হোম বই নিয়ে স্কুল বলতে তোমাকেই বুঝি : দৃশ্যান্তরের ভিতর দিয়ে দগ্ধ অরণ্য

স্কুল বলতে তোমাকেই বুঝি : দৃশ্যান্তরের ভিতর দিয়ে দগ্ধ অরণ্য

স্কুল বলতে তোমাকেই বুঝি : দৃশ্যান্তরের ভিতর দিয়ে দগ্ধ অরণ্য
220
0

কবি জাহানারা পারভীনের লেখা কবিতার বই স্কুল বলতে তোমাকেই বুঝি। যদিও কবিতা পড়তে ভালোবাসি তবু উনার লেখা অন্য কবিতার বই আমার পড়া হয়ে ওঠে নি। তবে এই বইটি আমি কিনেছিলাম ২০১৫ বইমেলায়। অনেকদিন সময়ের অভাবে বইটিতে মনোনিবেশের সময় ছিল না। কিন্তু বইটি সেলফের এক কোণে নিজের শক্তিশালী ইমেজ নিয়ে আমাকে প্রতিনিয়তই টানছিল। তারপর একদিন পাতা ওল্টাবার দিন এল। একান্ত পাঠে বইটিকে আমি বেশ কয়েকবার পড়লাম। গদ্য কবিতা, কিন্তু মাঝে মাঝে আবার ছন্দের নেশা। কোথাও কোথাও অন্ত্যমিল এসে পড়েছে অভ্যাসবশতই।

‘কেন যে ঐ শীতকালটার সাথে দেখা!
নভেম্বরের সাথে তো শত্রুতা ছিল না কোনো
শিরীষগাছেরা কাঠের ভেতর
লুকিয়ে রাখল বাকল,
ক্ষতচিহ্ন, কষ, গাছের সীমারেখা।’

অনেকদিন ধরেই লিখছেন তিনি। লেখার চর্চার ভিতর রয়েছেন বলেই লেখার ভিতর চর্চার সেই চকচকে ভাবটি রয়েছে। প্রতিটি পরতে পরতে রয়েছে গোপন অভিযাত্রা। কবিতার ভাষা একেবারেই আলাদা। লক্ষণীয় তার ঋজুতা, ও কাঠামোগত নির্মাণ। কবিতার ভিতরের শব্দগুলি এত বলিষ্ঠ! পড়বার পর এক মানসিক প্রতিক্রিয়া জেগে ওঠে, তারপর কত ভাবনা যেন নিজ থেকেই ঝিকমিকিয়ে ওঠে।

কয়েকটি শিরোনামে ভাগ করা এই কবিতার বইটি। প্রথম শিরোনাামটিই যেন একটি চাপা ভর্ৎসনা। ‘কেন এত আন্দোলন কলপাড়ে, অব্যবহৃত জলের?’ যেন সকল নৈরাজ্য আর নৈরাশ্যের ভিড়ে একটি দৃঢ় প্রশ্ন! যেন পৃথিবীটা এরকম না হয়ে হতে পারত অন্যরকম।

‘হাটের মাঠে দাঁড়িয়ে থাকা বুড়ো অশথ সাক্ষী, চোখের জলে কেনা সেসব মুহূর্ত এখনো আছে বেঁচে, হাঁড়িতে থাকা জিয়ল মাছের সাথে—ঘোলা জলের অপমানে।’

‘অশথের গ্রামে স্বীকার করে নেয়া বনসাই জীবন!’


প্রকাশভঙ্গি ও মেজাজ কবির নিজস্ব নিয়মে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। শব্দচয়ন ও বুননে কবি নিজের মতো করেই কুশলী। চিন্তার জায়গাগুলো ইঙ্গিতময়।


কবিতার মুভমেন্ট ও ফ্লোয়ের মধ্যে যখন ভাসতে থাকে এই রকম বাক্য, যখন পড়তে পড়তে খানিকটা থমকে যাই, ভাবতে থাকি, আর শব্দেরা কেবল ঘুরপাক খায় মাথার ভিতর। ‘সামান্য নয়, অসামান্য সরুপথ হেঁটে এসেছি এখানে, যেন গোপন যুদ্ধের সুড়ঙ্গভাঙা অন্ধকারে। তুমি না আলোর সন্তা্ন! ঈশ্বরের বরপুত্র! হাতে জিয়নকাঠি আমার। কোনো কোনো প্রেম তবে বাঁচে এভাবেই? খুঁড়িয়ে, অবসাদে, অবহেলায়? প্রকৃত মানুষ তবু বেড়ে ওঠে মনে, গোপনে। ফসিলের জঞ্জাল থেকেও জন্ম নেয় নতুন চারা। তুমি দেখতে পাওনি, ফেলে আসা দীর্ঘ সংগ্রাম! ডোবায় জিইয়ে রাখা নৌকায় সাপ, মাছের সংসার। এক জীবনে এত দূরত্ব নির্মাণ করে মানুষ!’

কবিতায় জীবন, আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন, হতাশা, অপ্রাপ্তি—সমস্ত মানসিক প্রক্রিয়ার প্রতিফলন ঘটেছে। কবির বোধিতে একে কী সচেতন নির্মাণ বলব! অথবা কবির অজান্তেই কবিকে দিয়ে লিখিয়ে নিয়েছেন তার অবচেতন! আমি নিমগ্ন পাঠক হয়ে ভাবতে থাকি কবিতার হয়ে ওঠার কথা। কবির অনুভবগুলি নিজস্ব কায়দায় হয়ে উঠেছে অগাধ নীল জলের মতো। যেখানে আছে সংবেদনশীল মানুষটির তীব্র বেদনা, স্বপ্নগুলো ভেঙে পড়তে দেখা মানুষের গাঢ় প্রশ্ন, উপলব্ধি ও উচ্চারণ।

‘তুমি সর্ম্পকের কফিনে ঠুকেছ শেষ পেরেক। আমি নুনের গামলায় ডুবিয়ে রেখেছি শিংয়ের ঘাই খাওয়া রক্তাক্ত হাত।’

এক সর্বগ্রাসী বিপন্নতার আঘাতে যেন ক্রমশই মৃত্যুর শীতলতা অনুভব করি। কবিতার পাতায় যতই এগোই ততই রুদ্ধদ্বার, ততই উন্মোচন।

‘তবে তো ঘোলাই হল পাঠ্য জল! ভুল শব্দের এককে মেপেছে যে আমায়, ঈশ্বরের দোহাই সে আমি নই, অন্য কেউ। শব্দের বিষাক্ত তির ছুড়েছে যে, সে তুমি নও, অন্য কোনো জন। পাথরের নিচে চাপা পড়া শবদেহ থেকে উঠে আসা ছায়া। পেছনে তাকিয়ে দেখি ডাইনির হাতের মুঠোয় ঘুমিয়ে থাকা ডালিমকুমারের মুখ।’

যখন স্বপ্নগুলিও রুদ্ধদ্বারের কাছে বন্দি, তখন এক বিশাল দিক্‌ভ্রান্ত মন ক্রুশকাঠে মাথা ঠুকে মরে। একদিকে নতুন পথ, অন্য দিকে রুদ্ধদ্বার।—‘সব পরিচর্যা হারিয়ে দেয় কাকনদাসি এক’—কবিতার প্যারাগ্রাফে ভেঙে ভেঙে থেমে থেমে চলা। এক বিলম্বিত লয়ে চলা কিন্তু ধরে আছে প্রবহমানতাকে। এক প্রবল নারীসত্তাকে যেন ক্রীতদাসী হয়ে উঠতে দেখি, তেমনি দেখি একজন মানুষের অলটার ইগো। কিছু অমোঘ দৃশ্যের চিত্রকল্প যেন আমাদের নিয়ে যেতে চায় হাহাকার ও অনন্যোপায় শূন্যতায়। এভাবে কবিতায় শব্দের স্বরগুলি ভাঙনের মুখোমুখি হতে হতে আবার প্যাটার্ন বদলায়।

‘আমিও পাথর কুড়াতে গিয়ে
অজস্র পাথরের মাঝে পড়ে আছি;
নদীপাড়ের নুড়িরা—পাহাড় থেকে
নেমে আসতে দেখেছে মা-পাথরের ক্রোধ

পাথর প্রসব করা নদী
বুক থেকে শিকারিরা তুলে নেয় সন্তান,
প্রতিনিয়ত গর্ভে নেয় পাথরের ভ্রূণ…’

আবার কিছু পরে সেই প্রচলিত দুঃখের চেনা আঙ্গিক কিছুটা মৃদু স্বরে—‘খুব কি বেশি ছিল চাওয়া? জলপাই পাতার সমান ঘুম। খইয়ের ওজনের কাছাকাছি কিছু মুহূর্ত। তবু চিটেধানের ভেতর হারিয়ে গেল আদিগন্ত ফসলের জেদ।’

কবি জাহানারা পারভীনের কবিতাগুলি পড়তে পড়তে মনে হয়েছে, কবিতাগুলি কারো কাছে কিছুই জানাতে চায় নি। যেন কোনো অবচেতন সত্তার সাথে কবির কথোপকথন। মানুষটির সংবেদনশীল মনের প্রকাশ, অভিজ্ঞতার আলোতে দেখা নিজের দগ্ধ অংশের প্রকাশ। কিন্তু খুবই সাবলীলভাবে, খুবই দ্বিধাহীনভাবে, তবে সাহসের সঙ্গে।

গদ্যরীতিতে লেখা এই কবিতাগুলির মধ্যে রয়েছে চমৎকার চিত্রকল্প। সম্পর্ক ও সময় বিভিন্নমাত্রায় ইঙ্গিতবাহী প্রতীকের মাধ্যমে স্পষ্টভাবে উপস্থিত। তবে প্রকাশভঙ্গি ও মেজাজ কবির নিজস্ব নিয়মে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। শব্দচয়ন ও বুননে কবি নিজের মতো করেই কুশলী। চিন্তার জায়গাগুলো ইঙ্গিতময়।


কাব্যগ্রন্থটির আরম্ভে, মধ্যভাগে এমনকি শেষের দিকে এসেও একটা ঘোর লেগে থাকে। শব্দের ঘোর, চিত্রকল্পের ঘোর। 


প্রতিটি শিরোনামের মধ্যেই একটি যৌক্তিক গ্রহণযোগ্যতা টের পাই। যেমন—‘যদিও নদী, তবুও দাঁড়িয়েছি জলের বিপক্ষে…’। অথবা ‘সেলাই করা সম্পর্ক বা মমতার সলতে জ্বালা হারিকেন। সেলাই করা সম্পর্ক শিরোনামের গদ্য কবিতার কিছু অংশ এরকম—আরও কিছু মানুষ ভেসে গেছে—সীমান্তবর্তী নদে। কারো হাত নেই, কারো পা, কারো চেরা বুক থেকে বেরিয়ে এসেছে নাড়ি। খরকুটোর সাথে ভাসছে চোখ। মানচিত্র নয়, ভাগ হয়েছে কপাল। সাম্প্রদায়িকতার জলে ভেসে শেয়াল-কুকুরের খাদ্য হওয়া মানুষের কাছে কি উত্তর গেছে রেখে ভারতবর্ষ? ধর্মই জীবন-মৃত্যুর নির্দেশক শুধু?’

এখানে কবিতা এসে দাঁড়িয়েছে এক দ্বন্দ্বমুখর অবস্থানে। টানাপোড়েনের ভিতর থেকে উঠে আসে ইতিহাস আর অনিবার্য মৃত্যুর গল্প। গম্ভীর এক জিজ্ঞাসা সমস্ত জগৎকে প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। এভাবে কবির নিজস্ব অভিজ্ঞতার সাথে সাথে সমাজের জটিল বুননের প্রেক্ষাপটগুলোও কবিতাগুলির মধ্যে পাই। নির্ধারিত বাঁধা বুলিতে না লিখে এই ব্যতিক্রমী কবিতার বুনন কবিতাগুলোকে অন্য এক মর্যাদায় নিয়ে গেছে বলে মনে হয়েছে। তাছাড়া কবিতাগুলিকে অনায়াসে নারীবাদী কবিতা বা প্রেমের কবিতা অথবা দ্রোহের কবিতা এভাবে বলা যাবে না। নানারকম সমান্তরাল প্রশ্ন রয়েছে কবিতার প্রতিটি বাঁকে। যেখানে এক টুকরো দৃশ্য তৈরি করে দেয় অনুভবের আলতো টান। তারপর দৃশ্যান্তরে যেতে যেতে কখনও অতীত, ইতিহাস, কখনও স্মৃতি নির্ভরতা, কখনও কবির ব্যক্তি সত্তা কবিতার শিল্পময় দ্যুতিতে অনবদ্য হয়ে ওঠে।

‘কিছু গ্রন্থের পোড়া পৃষ্ঠা হাতে সেই যে দাঁড়িয়ে ছিলাম একা! হাতের তালুতে গ্রন্থ-পোড়া ছাই। মনে আছে? শশাঙ্কের নগরে ছুটে আসা বখতিয়ারের ঘোড়া, নালন্দার লাইব্রেরি পোড়া আগুন। বৌদ্ধ ভিক্ষুদের আর্তনাদ। ঘোড়ার পালের কাছাকাছি দেখেছি পায়ের চিহ্ন এক।’

‘প্রতিমার খড় দেখে ফেলেছি বলে জানালায় বসতে চায় না কোনো চড়ুই।’

‘আমি যে আজও মেলাতে পারি নি
মাঝরাতে সবার অগোচরে
ট্যাপকল থেকে পড়ে যাওয়া জলের হিসেব।’

‘সেই বাঁশিটিকে ডেকে পাঠাব,  ঠান্ডা ভাতের থালায় ডুবে যাওয়া চাঁদকে যে দেখিয়েছে ফুটো হয়ে যাওয়া বুকের ক্ষতচিহ্ন।’

কাব্যগ্রন্থটির আরম্ভে, মধ্যভাগে এমনকি শেষের দিকে এসেও একটা ঘোর লেগে থাকে। শব্দের ঘোর, চিত্রকল্পের ঘোর। ঘোরের ভিতর থেকেই তুলে নিলাম কবিতার অন্তঃসার। ভালো লেগেছে নিঃশব্দ ও গুঞ্জনময় চেতন-অবচেতনের কবিতার দৃশ্যপট।

মণিকা চক্রবর্তী

জন্ম ২৬ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭১; কুমিল্লা।

মাস্টার্স, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

সাহিত্যচর্চা ও সঙ্গীতচর্চা পেশা ও নেশা।

প্রকাশিত বই ৭টি :

গল্পগ্রন্থ—
বণার্ন্ধ রাত ও ডায়েরী [শুদ্ধস্বর, ২০১৩]
হাওয়ার সংকেত ও অন্যান্য [সংবেদ, ২০১৭]

নভেলা—
অতঃপর নিজের কাছে [নওরোজ, ২০১০]
দিগন্ত ঢেউয়ের ওপারে [নওরোজ, ২০১১]
যখন ভেসে এসেছিল সমুদ্র ঝিনুক [শুদ্ধস্বর, ২০১৪]
মন্দ্রসপ্তক [বেহুলাবাংলা, ২০১৬]
রোদের বৃত্ত [পরিবার, ২০১৭]

প্রকাশিতব্য—
অ্যাম্ফিথিয়েটার [সংবেদ, ২০১৯]

ই-মেইল : chakrabortymonika32@gmail.com