হোম বই নিয়ে মুয়িনের কবিতা : ছানায় চুবিয়ে রাখা সূর্যাস্ত

মুয়িনের কবিতা : ছানায় চুবিয়ে রাখা সূর্যাস্ত

মুয়িনের কবিতা : ছানায় চুবিয়ে রাখা সূর্যাস্ত
1.24K
0

‘যাকে আমরা ‘বুঝতে পারা’ বলি, তা আসলে একটা ধীর এবং চাতুর্যময় প্রক্রিয়া, কারণ আমরা নিজেরাই নিজেদের ভুল এবং ছলনার শিকার হয়ে উঠি।’
—নোবেল ভাষণ, অক্তাভিও পাজ, মেক্সিকোর কবি এবং প্রাবন্ধিক

পাজের এই ভাষণ পড়তে পড়তে উপরের অংশে কিছুটা থামতে হয়, কেননা একই সময়ে পঠিত অন্য এক কবির কবিতার বইয়ের যে ব্যাপারটি শুরুতেই আমাকে ভাবিয়েছে তা হলো বইটির রচনাকাল—বইয়ে উল্লিখিত সময় অনুযায়ী যা প্রায় একযুগ অর্থাৎ ৩ মাঘ, ১৪১৪ থেকে ২২ মাঘ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ। কবি/লেখকদের বই রচনায় এর থেকেও বেশি সময় নেয়ার অনেক নজির আমাদের সামনে থাকা সত্ত্বেও এটি বিশেষ হয়ে ওঠে মূলত দুটি কারণে—

১) তিন ফর্মার কবিতার বইটির সবগুলো কবিতার শিরোনাম কোনো না কোনো মানুষের নাম দিয়ে, যা ইউনিক মনে হয়েছে, কেননা মানুষের নাম দিয়ে কবিতার পুরো বই অন্তত আমার চোখে পড়ে নাই।

২) পূর্বেই উল্লিখিত, প্রায় একযুগের লেখার সংকলন এই বই। প্রত্যেকটি কবিতা ব্যক্তিনাম দিয়ে বলেই প্রশ্ন জাগে, বইটি কি শুরু থেকেই কবির পরিকল্পনার অংশ ছিল, নাকি দীর্ঘদিনের লেখার ভেতর থেকে বাছাইয়ের মাধ্যমে আলাদা ধরনের গ্রন্থ উপস্থাপনের প্রচেষ্টা ছিল?


তিনি মলাটবদ্ধ করেছেন ইতিহাস, সংস্কৃতি, চলচ্চিত্র, ধর্ম, দর্শন, কবিতা, সংগীত, রাজনীতি ও অভিবাসন ইত্যাদি।


কবিতার বই হাতে নিয়ে পাঠক কবির অনুভূতির সাথে নিজের অনুভূতির সামঞ্জস্যপূর্ণ ঐক্য প্রত্যাশা করেন। কিন্তু মগ্নপাঠক অনুভূতির চৌকাঠ পেরিয়ে আরও গভীরের দিকে যখন যেতে শুরু করেন তখন কবিতার রূপ-রস-ব্যঞ্জনা-কৌশল-বুনন প্রভৃতি থেকেও নিংড়ে নিতে ইচ্ছুক থাকেন। ঠিক এই জায়গাতে এসেই কবি থেকে কবি আলাদা হতে শুরু করেন পাঠকের কাছে।

আপাত অসামঞ্জস্যপূর্ণ কিন্তু মননসিদ্ধ গভীর কিছু বাক্যের সমবায়ে হাল আমলে যে ধরনের কবিতা লেখা হচ্ছে, যা একই সাথে হৃদয়গ্রাহী এবং চলচ্চিত্র-ভাষার মতো অনুভব তৈরি করে, আজকের আলোচ্য কবি ও কবিতা তার থেকে কিঞ্চিৎ দূরেই অবস্থান করলেও কবিতার কাব্যগুণে সকলের কাছেই তিনি সমাদৃত হয়ে ওঠেন।

আঠারোটি কবিতা নিয়ে কবিতার বই সঞ্জয় উবাচ, যার প্রথম কবিতা একগুচ্ছ ‘বিন্তি’। আর সর্বশেষ কবিতা ‘সঞ্জয় উবাচ’। বইটির কবিতাক্রম নির্ধারণেও কবি মুয়িন পারভেজ রাখেন মুনশিয়ানার ছাপ। প্রথম কবিতা ‘বিন্তি’র ষোলটি অংশের প্রতিটি দশ লাইনের আঠারো মাত্রায় যেভাবে ঢেলে দেন আন্তরিক রতির দরদ, শেষ কবিতা ‘সঞ্জয় উবাচ’-এ তিনি হয়ে ওঠেন ধারাভাষ্যকার অন্তর্স্পর্শী মমতা ও স্থিতির, মহাধনুর্ধরদের তিনি দেখিয়েছেন আস্থা রাখতে বাণের বদলে বীণে। দু’পাশে এই দুই কবিতা এবং মাঝের অন্যান্য সব কবিতা দিয়ে তিনি মলাটবদ্ধ করেছেন ইতিহাস, সংস্কৃতি, চলচ্চিত্র, ধর্ম, দর্শন, কবিতা, সংগীত, রাজনীতি ও অভিবাসন ইত্যাদি।

অথচ ১৭ জন মানুষ, তারা প্রত্যেকেই যেন একেকটি অস্ত্র, কবি-নির্মিত এই মহাভাষ্যের পৃথিবীতে, যাদের হৃদয় দিয়েই কবি পরখ করে নিতে চেয়েছেন কবিতার চিরায়ত সেই গূঢ় গান। আর সারথি সঞ্জয় সেই গান ছড়িয়ে দেন পাঠকের দরবারে।

জীবনের শেষদিকের কোনো এক কবিতায় অক্তাভিও পাজ লিখেছিলেন : আমি আমার শব্দদের ছায়া।

সঞ্জয়ও যেন কবির সেই ছায়া, যিনি ধৃতরাষ্ট্রকে দিব্যচোখে দেখা কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের বর্ণনা দেয়ার মতোই বিভিন্ন কবিতার মাধ্যমে বর্ণনা করছেন পৃথিবী নামক ময়দানে তৎপর মানুষের বিভিন্নমুখী কার্যের।

আমিই আত্মা—এই ধারণার সলতে’য় যখন কবি আগুন ধরিয়ে দেন তখন তিনি সম্ভবত সকলের হয়ে ওঠেন। কবিরা আত্মার কারবারি, যদিও অন্যান্য মানুষের মতই তারা মেঠে জীবন যাপন করেন। জীবনের আনন্দ-দুঃখ যাত্রায় যে ঘাত-প্রতিঘাত উত্থান-পতন, তার হিশেব করলে একযুগ তো কম দীর্ঘ নয়। এই সময়ের ভেতর ব্যক্তির জীবনবীক্ষায় ঘটে যেতে পারে র‍্যাডিকাল পরিবর্তন এবং সে বিষয়কে মাথায় রেখেই হয়তোবা পাজ বলেওছিলেন :

আমরা নিজেরাই নিজেদের ভুল এবং ছলনার শিকার হয়ে উঠি।

কবি মুয়িন পারভেজ কি ভুল ও ছলনার শিকার হন নি সঞ্জয় উবাচ-এর রচনাকালীন দীর্ঘ পরিক্রমায়? ১৮টি কবিতা এবং ১৯টি অংশসহ মোট ৩৭টি কবিতা লিখতে তিনি সময় নিলেন প্রায় একযুগ, গড়ে তিনটি কবিতা বছরে, কবিতা লেখার এমন নির্বিঘ্ন সাধনা এ-যুগে করতে পেরেছেন কজন?


তিরিশের কবিরা মোটাদাগে পশ্চিমের ভাব, ধারণা, কৌশল বাংলা কবিতায় চালান করেছেন।


কিন্তু এই বিশাল প্রস্তুতির পর মুয়িন পারভেজের সঞ্জয় উবাচ আশলে কেমন বই হলো? মলাটবন্দি শিরোনামেরা কবিতার ভেতর দিয়ে জ্যান্ত হয়ে উঠল কি-না? যেখানে অড্রি হেপবার্ন সহজ হাসির সেই মুখ, আর ম্যারিলিন মনরো অসমাপ্ত চেহারার চিরবিবসনা। তাদের বিনির্মাণ কিভাবে হয় কবির মগজে? মোটাদাগে, ম্যারিলিন মনরো ‘নগ্ন দুটি ডানা, আর নিচে মূর্ছাতুর পুরুষের গান’। যদিও কবির ভাষ্যমতে মনরো ছুড়ে দিয়েছেন তাচ্ছিল্যের হাসি নতজানু পুরুষের দিকে। আর হেপবার্ন—

পাথরমুখের কাছে তোমার আঁতকে ওঠা দেখে
মনে হলো আর্তনাদ বড়ো মিথ্যে এই পৃথিবীতে
মুখের ব্যান্ডেজ খুলে হাসছে শিশুরা! সব রেখে
ভাবছি প্রাসাদ থেকে ফিরবে তুমিও একদিন

সেই রাজকুমারী, যিনি ‘রোমান হলিডে’ ছবিতেই স্থির হয়ে যান কবির কাছে, যেন তিনি বেরিয়ে আসেন মিশে যেতে জনগণের কাতারে। এহেন সোজাসাপ্টা বিনির্মাণে in between lines পাঠ না হলে হলিউডি এই দুই নায়িকাকে কবির ব্যবহারের ভিন্নতাটুকুর রসগ্রহণ পূর্ণাঙ্গ হবে না।

মুয়িন পারভেজ কাব্যিক রস ছড়িয়ে দিয়েছেন কবিতা থেকে কবিতায়। যদিও সময়যাপন কবির ভাষ্যকে নির্ধারণ করে, কিন্তু তাকে সহজ যোগাযোগসম্পন্ন [ইশারা-ইঙ্গিতসহ] করতে যে মুনশিয়ানা ও কাব্যিক-বোধের দরকার তা সকলের থাকে না, কারও কারও থাকে। মুয়িন একইসাথে সহজ ও ক্ষুরধার লেখনির মাধ্যমে নিজেকে প্রকাশ করেন। যা তার কাব্যভাষাকে তৈরি করেছে—

১) অভিজ্ঞতা ও গভীর অভিনিবেশ
২) যথাযথ মাত্রাজ্ঞান, বিষয় নির্বাচন ও তার ব্যবহারে
৩) ছন্দের স্নিগ্ধ ও স্বচ্ছন্দ ব্যবহার

এই কারণে তিনি সমকালের ক্যাসপার ও কৃত্তিকার সাথে মেলাতে পারেন পুরাকালের দেবযানীকে!

যুদ্ধ থেমে যায় নি আজও, সঞ্জীবনী তুচ্ছ ক’রে আমি আসছি
তোমার কাছে; চিরজয়ের নেই বিরোধী চাপ
[দেবযানী]

পিছনে হায়েনারা সামনে কাঁটাতার
কোথাও পথ নেই পালিয়ে যাওয়ার
সাগরপাড়ে তাই শিশুটি প’ড়ে আছে
[ক্যাসপার]

অথবা

অনেকেই ক্ষমা চাইছেন
কৃত্তিকা, তোমার কাছে

……………

ক্ষমা এক প্রাচীন ভুট্টার নাম
আগুনে ভেজে খেতে হয়
যে-আগুনে ঝলসে গেছে তোমার শরীর
[কৃত্তিকা]

আধুনিক কবিতা দুর্বোধ্য—এই বহুল প্রচারিত কথার কারণেই কি সাধারণ পাঠক কবিতাকে তাদের নাগালের বাইরের মনে করেন? পুরনো প্যাঁচাল তো এই, মধুসূদনকে হিশাবে রেখেও বলা হয় তিরিশের কবিরা মোটাদাগে পশ্চিমের ভাব, ধারণা, কৌশল বাংলা কবিতায় চালান করেছেন। এসব নিয়ে বহু তর্ক-বিতর্ক, তাত্ত্বিক ও দার্শনিক ব্যাখ্যার ঝড় ইতোমধ্যে বয়ে গেছে। এর ভেতরে কবিতার পাঠক কতটা বেড়েছে জানা নাই, কিন্তু বৈদ্যুতিন যোগাযোগের বৈপ্লবিক উন্নতির ফলে কবির সংখ্যা যে অনেক বেড়েছে, এ-কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়। অবস্থার এমন আনুকূল্যের সময়ে কবি বিন্তিকে নিয়ে মুখোমুখি বসতে গেলেই শীতল কফির মতো নিঃশব্দে গড়িয়ে যাচ্ছেন টেবিলের নিচে, আর যে বিড়ালটির ওখানে থাকবার কথা সে শুয়ে আছে মেঘের কার্নিশে, যেখানে কবি রোমশ রোদ্দুরে বিন্তির সাথে সংলগ্ন থেকে গোল হয়ে যাচ্ছেন, কিন্তু ওখানেও শান্তি মেলে না, কেননা দুঃস্বপ্নের স্নাইপার তাকে তাড়িয়ে নিচ্ছে এক মরু থেকে আরেক মরুতে। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটের কয়েক দশকের এই মরুঝড় ফরাসি কবি ‘আপোলিনের’ শিরোনামের কবিতার থেকে আর যথার্থ হয় না। কবিতাটি শেষ করেন তিনি এভাবে—বড় গোল হয়ে যাচ্ছি, দাদা, ছানায় চুবিয়ে রাখা সূর্যাস্তের মতো; একটি পিঁপড়ে তবু সমস্ত শরীর ঘুরে এসে কিছুতেই আর খুঁজে পাচ্ছে না আমার চোখ।


মুয়িন পারভেজ কবিতায় মূলত ক্ল্যাসিক ধারার অনুসারী, ছন্দ ব্যবহারে, বাক্য বুননে। 


এক-একটি শব্দ, আজকের সময়ের বিশ্লিষ্ট মানুষের মতোই, এক-একটি ব্যঞ্জনাসংকুল দ্বীপ। অর্থাৎ একটি কবিতা একটি দ্বীপপুঞ্জ যেখানে এক-একটি শব্দের অনাশ্রয়িতা শেষ অবধি মুছে দিয়ে পরম আশ্রয়ের মতো হয়ে ওঠে—কবি আলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের এই যে ‘পরম আশ্রয়’ তা-কি সবচেয়ে বেশি মিলে ‘বিন্তি’ সিরিজের কবিতাগুলোর মধ্যে! পুরো একটি কবিতা পড়ে ফেলা যাক—

কান পেতে শোন, বিন্তি, হৃৎপ্রপাতের সেরেনাদ
সমস্ত কথার কাচ ভেঙে পড়ে মৌনের ধারায়
চূর্ণ-চূর্ণ মেঘে তুই জমিয়ে রাখিস যত স্মৃতি
ভোরের গণ্ডূষ থেকে গড়িয়ে পড়েছে তার রং
অপরিচয়ের পলি কখনও কি ক্ষয়ে যায় সব?
বানানো বাক্যের বিভা? বিন্তি, শোন তবু কান পেতে
বধিরতা থেকে যদি ঢেউ তোলে সরস্বতী নদী
কঙ্কালের স্তূপ থেকে বেজে ওঠে যদি-বা নিক্বণ
তামাদিকালের রেখা ভিজে যায় মুহূর্তবৃষ্টিতে
দূরের সাম্পান থেকে ভেসে আসে উটের বিলাপ

কবি তো আশলে পরিসর-বৃন্তে ফোঁটা ফুল, যে সবসময়ই গন্ধ ছড়াতে চায়, কিন্তু জগৎ বড় সংকুল, পরিপার্শ্ব বড়ই নির্মম, তখন আমাদের হৃদয়ে ক্ষরণ হয়, তবুও আমরা আস্থা রাখি, স্বস্তির সন্ধান করি।

মুয়িন পারভেজ কবিতায় মূলত ক্ল্যাসিক ধারার অনুসারী, ছন্দ ব্যবহারে, বাক্য বুননে। আঙ্গিকের ক্ষেত্রেও খুব একটা নিরীক্ষার আশ্রয় নেন নি ‘আপোলিনের’ কবিতাটি ছাড়া। ২/১টি ব্যতিক্রম ব্যতিরেকে শব্দ ব্যবহারে তিনি শান্ত স্রোতঃস্বিনী। তার কবিতার মাত্রা এমনই যে ’স্তনাঢ্য’ শব্দের দুর্দান্ত ব্যবহার সত্ত্বেও তা উচ্চকন্ঠের মনে হয়, আবার তাকে সুশীল কবিও বলা চলে কবিতার একটি চরিত্রের মুখে খিস্তি ‘চাইন্দার হোগাদি সংগ্রাম’ ছাড়া। শিল্পী মইনুল আলমের প্রচ্ছদ বইটির শ্রীবৃদ্ধি তো করেছেই, কবিতার বিষয়ের সাথেও বিলকুল সামঞ্জস্যপূর্ণ মনে হয়েছে।

(1240)