হোম বই নিয়ে মায়াবী চরিত্রের বিষণ্নবোধ

মায়াবী চরিত্রের বিষণ্নবোধ

মায়াবী চরিত্রের বিষণ্নবোধ
533
0

শাদা শাদা মেঘে খণ্ড খণ্ড প্রেম মহিউদ্দীন আহ্‌মেদ-এর প্রথম গল্পগ্রন্থ। শিরোনামকে গুরুত্ব দিয়ে বইটি হাতে নেয়ার আগ্রহকে এ গ্রন্থের প্রথম সাফল্য বলা যায়। এ সময়ের গল্পে সাধারণ পাঠকের আগ্রহ থাকাই স্বাভাবিক। তবু ওই নামের টানে বইটির পাতা ওল্টাতে শুরু করি। প্রথম পৃষ্ঠা পাঠ করে লেখকের প্রতি একটা গোপন প্রেম ঘটে যায়। সেই প্রেম থেকে চেষ্টা করব, পাঠকের সামনে বইটির কিছু পরিচয় তুলে ধরতে। এর আগে মলাটবদ্ধ বারোটি গল্পের তালিকা পেশ করা যাক :

‘সাঁকো’, ‘হাস্যরসাত্মক গল্প লেখার কৌশল’, ‘চাল ডাল লবণ তেল ও ধর্মাচার’, ‘তেলাপোকা’, ‘৫৭৭ টাকা’, ‘ফেসবুক লাইভ’, ‘বংশের বাতি’, ‘একটি পুরোন চিঠি’, ‘যাদেরকে মেরে ফেলেছি’, ‘শাদা শাদা মেঘ খণ্ড খণ্ড প্রেম’, ‘বাচ্চাটি আমার কেউ না’, ‘যদি সেনাবাহিনীর প্রধান হতাম’।

প্রসঙ্গিক বিষয়ের মধ্যে কিছু অদ্ভুত চরিত্রের সাক্ষাতে পাঠককে বিব্র্রত করা, তারপর মনোজগতের ভেতরটায় সূক্ষ্ম একটা চিড় ধরানো গল্পকারের বিশেষ একটা প্রবণতা বললে ভুল হবে না। অর্থাৎ বলতে চাইছি, গল্পকার গল্প বলার ছলে চরিত্র-সৃষ্টিতে এবং চরিত্র-সৃষ্টির আয়োজনে কিছু বিহ্বলতার বিচ্ছুরণে অধিক যত্নবান।

‘সাঁকো’ দিয়ে পাঠযাত্রা শুরু করি। যার ভেতরে ঢুকে যাই দুর্মর আর্কষণে। এই শীতে নাজিরুদ্দিন মাস্টারের মৃত্যুটা অনেকটা নিশ্চিত বলে প্রতিবেশীদের মধ্যে চলে কানাঘুষা, মৃত্যু নিয়ে পূর্বাভাস। মাস্টারের বড় ছেলে আলতাফকে আত্মীয়-স্বজনদের খবর দিয়ে শেষ দেখাটা দেখে যেতে বলে মুন্সি। দ্বন্দ্বমুখর পরিস্থিতির ভেতর আমাদের সামনে উন্মোচিত হয় নাজির মাস্টারের যৌবনকালীন খণ্ডচিত্র।

মিনারা তার প্রথম প্রেম—উছলে-পড়া ভরা যৌবন, আঁচলের নিচে অন্য এক পৃথিবী। তিনি আরও পিছনে দৃষ্টি মেলে দেখতে পান বাবার হাত ধরে মেলায় ছুটে যাওয়া। চলে বাবার সাথে তার কথোপকথন—

—কিন্যা দিওন লাগব
—আইচ্ছা দিমুনে
—অনেকগুলা দিওন লাগব
—আইচ্ছা [পৃষ্টা ১৫]

আকাশে শাদা শাদা মেঘ আর গোধূলি রঙের ছড়াছড়ি, উনি শূন্যে ভাসছেন। ‌’শাদা শাদা মেঘ খণ্ড খণ্ড প্রেম’ মূল শিরোনামের আগে ‌’সাঁকো’ একটা ইঙ্গিত বটে। সাঁকো পেরিয়ে অন্য গল্পের মায়াবী জাদুবলে ক্রমশ এগিয়ে যাই। ভাষার প্রাঞ্জলতা, বর্ণনার সাবলীলতা এই এগিয়ে যাওয়াকে সহজতর করেছে। চরিত্র, পটভূমি, বর্ণনা সব মিলিয়ে স্পষ্ট করে তুলেছে গল্পকথকের স্বতন্ত্র এটিচুড। ধরা যাক, ‘একটি পুরনো চিঠি’, গল্পকারের বহুস্বরিক শিল্পচেতনার স্মারক। দেশত্যাগের সিদ্ধান্ত থেকে স্বাধীন ফিরে আসে। পাশে থাকে স্ত্রী নাসরীন। তাহলেই বাবার স্বপ্ন বাস্তবায়নে আরেক ধাপ এগিয়ে যাবে ওরা। মুক্তিযোদ্ধা বাবার একটি পুরনো চিঠি গল্পের মূল টার্নিং পয়েন্ট।

হাস্যরসাত্মক গল্প লেখার কৌশল মাথায় রেখে গল্পকার খুব সুচারুভাবে বর্তমান হালের ভাঁড় লেখকদের প্রতিচ্ছবি তুলে ধরেছেন। পাঠক হিশাবে বউকে সুকৌশলে নিজের লেখা গেলানোর চরিত্রে এক ধরনের বেহায়াপনার রুগ্‌ণ চিত্র দেখতে পাই। এখানে গল্পকারের মুনশিয়ানাকে সাধুবাদ জানাতে হয়।

গ্রন্থ-শিরোনামের গল্পে দেখতে পাই এক সময়ের হিট ছবির নায়িকা অনিতা, যিনি বাস্তবতকে মেনে নিয়ে চলতে থাকেন। শাদা শাদা মেঘের মতো বহু মারুফ এসেছে তার জীবনে। অনিতার কাছে দ্বিপাক্ষিক কোনো ভালোবাসা নেই। ওয়ান সাইড লাভ। অনেকটা মেঘের মতো। একসময় মারুফকে ভালোবেসে বুঝতে পেরেছিল সে, আগুনে জ্বলতে জ্বলতে লাইফ ইজ হার্ড স্টোন। অনিতা বলে :

‘আমি জানি সব পুরুষেই এটা সেটা বলে সেক্স করতে চায়। তাদের কাছে সেক্সের উপর কোনো সত্যি নেই, কোন ধর্ম নেই।’  [পৃষ্ঠা ৭৬]

গল্পের পরিমণ্ডল ভ্রমণে বারোটি গল্পকে বারোভাজার স্বাদ বললে ভুল হবে না। প্রতিক্ষেত্রে যোগ হয়েছে নতুন মাত্রা। বিশেষ করে ধর্মতাত্ত্বিক চরিত্রগুলো অগ্রসর পাঠকে নিয়ে যাবে ভাবনার অতলান্তে। মজিদ চরিত্রের পরে আমরা বাংলা সাহিত্যে দ্বিতীয় কোনো চরিত্রকে হঠাৎ মনে করতে পারি না। ‘৫৭৭ টাকা’ গল্পে আলাবক্‌শো মৃধা সেরকম চরিত্রের পুনরুত্থান বলা যায়। গল্পের শেষ প্রান্তে দেখতে পাই, তিনি একধারে মসজিদের সভাপতি ও ম্যানেজার। ঢাকার বাস থেকে যারা গাঁয়ের মসজিদের জন্য টাকা কালেকশন করে তার মধ্যে তুবরেজ খাঁ এই গল্পের অন্যতম চরিত্র। বিশাল পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। ঘরে তার চারটি ছেলে মেয়ে ও বৃদ্ধ পিতা পাঞ্জু খাঁ।

‘তুবরেজ খাঁ পায়ু পথে যতই ইন্ডিয়ান মরিচের ঝাঁঝ থাক, সে বুঝতে পারে আর দেরি করা ঠিক হচ্ছে না। এবার বাপের জন্য সিট ফাঁকা করে দেওয়া দরকার।’ [পৃষ্ঠা ৩৯]

গল্পকারের ভাষাশৈলীর স্বাতন্ত্র্য চিহ্নিত করার জন্য কিছু গ্রামীণ ও বহুল ব্যবহৃত আরবি-ফার্সি শব্দকে তুলে ধরছি : নাখরাজি, সিন্দুইরা, ম্যাড়ম্যাড়া, ভেন্না, মুতুম, তুবড়ি, হম্বিতম্বি, কুটচাল, কৌদপাড়ে, খোঁড়ল, ভুভুজেলা, ভারাক্কি, নেওটে, টাট্টি, বাগড়া ইত্যাদি।

‘চাল ডাল লবণ তেল ও ধর্মাচার’ গল্পে পাই জয়নব চরিত্রের নৈরাশ্যবাদী এক নারীকে। আলিফ বে তে ছে পড়তে পড়তে যার প্রথম বিয়ে হয়। বেঁচে থাকার তাগিদে আরেকবার সংসার বাঁধে তরফ আলী মুন্সির সাথে। যিনি তাকে কয়েকটা সুরাসহ আম-সিপারা পড়িয়েছিলেন। জয়নব পরে বুঝেছিল লোকটা তার অস্থায়ী ঘর-সংসার সামলানোর জন্য বিয়ে করেছিল। সে মূলত ভালোবাসে আগের বউকে। জয়নব তার ছেলে মগর আলীকে নিয়ে ধর্মাচারে দ্বিতীয় পর্ব শুরু করেন। জয়নবের সামনে কাফনে রাখা লাশ। উনি জপতে থাকে আল্লা, আল্লা। ভেতর থেকে শব্দ আসে, ‘অ মা, মুতুম’।

ঘটনাপ্রবাহের ভিতর দিয়ে চরিত্রের ধর্মবোধ, অন্তর্দ্বন্দ্ব ভাস্কর্যময় টান টান উত্তেজনার এক রূপরেখায় চিত্রিত করেছেন গল্পকার। বাস্তবতার রেখাবন্ধনকে স্বীকার করেই মায়াবী জগতের আলো-ছায়া স্পর্শ করার স্পর্ধা দেখিয়েছেন। যা চরিত্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বিষণ্ন ব্যঞ্জনা বিমূর্ত করেছে।শাদা শাদা মেঘ খণ্ড খণ্ড প্রেম সেই দিক থেকে উপলব্ধির জায়গায় কড়া নাড়তে সক্ষম হয়েছে বলা যায়।


শাদা শাদা মেঘ খণ্ড খণ্ড প্রেম। মহিউদ্দীন আহমেদ।।  প্রকাশক : মুক্তিচিন্তা।। প্রচ্ছদশিল্পী : সারাজাত সৌম।। প্রকাশকাল : ফেব্রুয়ারি ২০১৮।। মূল্য : ১৮০।

অনিরুদ্ধ দিলওয়ার

জন্ম ৪ জানুয়ারি ১৯৮১; ঢাকা। শিক্ষা বিএসএস। পেশায় ব্যবসায়ী।

প্রকাশিত বই :
মেঘ জমেছে আকাশে [উপন্যাস, ২০১০]
প্রবুদ্ধ মেঘের ঘুঙ্গুর [কবিতা, ২০১৭]

ই-মেইল : aniruddodilwar@gmail.com