হোম বই নিয়ে রাফিক হারিরির উচ্চাভিলাষী প্রকল্প : ঐতিহাসিক উপন্যাস ‘ওমর’

রাফিক হারিরির উচ্চাভিলাষী প্রকল্প : ঐতিহাসিক উপন্যাস ‘ওমর’

রাফিক হারিরির উচ্চাভিলাষী প্রকল্প : ঐতিহাসিক উপন্যাস ‘ওমর’
0
Mohammad Aza

ইসলামের ইতিহাসের দ্বিতীয় খলিফা ওমরের জীবনভিত্তিক উপন্যাস রচনা করতে নেমে রাফিক হারিরি নিশ্চিতভাবেই একটা ঝুঁকিপূর্ণ অভিযান শুরু করেছিলেন। উপন্যাসের, এমনকি ঐতিহাসিক উপন্যাসেরও, যেসব জরুরত সম্পর্কে আমাদের ধারণা আছে, ওমরের জীবনের প্রচলিত কাহিনি ও ঐতিহাসিক ঘটনাবলিতে সেগুলোর কিছু ঘাটতি তো আছেই। বিশ্বাসের শক্ত ভিতের উপর যে কাহিনি বা ঘটনা অসংখ্য মানুষের স্থির-নির্দিষ্ট মূল্যায়ন নিয়ে জারি থাকে, তাকে সাহিত্যের আদলে এদিক-সেদিক করতে যাওয়া বিপজ্জনকই বটে। ব্যাপারটা শুধু অন্যের প্রতিক্রিয়ার নয় আসলে; বরং যিনি লিখছেন, তিনিও ওই বিশেষ ভাবাবহের ভিতর দিয়েই বড় হয়েছেন। তদুপরি যাকে ইতিহাস-রস বা ইতিহাসের সত্য নামে চেনা হয়ে থাকে, তাকে রদ করা খুব সহজ কাজও নয়, আরো বড় ‘সত্যে’র প্রতিষ্ঠা ছাড়া খুব প্রশংসনীয়ও নয়।

ঐতিহাসিক সত্যের প্রায় একরৈখিকতা ছাড়াও ওমর বা তাঁর মতো কারো জীবন নিয়ে উপন্যাস লেখার আরেকটি গুরুতর সংকট ব্যক্তিটিকে আলাদা করে চেনার মতো মালমশলার অভাব। এটা ঠিক, ওমরের জীবন নিয়ে যেসব ঘটনা পড়ে বা শুনে এ মুলুকের বাচ্চারা, বিশেষত মুসলমান বাচ্চারা, বড় হয়, সেগুলো ব্যক্তি-ওমরের নামেই জাহির আছে। কিন্তু একস্তর গভীরে নজর দিতে পারলেই টের পাওয়া যাবে, এই ব্যক্তি ঠিক উপন্যাসের ব্যক্তি নয়। উপন্যাস তার আধুনিক ইতিহাসের চারশ বছর ধরে ব্যক্তিকে যে গুণে-মানে তুলে আনার জন্য এতটা সুনাম কুড়িয়েছে, ইতিহাস বা গল্পগাছার ব্যক্তি আসলে তার ধারে-কাছেও যায় না। ওমরকে নিয়ে চালু কাহিনিগুলোর আরেক দফা সমস্যা এই যে, এসব কাহিনিতে ওমর তো এক মহাবয়ানের মূর্তিমান প্রতিনিধি হওয়ার চাপে ব্যক্তি-বৈশিষ্ট্যের অন্তত খানিকটা খুইয়ে বসেন। যদিও কাহিনিগুলোতে, ধরা যাক, ইসলামের চার খলিফাকে আলাদা সুরতে চেনা যায়, তবু দিনশেষে তাঁরা ইসলামের বার্তাবাহক হিসাবেই আমাদের সামনে উপস্থাপিত হন। ঠিক এই মাপের ‘ব্যক্তি’তে উপন্যাসের পোষায় না।


একদিকে তথ্য-উপাত্তের ঘাটতি আছে, অন্যদিকে আছে পাহাড়প্রমাণ স্পর্শকাতরতা।


সমস্যা আরো আছে। ব্যক্তিকে চেনার জন্য সমষ্টির মধ্যে স্থাপনের যে কেতা উপন্যাসের সাধারণ স্বভাব, সেই সমষ্টির প্রধান একক আবার পরিবার। নারীর সাপেক্ষে পুরুষ এবং পুরুষের সাপেক্ষে নারীকে অন্তরঙ্গভাবে চেনার একটা তরিকা আছে। মানুষ সাধারণভাবে পারিবারিক। বিপুল অধিকাংশ মানুষের অস্তিত্ব আসলে পারিবারিকই। তাই ব্যক্তিকে চেনার সরল কিন্তু অনিবার্য তরিকা পরিবারের বলয়ে চেনা। ওমরের মতো যাঁদের অস্তিত্বের প্রধান পরিচয় পরিবার নয়, তাঁদের ক্ষেত্রেও ওই পরিবারই হতে পারে অন্যতম প্রধান কৌশল। কারণ, যা বহুজনের জন্য স্বাভাবিক বলে গণ্য হয়, তার সাপেক্ষে ব্যতিক্রম শনাক্ত ও সাব্যস্ত করা সম্ভব। বলার কথাটা হলো, ওমরের ক্ষেত্রে এ সুযোগটাও কম। একদিকে তথ্য-উপাত্তের ঘাটতি আছে, অন্যদিকে আছে পাহাড়প্রমাণ স্পর্শকাতরতা।

এ সবের সাথে যোগ করা যাক ঐতিহাসিক উপন্যাস লেখার নিজস্ব হ্যাপা। স্থান ও কালের ওই সংযোগবিন্দু আঁকতে পারা, যে বিন্দুতে পাত্র-পাত্রীরা জীবননাট্যে অভিনয় করলে বাস্তবের আবহটা হুবহু পাওয়া যাবে। কাজটা এমনিতেই জটিল। তার উপর স্থান ও কালের দূরত্ব যদি এমন হয় যে, বস্তুগত উপকরণগুলো, সংস্কৃতির প্রধান সূত্রগুলো আর প্রাকৃতিক ও মনুষ্যনির্মিত অবকাঠামো রীতিমতো আধা-চেনা বা প্রায় অচেনা, তাহলে কাজটা হয়ে যায় আরো দুরূহ। ওমর নিয়ে লিখতে গিয়ে রাফিক হারিরি নিশ্চয়ই এসব গভীর সংকট মোকাবেলা করেছেন।

এখানে একটা প্রশ্ন তোলা দরকার। যদি স্থান-কালের দূরত্ব এত বেশিই হবে, যদি সাংস্কৃতিক ফারাক প্রায় অচেনার আবহ তৈরি করবে, তাহলে ওই বিষয়ে সাহিত্যকর্ম বা অন্য কোনো শিল্প রচনা করতে হবে কেন? এ প্রশ্নের প্রাথমিক উত্তর অবশ্য বেশ সরল। দুনিয়া জুড়ে ইতিহাসের সব কালেই এ ধরনের শিল্পকর্ম রচিত হয়েছে। ফলে রাফিক হারিরি একই ধরনের একটা প্রকল্প নিয়ে ঠিক কাজটিই করেছেন। কিন্তু বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক রাজনীতির একটা দুর্ভাগ্যজনক বাস্তবতা হলো, ইসলামি আবহে মুসলমানি ঐতিহ্যে রচিত শিল্পকর্ম এখানে অকারণ বিরোধের মুখে পড়ে। মূর্খতাবশত এখানকার সংস্কৃতিসেবীদের একাংশ বুঝতে পারে না যে, মুসলমান সমাজের জন্য আরব-ইরান-তুরানের গল্প তাদের ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য এবং তাজা অংশ। এই বুঝতে না পারা যে ঐতিহাসিক-সাংস্কৃতিকভাবে গড়ে ওঠা ইসলামফোবিয়া, তা বুঝতে না পারাটাই মূর্খতার প্রধান প্রকাশ। ফলে কলকাতার উনিশ শতকীয় সংস্কৃতিতে উত্তর ভারতের ‘প্রাচীন ভারতীয়’ সংস্কৃতির প্রবল প্রতাপ, ইউরো-আমেরিকান সংস্কৃতিতে বেথেলহামস্থ যিশুর সরব উপস্থিতি, শামসুর রাহমানের কবিতায় গ্রিক কাহিনির রূপায়ণ আর ফররুখের কবিতায় মধ্যপ্রাচ্য যে আদতে একই প্রক্রিয়ার ভিন্ন ভিন্ন রূপ, তা বুঝতে অনেকেরই অনীহা দেখা যায়। বলার কথাটা হলো, এ অনীহাটা সাংস্কৃতিকভাবে নির্মিত। এ অনীহা মিথে আকণ্ঠ নিমজ্জিত থেকে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা করার পরিণতি। তা না হলে বোঝা মোটেই কঠিন নয়, ফররুখ আহমদের কবিতা মধ্যপ্রাচ্য তো দূরের কথা, পাকিস্তানের জন্যই কোনো তাৎপর্য বহন করে না; পাকিস্তান রাষ্ট্রে ফররুখের কবিতা নিয়ে উর্দুভাষী অঞ্চলে একবিন্দু আগ্রহ দেখা যায় নাই। ফররুখের কবিতা খাঁটি বাংলাদেশি মাল; কেউ নির্মম হতে চাইলে বড়জোর বলা যায়, এ কবিতা বাঙালি মুসলমানের। বলা যায়, এ কবিতা পাকিস্তান আন্দোলনের। কিছুতেই বলা যাবে না, এটা মধ্যপ্রাচ্যীয় বা আরব-ইরানের।

এ সোজা কথাটা মনে রাখলে বোঝা যাবে, ওমর বাঙালি-মুসলমান সংস্কৃতির অনিবার্য অংশ। কার্যত, রাফিক হারিরি যে কাহিনিগুলোকে মুখ্য ভূমিকায় রেখে তার উপন্যাসের প্লট সাজিয়েছেন, তার বেশিরভাগই বাঙালি মুসলমান গল্পচ্ছলে শুনে ফেলে দূর শৈশবেই। কিন্তু উপন্যাস লিখতে গেলে এ ধরনের কাহিনিতে একটা অন্যরকম চাপ তৈরি হয়—বাস্তবসম্মত আবহ তৈরির চাপ। সে কাজটা কঠিন। বলা যায়, হারিরি আগে উল্লেখিত ঝুঁকিগুলোর সাথে সাথে এ বড় ঝুঁকিটাও নিয়েছেন। কিন্তু একদিক থেকে তার প্রত্যয়টা খাঁটি শিল্পীর। শিল্পকলা বিশেষ স্তর ছাড়িয়ে যে পর্যায়ে সার্বিকে পৌঁছায়, হারিরি সেখানে বাংলাদেশ আর তার বর্তমান বাস্তবতাকে দৃঢ়ভাবে গেঁথে দিয়েছেন। ফ্ল্যাপ বলছে, ‘কোনো রাষ্ট্রে যখন স্বৈরশাসন কায়েম হয়, শাসক ফ্যাসিবাদী হয়ে ওঠে, প্রতিষ্ঠিত হয় লুটতরাজের রাজত্ব, তখন সাধারণ মানুষ ওমরের মতো একজন সুশাসকের কথা কল্পনা করে মনে প্রশান্তি পায়।’ ঠিক এখানেই হারিরির এই প্রকল্প তার অন্যসব তাৎপর্যের সাথে সাথে সুগভীর রাজনৈতিক তাৎপর্যও হাসিল করে।

২.
আগেই যেমনটা ইঙ্গিত দিয়েছি, ইতিহাসের বা ধর্মীয় সত্যকে অগ্রাহ্য করে উপন্যাসের কোনো সত্যকে প্রতিষ্ঠা দেয়া, অন্তত ওমরের মতো চরিত্রকে ঘিরে, খুবই দুরূহ। রাফিক হারিরি সে চেষ্টাও করেন নি। অন্যভাবে বলা যায়, ধর্মীয় মূল্যবোধের আবহের মধ্যে যে মুসলমানরা জীবনযাপন করে, হারিরির উপন্যাস পড়লে তারা কোনো রকম চাপ বোধ করবে বলে মনে হয় না। লেখকের সম্বোধন, ভাষাভঙ্গি, পক্ষ-বিপক্ষ নির্ধারণ ইত্যাদির সুর পরীক্ষা করলে বোঝা যাবে, এরকম কিছু লেখকের ইচ্ছার মধ্যে ছিল না। তাহলে তিনি করেছেন কী?

প্রথমত এবং প্রধানত হারিরি ইতিহাস প্রণয়ন করেছেন। কাজটা খুব সহজ নয়। কিন্তু এ কাজের জন্য আমরা লেখককে খুব বেশি মূল্য দেবো না। কারণ, ইতিহাসে তার নিজস্বতা যথেষ্ট প্রকাশিত হয় নাই। কাজেই আমরা যাব এর পরের ধাপে। পরের ধাপ হবে ইতিহাসের বিবরণীকে উপন্যাসের ইমেজে রূপান্তর করা। এ কাজ করার জন্য দরকার হয় স্থান ও কালের সংযোগবিন্দু তৈয়ার করে ঘটনাকে মোলায়েম কায়দায় সেখানে স্থাপন করতে পারা। কাজটা হারিরি অনেক পরিমাণে করেছেন, কিন্তু সম্ভবত যথেষ্ট পরিমাণে করতে পারেন নি। ইতিহাসের বিবরণীর নিজেরই একটা কাহিনির আকার থাকে। এটা যে উপন্যাসের বিবরণীর চেয়ে আলাদা জিনিস, সেই হুঁশ রাখা খুব সহজ কাজ নয়। উদাহরণ হিসাবে বলি, বাদশাহ নামদার-এ হুমায়ূন আহমেদ তাঁর রীতিমতো তুলনাহীন বিবরণী আর ব্যক্তিত্বসম্পন্ন পর্যবেক্ষণ সত্ত্বেও কাজটা করতে পারেন নি। শাহীন আখতার ময়ূর সিংহাসন-এ প্রায় মোক্ষম কায়দায় এবং হুমায়ূন মধ্যাহ্ন প্রথম খণ্ডে অনেকাংশে কাজটা করতে পেরেছেন। রাফিক হারিরির এ চেষ্টাটা ছিল। কখনো কখনো সংলাপের বেশে আর কখনো স্থান-কালের মিলনবিন্দু তৈরি করার মধ্য দিয়ে তিনি কাজটা করতে চেয়েছেন। কিন্তু তুলনামূলক বেশিরভাগ জায়গায় ঘটনাটা যে হয়ে ওঠে নি, তার প্রধান কারণ, তিনি আসলে চরিত্র ও স্থানের ঐক্য মেনে কাহিনিটা পরিবেশন করেন নি। আমরা বলব, চরিত্রকে স্থানে উপস্থিত রেখে ঘটনাগুলোকে পুনর্বিন্যস্ত করতে গেলে সামগ্রিক কাহিনিরেখায় যে বৈপ্লবিক বদল আনতে হতো, হারিরি সে উচ্চাভিলাষ দেখান নি। না দেখানোর কারণ বোধ হয় আছে উপন্যাসটির গোড়ার সত্যে, যেকথা আমরা এর মধ্যেই নানা ছলে বলেছি—হারিরির জন্য ইতিহাসের সত্য যতটা গুরুতর ছিল, উপন্যাসের সত্য ততটা নয়।


একটা দারুণ প্যাশনে পুরা প্লটকে উদ্‌যাপন করতে পারার সাফল্য থেকেই মূলত উপন্যাসটির ভাষা এরকম গতি, এবং কোথাও কোথাও দ্যুতি, পেয়েছে।


ইতিহাসের সত্যের দিক থেকে হারিরির মনোযোগ ছিল মনে হয় দুই দিকে। একদিকে ওমরের ব্যক্তিগত বিশিষ্টতা ও মহত্ত্ব ফুটিয়ে তোলা, অন্যদিকে ইসলামি প্রগতির দিক থেকে শাসন ও বিজয় এই দুটিকে ওমরের ক্যারিশমা হিসাবে উপস্থাপন করা। এর মধ্যে ব্যক্তিগত বিশিষ্টতা ও মহত্ত্ব সাধারণভাবে চরিত্র হিসাবে ওমরের উপস্থিতিতেই দেখানো হয়েছে। কিন্তু রেফারেন্স পয়েন্ট সর্বত্র ধর্মীয় ম্যাটান্যারেটিভ। এমনকি নির্ভীকতা, সর্বস্ব দানের মন, স্বজনপ্রীতিকে শক্ত হাতে দমন, বা শাসক হিসাবে সমস্ত মানুষের দায়িত্ব নিজের কাঁধে নেয়ার চিন্তা—ইত্যাদি গুণগুলোও প্রচলিত কাহিনি মোতাবেকই সংঘটিত হয়েছে। এর মধ্যে অন্তত দুটি দিক বোধ হয় বেশ গুরুত্বের সাথে লেখকের মনোযোগে ছিল, যেগুলো ঠিক ঐতিহাসিক তথ্য বা গল্পে মশহুর নয়। একটি হলো তাঁর শাসনভঙ্গির গণতন্ত্র; অন্যটি মানবিক বোধের এক গভীর প্রজ্ঞাজাত উপলব্ধি। প্রথমটি প্রকাশিত হয়েছে মুখ্যত মসজিদে নববির সমাগমে। আর পরেরটির ভালো উদাহরণ হুতাইযা-উনাইযার প্রলম্বিত প্রেম-কাহিনি।

তুলনায় মদিনার বাইরের অংশে, বিশেষত রোম ও পারস্য সীমানার যুদ্ধ-ময়দানগুলোতে লেখকের দিক থেকে স্বাধীনতার সুযোগ অনেক বেশিই ছিল। এ অংশগুলোতে প্রতিপক্ষ হাজির। আর লেখক এক ধরনের ডায়ালেকটিকস তৈরির ব্যাপারে সতর্ক ছিলেন বলেই মনে হয়। পুরানা সাম্রাজ্যগুলো কী কী সংকটের কারণে নিজেদের আভিজাত্যবোধ আর ঐতিহ্যগত কলাকৌশল সত্ত্বেও নতুনের কাছে পরাস্ত হচ্ছে, তার একটা রূপরেখা রক্ষা করে, আমি বলব, লেখক থিয়োলজির বাইরে সেক্যুলার ইতিহাসের সম্ভাবনা উজ্জ্বল করেছেন। আমি বলব না যে, পক্ষ-বিপক্ষের প্রতি তিনি সমান মনোযোগ দিতে পেরেছেন, বলব না যে, সেক্যুলার দৃষ্টিই তাঁর প্রধান দৃষ্টিভঙ্গি—দুটোর কোনোটাই এ উপন্যাসের কাঠামোর মধ্যে করা সম্ভব ছিল না; কিন্তু এটা বলা যাবে, লড়াইয়ের ময়দানগুলোকে তিনি শয়তান ও ফেরেশতার বিরোধে নামিয়ে না এনে মনুষ্যোচিত একটা চেহারা দিতে পেরেছেন।

৩.
ওমর উপন্যাসের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য এর ভাষাভঙ্গি ও বর্ণনার গতিশীলতা। আমি একে হয়তো প্রধান গুণই বলতে পারতাম। ঢাকার একটা সাধারণ মূর্খতার জবাব হিসাবে এটা বলা থেকে নিজেকে হেফাজত করলাম। চিন্তা ও সৃষ্টিশীলতার চর্চা তলানিতে ঠেকার প্রেক্ষাপটে ঢাকায় এ কথা এন্তার শোনা যায় যে, অমুক লেখার গদ্য ভালো এবং ঝরঝরে। এই আলাপ নিশ্চয়ই চলতে পারে। কিন্তু নিশ্চয়ই তা খুবই প্রাথমিক পর্যায়ের আলাপ হিসাবে। যে সাহিত্যকর্ম হয়ে গেছে, কিংবা যে লেখা কোনো চিন্তা প্রকাশ করতে পেরেছে, কোনো একটা কথা বলে ফেলতে পেরেছে, সে-লেখার ক্ষেত্রে ভাষার সারল্যের আলাপ তো একটা আস্ত মুনাফেকি। হয় আলাপটা হবে চিন্তা নিয়ে, অথবা বলতে হবে, কিছুই হয় নি। শুধু ভাষা নিয়ে তো কোনো আলাপ চলতে পারে না। ঢাকার ভয়ংকর অধঃপতনের লক্ষণ হিসাবেই হয়তো আলাপ আজকাল এ পর্যায়ে এসে ঠেকেছে। যাই হোক, হারিরির ওমর সম্পর্কে বরং বলা দরকার, একটা দারুণ প্যাশনে পুরা প্লটকে উদ্‌যাপন করতে পারার সাফল্য থেকেই মূলত উপন্যাসটির ভাষা এরকম গতি, এবং কোথাও কোথাও দ্যুতি, পেয়েছে। আর হারিরির লেখালেখির লম্বা ইতিহাস সম্পর্কে জানা থাকলে এও বলা যাবে, অনুবাদ ও মৌলিক রচনায় দীর্ঘদিনের নিবিষ্টতা হয়তো একটা সমে পৌঁছেছে। আরেকটা কথাও এখানে তোলা যায়। লেখকজীবনের শুরুতে হারিরির বানান ও ভাষারীতি প্রশ্নে যে শিথিলতা ছিল তা কিভাবে যেন আজতক রয়ে গেছে। তা সত্ত্বেও একটা ঢাউস রচনার গদ্য তাল ও লয় রক্ষা করে তিনি সামলাতে পেরেছেন। এ কথার অর্থই হলো, ভাষার পারিপাট্যের একটা অংশ পেশাদার সম্পাদকরাই সামলে ফেলতে পারেন। আমাদের দেশে সেই চল না থাকায় কিছু অনাবশ্যক দায় লেখকের কাঁধে চলে আসে।

সে যাই হোক, লেখার গতি সম্পর্কে উপরে যা বলা হলো সেটাও তো শিথিলমনা বা আরামপ্রিয় পাঠকের মামলা। যে পাঠক উপন্যাস-গল্প পড়তে এসে লেখার জটিলতায় দমেন না, তার জন্য এ উপন্যাসে কী আছে? উত্তরে বলব, আছে; এবং সেটাই সম্ভবত ওমর উপন্যাসে শিল্পী হারিরির সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব। হারিরি তার উপন্যাসে প্রাকৃতিক ও ভৌত অবকাঠামো, মানুষের জীবন ও জীবিকা, এবং পারস্পরিক যোগাযোগ উপস্থাপনের জন্য জুতসই ভাষা তৈরি করতে পেরেছেন। আমি বলব না যে, এ ব্যাপারে শিথিলতা নাই। বেশ পরিমাণেই আছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও বাংলা সাহিত্যের পরিপ্রেক্ষিতে হারিরির এ কৃতিত্ব সম্ভবত বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য থেকে যাবে। হারিরির মদিনা চোদ্দশ বছর আগের একটা আবহ তৈরি করতে পেরেছে। মরুভূমির ভাঁজে ভাঁজে খেজুরগাছ, ফসলের মাঠ আর অন্য অবকাঠামোকে তিনি এমনভাবে মূর্ত করতে পেরেছেন যে, মানুষগুলোর স্বভাব ও আচরণের একটা ন্যায্যতা তার মধ্যেই প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। এর পরের ধাপে দরকার মানুষের পারস্পরিক সম্বোধনের ভাষা আবিষ্কার। এ কাজটাও ওমর উপন্যাসের লেখক বেশ অনেকদূর পর্যন্ত সাফল্যের সাথে করেছেন।

কাজটা আসলে খুবই কঠিন। কারণ, বাংলা মুলুকের তুলনায় ওই ভূমি আর ওই মানুষ এতই আলাদা যে, তার জন্য জুতসই ভাষা খুঁজে পাওয়া সহজ হওয়ার কথা না। আধুনিক বাংলা সাহিত্যের আরেক সমস্যা হলো, যাকে মোটের উপর ইসলামি বা মুসলমানি ভাব বলা যায়, উত্তর ভারতীয় উর্দু তো বটেই এমনকি হিন্দিতেও যা দারুণ ফোটে, তা বাংলা ভাষায় ফোটানোর ক্ষেত্রে একটা ঐতিহাসিক দ্বিধা আছে। হারিরি যে এসব প্রতিবন্ধকতা বেশ স্বাচ্ছন্দ্যে কাটিয়ে উঠতে পেরেছেন, তার পেছনে বোধ হয় তার আরবি সাহিত্য পঠন-পাঠনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা কাজে লেগেছে। অন্তত পারস্পরিক সম্বোধনের ভাষা যেভাবে একই স্বর ও সুর বজায় রেখে তিনি অব্যাহত রাখতে পেরেছেন, এবং তাকে একটা সামঞ্জস্যপূর্ণ মূর্তি দিতে পেরেছেন, তাতে সেরকমই মনে হয়। ওই কালের প্রেক্ষাপটে আজকাল যে ভিজ্যুয়াল ইমেজ তৈরি হচ্ছে, রাফিক হারিরি কি তাতেও খানিকটা মজেছেন? কারণ যাই হোক, ওমর উপন্যাস সম্ভবত এই সাফল্যের জন্য অনেকদিন মূল্য পেতে থাকবে।

এই পটভূমিতে লেখকের দমের প্রসঙ্গটাও উঠানো উচিত। লেখার প্রবাহের মধ্যে একটা লয় একবার প্রতিষ্ঠা পেয়ে গেলে তা বজায় রাখতে দম লাগে। বিশেষত এরকম দীর্ঘ রচনায়। আবার প্রয়োজনে লয় বদল করে স্বরগ্রাম ঠিক রাখতে আরেক ধরনের সক্ষমতার দরকার হয়। হারিরি প্রথমটাতে মোটামুটি সক্ষমতার পরিচয় দিয়েছেন। উপকাহিনিগুলোর কথা মনে রাখলে হয়তো দ্বিতীয়টার কথাও বলা যাবে। তবে ওমর প্রসঙ্গে কথাটা তুললাম আসলে তৃতীয় এক দমের কথা বলতে। বেশ কয়েকটি জায়গায় প্রয়োজন অনুসারে লেখক মনোযোগ, শৈলী আর ঘনত্ব এমনভাবে তুরীয় করে তুলতে পেরেছেন যে, বলতেই হয়, হাল ধরে মসৃণ গতিতে নৌকা চালানো শুধু নয়, প্রয়োজনে ঝঞ্ঝা সামলানোর জন্যও তিনি তৈরি ছিলেন। এক্ষেত্রে পরের জন্য খানিকটা তোলা রেখে এখন বিশেষভাবে উল্লেখ করব মরুঝড়ের কমপক্ষে দুইটা বিবরণী, এবং বেশ কয়েকটা যুদ্ধ-বিবরণীর কথা। বিশেষত খালিদের মরু-অভিযানে কল্পনা এবং কল্পনার বাস্তবায়ন বেশ উল্লেখযোগ্য চূড়ায় পৌঁছেছে। খালিদের প্রতি যতটা প্রকাশ পেয়েছে লেখকের যে তারচেয়েও বেশি পক্ষপাত ছিল, ভাষার যৌবন তার মোক্ষম প্রমাণ।


উপন্যাসটিতে এমন অন্তত দুটি অংশ আছে যেগুলো দেখে মনে হয় উপন্যাসটি হয়তো তার অর্জিত সাফল্যকে ছাড়িয়ে যেতে পারত। 


৪.
উপন্যাসের দ্বিতীয় খণ্ডের ভূমিকায় লেখক যে মর্মবিদারী হাহাকার করেছেন, তা অযৌক্তিক নয়। সত্যি সত্যি এমন একটা উপন্যাস লিখে উঠতে গেলে অবর্ণনীয় পরিশ্রম করতে হয়। আর বাংলাদেশে এরচেয়ে সত্য আর কী হতে পারে যে, লেখালেখিকে কোনো তাৎপর্যপূর্ণ অর্থে গুরুত্ব দেয়ার পরিপক্বতা এ সমাজের নাই। কিন্তু বলতেই হয়, ওমর উপন্যাস পাঠকরা মোটের উপর ভালোভাবেই গ্রহণ করেছে। যিনি আরামদায়ক কাহিনি পড়তে চান তার জন্য, যিনি ইতিহাস পড়তে চান তার জন্য, এমনকি যিনি ইসলাম পড়তে চান তার জন্যও ওমর যথেষ্ট রসদের জোগান রেখেছে। পরিশ্রমের পুরস্কার হিসাবে এটা মোটেই কম নয়।

কিন্তু উপন্যাসটিতে এমন অন্তত দুটি অংশ আছে যেগুলো দেখে মনে হয় উপন্যাসটি হয়তো তার অর্জিত সাফল্যকে ছাড়িয়ে যেতে পারত। এর একটি আছে শুরুর দিকেই—নীলের পারে গড়ে তোলা রোমান প্রাসাদের বিবরণীতে। ক্লাসিক সাহিত্যের যাবতীয় লক্ষণ আছে এ বর্ণনায়। ভাষার গাম্ভীর্য ও সৌন্দর্য থেকে শুরু করে নামশব্দের সমাহার আর অবস্থা ও অবস্থানকে পূর্ণ মূল্য দিয়ে চরিত্রায়ণ। দ্বিতীয় অংশটি আছে শুরুতেই। তবে শেষাংশে আবির্ভূত হয়েছে আবার। উপন্যাসটি শেষ হবে বলে। আমি ওমরের হত্যাকারী আর তার তরবারির কথা বলছি। তার অগ্নি-উপাসনার আকুল সৌন্দর্যের কথা বলছি। ঘৃণাকে কবিত্বপূর্ণ বর্ণনায় হত্যার যুক্তি বানিয়ে তোলার কথা বলছি। দুটি অংশেরই প্রকাশক্ষমতা আর শৈলী লেখকের মুনশিয়ানার নিখুঁত চিহ্ন। কিন্তু তারচেয়ে বড় কথা, অংশ দুটোতে পক্ষ-বিপক্ষের সচেতনতা লুপ্ত হয়ে বড় হয়ে উঠেছে লেখকের অচেতন। ইতিহাসের দিক থেকে তা পাপ হতেও পারে, কিন্তু উপন্যাসের জন্য হয়তো সবচেয়ে বড় পুণ্য।

এ ধরনের অংশগুলো ভাবতে উদ্বুদ্ধ করছে, এই লেখক ইতিহাস বর্ণনায় যে কুশলতা ইতিমধ্যেই আয় করে নিয়েছেন, তার উপর ভর করে হয়তো আরো প্রকল্প তিনি নেবেন। ওমর-এর অভিজ্ঞতা থেকে এটা বলা অবান্তর হবে না, ইতিহাসের গোলামি না করে বরং ইতিহাসকে উপকরণ হিসাবে ব্যবহার করে ইমেজে রূপান্তরিত করলে, এবং নিজের প্রকল্পের পক্ষে কাজে খাটাতে পারলে, হয়তো উপন্যাসে জোরটা বাড়বে।