হোম বই নিয়ে দ্য মিনিস্ট্রি অব আটমোস্ট হ্যাপিনেস : আনন্দমঠ থেকে পরমানন্দের মন্ত্রণালয়ের দিকে যাত্রা

দ্য মিনিস্ট্রি অব আটমোস্ট হ্যাপিনেস : আনন্দমঠ থেকে পরমানন্দের মন্ত্রণালয়ের দিকে যাত্রা

দ্য মিনিস্ট্রি অব আটমোস্ট হ্যাপিনেস : আনন্দমঠ থেকে পরমানন্দের মন্ত্রণালয়ের দিকে যাত্রা
1.29K
0

অরুন্ধতী রায়ের The Ministry of Utmost Happiness প্রকাশিত হবার পর দেশ, বিদেশ ও ভারতের খ্যাত, অখ্যাত পত্র-পত্রিকায় যে আলোচনা এসেছে তাতে এই বইয়ের প্রতি আমার আগ্রহী হবার তেমন কোনো কারণ ছিল না। সেই আলোচনায় অরুন্ধতী গ্লামারাস নায়িকা। তিনি ১৯৯৭ সালে তার প্রথম ফিকশন The God of Small Things-এর জন্য বুকার পেয়েছেন। সেই বইয়ের বিক্রি প্রায় আট মিলিয়ন। আর তারপর বিশ বছর পর দ্বিতীয় উপন্যাস। এই সমস্ত আলোচনায় তার বিগত বিশ বছরের জার্নিটা কেমন যেন লুকানো! কোথাও নেই। অরুন্ধতীর মতো টাইগ্রেসকে ইন্ডিয়ান মিডিয়া বিশ বছর পর একখানা উপন্যাস লেখিকা হওয়ার বিরল সম্মান ছাড়া আর কিছুই দেয় নি। এমন উপন্যাস একটা দেশে কখন, কেন লিখিত হয় সেই সমস্ত বিষয় তারা আড়াল করেছে সুনিপুণভাবে। এই উপন্যাস লিখতে পারার জন্য তিনি অনেকগুলো নন-ফিকশন লিখেছেন। এই নন-ফিকশনগুলো এই উপন্যাস লেখার প্রস্তুতি মূলত। কিন্তু সমস্ত জায়গা প্রচারিত হয়েছে, একমাত্র ফিকশন লেখাই যেন অরুন্ধতি রায়ের জীবন, তার জীবন উদ্দেশ্য, লক্ষ্য। নায়িকারা যেমন একটা হিট ছবি করার পর, অনেকগুলো বক্স-ফ্লপ সিনেমার পর আবার একটা হিট ও হট ফিল্ম নিয়ে ফিরে আসে, তেমনই অরুন্ধতীকে ফিরিয়েছে ইন্ডিয়ান মিডিয়া। এই বিশ বছরে ৭/৮ খানা ননফিকশন লিখেছেন তিনি যার সকলই প্রায় মেড বাই ইন্ডিয়া স্বপ্নের বিপরীতে লিখিত। সেই সমস্ত লেখা-পত্র নিয়ে যেন এই উদ্‌যাপন। একজন ঔপন্যাসিকের কাছে কি আমরা শুধু ফিকশন আশা করব? এই প্রশ্ন মনে জাগে। বিষয় তেমনই। বিশ বছর পর খ্যাতনামা নায়িকা পুনরায় ফিরে এলে যেমন হয়, তেমনভাবেই যেন অরুন্ধ‌তী তার নতুন উপন্যাস নিয়ে ফিরেছেন। তার পরমানন্দের মন্ত্রণালয়-এ কী আছে, কারা আছে, কেন আ‌ছে এ সমস্ত গুরুতর আলোচনা সমগ্র ভারতে উপে‌ক্ষিত। ‘বিশ বছর পর লি‌খিত একটা উপন্যাস’ ট্যাগ দিয়ে ভারতীয় মি‌ডিয়া তৃ‌প্তির ঢেঁকুর তুলে বেশ আরামে আছে। বি‌ক্রি বাড়বে, কিন্তু তা শেষ কথা না। আমার মনে প্রশ্ন জাগে, উপন্যাসটি আমরা কি উপলব্ধি করতে পারলাম এই ‘‌বিশ বছর পর’ ট্যাগ লাইনের বাইরে এসে? এই উপন্যাসের বিস্তার ও চিন্তা ব্যাপক বিজেপি-শা‌সিত ভারতে। তাকে আড়াল করার একটা চেষ্টা আছে ভারতীয় মি‌ডিয়ার।

The Ministry of Utmost Happiness হয়তো অরুন্ধতীর বিগত ২০ বছরের কর্ম ও ভাবনার কম্পাইলেশন, কনসেনট্রেশন। ২০ বছর পর একটা উপন্যাস, এইটাই মুখ্য! উপন্যাসটিকে এমন ট্রিটমেন্ট দেওয়ার কারণ বুঝতে পারি না আমি। পড়ার পর অবশ্য সামান্য বুঝেছি কেন মিডিয়া এমনভাবে এটার প্রচার চালাচ্ছে। লেখক হিসেবে তার যে দায় তিনি তা ভালোই সামলেছেন বিগত বছরগুলোতে। বিশ বছরের অবান্তর আলোচনা আমাকে কিছুতেই টানে নি। মনে হয় এই উপন্যাসের পরমানন্দটাকেই ছেঁটে দিয়েছেন মিডিয়া রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে। প্রকৃত কথা, সব মিডিয়া মিলে বলতে থাকলে তো মিডিয়ার এই পুঁজিবাদী ফর্মটাই থাকে না। ফলে, কালচার উৎপাদকরা নিজেদের সেভ করবে সেটাই স্বাভাবিক। হয়তো শিল্পসাহিত্য নিয়ে যারা মিডিয়াগিরি করে তাদের মূল লক্ষ্যই থাকে সেই সমস্ত বিষয়ের উপর আলোকপাত করা যা বেচা-বিক্রি বাড়ায়। ২০ বছর ব্যাপারটা তার বইয়ের বিক্রি যে বাড়িয়েছে তাতে সন্দেহ নাই। এটাই মিডিয়ার অর্জন। হু হু করে সেল বাড়িয়ে দেয়। আমরা কিনতে থাকি, মিডিয়ার মতো করে দেখতে থাকি বিষয়গুলো। দুনিয়ার বেশির ভাগ লোকের আইকিউ ও ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স মিডিয়ার লোকদের থেকে কম। ফলে, তারা যা বলবেন, বেশির ভাগ লোকের সে হিসাবে ‘আ-তে আমটি আমায় খাওয়াও পেড়ে’ বুঝতে কোনো সমস্যা হয় না। ফলে, অরুন্ধতী রায়ের The Ministry of Utmost Happiness-কে ভারতবর্ষের দলিত, মুসলিম, গেরিলা, বিদ্রোহী, দরিদ্রের করুণ ইতিহাস বলার থেকে ‘বিশ বছর পর লেখিকার একটি উপন্যাস’ বলতে পারার মাধ্যমে কোরটাকে আড়াল করার সক্ষমতা মিডিয়ার সোবারনেস, ইনক্লাইন্ডনেস টু স্টেট। চলতে থাকুক যুদ্ধ মানুষের বিরুদ্ধে। ‘যুদ্ধের জন্য শান্তি, আর শান্তির জন্য যুদ্ধ’ চলতে থাকুক জনগণের বিরুদ্ধে।


মানুষ হত্যার মাধ্যমে কোন মানুষকে বাঁচানোর গল্প শোনাচ্ছে রাষ্ট্র আমাদের?


জাতীয়তাবাদ, উগ্র জাতীয়তাবাদ, দেশপ্রেম, ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক, জঙ্গিবাদ, ধর্মীয় উন্মাদনা, কাশ্মির, বিজেপি, গোহত্যা, মেড বাই ইন্ডিয়া, বিচার, অবিচার, সাম্রাজ্যবাদ, উদারনৈতিক গণতন্ত্র, উন্নয়ন, আন্দোলন, শান্তি, সরকারি বাহিনী, পাওয়ার, পার্টি, ধর্মনিরপেক্ষতা ইত্যাদি কোনো নতুন বিষয় না এই বিশ্বব্যবস্থায়। এই সমস্ত আন্তর্জাতিক সমস্যাসঙ্কুল অবস্থার সাথে আমাদের পরিচয় বহু দিনের। বিশেষত কোনো উপন্যাসে, তাও যদি তা অরুন্ধতী রায়ের উপন্যাসে ফিরে ফিরে আসে তবে তা আর কতটুকুই-বা নতুন হয়ে উঠতে পারে। এ তো অরুন্ধতীর লেখার সাধারণ বিষয়। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিবেশ নিয়ে অরুন্ধতীর দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে সচেতন পাঠক কম-বেশি জানেন। সেই হিসাবে ৪৪৫ পৃষ্ঠার উপন্যাস কেন পড়ব আলোচকদের তথাকথিত আলোচনা পড়ে, তাই বুঝছিলাম না। জীবনে কোয়ালিটি রিডিংয়ের সময় খুবই কম। কী পড়ব, তার থেকে বেশি কী পড়বেন না সেই বিষয়ে সচেতন থাকা কর্তব্য এখন। তার ননফিকশনের শিক্ষা, তার এই উপন্যাস থেকে আমি নিতে প্রস্তুত ছিলাম না। গল্প-উপন্যাস শুধু, অতি শিক্ষামূলক হলে তা ঝামেলাপূর্ণ বিষয় মনে হয় আমার কাছে। উপন্যাসের কাজ সমাজ-সভ্যতার টুইস্ট আর তার কন্ট্রোভার্সিগুলো উন্মোচন করা। সেই হিশাবে কিছু নির্দেশনা থাকতে পারে উপন্যাসে, এনজিও থিসিস পেপারের সমাধান উপন্যাসের কাছে প্রত্যাশিত না। গল্প-উপন্যাস যদি উন্নয়নমূলক কাজের মতো কিছু একটা হয়, তবে উপন্যাস লেখা থেকে এনজিও খোলা ভালো আমার হিশাবে। ড. মুহাম্মদ ইউনুস ‘গ্রামীণ’-এর মাধ্যমে যা করতে চান তা তিনি উপন্যাস লিখে করতে পারবেন না। অপরের উপকার করতে পারার মধ্যে কতটুকু প্রকৃত অর্থে অপরের উন্নয়ন থাকে তা নিয়ে আমি খুবই সন্দিহান। মানুষ যখন তার অর্জিত বা দৈব জ্ঞান দ্বারা উপকার করতে চায় সেটা সব সময় উপকার হয় না। কলোনি পরবর্তী ভারত যদি প্রিকলোনিয়াল (রামরাজ্যে) অবস্থায় ফিরতে চায় তবে তার হাহাকার কেমন হতে পারে, তার একটা মেটাফরিক ডার্টি জোকস আছে স্লাভো জিজেকের যিশু খ্রিস্টকে নিয়ে।

খ্রিস্ট গ্রেফতার ও ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার আগে তার শিষ্যরা ভাবল, ‘আহা বেচারা, ভার্জিন থেকে গেল! রক্তমাংসের উষ্ণতার স্বাদ পেল না! এরার আগে তাকে একটু আনন্দ কি দেওয়া যায় না।’ যেই কথা সেই কাজ। তারা মেরি ম্যাগডলিনিকে বিশ্রামরত যিশুর খাস-কামরায় যেতে বলল তাকে প্রলুব্ধ ও জাগ্রত করার জন্য। সে খুব খুশি মনেই তার মনোরঞ্জনে সম্মত হলো। সে ঢুকে গেল যিশুর তাঁবুতে। কিন্তু পাঁচ মিনিট পরেই সে দৌড়ে বেরিয়ে এল, ভীত, ত্রস্ত, তীব্র হারানোর হাহাকার চোখে মুখে। সবাই তাকে জিজ্ঞেস করল, ‘সর্বস্বান্ত হওয়ার মতো কী হয়েছে? তোমাকে কি তিনি অভিশাপ দিয়েছেন?’ ম্যাগডলিনি বলল, ‘আমি তার ঘরে ঢুকে ধীরে ধীরে কোমর দোলাতে দোলাতে নিজেকে উন্মুক্ত করে দিলাম তার সমানে, আমার পা দুটো ছড়িয়ে দিলাম যেন দেখা যায় আমার নারীচিহ্নের পিচ্ছিল প্রস্তুতি।’ তিনি এটা দেখে আঁতকে উঠলেন। যিশু বললেন, ‘কী গভীর ক্ষত। এই ক্ষতের আরোগ্য করা দরকার।’ তিনি খুব ধীরে সুস্থে তার করতলে ঢেকে দিলেন আমার গভীর ক্ষত।’

জিজেক এই নোংরা কৌতুকের নিচে লিখেছেন, অপর কেউ যখন আপনার অসুখ সারাতে চায় তখন একটু সাবধানী হোন। কেউ যদি তার অসুস্থতাই উপভোগ করে তবে সমস্যা কী! একইভাবে, কলোনিয়াল দেশগুলো প্রিকলোনিয়াল অবস্থায় ফিরতে গেলে মেরি ম্যাগডলিনির দুঃস্বপ্নের মতোই অবস্থা হবে। ইন্ডিয়া কলোনিয়াল প্রতিক্রিয়া ও দীর্ঘদিনের রূপান্তরকে বাদ দিয়ে রামরাজত্বে ফিরতে চাইলে চিৎকার এর থেকে কম হবে না।

কে চাইবেন যিশুর এই উপকার। মানবশরীরের আনন্দ-অঙ্গকে ক্ষত হিশাবে সারিয়ে তুলতে চাইবেন কে? এই কথা সাহিত্যের মাধ্যমে অপরের উপকার করার ক্ষেত্রেও খাটে। কী উপকার তা নির্ধারণ করতে হবে উপকারগ্রহীতার দশা ও অবস্থার ভিত্তিতে। যিনি উপকারের বাহানা করছেন সেই জায়গা থেকে দেখার সুযোগ নাই। ফলে, উপকার- ও উন্নয়ন-মানসিকতার সাহিত্য সৃষ্টিকারীরা যিশু। সাহিত্যগ্রহীতারা যে উদ্দেশ্য নিয়ে যায় সাহিত্যের কাছে, সেখান থেকে একটা হাহাকার নিয়ে ফেরে যদি তাঁবুর মধ্যে যিশু বাদে অন্য কোনো প্লেবয় বসে না থাকে।

নানা রকম আলোচকরা যা যা বলছেন The Ministry of Utmost Happiness নিয়ে, সেই হিশাবে আমি এইটা পড়ার তেমন আগ্রহ বোধ করি নি।

কিন্তু আমার সন্দেহ হয়। যে ভারতে গরুর মাংস ফ্রিজে থাকার সন্দেহে মব লিঞ্চিং হয়, সেই ভারতে বিজেপি ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় এমন একটা বই নিয়ে তো আগুন জ্বলার কথা। সেই অর্থে বড় কোনো গুঞ্জন নাই। অথবা ভিন্নমুখী আলোচনার মাধ্যমে এটার গুরুত্ব তৈরি করতে চায় নাই সচেতনভাবেই। যেদেশে রাজনৈতিকভাবে নির্বিষ তসলিমা নাসরীন নিয়ে হাওয়া গরম হয় সেখানে প্রবল ভারত-উন্নয়নকে মিথ্যেবাদ আখ্যা দেওয়া অরুন্ধতীর নতুন উপন্যাস নিয়ে তেমন কোনো ঝড় নাই, আওয়াজ নাই। এই উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্রগুলো মুসলিম বা দলিত বা কাশ্মির বা অন্ধ্র প্রদেশের আতঙ্কবাদীরা। হিন্দুবাদী ভারতের সংখ্যালঘুরাই এর ক্যারেকটার। কিন্তু, সমগ্র ভারত কেন নিশ্চুপ? যারা জাতীয়তাবাদ আর ধর্মের নামে রাজনীতি করে এবং যারা উদারনৈতিক সর্বধর্মময় ভারতের নামে রাজনীতি করে, উভয় পক্ষই নীরব। ব্যাপারটা অদ্ভুত লাগে আমার কাছে। ১৩৫ কোটির দেশে সে কি অপঠিত? নাকি তাদের উদার গণতন্ত্রের মুখোশ এইটা। ১৯৯৭ সালে যখন The God of small things প্রকাশিত হয় তখন অরুন্ধতী নিয়ে ব্যাপক সাড়াশব্দ ছিল। সেই তুলনায় এই ওপেন মিডিয়ার, সোস্যাল নেটওয়ার্কিংয়ের যুগে The Ministry of Utmost Happiness নিয়ে কথা একটু কমই। আমার মনে সন্দেহ জাগে। বিষয়টা অস্বাভাবিক মনে হয়। ফলে আমার মনে হয়, এই আনন্দপুস্তক আমার পড়ে দেখা দরকার। কারণটা খুঁজে পাওয়া দরকার। বইটা পড়ে ফেলি আমি।

এটা পড়ার পরই আমার বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপধ্যায়ের আনন্দমঠ-এর কথা মনে পড়েছে। কেন, কিভাবে, পরে বলি। আগে অন্য কথায় যাই।

নৃবিজ্ঞান ও মনোবিজ্ঞান দুই জায়গাতে গসিপ বা ফিকশন থিয়োরি নামে একটা বিষয় আছে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ইভাল্যুশনারি সাইকোলজির অধ্যাপক রবিন ডুনবারের মনে করেন, মানুষের সাথে মানুষের যে বিশ্বাস ও আস্থার সস্পর্ক গড়ে উঠে তা গসিপের ভিত্তিতেই হয়। গসিপ হলো কে কার নামে কী বলছে। ধরেন অফিসের ক্যাফেটরিয়ায় বসে লাঞ্চ আওয়ারে আপনার পাশের টেবিলের কলিগের নামে দূরের টেবিলের আরেক কলিগের কাছে আপনি কিছু একটা বলছেন তার অগোচরে। আপনি কাকে বলছেন? কার বিরুদ্ধে বলছেন? যাকে বলছেন তিনিও আপনার সামনে অন্তত ঐ ব্যক্তির বিরোধী ধরেই কথা বলছেন। এই বলার মধ্যে দুইজন মানুষের মধ্যে সহযোগিতা গড়ে ওঠে, বিশ্বাস স্থাপন হয়। তারা একইভাবে ভাবার যোগ্যতা অর্জন করে। এছাড়া এর মধ্যে আরও দুই রকম বিষয় আছে লক্ষ করার মতো। এক, বিষয়টা নিয়ে আপনি দূরের টেবিলের কলিগের কাছে যা যা বলছেন তা হয়তো সত্য। যার সম্পর্কে বলছেন তিনি বিষয়টা লুকিয়েছেন সবার কাছ থেকে, কিন্তু আপনি কোনো না কোনোভাবে জেনেছেন। ফলে এইটা গোপনে আরেক জনের কাছে প্রকাশ করে দেওয়ার মাধ্যমে এমন আনন্দ লাভ করছেন আপনি। সত্য জানালে ক্ষতি কার! এটা হলো রিয়েল রিয়েলিটি। আবার এমনও হতে পারে, আপনি যা বলছেন তার বেশির ভাগ ব্যাপারই আপনার মনগড়া। হয়তো কোনো একটা ঘটনায় আপনার মনে একটা পূর্বানুমান তৈরি হয়েছে, সেই অনুমানকে নানা জল্পনা-কল্পনা দিয়ে আপনি ভ্যালিড করছেন। কল্পনার এই ভ্যালিডিটি হলো সন্দেহ। সেই সন্দেহের কথাটাই আপনারা খুব নিচু স্বরে পরস্পরের সাথে শেয়ার করলেন। এটা হলো ইমাজেনারি রিয়ালিটি। হয়তো ঘটনা এমন না, আপনি যেমন ভাবছেন। রিয়েল রিয়েলিটি বা ইমাজেনারি রিয়েলিটি যাই বলেন না কেন, আপনার শ্রোতা আপনার উপর বিশ্বাস ও আস্থা রাখবে, কেননা আপনারা পরস্পরকে মানসিকভাবে কো-অপারেট করছেন এইখানে। এই পরস্পরকে মানসিক ও শারীরিকভাবে সাপোর্ট দিতে পারার ক্ষমতাই মানুষ ও সভ্যতা তৈরির নিয়ামক। এই গসিপ আর নানা গল্প নিয়েই মানুষে মানুষে আস্থার সম্পর্ক আগায়। গসিপ, রিউমারকে খারাপ কিছু হিশাবে ধরতে হলে অনেকগুলো বিষয় নিয়ে আলোচনা শেষ করে নিয়ে তবেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। গসিপ হলো মানব অগ্রগতির টুলস। এই গসিপের জন্যই আমরা মানুষ। যারা গসিপ করছে তাদের মধ্যে বিশ্বাস ও আস্থার একটা সম্পর্ক গড়ে উঠছে। এই ইমাজেনারি বাস্তবতা, ফিকশনাল রিয়েলিটি, গল্প সমাজ-সভ্যতার জন্য বিরাট গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ একমাত্র জীব যারা এই কল্পিত বাস্তবতাকে মানে ও সে অনুযায়ী চলে। অন্য প্রাণীর মধ্যে এমন নজির নাই। আমাদের দৈনন্দিন জীবনের গল্পে কত ভাগ বাস্তব সত্য, আর কত ভাগ কল্পিত সত্য আছে তা নিয়ে হিশেব করে দেখতে পারেন আপনি। সত্য মিথ্যা মুখ্য না। গল্পটাই ব্যাপার। সভ্যতার সামনের দিকে আগানোর জন্য গসিপ অবধারিত। আপনি যদি বানরকে বলেন মৃত্যুর পর তোমাকে ২৪টা কলা দেওয়া হবে, যদি আর কলা না খাও। বানর দুইটা কলা বেশি খাবে এক্ষেত্রে, মনে মনে আপনাকে বানর গালিও দিতে পারে যদি তার সে সুযোগ থাকে। আর মানুষ নানা রকম কল্পিত গল্প থেকে ঐক্যবদ্ধ হয়, পরস্পর মিলে লক্ষ নির্ধারণ করে। সভ্যতা আজ এখানে এল, আপনারা নিজেদেরকে সভ্য হিশাবে দাবি করছেন, সুন্দর সুন্দর পোশাক পরেছেন, নানা বিষয় নিয়ে ভাবেন, বিমূর্ততার মজা নিচ্ছেন—এইগুলোর পেছনে বাস্তবতার চেয়ে কল্পিত বিশ্বাসের ভূমিকাই বেশি। মানুষ আশলে গল্প বিশ্বাস করতে চায়। জীবনের নানারকম গল্পই নিয়ন্ত্রণ করে তাকে। গুহাজীবী একজন মানুষ তার বাচ্চাকে সাবধান করছে, গুহার বাইরে রাতের বেলায় বাঘ থাকে। হয়তো সত্য বাঘ নাই গুহার বাইরে। মনের বাঘ মেনে নিয়ে বাচ্চারা বাইরে গেল না। এতে তাদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বাড়ে। আধুনিক মানুষের টেলিভিশন খুলুন। দেখবেন হরলিক্স না খেলে আপনার সন্তান টলার, শার্পার, স্ট্রংগার হতে পারবে না। এমন কত কল্পিত গল্প মানুষ শোনে আর বিশ্বাস করে আর বাঁচতে থাকে যুগের পর যুগ। মানুষ ঝাড়ফুঁক বিশ্বাস করত রোগমুক্তির জন্য এক সময়। তাদের বিশ্বাস ছিল বিশেষ মানুষ মানুষকে সাহায্য করতে পারে রোগশোকের সময়। ফলে আজকের এই হাসপাতাল ব্যবস্থা। লিমিটেড কোম্পানি হলো ইমমর্টাল ব্যক্তি ছাড়া আর কিছু নয়। রাষ্ট্রও লিমিটেড কোম্পানিই। আমেরিকায় লিমিটেড কোম্পানিকে কর্পোরেশন বলে। কর্পোরেশন এসেছে ল্যাতিন কর্পাস থেকে। যার অর্থ বডি বা দেহ। লিমিটেড কোম্পানি একটি অতীব আধুনিক ধারণা ও বিশ্বাস। মানুষ আর কর্পোরেশনের মধ্যে সবই এক। মানুষের বিচার হয়, ছেলে মেয়ে হয়, জরিমানা হয়। কোম্পানি মন্দ কাজ করলে তার বিচার হয়, তার সিস্টার কান্সার্ন তৈরি হয়, ফাইন হয়। সুশীল মানুষের মতো তারও সমাজের প্রতি দায়িত্ব-কর্তব্য থাকে। রাষ্ট্র তাকে নানা দিক-নির্দেশনা দিতে পারে। এইটা তো একটা ধারণা, গল্প। কল্পিত ব্যক্তিত্ব আরোপ করা হয়েছে প্রতিষ্ঠানের উপর। কর্পোরেশন হলো কল্পিত বাস্তবতার চূড়ান্ত রূপ। আমাদের প্রতিটি আচরণ অর্ধেক ননফিকশন আর অর্ধেক ফিকশন। ফিকশনের ব্যাপক ভূমিকা আছে মানুষের জীবনে। রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য গল্প লাগে, মিথ লাগে। সেই গল্প আর মিথ তারা তৈরি করে দেয়? রাষ্ট্র তো জাতীয়তাবাদী গল্প। তা টিকিয়ে রাখার জন্য জাতীয় সংগীত লাগে, পতাকা লাগে, দেশ-বন্দনার কবিতা, গান লাগে, শহিদ হওয়া লাগে, বীরত্বের গল্প লাগে, ঐক্য লাগে, যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা লাগে, কল্পিত শত্রু তৈরি করা লাগে। এই শত্রু তৈরির কাজ রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রের নাগরিকদের করতে পারে, আবার নিজ রাষ্ট্রের একটা সংখ্যালঘু অংশকেও রাষ্ট্রশত্রু হিশাবে দাঁড় করাতে পারে। আমাদের নিরপত্তার জন্য হুমকি তৈরি করার মতো সংখ্যালঘু রাজনৈতিক দল, চরমপন্থি আদমবোমাদের গল্প আমরাই তৈরি করেছি। মুসলিম মানেই সন্ত্রাসী, এন্টি-স্টেট এই যে হীন আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গির ফিকশন-উৎপাদী মেশিন ৯/১১ পর থেকে যে দুনিয়ায় শুরু হয়েছে তা আর থামছেই না। রাষ্ট্রের ভেতর জন্ম দিচ্ছি আমরা নতুন নতুন শত্রু, সমগ্র দুনিয়ার দেশ বাঁচানো, মানুষ বাঁচানোর স্লোগান দিয়ে। মানুষ হত্যার মাধ্যমে কোন মানুষকে বাঁচানোর গল্প শোনাচ্ছে রাষ্ট্র আমাদের?

অরুন্ধতী রায়ের The Ministry of Utmost Happiness পড়েই আমার বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপধ্যায়ের আনন্দমঠ-এর কথা মনে পড়েছে আগেই বলেছি। সে কথায় যাওয়া যাক।


The Ministry of Utmost Happiness হলো সেই নতুন গল্প যা আমাদেরকে আনন্দমঠ উৎসারিত উগ্র জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর অনুপ্রেরণা দেয়।


যেকোনো বিষয়ে জনমনে বিশ্বাস জন্মানোর জন্য গল্প লাগে। বঙ্কিম আনন্দমঠ-এ সেই উগ্র জাতীয়তাবাদের গল্প তৈরি করেছেন। তার ফিকশন ভারতকে হিন্দুবাদে ঐক্যবদ্ধ করেছে। সেই বিশ্বাস ভারতীয় ঐতিহ্যের সাথে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল সেটা আলোচনা করা জরুরি আজ এই অঞ্চলের জাতীয়তাবাদ ও দেশভাগ বোঝার জন্য। জাতীয়তাবাদ একটা গল্পনির্ভর বিষয়। জাতীয়তাবাদ টিকিয়ে রাখার জন্য, ইন্সপায়ার্ড করার জন্য জাতীয় সংগীত, পতাকা, যুদ্ধ, কিছু বীর, নানা দিবস ইত্যাদি থাকা লাগে। মানুষকে এক কল্পিত লক্ষ্য নির্ধারণ করে দেয়। ‘জীবন মৃত্যু পায়ের ভৃত্য, চিত্ত ভাবনাহীন’-মূলক জাতীয়তাবাদের গল্প, দেশ নামক দশভুজা দেবী, দেশপ্রেম মানে মায়ের সেবা এইসব একটা প্রজন্ম প্রবলভাবে বিশ্বাস করতে থাকে। কারণ জাতীয়তাবাদ কায়েমের সাথে সাথে এই সকল গল্প সত্য হয়ে যায়। ফলে উন্নয়ন আর শান্তির নামে মানুষ থেকে দেশ বড় হয়ে ওঠে। জাতীয়তাবাদী মাতৃস্বরূপা, দেবীর মতো দেশ—মানুষের বিরুদ্ধে এই সমস্ত গল্পের জোরে দাঁড়িয়ে থাকে। জাতীয়তাবাদী দেশ মানেই তা মানুষকে নিপীড়নের মাধ্যমে টিক থাকে। এখন মানুষকে জাতীয়তাবাদের নেশা থেকে বের করতে হলে তার সামনে নতুন গল্প হাজির করতে হবে। নতুন গল্প ছাড়া প্রতিষ্ঠিত গল্পের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো যায় না। অরুন্ধতীর The Ministry of Utmost Happiness হলো সেই নতুন গল্প যা আমাদেরকে আনন্দমঠ-উৎসারিত উগ্র জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর অনুপ্রেরণা দেয়।

যে গল্প তিনি লিখেছেন এই বইয়ে তা আমরা কম-বেশি জানি সকলেই। সরকার কর্তৃক গুম, হত্যা, ধর্ষণ, অর্থ-জালিয়াতি, সেনা-নির্যাতন, জাতপাত, জঙ্গিবাদ—এ তো আমাদের জানা কথা। পত্রিকায় রোজ এই সংবাদ আসে। মানুষের রাষ্ট্রের বাইরে বসবাসের সুযোগ থাকলে আপনারা কী করতেন, আমি জানি না! যেখানে রাষ্ট্র নামক উৎপাদনক্ষম মেশিন আছে, সেখানেই তো এই অনাচার। সংবাদপত্রে লেখা এই সমস্ত শোকের, নির্যাতনের গল্প আমরা গুনতে শুনতে সহ্য-ক্ষমতা অর্জন করেছি। জাতীয়তাবাদ টিকিয়ে রাখার জন্য রাষ্ট্র কর্তৃক খুন, জখম, জেলকে আমরা মেনে নিয়েছি। ফলে, পত্রিকায় বা টিভিতে যে সত্য গল্প আসে তাতে যেন প্রাণ নেই। বিদ্রোহের কোনো অনুপ্রেরণা নাই এই গল্পে। আমরা সকালে শুনি রাষ্ট্রবাহিনীর সাথে গেরিলাদের যুদ্ধে ত্রিশজন হতাহত, কিন্তু রাতে ভুলে যাই। রোজ রোজ নতুন গল্প উৎপাদন হতেই থাকে। অথচ অরুন্ধতী যে গল্প আমাদের বলেন তাতে প্রাণ আছে। আগেই বলেছি দুই রকম বাস্তবতা আছে দুনিয়ায়। এক সত্য বাস্তবতা আর দুই কল্পিত বাস্তবতা। কল্পিত বাস্তবতার শক্তি অনেক। মিডিয়ার গল্পে শুধু বাস্তবতার বাস্তবতা থাকে। অরুন্ধতীর তৈরি গল্পে আছে রিয়েল রিয়েলিটি আর ইমাজেনারি রিয়েলিটি। মানুষ গল্প থেকেও বেশি বিশ্বাস করে এই ফিকশন। এর জন্যই চেনা গল্প হয়েও The Ministry of Utmost Happiness শুধুমাত্র গল্প না হয়ে ফিকশন হয়ে ওঠে, চিন্তা আর বিশ্বাসের নতুন বেজ লাইন হয়ে ওঠে।

The Ministry of Utmost Happiness-কে বাংলায় পড়া যায় পরমানন্দের মন্ত্রণালয়। বঙ্কিমচন্দ্রের আনন্দমঠ আর অরুন্ধতীর পরমানন্দের মন্ত্রণালয়—কোথায় যেন একটা মিল আছে! ইতিহাসের পায়ে পায়ে আগাতে হবে আমাদের।

আনন্দমঠ বঙ্গদর্শন পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে ছাপা শুরু হয় ১৮৮০ সালে। ১৮৮২ সালে তা বই আকারে মুদ্রিত হয়। আনন্দমঠ যারা পড়েছেন তারা জানেন এটা ছিয়াত্তরের (বাংলা ১১৭৬, ইংরেজি ১৭৭০) মন্বন্তরের পটভূমিতে সন্ন্যাসী-বিদ্রোহের প্রেক্ষিতে লেখা। উপন্যাস হিশাবে বেশ বাজে। চরিত্রগুলোর যত না রক্তমাংস দেখা যায় তার থেকে বেশি মাংসের নিচে হাড় দেখা যায়। উপন্যাসের কঙ্কাল। রাজনৈতিক মতাদর্শ, হিন্দুজাতীয়তাবাদ ও দেশপ্রেম—এই নিয়েই গড়ে উঠেছে আনন্দমঠ। এটা যত না উপন্যাস তার থেকে বেশি হিন্দুজাতীয়তাবাদী দীক্ষাগ্রন্থ, ম্যানুয়াল। সমাজতন্ত্র বোঝার জন্য কম্যুনিস্ট ম্যানিফেস্টো যেমন, ভারতের জাতীয়তাবাদ উপলব্ধি করার জন্য বঙ্কিমের আনন্দমঠ। ‘বন্দে মাতরম’ গানটি এই বইয়েরই অন্তর্ভুক্ত। আনন্দমঠ বইয়ে এই গানের সুর হিশাবে পাদটিকায় লেখা ছিল মল্লার, কাওয়ালি তাল। সুর করেছিলেন যদুভট্ট। ১৮৮৫ সালে তরুণ রবীন্দ্রনাথ এই গানের সুর করলেন ‘দেশ’ রাগে। হিন্দু জাতীয়তাবাদের পাশাপাশি মুসলিম জাতীয়তাবাদও মাথা চাড়া দিয়ে উঠল এর বিপরীতে। ক্রিয়ার বিপরীত সমান প্রতিক্রিয়া। ‘বাহুতে তুমি মা শক্তি/ হৃদয়ে তুমি মা ভক্তি/ তোমারই প্রতিমা গড়ি মন্দিরে মন্দিরে।’ জিন্না ও মুসলিম লীগের আপত্তি ছিল বৈকি! জিন্নাহ কতটা মুসলিম সেই প্রশ্নে না যাই। তিনি মুসলিম কম্যুনিটির প্রতিনিধিত্ব করেছেন। মুসলিম কম্যুনিটির প্রতিনিধিত্ব করার জন্য যারা বলবেন জিন্নার জন্য নামাজ-রোজা করা প্রাথমিক শর্ত, তারা কেমন সেক্যুলার? নামাজ-রোজা পালন করার ভেতর দিয়ে পুঁজিবাদের সেবক হতে পারবেন না? র‌্যাডিক্যালিস্ট হওয়ার মাধ্যমে আপনি আমেরিকার স্বার্থ হাসিলে সাহায্য পাচ্ছেন, কিন্তু অমুসলিম জীবন যাপন করে মুসলিম কম্যুনিটির প্রতিনিধিত্ব করতে পারবেন না! দুর্বলের পক্ষে দাঁড়ানোটাই আশল রাজনীতি। কিন্তু আমাদের বঙ্কিম, রবীন্দ্রনাথ কাদের পক্ষে দাঁড়িয়েছে? শুধুমাত্র সংখ্যাগুরুর কল্যাণ যে ব্যবস্থা দেখতে চায় তা কতটা কাজের। ১৯৩৭ সালে রবীন্দ্রনাথের পরামর্শেই এই গান কেটে-ছেঁটে জাতীয় সংগীত হিসাবেই রাখার পরামর্শ দেওয়া হলো। ৭৬ বছর বয়স্ক রবীন্দ্রনাথ প্রবল আপত্তির মুখে পড়েন সেই সময়। প্রবল হিন্দুত্ববাদ আর জিন্নার মুসলিম জাতীয়তাবাদ একই তো বিষয়। মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। ‘বন্দে মাতরম’ মানে ‘করি মাতার বন্দনা’। এই মাতার যে বর্ণনা এই গানের মধ্যে আছে তা দশভুজা মা দুর্গা। এইখান থেকেই দেশ আমাদের কাছে মাতৃমূর্তি। দেশকে মূর্তি হিসাবে দেখার যতই বিরোধিতা জিন্নারা করুক না কেন, সেই ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের বাইরে কিন্তু তারা কোনো নতুন বিকল্প হাজির করতে পারেন নি। হিন্দুত্বের বিরুদ্ধে মুসলমানিত্ব। দেশ এক মিথিক্যাল মূর্তি আমাদের কাছে। ভক্তি- ও ভয়-মিশ্রিত। এখানে ব্যক্তি থেকে দল বড়, দল থেকে দেশকে বড় হিশাবে দেখানোর প্রবণতা। দেশ থেকে মানুষই বড় হওয়া দরকার। দেশমাতা নামক বিমূর্ত ধারণার পাশে মানুষ ধারণাটি পরাজিত হলো। দেশ নামক দেবতার কাছে মানুষ এক নগণ্য অস্তিত্ব। উপমহাদেশের জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে জনগণ থেকে দেশ শব্দটা বেশি উচ্চারিত হয় তার ঐতিহাসিক কারণ হয়তো এখানেই।

বহুজাতীয়তাবাদী ভারত রাষ্ট্রকে দুর্গার প্রতিরূপ হিশাবে দেখার যে দেশাত্মবোধক চিন্তা তাতে তরুণ রবীন্দ্রনাথের সায় ছিল। ১৮৯৬ সালে রবীন্দ্রনাথ ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসে এই গান নিজে গান। শ্রীঅরবিন্দ এই গানকে বঙ্গদেশের জাতীয় সংগীত হিশাবে উল্লেখ করেন। শ্রীঅরবিন্দ কংগ্রেসের চরমপন্থি দলের নেতা ছিলেন, তা আমরা জানি। ইতিহাস বলে, মুসলিম সংগঠনগুলো জাতীয় সংগীত হিশাবে পৌত্তলিকতার দায়ে এই গানের বিরুদ্ধে ফতোয়া জারি করে। বিষবৃক্ষের বীজ দেখতে কেমন? বহুজাতি-মিশ্রিত নৃতত্ত্ব-নির্ভর ভারতের ইতিহাস-ঐতিহ্যকে অগ্রাহ্য করে মিথলজি-নির্ভর রাষ্ট্রচিন্তার ফল কেমন হতে পারে তা ভারত ঠিকই মর্মে মর্মে উপলব্ধি করছে এখন। কাকে বলে ইতিহাস আর কাকে বলে পুরাণ, মিথ তা রাষ্ট্রতাত্ত্বিকদের জানা দরকার। না হলে মাটির বুকে কান পেতে শুধু রক্তপাতের শব্দ শোনা যাবে। মানুষ থেকে দেশ বড় হয়ে গেলে, রাষ্ট্র তার জনগোষ্ঠীকে নিজের বাহিনী দ্বারা উন্নয়ন আর শান্তির নামে নির্যাতন করতে পারে। রাষ্ট্র এক ধর্মীয় মিথিক্যাল চরিত্র, যার সেবা লাগে মানুষের রক্তে ভেজা রক্তজবায়। সেই মানুষ থেকে বড় রাষ্ট্রনামক বিষবৃক্ষের বীজ এইখানেই প্রোথিত। পরাধীন ব্রিটিশ-ভারত খণ্ডে যে দেশপ্রেমমূলক জাতীয়তাবাদ নামক ধর্মের জন্ম হয়েছিল তার ফলাফল দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিটা দেশ মোটামুটি ভোগ করছে এখনও। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকা, মায়ানমার কেউই বাদ নাই। উপমহাদেশে হিন্দু-জাতীয়তাবাদের সূচনা উদাহরণ হিশাবে কাজ ক’রে সকল রাষ্ট্রকে উদ্বুদ্ধ করেছে ধর্মীয় রাজনীতিতে। মানুষ থেকে দেশ দেব-দেবীর মতো মহৎ পরিশুদ্ধ সবদেশেই। ফলে, রাষ্ট্র নামক ধারণা আর গল্পের নাম নিয়ে যেকোনো অনাচারই বৈধ।

এই বিষয়গুলো একটু মাথায় নেওয়া দরকার The Ministry of Utmost Happiness নিয়ে সামাস্য দুএকটা কথা বলার আগে। সুবিধা হয় একথা বোঝাতে, যে ভুল জাতীয়তাবাদের উপর নির্ভর করে ভারত তথা উপমহাদেশের রাষ্ট্রগুলো গড়ে উঠেছে সেই রাষ্ট্রের দৃশ্যমান সমস্যা ও সমাধানের কিছু প্রবল নির্দেশনা হলো অরুন্ধতীর পরমানন্দের মন্ত্রণালয়। বঙ্কিমের আনন্দমঠ যেভাবে ভারতীয় জাতীয়তাবাদ গড়ে উঠতে ভূমিকা রেখেছে ঠিক একইভাবে এই বই ভবিষ্যৎ জনমুখী ভারত তথা পৃথিবীর সকল কল্যাণমুখী রাষ্ট্র গড়ে ওঠার বীজ রেখে যাচ্ছে। এই হলো আনন্দমঠ আর পরামানন্দের মন্ত্রণালয়ের সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্য পরস্পর থেকে। দুটো বইই রাজনীতিকে ডিল করছে। উপমহাদেশের জাতীয়তাবাদী রাজনীতির মূলটা তৈরিতে আনন্দমঠ যেভাবে কাজ করেছিলে, একইভাবে এই রাজনীতির পরিবর্তনের স্বপ্ন পরমানন্দের মন্ত্রণালয়-এ আছে।

রাষ্ট্রকে নির্দেশনরা দেবার ক্ল্যাসিকাল গ্রন্থ পৃথিবীতে তিনটা : কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র, সান’জুর আর্ট অব ওয়ার আর ম্যাকিয়াভেলির প্রিন্স। আর এই উপমহাদেশের জাতীয়তাবাদ, দেশ, দেশপ্রেম ধারণার জন্য আনন্দমঠ অবশ্যপাঠ্য। এবং রাষ্ট্রের অসুখটা কোথায় তা দেখার জন্য এবং তার চিকিৎসার অনুপ্রেরণা পেতে The Ministry of Utmost Happiness বইটি। অরুন্ধতীর অতীতের রাষ্ট্রচিন্তকদের চিন্তার প্রতিফলনে যে নিষ্পেষণের রাষ্ট্রব্যবস্থা এখানে গড়ে উঠেছে তার স্বরূপ, সীমাবদ্ধতা বোঝা যায় এখানে। এই উপমহাদেশের জাতীয়তাবাদের সূচনা হিন্দু-মিথলজি দিয়ে। এই অঞ্চলের অংশ বিশেষের ঐতিহ্য, কালচার, বিশ্বাসকে পুঁজি করে শুধুমাত্র হিন্দু-মিথের উপর নির্ভর করে জন্ম দেওয়া হয়েছে জাতীয়তাবাদের বিষবৃক্ষ। এইকালে তার যে ফল পাওয়া গেল, সমগ্র জনগণের জন্য তার স্বাদ বড় কটু, জাতি-বিদ্বেষপূর্ণ, রাষ্ট্র কর্তৃক উন্নয়ন ও শান্তির নামে দমন-পীড়নময়।

হিন্দু জাতীয়তাবাদের স্বপ্ন নিয়ে ব‌ঙ্কিমের আনন্দমঠ র‌চিত হয়েছে ১৮৮২ সালে। ভারত ঐ‌তিহা‌সিক ও নৃতা‌ত্ত্বিকভাবে বহুজা‌তি-মিশ্রিত সংঘ-রাষ্ট্র। সেই ই‌তিহাস ও বহুজাতি-নির্ভর ভারতের প্রত্যাশায় লিখিত The Ministry of Utmost Happiness উপন্যাস‌টি। ব‌ঙ্কিমের পর ভারতকে ১৩৫ বছর অপেক্ষা করতে হলো এর জন্য। এই অপেক্ষা বড় দীর্ঘ।


দুনিয়াটাকে গোরস্থান বানিয়ে ফেলেছি আমরা এটা যেন আমরা ভুলে না যাই। এই ভুলে না যাওয়া থেকেই জন্ম নিবে গোরস্থানে জান্নাত।


আনন্দমঠীয় বঙ্কিম-রাবীন্দ্রিক রাষ্ট্রচিন্তার বিপরীতে অরুন্ধতীর ‘পরামানন্দ’ গড়ে উঠতে ১৩৫ বছর বড় বেশি সময়। বহু রক্ত ঝরে গেছে এর মধ্যে। বহু বহু প্রাণের ক্ষয় হয়ে গেছে। উপত্যকা ভরা লাশের মিছিলে The Ministry of Utmost Happiness হলো সুউচ্চ স্মৃতিসৌধ। ১৮৯৬ ‘জাতীয় কংগ্রেস’-এ ‘বন্দে মাতরম’ গাওয়ার মাধ্যমে ভারত জাতীয়তাবাদের যে বিসমিল্লায় গলদ দিয়ে শুরু করেছিল ঠিক সেইভাবে ২০১৭ সালে The Ministry of Utmost Happiness-এর মাধ্যমে ভারত নিজেকে শুধরে নিতে পারে। নতুন সূচনা হতে পারে। অতীতকে পাল্টানোর কোনো উপায় নাই। শুধু একে ক্রিটিক্যালি দেখে নতুনভাবে শুরু করা যেতে পারে। পরমানন্দের দরজা দিয়ে সম্মিলিত ভারত তৈরি হতে পারে। এই বই একটা ইন্সপাইরেশন সমগ্র উপমহাদেশের জন্য। উপন্যাসের মধ্যে একটু ঢোকা যাক। অন্যান্য কথাই বেশি হয়ে গিয়েছে। তবে বইটার কোর পলিটিক্সটা খোলাশা করার জন্য এত কথার দরকার ছিল বলে মনে হয়।

থ্রু ট্র্যাডিশনাল ফর্মে লেখা একটা উপন্যাস। ছিন্ন ভিন্ন অনেক গল্প একে অন্যের সাথে জোটবদ্ধ হয়েছে। প্রতিদিন সকালে আপনি যা পড়েন পত্রিকায়, রাতে দেখেন নিউজ চ্যানেলে তাই নিয়েই এই উপন্যাসে গল্প। এই সংবাদপত্র-ধর্মী গল্পকে উপন্যাস হিসাবে তৈরি করে তোলাটাই হলো বড় এক চ্যালেঞ্জ। সেই চ্যালেঞ্জটা ভালোভাবেই সামলেছেন তিনি।

উপন্যাসের গল্পটা সংক্ষেপে বলি। উপন্যাসের ঘটনা বর্ণণা এই লেখার উদ্দেশ্যও না। এটা আশলে মাল্টিস্টোরিড এগারো তলা একটা বিল্ডিং। একটার মাথার উপর আরেকটা গল্প, একটা তলা যেভাবে আরেকটা তলা ধরে রাখে তেমন। ১২ তলায় ছাদ। প্রতি ফ্লোরের সজ্জা ও উদ্দেশ্য ভিন্ন ভিন্ন। মাল্টি লেয়ারড, পরস্পর ছিন্নভিন্ন। কিন্তু ধীরে ধীরে তারা হয়ে ওঠে এক ও অদ্বিতীয় পুরা ১২তলার এক বিশাল বিল্ডিং। সবকিছু জড়িয়ে পড়ে এক জায়গায়। অমৃত আর বিষের শরবত হয়ে ওঠে। মুলাকাত আলী ও জাহনারা বেগমের হিজড়া ছেলে আফতাব। সে লিঙ্গ পরিবর্তন করে আঞ্জুম হয়ে যায়। এই আঞ্জুমের কুড়িয়ে পাওয়া মেয়ে জয়নাব, দলিত সাদ্দাম হোসেন যার বাবা—নিহত রাষ্ট্রীয় পুলিশ বাহিনীর হাতে, যার জীবনের লক্ষ্যই এই পুলিশ অফিসারকে হত্যার মাধ্যমে পিতৃহত্যার প্রতিশোধ নেওয়া; ডক্টর আজাদ ভারতীয়, যিনি দিল্লির যন্ত্রর-মন্ত্ররে ১০ বছর ধরে অনশন করছেন, তিলো, তিলোত্তমা যার প্রেমিক মুসা, তারই স্বামী নাগারাজ হারিয়ানা। মুসা কাশ্মিরের বিচ্ছিন্নতাবাদী বিপ্লবী, নাগা কাশ্মির বিট করা বিখ্যাত সাংবাদিক, টক শো ম্যান; বিপ্লব দাশগুপ্ত শ্রীনগরের ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর হেড। এরা আবার পরস্পরের বন্ধু ছাত্রজীবনে। কিন্তু জীবন তাদের কোথায় ভাসিয়ে নিল। একই জীবন যাপন করা চারটা মানুষ কর্মক্ষেত্রে কী বিচিত্রভাবে ভিন্ন। সেনাবাহিনীর বিদ্রোহ দমনের নামে গুলিতে নিহত মুসার বউ বেগম আরিফা ও মেয়ে জেবিন। সেনা অফিসার আমরিক কাশ্মিরের কসাই। নির্বিচারে হত্যায় পারদর্শী। অন্ধ্র প্রদেশের বিপ্লবী কমরেড রিভাথি, আহলাম বাজি, ওস্তাদ হামিদ খান, ইমাম জিয়াউদ্দীন, কুলসুম বাঈ, জাকির মিয়া, বেগম জিনাত, বেগম রেনেটা, রোশান লাল, ঠিকাদার ডি ডি গুপ্ত, এসিপি পিংকি, বলবীর সিং, জেবিন দ্বিতীয়। বহু চরিত্রের সমাবেশ এই বারো তলা বাড়িতে।

খোয়াবগাঁ-নামী পুরানা দিল্লির এক হিজড়াপট্টি থেকে আঞ্জুম নিঃসঙ্গ এক কবরখানায় আশ্রয় নেওয়ার মাধ্যমে উপন্যাসের শুরু। জন্মসূত্রে সে উভলিঙ্গ। কিন্তু পরিবার তাকে ছেলে অফতাব হিসাবে বড় করে তুলতে চেয়েছিল। সে পরিবার ছেড়ে খোয়াবগাঁয়ে চলে আসে স্বেচ্ছায়। বয়ঃসন্ধির সময় নিজ সিদ্ধান্তে জেন্ডার রিঅ্যাসাইনমেন্ট সার্জারির মাধ্যমে মেয়ে হয়ে যায়। ছেলে অফতাব মেয়ে আঞ্জুমে রূপান্তরিত হয়। কিন্তু ভারতের নাগরিক হয়ে ওঠাটা আফতাবের সেলফ সিলেকশন না। ভারত রাষ্ট্র ত‌াকে আফতাব করে তুলতে চায়। সে আঞ্জুম হয়ে উঠতে চায়, এটা তার চয়েস। কিন্তু রাষ্ট্র আর আদর্শ জ্বলে ওঠে আপন শক্তিতে। আঞ্জুম হয়ে ওঠার ক্ষণে, উপন্যাসের মধ্যে ঢুকে পরে আহমেদাবাদের দাঙ্গা। ইন্দিরা গান্ধির মৃত্যর পর কত শিখদের জীবন্ত পোড়ানো হয়েছে তা কেউ হিসাব দিতে পারবে না। রাষ্ট্র মানুষের মৃত্যুর হিশাবের পবিবর্তে ভিন্নমতাবলম্বীদের লাশ পরিষ্কার করতে ব্যস্ত। হিশাব করবেই না কেন? পাকিস্তান মুসলিম রাষ্ট্র হলে ভারতকে আরো বেশি হিন্দুরাষ্ট্র হতে হয়। ভারত হিন্দুরাষ্ট্র হলে পাকিস্তানকে আরো বেশি মুসলিম রাষ্ট্র হয়ে উঠতে হয়। আঞ্জুম একজন মুসলিম হয়েও হিন্দুর বেশ নিয়েই তাকে বেঁচে ফিরতে হয় দিল্লিতে, আহমেদাবাদের দাঙ্গা থেকে। মানুষকে নিজের পরিচয় লুকিয়ে বাঁচতে হয়। এরপর এই দাঙ্গা থেকে ফেরার পর আঞ্জুমের ভেতর এক পরিবর্তন আসে। সে খোয়াবগাঁ ছেড়ে গোরস্থানে আশ্রয় নেয়। সেখানে একটা রেস্ট হাউস খোলে সে। নাম দেয় ‘জান্নাত’। স্বপ্ন থেকে স্বর্গের দিকে যাত্রা। এই কবরখানাই আজকের হিন্দুস্থান, জান্নাত হলো ভবিষ্যৎ ভারতের স্বপ্ন। এই কবরস্থানের জান্নাতেই জাতি, ধর্ম, দলিত, বিপ্লবী সবার নির্বিশেষে শারীরিক বা প্রতীকী স্থান হয়। এই দুনিয়ায় মানুষের পৃথিবী গড়ার স্বপ্ন হলো আমাদের সিলেকশন। যখন দিল্লিতে দুর্নীতি-বিরোধী আন্দোলন চলছে তখন আঞ্জুম সেখানে গিয়ে দেখে এই আন্দোলন সমাজের একটা বিশেষ শ্রেণির আন্দোলন। হিজড়াদের স্থান নাই। এমন আরো অনেকের স্থান এখানে নেই। দেখা যায় ভূপালে রাসায়নিক হাওয়ায় যারা পুড়িয়ে ফেলেছে ফুসফুস, তাদেরও তেমন একটা প্রয়োজন নেই এই আন্দোলনে। মিডিয়া আন্দোলনের যে খণ্ডচিত্র বেচতে চায় সেভাবেই আন্দোলন নিজেকে সাজিয়ে নেয়। সেই আন্দোলন-মুখরিত দিনে মানমন্দিরের পাশে একটা শিশু পাওয়া যায়। পরে যে মিস জেবিন দ্য সেকেন্ড হিসাবে কবরস্থানে গড়ে ওঠা ‘জান্নাতে’ স্থান পায়। এই শিশুটা আসলে কমরেড, বিপ্লবী রিভাথির। সে রাষ্ট্রের ছয়জন পুলিশ দ্বারা ধর্ষিত হয়ে এই শিশুটিকে গর্ভে ধারণ করে। একজন শিশুর ছয়জন রাষ্ট্রীয় পিতা। এই হলো বাস্তবতা। এই হলো রাষ্ট্রের নিপীড়ন নিজ জনগণের প্রতি। সে শিশুটিকে ফেলে চলে যায় দিল্লিতে। এই শিশুটির সাথে গল্পে প্রবেশ করে তিলো, তিলোত্তমা। যার প্রেমিক কাশ্মির-বিচ্ছিন্নতাবাদী বিপ্লবী মুসা। যে মুসা ছাত্রজীবনে নামাজহীন, তাকেই বিপ্লবীর বেশে নামাজ পড়তে দেখা গেছে। মুসা হলো স্বাধীন কাশ্মিরের পক্ষে রাষ্ট্রদ্রোহী। একদিন সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে আন্দোলন চলারত অবস্থায় গুলিতে মুসার বউয়ের আর শিশুকন্যা জেবিনের মৃত্যু হয়। অসহায় বন্ধুর পাশে দাঁড়াতে তিলো কাশ্মিরে চলে আসে মুসার কাছে। মুসাকে পুলিশ বহুদিন হলো খুঁজছে। সেনা অফিসার আমরিক সিংয়ের হাতে তিলো ধরা পড়ে। মুসা পালিয়ে যায়। তিলোকে সেনা নির্যাতনের হাত থেকে রক্ষা করে ইউনিভার্সিটির বন্ধু বিপ্লব দাশগুপ্ত। ছাত্রজীবনে বিপ্লব তিলোর প্রতি দুর্বল ছিল। মুসাকে হারিয়ে তিলোর একটা অবলম্বন দরকার ছিল। এই স্ট্র্যাটেজিকেল অবলম্বন হলো সাংবাদিক নাগা। সে নাগাকে বিয়ে করে। বাঁচার জন্য মানুষকে ইচ্ছার বাইরেও যেতে হয়। সে মূলত নাগাকে অবলম্বন করে মুসার জন্য অপেক্ষা করে। নাগার সাথে সম্পর্ক শেষ হয় তিলোর। ডিভোর্স দিয়ে সে চলে আসে দিল্লি। আমরিক সিংয়ের একের পর এক হত্যা চলতেই থাকে। যুদ্ধ আর ব্যবসা এক, একাকার কাশ্মিরে। শান্তির জন্য যুদ্ধ, নাকি যুদ্ধের জন্য শান্তি। আমরিককেও পালাতে হয়। ব্যক্তিই রাষ্ট্রকে রক্ষা করে। কিন্তু এই রক্ষাকর্তা ব্যক্তিকেও রাষ্ট্র ছুড়ে ফেলে দিতে পারে। আমরিক সিংকেও জীবনের কোনো এক মুহূর্তে আমেরিকায় রাজনৈতিক আশ্রয় নিতে হয়। ভারত রাষ্ট্র তার নিজের প্রয়োজনে তাকে বাদ দেয় যুদ্ধ যুদ্ধ খেলার মাঝ থেকে। মুসাও আমেরিকায় যায়। যে তার কন্যা ও স্ত্রীকে হত্যা করেছে, পক্ষ-বিপক্ষের বহু লোক হত্যা করেছে—তাকে তো একজন বিপ্লবীর সাহায্যে তার কাছে পৌঁছানো দরকার। তার মগজের ভেতর পিতলের বীজ বুনে দেয়ার কথা। মুসার তো তাকে হত্যা করতে যাওয়াটা স্বাভাবিক। তাই না? সে আমরিক সিংকে খুঁজে বের করে। তাকে বলে তার কোনো ক্ষতি সে করতে চায় না। শুধু তাকে মনে করিয়ে দিতে চায় সে কী করেছে তার এক জীবনে, সভ্যতার বিরুদ্ধে। সে যেন শুধু ভুলে না যায় এই হত্যার ইতিহাস। এটাই আমরিককে সেলফ-ডেস্ট্রাকটিভ করে তোলে। আমরিক আত্মহত্যা করেছিল এরপর। মুসার ভাষায় আরও বলেছে ‘one day Kashmir will make India self destructive in the same way’, রাষ্ট্র যেন ভুলে না যায় সে কী করেছিল নিজ দেশের নাগরিকদের বিরুদ্ধে। ক্রিয়ার বিপরীত প্রতিক্রিয়ার জ্ঞান তার যেন থাকে। বিপ্লবী মানেই লাল খুন না শুধু; বিপ্লব মানে বিশ্বাস, সহযোগিতা আর প্রভাবিত করা সময়কে। মুসা সেই বিপ্লবী যার অস্ত্র শুধু বন্দুক না। অতীতকে মুছে ফেলা কিছুতেই সম্ভব নয়, অস্বীকারের কোনো উপায় নেই। শুধু যেন আমরা সেই ইতিহাসটা ভুলে না যাই। বিল্পবী এই ইতিহাসের শিক্ষা নিয়েই আগায়, নির্মাণ করে নতুন দেশের স্বপ্ন। মুসা মূলত আমরিককে সেলফ-ডিস্ট্রাকশনে উদ্বুদ্ধ করেছে। তাকে অন্তত উপলব্ধি করাতে সক্ষম হয়েছে আসলে সে কী করেছে। আর তিলো কমরেড রিভাথির কুড়িয়ে পাওয়া সন্তানের যোগসূত্রে স্থান পায় আঞ্জুমের জান্নাতে। সেই সূত্রে মুসাকেও দেখা যায় আঞ্জুমের কবরখানার জান্নাতে। সমগ্র ভারতের নিপীড়িত জনগণের জন্য কবরখানায় গড়ে ওঠা জান্নাত। এমন ছোট ছোট আরো অনেক গল্প আছে। শুধু ভারতের গল্প মনে হয় না, মনে হয় পৃথিবীর নিপীড়ক সকল রাষ্ট্রের ছবি যেন দেখতে বসেছি এখানে। পড়তে পড়তে নিজের মানচিত্রটাও ঢুকে যেতে পারে। রাষ্ট্র, মতাদর্শ, দেশপ্রেম, উন্নয়ন, শান্তি, বিচারের নামে মানুষের চেয়ে রাষ্ট্র বড় হয়ে ওঠে। দুনিয়াটাকে গোরস্থান বানিয়ে ফেলেছি আমরা, এটা যেন আমরা ভুলে না যাই। এই ভুলে না যাওয়া থেকেই জন্ম নিবে গোরস্থানে জান্নাত। গল্পগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেবে বারবার, সভ্যতার নামে কোন কবরস্থান বানিয়ে রেখেছি এই দুনিয়া।

জাতীয়তাবাদী ইস্যুতে শুধু ভারতের নাম নিলে তা একপেশে বিচার হয়ে যাবে। বিষয়টা শুধু ভারতের না। ভারত হলো এই উপন্যাসের একটা দেশ যা সকল দেশের প্রতিনিধিত্ব করে। পৃথিবীর যেখানেই ইতিহাসের ভুল ব্যাখ্যার উপর রাষ্ট্র পরিচালিত হয়েছে সেখানেই আপনি দেখতে পাবেন ডিভাইড অ্যান্ড রুলিং, রাষ্ট্র কর্তৃক রাষ্ট্রের নাগরিককে গণঅত্যাচার, হত্যা, ধর্ষণ। সরকারি সকল নথি থেকে খুব পরিকল্পিতভাবে আস্তে আস্তে তার নাগরিকদেরকে মুছে ফেলা হয়। চীনের উইঘুর বা তিব্বত, পাকিস্তানের বেলুচ, ভারতের কাশ্মির, মায়ানমারের আরাকান, বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম, বিরোধীদল দমন, শ্রীলঙ্কায় উকুনের মতো মানুষ হত্যার ইতিহাস—এ সমস্ত অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। এই অঞ্চলে জাতিগত ঘৃণার ফলাফল কত ভয়াবহ তার উদাহরণ ১৯৪৭, ১৯৭১। ভারত বনাম পাকিস্তান, পূর্ব পাকিস্তান বনাম পশ্চিম পাকিস্তান। ইতিহাসের এই শিক্ষার পরও কোন আশায় রাষ্ট্রগুলো হত্যার পর হত্যা করে যাচ্ছে আমাদের।

মানবসভ্যতা যদি বিলীন হয়ে যায় এবং এরপর একদল এলিয়েন যদি এই দুনিয়ায় আসে আর যদি বুঝতে চায় মানবজাতি কেমন ছিল তবে তাদের হাতে গ্যেটের ফাউস্ট দেওয়া যেতে পারে। ভিনগ্রহের এলিয়েন এই পুস্তক থেকে মানবচরিত্র ডিকোড করতে পারবে। আর অরুন্ধতীর The Ministry of Utmost Happiness পড়ে যে কেউ ডিকোড করতে পারবে ভারত নামক রাষ্ট্রটি কী ও কেমন। ফাউস্ট পড়ে মানবসভ্যতা বিলীন হবার কারণ খুঁজে পাওয়া যাবে না। কিন্তু পরমানন্দের মন্ত্রাণলায় পড়ে জানা যাবে কেন ভারত বিলীন হয়ে যেতে পারে, কাঁচের বাসনের মতো ঝনঝন শব্দে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়তে পারে এদিক সেদিক। শুধু ভারত না, যেকোনো রাষ্ট্র বোঝার জন্য এই বই সংরক্ষণ করা যেতে পারে। পরবর্তী প্রজন্ম আমাদের রাষ্ট্রচিন্তকদের হাঁ-মুখের মধ্যে কতগুলো হাঙ্গরের দাঁত আছে তা গুনে দেখতে পারে এই বইয়ের মাধ্যমে।

এই উপন্যাস দক্ষিণ এশিয়ার ভারত বাদে অন্য কোনো দেশে প্রকাশিত হলে তা ব্যান হতো। ধরুন এই বইয়ের লেখক কোনো চাইনিজ বা বাংলাদেশি বা পাকিস্তানি বা সিঙ্গাপুরি। ভাবা যায় কী-ই না হতে পারত রাষ্ট্রের তরফ থেকে তার বিরুদ্ধে! ভাবা যায় দিল্লির মসনদে ভারমিলিয়ন রেড পাগড়ি পরা লাল্লা মোদী জি ও তার খোলা তারোয়াল, যোগাসন! তিনি ও তার অনুসারীরা যখন ভাবছেন মোঘল আমলের পর এই প্রথম ভারত স্বাধীন হলো। যে হিন্দুরাষ্ট্রের স্বপ্ন ও চিন্তা বঙ্কিম আনন্দমঠ-এ করেছেন, সেই স্বপ্নের স্বরাজ কায়েম হলো। ভারত মানেই হলো হিন্দুত্ববাদ। এমন একটা সময়ে এই বই প্রকাশিত হলো! ভাবা যায়! কতটা উদারচেতা এই ভারত, ভারতের গণতন্ত্রের ওপেননেস। ভারতের লোহার বাসরঘরের ফুঁটো হলো এই উদারতা। এই উদারতার হাত ধরেই বিজেপি দিল্লির অধিপতি আজ। মানব-রক্ষার থেকে গরু-রক্ষার গুরুত্ব বোঝার মতো উদারতা কয়টা রাষ্ট্রপ্রধানের থাকে, বলুন! উদারতাই ভারত গণতন্ত্রের বেহুলার বাসর। এই উদারতার নাম করেই কাশ্মির আজও জ্বলছে। রাষ্ট্রের নাম নিয়ে চালানো হচ্ছে এ যুদ্ধ। এই যুদ্ধ শুধু অপর রাষ্ট্রের বিপক্ষে না, নিজ দেশের মানুষের বিরুদ্ধেও। এই উদারতার নাম ধরেই কর্পোরেটের হাতে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে একরের পর একর জমি, এর নাম উন্নয়ন, মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি। এই উদারতার নাম করেই মানুষকে মানুষের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এই উদারতার নাম করেই আমি যেহেতু হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ, সেহেতু মুসলিম/দলিত-নিধনের কিছু অধিকার রাখি। এই উদারতার নাম করেই ভারত হজম করে The Ministry of Utmost Happiness। তেমন সমস্যা হয় না। এই উদারতার নাম করেই রাষ্ট্র যা ছিল এবং যা আছে, ঠিক সেইভাবেই চালানো যায় বছরের পর বছর। এমনভাবে ভারতের রাজনীতির সংকট ও তার উত্তরণ নিয়ে অরুন্ধতী রায়ের মতো ১৩৫ বছরে আর কেউ সামগ্রিকভাবে উপন্যাস লেখে নি। বঙ্কিম, রবীন্দ্রনাথ আর গান্ধির ব্যাপক প্রভাব আছে ভারতীয় গণতন্ত্র ব্যবস্থায়। আনন্দমঠের পর এটিই দ্বিতীয় ভারতীয় জীবন্ত রাজনৈতিক উপন্যাস যা ভারতের সংবিধান থেকে শুরু করে রাষ্ট্রকাঠামোকে পরিবর্তনের অনেক সূচক দিতে পারে। এমন উপন্যাস পৃথিবীতে কয়টা আছে, বলুন?


The Ministry of Utmost Happiness প্রকাশের ভেতর দিয়ে জাতীয়তাবাদের মৃত্যু ঘোষিত হয়েছে।


শুধু ভারত না, উদার গণতান্ত্রিক যেকোনো দেশের স্বরূপ, সমস্যা ও সমাধান এই বই। ভারত হলো এই বইয়ের অনুসঙ্গ। জাতীয়তাবাদী চরম দেশপ্রেমী ধারণার উপর জন্ম নেওয়া সমস্ত দেশেরই চরিত্র একই। ঈশ্বরের নামে যেমন পশু বলি দেওয়া যায় তেমনি রাষ্ট্র নামক দেবীর নামে ক্রসফায়ার, গুম, খুন, ধর্ষণ, নিপীড়নকে আইন সন্মত হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া যায়।এইটাই আধুনিক রাষ্ট্র-ব্যবস্থার সমস্যা। উপমহাদেশের রাষ্ট্রগুলোর জাতীয়তাবাদী চিন্তার মূল হলো ভক্তিমূলক দেশপ্রেম নামক দেবী-চেতনা। এই অতিদেশ চেতনাই সমস্যাগুলোর কারণ এবং যা ঘটছে তা হলো এর ফলাফল। এবং এ থেকে উত্তরণের জন্য আমারা যা করতে পারি তার নির্দেশনাই পরমানন্দের মন্ত্রণালয়

আনন্দমঠ উগ্র, হৃদয়হীন জাতীয়তাবাদের গল্প। এই গল্পে এক বিপুল জনগোষ্ঠীর বিশ্বাস ছিল। এই অলীক গল্পের বিশ্বাস তিনটা দেশের জন্ম দিয়েছে, যা ছিল অবধারিত। এই তৈরিকৃত ফিকশনের কারণে মানুষ মরেছে কত-শত। মানুষের রক্তে ধুয়ে গিয়েছে ইতিহাসের পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা। ফলে, রাজনৈতিক শোষকরা মানুষকে ঘৃণা শিখিয়েছে। শত্রুতা আর অবিশ্বাস দিয়েই শুরু হয়েছে ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ। এই ঘৃণার বীজ কোথায়? শুধু খুঁজে পেলেই হবে না। এই ঘৃণাকে নতুন ভালোবাসার গল্প দিয়ে রিপ্লেস করতে হবে। মানুষ গল্প পছন্দ করে। জাতি-ঘৃৃণার ঊর্ধ্বে উঠে নতুন গল্প বলতে হবে। ভারতের জাতীয় সংগীতে ভাগ্যবিধাতা আছে। সেই বিধাতা মানুষ না, বিমূর্ত অলীক কিছু। ‘আমার সোনার বাংলা’য় মায়ের মলিন মুখ আছে। এই মা কে? এই মানুষের বিরুদ্ধে মানুষের জাতীয়তাবাদী মাতৃস্বরূপা দেশ নামক ধারণা দিয়ে রাষ্ট্রের নামে হত্যা, গুম, ধর্ষণ আইন-সম্মতভাবে চলছে। জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রের চরিত্রই এই। দেশ থেকে মানুষ বড়, প্রকৃতি বড়, সমস্ত প্রাণ ও জড় বড়। প্রাণ ও জড়কে সংরক্ষণ করতে হবে আমাদের। কিন্তু এই দেশের মাতৃরূপ, দেবীরূপ থেকে বের হবার গল্পটা ছিল না আমাদের এতদিন। অরুন্ধতীর The Ministry of Utmost Happiness হলো সেই ফিকশন যা আমাদেরকে আনন্দমঠ উৎসারিত উগ্র জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর নতুন গল্প দেয়। ১৩৫ বছর খুব বড় সময়। এখনো রক্ত ঝরছে ইতিহাস-গল্পগ্রন্থের পাতা থেকে।

উপন্যাসের শুরুতে আঞ্জুম যে গোরস্থানে আশ্রয় নিয়েছিল তার ফ্রি উইল, উইট চয়েজ। এই কবরখানা হলো বর্তমানের এই জাতীয়তাবাদী প্রতীকী রাষ্ট্র। সেই কবরখানাতেই সে তৈরি করল জান্নাত গেস্ট হাউস। পথের উদ্বাস্তু পশু থেকে মানুষ ও তার মত যেন স্থান পেল এখানে। পরমানন্দের মন্ত্রণালয় জন্ম নিল কবরখানার, মানুষের তৈরিকৃত জান্নাতে। এই গল্প থেকেই শুরু হতে পারে নতুন প্রাণ ও জড়ের দেশের ধারণা।

নিৎসে যেদিন পাগলা-গারদে গেল সেইদিন উত্তরাধুনিকতার জন্ম হলো। বিষয় হলো তারপরও আধুনিকতা চলছেই। তেমনি ২০১৭ সালে The Ministry of Utmost Happiness প্রকাশের ভেতর দিয়ে জাতীয়তাবাদের মৃত্যু ঘোষিত হয়েছে। এর মানে এই না, এখনই বিরাষ্ট্রীয় মানুষ-প্রধান রাষ্ট্র গড়ে উঠবে দেশে দেশে। আনন্দমঠ-এর পর পরমানন্দের মন্ত্রণালয় লিখিত হতে ভারতমাতাকে ১৩৫ বছর ধরে অরুন্ধতী রায়কে জরায়ুতে ধারণ করতে হয়েছে। বঙ্কিমের মতোই গুরুত্বপূর্ণ অথর তিনি। বঙ্কিম যেমন ভারতকে রাষ্ট্রচিন্তার প্রথম অস্ত্রটি দিয়েছেন, অরুন্ধতীও ভারত তথা সমগ্র দুনিয়াকে মানুষের পৃথিবী গড়ার গল্পটা মাত্র দিলেন। এই স্টেট ম্যানুয়ালের ব্যবহারিক বিধির প্রয়োগের কাজটা আমাদের।


লেখাটির সংক্ষিপ্তরূপ ‘শিরিষের ডালপালা’ ওয়েবজিনে প্রকাশিত

মৃদুল মাহবুব

জন্ম ৯ অ‌ক্টোবর ১৯৮৪। টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার। চাকরি করেন একটি বহুজা‌তিক কোম্পা‌নিতে।

প্রকাশিত বই :
কবিতা—
জল‌প্রিজমের গান [কবিয়াল, কলকাতা ২০১০]
কা‌ছিমের গ্রাম [চৈতন্য, ঢাকা ২০১৫]
উনমানুষের ভাষা [চৈতন্য, ঢাকা ২০১৭]

ই-মেইল : mridulmahbub@gmail.com