হোম বই নিয়ে যেভাবে পড়েছি ‘প্রসন্ন দ্বীপদেশ’

যেভাবে পড়েছি ‘প্রসন্ন দ্বীপদেশ’

যেভাবে পড়েছি ‘প্রসন্ন দ্বীপদেশ’
804
0

কিছুদিন আগের কথা। এক বড় ভাইকে আক্ষেপ করে বললাম, ‘ভাই আপনি তো অনেক বই-টই পড়েন বলে জানি। তা, বাংলায় লেখা দুইএকখান বই দ্যান, যা পড়ে টাসকি খেয়ে যাব। হতভম্ব হয়ে যাব। বই পাঠান্তে মনে মনে লেখককে বড় কুটুম (পড়ুন শালা) বা বড় কুটুমের পুত সম্ভাষণে বলব, …করছেটা কী! সাথে সাথে নিজের অজান্তে একটা দীর্ঘশ্বাস বের হবে। দীর্ঘশ্বাসের বাষ্পের মধ্যে নিজের লেখালেখি সম্পর্কে একটা হতাশাও মেশানো থাকবে। অনেকদিন বই পইড়া এইরকম হয় না।’ আমার কথা শুনে পড়ুয়া বড় ভাই ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলেন মনে হলো। তিনি বললেন, এই মুহূর্তে বলতে পারতেছি না। আগামীকাল আইসো।’ আজকের সব পরের দিনই যেহেতু আগামীকাল, তাই বড় ভাইয়ের আগামীকাল এখনো শেষ হয় নাই। আমিও সেই থ’ মারা বাংলা বইয়ের নাম আর পাই নাই। এর মধ্যেই আমার হাতে আসে মাসুদ খান (জ.১৯৫৯)-এর প্রসন্ন দ্বীপদেশ (২০১৮) কবিতার বইটা।

এই কবির কবিতার বই আগেও পড়েছি। পাখিতীর্থদিনে (১৯৯৩), নদীকূলে করি বাস (২০০১) আর সরাইখানা ও হারানো মানুষ (২০০৬)। পাখিতীর্থদিনে আর প্রসন্ন দ্বীপদেশ-এর মাঝখানে নদীকূলে করি বাস আর সরাইখানা ও হারানো মানুষ ছাড়াও মাসুদ খানের আরো কবিতার বই আছে। আঁধারতমা আলোকরূপে তোমায় আমি জানি (২০১১), এই ধীর কমলাপ্রবণ সন্ধ্যায় (২০১৪) আর দেহ-অতিরিক্ত জ্বর (২০১৫)—বোধ হয় এই তিনটা। এগুলো নানা কারণে আমার পড়া হয় নাই। এইবার পড়লাম শেষটা—প্রসন্ন দ্বীপদেশ। এই যে কিছু বই পড়া আর কিছু না পড়া একেই বোধ হয় বলে খাবলা-খাবলা পড়া। এইটা খুব খারাপ। কিন্তু আমার বর্তমান কথা বলার ক্ষেত্রে সমস্যা নাই। কারণ প্রত্যেকটা কবিতাই সার্বভৌম বলেই মনে করি। আর আমি এখানে তাঁর সব বই নিয়ে কথা বলতে বসি নাই। কথা পাড়ব শুধু প্রসন্ন দ্বীপদেশ নিয়ে। সেইটা পড়া আছে আমার।

তা যে কথা বলছিলাম। প্রসন্ন দ্বীপদেশ বইয়ের প্রথম কবিতা ‘স্বপ্নভূভাগ’ পড়ে সত্যিই টাসকি খাইলাম। কত গভীর, সযত্ন, আরামদায়ক আর খাঁটি কবিত্বে ঠাসা! ‘কালের রেদার টানে সর্বশিল্প করে থরথর’—একথা জেনেও এই প্রশ্নও জাগল নিজের ভেতরে যে, এরকম কয়টা কবিতা থাকলে বহুকাল টিকে থাকা যায়। মনে মনে খোঁজ করতে শুরু করলাম বড় বড় কবি-সাহিত্যিকদের মাস্টারপিসের সংখ্যা নিয়ে। দেখলাম কারোরই কমপ্লিট কবিতার সংখ্যা খুব একটা বেশি না। কথাসাহিত্যিকদের খোঁজ করলাম। দেখলাম সেখানেও একই অবস্থা। সবাই লিখেছে ঢের। কিন্তু টিকেছে কম। আমরা যখন কোনো বড় কবি বা সাহিত্যিকের কবিতা বা সাহিত্য নিয়ে কথা বলতে যাই, তখন ঘুরেফিরে ওই কয়েকটা মাস্টারপিস নিয়েই কথা বলি। ওই হাতেগোনা কয়েকটার নাম নিয়েই বলি, দেখছেন বড় কুটুম বা বড় কুটুমের পুত করছেটা কি! তা, এই ‘স্বপ্নভূভাগ’ কবিতা পড়ে নিজের অজান্তে ওই রকম একটা কথা বের হয়ে আসল। সাথে নিজের লেখালেখি সম্পর্কে একটু হতাশা বোধ করলাম। বলে রাখা ভালো, মাসুদ খান বয়সে আমাদের বেশ বড় হলেও আমরা তাকে ভাই বলি। যেমন, শামসুর রাহমান জীবিত থাকতে তাঁকে আমরা বলতাম রাহমান ভাই। যদিও তাঁর জন্মসাল আর আমার বাপের জন্মসাল একই (১৯২৯)। আবার জীবিত নির্মলেন্দু গুণকে আমরা বলি গুণদা। কবি বলেই বোধ হয় এই ভাই বা ‘দা বলা যায়। আর আলাপ-পরিচয়সূত্রে দেখা-সাক্ষাৎ হয় বলেই বোধকরি তাঁদের টাসকি লাগানো কোনো লেখা পড়ে বড় কুটুমবাচক কোনো শব্দবন্ধ মাথা আসে না। আসে ভাই বা ‘দা। মাসুদ খানও সেইভাবে মাসুদ ভাই। চক্ষুলজ্জার খাতিরে আর-কি! তা নইলে তিনি ওই প্রথম কবিতায় যা করেছেন, তাতে তাঁরে বাঁচানো খুব মুশকিল হতো। পরের কবিতাগুলোর কথায় পরে আসি। আগে বলে নিই মাসুদ খানের ওই কবিতা কিভাবে পড়েছি। কী আমারে হতভম্ব করছে!


বাংলাভূভাগের এমন ইন্দ্রিয়ঘন বর্ণনা, প্রকৃতি ও রোদের শ্যাম্পেন পানের ‘চিয়ার্স-ধ্বনি’ বহুকাল কবিতায় শুনি না।


প্রথমত, এই কবিতায় একটা দ্বীপদেশ আছে। দেশটা কোন দেশ তার উল্লেখ নাই। সেটা স্বপ্ন-কল্পনার হতে পারে। আবার না-ও হতে পারে। কবিতার মধ্যে সাক্ষ্য পাওয়া যাচ্ছে, অন্তত কবিতাটা যার মুখে বর্ণিত হচ্ছে তিনি এখনো সেই দেশে পৌঁছাতে পারেন নি। তার কাছে এটা স্বপ্নেরই বটে। তাঁর বক্তব্য এমন, ‘বহু প্রত্যাশার, বহু সাধ-সাধনার যোগ্য/স্বপ্নভূভাগ কি এরকমই দূর ও দুর্গম, যোগাযোগাতীত?’ হতে পারে বর্ণনাকারী ওই নাবিকের কাছে বর্ণিত দ্বীপদেশটি স্বপ্নের। কিন্তু ওই দ্বীপদেশকে বাংলাদেশ বলে দারুণভাবে পড়া যায়। বাংলাদেশের কুটির, বনবিড়াল, ঝোপঝাড়, রাধিকাপুরের ঝিয়ারি, মাটি, প্রাণী ও পতঙ্গদের উচ্ছ্বাস সবই আছে কবিতায়। আছে মাটি আর মানুষের সরাসরি যোগাযোগের কথা। বাংলাভূভাগের এমন ইন্দ্রিয়ঘন বর্ণনা, প্রকৃতি ও রোদের শ্যাম্পেন পানের ‘চিয়ার্স-ধ্বনি’ বহুকাল কবিতায় শুনি না। আশির দশকের পরে বাংলাদেশের কবিতা সেই যে, এইসব নিষ্পাপ আর নিঃশর্ত দেশালপনা থেকে পাশ ফিরে শুয়েছে, দুএকটি ব্যতিক্রম ছাড়া, সে তো আর ফিরে আসে নি। একটু চেখে নেয়া যাক মাসুদ খানের বর্ণনায়:

নাবিক, অবাক সেই ভূভাগের কথা বলো
যেখানকার মাটি উষ্ণ, অপত্যবৎসল,
যেখানে মানুষ সোজা মাটিতে শুয়ে প’ড়ে
শুষে নেয় অষ্টাঙ্গে ভূতাপশক্তি সঞ্জীবন…
দেহ ও মাটিতে যোগাযোগ হয় সরাসরি,
সোজা ও সহজ।

এই বর্ণনা বাংলাদেশের বর্ণনা ছাড়া আর কিভাবে পড়ব! বাংলাদেশ ঘুরতে গেলে একথা যেকারো মনে হবে, মাটির সান্নিধ্যই এদেশের মানুষকে বাঁচিয়ে রেখেছে। নইলে এখনো যেদেশে মানুষ যেখানে-সেখানে মল ত্যাগ করে, সেদেশের মানুষ এত শ্রম-ঘামের পর, এত পুষ্টির অভাবের পর, কিভাবে টিকে আছে! মাটির গন্ধ আর মাখামাখিই এদের বাঁচিয়ে দিয়েছে। মাটির পাশাপাশি এখানকার মানুষদের জীবনের সাথে যুক্ত হয়েছে ‘জলবায়বীয় পরিস্থিতি’, ‘প্রাণী ও পতঙ্গদের উল্লোল উচ্ছ্বাস’ ‘আর গাছেদের স্বতস্ফূর্তি’। কবিতা পাঠান্তে মনে হলো বাংলাদেশ বুঝি স্বপ্নে কথা কয়ে উঠেছে মাসুদ খানের এই কবিতায়। এই কবিতায় বর্ণিত ভূভাগকে বাংলাদেশ বলে পড়তে গিয়ে মনে পড়ল জীবনানন্দ দাশের বনলতা সেন কাব্যের ‘নগ্ন নির্জন হাত’ কবিতার কথা। কবিতাটি কোনো দেশের কল্পিত বর্ণনা নয়। কিন্তু কবিতাটি যে নিরেট কল্পনা তাতে সন্দেহ নাই। কবিতায় কল্পিত একটি নগরীর এক প্রাসাদের বর্ণনা দেয়া হয়েছে। সেই প্রাসাদে কবি কী কী রেখেছেন দেখা যাক, ‘মূল্যবান আসবাবে ভরা এক প্রাসাদ/পারস্য গালিচা, কাশ্মীরি শাল, বেরিন তরঙ্গের নিটোল মুক্তা প্রবাল,/…অজস্র হরিণ ও সিংহের ছালের ধূসর পাণ্ডুলিপি,/রামধনু রঙের কাচের জানালা…’। একে কি কেউ বাংলার কোনো মানুষের ঘর বলে পাঠ করবে! মাসুদ খান আর জীবনানন্দ দাশ দুজনের কবিতাদুটোরই একদিক থেকে মিল আছে। দুটো কবিতাই মূলত কল্পনা। কিন্তু আপনি আপনার কল্পনার মধ্যে কোন কোন অনুষঙ্গকে রাখছেন, আর কোন কোন অনুষঙ্গকে রাখছেন না, তা দিয়ে আপনার মনোজগতের গভীর প্রদেশের খবর কিন্তু সহজেই আঁচ করা যায়। জীবনানন্দের কল্পনায় চমৎকৃতি জাগলেও তা আপন আপন লাগে না। মনে হয় দারুণ, কিন্তু এটা কোনো বড়লোকের ব্যাপার-স্যাপার। লোকটা হয়তো বিলেতটিলেত থাকে। কিন্তু মাসুদ খানের এই কবিতার কল্পনার অনুষঙ্গের মূলে আছে জল-জংলা-বিল-ঝিল আর কালো মানুষের বাংলাদেশ, যাকে আমরা এক সময় আদর করে বলতাম পূর্ব বাংলা।

শুধু বাংলাদেশ বলে নয়, ‘স্বপ্নভূভাগ’ কবিতার উপস্থাপন একেবারে ভিন্ন। বহুকাল এই ধরনের উপস্থাপনের টেকনিক কবিতায় সচরাচর দেখি না। বাপ-দাদার আমলের গল্প বলার ঢঙের মতো। বাংলার লোকনাটকের মধ্যে এই ঢংটা প্রায়শ লক্ষ করা যায়। যেখানে রাজাগোছের কেউ একজন কোনো পারিষদের কাছে জানতে চান, ‘বলো ওহে অমাত্য! কী কী দেখলে?’ মাসুদ খান যেমন বলেছেন, ‘এবার বলো হে ফিরতি পথের নাবিক,/ওহে মাথা-মুড়ে-ফেলা ভিনদেশি কাপ্তান,/সেই দ্বীপদেশের খবর বলো…। উপস্থাপনের এই ধরনের কথা যখন বলছি, তখন খুব করে মনে পড়ছে জসীমউদ্‌দীনের মধুমালা নাটকের কথা। জিজ্ঞাসার এই ঢঙের মধ্যে একটা ক্লাসিক ক্লাসিক ভাব আছে, আবার যথেষ্ট টেকনিক্যালও বটে। টেকনিকের দিক থেকে মনে আসছে কালিদাসের মেঘদূত কাব্যের কথাও। কালিদাস তাঁর মেঘদূত কাব্যে যক্ষের বরাতে মেঘকে দূত করে পাঠিয়েছিলেন তার প্রিয়ার কাছে। মেঘকে যক্ষ বলেছিলেন, মেঘ যেন তাঁর প্রিয়াকে উজ্জয়িনীপুরে গিয়ে তার বিরহের কথা জানায়। পুরো কাব্যে আমরা কোথাও দেখি নি যে, মেঘ যক্ষপ্রিয়ার কাছে গিয়েছে এবং তার বিরহের কথা জানিয়েছে। যক্ষ মেঘকে একটা গাইড-লাইন দিয়েছে। মেঘ যে-পথ পাড়ি দেবে সেই পথ কেমন, সে-পথের কোথায় কী থাকবে, এইসবের একটা গাইড-লাইন আর-কি। কিন্তু এর মধ্য দিয়ে যক্ষের বিরহকথা আর প্রকৃতির বর্ণনা কালিদাস বলে ফেলেছেন। ‘স্বপ্নভূভাগ’ কবিতায়ও মাসুদ খান ফিরতিপথের নাবিকদের কোনো কথা বলতে না দিয়ে, নিজেই ‘স্বপ্নভূভাগ’-এর বর্ণনা হাজির করেছেন। সরাসরি ক্লান্তিকর বর্ণনা না দিয়ে নাটকীয়তা তৈরির ভেতর দিয়ে কবি তাঁর কহতব্যকে বেশ আয়েশ করে বলেছেন। টেকনিকটা পুরোনো পুরোনো ঠেকে। কিন্তু ‘স্বপ্নভূভাগ’-এর ভাষাভঙ্গি, ওজস্বী বর্ণনা, আর অলক্ষ্য অথচ গভীর স্বদেশানুরাগের সঙ্গে তা এত বেশি মিলমিশ খেয়ে গেছে যে, তাকে ক্লাসিক বলে মনে হয়। মাসুদ খানের কবিতার এই এক বৈশিষ্ট্য যে, তিনি চলতি সময়ের কবিতাটেকনিকের ট্রেন্ডের খুব একটা ধার ধারেন না। তাঁর নিজের একটা চলন-বলন আছে। সেই নিজস্ব ঢঙে চলতে-বলতেই তিনি বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। এ কারণেই মাসুদ খান আশি বা নব্বই দশক বা তাঁর পূর্বজ কবিদের থেকে আলাদা হয়েছেন। মাসুদ খানকে এ কারণেই আলাদা করে চেনা যায়। তাঁর কবিতা পড়তে গেলে তাঁর নাম ছাড়াও পড়া যায় এবং কবিতা পড়ে সিদ্ধান্ত নেয়া যায় যে, এটা মাসুদ খানের কবিতা। আমি তাঁর পাখিতীর্থদিনে, নদীকূলে করি বাস আর সরাইখানা ও হারানো মানুষ কাব্যগুলো পাঠের স্মৃতিকে মাথায় নিয়েই একথা বলছি। তাঁর কবিতার মুদ্রার মতো চকচকে আর ঝংকৃত শব্দচয়ন, ইন্দ্রিয়সঘনতা, অন্তর্গত অনায়াস অনুপ্রাসের সাংগীতিক মূর্ছনার কথা না হয় না-ই বললাম।


প্রাণ আর প্রকৃতির এই যৌথ উদ্‌যাপনের শৈল্পিক উপস্থাপন মাসুদ খানের জাত চেনার জন্য যথেষ্ট বলে মনে হয়।


‘স্বপ্নভূভাগ’ থেকে এগোলাম দ্বিতীয় কবিতা ‘প্রলাপবচন’-এর দিকে। দ্বিতীয় কবিতায় ঢুকে দেখলাম সেখানেও এক স্বপ্নের কথা, যা প্রলাপ বলে কবি চালান করতে চেয়েছেন। তা না হয় বুঝলাম। কিন্তু নড়ে চড়ে বসলাম যখন কবিতাটা শুরু হলো এভাবে—

নদ এসে উপগত হবে ফের নদীর ওপর
দুই পারে জমে উঠবে কপট কাদার ঘুটঘুটে কেলেংকারি
মাঝখানে চোরাঘূর্ণি চোরাস্রোত
এলামেলো এলোমেলো বাউরি ভাবনা এসে
পাক খেয়ে ঢুকে পড়বে বৃষ থেকে মিথুনের অধিক্ষেত্রে…

মাকাল ফলের মৃদু মনস্তাপ
করলা-লতার শ্যামলা আক্ষেপ
কোকিলস্য প্রবঞ্চনা, কাকের বাসায় উপঢৌকন
ভরা বিলের ওপর দিয়ে ভেসে আসা ভেজা-ভেজা সুর
হুদহুদ পাখির অস্থিরতা…

এখানে বা এই কবিতায় কবি কী বলতে চেয়েছেন তা আমার কাছে গৌণ হয়ে গেল। অবাক বিস্ময়ে ভাবলাম, একজন মানুষের করোটি আর বুকের আনাচে-কানাচে, চিপা-চাপায়, কলিজার রন্ধ্রে রন্ধ্রে তাঁর স্বদেশ কী পরিমাণ গভীরতায় বাসা বাঁধলে এইভাবে একটা বর্ণনা হাজির করতে পারেন। ‘নদ’, ‘নদী’, ‘চোরাঘূর্ণি’, ‘করলা-লতার শ্যামলা আক্ষেপ’, ‘ভরা বিলের ওপর দিয়ে ভেসে আসা ভেজা-ভেজা সুর’, ‘হুদহুদ পাখি’ এগুলো কী! কিসের জন্যে এসব আয়োজন! কবির লক্ষ্য কী! হঠাৎ মনে হলো লক্ষ্যের (পড়ুন কবির বক্তব্য) খ্যাতা পুড়াই। উপলক্ষই এই কবিতার লক্ষ্য। আমার মনে হলো আমি ভাটিয়ালির সুর শুনছি। কবির স্বদেশের অদৃশ্য মর্মসুর মর্মরিত হয়ে উঠেছে কবিতা লাইন আর শব্দগুলোর ফাঁকে ফাঁকে, ঝরনার পানি যেমন পাথরের ফাঁকাফুকা দিয়ে আওয়াজ করতে করতে বয়ে যায়। আমি একটা শুভ-আতঙ্কে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ি। ভাবতে থাকি মাসুদ খান কি বাংলার প্রাণের শ্যাম্পেন পান করিয়ে তাঁর পাঠককে মাতাল করতে চান এই কাব্যে! মাথার মধ্যে তড়াক করে উঠল কাব্যগ্রন্থের নাম ‌’প্রসন্ন দ্বীপদেশ’। তবে কি এই দ্বীপদেশ পৃথিবীর বৃহত্তম ব-দ্বীপ বাংলাদেশ! বাংলাদেশ নিয়েই কি তিনি পুরো কাব্য ফেঁদেছেন! লোভাতুর হয়ে কাব্যের তৃতীয় কবিতা ‘মৌসুম’-এর দিকে এগোলাম। দেখলাম সেখানে উৎসব বসেছে ‘গাছগাছালি’, ‘আলাভোলা আশশেওড়ার ঝাড়’, ‘মাটি-ঝোঁকা রাংচিতা-ঝোপ’, ‘ঘোড়েল’, ‘ফোকলা দাঁতের খিলখিল হাসির হিল্লোলসহ কাঠবিড়ালির শিশুকন্যা’, ‘উড়ুক্কু শিয়াল’, ‘বহুরূপী গিরগিটি’, ‘বন্য বেল্লিক ছাগল’ আর ‘গাছগাছালি’দের। প্রাণ-প্রকৃতি আর জীববৈচিত্র্যের এ-এক ভিন্ন জগৎ। আর পরের ‘হর্ষতরঙ্গ’ কবিতায় গিয়ে মনে হলো এ-তো কবিতা নয়, রীতিমতো চিড়িয়াখানা। না, চিড়িয়াখানা নয়। কারণ, চিড়িয়াখানা তো বানানো। বিচিত্র চিড়িয়া ধরে এনে বানানো খানাই তো চিড়িয়াখানা। ‘হর্ষতরঙ্গ’ কবিতায় দেখলাম রীতিমতো এক অভয়ারণ্য। দেখা যাক কী কাণ্ড বাঁধিয়েছেন মাসুদ খান সেই অভয়ারণ্যে—

সরো সরো, ঈশান থেকে তিরের বেগে ওই নেমে পড়ছে হংসবাহিনী—উঠানে, অঙ্গনে, ধানক্ষেতে, নয়ানজুলিতে। আর নৈর্ঋত থেকে ছুটে আসছে দস্যি বাচ্চারা। এসেই দুই ডানা পাকড়ে ধরে উঠে পড়ছে রাজহাঁসের পিঠে। তা-ই দেখে ঘাস থেকে মুখ তুলে মুচকি হাসছে খরগোশ, প্রশাখাজালের আড়াল থেকে কাঠবিড়ালি।
এক হোঁদলকুতকুতে, দুষ্টের চূড়ামণি, এমনিতেই লেট লতিফ, তদুপরি পিছিয়ে পড়ছে বারবার, কুকুরছানার কান মলে দিয়ে, পোষা শজারুর শলাকা ধরে টান মেরে, খুচরা নোটাংকি সেরে, দুই কাঁধে দুই অস্থির গুঞ্জরণরত বাচ্চা বসন্তবাইরিকে বসিয়ে নিয়ে এগিয়ে আসছে শেষ হংসবাহনের দিকে। হাঁসটি তখনো নয়ানজুলির জলীয় রানওয়েতে। উড়ালে উন্মুখ। বাচ্চাটি আছাড়ি-পিছাড়ি খেয়ে জলকাদা মাড়িয়ে কোনোমতে হাঁকুচ-পাঁকুচ করে উঠে পড়ছে সর্বশেষ হংস-ফ্লাইটে। পেছন পেছন আলপথে হেলেদুলে আসছে কান-মলা-খাওয়া নাদুসনুদুস কুকুরছানাটিও।

প্রাণিজগতের এই হুলুস্থুল যে-প্রকৃতির মধ্যে মাসুদ বাঁধালেন, পাঠকদের অনুরোধ করব, দেখেন তো এই পরিবেশের সাথে বাংলার মিথিক্যাল বা সাবেক অথবা বর্তমান প্রকৃতির কোনো মিল পাওয়া যায় কিনা—

তুলাপ্রসূ সব শিমুলের গাছ, ফলপ্রসূ সব আম ও আমড়া বাগান। তাদের ওপর দিয়ে উড়ে চলেছে হংসবাহিনী। এক-একটি হাঁসের পিঠে এক-একটি শিশু। উড়ে যেতে যেতে উৎফুল্ল বাচ্চারা ভূমণ্ডলের দিকে উড়ন্ত চুমু ছুড়ে দেবার মুদ্রায় ফুঁ দিচ্ছে হাতের তালুতে। একবার ডান হাত, আরেকবার বাম। দুই দিকে জেগে উঠছে ছোট-ছোট হাওয়াহিল্লোল।
আর সেই হিল্লোলের হালকা ধাক্কাতেই সঙ্গে-সঙ্গে নিচে আগুন ধরে যাচ্ছে হুলুস্থুল কৃষ্ণ ও রাধাচূড়ায়, আর আমের পাতারা খিলখিল আহ্লাদে ঢলে পড়ছে প্রতিবেশী আমড়ার পাতাপল্লবের ওপর।

প্রাণ আর প্রকৃতির এই যৌথ উদ্‌যাপনের শৈল্পিক উপস্থাপন মাসুদ খানের জাত চেনার জন্য যথেষ্ট বলে মনে হয়। দুই অর্থেই জাত চেনার জন্য এই কবিতা পাঠ করা যেতে পারে। প্রথমত, মাসুদ খান বড় জাতের কবি। দ্বিতীয়ত, তিনি বাঙালিজাতের কবি। বাংলার প্রাণ-প্রকৃতি মাসুদ খানের রক্তের সাথে কত গভীরভাবে মিশে আছে সে-পরিচয় মাসুদ খানের পাঠক মাত্রেই বোধ করি জানেন। তাঁর কবিতায় দর্শন থাকে, তত্ত্ব থাকে, অধিবাস্তবতা থাকে। কিন্তু আমি দেখি তাঁর কবিতায় কী গভীরভাবে বাংলাদেশ থাকে! বাংলাদেশের প্রাণ-প্রকৃতির ব্যাকরণ থাকে; প্রাণ-ভোমরা থাকে। বাংলার এই প্রাণ-প্রকৃতি আমরা একটু ভিন্নভাবে ভিন্ন প্রকরণে দেখেছি জীবনানন্দের মধ্যে। আবার দেখলাম মাসুদ খানের মধ্যে। বাংলার প্রাণ-প্রকৃতিই মাসুদ খানের কবিসত্তা নির্মাণ করেছে বলে তিনি সম্প্রতি ‘প্রথম আলো’ পত্রিকায় আলতাফ শাহনেওয়াজকে জানিয়েছেন। একথা বোধ করি সত্য। দেখা যাক সাক্ষাৎকারে কী বলেছেন মাসুদ খান—

হ্যাঁ আমার শৈশবও কেটেছে বগুড়া ও জয়পুরহাটের নানা জায়গায়, পিতার কর্মস্থলে। বরেন্দ্র অঞ্চল। শুকনো মৌসুমে সেখানকার কর্কশ লাল মাটি ফেটে চৌচির হয়ে যায়। ধূলি ওড়ে খরখরে হাওয়ায়। আবার বৃষ্টি হলেই একেবারে কোমল কাদা। আবার আমার কৈশোর ও যৌবনের প্রথমাংশ কেটেছে নরম পলিমাটি-গড়া যমুনা-ধোয়া অববাহিকায়। সিরাজগঞ্জ অঞ্চলে, মেছড়া গ্রামে, পৈতৃক ভিটেমাটিতে। প্রচুর আলো ও ছায়া, অক্সিজেন, গাছপালা, পশুপাখি, প্রাণবৈচিত্র্য আর প্রাণচাঞ্চল্যমুখর এক জনপদ। নদী সেখানে ভাঙে, আবার গড়ে। তালে তালে তাই মানুষকেও ভাঙতে হয় অনেক কিছু, গড়ে তুলতে হয় পুনর্বার। প্রকৃতি ও জীবনসংগ্রামের এই সব কড়ি-কোমলের টানাপোড়েন ও মিথস্ক্রিয়া, রৌদ্র-রুদ্র-মেঘ-বৃষ্টি-খর্খরতা-নম্রতার এই সব দোলাচল ও মেলামেশা—এগুলোই হয়তো ছাপ ফেলে আসছিল ক্রমাগত আমার চেতনায়-অবচেতনায়। এভাবেই হয়তো ভেতরে-ভেতরে তৈরি হয়ে উঠছিল একধরনের কাব্যিক বোধ। যদিও পারিবরিক পরিবেশ ছিল পূর্বাপর অকাব্যিক।

এই কথাগুলোকে মাথায় রেখে প্রসন্ন দ্বীপদেশ পড়লে দুটি বিষয় বোঝা যায়। একটি বাংলাদেশের ভূগোল। অন্যটি আশির কবিতার স্বভাবের মধ্য থেকে মাসুদ খানের স্বকীয় রাস্তায় বের হয়ে আসার ইতিবৃত্ত। আশির দশকে কবিতাকে শ্লোগান আর বিবরণের একঘেয়েমি থেকে বের করে আনার সাধ্যসাধনা করেছেন এক ঝাঁক নতুন কবি, একথা আমরা জানি। কিন্তু একথাও আমরা জানি যে, কবিতাকে তাঁরা দেশ ও দশ থেকে মুক্ত করে আগের চেয়ে বেশি করে প্রাইভেট প্রপার্টিতে পরিণত করেছেন। সাধারণের প্রবেশাধিকারকে সংরক্ষিত করে দিয়েছেন। কবিতাকে আরো বেশি করে কবিদের মধ্যে আটকে ফেলেছেন। অথবা কবিতা পড়ার দীর্ঘ ট্রেনিং নাই এমন মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছেন। মাসুদ খান প্রসন্ন দ্বীপদেশ কাব্যে কবিতাকে যে মানুষের মধ্যে ফিরিয়ে এনেছেন তা নয়। কিন্তু বেশ কিছু কবিতায় তিনি কবিতাকে দেশের ভূগোলের মধ্যে এনেছেন। এখানেই এই কাব্যের বিশেষত্ব বলে মনে করি। শুধু ভূগোল নয়, কবিতায় কথকতার ভঙ্গির মাধ্যমে কবিতাকে পাঠের আরামের আওতায় নিয়ে আসার একটা প্রয়াস-স্বাতন্ত্র্য বরাবরই মাসুদ খানের মধ্যে দেখা যায়। প্রসন্ন দ্বীপদেশ কাব্যের বেশ কিছু কবিতায় এই চেষ্টা যে-কারো চোখে পড়বে। আগেই বলেছি, তার মানে আমার বলার চেষ্টা এই না যে, মাসুদ খান কবিতাকে মানুষের মধ্যে নামিয়ে এনেছেন। কবিতার সে কপাল স্বভাবতই অনেক আগেই পুড়েছে। সে ভিন্ন আলাপ।


মাসুদ খান তাঁর এই বইয়ে যখন বিশ্ব-অভিযাত্রায় বেরিয়েছেন, তখন প্রায়শই দর্শন বা ভাববস্তু কবিতার চেয়ে মুখ্য হয়ে উঠেছে।


তো, আমরা যে আলাপ করছিলাম। প্রসন্ন দ্বীপদেশ কাব্যের পঞ্চম কবিতা ‘হর্ষতরঙ্গ’ পড়ে তব্দা হয়ে গেলাম। তব্দা খাইলাম কবির কল্পনা, বুনন, ভাষা, শব্দসজ্জার মধ্যকার টুংটাং আওয়াজ আর ওই যে দ্বীদেশের স্বরূপের আবিষ্কার দেখে। কবি কী বলতে চাইলেন তা খোঁজার প্রয়োজন বোধ করলাম না। সাথে সাথে পুরো বই জুড়ে মাসুদ খানের চোখে দ্বীপদেশ দেখার জন্য নড়েচড়ে বসলাম। ভাবলাম পুরো কাব্য জুড়ে মাসুদ খান দ্বীপদেশের প্রজেক্ট নিয়ে হাজির হবেন বোধ হয়। মজা লুটার জন্য সন্তর্পণে পাতা উল্টালাম। পড়লাম পরের কবিতা ‘চারুশিল্প’। মারাত্মক ধাক্কা খেলাম! দেখি খানের মেজাজ বিগড়ে যাচ্ছে। তিনি দ্বীপদেশ থেকে অভিযাত্রা শুরু করেছেন বিশ্বের দিকে, এমনকি মাঝে মধ্যে অধিবিশ্বের দিকে। পৃথিবী নিয়ে তাঁকে ক্রমাগত খুব বিচলিত আর বিষণ্ন মনে হতে লাগল। সভ্যতা, বিশ্ব অর্থনীতি, সমাজনীতি নিয়ে তিনি ক্রমাগত ভেবেছেন আর বিপন্ন বোধ করেছেন। বিপন্ন হয়ে কাতরিয়ে উচ্চারণ করে উঠেছেন—‘দেশে দেশে রাজদণ্ড আজও রতিবাহিত ব্যাধির মতো চণ্ড।/স্নিগ্ধ বাতাসের দেশে, কূটবেশে, গুপ্ত উচ্চাকাঙ্ক্ষারূপে/সুপ্ত থাকে ঘূর্ণ্যমান হিংস্র হ্যারিকেনে-মত্ত ও মাংসাশী।’ মাসুদ লক্ষ করেছেন বাণিজ্যনির্ভর বিশ্বব্যবস্থার সূত্র—‘যদি বাড়ে জন্মহার,/বাণিজ্য বাড়বে তবে শিশুখাদ্য ও ডায়াপারের/আর মৃত্যু বাড়লে চিরবিদায় স্টোরের। জন্ম মৃত্যু যেটাই বাড়ুক/বাণিজ্য বাড়বেই।’ এইসব ভাবনা যখন এখানে সেখানে নানা কবিতায় ইতিউতি উঁকিঝুঁকি দিচ্ছিল তখন হঠাৎ ‘জ্ঞাতি’ নামের কবিতা পড়ে বুঝলাম প্রসন্ন দ্বীপদেশ কাব্যের বারো আনা জায়গা জুড়ে কবির কিসের এত হাহাকার উৎকণ্ঠা আর চাপা ক্ষোভ। বুঝলাম মাসুদ খানের হৃদয় ব-দ্বীপ থেকে উদ্বাহু হয়েছে বিশ্বের দিকে। বিশ্বের মঙ্গলামঙ্গল কবিকে ভাবনা-ব্যাকুলতার মধ্যে ফেলেছে। কবির বিশ্বাত্মবোধ প্রকাশিত হয়েছে এভাবে—

অগণন অচেনা মানুষ
পৃথিবীর নানা প্রান্তে, দ্বীপে, দ্রাঘিমায়…
তুমি বংশলতা ধরে ধরে চলে যাচ্ছ ধীরে ধীরে
সময়ের উজানে। এবং দেখে আসছ—
দুনিয়ার প্রত্যেকটি মানুষই তোমার
ভাই কিংবা আত্মীয় পরম।
এমনকি প্রতিটি উদ্ভিদ, জীব, অণুজীব…
সবই বাঁধা দূরসম্পর্কের জ্ঞাতিত্বে তোমার।
এই বোধই কবিকে তাড়িত করেছে ব-দ্বীপ থেকে বিশ্বে।

কিন্তু একটা কথা বলতেই হবে, মাসুদ খান তাঁর এই বইয়ে যখন বিশ্ব-অভিযাত্রায় বেরিয়েছেন, তখন প্রায়শই দর্শন বা ভাববস্তু কবিতার চেয়ে মুখ্য হয়ে উঠেছে। কবি মাসুদ খান স্থানে স্থানে যেন ধোঁয়াশা হয়ে উঠেছেন। কবিতা ঠিক যেন দানাদার হয়ে ওঠে নি। কোনো কোনো কবিতায় মাসুদ খানকে অপ্রস্তুত মনে হয়েছে। মনে হয়েছে বিশ্বকে আলিঙ্গন করার মতো একটা বিরাট হৃদয় নিয়ে তিনি দুই হাত ছড়িয়ে দিয়েছেন। কিন্তু হাতের মাপ ছোট হওয়ায় সে আলিঙ্গন অসম্পূর্ণ রয়ে গিয়েছে। বিড়াল সম্পর্কে একটা কথা চালু আছে। বিড়াল গৃহস্থের ঘরের কোথাও ঘুমানোর আগে চারদিক ভালো করে দেখে নেয় বিপদের সময় কোথায় লাফ দেবে, কিভাবে ঠিক ঠিক পার হয়ে যাবে। আক্রান্ত হলে বিড়াল অধিকাংশ ক্ষেত্রে ঠিকই লাফিয়ে নিরাপদে বের হয়ে যায়। বিড়ালের লাফ সাধারণত মিস হয় খুব কম। লেখকের বক্তব্য আর শিল্পিতার ব্যাপারটা কিন্তু বিড়ালের লাফিয়ে নিরাপদে পার হয়ে যাবার মতো। কথার মাপে তিনি বানিয়ে তোলেন তাঁর শিল্পের খাপ। কিন্তু কথা যখন বড় হয়ে যায় কিন্তু খাপটা ছোট থাকে তখন পাঠক হোঁচট খায়। প্রসন্ন দ্বীপদেশ কাব্যগন্থের কিছু কবিতায় এই বিষয়টি লক্ষ করা যায়। বিশেষত, কবি যেখানে বিশ্বভাবনায় উদ্বেল সেখানে। কিন্তু এই ঘরানার কয়েকটি কবিতা আবার দারুণ খাপে খাপে মিলে গিয়ে পাঠককে স্তব্ধ করে দেয়। এরকম একটি কবিতা ‘রসমঞ্জরি’। এই কাব্যের একাধিক কবিতায় মাসুদ খানকে দেখা গিয়েছে যুদ্ধবিরোধী চেতনায়। বিশ্বব্যাপী যুদ্ধোন্মাদনা কবিকে যথেষ্ট উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। কারণ, যুদ্ধের সাথে মানুষের ভাগ্য অনিবার্যভাবে জড়িয়ে যায়। যুদ্ধের ধ্বংসের নির্মম সত্যকে মাসুদ খান এমন আশ্চর্য সংযমশিল্পিতায়, নিরাসক্তিতে তুলে ধরেছেন যে, কবিতাটি পাঠ শেষে রক্ত হিম হয়ে আসে। লোভ সামলাতে না পেরে পুরো কবিতাটি তুলে দিতে চাই—

শান্ত সমুদ্রে ভেসে চলেছে একা এক রণতরি।
দূর থেকে মনে হচ্ছে যেন
অনন্ত ময়রার গোল গামলাভরা রসের ওপর ভাসছে
এক আয়তাকার রাঘব রসমঞ্জরি—
উপরিভাগে একটি একটি করে বসানো সব বুন্দিয়া
আর কুড়মুড়ে পেস্তা বাদাম।

মিঠাইয়ের দিকে চঞ্চু ব্যাদান করে তেষট্টি ডিগ্রি কোণে
তেড়ে নেমে আসছে এক মহাকায় খেচর।

ওই হা-করা ধেয়ে-আসা চঞ্চু তাক করে ছুটল মিসাইল মুহুর্মুহু।

অবিশ্বাস্য বেগে ছুটে-আসা সেইসব জ্যান্ত মিসাইল,
পেছনে লাঞ্চার, তারও পেছনে ডেকের ওপর
পেস্তা বাদাম বুন্দিয়ার মতো ছড়ানো-ছিটানো সব কামান ও জঙ্গি বিমান
আর জলযোদ্ধাদের কৃত্য ও কম্যান্ড
আর এই সবকিছু ধারণ করে আছে যে বহুতল রণতরি…
সুড়ুত করে সমস্তটাই টেনে নিল পাখি এক টানে, দ্রুত চঞ্চুক্ষেপে।

পাখির ঠোঁট আর কশ বেয়ে তখনো ঝরছে রসমঞ্জরির রস।

‘পাখির ঠোঁট আর কশ বেয়ে তখনো ঝরছে রসমঞ্জরির রস’—আশ্চর্য নরম সুরে একটা নির্মম ধ্বংসচিত্রকে প্রকাশের এই ধরনের মুন্সিয়ানার মুখোমুখি হলেই বোধ করি পাঠক তব্দা খায়! শিল্প আর ভাবের মনিকাঞ্চনযোগের কবিতা এই কাব্যে আরো আছে। যেমন, ‘সাক্ষাৎ’ এবং ‘উচ্চতর বাস্তবতা’। চেখে নেয়া যাক ‘সাক্ষাৎ’ কবিতার একটি স্তবক—

কতদিন হলো তুমি নেই এই দেশে।
উঠানে বরইয়ের গাছে চুপচাপ
ঘনিয়ে-জড়িয়ে-থাকা স্বর্ণলতাগুলি
এতদিনে বদলে গেছে জং-ধরা তামার তন্তুতে।
মৌমাছিরা সেই কবে উড়ে গেছে দূরের পাহাড়ে
ফাঁকা-ফাঁকা স্মৃতিকোষ হয়ে ঝুলে আছে
এখনো মৌচাক, কৃষ্ণচূড়া গাছে।
গুঞ্জনের রেশ, মধু ও মোমের অবশেষ, কিচ্ছু নেই
কোনোখানে।

ফিরে আসি আগের প্রসঙ্গে। প্রসন্ন দ্বীপদেশ-এর কবিতাগুলো পড়া শেষ করলাম। কিন্তু বাংলাদেশের ভূগোলের প্রাণ-প্রকৃতি, মানুষ যেসব কবিতার লক্ষ্য-উপলক্ষ, সেসব কবিতার প্রতি মোহ আমার রয়েই গেল। একটা অতৃপ্তি যেন তাড়া করে ফিরতে লাগল। কারণ, ‘সোনার স্বপ্নের সাধ পৃথিবীতে কবে আর ঝরে!’

Kudrat E-Hud

কুদরত-ই-হুদা

জন্ম ২৫ জানুয়ারি ১৯৭৮, ফরিদপুৱ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করেছেন 'ষাটের দশকে জাতীয়তাবাদী চিন্তার বিকাশ ও বাংলাদেশের কবিতা' বিষয়ে। পেশা : অধ্যাপনা।

প্রকাশিত বই :
প্রবন্ধ—
শওকত ওসমান ও সত্যেন সেনের উপন্যাস : আঙ্গিক বিচাৱ [আদর্শ, ২০১৩]
জসীমউদ্‌দীন [প্রথমা প্রকাশন, ২০১৮]

ই-মেইল : kudratehuda@gmail.com
Kudrat E-Hud