হোম বই নিয়ে ‘মীনগন্ধের তারা’ সম্পর্কে

‘মীনগন্ধের তারা’ সম্পর্কে

‘মীনগন্ধের তারা’ সম্পর্কে
487
0

হাসান রোবায়েতের মীনগন্ধের তারা কবিতাগ্রন্থ আধুনিক কবিতার শর্তপূরণের মধ্য দিয়ে (রোম্যান্টিক ও মিস্টিক প্রবণতাও কিছু আছে) সমকালীন হয়ে ওঠার অনুশীলন প্রামাণ্য করেছে। কথাটা এজন্যই বলা, বাংলা ভাষার বিপুল-অধিকাংশ কবি সমকালীন প্রতিপাদ্য ও ভাষায় ভর দিয়ে আধুনিক হওয়ার প্রয়াস ক’রে থাকেন। মীনগন্ধের তারার অবস্থান এর বিপরীতে। ফলে, আধুনিকের উল্লম্ফন, বিপর্যয়, সিদ্ধান্ততৃষ্ণা, নির্মোহপনা, প্রথাগত অলঙ্কার এড়ানোর চেষ্টা, অনুভূতির প্রকাশগত রূপবদল ও প্রসারণ, ভাষার সংস্কার বর্জন, প্রাত্যহিক কিন্তু কবিতায় অপ্রচল শব্দের প্রয়োগ—কিছুই বাদ পড়তে দেখা যায় না। এইসব বৈশিষ্ট্যের মধ্যে সম্ভবত সবচেয়ে লক্ষ্যযোগ্য কবির উল্লম্ফনধর্মিতা। কেননা, আধুনিক কবিতায় উল্লম্ফনের যে-ধারণাটি আমরা পাই, বিশেষত টি এস এলিয়টের কবিতায়—তা থেকে এটি পৃথক। বলা চলে, কিছুটা রোবায়েতীয়। একটি দৃষ্টান্ত :

এখানে দুপুর—
ডালিম অব্দি যেতেই ফেটে লাল

ঘড়ির ভেতর বসে বসে
কেউ একজন
ফুলচারা লাগাচ্ছেন—অনেক দূরের থেকে
সেসব ফুটে ওঠা কল্পনা
দুলছে ছায়ায়—
পাতাটা ভাষার দিকে ঝুঁকে আছে—
যেন তোমাকে ডাকছে লাল এলাচ ফুলের হাওয়া—

(স্যালারির চিঠি, ৯)


হাসান রোবায়েত কার্যকারণশৃঙ্খলা এড়িয়ে একটা দৃশ্য তৈরি করে বস্তুসমূহের পারস্পরিক ও বিচ্ছিন্ন অবস্থান, অস্তিত্ব, অর্থ ও সঙ্কেত সমবায়ে প্রতিপাদ্যের সারফেস মিনিংয়ে প্রসারতা চান। 


এই কবিতাংশে রয়েছে উল্লম্ফন আর অবিদিতায়নের প্রয়োগ : দুপুরের ‘ডালিম অব্দি’ যাওয়া এবং কারও ‘ঘড়ির মধ্যে বসে’ ফুলচারা লাগানোর দৃশ্যগত পরম্পরা কল্পনাসম্ভব হলেও বাকি অনুষঙ্গগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক প্রশ্নসঙ্কুল হয়ে পড়ে। টি এস এলিয়টের কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল এই উল্লম্ফন ও অবিদিতায়ন, তবে তিনি তা রপ্ত করেছিলেন হার্ট ক্রেনের কবিতা থেকে। তাঁর অ্যাট মেলভিলস টম্ব সেরকম একটি কবিতা, যেখানে মানুষের হাড় সমুদ্রতীরের সঙ্গে দূতিয়ালি করছে সেই জাহাজের, যা ঘন্টার শব্দ ছেড়ে চ’লে গেছে। এলিয়টের ওয়েস্টল্যান্ড-এ যেমন—সন্ধ্যার বেগুনি মুহূর্ত নাবিককে নিয়ে আসছে ঘরে। এই সব উদাহরণ থেকে এটা পরিষ্কার যে, বস্তুসমূহের ক্রিয়াগত আন্তঃসম্পর্ক আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে কবিতায় উল্লম্ফনের প্রয়োগকে বৈধতা দেওয়া হয়েছে। মীনগন্ধের তারায় হাসান রোবায়েতও করেছেন তাই; কিন্তু তিনি আরও অগ্রসর থাকতে চেয়েছেন, অসম্পর্কিত কিংবা দূরবর্তী অনুষঙ্গকে পরস্পর জড়িত করার মধ্য দিয়ে। প্রচলিত আধুনিক কবিতায় উল্লম্ফনের যে ধারণা, তা থেকে এর পার্থক্য হলো, হাসান রোবায়েত কার্যকারণশৃঙ্খলা এড়িয়ে একটা দৃশ্য তৈরি করে বস্তুসমূহের পারস্পরিক ও বিচ্ছিন্ন অবস্থান, অস্তিত্ব, অর্থ ও সঙ্কেত সমবায়ে প্রতিপাদ্যের সারফেস মিনিংয়ে প্রসারতা চান। এটা এমন এক প্রক্রিয়া, যা কবিকে সিদ্ধান্তের দিকে নিয়ে যায়। রোম্যান্টিকের মতোই ব্যক্তিক অনুভবের সমর্থনও তিনি তাতে গ্রহণ করেন। যেমন :

দূরত্বে সবকিছু ভালো লাগে; মেহেদি ফুলের উজ্জ্বল
পানির গভীরে ছেঁড়া পাতা, হলুদ পাখির ডাক—

প্রশ্নের অলক্ষ্যে কেবলি পড়ে থাকে উত্তর—

(চিত্রার্পিত হাওয়া, ৪৮)


 বিজ্ঞানের পারিভাষিক শব্দ তার হাতে সমাসবদ্ধ হয়ে নতুন ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করে।


মীনগন্ধের তারায় নতুন ও স্বতন্ত্র কাব্যভাষা নির্মাণের প্রয়াস লক্ষণীয়। তাতে দেখা যায়, অপ্রচলিত (কবিতায়) শব্দ, বিজ্ঞানের পরিভাষার একককে সমাসবদ্ধ পদে পরিণত করে কবিতাভাষায় জুড়ে দেওয়া হয়েছে। ইসলামিক মিথের শব্দানুষঙ্গ, এমন-কি আয়াতের ব্যবহারও লক্ষ করা যায়। এক্ষেত্রে আল মাহমুদের চেয়ে হাসান রোবায়েতকে বেশি বেপরোয়া ব’লে মনে হয়। তবে একটা পার্থক্য এখানে বিবেচ্য। তা এই: আল মাহমুদের অভিমুখ আধুনিকতার দিকে নয়; ধর্মীয় মরমিপনায় তিনি সমর্পিত। এই সংকীর্ণতার বাইরে আলোচ্য কবি এমন এক পরিসর চাইছেন, যেখানে আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে সমকালীন কবিতাভাষার এককগুলো, বিজ্ঞান ও ধর্মীয় অনুষঙ্গরাশির মিলিত সংস্থান ঘটবে। কিন্তু এটা খুব বিপজ্জনক। কেননা, ভাষা নিজেই চৈতন্য বা সংবেদনশীলতা, পরস্পরবিরোধী ভাবনাপ্রকল্প কিংবা সাংঘর্ষিক বিষয়মুখ দিয়ে একে বিরক্ত করা চলে না। এ-ব্যাপারে কবিদের সচেতন থাকা জরুরি। তবে এটা ঠিক, হাসান রোবায়েত আলোচ্য গ্রন্থে এই স্বাক্ষর রেখেছেন যে, কবিতার লিপিকৌশল তার যথেষ্ট আয়ত্তে রয়েছে। বস্তু কিংবা ভাবের কনট্রাস্ট বা বিপরীত সমন্বয়, রহস্যীকরণ, লুপ্তোপমার ব্যবহার ইত্যাদিতে তিনি পারঙ্গম। বিজ্ঞানের পারিভাষিক শব্দ তার হাতে সমাসবদ্ধ হয়ে নতুন ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করে। সঙ্গে অনন্যতা সঞ্চারের চেষ্টায়, সেমেটিক অনুষঙ্গও জুড়ে দেন।

বোরাক থেমেছে দূর পরাভূত জলে
সপ্তখণ্ড রাত তারাগ্র্যাভিটির কূলে—

(ছায়াকারবালা, ৩৬)


কিন্তু যে কবি তার ধর্মীয় পরিচয় কবিতায় চাপিয়ে দেন, কবিতা যত উত্তীর্ণ হোক—শিল্পকলার বিপরীতেই তাঁর অবস্থান প্রামাণ্য হয়ে যায়।


আধুনিক কবিতার রসদপত্রের উপস্থিতি বেশ দেখা গেলেও মীনগন্ধের তারা কবিতাগ্রন্থে এই টেনশন দুর্লক্ষ্য নয় যে, এর রচয়িতার চৈতন্যগত প্রকৃত অভিপ্রায় শেষ পর্যন্ত কী? রোম্যান্টিক? আধুনিক? মিস্টিক? না-কি এসবের মিশ্রণ ঘটিয়ে কবিতার চৈতন্যগত পরিচয় সম্পর্কে নতুন এক ধারণার জন্ম দেওয়া?

এইসব প্রশ্নের উত্তর হয়তো এই মুূহূর্তে পাওয়া মুশকিল। সমস্যা হলো, কোনো কবির চৈতন্য বা সংবেদনশীলতা যদি ভাষার এককগুলোকে পরস্পর সাংঘর্ষিক ক’রে তোলে, তবে তার অবস্থান নিয়ে একধরনের সন্দেহ তৈরি হয়। বোধ করি, তা কবির জন্য নিরাপদ নয়। ফররুখ আহমদ, আল মাহমুদসহ বেশ কয়েকজনের কবিতার সূত্রে এই অভিজ্ঞতা অনেক পাঠকের রয়েছে। অন্যদিকে এটাও ঠিক, ভাষায় কোনো জবরদস্তি চলে না। না কবির দিক থেকে, না পাঠকের রুচির দিক থেকে। কিন্তু যে কবি তার ধর্মীয় পরিচয় কবিতায় চাপিয়ে দেন, কবিতা যত উত্তীর্ণ হোক—শিল্পকলার বিপরীতেই তাঁর অবস্থান প্রামাণ্য হয়ে যায়।


মীনগন্ধের তারা ॥ হাসান রোবায়েত ● প্রচ্ছদ ॥ রাজীব দত্ত ● প্রকাশক ॥ জেব্রাক্রসিং
চঞ্চল আশরাফ

চঞ্চল আশরাফ

জন্ম ১২ জানুয়ারি, ১৯৬৯; দাগনভুইয়া, ফেনী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে সম্মানসহ স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। পেশা : সাংবাদিকতা।

প্রকাশিত বই :
কবিতাগ্রন্থ : চোখ নেই দৃশ্য নেই (১৯৯৩), অসমাপ্ত শিরদাঁড়া (১৯৯৬), ও-মুদ্রা রহস্যে মেশে (২০০২), গোপনতাকামী আগুনের প্রকাশ্য রেখাগুলো (২০০৮), খুব গান হলো, চলো (২০১৩)।

উপন্যাস : কোনো এক গহ্বর থেকে (১৯৯৭), যে মৎস্যনারী (২০১১)।

গল্পগ্রন্থ : শূন্যতার বিরুদ্ধে মানুষের জয়ধ্বনি (১৯৯৯), সেই স্বপ্ন, যেখানে মানুষের মৃত্যু ঘটে (২০০৭), কোথাও না অথচ সবখানে (২০১৩)।

স্মৃতিগ্রন্থ : আমার হুমায়ুন আজাদ (২০১০)।
প্রবন্ধগ্রন্থ : কবিতার সৌন্দর্য ও অন্যান্য বিবেচনা (২০১১)

ই-মেইল : chanchalpoetry@gmail.com
চঞ্চল আশরাফ