হোম বই নিয়ে ‘মাধুডাঙাতীরে’ : ভূমিকার বদলে

‘মাধুডাঙাতীরে’ : ভূমিকার বদলে

‘মাধুডাঙাতীরে’ : ভূমিকার বদলে
142
0

হাসান রোবায়েত প্রণীত ‘মাধুডাঙাতীরে’ কাব্যের প্রথম কবিতা, যাকে কবি নিজে এ কাব্যের ‘বিভাব কবিতা’ নামে ডাকতে চান, পড়ে কাব্যটির আকাঙ্ক্ষা সম্পর্কে ধারণা হয়। কাব্যটির প্রায় একই ধাঁচে লেখা কবিতাগুলো যে একটা সামগ্রিক ভাব প্রকাশের আভ্যন্তর উন্মুখতা নিয়ে রচিত বা বিন্যস্ত হয়েছে, তার দিকে প্রথম কবিতাটি বেশ খোলাখুলিই ইঙ্গিত দেয়। তাতে কাব্যটির উচ্চাভিলাষ সম্পর্কে একটা আশ্বাস জন্মে; পড়ার একটা গতিরেখা আবছাভাবে হলেও পাঠকের সঙ্গী হয়ে ভীষণ কাব্যনদীতে একাকী ভ্রমণের প্রেরণা জোগায়। অবশ্য কাব্য তো আর কবির ইশারা শেষ পর্যন্ত মান্য করে না—কোনো টেক্সটই নয়। সে ক্ষেত্রে কাব্য সম্পর্কে ইশারা পাঠকের দিকভোলা বুনো কল্পনায় খানিকটা আগল দিয়ে দেয় কি না, সে প্রশ্ন যদি উঠেই পড়ে তাহলে ঠেকানো মুশকিল। আপাতত যদি এই কবিতাটিকে একটা স্বয়ংসম্পূর্ণ কবিতা হিসাবে পড়ি, তাহলে প্রথমেই চোখে পড়ে এর কথকতার সংযম, সংগীতধর্ম আর ভাব-ভাষার খানিকটা পুরানা—বলা যায় অ্যান্টিক—কায়দাকানুন। বাংলা কবিতার উপনিবেশপূর্ব টোনটি টের পাওয়া যায় কবিতার শব্দ-ব্যবহারে, বিনয় ও আকুলতার টানে, এবং এমনকি আট-ছয় মাত্রাকে চার-চার-ছয়ে বিন্যস্ত করে ত্রিপদীর একটা সুর দেয়ায় পর্যন্ত। অন্যদিকে আবার অর্থ-যোজনার অন্তর্নিহিত কৌশলে দেখছি পুরানা সহজিয়া ঢঙের বেজায় বিরুদ্ধতা। সেখানে কবিতাটি এসে দাঁড়ায় গত শতকের শেষ দশক থেকে শুরু করে এ শতকের শুরুর দশকের সীমানায়। এই দুই বিপরীতের টান সহিসালামতে আঁটিয়ে নেয়া একদিক থেকে এ কাব্যের সবচেয়ে দৃষ্টিগ্রাহ্য বিশিষ্টতা।

তোমার মুখের থেকে বেশি/ মহাকাল নাই পৃথিবীতে—/ কত পথ যাওয়া যাবে আর/ ডালিম ফুলের বিপরীতে!—এরকম বিধ্বংসী সব পঙ্‌ক্তিতে ধরা পড়েছে কাব্যটির মূল মোটিফ। তাতে আমি-তুমি দাগানো একটা সম্পর্কের কাতরতা সামনে আসে। তাতে আকাঙ্ক্ষা, আবেশ আর সিদ্ধান্তসূচক নিবৃত্তির ছবি মনে ভাসে। মনে হয়, অস্তিত্বের সীমা-সরহদ্দ এঁকে নেয়ার একটা লীলা চলছে এখানে। সেখানে তুমি আর তোমার মুখ অস্তিত্বের যাবতীয় এনতেজামের চিহ্ন হয়ে একটা অসীম সীমা নির্ধারণ করে দিতে চায়। ‘আমি’র যদি কোনো মুখ আঁকতে চাই, যদি বুঝতে চাই নিজেকে, তবে তোমার মুখই তো একমাত্র সম্বল। কিন্তু আমার তো বাস্তব যেমন আছে তেমন কল্পনাও আছে; বাস্তব ও কল্পনার অতীত রূপ ও অরূপলোকও তো আমার অস্তিত্বেরই অংশ। এই অসীম সীমাকে কোল দেয়ার জন্য মহাকালের চেয়ে কম কিছু যথেষ্ট হতেই পারে না। কিন্তু অসীমকে উপলব্ধি করার জন্যও চাই সসীম বস্তু-পৃথিবীর ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য মরীচিকা। এই দুই বিপরীতের মেলবন্ধন ঘটানোর রক্তাক্ত বাসনা বোধ করি মাধুডাঙাতীরে কাব্যের প্রধান কাব্য-আবেগ।

হবেই বা না কেন? আমার তো অতীত আছে। আছে বিষণ্নতায় ডুবে যাওয়া বধিরতা। ৭-সংখ্যক কবিতায় যে অতীতের দেখা পাই, তাতে জন্মের স্মৃতি আছে। কিন্তু যে অতীতে আমার জন্ম, জন্মের বিষণ্ন স্মৃতিতে মা আর মাতৃসম মাটি-নদীর যে আখড়ায় আমার স্থিতি, আমার বর্তমানে তার বাস্তবতা কেমন? জীবদেহের মা কিংবা নদী-ভূমির সজল-কোমল বস্তুকতায় তাকে অস্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসাবে কিভাবে পাওয়া যাবে? ধারণা করি, কবি হাসান রোবায়েত এ মর্মে এক টুকরা তাৎপর্যপূর্ণ নিরীক্ষা করেছেন। স্মৃতির যে অংশটা যে রূপে বর্তমান অস্তিত্বের কার্নিশে আলগোছে ঝুলতে থাকে, অথচ তাকে বাড়তি ভেবে কিছুতেই এড়িয়ে যাওয়া যায় না, ‘মাধুডাঙাতীরে’র কবি সে স্মৃতির রূপের তল্লাসে খানিক অরূপে গেছেন। লিখতে চেয়েছেন এমন ভাষা, ধরা-পড়া এবং একই সাথে ধরা পড়তে না-চাওয়া যে স্মৃতিগুলো বেশ নিরীহ অথচ তীক্ষ্ণ ভঙ্গিতে জায়মান থাকে, সেগুলোকে যে ভাষায় বেশ কতকটা পাকড়াও করা যাবে। কথাটা আরো খানিকটা খুলে বলা যাক।

বিনয়-উৎপলের উৎসাহেই বোধ হয়, সত্তর-আশির কলকাত্তাই কবিভাষার বিমূর্ততা ঢাকায় নব্বইয়ের দশকে এবং তৎপরবর্তীকালে বেশ চর্চিত হয়েছিল। কবিতার ভাষার ইতিহাসের দিক থেকে এ চর্চার গুরুত্ব স্বীকার করতেই হয়। বিশেষত ব্যক্তির অনুভূতি-উপলব্ধিকে ওই অনুভূতি-উপলব্ধির মতোই বিমূর্ত ভঙ্গিতে ভাষায় সমর্পিত করার ক্ষেত্রে এ ধরনের চর্চার কার্যকরতা আছে। এ ভাষার অর্থহীনতায় পর্যবসিত হওয়ার ঝুঁকিও যথেষ্ট, যার বিস্তর নজির ঢাকার ওই সময়ের কবিতায় দেখা গেছে। সাম্প্রতিক দশকে ঢাকার কবিতা এ ধরনের বিমূর্ততা থেকে বেশ কতকটা সরে এসেছে বলেই মনে হয়। হাসান রোবায়েত নিজেই তার সাক্ষ্য। তবে পূর্বোক্ত বিমূর্ততায় তার যে কোনো বিরাগ নেই, বরং দরকারমতো সে ধরনের ভাষাকে ব্যবহার করার জুতসই মুনশিয়ানা তার সহজাত কবিত্বের অংশ, তার নজির ‘মাধুডাঙাতীরে’ কাব্যে যথেষ্ট আছে। ৭ সংখ্যক কবিতার স্মৃতি এবং ৮ সংখ্যক কবিতার বিষণ্ন-বধিরতা ভাষিক বিমূর্ততার নিঃসংশয় দলিল। ‘তবুও দূরের আলো আসে/ সন্ধ্যা ও নিভৃতির নিচে/ বহমান আমি ক্ষণকাল/ জননীর চেনা দহলিজে।’—স্মৃতির এই নির্মাণ পষ্ট করে হয়তো ঠিক ওটুকুই বলতে চায়, যতটা বললে স্মৃতি ও বর্তমানের আবছা যোগটা আবছাভাবেই উঠে আসে। ৮ সংখ্যক কবিতায় নিজের ভারে নত ‘আমি’টির মুখ চিহ্নিত হয়েছে এই ভাষায় : ‘যে জামা ছিঁড়িছে বহু আগে/ স্বপ্নে সেসব ফিরে আসে/ দিনভর উড়ছে সেলাই/ পরাভূত মুখটার পাশে—’।

উপরের উদ্ধৃতিগুলো এ কাব্যের বিমূর্ততার চরম নয়, প্রাথমিক লক্ষণ মাত্র। কাব্যে গমের বাগান-ঘেঁষা গান, ধু ধু ব্রিজ কিংবা ভেড়ার লোম উড়ার মতো প্রায় অসংলগ্ন ও ভাঙা ছবি যথেষ্ট আছে। অথচ লক্ষণবিচারে মনে হয়, কবি শুধু ছবিতেই তৃপ্ত নন, কথাও বলতে চান। নিজেকে চেনার এবং চেনানোর একটা জরুরত যেন সর্বত্র একটা ভীষণ কামনা হয়ে ভাষায় মুক্ত হতে চাচ্ছে। সে কথারা কখনো সরাসরি কখনো ছবির মধ্য দিয়ে বলতেই চায়। একদিকে বিমূর্ত ছবিতে এমন ভাব ধরার চেষ্টা, অন্যদিকে নিজেকে মূর্ত করার মরিয়া অভিপ্রায়—এ দুয়ের দ্বন্দ্বে প্রকাশের অভিপ্রায়টা জয়ী হয়েছে বলেই কি ‘মাধুডাঙাতীরে’ কাব্যে মিহি সুরকে মোটা ছবিতে মূর্তি দেয়ার বিরামহীন আয়োজন? কয়েকটি পঙ্‌ক্তি উদ্ধৃত করি :

উড়ে গেছি লঘু শিস দিয়ে
ডোরাকাটা বাতাসের পর [কবিতা ৪]

সেলাই কলের মতো বাঁকা
এই রাত শুয়ে আছে দূরে [কবিতা ৫]

তখন লেবুর ছাঁচে কেউ
গোল করে কাটছে সময় [কবিতা ৩০]

এ ধরনের উচ্চারণ বাংলা কাব্যধারায় অভাবনীয় নয়; কিন্তু মাধুডাঙাতীরে কাব্যের মিহি সুরে এরকম চড়া এনতেজাম কাব্যটির প্রবণতা সম্পর্কে বিশেষভাবে সচকিত করে। আমাদের হয়তো তখন দৃষ্টি আকর্ষণ করবে এ কাব্যের অন্য কিছু উচ্চারণ, যেখানে অভিজ্ঞতার আয়োজন রীতিমতো প্রবাদ-প্রবচনের মতো বলবান উক্তি হয়ে ব্যক্তি-আমির সাথে দশের অস্তিত্বকেও ক্ষণে ক্ষণে স্পর্শ করে যায়। ‘তবুও মানুষ কোনো সুরে/ বিকালের থেমে যাওয়া নদী/ নিজের শিশুর গোল হাতে/ রেখে যায় আয়ু-শেষাবধি’ কিংবা ‘বকুল কি জানে সে কী ফুল?’, কিংবা ‘মানুষেরা নিরাময়-প্রিয়/ আদতে অসুখ ভালোবাসে—’ ইত্যাদি উচ্চারণ নিজের সত্তার গভীর বাস্তবতা থেকে উৎসারিত হয়ে শেষ পর্যন্ত সর্বমানবিক অভিজ্ঞতা হিসাবেই প্রকাশিত হতে চেয়েছে।

আমাদের অতি পরিচিত প্রেম-আয়োজন এ কাব্যের খুব গোপন থেকে অতিপ্রকাশ্য অঙ্গন পর্যন্ত তৎপর। কবিতাগুলোতে ধারাবাহিকভাবে পড়ার নানারকম মন্ত্রণা থাকলেও আদতে অন্তর্গত সময়, ঘটনা ও ভাবের দিক থেকে আবশ্যিক কোনো ধারাবাহিকতা নির্মাণ খুব সহজ নয়। বরং একটা উপলক্ষকে লক্ষ্য মেনে একেকটি কবিতায় বিশেষ ভাব ও অনুভবকে প্রায় স্বতন্ত্র আমেজে প্রকাশের ভঙ্গিটাই প্রবল। এদিক থেকে কয়েকটি কবিতা তো আছেই, যেগুলো প্রেমের কবিতা হিসাবে পড়া যায়। ১২ সংখ্যক কবিতায় যেমন পাওয়ার আকুতি না-পাওয়ার কিছু মনোরম ছবি হয়ে শেষ পর্যন্ত প্রেম-সম্পর্কের অনিবার্যতাকেই সামনে নিয়ে আসে। ৩৩ সংখ্যক কবিতায়ও একই রকমের ভাব ফুটেছে আরো তীব্রতায়। সম্মিলনের প্রত্যাশা এখানে মূর্তি পেয়েছে প্রায় পরমের মহিমায়—পাওয়ার অসম্ভাব্যতাই মিলনের সম্ভাবনাকে একইসাথে সুদূর এবং সে কারণেই আকর্ষণীয় করেছে।

এ ধরনের বেশ কিছু উচ্চারণ ও উপলব্ধির গাঢ়তা সত্ত্বেও কবিতাগুলোকে ঠিক প্রেমের কবিতা হিসাবে পড়তে মনের সায় কমই পাওয়ার কথা। কারণ, শরীর ও মনের সৌন্দর্য তো নয়ই, এমনকি বিরহকাতর আবেগও নয়, কবিতাগুলোতে আগাগোড়া বড় হয়ে উঠেছে পরিস্রুত মননশীল উপলব্ধি। সূক্ষ্মভাবে নিজেকে আর নিজের উপলব্ধিকে প্রকাশের বাসনা এখানে যতটা প্রবল, শুধু দেখা বা দেখানোর আয়োজন ততটা নয়। এ থেকেই হয়তো, কবি পৌঁছেছেন এক দার্শনিক উপলব্ধিতে—ভাষা শেষ পর্যন্ত আগে বলা হয় নি এমন কথা প্রকাশে খুব একটা সমর্থ নয়। ভাষার ছাঁকনিতে বাদ পড়া কথারাই বলার কথা; কিন্তু আবার ভাষার আশপাশটায় ছটফটানো ছাড়া যোগাযোগের ব্যাকুলতা প্রকাশের উপায়ই-বা আর কোথায়—এরকম ভাব বেশ কয়েকবারই প্রকাশ পেয়েছে কবিতাগুলোতে। ৪, ১৩, ১৫, ১৮ ইত্যাদি বেশ কয়েকটি কবিতায় যোগ-স্থাপনের ব্যর্থতা ভাষার স্বভাব হিসাবে বিবৃত হয়েছে। আর যে ভাব প্রকাশে ভাষার এই ব্যর্থতা, ভাষাই আবার তার বাহন হয়েছে। বলা যায়, ভাষার সক্ষমতাকে চাপে ফেলে দেওয়া ভাষাই কবিতাগুলোর অন্যতম প্রধান ঐশ্বর্য।

সেই ঐশ্বর্যের তালাশে অন্য অনেক কবির মতো হাসান রোবায়েতকেও প্রস্তাব করতে হয়েছে নিজের প্রকাশভঙ্গি। জুতা, ভেড়া, জামা, নদী, পথ, হাওয়া বা কারবালার পরিচিত অনুষঙ্গগুলো বিচিত্র বিন্যাসে নতুন কথা ও অর্থের জোগান দিয়ে পাঠককে আশ্বস্ত করেছে এই মর্মে যে, কবিতা শেষ পর্যন্ত ভাষার প্রচলিত অর্থকাঠামোকে চাপে ফেলেই নিজের পথ তৈরি করে নেয়। কোনো সন্দেহ নাই, মাধুডাঙাতীরে কাব্যে এদিক থেকে সাফল্যের যথেষ্ট নজির আছে।

যতদূর মনে করতে পারছি, এ কাব্যের বিশ মাত্রার চলন—যার দশ মাত্রা আবার বিন্যস্ত হয়েছে চার-ছয়, ছয়-চার, অথবা আট-দুয়ের চালে, বেশ নতুন ব্যাপার। এ ধরনের পুনরাবৃত্ত উচ্চারণের মধ্যে একটা একসুরো তান থাকে। কখনো কখনো হয়তো এ আক্ষেপও জাগে, কোনো কথাই কি অন্য সুরে-স্বরে-ছন্দে বলার দরকার হয় নি? কিন্তু উল্লেখযোগ্য পরিমিতি বজায় রেখে এক তালে কবিতাগুলো পড়তে বাধ্য করা, আর বৈচিত্র্যকে এক জরুরি ঐক্যে সমর্পিত করার সাফল্য হয়তো গভীরতর আবেশ তৈরি করে পাঠকের মনে। ‘মাধুডাঙাতীরে’ কাব্যটি বিরল ধরনের পরিপূর্ণতার আস্বাদ জোগায়—এ-ও নিশ্চয়ই কম কিছু নয়।


মূল পাতার লিংক : পরস্পর ঈদ আয়োজন ২০২০
Mohammad Aza

মোহাম্মদ আজম

জন্ম ২৩ আগস্ট ১৯৭৫, হাতিয়া, নোয়াখালী। এম এ বাংলা, ঢাবি, পিএইচ ডি, ঢাবি। সহযোগী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, ঢাবি।

প্রকাশিত বই :
বাংলা ভাষার উপনিবেশায়ন ও রবীন্দ্রনাথ [আদর্শ, ঢাকা, ২০১৪]

ই-মেইল : mazambangla1975@gmail.com
Mohammad Aza