তু এক গ্রিক বা খাজুরাহের ভাস্কর্য হেঁটে যাচ্ছে। মুহূর্তেই জলপরিটা হারিয়ে গেল, তবে তার ছায়া মাথার কোষে জায়গা করে নিল অজান্তে। ক্যানভাসে রেখার মতো একটি স্পর্শ মাত্র। মুহূর্তেই উত্থান আবার পতন। এমন দৃশ্য সামনে না পড়লেই ভালো হতো। আমার নিয়ন্ত্রণহীন সময়ে আমি। এ হারানোর বেদনা পেয়ে হারানো নয়। ‘যদি হতো’ এমন অনুভূতির মাঝে ঘুরপাক খায় অবচেতনের কথাগুলো। তবে এ বেদনা স্থায়ী হয়ে গেল।

I miss the times when you were here,
Telling me to have no fear.
To hold my head up high and strong,
Add happy notes to my sad song.

I miss the way you look at me
As if I were too blind to see.
The path I’m on might hurt and scathe,
But all goes well if you just have faith.

I miss the sound of your sweet voice,
Through bitter times a saving noise
That told me what was right and wrong
But rang in my ears for far too long.



Then one day you never returned,
My tears so hot they almost burned.
Aware now about what I lack,
But crying and mourning won’t bring you back.

For me to let out what I need to say.
I can’t do much more than pray.
No longer am I weak; my heart’s quite strong
from adding a happy chorus to a sad, sad song.
[Dane Yule: Gone Forever]

প্রথম আমার চলার পথে ছন্দপতন হলো। আমি এরপর এগুতেই পারছিলাম না। মনে হলো বারবার ওর সাথে কথা বলে আসি, আবার ঘুরে দেখে আসি; কিন্তু পারি নি। স্মরণ করি ওহ! আমি তো বাঙালি মধ্যবিত্ত! কত যে মতলবের দোলাচল। তার জন্য হাহাকার বা মনের ভেতরে কামনার শিরশির তৈরি ছাড়া আর কী করা যায়। কবির মতো নিজের ভেতর কথাগুলো মনে আসে।

তোমার শরীরে তুমি গেঁথে রাখো গান
রাত্রিকে করেছো তাই ঝঙ্কারমুখর
তোমার সান্নিধ্যেও অপরূপ ঘ্রাণ
অজান্তে জীবনে রাখো জয়ের স্বাক্ষর।
[সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় : তুমি]


আমাদের দেখা দায়াং বানটিং জিওফরেস্ট মার্বেল পাথরের জন্য বিখ্যাত। এখানে রূপান্তরের [Metamorphic] মাধ্যমে গঠিত হচ্ছে শিলা।


চলতে চলতে নিচে নেমে জলাধারের দৃশ্য দেখে তো অবাক। এত চমৎকার একটি স্থানের দর্শন পাব ভাবি নি। কিন্তু আমার মাথা চক্কর দিয়ে খানিকটা হ্যাঙ হয়ে আছে। চারদিকে বন-জঙ্গলে পূর্ণ এখানে পাহাড় ঘেরা এ দ্বীপের মাঝখানে রয়েছে বিশাল এক লেক। চারপাশে উঁচু উঁচু পাথরের পাহাড় আর মাঝখানে স্বচ্ছ জলের লেক। যে জলাধারে ছোট ছোট যানে ঘুরে বেড়ানো ও সাঁতারের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। কেউ এখানে রক্ষিত বিশেষ নৌকায়ও ভ্রমণ করতে পারে। এ জলাধারের জল খুবই স্বচ্ছ, শীতল ও পরিষ্কার। ঘাটের সাথে সংযোগ রেখে এখানে একটি ভাসমান জেটির মতো অবস্থান তৈরি করে দেওয়া আছে। যাতে সহজেই পর্যটকরা সাঁতারের পর কাপড় বদলাতে পারে। দাঁড়াতে ও বসতে পারে। ফিরে আসতে ইচ্ছে করে না। অসাধারণ এক সুন্দর জায়গা। সারাক্ষণ বসে এখানে প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগে বিরক্ত লাগবে না। সত্যি অভিভূত হওয়ার মতো এক স্থান। কিসের সৈকত আর কত কি। এখানে আনকোরা সাতারুদের জন্য রয়েছে অনেক সহায়ক উপাদান। মনে হলো এ কৃত্রিম দ্রব্যাদি দিয়ে বরং এ জলাধারের সৌন্দর্যই নষ্ট করা হয়েছে। তবে নাগরিকদের তো এগুলো না হলে চলে না।

এখানের মাটি শিলীভূত হতে হতে পাথরের মতো হয়ে গেছে। জানা গেল, মাটি শিলীভূত হতে হতে একটি নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় চুনাপাথর এবং আবার মার্বেল পাথরে পরিণত হচ্ছে। এটা অনন্য এক রূপান্তর, যা কোথাও এমন দেখা যায় না। আমাদের দেখা দায়াং বানটিং জিওফরেস্ট মার্বেল পাথরের জন্য বিখ্যাত। এখানে রূপান্তরের [Metamorphic] মাধ্যমে গঠিত হচ্ছে শিলা। এ রূপান্তর বৈশিষ্ট্য খুব কম স্থানেই পাওয়া যায়। তাপ চাপ ও রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফলে এ ধরনের রূপান্তর প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় ভূপ্রকৃতিতে। যা হোক লংকাউই-এর সবখানে লক্ষ করি মাটির রূপান্তর। তবে কোথাও বনভূমির কমতি নেই। এ মাটির বৈশিষ্ট্য দেখে অবাক হওয়ারই কথা। তার মধ্যে আবার বৃক্ষরাজি, বাগান, সংরক্ষিত বনাঞ্চল।

3
রূপান্তরিত শিলা

মালয়েশিয়াতে পাললিক ও কঠিন এ দুই বৈশিষ্ট্যের শিলা পাওয়া যায়। দায়াং বানটিং কঠিন শিলা দ্বারা গঠিত। এ শিলা দিয়ে গড়ে ওঠা শিল্প কারখানায় মালয়েশিয়া লাভবান হচ্ছে প্রচুর। ফলে, মালয়েশিয়ার জিওফরেস্টগুলোতে ভূবৈচিত্র্য ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ করা হচ্ছে। সেগুলোতে বিভিন্ন ধরনের পাথর ছাড়াও রয়েছে বৃক্ষ ও খনিজ উপাদান। বলে রাখা ভলো লংকাউইসহ মালয়েশিয়ার সর্বত্রই মাটির বিশেষ বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এসব বিষয়ে চমৎকার অনেক গবেষণাও হয়েছে। এ থেকে লংকাউই ও মালয়েশিয়ার শিলা গঠনের বৈশিষ্ট্য বিভাজন ও শনাক্ত করা যায়। লক্ষণীয়, পুরো মালয়েশিয়া যেন পাথরের ভূমি। আর এ পাথরের ওপর বৈচিত্র্যের সমাহার ও সবুজের সমারোহ। দেখে মনে হলো তারা এ মাটিকে অন্তর দিয়ে ভালোবেসেছে। তারা জানে ভালোবাসায় পাথরেও জীবনের আহ্বান শোনা যায়।

একবার তুমি ভালোবাসতে চেষ্টা কর—
দেখবে নদীর ভিতরে, মাছের বুক থেকে পাথর ঝরে পড়ছে
পাথর পাথর পাথর আর নদী-সমুদ্রের জল
নীল পাথর লাল হচ্ছে, লাল পাথর নীল
একবার তুমি ভালোবাসতে চেষ্টা কর।
[শক্তি চট্টোপাধ্যায় : একবার তুমি]

4
ফসিল হওয়া বৃক্ষ

এর মধ্যে ফসিল হয়েছে কত গাছ। স্বচ্ছ জল, গাছ আর পাথরের ঢেউ অসাধারণ। এ পাহাড়ের চুনাপাথর নিয়েও মিথকাহিনি প্রচলিত রয়েছে। আমাদের দেশের বনাঞ্চল ও এ জিওফরেস্ট-এর ব্যবধান রয়েছে। বলার দরকার হয় না যে, লংকাউই-এর সকল ফরেস্টই খুব ন্যাচারাল। প্রকৃতিগতভাবে যে বৃক্ষ, বন তৈরি হয়েছে, তা সবই রক্ষিত আছে। এখানের বনাঞ্চল থেকে কেউ এ বিশাল বিশাল বৃক্ষগুলো কেটে নেয় না। আমাদের দেশের কোনো বন এলাকায় এত পুরনো বৃক্ষ সংরক্ষণে রাখা বেশ কঠিন। এক্ষেত্রে দু-দেশের গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য হলো, আমরা বনজ গাছগুলো কেটে বনায়নের নামে এসব এলাকায় শাল, সেগুন, একাশিয়া, ইউক্যালিপটাস, মেনেজিয়াম, মেহগনি গাছ লাগিয়ে বনায়ন করেছি। এসব ক্ষেত্রে মূলত ইকোব্যালেন্স নষ্ট করা হয়েছে। বনের সাধারণ বৈশিষ্ট্য ধ্বংস করা হয়েছে। আমরা মাটি ও স্থানীয় লতাগুল্মের বৈশিষ্ট্য খেয়াল করি নি বা গুরুত্ব দিই নি। মালয়েশিয়াতে নির্দিষ্ট এলাকা ছাড়া তা করা হয় নি। তারা অর্থকেন্দ্রিক চিন্তার বদলে ইকো-ফরেস্টের দিকে নজর রেখেছে বেশি। ফলে, প্রকৃতিগতভাবে যে বন আছে সেটাই সেভাবে রয়েছে। যেখানে পর্যটন এলাকা নির্দেশ করা আছে, সেখানেও এ পরিবেশবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে। আলাদা কোনো বনায়ন করা হয় নি। শুধু মানুষের চলাচলে যাতে বনভূমি নষ্ট না হয়, সকল ভূমিকে সেভাবে সাজানো ও রক্ষা করা হয়েছে। একইসাথে পাহাড়ও কাটা হয় নি। শুধু চলাচলের সুবিধার্থে কিছু পথঘাট তৈরি করা হয়েছে।

জলাধার থেকে ফিরে আসতে মন চায় নি। কিন্তু আমাদের অন্য কোথাও যেতে হবে। কুয়া জেটির দিকে রওয়ানা হওয়ার আগে হোপিং আইল্যান্ডের ঘাটে কিছুক্ষণ বিরতি গ্রহণ করি। আর শরীর চলছে না। ওই সময় আমাদের দলের এক সদস্য চমৎকার কয়েকটি লোকগীতি শোনালেন। বিরতির পর আমরা রওয়ানা হলাম কুয়া জেটির দিকে। হোপিং দ্বীপ থেকে আমরা কুয়া জেটির দিকে রওয়ানা হওয়ার ১৫ মিনিট পর আমাদের এক সদস্য বললেন, তার পার্সপোর্টসহ হ্যান্ডব্যাগ খুঁজে পাচ্ছেন না। কোথায় ফেলেছেন তা বলার কথা নয়। তবুও সকলের প্রশ্নবানে তিনি জর্জরিত। সকলেই ভাবছেন পাসপোর্ট খোয়ানোর বিষয়টি খুব বিপজ্জনক। আবার ঘটনাটি মালয়েশিয়াতে। এ দুঃশ্চিন্তায় তিনি খুবই ভেঙে পড়েছেন। আমি নীরবে বসে তা লক্ষ করছিলাম। সকলেই টেনশনের মধ্যে পড়ে গেল। তা হওয়ারই কথা। কারণ, এ নিয়ে বিশাল এক জটিলতা তৈরি হবে। অবশেষে যদি না পাওয়া যায় তবে নতুন পাসপোর্ট সংগ্রহ করতে হবে। তাও এক জটিল বিষয়। এ নিয়ে জল্পনা কল্পনা শুরু হলো। আসলেই এক টেনশন। যিনি পাসপোর্ট হারিয়েছেন, তিনি কথাই বলতে পারছেন না। তার নাক দিয়ে টেনশনের শ্লেষা বের হওয়া শুরু হলো।


ওই সীমানার মধ্যে শুধু বিদেশি পর্যটকরাই প্রবেশ করতে পারবেন। মালয়দের এখানে প্রবেশ নিষেধ। এটি করা হয়েছে এ জন্য, যাতে পর্যটকরা নির্বিঘ্নে সূর্যস্নান করতে পারে।


কুয়া জেটিতে নামার পর দু-জনকে ঠিক করা হলো, যারা আবার পাসপোর্টের সন্ধানে যাবেন বারবাসা সৈকত ও হোপিং দ্বীপে। যেসব স্থানে আমরা ঘুরেছিলাম। স্পিডবোট নিয়ে ওসব স্থানে যাবে আবার ফিরে আসবে। আমরা ততক্ষণ অপেক্ষা করব কোথাও। সবাই খুব শঙ্কিত—এখন কী করা এই ভেবে। সবার ভেতরে টান টান উত্তেজনা। প্রায় এরকমই কথা হচ্ছে, এখন কুয়ালালামপুর বাংলাদেশের অ্যামবেসিতে যোগাযোগ করা হবে। তারপর যা হয় দেখা যাক। আপাতত ভ্রমণের সব প্রোগ্রাম বাতিল। এমন আলোচনা ও জটলার মধ্যে দূর থেকে চিৎকার শোনা গেল। লক্ষ করছি একটা লোক দৌড়ে আমাদের জমায়েতের দিকে আসছে। আমাদের মধ্যে কে একজন বাংলায় চিৎকার করে বলল—পাওয়া গেছে। সবাই দৌড়ে গেল ওই লোকটির দিকে। সে আর কেউ নয়— মোহাম্মদ সুয়ামি। যে বারবাসা যাবার সময় আমাদের স্পিডবোটের ড্রাইভার ছিল। সে বলল তার হাতে একটি পাসপোর্ট আছে, যা তার বোটের মধ্যেই ছিল। বারবাসা যাবার পর সুয়ামির বোটের ইঞ্জিনে সমস্যা থাকায় হোপিং এর দিকে আর আসে নি। তখন আমরা অন্য বোটে ফিরেছিলাম। সুয়ামি ওই পাসপোর্ট ফিরিয়ে দেয়ার জন্য শুধু স্পিডবোট নিয়ে একাই বারবাসা থেকে কুয়াতে ফিরে এসেছে। এ মুহূর্তে তাকে অসামান্য এক মানুষ মনে হলো আমার। ওই সময় আমি তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে জড়িয়ে ধরলাম। তার চোখে মুখে হাসির ঝিলিক। কারণ, এরকম একটি চমৎকার কাজ সে করতে পেরেছে।

5
মোহাম্মদ সুয়ামি, সততার দৃষ্টান্ত

জটিলতার অবসানে আমরা ছুটলাম ব্লাকস্যান্ডবিচের দিকে। মালয়েশিয়ার একটি বিখ্যাত সমুদ্র সৈকতের নাম ব্লাবস্যান্ড। এ সৈকতটি খুব বেশি বড় নয়। কিন্তু এর বৈশিষ্ট্য হলো বালু সবসময় কালো হয়ে যায়। কেন কাল হয়ে ওঠে তা জানা যায় না। আমরা জানি না। এটা না কি আর পৃথিবীর কোথাও নেই। সব সৈকতের বালু একই রকমের হয় একটু সোনালি, বা কখনও সাদাটে। কিন্তু এখানে না কি সাদা বা সোনালি বালু এনে দিলেও আবার কালো হয়ে যায়। আমরা তাই দেখলাম।

6
ব্লাকস্যান্ড বিচ

অনন্য এ সৈকত দেখে সামনে আরেকটি সৈকতের দিকে আমরা গেলাম। এ তেনজাংরো বিচে বলিউড, টালিউড, থাই মুভির শুটিং হয়ে থাকে। এ সৈকতে সংরক্ষণের একটি বিষয় আছে। যেখানে লাল পতাকার সীমারেখা নির্দেশ করা রয়েছে। ওই সীমানার মধ্যে শুধু বিদেশি পর্যটকরাই প্রবেশ করতে পারবেন। মালয়দের এখানে প্রবেশ নিষেধ। এটি করা হয়েছে এ জন্য, যাতে পর্যটকরা নির্বিঘ্নে সূর্যস্নান করতে পারে। বুঝতে পারলাম যে, সংরক্ষিত এলাকায় বিদেশি পর্যটকরা সংক্ষিপ্ত পোশাকেই স্নান করতে নামে। তাদের জন্য স্বচ্ছন্দ, নিরাপদ একটি এলাকা গড়ে তোলা হয়েছে। এখান থেকে থাইল্যান্ড সীমানার ছোট ছোট দ্বীপের মতো কিছু দেখা যায়। বুঝলাম থাইল্যান্ড কাছেই রয়েছে।

7
তেনজাংরো বিচে আয়েশি যুবক

এসময়ই লক্ষ করি চীনা তরুণ-তরুণীর এক জুটি ঢেউয়ের মধ্যে লাফালাফি করছে। ফেরার সময় লক্ষ করি সৈকতের কাছে ছোট একটি ছাউনিতে এক যুবক ঝুলন্ত জালের মধ্যে শুয়ে আয়েশ করছে। তার চোখজোড়া ব্যস্ত মোবাইল সেটের স্ক্রিনে। বিষয়টি তেমন কিছু নয়, কিন্তু ওই সময়ে জালের মধ্যে শুয়ে থাকা তার আয়েশি ভাবটি আমার কাছে ছিল আনন্দের। তাকে জানতে চাইলাম এ জালের মধ্যে শুয়ে থাকা বিশ্রামের রীতিকে মালয় ভাষায় কী বলা হয়। সে বলতে পারে নি বা এমনও হতে পারে সে আমার কথা বুঝে নি।


[চলবে]

 

স্বপন নাথ

জন্ম ৪ মে ১৯৬৮; বড়লেখা, মৌলভীবাজার। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর, বাংলা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়; এমফিল, ভাষাবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

পেশা : শিক্ষকতা; উপপরিচালক (গবেষণা ও তথ্যায়ন), নায়েম, শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

প্রকাশিত বই :
প্রবন্ধ—
চিন্তা ও জগৎ : সাহিত্য সংস্কৃতি [প্রবাস প্রকাশনী, যুক্তরাজ্য ২০০৭]
কবিতার নন্দনবিশ্ব [অনিন্দ্য প্রকাশ, ঢাকা ২০১৭]
কথার বুনন [জিনিয়াস পাবলিকেশন্স, ঢাকা ২০১৯]
ছিন্ন কথামালা [জিনিয়াস পাবলিকেশন্স, ঢাকা ২০১৯]

কবিতা—
রৌদ্র ও বৃষ্টিতে মায়াহরিণ [ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ, ঢাকা ২০০৭]
জলৌকা চোখের চাতাল [ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ, ঢাকা ২০১০]
নির্জন বিচালির ডানা [কবি প্রকাশনী, ঢাকা ২০১৩]
নখের আউঠা [উৎস প্রকাশন, ঢাকা ২০১৪]
নানকার ধানবীজ [উৎস প্রকাশন, ঢাকা ২০১৫]
একলব্যের ছিন্ন আঙুল [নাগরী, সিলেট ২০১৬]
সংশয়ের বসতি [নাগরী, সিলেট ২০১৭]
গ্রাম বজ্রযোগিনী [জিনিয়াস পাবলিকেশন্স, ঢাকা ২০১৯]

ই-মেইল : rudro71@gmail.com