হোম বই নিয়ে হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস ‘নি’ : প্রেম ও ফ্যান্টাসি

হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস ‘নি’ : প্রেম ও ফ্যান্টাসি

হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস ‘নি’ : প্রেম ও ফ্যান্টাসি
650
0

নি উপন্যাসের ভূমিকায় হুমায়ূন লিখেছেন, নি বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি নয়, ফ্যান্টাসি ধরনের রচনা। এই সাবধানবাণী তাকে উচ্চারণ করতে হয়েছে, কারণ এ বইকে বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি হিসাবে পাঠ করার কিছুটা প্রণোদনা খোদ বইটির ভিতরেই আছে। বলা হয়েছে, ‘নি’ এক ধরনের মানব-প্রজাতি, যাদের ক্রমোজমের সংখ্যা বেশি। অন্যদের যেখানে ছেচল্লিশটি ক্রমোজম থাকে, সেখানে নি-গোত্রভুক্তদের থাকে সাতচল্লিশটি। এই বাড়তি ক্রমোজম তাদের অভাবনীয় ক্ষমতার উৎস। নিজেদের কল্পনার জগৎকে বাস্তব রূপ দেয়ার অসাধারণ সামর্থ্য আছে তাদের, এবং নতুন দুনিয়া সৃজনের ক্ষমতার দিক থেকে তারা স্রষ্টার পর্যায়ভুক্ত। স্পষ্টতই এ কল্পনার ভিত্তি ‘বৈজ্ঞানিক’ বা ‘ছদ্ম-বৈজ্ঞানিক’ উপাত্ত। ফলে বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনির সাথে একে মিলিয়ে পাঠ করার একটা সুযোগ থাকছেই। কিন্তু লেখক একে পড়তে বা পড়াতে চান ফ্যান্টাসি হিসাবে। এ কথার অর্থ হলো, ফ্যান্টাসি হিসাবেই রচনাটির অধিকতর সামঞ্জস্যপূর্ণ পাঠ সম্ভব। আমরা পরে দেখব, লেখকের এই দাবি শুধু যে যৌক্তিক তাই নয়, অধিকতর তাৎপর্যপূর্ণ পাঠের জন্য এর কোনো বিকল্পও নাই। বস্তুত, লেখকের দিক থেকে উল্লেখ না থাকলেও যে কোনো ‘কুশলী’ পাঠক রচনাটিকে ফ্যান্টাসি হিসাবেই পড়বে।


কল্পনায় বহুদূর চলে যাওয়ার এবং নিয়ে যাওয়ার একটা সহজাত প্রতিভা তার ছিল।


কিন্তু ফ্যান্টাসি হিসাবে, বিশেষত দুনিয়াজোড়া খ্যাতিমান ফ্যান্টাসিগুলোর নিরিখে, রচনাটি পড়া যে খুব আমোদজনক তা-ও নয়। ফ্যান্টাসির মধ্যে রোমান্সের বিস্তর উপাদান থাকে। বাস্তবকে ছাড়িয়ে যাওয়াই উভয়ের নিয়তি, ফলে যতদূর যাওয়া যায় ততই ভালো। হুমায়ূনের বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনিগুলো প্রমাণ করে, কল্পনায় বহুদূর চলে যাওয়ার এবং নিয়ে যাওয়ার একটা সহজাত প্রতিভা তার ছিল। বিকল্প বা কল্পিত জগৎ নিয়ে তিনি বিস্তর কাজ করেছেন; কল্পনা করেছেন এমন সময় এবং উপাদানরাশি যা আমাদের চেনা দুনিয়ার সাথে সংযোগের চেয়ে বিযোগই বেশি রচনা করে। শিশুদের কল্পনার জগৎকে কিংবা নানা ধরনের প্রাণী ও উদ্ভিদকে খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে কল্পদুনিয়ার অঙ্গীভূত করে নেয়ার কুশলতা তার রচনায় ঢের পাই। এতে মনে হয়, রোমান্স তিনি খুব সাফল্যের সাথে রচনা করতে পারতেন—যদি চাইতেন; ফ্যান্টাসির বহুল-প্রচলিত ধরনগুলোর কোনো-কোনোটি বাংলা ভাষায় অন্য যে কারো চেয়ে সাফল্যের সাথে রচনা করতে পারতেন—যদি চাইতেন। কিন্তু করেন নি। যা করেছেন, তার প্রায় সবগুলোরই একটা হুমায়ূনীয় ঢং আছে। ফ্যান্টাসির মাত্রাকে কমিয়ে, বাস্তবের সীমানাকে খানিকটা বাড়িয়ে তিনি রচনা করতে চাইতেন এক ভিন্ন ধরনের ফ্যান্টাসি, যার মধ্যে ফ্যান্টাসির সীমানায় বাস্তবই খেলা করে। হুমায়ূনের এ ধরনের রচনার মধ্যে নিঃসন্দেহে নি শ্রেষ্ঠ। আর বলে রাখা হয়তো প্রয়োজনীয়ই, বাংলা সাহিত্যের এ ধরনের রচনার তুলনামূলক গরিব ভুবনে নি-র তুল্য রচনা সম্ভবত নাই।

ফ্যান্টাসি বংশের প্রধান যে বৈশিষ্ট্য—প্লট, চরিত্র এবং আবহের মধ্যে ফ্যান্টাসি উপাদানের কার্যকর ভূমিকা—তা নি-তে যথেষ্টই আছে। প্রধান চরিত্র মবিনুর রহমান একজন নি; তার কাজকারবারকে খুব সহজেই অন্যদের থেকে আলাদা করে নেয়া যায়। সে যে শেষ পর্যন্ত বাস্তবকে লঙ্ঘন করে নিজের মন-মতো ভুবন তৈরি করেছে, করতে পেরেছে, তাতেও কোনো সন্দেহ নাই। পুলিশের আওতা থেকে যেভাবে সে মুক্ত হলো তার মধ্যেও, কাহিনি পরিষ্কার সাক্ষ্য দিচ্ছে, ফ্যান্টাসির ভূমিকা আছে। এ কাজে তাকে সাহায্য করেছে তুলনামূলক কম ক্ষমতার আরেকজন নি—রূপার ভাস্তি জেবা। এগার বছরের মেয়েটি সংসারের খুব স্বাভাবিক দৈনন্দিনতার মধ্যে অস্বাভাবিক কেতায় জীবনযাপন করে। খুব সহজে বুঝে ফেলে তার ফুফু রূপা শিক্ষক মবিনুর রহমানের প্রেমে পড়েছে। আগেই জেনে ফেলে, খুব শিগগির এ বাড়িতে দুটি দল হবে, একদিকে থাকবে শুধুই রূপা, অন্যদিকে বাড়ির আর সকলে। সে তার ফুফুকে এই বলে আশ্বস্ত করে, সে থাকবে তার ফুফুর সাথে। ফুফুকে সাহায্য করবে তার গভীর গোপন ফ্যান্টাস্টিক ক্ষমতা দিয়ে। সে তার কথা রেখেছে। মবিনুর রহমানকে যখন থানায় ধরে নিয়ে যাওয়া হয়, তখন দুজন মানুষকে মানসিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করে সে কাজে খাটায় পরিস্থিতি সামাল দেয়ার জন্য। একজন স্কুলের দপ্তরি কালিপদ, অন্যজন ধর্ম ও আরবি-শিক্ষক জালালুদ্দিন। এরা দুজন মানসিক ক্ষমতাবলে মবিনুর রহমানের শত্রুদের কাবু করে ফেলে। শত্রুদের তালিকায় আছে স্কুলের হেডমাস্টার, বাজারের মেয়ে সাবিহা বেগম এবং থানার ওসি। মবিনুর রহমান মুক্ত হয়। কিন্তু শেষ রক্ষা হয় না। রূপা উত্তাল নদীতে ঝাঁপিয়ে আত্মহত্যা করেছিল। মবিনুর রহমান চেয়েছে তার ক্ষমতা ব্যবহার করে মৃত রূপাকে আবার জীবিত করে তুলতে। প্রকৃতির নিয়মের এই লঙ্ঘন প্রকৃতি মেনে নেয় নি। নদী এসে মবিনুর রহমানকে গ্রাস করে।

স্পষ্টতই ফ্যান্টাসি উপাদানের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে কাহিনির মূল বাঁকগুলো সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু এ-ও আমাদের দৃষ্টি এড়ায় না যে, উপাদানগুলো এমনভাবে কাজ করেছে যাতে বাস্তবের ন্যায় তাতে লঙ্ঘিত না হয়। বাস্তব মানে ডাহা বাস্তব। একেবারেই আশি বা নব্বইয়ের দশকের বাংলাদেশের যে কোনো থানা শহর। সেখানকার পুলিশপ্রশাসন ও শিক্ষাপ্রশাসন; স্কুলের শিক্ষকরুমে বসে থাকা কয়েকজন শিক্ষক আর তাদের আলাপচারিতা; ভুলোমন বিজ্ঞানশিক্ষক এবং করিৎকর্মা ধর্মশিক্ষক; থানা সদরের প্রভাবশালী ব্যক্তি, তার সুলক্ষণা কন্যা এবং সুপরিসর বাড়ি। গল্প বলার ওস্তাদ হুমায়ূন নিমেষেই বিশেষ কিছু বুঝতে না দিয়েই বেঁধে ফেলেন জমজমাট এক কাহিনি। মবিনুর রহমানকে এঁকে নেন শুরুতেই। তার অতীতের সাথে বর্তমানের বিচ্ছেদ তৈয়ার করেন। তাকে আলাদা করে নেন আর সবার কাছ থেকে। কিন্তু সে আলাদা হয় এমনসব বৈশিষ্ট্যের জন্য, এমনসব আচরণ আর তৎপরতার জন্য, যেগুলো তার প্রতি এলাকাবাসীর সশ্রদ্ধ ভালোবাসারও জন্ম দেবে। তার চেয়ে বড় কথা, দৈনন্দিনতার সাথে কোনো বিরোধ তৈরি করবে না। দপ্তরি কালিপদের পৈতৃক নিবাস লোকালয় থেকে খানিকটা দূরে। পড়ো-পড়ো দশা আর সাপের উৎপাতের জন্য সে সেখানে থাকে না। সে ঘরই ভাড়া নেয় মবিনুর। তাতে লোকালয়ের খানিকটা বাইরে থাকা হয়। এমন এক ভবনে থাকা হয় যেখানে সাপের উপদ্রবের মধ্যে ভাঙা ছাদের নিচে থাকায় অস্বাভাবিকতা তৈরি হবে, কিন্তু ব্যাপারটা কোনো দিক থেকেই অসম্ভব মনে হবে না। গল্পের দিক থেকেও না, গল্পের চরিত্রগুলোর দিক থেকেও না। বাড়তি সুবিধা হয় এই যে, কালিপদ তার এই ভাড়াটিয়া শিক্ষককে খুব নিবিড়ভাবে চেনার সুযোগ পায়। তার ভক্তিমন্ত হয়ে ওঠার নানান কারণ ঘটে। এবং কাহিনির শেষদিকে সে জরুরি ভূমিকা পালন করে। স্কুলের শিক্ষক কমনরুমে মবিনুর রহমানের পাশের চেয়ারে বসে জালালুদ্দিন। তাদের দুজনের ভিতরে-বাইরে কোনো মিল না থাকলেও স্বভাবের গভীরতর কোনো বৈশিষ্ট্যের কারণে ভালোই খাতির হয়। জালালুদ্দিন মবিনুর রহমানকে গভীরভাবে আবিষ্কার করে ভালো-মানুষ হিসাবে, যার নীতি-নৈতিকতার উপর ভরসা করা যায়। কাহিনির শেষভাগে সে যে জরুরি দায়িত্ব পালন করবে, তার বাস্তব শিকড় এভাবে আগে থেকেই পোঁতা ছিল।


সে শুধু নিজেকে অতিশক্তিমান ‘নি’ হিসাবেই আবিষ্কার করে নি, নিজেকে বিস্মিত করে দিয়ে প্রকৃতির সৌন্দর্য অনুসন্ধান করাও শুরু করেছে।


প্রাথমিক পরিচিতি সম্পন্ন হওয়ার পর এ উপন্যাসের প্রধান দুটি ঘটনা ঘটে প্রায় একই সাথে। দুটিরই কেন্দ্র মবিনুর রহমান। এ অঞ্চলের প্রভাবশালী আফজাল চেয়ারম্যানের মেয়ে রূপা মবিনুরের প্রেমে পড়ে নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারায় অথবা নতুনতর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে; আর স্কুলের হেডমাস্টার নিজের গমচুরির দায় পুরোপুরি মবিনুরের উপর দিয়ে মামলায় তাকে ফাঁসিয়ে দেয়। দুটি ঘটনাই ঘটে বাস্তবের অস্থি-পাঁজরের ভিতর থেকে, কোনোভাবেই দৈনন্দিনতার ন্যায় লঙ্ঘিত হয় নি এসব ঘটনায়, আর লেখক আক্ষরিক অর্থেই উল্লেখযোগ্য মুনশিয়ানায় দুটি ঘটনাকে একত্রে বুনে মিলিয়ে দিলেন পরস্পরের সাথে। রূপাকে মবিনুর পড়ায় মাস ছয়েক হলো। রূপার বয়স এমন যে, তাকে কিশোরী বলা যায় না। তার প্রেমের প্রকৃতি অবশ্য বেশ খানিকটা বয়ঃসন্ধিকালের; অন্তত হুমায়ূন আমার আছে জল-এর মতো বেশ কিছু স্মরণীয় রচনায় কিশোরীর বয়ঃসন্ধিকালীন প্রেমের যে ছক আবিষ্কার করেছেন, তার নিরিখে এ কথা নিশ্চিত করে বলা সম্ভব। কিন্তু এ রচনায় নিজের পক্ষে রূপার যে শক্ত অবস্থান তার সাথে ওই ছক যায় না। ফলে রূপার বয়স বাড়াতে হয়েছে। অনেকটা ‘হৈমন্তী’ গল্পে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যে কারণে হৈমন্তীর বয়স বাড়িয়েছেন। বলা হয়েছে, অসুস্থতাজনিত কারণে রূপা আগের বছর এসএসসি পরীক্ষা দেয় নি। তার বয়স আরো বাড়ানো সম্ভব ছিল না। সেরকম হলে মবিনুরের সাথে তার দেখা হওয়ার সম্ভাবনা কমে যেত। তার চেয়ে বড় কথা, বাস্তব ও সামাজিক ভাষায় অভ্যস্ত কারো পক্ষে জীবনবিনাশী সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা অনেক কম।

রূপার দিক থেকে আকর্ষণজনিত আবেগ অনেকদিন থেকে বিকশিত হয়ে হয়ে পরিপূর্ণ মূর্তি পেয়ে যাওয়ার পর ব্যাপারটা মবিনুরের চোখে পড়ে। সেদিন সন্ধ্যায় ঘটনাটা ঘটে, যেদিন পাঠকদের সাথে রূপার প্রথম পরিচয় ঘটেছে। বলার সঙ্গত কারণ আছে, অচেতনে যে আকাঙ্ক্ষা মবিনুরের আগে থেকেই ছিল, নিজের বিশেষ জীবনধারা ও চিন্তাপ্রণালির জন্য যে আকাঙ্ক্ষাকে নিজের মনের ভাষায় রূপান্তরের আগ্রহও তার জাগে নাই, সামাজিক ভাষার প্রচণ্ড বিরোধিতার সম্ভাবনায় যে আবেগকে চেতনলোকে প্রশ্রয় দেয়ার কথা মবিনুরের কখনো মনে হয় নাই, রূপার সম্মতি এবং সম্মতির তীব্রতা আবিষ্কৃত হওয়ার পর তা মনের গহনে বাসা বাঁধে। রূপা ফ্যান্টাস্টিক মেয়েই বটে। পড়াশোনায় ভালো। বুদ্ধিতে চৌকস। আচরণে সপ্রতিভ। শারীরিক সৌন্দর্যে দুর্লভ প্রজাতির। বহুজনের মুখ দিয়ে বা বলা-না-বলা ভাষায় রূপার যে প্রবল সম্মোহনী রূপের পরিচয় লেখক তৈরি করেছেন, মবিনুরের তা থেকে মুক্ত থাকার কোনো কারণ নাই। সে আসলে মুক্ত থাকেও নাই। আগে ব্যাপারটাকে সে চেতনলোকে আসতে দেয় নাই। রূপার সম্মতি আবিষ্কৃত হওয়ার পরেও সামাজিক ভাষায় সে আবেগটা প্রকাশ করে নাই। কিন্তু তার চেতন-অচেতন এক নতুন লোকে উপনীত হয়েছে, জীবনযাপনের যাবতীয় ‘অস্বাভাবিকতা’ সত্ত্বেও আগে যার সাথে তুলনীয় কোনো কিছু তার জীবনে ঘটে নাই। ঠিক এ জায়গাটাতেই মনে হয়, নি ফ্যান্টাসি বা আর কিছু নয়, বিশুদ্ধ প্রেমের উপন্যাস। সেই মাপের রচনা যেগুলো নতুন সংজ্ঞায়ন করে, নতুন প্যাটার্ন তৈরি করে। আরো মনে হয়, হুমায়ূনের প্রেম-ধারণা প্রধানত নারীমূলক হলেও অন্তত এ উপন্যাসে তা ‘পুরুষমূলক’। পুরুষের সক্রিয়তাই প্রধান। বাসনার অনুকূলে যে জীবনবিধ্বংসী সক্রিয়তা, তা-ই সেই প্রেমের তুরীয় প্রকাশ।

এরকম পাঠ-নির্ণয়ের পক্ষে জোরাল যুক্তি হাজির হয় যখন দেখি মবিনুর কথিত নি-বৃদ্ধদের অস্পষ্ট মুখ দেখতে পায় ঠিক সেদিন যেদিন রূপার মতি এবং গতি তার কাছে স্পষ্ট হয়। সে যে ঝড়বৃষ্টির কারণে মে মাসের দুই তারিখে পড়াতে যায় নি, রূপা তা মনে রেখেছে। পড়ার মাঝখানে শাড়ি পালটে এসেছে। একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকেও মবিনুরের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। মবিনুরের উপর তার প্রভাব পড়েছে গভীরভাবে। সে শুধু নিজেকে অতিশক্তিমান ‘নি’ হিসাবেই আবিষ্কার করে নি, নিজেকে বিস্মিত করে দিয়ে প্রকৃতির সৌন্দর্য অনুসন্ধান করাও শুরু করেছে। শরীর খারাপের অজুহাতে স্কুল কামাই দিয়েছে, যা তার ক্ষেত্রে আগে কখনো ঘটে নি। শরীর খারাপ বললেও তার কোনো লক্ষণ আমরা দেখতে পাই না। ফলে ব্যাপারটা মনোজাগতিক ভাবতে কোনো অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। আর এই নিরিখকে সামনে রেখে যদি পুরো ঘটনাপ্রবাহ আরেকবার বিচড়ে দেখি, তাহলে বোঝা যাবে ফ্যান্টাসি হিসাবে না দেখে পুরো ঘটনাবলিকে মনোজাগতিক বিপর্যয়ের অতিরেক হিসাবে ভাবা খুবই সম্ভব এবং সঙ্গত।

অতি শক্তিমান ‘নি’ হিসাবে মবিনুর কি এমন কোনো সুবিধা পেয়েছে যা তার আকাঙ্ক্ষার অনুকূলে কাজ করেছে? পায় নি। রান্নার সময়ে যে শব্দময় জগৎ তৈরি হওয়ায় কথিত নি-রা তাকে বাহবা দিয়েছে, তা যে কারো ঘোরের মধ্যে তৈরি হতে পারে। চির-জোছনার কল্পনা থেকে জোছনামাখা যে জগৎ সে আধা-ঘুম আধা-জাগরণে দেখে ঘোঁ ঘোঁ শব্দে নৌকার ছাদে পাশে বসে থাকা জালালুদ্দিনকে চমকে দিয়েছে, সে পরিস্থিতিও ঘোরের মধ্যে বা স্বপ্নে বা মানসিক বৈকল্যে সম্ভব। মনে রাখা দরকার, দুটি ঘটনাই ঘটেছে তার রূপা-আবিষ্কারের পর। বাস্তবে কোনোভাবেই এই রূপা-লাভ সম্ভব নয়—এরকম মানসিক ঘোরের মধ্যে যদি এই মনস্তাত্ত্বিক নিরীক্ষা অচেতনে হয়ে থাকে, তাহলে মানব মনস্তত্ত্বের দিক থেকে তাকে কিছুতেই অবাস্তব বলা যাবে না। এ ধরনের ঘটনা স্বপ্নে ঘটতে পারে, সিজোফ্রেনিয়ার মতো মনোবিকলনের ক্ষেত্রে ঘটতে পারে, এমনকি ইচ্ছার প্রচণ্ড তীব্রতার মধ্যেও ঘটতে পারে। এরকম ভাবার পক্ষে অন্তত দু-প্রস্ত কারণ আছে। এক. মবিনুরের মনে হয়েছে, কাছাকাছি ধরনের স্বপ্ন সে দেখেছে সেই দূর শৈশবে। সেই স্মৃতি অস্পষ্ট। এখন যে ‘নি’-দের দেখছে সে, তারাও অস্পষ্ট। মাঝের কয়েক দশকে এ ধরনের কোনো স্বপ্ন সে দেখে নি। দুই. কথিত ‘নি’রা আসলে তার জন্য প্রত্যক্ষত কিছুই করে নি। যদিও বলা হয়েছে, প্রতিকূলতা থেকে মবিনুরকে বাঁচানোর জন্য তারা চেষ্টা করবে, কিন্তু বাস্তবে আমরা এমন কিছু ঘটতে দেখি না, যাকে অতিপ্রাকৃত বলা যেতে পারে।

আসলেই ঘটে নি। মবিনকে থানায় নিয়ে যাওয়ার পথে এবং থানার চারপাশে বিস্তর লোকসমাগম হয়েছে। এটা মোটেই অভাবনীয় নয়। যাদের সাথে আমাদের প্রত্যক্ষত কথা হয়েছে—জালালুদ্দিন, হরিপদ, আফজাল—তারা প্রত্যেকেই বলেছে, গমচুরির ব্যাপারটা মবিনুর করতেই পারে না। আমাদের আগেই জানানো হয়েছে, নীলগঞ্জের মানুষের ভালোবাসা পেয়েছেন মবিনুর। এমতাবস্থায় থানার চারপাশে লোক জমায়েত হওয়া অবাস্তব নয়। এই জমায়েত যে কোনো অলৌকিক ইশারায় হয় নি সে প্রমাণ দাখিল করতেই যেন মবিনুরের বিরুদ্ধে ‘রেপ কেইসে’র সংবাদ শুনে তারা চলে যেতে শুরু করে। কালিপদ যে হেডমাস্টারকে ও বাজারের মেয়েটিকে আর জালালুদ্দিন যে থানার ওসিকে কায়দা করতে পারল তার পেছনে থানার চারপাশে লোক-জমায়েতের ভূমিকা থাকা খুবই সম্ভব। সম্ভব এমনকি নদীভাঙনের কবল থেকে মবিনুরের আবাস এবং নৌকার রেহাই পাওয়া। নদী সব বাঁকে সমান মাত্রায় উত্তাল হয়ে ওঠে না। নদীভাঙনও সব জায়গায় একই সাথে শুরু হয় না। রাতে বাজারের অংশে ভেঙে মবিনুরকে নৌকা ও বসতিসমেত নদী সকালে গ্রাস করতেই পারে।


ফ্যান্টাসি এ উপন্যাসের ছদ্মবেশ নয়, আবরণ বা আভরণ নয়, আত্মাই বটে।


পুরো কাহিনিটি এভাবে দ্বিতীয়বার পড়ার পর কোনো সন্দেহ থাকে না যে, অতিপ্রাকৃত বা ফ্যান্টাসি বলা যায় এমন কিছু নি উপন্যাসের মূল কাঠামোয় কোনো প্রভাব ফেলে নি। এ অর্থে ফ্যান্টাসি এ কাহিনির ছদ্মবেশ মাত্র। আদতে যাকে ফ্যান্টাসি বলে মনে হয় তা মবিনুরের তীব্র আবেগজনিত কল্পনা, যা বাস্তবের মতোই প্রতিভাত হয়। সে তো আবাল্য জেনে-বুঝে এসেছে, সে অন্যদের মতো নয়। তার আয়না হয়ে অন্যরা একথা কি তাকে অসংখ্যবার বলে নি? নিজের বুঝ আর অন্যের বুঝ মিলে তার মধ্যে এই গভীর প্রতীতি কাজ করতেই পারে যে, সে আলাদা। বিজ্ঞানের ছাত্র হিসাবে এই স্বাতন্ত্র্য তার কল্পনায় একটি বাড়তি ক্রমোজমের কাণ্ড বলে মনে হওয়া খুবই সম্ভব। আর নিজেকে প্রকৃতির বিশেষ পছন্দের মানুষ হিসাবে ভাববারও কারণ আছে বৈকি! চন্দ্রবোড়া সাপের সাথে সহাবস্থান তো প্রকৃতি সম্পর্কে তার দার্শনিক সিদ্ধান্তের ফল। ঔষধ প্রয়োগ করে ধানের পোকা ধ্বংস করার খবর তাকে উদ্বিগ্ন করে। প্রকৃতির স্বাভাবিক সংস্থান সম্পর্কে এতটা সতর্ক একজন যদি প্রকৃতির পক্ষপাত দাবি করে বসে, তাহলে বিশেষ দোষ দেয়া যায় না। বিশেষত এখন যখন তার জন্য এ ধরনের আনুকূল্য খুব জরুরি হয়ে উঠেছে। নারীর সাহচর্য, আবেগ এবং সৌন্দর্যবোধ ছাড়াই যৌবন কাটিয়ে দেয়া মানুষটি সহসা রূপার অভাবিত আশকারা পেয়ে নিজের বাড়তি ‘অতিপ্রাকৃত’ ক্ষমতায় আগ্রহী হয়ে ওঠে। সামাজিক বা সাংস্কৃতিক ভাষার মধ্যে যা কখনোই ঘটবার নয়; নিজের বয়স, দারিদ্র্য, স্বভাব ও অভ্যস্ততার মধ্যে রূপাকে বাস্তবে পাবার লড়াইটা যেখানে অর্থহীন—অর্থহীন কেবল অন্যের বিরুদ্ধতার জন্য নয়, নিজের নৈতিকতা ও নিজের বাস্তবের ন্যায় লঙ্ঘনের আশঙ্কার জন্যও—তখন বিকল্প বাস্তবে রূপাকে পাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষাই মবিনুরের একমাত্র বাস্তব হয়ে ওঠে। লক্ষণীয়, রূপা নদীতে আত্মাহুতি দেয়ার আগেই মবিনুরের এই আকাঙ্ক্ষা মূর্তি পাচ্ছিল। কল্পনার ‘নি’রা তাকে একদিকে বাহবা দিচ্ছিল জোছনাশোভিত কল্পলোক বা শব্দময় বস্তুলোক তৈরির সাফল্যের জন্য—এবং এভাবে অধিকতর জটিল কল্পনাকে ব্যক্তিগত বাস্তবে রূপান্তরের একটা ধারাক্রম তৈরি হচ্ছিল; অন্যদিকে আবার নিরন্তর ভীতি প্রকাশ করছিল প্রকৃতির নিয়ম লঙ্ঘনের যে কোনো উদ্যোগ সম্পর্কে। নিশ্চিতভাবেই শরীর খারাপের অজুহাতে স্কুলে না যাওয়ার এবং রূপাকে এড়িয়ে চলার সেই দিনগুলোতে এটা ছিল মবিনুরের কল্প-অভিযানের ক্রম-অগ্রসরতা আর তার বিপরীতে অচেতনের সাবধানবাণী। সেই সাবধানবাণী হয়তো নিজেকে ধ্বংস করার অমোঘ যুক্তি মাত্র। থানা থেকে ছাড়া পেয়ে বাড়ি ফেরার সময়ে ঘুরপথে রূপার বাড়িতে হাজির হয়েছিল মবিনুর। সামাজিক বিধি আর ভাষার অধীন রূপা মবিনুরের সাথে চলে আসতে চেয়েছিল। কিন্তু বিদ্যমান ভাষাকাঠামোয় এ ধরনের বিপর্যয় ঘটানো মবিনুরের পক্ষে সম্ভব ছিল না। অথচ তার আবেগ ছিল তীব্র, হয়তো এ ধরনের আবেগের সাথে পূর্ব-পরিচয়ের অভাবেই। রূপা আত্মবিসর্জনের মধ্য দিয়ে ওই সম্পর্কের জাল ছিন্ন করলে মবিনুরের বাসনার পরিপূরণের সুযোগ তৈরি হয়। অনুপস্থিত রূপাকে বাস্তবে হাজির করে সে অগ্রসর হয় বিলয়ের দিকে। ভাঙতে ভাঙতে এগিয়ে আসা নদী তার কাজকে সহজ করে দিয়েছিল মাত্র।

হুমায়ূনের প্রেম-সম্পর্ক প্রায়শই অসামাজিক, এ অর্থে যে, সামাজিক ভাষার সম্মতির মধ্যে প্রেমজনিত আবেগ তীব্র হয়ে ওঠার কোনো উপলক্ষ তৈরি হয় না। একই কারণে এ সম্পর্ক অনেক ক্ষেত্রেই ট্র্যাজিক। মবিনুরের কল্পলোককে বলতে পারি এই ট্র্যাজেডি শমিত করে আনার প্রকল্প। কাজটা করতে হয়েছে, কারণ সামাজিক ভাষায় যে বাসনার অনুবাদ হয় না তা আসলে ফ্যান্টাসিই। এদিক থেকে মনে হয়, এতক্ষণ নি উপন্যাসের বাস্তবলিপ্ততা সম্পর্কে যা বলেছি, তা সত্যের একদিক মাত্র। মনে হয়, ফ্যান্টাসি এ উপন্যাসের ছদ্মবেশ নয়, আবরণ বা আভরণ নয়, আত্মাই বটে। লেখক ফ্যান্টাসির মতো করে ঘটনা সাজিয়েছেন, আমাদের সেভাবে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করেছেন, মবিনুরের তৈরি করা রূপাকে প্রায় দেখিয়ে দিয়েছেন হরিপদকে, রূপার ভাস্তি জেবাকে এমনভাবে বানিয়েছেন যেন কম শক্তিমান ‘নি’ হিসাবে সে ঘটনাপরম্পরায় যথেষ্ট পরিমাণে উপস্থিত থেকেছে। লেখক চেয়েছেন, আমরা ফ্যান্টাসি হিসাবেই একে ভাবি। কারণ, অন্য দশ বাসনার মতো এই বাসনার আকারও ফ্যান্টাসির মতোই—রূপার দিক থেকে বেশ কতকটা, আর মবিনুরের দিক থেকে সবটাই।

 

[প্রকাশিতব্য গ্রন্থ হুমায়ূন আহমেদ : পাঠপদ্ধতি ও তাৎপর্য-এর অংশবিশেষ।]

ঈদসংখ্যা ২০১৯

Mohammad Aza

মোহাম্মদ আজম

জন্ম ২৩ আগস্ট ১৯৭৫, হাতিয়া, নোয়াখালী। এম এ বাংলা, ঢাবি, পিএইচ ডি, ঢাবি। সহযোগী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, ঢাবি।

প্রকাশিত বই :
বাংলা ভাষার উপনিবেশায়ন ও রবীন্দ্রনাথ [আদর্শ, ঢাকা, ২০১৪]

ই-মেইল : mazambangla1975@gmail.com
Mohammad Aza