হোম বই নিয়ে সাজ্জাদ শরিফের ‘ছুরিচিকিৎসা’ : ভাষাজগতের ব্যবচ্ছেদ

সাজ্জাদ শরিফের ‘ছুরিচিকিৎসা’ : ভাষাজগতের ব্যবচ্ছেদ

সাজ্জাদ শরিফের ‘ছুরিচিকিৎসা’ : ভাষাজগতের ব্যবচ্ছেদ
496
0

কবিকে নিয়ে কথা বলতে গেলে কবির ধ্যান ও যাত্রা নিয়েই কথা বলতে হয়। কবি কী দেখান আর কী গোপন করেন তা নিয়েও কথা বলতে হয়। যা তিনি দেখান তা যদি তার ভাষার বহিরঙ্গ হয় তবে যা দেখান না তা কি ভাষার অন্তরঙ্গ? আমার বিশ্বাস তা ভাষার অন্তরঙ্গ নয়, বরং তাই কবির ভাষা এবং সেখানে কবির ধ্যানও বিরাজমান। বহিরঙ্গে আমরা যা দেখি তা বিচ্ছুরিত আলো।

কবিতায় আমরা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছি যখন আমাদেরকে কবিতার স্থাপত্যের দিকে তাকাতে হবে। বর্ণিলতা ইত্যাদির গভীরে কবি তার মৌল যে কারুতা সাধন করেন তা হলো—একটি মানস বয়নকে তুলে ধরতে কেমন করে তিনি অন্তর্বীক্ষণ এবং অভিব্যক্তির পরিসরকে গড়ে তোলেন। এর মাঝে অস্তিত্বের পর্যটন এবং যে পরিস্থিতিগুলো পাড়ি দিয়েছে অস্তিত্ব সেসবকে কবি মেলে ধরতে থাকেন বিবিধ আসবাবের মাধ্যমে। কবি সাজ্জাদ শরিফের ছুরিচিকিৎসা বইটি পড়তে যেয়ে প্রতি মুহূর্তে এই উপলব্ধিগুলো হয়েছে আমার।


কবিতাকে বাণী ও স্মরণীয় বচনের বাইরে—গভীরতর প্রদেশে নিয়ে গেছেন—একটি ভাষা তৈরি করেছেন।


লেখক কখনও স্রোতের উল্টোদিকে চলেন, কখনও স্রোতের সাথে চলে স্রোতের মুখকে বদলে দেন, আবার কখনও স্রোতকে তৈরিও করেন। এই কয়েকটি ভ্রমণের কোনটি মহত্তর এবং কোনটি শ্রেয় তা ভিন্ন বিবেচনা এবং আলোচ্য হতে পারে। আমার বিবেচ্য এদের মাঝে কোন যাত্রাটি উত্তরকালকে কিছু দিয়ে যায় অথবা কী দিয়ে যায় তা। একটি সাহিত্যের ঐতিহ্যের ভেতরে থেকে, হয়তো কিছু সাম্প্রতিক ধারার স্বাদ গ্রহণ করেও সাহিত্যকে নতুন করে তোলার, বাঁক বদলের এবং স্রোত তৈরির কাজটি করেছেন সাজ্জাদ শরিফ। একথা বলতে পারি, তিনি কবিতাকে বাণী ও স্মরণীয় বচনের বাইরে—গভীরতর প্রদেশে নিয়ে গেছেন—একটি ভাষা তৈরি করেছেন। অনির্বচন ও দৃষ্টিগ্রাহ্য জগতের সম্মিলনে গড়া তার ভাষা। সাজ্জাদ শরিফ ছুরিচিকিৎসা বইয়ের কবিতাগুচ্ছে ভাষাকে বাইরে থেকে গড়ে ভেতরের দিকে যাচ্ছেন। প্লুত স্বর ও সীমাবদ্ধতার অভিব্যক্তিতে মিলিত এক ভাষা।

পাঠকদের সুবিধার্থে আরও জানাই, কবি সাজ্জাদ শরিফের মানসকে তথা তার জগৎকে বুঝতে আমি একটি বিষয়েই তার বিবিধ কবিতার উদ্ধৃতি দেবো, আবার একই কবিতার উদ্ধৃতি দেবো বিভিন্ন বিষয়ে—কেননা তার কবিতার জগৎ তেমনই বিচিত্র এবং অভিনিবেশ দাবি করে।

ঊর্ধ্বমুখী সত্তার পাশে জ্বলজ্বলে দেহবদ্ধ সত্তার অস্তিত্বের অভিব্যক্তি আছে সাজ্জাদ শরিফের ভাষায়। বইয়ের প্রথম কবিতা ‘প্রতিবেশী’-র দিকে তাকাই যেখানে তিনি দূরে দিগন্ত কাঁটাতার এবং উড়ন্ত মিনারের নিচে মশগুলি দেখেন—

দূরে দিগন্ত কাঁটাতার
দূরে মেঘে মেঘে মশগুল
সাদা উড়ন্ত মিনারের
নিচে একাকিনী মশগুল             
[প্রতিবেশী, পৃষ্ঠা ১৫]

এই কবিতাতেই তৃতীয় লাইনে তিনি বলছেন—

তাকে ভাষাহীন সংকেতে
আমি চিনি না বা
ঠিক চিনি             
[প্রতিবেশী, পৃষ্ঠা ১৫]

এই সংশয়, অনির্বচনের জগৎ কিংবা অগঠিত অথবা অপরিণত ভাষার জগতে পড়শিকে চিনে নিতে চান তিনি—কেননা তা অস্তিত্বের পরিচয়ের নিরিখে ধরা পড়ছে। সত্তা কিসে উত্তরিত হচ্ছে বা মিলিত হচ্ছে কবি তা বুঝতে চাইছেন—

কেউ বুঝি না তো এই রাতে
তুমি তুমি, নাকি তুমি আমি             
[প্রতিবেশী, পৃষ্ঠা ১৫]

পরের কবিতা ‘চাঁদে পাওয়া গাছ’-এ দেখি কবির সত্তা সাক্ষ্য দিচ্ছে ইতিহাস তথা সভ্যতায় ও মানব বিকাশের ধারায় ইটারনাল রিটার্নের দুঃস্বপ্ন কেমন ভয়াবহ রূপ নিয়ে ফিরছে—

…আমাকে কি বেছে নিতে বলো
ও ডানা, ও পুনরাগমন?           
[ডানা, পৃ. ২৩]

চোখে দেখলে অতীতের
সব লাশ
জ্যান্ত হয়ে
উঠে আসছে আগামীর থেকে             
[চাঁদে পাওয়া গাছ, পৃ. ১৬]

সে কারণে মানব অস্তিত্ব “বৃক্ষ” হতে চাওয়ার স্থিতিকে এক সময় সীমাবদ্ধতা জ্ঞান করে এবং সে অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে চায়। ইতিহাস মানুষকে শেখায়—

ধর্মবনানী, বলো সাবধানে,             
[ধর্মবনানী, পৃ. ১৮]

কিন্তু কবি আবার সংবাদও দেন—

জন্ম নিচ্ছে স্বাধীন অঙ্গ…
দেহতরঙ্গ… মানুষ… মানুষ…             
[ধর্মবনানী, পৃ. ১৮]

যদিও তথাকথিত সভ্যতা এবং মানব বিকাশের বা বিবর্তনের বিবরণখানি—দগ্ধ হতে হতে এগুবার বা না এগুবার :

টগবগে এই লাভার ওপরে
সন্ন্যাস ভেঙে লক্ষ বছর
ঝরাচ্ছি বীজ ঝরিয়ে চলেছি।             
[ধর্মবনানী, পৃ. ১৮]

কেন ঝরিয়ে চলেছি বীজ? তা কি ফলছে কিছুতে? উত্তর খুঁজব ‘অধর্মবাতাস’ কবিতায়—

ধরেছি কর্তিত বাহু নিরুপায়, ক্ষমা করো মোরে
শুধায়ো না, অধর্মবাতাসে ওড়ে কাদের ছেলের রামধনু
ও তো রাততরবারি—পিপাসার, মানসিংহের             
[অধর্মবাতাস, পৃ. ২০]

বাহু কর্তিত বলে অনৈক্য, সাম্প্রদায়িকতা ও কর্তৃত্বের লড়াইয়ে পিষ্ট এবং সেকারণে একটি জাতিরাষ্ট্র গঠনে আমাদের দীর্ঘ ব্যর্থতা এবং এমনতর জাতীয় ইতিহাসের বিনির্মাণকে হাজির করেন কবি—

হাজার ঘোড়ার দামামা পিটছে
আবহবাতাস… মাতাল গন্ধ…
আধো জাগা শব…            
[ছুরিচিকিৎসা, পৃ. ৩২]

“তোমাদের ষড়যন্ত্রে মেঘে মেঘে উড়ন্ত প্রাসাদ”             
[অধর্মবাতাস, পৃ. ২০]

…’যুগ যুগ ধরে
অপেক্ষা যাঁর শেষ রাত্তিরে আসবেন তিনি; ততক্ষণ আমি
দেখি বুক চিরে, তুমি তো
কখনও আস্ত ছিলে না।’…             
[ছুরিচিকিৎসা, পৃ. ৩২]

নির্জন তাঁবুর মধ্যে খুঁজে পাই পারদমাখানো নারীদেহ
নয় সাবানের হর্ষ অজস্র ফেনা
ভিখারিভ্রমণে নয় তত ফুটো পয়সানির্ভর
হয়তো চলার গতি।…             
[অধর্মবাতাস, পৃ. ২০]

সভ্যতার উল্লম্ব বৃদ্ধি আমাদের শিখিয়েছে রাষ্ট্র মানে লেফট রাইট। সাজ্জাদ শরিফ আরেকটু এগিয়ে কথা বলছেন, কিন্তু যা বলছেন তাতে একই সাথে গড়ে তুলছেন ভাষাকেও—

কেঁপে কেঁপে জাগে উপবন
তার প্রতি রোমকূপে, স্তনতলে নতুন শহর             
[অধর্মবাতাস, পৃ. ২০]

নিঘুমজাগর আমি দিগব্যাপী এ জলপাতালে
দেখছি উঠছে জেগে সমাধিমহল–
একটি সে খালি, তাতে মনুষ্যচর্বির দীপগুলো
জ্বলে উঠছে একে একে             
[ডানা, পৃ. ২৩]

এ প্রদেশে ঈশপের মূর্খ প্রাণীগুলো সাক্ষী হয় টিকটিকি হয়ে যাওয়া পৌরাণিক জোড়া চটির এবং সেই সময়ের যখন সুকুমার কলা প্রতাপ, ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের সেবাদাসীতে পরিণত হয়—

আবৃত্তি করো যে মেয়ে, সন্ন্যাসীটিলায় উঠে নাচ শিক্ষা দাও             
[অধর্মবাতাস, পৃ. ২০]

দ্রষ্টা বলেই কবি নির্দেশ করতে পারেন সামগ্রিক অস্তিত্বের হঠকারিতা, পিছুটান, একই চক্রে অস্তিত্বের ঘুরপাক খাওয়া। এই সমাজ তেমনই, এই মানুষের ইতিহাস এমনই যেখানে বিপ্লবী হত হয় বিপ্লবের ফলভোগীদের হাতে। নতুন চিন্তার উদ্‌গাতা এখানে নিজের চিন্তার জালে সীমিত হয়ে পড়েন, আটকে পড়েন ফাঁদে—

শিকারি নিজে তুমি হয়েছ নিরুপায় শিকার
আয়না ভেঙে আজ বেরিয়ে এসে গেছ মেয়ে             
[বংশপরিচয়, পৃ. ২১]

ভীতির কারণ ঘটেছিল জন্মক্ষণেই আঁতুড়ঘরে শিশুডাকাত দেখার কারণেই। কেননা ‘অন্নপ্রাশন’-এর দিনে—

মড়াটানা চৌকিতে ভরে উঠছে অন্নপ্রাশনের দিন
পা পেঁচিয়ে গরুর নাড়িতে হুমড়ি খাচ্ছে এদের শিশু ওদের শিশু
বস্তুত খালি খামই পোস্ট হয়েছে ক্রমাগত ভুল ঠিকানায়             
[অন্নপ্রাশন, পৃ. ২৮]


কবিতায় বিবিধ বিচ্ছুরণ এবং রাষ্ট্রেরও ব্যবচ্ছেদ যে সাজ্জাদ শরিফ করেছেন তা তো দেখেছিই আমরা।


সারহীন প্রতিশ্রুতি, পঙ্কময় উদ্‌যাপনে জন্ম হোঁচট খাচ্ছে। নিখিলে মানব অস্তিত্ব একা নিজেকে যেমন করে চিনে নিচ্ছে (সার্ত্রের অস্তিত্ববাদের কথা মনে পড়তে পারে) তার ফলে ভাষা আবার ধাঁধাময় হয়ে উঠেছে—

অচেনা জন্তুর ঘায়ে ন্যুব্জ হয়ে থাকি, আমি জলে ডুব দিয়ে
কাটাই দিবসযাম। হাঙর আমার
বাবা-মাকে খেয়ে নিল, আমি তো অনাথ, আমি
শ্যাওলার ঝোপে
লুকিয়ে বেঁচেছি এতকাল             
[ডানা, পৃ. ২৩]

গভীর জ্যোৎস্না/ তাতে জটিল হয়ে পড়ল কথাবার্তা, মুখ দেখাদেখি             
[অন্নপ্রাশন, পৃ. ২৮]

ভান, রেটোরিক, ফালতু আলাপ এসবের সাক্ষী হচ্ছি আমরা। অস্তিত্বের অসারতার প্রমাণ এসব—

বুদ্ধপূর্ণিমায় শাণিয়েছি ধর্মনিরপেক্ষতার চাকু             
[অন্নপ্রাশন, পৃ. ২৮]

প্রগতির ও শুভ সমাজের জন্য তৈরি করা বিবিধ ইজমগুলো বরং খর্ব ও হরণই করে ভিন্নরূপে—

গিয়েছি যদি ডানে আদরে চুম্বনলালাতে
ভস্ম করেছিলি, গিয়েছি বাঁয়ে যদি পালাতে
ছদ্মছলে ফের ভিন্ন রূপে তুই মস্ত
দাঁত আড়াল করে আসিস;…             
[বন্দী, পৃ. ৩৩]

কবি দেখিয়ে দেন মৃত্যুর চক্রে আটকে পড়ছে জন্ম এবং স্বপ্নের পাশেই ঘটছে অস্তিত্বের পরাজয়—

আসে মরা চোখ থেকেই ঠিকরে পড়ছে অতর্কিত দ্যুতি
যেমন হেস্টিংসের ভূত চলে যেতে যেতে
‘বাঙ্গালা মা, বাঙ্গালা মা’ কেঁদেছিল নীল কৃষকেরা             
[অন্নপ্রাশন, পৃ. ২৮]

বংশনদীতীরে বংশঝরনার বাঁকে
যেন বা মাঝি হয় তোমার জন্মের স্নেহ
খুলেও গাঁথা থাকে একটি অবিরল সুতোয়
স্বপ্নদেহ আর তোমার কঙ্কালদেহ           
[বংশপরিচয়, পৃ. ২১]

মানুষের সারাৎসার হারিয়ে “এক ধরনের এগুনো”, সংহার-বিলয়-স্থবির জলরাশিতে মৃত্যু ঘটে উড্ডয়নের ও নির্মলতার, ক্ষমতার চূড়ায় চলে বিসর্জন—সভ্যতার বিকাশের ইতিহাসই যেন এমন :

‘কোথায় যাবি রে শেষে? কী জলধারায়?’
‘মরজগতের পারে যেখানে শৈবাল-সরোবরে
ঝাঁকে ঝাঁকে পরীদের লাশ ভেসে যায়।’             
[কথোপকথন, পৃ. ২৪]

এই মরজগৎ, এই ক্ষীণ অস্তিত্বের মাঝে মানুষের উপলব্ধির উন্মেষেই তার মুক্তি ঘটে। কিন্তু সে উপলব্ধির স্বরূপ কেমন?—

জানি না। বুঝি না পরিত্রাণ।
শুধু শ্বাসবুদ্বুদ বানাই।             
[জলচর, পৃ. ৪০]

যে দ্বীপে বসত করি তার নাম ক্ষণ পরিত্রাণ             
[উপাখ্যান, পৃ. ২৬]

শেষ পঙ্‌ক্তিটি ‘উপাখ্যান’ শিরোনামের কবিতা থেকে নেয়া। পঙ্‌ক্তিটিতে সাজ্জাদ শরিফ অনির্বচনের এমন এক সমতলে পৌঁছেছেন যেখানে পৃথিবীর সব সময়খণ্ডে এবং বিভিন্ন সময়খণ্ডে অবস্থান করা সব কবিই এক হয়ে ওঠেন। সেই সমতল সুরের। মনে পড়তে পারে উৎপল কুমার বসুর লাইন—‘যে দেশে পৌঁছে গেছি তার নাম অলাবুভক্ষণ’। কবি উৎপল কুমার বসুর কবিতাটি সাজ্জাদ শরিফের কবিতার দুই বছর পরে লেখা হয়েছিল। কবি তারিক ঈমাম এই নিয়ে লিখেছিলেন উল্লেখ পত্রিকায়।

উপাখ্যান শিরোনামের এই কবিতায় আমরা ইউলিসিস-সিন্দাবাদের সমুদ্রযাত্রার ভেতর দিয়ে যাই যেন। এ অভিযান মহাকাব্যিক, তবে ধ্রুপদী নয়—এটি অধুনার যাত্রা ও যুদ্ধ যাতে ক্ষয় আছে বলেই বিজয় আসে ভিন্নরূপে—একরকম লিটস্টের রূপে—

…দেহের কলম
পারিনি লালন করতে, দাওনি সুযোগ, দেব, তোমায় তোষণ
এতই কঠিন, তাই অবশিষ্ট বীজ
ভাসিয়ে দিয়েছি আমি তরঙ্গশীর্ষের জলে জলে             
[উপাখ্যান, পৃ. ২৬]

আমাদের কোনো হিরো নেই, কারণ আমাদের কোনো হেলো নেই—আমরা ধ্রুপদী নই বলেই নেই সেসব। কাজেই মাছের পেটে প্রেরিত পুরুষ ইউনুস যেমন করে আশিষ নিয়ে যাত্রা সমাপ্ত করেন আমরা তা করতে পারি না।

যদিও গনগনে তীব্র ক্ষার
দিয়েছে শরীর দগ্ধ করে             
[মৎস্যপুরাণ, পৃ. ২৭]

হন্তারক চোরাটান, প্রতাপের, ক্ষমতার, সমাজের, সীমিতকারী সভ্যতার—এসবের সামনে নক্ষত্রের দিশা নেই, কিন্তু মানুষ বলেই কোমল অঙ্গার টিম টিম করে জ্বলে—

‘তারারা কই’? ‘রাত্রি এলে পরে
কুপি জ্বালি না। জ্বালিয়ে দিই জোনাকি।           
[হানাবাড়ি, পৃ. ৩৮]

প্রকৃতি ও মাতৃসত্তা তথা মূল সত্তা থেকে বিচ্ছিন্ন মানুষ কোন আর্তি জানায় তবে? বৃহৎ ও মহৎ আশ্রয়ের খোঁজ সে কি পায়?—

এই দগ্ধদেহ কুষ্ঠদেহ নিয়ে জনে জনে
করেছি তোমারই খোঁজ। শ্বাসরুদ্ধ মাতাল সাগরে
আমাকে আশ্রয় দিলে, এরই গর্বে বৎসরে দু মাস রেখো মনে             
[মৎস্যপুরাণ, পৃ. ২৭]

প্রকৃতিতে আশ্রয় পাবে না আর মানব সমাজ। কেননা প্রকৃতি তাকে স্থিত ও শান্ত থাকতে বলে। যদিও এর কোনোটিই মানবসমাজের বিবর্তন ও তথাকথিত বিকাশ তাকে শেখায় নি। এমন এক অনুধাবন কাজ করে যখন পড়ি—

অরণ্যসংকেত, তুমি ভুল
গোধূলিসাঁতার কখনো শেখোনি তাই
আজ রক্তপাত ঠেকাতে পারবে না।             
[অরণ্যসংকেত, পৃ. ৩০]

ভাষা যখন ধ্বনি, অভিব্যক্তি, গূঢ়তা ও কবিসত্তার পীড়নে রূপ পায় তখন কত জান্তব ও স্মরণীয় হয়ে উঠতে পারে তার একটি উদাহরণ দেখি চলুন—

শোনো আজ স্তব্ধ পারাবত
কুয়াশার দিগন্তের পারে
এখনো ছায়ায় ঢাকা দেশ             
[বোবা কথা, পৃ. ১৯]

কবিতার নাম ‘বোবা কথা’। স্বভাবতই মন জানতে আগ্রহী হয় পারাবত কেন স্তব্ধ—সে কি ডানাহীন? ডানা কি সে হারিয়েছে? সে কি মৃত? কথা কেন বোবা? দীর্ঘ নিষ্ফল সময় পেরিয়ে তবু আশার রূপ নিয়ে “ছায়ায় ঢাকা দেশ”-ও থাকে।

ভাষা না ফোটার যন্ত্রণা যেমন রয়েছে, ভাষা হারিয়ে যাবার তথা ভাষাকে খুইয়ে ফেলার যন্ত্রণা কঠিনতর—কেননা ভান, অসততা, প্রচার সর্বস্বতা, গণ-সমরূপতা ও গণসম্মতিতে, এবং গ্রন্থ, ইশতেহার, সংবাদপত্র যেন বহ্নুৎসবে ঝরে—

যোগাযোগ, বোবার অক্ষর
দেখেছি নিকষ অন্ধকারে
ফুলকি আর ছাই হয়ে ঝরে              
[বোবা কথা, পৃ. ১৯]

জীবনানন্দ “প্রগাঢ় পিতামহী” চরিত্রটি সাজ্জাদ শরিফের ভাষা তথা জগতে রূপ পেয়ে হচ্ছে “অন্ধ পিতামহী”। পিতামহী পাথর কেননা কাল পরিসর পাথর। মনে পড়তে পারে গ্রিক ধ্রুপধী ঐতিহ্যের তাইরেসিয়াসের কথা যিনি অন্ধ ওরাকল ছিলেন। কিন্তু কথা হচ্ছে কবিকে সাজ্জাদ শরিফ যে “বালক” বলছেন তা কি কবিতার ইতিহাসে কবি সমগ্রের অপরিণত মনস্কতা, লিরিকপ্রবণ “তানপ্রধান রেডিও” বাজানোর চক্রে আটক থাকার ফল? তাদের প্রজ্ঞাহীনতা? নাকি নিষ্পাপতা? কবি অন্যত্র এ ধাঁধার অন্তত একটি জবাব দিচ্ছেন এই দেখিয়ে দিয়ে যে বস্তুত সমগ্রের স্বর ফোটেনি, কেননা তার ভাষা নেই, কারণ সে বাড়তেই পারেনি যেহেতু সে জন্মায়ই নি—

কী করব আমি? কী করতে পারি? আমি যে জঠরে বন্দী।
কণ্ঠ ফোটেনি, তবু যদি কিছু বলতে
যাই অস্ফুট–নিমেশমাত্র… মাঠ পার…             
[জঠরবন্দী, পৃ. ৩৯]

কবিতার ধ্রুপদী মৃত্যুচেতনাকে সাজ্জাদ শরিফ অপসৃয়মানতা ও স্মৃতির নিরিখে দেখেন বলেই তা নতুন হয়ে ওঠে—

কামনা, স্মৃতির কণা, বিস্রস্ত অলক
অদ্ভুত দাঁড়ের শব্দ ফেলে রেখে জলে ডুবে যায়
হৃদয়ে করুণা রেখে, গ্লানিহীন বিষণ্নতা রেখে।
যদি বা এসেছ ছলে, দেখা দিলে ছদ্মময়তায়
মাস্তুলে আঘাত লেগে সূর্য ঝরে গিয়েছে পশ্চিমে।             
[ছাড়পত্র, পৃ. ৪৪]

এই সূর্যের যাত্রা বহুদূর নয়। তবে ঝরে পড়া সূর্য অন্যত্র সাজ্জাদ শরিফের কবিতায় উদিত হয় মৃত্যুময় তথা ক্ষয়িষ্ণু ক্ষমতার দেহ নিয়ে—

উঠতে দেখি রোজ আকাশে ফাঁপা ক্ষয়া ধড়কে—
সূর্য বলে লোকে, জানি না ওর সম্পর্কে
এর চে’ বেশি কিছু। ছেড়ে দে, ছেড়ে দে রে আমাকে             
[বন্দী, পৃ. ৩৩]

অস্তিত্ব, যা প্রশ্নবিদ্ধ, এর ভয়াবহ পরাজয় এবং পরিণতি জন্মের নামে সংহারের সূচনা, শব হিসেবে নরক পরিক্রমায় সাজ্জাদ শরিফ যে ইনফার্নোর ছবি আঁকেন তা ধ্রুপদী নয়, তা অবচেতন ও শরীর চেতনা পেরিয়ে অস্তিত্বকে এমন মড়ার বিছানায় আঁকছে, সেই ছবি আধুনিক কিনা বলা মুশকিল—তবে স্নায়ু বিকল করে দেয়ার মতো—রক্তাক্ত আত্মানুসন্ধান এবং অস্তিত্বের প্রেতপরিণতি। একই সাথে এরা অন্তর্বয়িত বাস্তব ও জনপদের মানসের ভয়াল রূপ—

প্রশ্নে কেঁপে ওঠে গুহা, পাথর ফাটিয়ে দেয় দেহ তার
জাগে মোহতন্দ্রা ভেঙে ধ্যানগরিমার জাল ছিঁড়ে             
[অয়েদিপাউস, পৃ. ৪৩]

জঠরে বন্দী, উল্টো শরীর, পাতালছিদ্ররাস্তা
নেমে গেছে নিচে, পাকে পাকে নিচে দূরে
রৌরবে গিয়ে মুক্ত—             
[জঠরবন্দী, পৃ. ৩৯]

সে গর্ভকুসুমে ফের ঢালব কি প্রাণকণা? এই
বেদনা মর্মের খোঁজে চলে যাওয়া রক্তমাখা তির             
[অয়েদিপাউস, পৃ. ৪৩]

কম্পিত লাল হৃৎপিণ্ডের ফালি
বাকি অর্ধেক কুয়াশার বনে শোচনার নিচে চাপা
আমার লাশ কাঁধে আটটি লোক
আদিম জান্তব হিংস্রতায়
ভাঙছে রাতভর আঁধার জল
[রাত্রি, পৃ. ৪৬]

কেটে নেয়া মাথা, রক্তের ফোঁটা,
পিরিচে দু চোখ নড়েচড়ে উঠে
দ্যাখে চুপচাপ : দু ফাঁক যোনীর
ভেতরে সাপের মোচড়ানো লেজ,
গহ্বরে ছোটা। রাত, সাবধান!             
[ছুরিচিকিৎসা, পৃ. ৩২]

বইটির নাম কবিতা ছুরিচিকিৎসা নিয়ে বহু জিজ্ঞাসা আছে আমদের। কেন শল্য চিকিৎসা না হয়ে ছুরি চিকিৎসা, ইত্যাদি। শেষে উদ্ধৃত পঙ্‌ক্তিটি এই কবিতার প্রথমাংশে রয়েছে।


সাজ্জাদ শরিফের ভাষা সত্তরের তুলনায় শমিত, সংহত ও এর অভিব্যক্তি ঋদ্ধ।


মানুষ নামে যে শবের দল, বা ফ্যাসিবাদ ও তৎপরবর্তী পরিস্থিতি যাকে মৃত ধরে নিয়ে মড়ার কাটাছেঁড়ার টেবিলে শুইয়েছে সেই পরিস্থিতির সাজ্জাদ শরিফকৃত ব্যবচ্ছেদ কিন্তু টিএস এলিয়টিয় দর্শনের নিরিখে ধরা পড়া নীতির মৃত্যু নয়, বরং অন্য পরিস্থিতির কাটাছেঁড়া করছেন কবি এখানে। মৃত্যু এখন আর বেদনাদায়ক নয়। মৃত কিংবা মড়া প্রতিশোধ নিচ্ছে প্রেত হয়ে কথা বলে যেতে থেকে। ব্যক্তির মড়া এখানে এলিয়টের হুডেড হোর্ডস নয়—ব্যক্তির প্রেত কথা বলছেই, যদিও বা তাকে মৃতই ধরে নিয়েছে ক্ষমতাবলয়। একই সাথে স্মরণ করিয়ে দেই যে ব্যক্তির সমষ্টি একত্রিত হয়ে সমগ্র গড়ে তুলতে পারছে না বলেই ব্যক্তিকে মড়ার টেবিলে শুইয়েছে ক্ষমতাবলয়।একই কবিতায় বিবিধ বিচ্ছুরণ এবং রাষ্ট্রেরও ব্যবচ্ছেদ যে সাজ্জাদ শরিফ করেছেন তা তো দেখেছিই আমরা।

বিমূর্তায়ন, দৃশ্যের ঋদ্ধি, নাটকীয়তা, অবজেক্টিভ কোরেলাটিভের ছায়ায় নির্মিত হলেও, সাজ্জাদ শরিফের ভাষা নির্মাণে কবিতার ঐতিহ্যের অর্জনগুলো কেবল ব্যবহার্য হয়েছে বলে দেখি—কিন্তু এরা তার কাছে মুখ্যও নয়, মোক্ষও নয়। যেসব স্লোগানমুখরতা ইত্যাদির অভিযোগে সত্তরের দশককে অভিযুক্ত করা হয় (যদিও সেসব অভিযোগ বিতর্কের ঊর্ধ্বে কিনা তা বিশেষজ্ঞরাই ভালো জানেন) সাজ্জাদ শরিফ এবং আশির ভাষা তা থেকে মুক্ত তো বটেই, অনেক দূরের—অভিব্যক্তিতেও, ভাষার গড়নেও। সাজ্জাদ শরিফের ভাষা সত্তরের তুলনায় শমিত, সংহত ও এর অভিব্যক্তি ঋদ্ধ। দশক হিসেবে আশির কবিরা নিজেদের ভিন্ন পরিসর এবং উচ্চতায় দাঁড় করিয়েছেন এমন করেই।

সাজ্জাদ শরিফের প্রত্নমানস (আর্কিটাইপ) যদি চিত্রকলার সংকেতে (কোডে) প্রকাশ করতে চাই তবে বলতে পারি সাজ্জাদ শরিফের চাঁদ আঁরি রুশোর, বাঘটা দালির হতে পারত, তবে সে বাঘ ছিল না দালির, কেননা এডভার্ড মুনশের ‘স্ক্রিম’-এর বাস্তবকে সাজ্জাদ শরিফ তার জগতে ঘন ঘন ঘটতে দেখেন।

কবিতার রহস্য, সংকেতময়তা, দৃশ্য ও রংয়ের বদল, প্রেক্ষাপট ও নাটকীয়তাকে কবিতায় অঙ্গীভূত করে নেয়া, কথাহীনতার ও সংগীতময়তাকে কবিতায় ভিন্নমাত্রায় আত্মীকৃত করা—এসবের ভেতর দিয়ে অস্তিত্বের নানা সংকট, সম্ভাবনা, আধুনিক মানুষের পরাজয়, রাজনীতি-ক্ষমতা-কর্তৃত্ব-সভ্যতার সামনে ব্যক্তি ও সমগ্রের হীনবল ও তুচ্ছ হবার, বিদ্ধস্ত, হৃত ও হত হবার এবং তদুপরি জটিল মানস তৈরি হবার সমগ্রতাকে ধরতে চেয়েছে ও পেরেছে সেই ভাষা। সাজ্জাদ শরিফ সেই ভাষার কারিগরদের পুরোধা।


কবি সাজ্জাদ শরিফকে নিয়ে ‘গালুমগিরি’ আয়োজিত অনুষ্ঠানে পঠিত প্রবন্ধ

তানভীর মাহমুদ

জন্ম ৯ অক্টোবর, ১৯৮০, ঢাকা। ইংরেজিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। এমবিএ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। অপরাধতত্ত্ব ও বিচার-এ এমএসএস।
পেশা : চাকরি।

প্রকাশিত বই : প্রতিবিহার (কবিতা)

ই-মেইল : editor.hansadhani@gmail.com