হোম বই নিয়ে রোহিঙ্গাপুস্তকে যা লেখা আছে

রোহিঙ্গাপুস্তকে যা লেখা আছে

রোহিঙ্গাপুস্তকে যা লেখা আছে
30
0

কনফেশন

সেলফকে অপরের কাছে প্রকাশ করায় নানান জটিলতা থাকে। আপনার সাথে কমিউনিকেশনের জটিলতা। সান্ত্বনা এই থাকে যে, বাংলা ভাষায় ‘আপনার’ মানে আমি নিজেই। একটা বই পড়ে শেষ করার পর নিজের সাথে নিজের আলাপ হয়, বিবেচনা হয়, এখানে সেই বিবেচনা তুলে ধরা অনেকটা। ‘রোহিঙ্গাপুস্তকে আত্মহত্যা লেখা নেই’ নামে একটি কবিতা পুস্তক পড়ার পর আমি যা বোধ করেছি, সেই আলাপটাই এখানে করা যেতে পারে। কিছু সাক্ষ্য সমেত। নইলে আমার আলাপ আপনি কেন নিবেন, যে আপনি আমার সেলফ না!


কবির কী দোষ

কবি কেমন করে মুখোমুখি হন কবিতার, কবিতা কেমন করে সামনে আসে কবির কিংবা কবি কোথা থেকে প্রেরণা পান কবিতা লেখার—এইসব প্রশ্ন ক্রিয়াশীল থাকে সব সময়। কেউ কেউ যদিও দাবি তোলেন কবিতা নিতান্তই একটা মেকানিক্যাল বিষয়, গড়ে উঠার বিষয়—তবু পারিপার্শ্বিক বাস্তবতা প্রকৃত কবি কখনো এড়াতে পারেন না। কবি তো বেশিরভাগ সময়ই খাপ না-খাওয়া মানুষ, যেহেতু তিনি অন্যান্যদের থেকে বেশি সেনসেটিভ। তার দেখার চোখ আলাদা। কবির জার্নি নান্দনিক, সৌন্দর্য তার লক্ষ্য তথাপি তাদের সামনে অসুন্দর এসে লাব্বায়েক জানায়, তাকে পীড়ন দেয়। তার যেহেতু বিশেষ কিছু করার থাকে না লেখা ছাড়া, তাই এই পীড়ন তাকে দিয়ে লেখিয়ে নেয়। খুব বেশি ম্যাসোকিস্ট না হলে কে আর বলতে পারে, ‘বিরহরে সাজাই আমি গেরুয়া রঙ দিয়ে!’ আমরা সর্ব সাম্প্রতিক যে হত্যাযজ্ঞ দেখেছি, তাতে গেরুয়া পরা একটা পার্টি ছিল নির্যাতকের ভূমিকায়। তারাই লেখিয়ে নেয় রোহিঙ্গাদের নিয়ে অনেক কবিতা বাংলা ভাষায়। এই কবিতাগুলো পীড়নজাত কবিতা। অন্তত পীড়ন প্রাণিত। আমরা যে জঘন্য গণহত্যা দেখেছি , রোহিঙ্গাদের বিপক্ষে যে জাতিগত নিধন দেখেছি তার অভিজ্ঞতা থেকেই লিখিত হয়েছে কামরুজ্জামান কামুর ‘আমিই রোহিঙ্গা’ কিংবা কাজী নাসির মামুনের ‘রোহিঙ্গাপুস্তকে আত্মহত্যা লেখা নেই’। এই অভিজ্ঞতার একটা অংশ বাংলাদেশ। তাই এই ভূভাগের কবি মাত্রই এই প্রপঞ্চ দ্বারা আলোড়িত হয়েছেন। মানবিক হৃদয় দিয়ে আগলে ধরেছেন। কামু যেখানে লিখেছেন—

আমি নিপীড়িত আমি রোহিঙ্গা
দিগম্বরের বেশে
নিখিল-বিশ্ব হামাগুড়ি দিয়ে
এসেছি বাংলাদেশে

সেখানে কাজী নাসির মামুন লিখেছেন—

মানবতা মাতৃত্ব চেয়েছে;
জঠর দিয়েছে বাংলাদেশ।
প্লাস্টিকের ত্রিপল, নীল পলিথিন ঘেরা
বাঁশের ঝুপড়ি দিয়ে বানানো জগৎ
পৃথিবীর তলপেটে
প্রসব ব্যথায় জাগে রোহিঙ্গা নগর।”

এই যে মানবতা মাতৃত্ব চায়, জঠর দেয় বাংলাদেশ, এই বাংলাদেশ সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদী বাংলাদেশ না। এই বাংলাদেশ নিপীড়ক রাষ্ট্র বাংলাদেশ না, এই বাংলাদেশ মানবিক জনগণের বাংলাদেশ। আমরা দেখেছি রাষ্ট্র তখন কেমন নেগেটিভ অ্যাপ্রোচ নিয়ে দাঁড়িয়েছিল। সেই জায়গা থেকে মানুষের এগিয়ে আসা দেখেছি, দেখেছি জঠর পেতে দিতে। যে জঠরে ধারণ করার বেদনার এক সাক্ষ্য হয়ে থাকে ‘রোহিঙ্গাপুস্তকে আত্মহত্যা লেখা নেই’।


রোহিঙ্গাপুস্তকে যা আছে

‘রোহিঙ্গাপুস্তকে আত্মহত্যা লেখা নেই’ বইতে কবিতা ঘনীভূত হয়েছে কখনো নিতান্ত ডকুমেন্ট, আবেগের উৎসারণ, ধারাবিবরণী থেকে গভীর দার্শনিকতা পর্যন্ত। আমরা যে অন্ধকার সময়ে বাস করছি, সেই অন্ধকারের এক ঘনায়মান রূপ ছিল রোহিঙ্গা হত্যাযজ্ঞ। যা ছোট ক্যানভাসে ধরা প্রায় অসম্ভব ছিল। তাই কবিকে দীর্ঘ কবিতার বিপদ সঙ্কুল পথে এগুতে হয়েছে। বিপদ এখানে দুই প্রকার অন্তত, দীর্ঘ কবিতার টানটান ভাব বজায় রাখার চ্যালেঞ্জ আর ঘটমান বর্তমানের ভেতরে থাকা লেখকের সাংবাদিকতামূলক বিবৃতি থেকে কবিতাকে রক্ষা করা। বলা বাহুল্য, কাজী সাহেব এখানে কবিতার প্রতি অবিচার করেন নি বরং দৃষ্টান্তমূলক ছিলেন।

রোহিঙ্গাপুস্তক পৃথিবীর এক কঠিন বাস্তবতার দিকে আঙুল তুলে শুরু হয়—

পৃথিবী মৃত্যুর দিকে গেছে
রক্তের নিশানমালা এখন উড়ছে আরাকানে।

এই মৃত্যুই পৃথিবীর বাস্তবতা। এই পৃথিবী আফগানিস্তান, ইরাক, ফিলিস্তিন, ইয়েমেন, মিয়ানমার… সবখানেই উড়ে চলে রক্তের নিশান। প্রাচীন দার্শনিকরা তিন বস্তুকে স্থান দিয়েছিলেন সমস্ত ‘সৃষ্টি’র পেছনে। আশ্চর্য দ্বৈততায় সেই ত্রয়ী জল-হাওয়া-মাটি পর্যন্ত নিপীড়কে পরিণত হয় রাষ্ট্র প্রযোজিত বৌদ্ধ মৌলবাদীদের দ্বারা। মানুষ যখন মানুষের পাশে থাকে না, তখন মাটি জল আগুন কিছুই থাকে না মানুষের পক্ষে—সব কিছুই চেপে ধরে—

আগুন! আগুন! বলে বৃষ্টির ঘূর্ণন
মাথায় নিয়েছে ওরা;
কান্নার বিকল্প নদী চোখের ভিতর।
ভূগোল বঞ্চনা পায়ে পায়ে।
জল তুমি রৌদ্রকন্যা? বিকশিত আগুনের বোন?

যদিও এই জাতিগত হত্যার পেছনের ইতিহাস করুণ এবং এর সর্ব সাম্প্রতিক কারণটি বহুলাংশেই সাম্রাজ্যবাদী বাণিজ্যিক তথাপি মুসলিম আইডেন্টিটি যেন আগুনে ঘি ঢালে! যেন মুসলমানদের বিপক্ষে জেহাদে নেমেছে ‘বৌদ্ধ জঙ্গি’। শান্তির কথা বলা গৌতম মুখ লুকাতে পারেন না তার গেরুয়া বাহিনী দেখে! কবির কাছে করুণ আর পীড়িত লাগে গৌতমকে—

নারীরা জ্বালানী কাঠ, শিশুরা ইন্দন।
………………
বিস্মিত গৌতম!

যুদ্ধের চেহারা পৃথিবীর সবখানেই একরকম। ধর্ষণ খুন জখম শিশু হত্যা। অদ্ভুত এক অসুস্থতা! সবাই ম্যাসিভ স্যাডিজমে আক্রান্ত যেন। সেই সংক্রামক স্যাডিজমে আক্রান্ত হয় পৃথিবীর মোড়লেরা! চিন রাশিয়া ভারত নিজ নিজ স্বার্থে চুপ। জাতিসঙ্ঘ ঢিমে তালে! কবিতায় কাজী নাসির মামুন ধরেন এইসব—

উদ্ধত হাতের প্রতিবাদে
আরাম বিতর্কে ঢুলো ঢুলো আমাদের জাতিসঙ্ঘ
শয়ে শয়ে মৃত্যুকে ভাবলো
হাসির ফোয়ারা
ভাবলো নিষ্পন্ন শান্তি এক কাপ চায়ের চুমুক।

বা,

পৃথিবীটা গোল ব্যাভিচার

নারী তার জিঘাংসা টার্গেট।

বা,

জলের নৌকায় মিলিটারি হয়েছিলো
প্রহার বাদক।

বা,

একেকটি দিন যেন সম্পূর্ণ দোযখ
শ্বাপদ অরণ্যে
নির্বিঘ্নে প্রস্তুত পুলসিরাত


বিষমুখা বাণিজ্যবিশ্বের ফোঁস

‘রোহিঙ্গাপুস্তকে আত্মহত্যা লেখা নেই’তে কবি টান মারেন বাণিজ্যবিশ্বের মুখোশে। সাবলীল আর কাব্যিক বর্ণনায় এসেছে টাকার প্রসঙ্গ, এসেছে পুঁজিবাদী পৃথিবীর কুৎসিত চেহারা—যেখানে বাণিজ্যই সব, বিকিকিনি ছাড়া আর কোনো আদর্শ নাই। পুঁজির সম্প্রসারণই এখানের প্রধান প্রবণতা, টাকাই শেষ কথা। সাম্রাজ্যবাদী এসব বাসনার দিকে তার ছিল তীব্র শ্লেষ—

কাঁটা ও ব্যাকুল বিত্তে
জোনাকির আলো বিনিয়োগ
বাণিজ্যে ফাগুন আনে বিষাক্ত ইচ্ছায়

বা,

চারিদিকে জীবিত কল্যাণ শুধু বাণিজ্য বিশ্বের
এখানে লুণ্ঠন
সকল উদয় থেকে দূরে
একটি ছাগল তবু সব কিছু খায়;
এই ব্যাধি-মর্মর প্রস্তরাঘাত
কতোকাল বইছে মানুষ।
ভাবছে পণ্যই ত্রাতা। বিধৃত ঈশ্বর।

বা,

বহুতল বাণিজ্যে চূড়ান্ত ওঠবস
ফণা ও আগুন সন্ন্যাসীর।

বা,

লোভের বেসাতি ছাড়া
এখানে কোথাও নাই ফুলের ঝঙ্কার


ডাক দিয়ে যায়

এই বইটি শুদ্ধ ঘটনার বর্ণনায় থেমে থাকে নাই। এইখানে ডাক আছে। ডাক রোহিঙ্গাদের প্রতি, আবিশ্ব জনপরিমণ্ডলের প্রতি। সেই ডাক প্রতিরোধের। কবি দেয়ালে পিঠ ঠেকা মানুষকে দার্শনিক প্রশ্নের মুখে ঠেলে দেন। বলে দেন, ‘বোতল বন্দি জলের কোটরে/ সাঁতারের ইতিহাস নেই।’ ফলে বন্দিত্ব যখন হাজির হয় বোতলের প্রতীকে, তার পিঠেই থাকে বোতল ভাঙার আহ্বান। বন্দিত্ব ভাঙতে হবে, নামতে হবে দরিয়ায়। সেই ভ্রমণ কখনই সরল সহজ না। কণ্টকপথ, ‘কৃত্রিম অহিংসা মারাত্মক’—থাকে এমন সতর্ক বাণী। থাকে বলা বার বার প্রতারিত মানুষের প্রতি—

ফল্গু ও লোভের ধনাঢ্য সংকটে
পৃথিবী দেয় নি কিছুই।
শুধু ঝাল-ধরা হা হু।
ফলে প্রতিরোধই পথ—

আত্মস্থ সত্যের দীপায়নে
কেবল মোমের মতো গলে যেতে নেই।
জীবন মুখস্থ নয়, ভ্রান্তিতে ইস্পাত;
তাকে মেলে ধরো;
বিশ্বাসের সূর্য সমর্থনে
দেখাও সাহস।

রাষ্ট্র বিষয়ে তার কবিতার ভাব যেন বিপ্লবী রাষ্ট্র চিন্তার সাথে একটা সূক্ষ্ম সুতা খুঁজে নেয়। যেখানে লেনিন বলেন, ‘রাষ্ট্র হল শ্রেণী বিরোধের অমীমাংসীয়তার ফল ও অভিব্যক্তি।’ সেখানে কাজী সাহেব বলেন, ‘রাষ্ট্র হল এক মর্মবিজ্ঞান; সীমান্তপ্রিয়;/ ভূগোল বিভোর যার অধিকার/ মুঠোর সঞ্চার ভালবাসে।’ কাজী নাসির মামুনের এই রাষ্ট্র পুঁজিবাদী রাষ্ট্র, বিরোধ মীমাংসা না হওয়া রাষ্ট্র। এই রাষ্ট্রের মানুষকে নানান অবদমনের ভিতর দিয়ে যেতে হয়। শ্রেণি বিরোধ না-মিটা রাষ্ট্রে আমাদের তড়পানো ছাড়া উপায় থাকে না, ‘বস্তুত মুক্তি তাই জীবন্ত ডানার নিচে তড়পানো/ আকাশ মাতানো অভিলাষ।’

শেষের আগে, শুরুতে

আকাশ মুক্তির। এই মুক্তি যতটা সময় না আসে ততটা সময় তড়পায় প্রলিতারিয়েত। কিন্তু তড়পানির ঘোষণাই যেন প্রধান প্রপঞ্চ হিসেবে রাখতে চান কবি। বস্তুত এইটাই তো চোখে পড়ে। নয়তো কেন বইটার নাম হবে, ‘রোহিঙ্গাপুস্তকে আত্মহত্যা লেখা নেই’! এই এক তড়পানো! পালিয়ে বেড়ানো। প্রতিরোধ নেই বিশেষ, দৌড়ে পালান। দাঁড়ানোর মাটি পেলেই খুশি যেন। কিন্তু জল মাটি আগুন—চৌদিকে, দাঁড়াবার মাটি নাই, পানের জল নাই, পোহাবার আগুন নাই—সবই সর্বগ্রাসী। প্রতারণার আয়না সারি সারি। প্রতিরোধহীন পলায়নোন্মুখ এক বয়ান। কবিরা যে স্বপ্নদ্রষ্টা হন, সেই দ্রষ্টা যেন এই সব খেয়ে ফেলা দেখে থমকে যান! যদিও দিশা দেয়া কবির কাজ না, সবসময়। তবু এইটুকু প্রশ্ন থেকেই যায়। শেষ পর্যন্ত যেন এস্কেপিস্ট লোকেদের কথাই তিনি বলে যান। এই দিশা দিতে না পারাটা আমার মতো লোকেদের খুঁত খুঁজে পাওয়ার সাফল্য হিসাবেও দেখতে পারেন!


আরও কিছু কথা আছে

‘রোহিঙ্গাপুস্তকে আত্মহত্যা লেখা নেই’ বইটি অবশ্যই প্রধানত রাজনৈতিক কবিতা। সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক কবিতা লেখাকে কবির জন্য বেশ শরমের কাজ হিসাবেই কোথাও কোথাও দেখা হয়। সেই কোথাওটা অবশ্যই কবিপরিমণ্ডলকে মাথায় রেখেই বলা। ফলে কবিকে রিস্ক নিতে হয়েছে! আর একটা বিষয় বিবেচ্য, দীর্ঘ কবিতার আকাল চলছে। হাজার হাজার বই বের হয় প্রতি বছর। তার সামান্যই দীর্ঘ কবিতার। এখানে কবি মুনশিয়ানা দেখিয়েছেন। যারা কাজী নাসির মামুনের কাব্য ভাষার সাথে পরিচিত, তারা এটা পড়েও মুগ্ধ হবেন। এই কারণে যে, এই কবিতাটি রাজনৈতিক মানবিক-অমানবিক ইতিহাসের বয়ান, সাম্প্রতিক ঘটনা এখানে ক্রিয়াশীল তবু এখানে কবিতাটি কোথাও শ্লথ হয়ে পড়ে নি, গতিশীল টানটান ছিল! এবং আশ্চর্যজনকভাবে কবিতাটি কাব্যিক সৌন্দর্যের সাথে বিন্দুমাত্র কম্প্রোমাইজ করে নি। এটা এই বইয়ের একটি প্রধান বিশিষ্টতা হিসেবে দেখা যায়। জীবনের ক্লেদ ক্লান্তিকে পেছনে ফেলে কবি শেষ পর্যন্ত সশ্রম প্রতিবাদের ভেতর দিয়েই সংকতের মেঘ কাটাতে চান—

প্রতিবাদ একটি উদ্যোগ
জীবনের সশ্রম সঙ্গীত
আমূল সঙ্কটে বার বার গেয়ে যেতে হয়।

রোহিঙ্গা গণহত্যার কাব্যিক প্রতিবাদী ডকুমেন্টেশনের পাশাপাশি গ্রন্থটি প্রায়-রাজনীতি বিবর্জিত সমকালীন কবিতা পরিমণ্ডলের প্রতিও একটি ব্যঙ্গাত্মক হাসি।

(30)

Latest posts by হাসান জামিল (see all)