হোম বই নিয়ে শতবর্ষে বামুনের মেয়ে : গোলোক চাটুয্যের নষ্ট পৃথিবী

শতবর্ষে বামুনের মেয়ে : গোলোক চাটুয্যের নষ্ট পৃথিবী

শতবর্ষে বামুনের মেয়ে : গোলোক চাটুয্যের নষ্ট পৃথিবী
0

শরৎচন্দ্রের রচনার প্রধান দুটি বিশিষ্টতা রয়েছে : কাহিনি বিন্যাসের সরলতা ও বাংলার সামাজিক প্রতিবেশের নিখুঁত চালচিত্র। তাঁর সাহিত্যিক জনপ্রিয়তার অন্তরালেও এ দুটি উপাদানই প্রধানত ক্রিয়াশীল থেকেছে। বোধগত ব্যবধান থাকলেও, সক্ষমতা সঞ্চার করেছে প্রায় সকল বয়সী পাঠককে সমভাবে আকর্ষণ করার। শরৎচন্দ্রের স্বল্পতনু সামাজিক আখ্যানগুলোর অন্যতম বামুনের মেয়ে। আখ্যানটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯২০ সালে। ততোদিনে শরৎচন্দ্র খানিকটা পরিণত সাহিত্যিক, ইতোমধ্যে তাঁর পাঠকগোষ্ঠীও তৈরি হয়ে গেছে। সুতরাং, আখ্যানটি রচনার সময় তিনি তাদের অভিরুচি সম্পর্কেও আদ্যোপান্ত অবহিত ছিলেন। কোনো বিকল্প মত ব্যতিরেকে, এমন সিদ্ধান্তে আমরা উপনীত হতেই পারি। বামুনের মেয়ে কি উপন্যাস? প্রশ্নটি নিয়ে পোড়খাওয়া সমালোচকরা বহু ব্যর্থ; একইসঙ্গে সমাধানরহিত বাগবিস্তার করেছেন। আমরা এই পুরনো ক্লেদের কলেবর আর বৃদ্ধি করতে চাই না। কাজেই, সে-আলোচনা থেকে নিরত থাকছি। শরৎচন্দ্রের রচনায় সামাজিক জীবনের নিখুঁত চালচিত্র আঁকার যে প্রবণতা প্রারম্ভে উল্লিখিত হয়েছে, এটি একপ্রকার সরল বিবেচনা। কিঞ্চিৎ বিস্তারিত বললে, এই চালচিত্রেরও কিছু নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য রয়েছে। যে বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করি সমাজের পুরনো প্রথা, ঐতিহ্য ও মূল্যবোধের সারশূন্যতা সম্পর্কে পাঠকের মস্তিষ্কে প্রশ্ন জাগ্রত করার সক্ষমতাকে। তবে, ওই প্রশ্ন জাগানো অব্দিই! আর, শরৎচন্দ্র পাঠকের মস্তিষ্কে প্রশ্ন জাগানোর এই কর্মটি সম্পাদন করেন নির্দিষ্ট কিছু চরিত্রের ক্রিয়াকলাপের মাধ্যমে। সমাজ দণ্ডায়মান থাকে যার কেন্দ্রভূমিতে। বামুনের মেয়ে আখ্যানেও তাঁর এই পরিচিত প্রবণতার ব্যতিক্রম ঘটে নি। আখ্যানটি পাঠের সময় বিগত শতকের প্রথমার্ধের বাংলার গ্রামীণ সমাজ কাঠামোর সমান্তরালে এমন একটি চরিত্র এসে উপস্থিত হয়; যার সীমাহীন দুষ্কৃতি যেকোনো কোমলহৃদয়, রুচিশীল পাঠকের বিবমিষা উদ্রেক করাতে বাধ্য। চরিত্রটি গ্রাম্য মোড়ল, ব্রাহ্মণ গোলোক চট্টোপাধ্যায়ের; নামের উচ্চারণগত বিকৃতি যাকে পরিণত করেছে ‘গোলোক চাটুয্যে’তে। এটি ব্যক্ত করা অত্যুক্তি বোধ করছি না যে, শরৎচন্দ্র গোলোকের অন্তর ও বহির্লোক নির্মাণ করেছেন সমস্ত নীচতার পুঞ্জ পুঞ্জ সমাবেশ ঘটিয়ে। আর, তার চরিত্র ও কাজের সঙ্গে বিপুলভাবে সংশ্লিষ্ট করে দিয়েছেন পুরো সমাজকাঠামোকে। এর ফলে, বামুনের মেয়ে আখ্যানে গোলোকের যে অপরাধগুলো দৃশ্যমান, নীতিবিগর্হিত, ধিক্কারযোগ্য; তার একপ্রকার সামাজিকীকরণ ঘটেছে। যা তাকে পরিণত করেছে এক সামাজিক অপরাধীতে, বদমায়েশে।


গোলোক এতটাই ধার্মিক যে, সে ভাত খেয়ে গোবর দিয়ে মুখ ধোয়।


গোলোক চাটুয্যে দশটা গ্রামের মাথা, সে হিন্দুকূল চূড়ামণি, তার নামে বাঘে গরুতে একঘাটে জল খায়, সে একটা জমিদার; আরেক সামাজিক নষ্ট, পতিত প্রচারক, বিজ্ঞাপনজীবী রাসমণির করা এই মন্তব্যগুলো গোলোকের সামাজিক গুরুত্ব আমাদের নিকটে উপস্থাপন করে। একইসঙ্গে তুলে ধরে, তার মধ্যযুগীয়, অনভিজাত সামন্তসুলভ প্রতাপও। আমরা পরিচিত রয়েছি যে, প্রতিষ্ঠান হিসেবে সমাজ মূলত আত্মরক্ষাকারী, নিজের পুরনো আড় না ভাঙার প্রশ্নে সর্বদা সচেতন। সমাজের এই আত্মরক্ষা; কিংবা আড় না ভাঙা চরিত্রের প্রধান সহায়ক হিসেবে যুগে যুগে কাজ করে চলেছে ধর্ম। আবার, নিজেকে রক্ষা করার এই প্রতিদান হিসেবে সমাজ পুরোহিত শ্রেণিকে, ধর্মীয় চরিত্রগুলোকে বিভিন্ন সংকট থেকে রক্ষা করে। তাদের এমন কিছু বিশেষ নিরাপত্তা, কিংবা দায়মুক্তি প্রদান করে, যা সমাজের অন্য দশজন পায় না। সমাজের এই চারিত্র্য আজও বিদ্যমান। বামুনের মেয়ে আখ্যানে গোলোক চাটুয্যেও সমাজ প্রদত্ত এই সুবিধাটা আদায় করেছে পূর্ণ মাত্রায়। উন্নত ভুঁড়ির পঞ্চাশউত্তীর্ণ ব্রাহ্মণ গোলোককে শরৎচন্দ্র আমাদের সামনে উপস্থিত করেন এভাবে : ‘সেই হিন্দুকূল চূড়ামণি পরাক্রান্ত ব্যক্তিটি এইমাত্র তাঁহার বৈঠকখানায় আসিয়া বসিয়াছিলেন। তাঁহার পরিধানের পট্টবস্ত্র ও শিখাসংলগ্ন টাটকা একটি করবী পুষ্প দেখিয়া মনে হয় অনতিবিলম্বেই তাঁহার সকালের আহ্নিক ও পূজা সারা হইয়াছে।’ এর বাইরে গোলোকের ধার্মিক চরিত্র সম্পর্কে রাসমণি আরেকপ্রস্থ আমাদের নিঃসন্দেহ করে—গোলোক এতটাই ধার্মিক যে, সে ভাত খেয়ে গোবর দিয়ে মুখ ধোয়। আখ্যানে গোলকের অপাচ্য ক্রিয়াকলাপকে সমাজ যে নির্বিবাদে হজম করে, তার পশ্চাতে ক্রিয়াশীল থেকেছে তার এই কথিত ধর্মাশ্রয়, ধর্মকূলচূড়ামণি মূর্তি। যা ঠক ও নষ্ট গোলোক চাটুয্যের প্রধান আভরণ।

২.
বাংলার যে সামাজিক মনোজীবন, বহুকাল ধরেই তার প্রচারিত অধিকাংশ মূল্যবোধের কোনো ব্যাবহারিক ভিত্তি নেই। বাইরে এগুলো টিকে রয়েছে মূলত সামষ্টিক গলাবাজির ওপরে; যার গভীরে স্বার্থসিদ্ধির উদ্দেশ্য ব্যতিরেকে আর কিছুই নেই। শত বছরের পুরনো বামুনের মেয়ে আখ্যানের পরতে পরতে এই সত্য জমা হয়ে রয়েছে। যেখানে গোলোক চাটুয্যেই প্রধানতম, একবারে অপ্রতিদ্বন্দ্বী ক্রীড়নক, তাকে চ্যালেঞ্জ করে কার সাধ্যি? হ্যাঁ, একজন চ্যালেঞ্জ করেছিল বটে, সে আখ্যানের একমাত্র প্রতিবাদ সন্ধ্যা। তার মাশুলও তাকে দিতে হয়েছে বৈকি! একবারে পরিবার সমেত বরবাদ হয়ে, দেশত্যাগ করে; সে আলোচনায় আমরা পরে আসব। গোলোকের নষ্ট পৃথিবীর প্রথম খবর আমাদের নিকটে উন্মোচিত হয়, পাঁড় ধার্মিক, ব্রাহ্মণ হয়েও তার আফ্রিকায় ছাগল ও ভেড়া চালান দেবার গোপন ও ধর্মহীন ব্যবসার মাধ্যমে। একাজে তার সহায়ক হিসেবে কাজ করে বিষ্ণু চোঙদার। চোঙদারের সঙ্গে গোলোকের যে বৈষয়িক কথাবার্তা এবং প্রতিটি কথাতেই নিজেকে ধার্মিক হিসেবে উপস্থাপনের প্রচেষ্টা, তার মাধ্যমে আমাদের নিকটে শরৎচন্দ্র নিখুঁতভাবে এক বিরল বাঙালি অর্থলোভী, ঠগকে উপস্থাপন করেছেন। যাদের বিচরণ বাঙালি সমাজে এখনো দুর্লভ নয়। তবে, গোলোকের এই নষ্টামো কেবল অর্থেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং অনর্থের খবর তার আরও রয়েছে। আখ্যানের সবচেয়ে বিবমিষা উদ্রেককর অঞ্চল গোলোকের নারী লোপুপতা, কামকাতর স্বভাব। যার প্রথম বলি তার বালবিধবা শ্যালিকা জ্ঞানদা। জ্ঞানদা গোলোকের সংসারে এসেছিল তার অসুস্থ স্ত্রীর সেবা করার জন্য। তবে, যার সেবার জন্য আসা, সেই দিদি রোগে ভুগে প্রাণত্যাগ করার পরও জ্ঞানদা মাসখানেক গোলোকের সংসারে রয়ে যায়, সংসার গুছিয়ে দেবার নাম করে। গোলোক তাকে নানা কথায় ভোলায়, আবেগী কথাবার্তা বলে স্বামীগৃহে ফিরতে দেয় না। বিধবা বিবাহের আশ্বাস দিয়ে তার সঙ্গে করে চলে ক্রমাগত সহবাস। এর ফলে, যুবতী বিধবা জ্ঞানদা সহসাই গর্ভবতী হয়ে পড়ে।


গোলোকের মতো মানুষের তো নীচতায় কোনো অরুচি নেই, নর্দমাতেই তার বিচরণ।


গোলোক ঠগ, প্রতারক, বদমাশ, সে তার কথা রাখবে কেন? প্রথমে চেষ্টা করে জ্ঞানদাকে তার শ্বশুর বাড়িতে ফেরত পাঠানোর। কিন্তু, জ্ঞানদা রাজি হয় না, পাষাণ হয়ে ফিরিয়ে দেয় অন্ধ শ্বশুরকেও। কিন্তু, তাতে কতটুকুই বা যায় আসে? গোলোকের মতো মানুষের তো নীচতায় কোনো অরুচি নেই, নর্দমাতেই তার বিচরণ। সে আয়োজন করে জ্ঞানদার গর্ভপাতের। কুঁজো মন্থরার বিশ শতকীয় সংস্করণ, রাসমণি তার সহায়ক হিসেবে এগিয়ে আসে; এই অভিজ্ঞ বদমাশ, পক্বকেশ বামুন কন্যা জ্ঞানদাকে বলে : ‘কথা শোন জ্ঞানদা, পাগলামি করিস নে। ওষুধটুকু দিয়ে গেছে, খেয়ে ফেল। আবার যেমন ছিল সব তেমনি হবে, কেউ জানতেও পারবে না।’ আসলে গোলোকের ফন্দি ছিল গর্ভপাতের নাম করে জ্ঞানদাকে হত্যা করা। নইলে, তার দ্বিতীয় বিবাহের রাস্তা পরিষ্কার হচ্ছিল না। যথার্থ ধার্মিকের কর্মই বটে! জ্ঞানদা যখন এই গর্ভপাতের প্রস্তাবে রাজি হয় না; তখন এই সামাজিক পাপের ভার চাপানো হয় গর্ভপাতের ওষুধ প্রদানে অস্বীকৃত হোমিওপ্যাথি ডাক্তার, গ্রামের সরলপ্রাণ প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়ের ওপরে। তবে, ঘটনার এখানেই শেষ নয়। জ্ঞানদা প্রতিবাদ জানিয়ে ওষুধ খায় নি। মেনে নিতে চায় নি গোলোকের আরেক জঘণ্য কর্ম গর্ভপাত। কিন্তু, গোলোকের সঙ্গে পেরেও সে ওঠে নি, তার কারণ হলো গোলোকের পেছনে রয়েছে সমস্ত সমাজটা। যেটাকে গোলোক কিনে রেখেছে পয়সা দিয়ে, সুবিধা দিয়ে, ক্ষমতা দিয়ে। এই টাকাটা, সুবিধাটা, ক্ষমতাটাই হলো শক্তিমান জোলাপ, যা খেয়ে পাথরসুলভ পাপও সমাজ নির্বিবাদে হজম করে, ন্যূনতম আজীর্ণেও ভোগে না। তাহলে, জ্ঞানদার বাঁচার পথ কোথায়? সে পথ তার রুদ্ধ। ফলে, আখ্যানের অন্তে গোলোকের দ্বিতীয় বিয়ের বৌভাতের রাতে তার দেয়া পঞ্চাশটা টাকা হাতে ধরে জ্ঞানদাকে চেপে বসতে হয় বৃন্দাবনের ট্রেনে।

৩.
বামুনের মেয়ে আখ্যানে গোলোকের আড়ম্বরপূর্ণ বৌভাতের রাতেই বৃন্দাবনের ট্রেন ধরে আরও দুজন। হোমিওপ্যাথি ডাক্তার প্রিয়নাথ এবং তার যুবতী কন্যা সন্ধ্যা; যারা গোলোকের নষ্ট পৃথিবীর সুস্থ দুজন মানুষ। এই তিন জনেরই একই উদ্দেশ্য, তাদের বাঁচতে হবে। এজন্যই ছাড়া চাই এই গ্রাম, গোলোকের নষ্ট পৃথিবী। প্রিয়নাথ এ গ্রামের ঘরজামাই, গোলোকের দূর-সম্পর্কের ভাগ্নি জগদ্ধাত্রীর বর। তাদের একমাত্র কন্য সন্ধ্যা। যে এই আখ্যানের একমাত্র সক্রিয় প্রতিবাদী, মানবিক চরিত্র। আমরা দেখেছি সমাজের কারণে, নিজেদের বাড়ি হতে উদ্বাস্তু, নীচুজাতের দুলে কন্যাদের সে কিভাবে অরুণের বাড়িতে থাকার সংস্থান করে দিয়েছে। আবার, এই সন্ধ্যাই মুখে মুখ রেখে প্রতিবাদ জানাতে পারে গোলোক ও রাসমণির তুল্য সামাজিক নষ্টদের কূটকথার। সন্ধ্যার প্রতিও বয়স্ক কামকাতর গোলোকের নজর পড়েছিল, সে তাকে বিয়ে করতে চায়। অবয়সে আহ্লাদী হয়ে খবরটা বয়ে আনে রাসমণি, জগদ্ধাত্রীকে বিয়ের প্রস্তাব পাড়ার আগেই ভূমিকা করে : ‘যা ভিজে কাপড়ে, ভিজে চুলে গিয়ে শ্রীধরকে সাষ্টাঙ্গে নমস্কার কর গে। পঞ্চাননের আর বিশালক্ষীর স্থানে পুজো পাঠিয়ে দিয়ে গে।’ তবে, সন্ধ্যার বাবা-মায়ের অরাজিতেই গোলোকের এই বাসনা চরিতার্থ হয় না। সন্ধ্যার বিবাহ স্থির হয় অন্যত্র, আরেক বামুন ঘরে। কিন্তু, গোলোক তো এত সহজে নিষ্কৃতি দেবার পাত্র নয়, সে আরেক নীচুতার আশ্রয় গ্রহণ করে। টাকা দিয়ে কেনা মৃত্যুঞ্জয় ঘটকের মাধ্যমে ভরা বিয়ের আসরে প্রমাণ করে যে, সন্ধ্যা বামুনের মেয়ে নয়। কারণ, তার বাবার জন্মের ঠিক নেই, সে ব্রাহ্মণ সন্তান নয়; ব্রাহ্মণরূপী জালিয়াত হিরু নাপিতের সন্তান। বিয়ে ভেঙে যায়। এই খবর শোনার পর সন্ধ্যার মা, স্বামীর জন্য জাত খোয়ানো জগদ্ধাত্রী পুকুরে ঝাঁপ দেয়। তবুও সে বাঁচে, গ্রামেই থাকে। কারণ, সে তো বামুন কন্যা, প্রায়শ্চিত্ত করলেই পাপমোচন হবে, জাতে ফিরবে। উঁচুজাতের জন্যই সমাজ তাকে এ সুবিধা দিয়েছে, বিধানটা তো কেবল তাদের জন্যই। কিন্তু, সন্ধ্যা ও তার বাবার পালানো ব্যতিরেকে উপায় থাকে না।


টিকে গেছে গোলোক চাটুয্যের নষ্ট পৃথিবী। বন্ধ হয়ে গেছে মুক্ত মানুষের আগামী।


জাত হারিয়ে, তাদের যে মুখ দেখাবার উপায় নেই! এর মাধ্যমে শরৎচন্দ্র জাত-পাতের সামাজিক কুপ্রথা আমাদের নিকটে আরেকপ্রস্থ উপস্থাপন করেন। দেখান, তুচ্ছ জাত-পাত প্রথার কারণে কিভাবে মানুষের জীবন, ভবিষ্যৎ, স্থিতি ধূলিসাৎ, অনিশ্চিত হয়ে যায়। তাদের বেঁচে থাকার উপায় বন্ধ হয়ে যায়। আর, তারই সুযোগ গ্রহণ করে সমাজটাকে আরও নিজেদের আয়ত্তে আনতে সক্ষম হয় গোলোক চাটুয্যের তুল্য অমানুষেরা। মানুষকে পায়ের নিচে পিষে মারার পথটা সুগম করে, মানুষকে আটকে ফেলে শোষণের জালে। শরৎচন্দ্র সামাজিক সমস্যা তুলে, প্রশ্ন জাগিয়ে আখ্যানের পর্দা টানেন, বামুনের মেয়েতেও তার ব্যতিক্রম হয় নি। কিন্তু, প্রকৃতই কি জ্ঞানদা, প্রিয়নাথ আর সন্ধ্যা বৃন্দাবনে গিয়ে মুক্তি পাবে? সেখানেও কি নেই কোনো নতুন ফাঁদ? তাদের চলে যাওয়া তো একপ্রকার পরাজয়। এসব প্রসঙ্গ শরৎচন্দ্র উপস্থাপন করেন না, তিনি নিরুত্তর। কারণ, এখানে কিছু বললে তো সমাজটাকেই ভাঙার ডাক দিতে হয়। যেটা কিনা হাজারো গোলোকে রীতিমতো ঘোগের বাসা হয়ে উঠেছে। এই ডাক শরৎচন্দ্র দিতে পারতেন একটি চরিত্রের মাধ্যমে, সেটি অরুণ। তাকে নিয়েও কিছু বলা প্রয়োজন বোধ করছি। অরুণ সকল গ্রাম্য প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে বিলেতে পড়তে গিয়েছিল। সে-কারণে, গোলোক কিংবা রাসমণির মতো নষ্টদের কাছে সে জাত খুইয়েছে, বিধর্মী হয়ে গেছে। আমরা দেখি, অরুণের ওপরেও একটা সামাজিক অত্যাচার নীরবে পুরো আখ্যান জুড়েই চলেছে। একারণে, অরুণ পৈতৃক বিষয় বিক্রি করে গ্রাম ছেড়ে চলে যেতেও চেয়েছিল। কিন্তু, আমাদের প্রশ্ন, অরুণ কেন প্রতিবাদী হলো না? কেন গোলোককে অস্বীকার করল না তীব্রভাবে? কেন গড়ে তুলল না কোনো প্রতিবাদ, প্রতিরোধ? কিংবা, সন্ধ্যাকেই কেন চলে যেত দিল ওভাবে? সে কেন হয়ে উঠল না বামুনের মেয়ের চার বছর আগে প্রকাশিত পল্লী সমাজের রমেশের তুল্য এক সংস্কারক চরিত্র। শরৎচন্দ্র এসব প্রশ্নে নিরুত্তর থেকেছেন। সম্ভবত, খানিকটা রক্ষণশীলও। যার ফলশ্রুতিতে, একজন সম্ভাবনাময় অরুণ পরিণত হয়েছে ব্যর্থ, অমেরুদণ্ডীতে; টিকে গেছে গোলোক চাটুয্যের নষ্ট পৃথিবী। বন্ধ হয়ে গেছে মুক্ত মানুষের আগামী।