হোম বই নিয়ে মোজাফ্‌ফর হোসেনের গল্প : কল্প-বাস্তবের অন্দরে-অন্তরে

মোজাফ্‌ফর হোসেনের গল্প : কল্প-বাস্তবের অন্দরে-অন্তরে

মোজাফ্‌ফর হোসেনের গল্প : কল্প-বাস্তবের অন্দরে-অন্তরে
341
0

পরাধীন দেশের স্বাধীন মানুষেরা গত একুশে বইমেলায় প্রকাশিত মোজাফ্‌ফর হোসেনের গল্প সংকলন। সংকলনটি ভাগ্যবান—পাঠকের হাতে বই আকারে পৌঁছার আগেই এর পাণ্ডুলিপি আবুল হাসান সাহিত্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছিল। এর ফলে বইটির প্রকাশে একটা আগাম বাড়তি মাত্রা নিশ্চয় যোগ হয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে এমন মনে হওয়ারই কথা। মনে হওয়ার কথা এজন্য বললাম, পুরস্কারের ছাপ বইয়ের জন্য অনেক সময় কাজে দেয়, যদিও পুরস্কার দিয়ে সব সময় বইয়ের প্রকৃত মাপজোখ হয় না। কথাটা আমাদের এখানেই শুধু নয়, অন্যান্য জায়গায়ও খাটে। এ কথা বলার পরপরই বলতে বাধ্য হচ্ছি, এ বইটি যে পাণ্ডুলিপি অবস্থায়ই পুরস্কার প্রদানকারীদের নজর কেড়েছে তা তাঁদের বিবেচনাবোধ ও দুরদর্শী চিন্তাভাবনার ফল।

সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের এখানকার গল্পচর্চায় পরাধীন দেশের স্বাধীন মানুষেরা একটা অত্যন্ত বলিষ্ঠ সংযোজন। লেখক গল্পকে অনেক ক্ষেত্রে গল্প থেকে বিচ্যুত করে আবার অগল্পকে তাঁর নিজস্ব উদ্ভাবনকুশলতায় গল্প বানিয়ে নির্মিতিকে এক অসামান্যতায় মুক্তি দিয়েছেন। গল্পকার মোজাফ্‌ফর হোসেনের এখানেই সার্থকতা।

বইয়ের ভূমিকায় মোজাফ্‌ফর তাঁর গল্পের প্রেক্ষাপট ও নির্মিতি নিয়ে কিছু কথা বলেছেন। পাঠক তা না পড়লেই পারেন; কারণ কী নিয়ে গল্প, কেন এভাবে লেখা এসব প্রশ্নের জবাব পাঠকের তালাশ করার কথা নিজের মতো করে। এ চ্যালেঞ্জটুকু পাঠকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ—বিশেষ করে যদি তাকে মোজাফ্‌ফরের অন্তত গোটা পাঁচেক গল্প নিয়ে ভাবতে হয়। বইয়ের নাম-গল্প ‘পরাধীন দেশের স্বাধীন মানুষেরা’ দিয়ে শুরু করা যেতে পারে। বিষয়ের সঙ্গে অত্যন্ত লাগসই শিরোনামের এ গল্প আদতে কোনো গল্প নয়, এটি একটি প্রতিবেদন—গোটা দেশের জন্মনাড়ি চেপে ধরা এক অন্তর্ভেদী প্রতিবেদন যা স্বাধীন-অস্বাধীনের মর্ম ও তাৎপর্যকে কাটাছেঁড়াই করে না, তাতে প্রবল কুঠারাঘাতও হানে। কিন্তু কুঠারাঘাতই লেখকের একমাত্র লক্ষ্য নয়, বরং কেন তিনি তাঁর নির্মোহ বয়ানে স্বদেশকে পরাধীন বলছেন সেদিকে পাঠকের মনোযোগ কেড়ে নিয়ে পাঠকের ওপরই ব্যাখ্যার ভার ও চাপ ছেড়ে দেন। কী দাঁড়ায় শেষ পর্যন্ত? যারা বিকলাঙ্গ হয়ে, ছিন্নভিন্ন শরীরে মরে গিয়ে যে স্বাধীনতার স্বাদ পেয়েছে, সেটাই কি প্রকৃত স্বাধীনতা? তারা কি কারো প্রতিপক্ষ, না তারাই মূল পক্ষ—বিচার পাঠকের। এটাই শক্তি গল্পকার মোজাফ্ফরের। বলার অপেক্ষা রখে না, এ সেই শক্তি যা নিজেকে প্রকাশ্য হতে দেয় না, কল্প-বাস্তবের আলো-আঁধারিতে পাঠককে টেনে নিয়ে পরিস্থিতি অনুধাবনের সুযোগ করে দেয়, তবে পরিস্থিতির জটিলতা থেকে বেরোবার পথ বাতলে দেয় না। পাঠককে মোজাফ্‌ফর এতটাই গুরুত্ব দেন।


তিনি একদিকে যেমন অসামান্য গল্প বলিয়ে, তেমনি গল্পের ভিতরে গল্প পুরে নতুন ধরনের আখ্যান তৈরিতেও পাকা কারিগর।


কথাগুলো থেকে যদি এমন ধারণা হয় মোজাফ্ফর তথাকথিত অগল্পকে গল্প বানাতেই মনোযোগী, তাহলে কয়েকটা গল্পের কথা এসেই যায়, যেখানে তিনি একদিকে যেমন অসামান্য গল্প বলিয়ে, তেমনি গল্পের ভিতরে গল্প পুরে নতুন ধরনের আখ্যান তৈরিতেও পাকা কারিগর। মূল গল্প তিনি তাঁর মতো করে বানান, তবে ভেতরে শাখা-প্রশাখা ছড়ানো অন্য গল্পগুলোকে অব্যক্ত রেখে দেন পাঠকের জন্য—তারা নিজেরা বানাবে বলে। ‘বরকত নামে কেউ একজন ছিল এই শহরে’ তেমনি এক গল্প। শহরের কেন্দ্রে, যাকে বলা হয় জিরো পয়েন্ট, একটা মৃতদেহকে ঝুলতে দেখা যায়, একজন মাঝবয়সি পুরুষের মৃতদেহ—পুলিশের পরিভাষায় ডেড বডি। গল্পে পুলিশই ভাষ্যকার, একজন পুলিশ অফিসার এই অজ্ঞাতপরিচয় ডেড বডির পরিচয় খুঁজতে গিয়ে, এবং কারা তাকে খুন করে থাকতে পারে এ তদন্তে নেমে যে পরিস্থিতির মুখোমুখি হন তা মোটেও এ দেশে নতুন নয়, পুলিশের কাছে তো নয়-ই। অজ্ঞাতপরিচয় এই ডেড বডি দেশের সামাজিক-রাজনৈতিক ও মিডিয়া-ন্যারেটিভকে উন্মোচন করে চলে, সেই সাথে পুলিশি-ন্যারেটিভকেও। ডেড বডির পরিচয় মেলে, জীবিতাবস্থায় তার নাম ছিল বরকত। কিন্তু দেখা গেল জীবিত থাকাকালীনও সে এক রকম নাম-পরিচয়হীনই ছিল। তাকে যারা চিনত তাদের অধিকাংশই তার নাম জানত না। তবে খোঁজাখুঁজিতে যখন জানা গেল সে তার বাড়ি থেকে খানিকটা দূরে এক প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষকতা করত, তাতেও জট তেমন খুলল না। কারণ সে যেমন নিজেকে সামাজিকভাবে পরিচিত করতে, সমাজের একজন হতে, ইনসাইডার হতে সামান্যতম গরজ দেখায় নি, সমাজও তার ব্যাপারে ছিল নিরাসক্ত। সমাজে বাস করেও সে ছিল সর্বার্থে একজন আউটসাইডার। এ পর্যায়ে পুলিশের কাছে ‘কে সে’ এ প্রশ্নটা যখন বড় হয়ে দেখা দেয়, তখন শুরু হয় খানাতল্লাসি। তাতেও তেমন ফায়দা হয় না, তবে ‘পুলিশ কী না পারে’ এই প্রবাদের সত্যতার খাতিরে পুলিশের হাতে উঠে আসে একটা জীর্ণ ডায়েরি, তাতে এক জায়গায় পাওয়া যায় বরকতের নিজের হাতে লেখা দুটি ছোট ছোট বাক্য : ‘আমিও চাই সকলে জানুক আমাকে। জানুক বরকত বলে কেউ একজন ছিল এই শহরে।’ মৃত্যুর এক দিন আগে লেখা বরকতের জবানবন্দি তার মৃত্যুবিষয়কে রহস্যের অবসান ঘটায়, সেই সাথে এক আমরণ অজ্ঞাতনামার আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠার দুঃসহ আর্তিও পাঠককে তীব্রভাবে বিদ্ধ করে। আপাতদৃষ্টিতে গল্পের এখানেই শেষ, তবে গল্পের মার্জিনে অনেকগুলো গল্পের মুখ খুলেও লেখক সেগুলোকে রুদ্ধ করে রেখেছেন—পাঠককে ভাবনার খোরাক জোগাতে, যাতে পাঠক চাইলে সেই ছিপি আটকানো গল্পগুলো নিজেই বানাতে পারেন। যেমন— ডেড বডিকে বরকত বলে আবিস্কার করা ও তার মৃত্যুর কারণ জানার পর পুলিশ কি বিষয়টাকে সর্বসাধারণের কাছে বুক ফুলিয়ে তুলে ধরবে, না-কি ‘পুলিশ কী না পারে’ এই প্রবাদকে আরো তাৎপর্যময় করতে অন্য কোনো পথ বেছে নেবে—সে-গল্পে লেখক যেতে চান না, পাঠক চাইলে পারেন।


গল্প বলা ও গল্পকে রুদ্ধ করা—দুদিকেই মোজাফ্‌ফর পারদর্শী।


‘আমার মা বেশ্যা ছিলেন’ গল্পটি নানা করণে উল্লেখযোগ্য। এখানেও পূর্বোক্ত গল্পটির মতো মোজাফ্‌ফর অপ্রতিরোধ্য গল্প বলিয়ে, থুড়ি, যার বয়ানে গল্পটি বলা হয়েছে, সে। গল্পে লেখক মোজাফ্‌ফরকে খুঁজে পাওয়া যাবে না। যে ঘটনাপুঞ্জ এ গল্পকে পরিণতির দিকে ধাবিত করেছে তা যেন অবধারিত। এ এলিয়টের সেই অবজেক্টিভ কোররিলেটিভ, যা ঘটনা ও ঘটনার ভগ্নাংশের সংশ্লেষে এক প্রবল অবিচ্ছিন্নতায় মূল চরিত্রের আশপাশকে এতই ঘনবদ্ধ ও অনিবার্যমুখী করে তোলে, ঘটনার সহগামী হওয়া ছাড়া তার করার কিছু থাকে না। তাই সে যখন গল্পের শেষে বলে, খুব পাপ করতে ইচ্ছা করে, তখন সে যে পারিপাশ্বিক ঘটনার নির্বিরোধ শিকার তা আড়াল থাকে না।

গল্প বলা ও গল্পকে রুদ্ধ করা—দুদিকেই মোজাফ্‌ফর পারদর্শী। গল্প বলায় যেমন ‘আত্মহত্যা করার জন্য লোকটি মরেনি’, ‘ভিজে যাওয়া শব্দগুলো’, ‘এক্সভিডিওজ ডটকম’ তাঁকে বিশিষ্টতা দেয়, তেমনি রুদ্ধবাক গল্প হিসেবে ‘পাপ-পুণ্যের মাঝে’, ‘ছেলেটি বোমা হামলায় বেঁচে গিয়েই মরল’ উল্লেখযোগ্য।

সার্ভিয়ান ঔপন্যাসিক ও ইতিহাসবেত্তা মিলোরয়েড প্যাভিচ, যিনি ‘ডিকশনারি অফ দ্য খাজার্স’ নামের অবিশ্বাস্য লেক্সিকান উপন্যাসেরও প্রণেতা, নিজের রচনার কল্পনারহিত অভিনবত্বের পাশাপাশি যে বিষয়কে গুরুত্বপূর্ণ মনে করতেন তা হলো পাঠককে নতুন ধরনের পাঠাভ্যাসে দীক্ষিত করা। তুলনাটা বাড়াবাড়ি রকমের অসম হলেও একথা বলা-ই যায় মোজাফ্‌ফর হোসেনও পাঠককে ভিন্ন ধরনের পাঠ-অভিজ্ঞতা উপহার দিতে প্রস্তুত।

কয়েকটি দুর্বল গল্প রয়েছে বইতে। প্রধান গল্পগুলোর নির্মিতির কলাকৌশল বা বিষয় বিবেচনায় এ গল্পগুলো বেমানান। যেমন— ‘একটি হাতের সন্ধান চেয়ে বিজ্ঞাপন’, ‘আরো একটি রাতের অপেক্ষায়’, ‘যে গল্পগুলো ঘরে ফেরে না’, ‘বিয়েবাড়িতে রবীন্দ্রনাথ’।

শেষে এটুকুই বলার : দীর্ঘ দিন পর বেশ কটা নাড়া দেয়ার মতো গল্প পড়ে ছোট এই আলোচনা লিখতে গিয়ে মোজাফ্‌ফর হোসেনকে ধন্যবাদ তো বটেই, অভিনন্দন জানানো কর্তব্য মনে করছি।


  • স্বাধীন দেশের পরাধীন মানুষেরা বইয়ের পাণ্ডুলিপির জন্য মোজাফ্‌ফর হোসেন ২০১৮ সালে আবুল হাসান সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন।

ওয়াসি আহমেদ

জন্ম ৩১ অক্টোবর ১৯৫৪; সিলেট। ইংরেজিতে স্নাতকোত্তর। কথাসাহিত্যিক। অনুবাদক। দুই খণ্ডে তাঁর গল্পসংগ্রহ বেরিয়েছে চৈতন্য প্রকাশনা থেকে।

ই-মেইল : wasiahmed.bd@gmail.com