হোম বই নিয়ে ম্যাথিউ আরনল্ডের সাহিত্যতত্ত্ব 

ম্যাথিউ আরনল্ডের সাহিত্যতত্ত্ব 

ম্যাথিউ আরনল্ডের সাহিত্যতত্ত্ব 
752
0
পূর্ণ শতাব্দীকাল পূর্বে, ১৮৮৮ খ্রিষ্টাব্দে, প্রয়াত হন ম্যাথিউ আরনল্ড। ম্যাথিউ আরনল্ড কবি এবং চিন্তাবিদ। যেমন তার কবিতা, তেমনই চিন্তাস্রোত এখনও অধীত হয়—কখনও অনুরাগে, কখনও প্রতিরাগে—কিন্তু কখনই বৈরাগ্যে নয়৷ উপেক্ষিত হয়ে পড়েন নি তিনি সর্বতোভাবে এখনও।

সাহিত্য সমালােচনার ক্ষেত্রে তার যে অবদান, তা নিয়ে প্রভূত পরিমাণে আলােচনা হয়েছে, ভবিষ্যতেও হবে, এমন হওয়াই স্বাভাবিক। বর্তমান স্বল্পায়তন রচনার উদ্দেশ্য নয় তার সাহিত্যতত্ত্বের  বিস্তৃত আলােচনা : কেবল তার তত্ত্বের প্রধান বক্তব্যসমূহ সংক্ষেপে ব্যক্ত করা এবং সে-সবের কিছু কিছু সম্পর্কে মন্তব্য করাই এর অভিপ্রায়।

আরনল্ড প্রবন্ধ রচনা করেন যেমন সাহিত্য বিষয়ে, তেমনই তার আলােচনার বিষয়বস্তু হয় সংস্কৃতি-ধর্ম-সভ্যতা । সাহিত্য ও সাহিত্য-সমালােচনা বিষয়ে কতিপয় উল্লেখনীয় রচনা রয়েছে তার; দৃষ্টান্তস্বরূপ : সমালােচনামূলক প্রবন্ধাবলি (১৮৬৫), সাহিত্য ও গোঁড়ামি (১৮৭৩), ঈশ্বর ও বাইবেল (১৮৭৫), মিশ্র প্রবন্ধাবলি (১৮৭১) ইত্যাদি। বর্তমান রচনা নির্মিত হচ্ছে তার বিশ্রুত প্রবন্ধ ‘কাব্যের পাঠ’ (The Study of Poetry)-এর ভিত্তিতে, যেটিতে তার সাহিত্যতত্ত্ব ও সাহিত্য-সমালােচনার মূলসূত্রসমূহ পাওয়া যায়। এবং যদিও আরনল্ডের প্রবল সমালােচনা করেছেন টি এস এলিয়ট, এ-প্রবন্ধকে তিনি ইংরেজি সমালােচনা-সাহিত্যের একটি ধ্রুপদী খণ্ড হিসেবে চিহ্নিত করেন।


আরনল্ড মনে করেন যে কবিতা ছাড়া বিজ্ঞান, দর্শন ও ধর্মের ক্ষেত্র সংকুচিত হয়ে আসে। 


ভিক্টোরীয় ইংল্যান্ডের জলবায়ুতে জন্ম-বিকাশ-মৃত্যু হয় আরনল্ডের; আর ভিক্টোরীয় ইংল্যান্ড ছিল এক বিবর্তমান, অস্থির, সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক-ক্ষেত্রে দ্বন্দ্বময় অঞ্চল। ১৭৭৮ খ্রিষ্টাব্দে সংঘটিত ফরাসি বিপ্লব যে সাম্য-মৈত্রী-ভ্রাতৃত্বের আশ্বাস দিয়েছিল, যে রুশো, ভলতেয়ার প্রমুখ চিন্তাবিদের চিন্তাধারা ইউরােপে উন্মুক্ত করে দিয়েছিল রােমান্টিক পুনরুত্থানের দরজা; ফরাসি বিপ্লবের সে প্রেরণা ও রােমান্টিক শ্ৰেয়ােবোধ ক্রমেই দ্বিধান্বিত-সংশয়িত-অপসৃত হতে থাকে ফরাসি দেশেরই সমরনায়ক নেপােলিয়নের আগ্রাসী যুদ্ধাবলির কারণে। ফরাসি-বিপ্লব যেমন উদারপন্থি ইংরেজ ‘হুইগ’দের অগ্রগামী করেছিল, নেপােলিয়নীয় যুদ্ধাবলি তেমনই রক্ষণশীল ‘টোরি’-দের জন্যে সহায়ক হয়ে উঠেছিল। সামগ্রিকভাবে, সংক্ষেপে, ভিক্টোরীয় যুগে বিজ্ঞান-দর্শন-রাজনীতি-সমাজ-ধর্ম-সংস্কৃতি—সবক্ষেত্রেই ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে, পুরনাে বিশ্বাস-চিন্তা-অনুভবে ধরে ফাটল। এ রকম পরিপ্রেক্ষিতে অবস্থান করেই আরনল্ড রচনা করেন তাঁর কবিতা ও প্রবন্ধ সমবায়।

আলােচ্য প্রবন্ধের প্রথম বাক্যেই দ্বিধাহীন আরনল্ড ঘােষণা করেন যে কবিতার ভবিষ্যৎ বিশাল; এমনকি প্রকারান্তরে তিনি এ কথাই বলেন যে ধর্মের স্থানটিই অধিকার করবে কবিতা; এবং তার মতে, কবিতায় বক্তব্যই—তিনি ‘আইডিয়া’ শব্দটি ব্যবহার করেন—প্রধান, অবশিষ্ট সবকিছুই বিভ্রম মাত্র।

কেন কবিতার ভবিষ্যৎ এত চমৎকার? তিনি যে-পিউরিটান দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ধর্মের সঙ্গে নৈকট্য নির্ণয় করেছেন—বরং যথার্থভাবে বলা উচিত, ধর্মের উপরে কবিতার স্থান দিতে চাইছেন, তা কি সত্যিই গ্রহণীয়? তিনি যে বলছেন কবিতার বক্তব্যই সব, এ কি মান্য? এসব বিষয়ে যথেষ্ট সংখ্যক প্রশ্ন ও সমালােচনা উত্থিত হয়েছে। কবিতা বলতে আরনল্ড ঠিক কী বােঝাচ্ছেন তা স্পষ্ট নয। আরনল্ড, পরে আমরা দেখতে পাব, সাহিত্যের একটি সংজ্ঞার্থ দিয়েছেন, যে-সংজ্ঞাটিও গোলমেলে। তাছাড়া, কবিতায় বক্তব্যটিই প্রধান—আরনল্ডের মৃত্যুর শতাব্দী-উত্তরকালে এ মতের সঙ্গে আমরা ঐক্য স্থাপন করতে পারি না। এলিয়ট লক্ষ করেন যে আরনল্ড কবিতার সাঙ্গীতিক বৈশিষ্ট্যের দিকে মােটেই মনােযােগ দেন নি। তাছাড়া এটাও লক্ষ করা হয়েছে যে তিনি যে ধর্মের স্থান নেবে কবিতা এ-মত প্রচার করেছেন, তা গ্রহণীয় নয়; কারণ, কোনাে কিছুর স্থান অন্য কিছু দিয়ে পূরণ করা সম্ভবপর নয়, অন্য কিছু কেবলই অন্য কিছু। আর, যে-বিভ্রমের কথা তিনি বলেছেন, সে-বিভ্রম বা মায়ার কারণেই কবিতা আদরণীয় অনেকেরই কাছে। অতঃপরও কবিতার ভবিষ্যৎ বিশাল—এ উচ্চারণ, আরনল্ডের অর্থে না নিয়েও, কবি ও কবিতানুরাগীদের জন্যে ইতিবাচক ধারণা সৃষ্টি করে।

আরনল্ড কবিতার উচ্চতর প্রয়ােগ চান। এর আগে ধর্মের কথা বলা হয়েছে। আরনল্ড মনে করেন যে কবিতা ছাড়া বিজ্ঞান, দর্শন ও ধর্মের ক্ষেত্র সংকুচিত হয়ে আসে। অর্থাৎ, কবিতার এসব ক্ষেত্রে প্রয়ােগ আবশ্যিক। এবং তিনি বলেছেন যে আমাদের কবিতার কাছে যেতে হবে সান্ত্বনা খুঁজতে, বেঁচে থাকবার প্রেরণা পেতে, জীবনের ব্যাখ্যা লাভ করতে। এখানেও আরনল্ড কবিতার উপর দায়িত্ব দিতে চান কিছু অতিরিক্ত। সন্দেহ নেই, বিজ্ঞান-দর্শন-ধর্ম এবং যা-কিছু পরিপার্শ্বে-চেতনায়-অবচেতনায় রয়েছে তার সবই কবিতাকে প্রভাবিত করে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে কবিতা জ্ঞান-বিজ্ঞান-নীতি প্রচারের মাধ্যম মাত্র। কোলরিজ একদা বলেছেন যে কবির একই সঙ্গে দার্শনিক হওয়াও প্রয়োজন, কিন্তু এর মানে এই নয় যে কোলরিজের কবিতা আমরা পাঠ করব কান্টের রচনার পরিবর্তে, কিংবা উপনিষদের বক্তব্য জানবার জন্যে পড়ব রবীন্দ্রনাথের কবিতা। এটা সম্ভব যে কোনাে প্রাতিষ্ঠানিক গবেষক তাঁর দুর্দান্ত গবেষণায় দেখিয়ে দেবেন, কোনাে কাব্যে বা কাব্যধারায়, কোনাে দর্শন-মতবাদ-নীতির প্রতিফলন কিভাবে ঘটেছে, কিন্তু সেটাই কবিতার সব নয়, এমনকি গুরুত্বপূর্ণ অংশও নয়; সে কেবলই তার উপাদানসমূহের অংশবিশেষ, অথবা কখনও কখনও, আবহ মাত্র।


আরনল্ডের নির্ধারিত চারজন শ্রেষ্ঠ লেখক হচ্ছেন হােমার, দান্তে, শেক্সপিয়র ও মিল্টন।


উচ্চমান লাভের জন্যে, আরনল্ড বলেন যে, কবিতাকে উচ্চবৈশিষ্ট্যসমূহ অর্জন করতে হবে। তিনি সংজ্ঞার্থ দেন, কবিতা ‘জীবনের সমালােচনা, এবং এ-সমালােচনা কাব্যিক সত্য ও কাব্যিক সৌন্দর্যের নির্ধারিত নীতির সহযােগে সম্পাদিত হয়। কবিতা ‘জীবনের সমালােচনা’—বিপুল বিশ্রুত এ উক্তি যথার্থ নয়। কবিতার ক্ষেত্র এত সীমাবদ্ধ নয়। কিটসের, ধরা যাক, ‘ওড টু অটাম’ কবিতায়, যথাযথভাবে বলতে গেলে, জীবনের সমালােচনা কিছুই নেই; অথচ, এটি কিটসের সুন্দরতম কবিতাগুলাের একটি। তার চেয়ে বড় কথা, যে-কাব্যিক সত্য ও কাব্যিক সৌন্দর্যের নির্ধারিত নীতির কথা তিনি বলছেন তাই বা কী? এরকম ‘নির্ধারণ’ কি আদৌ সম্ভব? আমরা অচিরেই দেখতে পাব, তিনি কোন ধরনের নির্ধারণ করতে সক্ষম হয়েছেন।

সাহিত্য সমালােচনার ক্ষেত্রে আরনল্ড ঐতিহাসিক মূল্যায়ন (যখন অতীতের কবিদের কবিতা পাঠ করা হয়), এবং ব্যক্তিগত মূল্যায়ন (যখন সমকালের কবিরা পঠিত হন) সম্পর্কে সাবধানবাণী উচ্চারণ করেন। তিনি বলতে চান যে প্রাচীন কবিদের কবিতা পাঠের সময়ে যদি আমরা ঐতিহাসিক মূল্যায়ন করতে থাকি, তবে কবির প্রকৃত রূপকে হারিয়ে ফেলি, যেমন হারিয়ে ফেলি, যদি সমকালীন কবির কবিতা পাঠের সময়ে ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ নিয়ে তা পাঠ করি।

সমালােচক জর্জ ওয়াটসন আরনল্ডের ঐতিহাসিক মূল্যায়ন সম্পর্কিত মন্তব্যের জন্যে তাকে ভিক্টোরীয় প্ৰবণতাবিরােধী হিসেবে চিহ্নিত করেন, যেহেতু সে-সময়ে ঐতিহাসিক মূল্যায়ন একটি গৃহীত মতবাদ ছিল। কিন্তু কবিতার পাঠের, এমনকি সমালােচনার ক্ষেত্রে কতখানি নৈর্ব্যক্তিক হওয়া সম্ভব? আমাদের ব্যক্তিগত রুচি বিশ্বাস-অপছন্দ-মানসিক বোধ ইত্যাদি কি আমাদের প্রভাবিত করে না সাহিত্য পাঠের ক্ষেত্রে? প্রসঙ্গটি বিতর্কমূলক এবং পৃথক আলােচনার মুখাপেক্ষী।

সমালােচনা সাহিত্যে একটি মানদণ্ড প্রয়ােগের প্রস্তাব করেন আরনল্ড, তার সাহিত্যতত্ত্বে যা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ। তিনি যে-পদ্ধতির কথা বলেন তার নাম দেন ‘নিকষায়ণ পদ্ধতি’ বা টাচস্টোন মেথড। অতীতকালের শ্রেষ্ঠ লেখকদের—তিনি নির্ধারণ করে দিয়েছেন তাদের—লেখার সঙ্গে তুলনা করে প্রমাণ করতে হবে তুলিত লেখকের শ্রোতা বা নিকৃষ্টতা। আরনল্ডের নির্ধারিত চারজন শ্রেষ্ঠ লেখক হচ্ছেন হােমার, দান্তে, শেক্সপিয়র ও মিল্টন।

সন্দেহ নেই, প্রাগুক্ত সাহিত্যিকেরা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম সাহিত্য-শিল্পীদের অন্তর্গত, কিন্তু ওই নিকষায়ণ পদ্ধতি কি হাস্যকর নয়? যদিও তুলনামূলক সাহিত্যের বিপক্ষে আমরা নই, কিন্তু এই নির্ধারিত কবিদের সঙ্গে তুলনা করে আদৌ কি নির্ধারণ করা সম্ভব অন্য কবিদের সাহিত্যিক মর্যাদা?

আরনল্ড তার প্রবন্ধে চসার, ড্রাইডেন, পােপ প্রমুখের রচনা আলােচনা করেছেন। তার মতে, চসার বড়ো কবি হলেও ধ্রুপদী কবি নন, এর কারণ তার মধ্যে নাকি উচ্চ ভাব নেই। ড্রাইডেন ও পােপকে তিনি ভালাে গদ্য লেখক হিসেবেই স্বীকৃতি দেন, কবি হিসাবে নয়। তাই বােঝাই যাচ্ছে আরনল্ড কবিতার ক্ষেত্রে বিদ্রুপাত্মক দৃষ্টিভঙ্গি পছন্দ করেন না। (হায়, নিজের জীবনের সমালােচনা তত্ত্বের কী দুরবস্থা! উল্লিখিত তিনজন কবির রচনাতেই ‘জীবনের সমালােচনা’ পর্যাপ্ত—বলা উচিত কারও কারও মধ্যে অতি পর্যাপ্ত)।


কবিতা দর্শন ও ধর্মের স্থান নেবে বলে আশা করেছেন আরনল্ড। 


আরনল্ডের প্রবন্ধের শেষ গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য এই যে সত্যিকার ধ্রুপদী কবিতা পাঠের আনন্দ লাভের যােগ্যতা থাকা অতীব গুরুত্বপূর্ণ। আরনল্ডের এ-বক্তব্যের সঙ্গে সহজেই একমত পােষণ করা যায়, যদিও ‘ধ্রুপদী’ সম্পর্কে তার মতামতের সঙ্গে নয়।

আরনল্ডের সাহিত্যতত্ত্বের সঙ্গে তার নিজের কবিতা-চর্চার কোনাে মিল নেই, বিপরীত দৃষ্টান্তে যেমন মিল আছে ওয়ার্ডসওয়ার্থের তত্ত্বের সঙ্গে তাঁর নিজের চর্চিত কাব্যের, কিংবা এলিয়টের তত্ত্বের সঙ্গে তার কবিতার।

কবিতা দর্শন ও ধর্মের স্থান নেবে বলে আশা করেছেন আরনল্ড। ধর্ম সততই ইতিবাচক, সেখানে সংশয় থাকলেও নির্বাণের পথনির্দেশ দেয়া আছে। কিন্তু যেমন কবি আরনল্ডের বিখ্যাত ‘ডােভার সৈকত’ সংশয়-বিশ্বাসভঙ্গ-বেদনা দ্বারা আপ্লুত এবং নিঃসন্দেহে একটি সুন্দর কবিতা, যার সঙ্গে হােমার-দান্তে-শেক্সপিয়ার-মিল্টনের পার্থক্য করা যায় সহজেই। তাই তিনি লেখেন :

হায়, প্রেম, এসাে নিষ্ঠ হই
একে অপরের প্রতি। কারণ পৃথিবী, যাকে মনে হয়
আমাদের সামনে এক স্বপ্নের জগৎ,
এত যা বিচিত্র আর সুন্দর-নতুন,
তার নেই সত্যিকার আনন্দ, অথবা প্রেম, অথবা আলােক,
নেই নিশ্চয়তা, নেই শান্তি, কিংবা সহায়তা, যখন যন্ত্রণা;
এবং আমরা আজ এখানে যেন-বা এক অন্ধকার দেশে,
সংঘাত ও পালাবার জটিল সংকেতে স্বেদময়,
যেখানে নির্বোধ সেনাদল সংঘর্ষে মাতে অন্ধকার রাতে।
১৯৮৮


সাহিত্যের আলাপ
প্রকাশনালয় : বাঙ্গালা গবেষণা

বইমেলায় স্টল : ৩৮১

(752)