হোম বই নিয়ে হৃদয়সিঞ্চিত ঘাটে ধ্যানমগ্ন কবি

হৃদয়সিঞ্চিত ঘাটে ধ্যানমগ্ন কবি

হৃদয়সিঞ্চিত ঘাটে ধ্যানমগ্ন কবি
515
0

হিমেনেস বলেছেন, কবিতা ছাড়া তিনি কিছুই লিখতে জানেন না, এমনকি চিঠিও। ইংরেজ কবি অডেন কবিতাকে ‘মেমোরেবল স্পিচ’ বলেছেন। কল্পনাপ্রতিভার মহত্তম অভিব্যক্তি হলো কবিতা, বলেছেন বাঙালি কবি জীবনানন্দ দাশ। আর স্যান্ডবার্গ-এর মতে—কবিতা হচ্ছে প্রতিধ্বনি, একটা ছায়াকে নাচতে বলা।

নিস্তরঙ্গ, নিস্তব্ধতা-ছাওয়া এই সময়ে কবি মাসুদ খানের ২০২০-এর গ্রন্থমেলায় প্রকাশিত কবিতার বই ঊর্মিকুমার ঘাটে পড়ার কালে উপরে বলা কবি এবং কবিতার ক্রিটিকদের কথাগুলো ভালোরকম টের পাওয়া হলো। অনুভব করা হলো, নিস্তার মিলবে না এমন এক আলো-আঁধারির বোধ মগজে বুদবুদযুক্ত ধ্বনির সৃষ্টি করলে, আর মহত্তম সে-বোধের জন্ম হওয়ার সাথে কল্পনাপ্রতিভার অনিন্দ্যসুন্দর সম্মিলন হলে তবে জন্ম হয় যে কবিতার—বইটির কবিতাগুলোর অক্ষরে-অক্ষরে কবির হৃদয়টিই স্বয়ং যেন প্রকাশিত হয়ে আছে। বইটির প্রথম কবিতা ‘অলুক, অনশ্বর’ পড়েই একধরনের আকুলতা অনুভূত হয়েছে, মনে হয়েছে, এ-আকুলতা কবি-হৃদয়ের গোপন তলদেশ থেকে উৎসরিত হয়ে পাঠককেও সহসাথি করে। পাঠককে ভাবিয়ে তোলে :

অমরতা চাও? চাও অন্তহীন পরমায়ু?
বিলাপ থামাও, শোনো, আমরা যে যখনই আসি
অমরতা নিয়েই আসি হে অমৃতের সন্তান—
অলুক, অব্যয়, অনশ্বর, চির-আয়ুষ্মান।

[অলুক, অনশ্বর]

যে শূন্যতা শূন্যতাবোধে বিলোড়িত বিলীয়মান থাকে কবি-হৃদয়ে; আলোড়ন-বিলোড়নের অপার্থিব যন্ত্রণা যেন যন্ত্রণার অমৃত শরাব, কবিতার সে অমৃত যন্ত্রণার শরাবনতহুরা পান করে কবিতার আত্মনিমগ্নতা কবিকে যেন টেনে নিয়েছে বহুদূর, সূদুরে। দারুণ আত্মাভিমানে কবি বলেছেন মগজের কথকতা হৃদয়-সিঞ্চন ক’রে। হৃদয়ের শুদ্ধতম আকাঙ্ক্ষা থেকে কবি কামনা করেন মানুষে-মানুষে প্রীতির সম্মিলনের। প্রীতি পেলে কবি নিজেও, এমনকি বহু অবহেলা সয়েও, থেকে যেতে ইচ্ছুক নশ্বর পৃথিবীতে। মানুষের সাথে একই মিছিলের যাত্রী হয়ে যোগ দিবেন আবার প্রকৃতির প্রতিটি আয়োজনে, আর বহুকাল আগে ভুলে যাওয়া সহপাঠীদের ঝিলিক-মাখানো মর্নিং স্কুলের রোদ মেখে সেরে নিবেন শান্ত প্রভাতী গোসল। কিন্তু প্রীতি না পেলে এক মূহুর্তও কবির থাকার ইচ্ছে নেই—

জানি অবহেলা পাব, তবু
কখনো বেহাগ রাগে, কখনো তোটক ছন্দে ঘুরব
রঙচিত্র প্রজাপতিদের পিছু পিছু
বাজি ধরব শিকারসফল উদবিড়ালের অন্তরা থেকে সঞ্চারী অবধি
জলপলায়নরেখা বরাবর।

[প্রস্থানের আগে]

বোধকরি, উত্তম কবিতা সৃষ্টি করার জন্য কুহকী ভাষার শরীর নয়, তার জন্য বোধের জন্ম হতে হয়; মগজের বোধকে ধারণ করতে হয় হৃদয়ে। ঊর্মিকুমার ঘাটে কবিতার কিতাবটির গভীরে নিমজ্জন করে এই প্রমায় আনীত হতে হয়েছে, যে, কবি, মাসুদ খান, বোধের গভীরতায় সিঞ্চন করেছেন, অবগাহন করেছেন বোধের অতলতলে; এবং মগজের হৃদয় খুঁড়ে বের করে এনেছেন :

তারপর চুপচাপ চলে যাব কোনো একদিন,
দূরসম্পর্কের সেই মাথানিচু লাজুক আত্মীয়টির মতো,
নিজের নামটিকেই ভুলে ফেলে রেখে, তোমাদের কাছে।

[নাম]

একজন চিরবিষণ্ন নারী, ‘প্রশান্তি’ কবিতায়, প্রেমে যার পরিণয় ঘটে নি, এবং বিবাহের পর একটি বাচ্চা রেখে স্বামীটিও হয়তো প্রয়াত হয়েছে যার। সন্তানটি তার চিরবিষণ্ণ জননীকে স্রেফ কিছুক্ষণ হাসিখুশি দেখবে বলে মায়ের প্রাক্তন প্রেমিকের সাথে সমাজ-বহির্ভূত সম্পর্ক যাতে আরও অন্তরঙ্গতা পায় তার জন্য সে সিডিতে চালিয়ে দেয় সেই সব গান, যে গানগুলো গেয়ে ওঠে প্রেম-কামনায় ব্যাকুল প্রেমিক-প্রেমিকা। অথবা, ‘বাস্তবতা’ কবিতার পৃথিবীর চিরকালীন, হাজার বছর ধরে চলে আসা সামাজিক ব্যবস্থায় আমাদের উদ্ভ্রান্ত জননীরা, যারা বহুকাল ধরে নিখোঁজ, নিরুদ্দেশ, গুমখুন হয়ে যাওয়া সন্তানকে বিজলিচমকের মতো কাছে পেয়ে নিজে অভুক্ত থেকে অন্তরের কোন সে মগজচোখে অভুক্ত সন্তানের আহারের দৃশ্যটি আঁখিপাত করে। অথবা, ‘ব্যাপন’ কবিতাটিতে গোয়ালিনীর ছোট্ট একটি মেয়ের যে চিত্র, মনের আনন্দে সবার অলক্ষ্যে সারি-সারি দুগ্ধভাণ্ডে দুধে পানি মিশিয়ে যে কিনা পায় অনাবিল আনন্দ। অথচ, ছোট্ট মেয়েটি জানে না তার ঊনঘনত্বের দুধ মদীনা, মথুরা, রঙ্গালয়, রাজনীতিকদের ঘর আর কোথায় কোথায় যায়। অথবা, কিম্ভূতকিমাকার, আমাদের চিরপরিচিত অসুস্থ, অর্ধবিকল লোকাল ট্রেন আর লোকাল স্টেশনের অ্যাবসার্ড যে দৃশ্য কবি কবিতায় এঁকেছেন—ঘুমে ঢুলুঢুলু এক স্টেশনের বিধ্বস্ত এক কোণে কয়েকজন নির্দন্ত নুলা ভিখারি মেতে থাকে সম্মিলিত স্বমেহনে—যে স্টেশন স্বাক্ষী থাকে সমকামীদের পথকিশোরকে তুলে নিয়ে যাওয়ার; শবাহারীর সদ্যমৃত শিশুর লাশ তুলে নিয়ে যাওয়ার; ক্রমে কাঁপতে কাঁপতে ক্রসফায়ারের দিকে এগোনো চোখবাঁধা এক হতভাগার। অথচ, কেউ দেখে না ট্রেনটিকে। শুধু এক অ্যাবসার্ড চরিত্র, পরান মল্লিকের রাতজাগা ছেলে, সে-শুধু দেখে কুয়াশা-কালারের হিজাবে আরও অধিক কুয়াশায় ত্রস্তপায়ে দূরে, বহুদূরে চলে যায় ঘরপালানো পাখির ছদ্মবেশ এক-একজন নারী!

বইটির কয়েকটি কবিতায় এমনকিছু চিরসুন্দর, চিরসুখকর, চির-অতৃপ্ত, ভাবনা-জাগানিয়া চিত্র পড়া হয়েছে, যে চিত্র এবং চরিত্রগুলোকে মনে হয়েছে, কবিতার অক্ষরে কবির পেইন্টেড করা চিত্র। বলতে দ্বিধা নেই, কবিতার ছত্রে ছত্রে মাসুদ খান বাঙলা, বাংলাদেশের সমাজ, সামাজিক চিত্রগুলো নিপুণ হাতে এঁকেছেন। শুধু তাই নয়, এইসব চিত্রের মধ্য দিয়ে কবি যেসব বার্তা দিয়েছেন, সে-সব বার্তা অনুধাবন করে রীতিমত শিউরেও উঠতে হয়েছে। আমাদের রাষ্ট্রীয় এবং সামাজিক ব্যবস্থায় যা আমাদের সমক্ষে হলেও অগোচরে থাকে, তেমন লোমহর্ষক চিত্র। মানুষ মানুষের জীবনের উপর রাজনীতি করে; নিজেদের স্বার্থ অক্ষুণ্ন রাখতে কত অবলীলায় খুন করে মানুষকে। আর কবি-হৃদয় ব্যথিত হয়ে সেসব চিত্র আঁকে কবিতায়।

মানুষের জীবন যাতে ক’রে কেউ বন্দি না করে—রাষ্ট্র, রাষ্ট্রব্যবস্থা, রাষ্ট্রনীতিকদের চরিত্র, অন্যান্য প্রাণীদের উপর শোষকদের অত্যাচার কবি-হৃদয় মেনে নিতে পারে না, এটাই চিরসত্য, স্বাভাবিক। এই প্রেক্ষিতে বলতে হয়, মানবজাতি, পৃথিবী, জগৎ-সংসারের মঙ্গল কামনা করেন কবি। ফলত, লিখেছেন, প্রকাশ করেছেন নিজের অন্তরাত্মার ক্ষোভ শব্দ-বাক্য-ছন্দ-অলঙ্কারে। স্পষ্ট করে বলেছেন ‘মৌচাক রাষ্ট্রের সংবিধান’, ‘জাহাজডুবি’, ‘চিত্রনাট্য’ এবং ‘বিবর্তন’ কবিতায়।

‘অত্যন্ত ধনীর পুত্র আর তার সিরিয়াস বামপন্থাবিলাস
বাদামি চিনির প্রলেপ-দেওয়া যত ইষ্টকথা
মাত্রাছাড়া বামাসক্তি, একইসঙে একটানা বিষয়বাসনা…’

[চিত্রনাট্য]

‘এই সেই ঘন সান্দ্র কারণতরল
যাকে ঘিরে এত-এত রাষ্ট্রাচার ও অনুশাসন
ক্ষমাহীন নিষ্করুণ এত অমা-আইনকানুন।’

[মৌচাক-রাষ্ট্রের সংবিধান]

আর যারা ছিল খাদ্যচক্রের চূড়ায়-চড়ে-বসা শাহানশাহ
শিকলশিখর থেকে তারা তবে নেমে যাবে নিচে
অবরোহী পদ্ধতিতে?

[বিবর্তন]

কবিতার শরীর-আত্মায় ঢুকতে পারার একটা ব্যাপার থাকে, যেখানে পাঠককেও সহসাথি হতে হয় কবিতা পাঠ করার কালে। ব্যাপারটি, বইটি পড়ার কালে, একপর্যায়ে, ভালোরকম ভাবতে হয়েছে। দ্রোহ, প্রেম, আক্ষেপ, অহংকার, রাগ, কামনা-বাসনা, শত্রুতা-মিত্রতা, বিচ্ছেদ, তির্যক বাণ ছুড়ে দেয়া, প্রায়শ্চিত্ত—একটি কবিতার বই কতসব বিষয়ে, বুননকৌশলে ঠাসা। প্রেমের চিরন্তনতা, প্রেমের চিরন্তন রূপটি গুটিকয়েক কবিতায় যার কারণে বারবার চলে এসেছে। কিন্তু প্রেমের রূপটি রবীন্দ্রনাথ, এলিয়ট, কামিংস, নেরুদা, বোদলেয়ার, আরাগঁ, শের্কো ফয়িক, হিকমত, মায়াকোভস্কি, নজরুল, সুধীন, বুদ্ধদেব, জীবনানন্দ, বিনয় তথা কারোরই নয়, স্বয়ং মাসুদ খানের প্রেম। যার পরমা কথা বলে আর পরমার গান শুনবে বলে চেয়ে থাকে নির্নিমেষ কবি ওতপ্রোত ব্যগ্রভাবে।

কথাপ্রসঙ্গে কবির থেকে জ্ঞাত ছিলাম, ‘ঊর্মিকুমার ঘাটে’ নামটি নির্বাচন করে দিয়েছিলেন কবি মজনু শাহ, বইটির একটি কবিতার চরণ থেকে। ফলত, ‘যোগিনী ও মাছরাঙা পাখি’ কবিতাটি আলাদা করে রেখাপাত করে গিয়েছে। আলোকপাত করতে গেলে বলতে হয়, যেন কবি দাঁড়িয়ে আছেন মুষলধারে, আর বলে চলেছেন :

আর ওহে রঙ্গনের ঝোপে বসে-থাকা মীনরঙ্গ পাখি, তোকেও তো বলি
এ ঊর্মিকুমার ঘাটে প্রতিদিন আসে কত
রূপস্বিনী, রজকিনী, বউমাছ, বসন্তকুমারী—
প্রগলভা, রঙিলা, আর বিলোল, ব্যাপিকা কত চঞ্চলা শঙখিনী।

[যোগিনী ও মাছরাঙা পাখি]

পাখিতীর্থদিনে কবিতার বই দিয়ে শুরু করে নদীকূলে করি বাস, সরাইখানা ও হারানো মানুষ, প্রসন্ন দ্বীপদেশ-এর পর ঊর্মিকুমার ঘাটে এসে, সবিশেষ যেটা মনে হয়েছে, বোধ করি, কবির কবিতা-যাত্রায় একটি মায়াবী পালক যুক্ত হয়েছে। যুক্ত হয়েছে বাংলা কবিতায়। যে পালকে ভর করে মাসুদ খান উড়বেন কবিতা-আকাশে।


মূল পাতার লিংক : পরস্পর ঈদ আয়োজন ২০২০

ধ্রুব সাদিক

জন্ম ২রা জানুয়ারি ১৯৯৩, রংপুর। ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। ইংরেজি ডেইলি নিউ এইজ-এর সাংবাদিক।

ই-মেইল : alsadiq880@gmail.com

Latest posts by ধ্রুব সাদিক (see all)