হোম বই নিয়ে মমি উপত্যকা : একটি দ্রুতরেখ আলোচনা

মমি উপত্যকা : একটি দ্রুতরেখ আলোচনা

মমি উপত্যকা : একটি দ্রুতরেখ আলোচনা
219
0

ক.
মুজিব মেহদীর প্রথম কবিতাগ্রন্থ মমি উপত্যকা নিয়ে আলোচনা করছি নিজের প্রণোদনা থেকেই। তা হলে অন্য আলোচনাগুলোয় কি আমার আগ্রহ ছিল না? আসলে আমার এই ধরনের বিপুল-অধিকাংশ রচনা সম্পাদকদের তাগাদারই ফল। কিন্তু অনেক দিন পর নিজের ইচ্ছায় একটা বই নিয়ে লিখতে বসতে পেরে সুখ হচ্ছে, দায়িত্বশীলতার আনন্দদায়ক চাপও অনুভব করছি। তবে এই কবির প্রথম বই বেছে নেয়ার কারণ, এটা পাঠ করে আমি বুঝতে চাই তার প্রস্তুতিটি কেমন, কবিতা সম্পর্কে কী তার প্রতীতি; কবি হিসেবে তার অভিপ্রায় কতটা প্রসারিত ও সংকীর্ণ, কবিতার জন্য জীবন ও জগতের কোন অংশ নিয়েছেন ও বাদ দিয়েছেন ইত্যাদি। পৃথিবীর প্রায় সব ভাষার সব কবির প্রথম সংকলনে এটা কম-বেশি মেলে, কিন্তু মুজিবের ব্যাপারটা আমার কাছে তার কবিতানুশীলনের শুরু থেকেই বিশেষ কিছু বলে মনে হয়েছে।


বাস্তবতা ও যুক্তির শৃঙ্খলা মুজিব গ্রাহ্য করেন। এটা তার এমন এক অনুশীলন, যাতে ব্যক্তির স্থানিকতা ও মানবসম্পর্কের একটা প্রতিভাস সৃষ্টি হয়েছে।


খ.
মমি উপত্যকা তিন ভাগে বিভক্ত। তিনটি উপশিরোনামে : ‘অতর্কিত এক অভীপ্সা’, ‘অসমাপিকাক্লান্ত দ্রুতযান’ ও ‘মনে পড়ে জামুরিন নদী’। আয়তনে প্রথম দুটি অংশ কাছাকাছি, তৃতীয়টি লক্ষণীয় রকমের ছোট। আমরা একে গ্রন্থটির উপসংহার হিসেবে ধরে নিতে পারি। সে-কথা পরে হোক। প্রথম দুটি অংশের মধ্যে প্রতিপাদ্য ও আঙ্গিক বা উপস্থাপনাগত পার্থক্য রয়েছে। দৃশ্যগ্রাহ্য ভিন্নতাই বেশি। এত যে, মনে হয়েছে, এই দুটি উপশিরোনামে ভাগ না-করলেও বুঝতে সমস্যা হতো না যে, বিষয়-চিন্তার দিক থেকে উভয় অংশের মধ্যে দূরত্ব ও পার্থক্য আছে। তা থাকুক বা না থাকুক, একটা মজা তো হলো! শুধু কি এটাই? কোনও ‘অভীপ্সা’ই হঠাৎ-কিছু নয়, কিন্তু মুজিব এতে সঞ্চার করেছেন আকস্মিকতা; ‘অতর্কিত’ শব্দটিও বেশ নতুনত্ব পেয়ে যায় অর্থ ও সৌন্দর্যে, ‘অভীপ্সা’র পাশে এসে, আর এটিও তো আনকোরা হয়ে উঠল, [(যেন) ব্র্যাকেটে থাকুক এই আলংকারিক শব্দ, আলোচনায় এগুলো দূষণ ঘটায়] বলা যায়, এইমাত্র কবিতার জন্যে এর উত্থাপন হলো। ‘অসমাপিকাক্লান্ত দ্রুতযান’ও বিরোধাভাসসৃষ্ট নতুন অর্থ ও সৌন্দর্য হাজির করেছে। এই ক্রীড়ামত্ততা মমি উপত্যকার সাধারণ একটি বৈশিষ্ট্য। এটি বাঙলা ভাষার কবিতায় বিরল কিছু নয়; তবে মুজিব এতেও নিজস্বতা তৈরি করে নিয়েছেন। শুধু আলংকারিক প্রয়োগে প্রথাগত কবিরা সন্তুষ্ট থাকেন এবং তাদের কাজ এখানেই শেষ হয়ে যায়; কিন্তু মমি উপত্যকায় আরও কিছু সম্পন্ন করা হয়েছে : একটা মায়াময় প্রতিভাসের জগৎ যা বাস্তবতা ও যুক্তির শৃঙ্খলাকে অস্বীকার করে না, বরং গ্রহণ করে নির্বাচনমূলক (সত্তাধারণায়) অনুশীলনের মধ্য দিয়ে।

গ.
এই জগৎ প্রধানত মুজিবের ভাষারই দান। আমরা একে ধরে নিতে পারি এমন এক অধিভাষা বলে, যাতে সমাজের সঙ্গে ব্যক্তির সংঘর্ষ টের পাওয়া যাচ্ছে, যেখান থেকে একটা প্রতিপৃথিবীর জন্ম হচ্ছে। একটা সমান্তরাল জগৎ কিংবা চেতনাবিশ্ব সব উচ্চাভিলাষী কবির কাম্য, কিন্তু মমি উপত্যকা প্রস্তাব করছে এমন এক প্রতিপৃথিবীর, যেখানে ব্যক্তির স্থানিক অবস্থান, প্রকৃতি ও মানবসম্পর্কের সত্যগুলো আবিষ্কার কিংবা সন্ধানযোগ্য চেহারায় উদ্বোধিত হয়েছে।

যতদিকে যত ছিল প্রেম-ট্রেম ছিঁড়েখুড়ে পকেটে গুটিয়ে নিয়ে মুখ ধুয়ে শুরু
                                                                                    হলো যাতায়াত

কেননা ভ্রমণে আমার দারুণ মনোটান ছিল—যুবক স্বভাবে ঘোর ছন্নছাড়াপনা
                                                            তদুপরি চাকা
সেই থেকে ঠিকানাবিহীন ঘুরে আমেরিকা শেষ হলে অতলান্ত পাড়ি দিয়ে
                                           সহসাই বাড়ি ফিরে আসি
নিজ হাতে গুছাই বিছানা আর দুইজনে ক্লান্ত হয়ে সারারাত চিকচিক বালিময়
মুখ গুঁজে থাকি—

স্ত্রী যদি জিজ্ঞাসে ফের— বলব যে : পৃথিবী ও সুখাসুখ গোলাকার—এই কথা
              বারেবারে প্রমাণ দিতেছি
(পৃ. ১৫)

আগেই বলা হয়েছে বাস্তবতা ও যুক্তির শৃঙ্খলা মুজিব গ্রাহ্য করেন। এটা তার এমন এক অনুশীলন, যাতে ব্যক্তির স্থানিকতা ও মানবসম্পর্কের একটা প্রতিভাস সৃষ্টি হয়েছে। তা পারিপার্শ্বিক জগৎ কিংবা সমাজকাঠামোর সঙ্গে ব্যক্তিসত্তার সংঘর্ষে স্পন্দমান। ‘প্রেম-ট্রেম ছিঁড়েখুড়ে’ ভ্রমণের পর ‘দুইজনে ক্লান্ত হয়ে’ ‘মুখ গুঁজে’ থাকার মধ্যে এটা বুঝে নিতে পারা যায়। এই ভ্রমণের যৌক্তিকতাও কবিতায় স্পষ্ট; তবে তা চেষ্টাহীনভাবে পরিহাসময়। অধিকন্তু, আকৃতির ধারণা প্রমাণে ‘পৃথিবী’র সঙ্গে ‘সুখাসুখ’ জুড়ে দিয়ে কবিতাটিকে তিনি অধিবিদ্যার স্তরে নিয়ে গেছেন। এই ধরনের উপসংহার মমি উপত্যকার বিশেষ প্রান্ত, এটি হয়তো মুজিবের নিজস্বতা প্রকাশের একটা উপায়। ‘অতর্কিত এক অভীপ্সা’র শুরুতে বহির্পৃথিবীর চাপে ব্যক্তির যে-অস্থিরতা, সেটি শমিত হয়ে এসেছে।

আমরা যা গাই তা পাখিদেরই গান
স্বপ্ন দেখতে দেখতে যে-প্রভাতে প্রতিদিন জাগি তা পাখিদেরই ভোর
পৃথিবীতে পুরোহিত তারা আজও—ঊষা ও গোধূলির
(পৃ. ২৫)

প্রতিপৃথিবীর রূপরেখাটি এইভাবে প্রণয়ন করা হয়েছে। এ-কবিতায় এর আগে সংশয়াকুল (আধুনিকের নয়) প্রস্তাবের ঢংয়ে বলা হয়েছে, ‘পাখিদের তবে নীড় হতে পারে না কি মানুষের মন’। যাতে রোমান্টিকতা ও মরমিপনা জড়াজড়ি করে আছে।

ঘ.
‘অসমাপিকাক্লান্ত দ্রুতযান’ বিষয় ও প্রকাশকৌশলে (ভাষা বাদ দিয়ে) আগের পর্ব থেকে আলাদা। মরমিপনা বেশ আছে, রোমান্টিকের কিছু লক্ষণও; তবে বাস্তবতাবোধই কবিকে এই পর্বে বেশি নিয়ন্ত্রণ করেছে। করলেও, দেখা যায়, এই নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্তির সাধনা কিংবা একে আড়ালে রাখার চেষ্টা তিনি করেছেন। এই অনুশীলন তাঁকে কবিতার উপস্থাপনরীতিতে পরিবর্তন আনতে বাধ্য অথবা প্ররোচিত করেছে। দৃশ্যগত আঙ্গিক থেকে কাব্যিকতা সরিয়ে দেয়ার ব্যাপারটি সে-সাক্ষ্যই দিচ্ছে। উপসংহার বা সিদ্ধান্তের প্ররোচনা এই পর্বেও মান্য হয়েছে। মনে হয়েছে, মুজিব মেহদীর ঝোঁক মরমিবাদের দিকেই, হেঁয়ালিপূর্ণ সংশয়ের পর পরমের খোঁজ তিনি করবেনই। ‘পাপ’, ‘প্রভু’, ‘সত্য’ ইত্যাদি ভাববাচক শব্দ তিনি বেশ ব্যবহার করছেন, তবে তা যে প্রচলিত অর্থে নয়, সেটি বোঝা যায় এই কবিতাংশ দু’টি পাঠ করলে :

স্বর্গে ফ্রি সেক্স থাকছে কি থাকছে না এ তর্কে সে কেমন নিস্পৃহ, বরং এখন
ক্ষুধাটা সত্য, আর সত্যটা সত্য রবে যত তুচ্ছ ও দীর্ঘ হোক আমাদের বাচাল
জীবন (পৃ. ৪৩)

প্রভুর করাঙ্গুলি ছুঁয়ে বলি, ও আমার প্রণয়-এষণা, একুনে একবার দৃষ্টি পেতেছি
মানবীর দেহে, তার স্থাপনা সজ্জায় (পৃ. ৪৬)

দেখা যাচ্ছে ‘স্বর্গ’, ‘প্রভু’ এই ধারণাগুলো মমি উপত্যকায় প্রথাগত নয়; বরং এইসব অনুষঙ্গ বিমূর্ততা থেকে প্রামাণ্য স্তরে উত্তরণের একটা অভিপ্রায় নিয়ে দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। ফলে ‘প্রভুর করাঙ্গুলি’ ইন্দ্রিয়াতীত থাকছে না।


মমি উপত্যকা শেষ পর্যন্ত সৃষ্টি করেছে একটা কাব্যিক ধাঁধার জগৎ, যেখানে জীবন ও শিল্পকলার প্রায় সব প্রত্যয় একসঙ্গে উপস্থিত হয়েছে। 


ঙ.
‘মনে পড়ে জামুরিন নদী’ পর্বে কবিতাকাঠামোর বদল ঘটল। প্রলম্বিত ও ব্যাঘাতহীন গদ্য থেকে হ্রস্ব ও অপ্রলম্বিত চরণ, তার বিন্যাসে নৈয়ায়িকতা রক্ষার অনুশীলন এতে খুব স্পষ্ট। সাংকেতিকতা, অসংবৃত সমাপ্তি, নৈঃশব্দ্যের মধ্যে বক্তব্য রেখে যাওয়া ইত্যাদির চর্চাও দেখা যাচ্ছে। ভাষার সংগঠন এড়ানো বা অস্বীকার কিংবা লঙ্ঘনের যে বেপরোয়াপনা দেখা গেছে আগের পর্বে, এই অংশে তা শমিত। প্রথম কাব্যাংশটিকে যদি আমরা থিসিস ধরি, তবে দ্বিতীয়টি অ্যান্টিথিসিস এবং শেষেরটি সিনথিসিস। আলোচ্য কবিতাগ্রন্থের বিষয় ও আঙ্গিকে এই সমীকরণটি মিলিয়ে দেখা যেতে পারে। এত তত্ত্বফত্ত্ব আর বিস্তৃতির মধ্যে না গিয়ে, কেবল এই পর্বের কবিতায় কী আছে, দেখা যাক :

আমরা নদীর শিশু
আমরাও বদলাব
অভিযোজনের রীতি মেনে-টেনে
প্রচণ্ড অথচ প্রেমময়
(পৃ. ৫৭)

বদলে যাওয়ার এই যে নৈয়ায়িক পরম্পরা ও প্রক্রিয়া, এটা মমি উপত্যকার কোনও কবিতাকে ছেড়ে গেছে বলে মনে হয় নি। ফলে একটা প্রসঙ্গ ও প্রশ্ন এই গ্রন্থ পাঠকালে বারবার জেগে ওঠে : মরমিপনা, যৌক্তিক দৃষ্টবাদ, ভাববাদ, বস্তুবাদী মন, রোমান্টিসিজম এই সব পরস্পরবিরোধী প্রত্যয় ও বিষয়আশয়ের সমাবেশ ঘটলে পাঠকের মনে যে দ্বিধা-জটিলতা দেখা দেবে এই কবিতাগ্রন্থ সম্পর্কে ব্যাখ্যা-বিবেচনায় এবং একে চিহ্নিত করার ব্যাপারে, তার সুরাহা কেমন করে সম্ভব?

চ.
মমি উপত্যকা শেষ পর্যন্ত সৃষ্টি করেছে একটা কাব্যিক ধাঁধার জগৎ, যেখানে জীবন ও শিল্পকলার প্রায় সব প্রত্যয় একসঙ্গে উপস্থিত হয়েছে। ভাষায় একটা আপেক্ষিকতা এতে প্রণীত হয়েছে, যাতে যে-কোনও দরজা দিয়ে কবিতার মধ্যে আমরা যে-যার মতো করে ঢুকে পড়তে পারি। অধিকন্তু পরিত্যক্ত, নতুন, সমকালীন ও অব্যবহৃত ভাষার এককের সমাবেশ ঘটিয়ে কবি তৈরি করতে চেয়েছেন ভবিষ্যতের ভাষা; অথবা কবিতার ভাষা বলতে একেই বোঝানোর প্রয়াস করা হয়েছে। উচ্চাভিলাষী কবিরা এই কাজ করবেনই। চাইবেন, পাঠক একটা সুখকর বিভ্রান্তির মধ্যে তার সময়টা উদ্‌যাপন করুক। মমি উপত্যকায় তা করা গেছে বলে মনে হয়। ফলে এও বোধ হয়, কোনও কবির প্রথম কবিতাসংকলন হিসেবে বইটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ ও শিক্ষণীয়। ঈর্ষা আর আলোচনার বিষয়ও বটে।

চঞ্চল আশরাফ

চঞ্চল আশরাফ

জন্ম ১২ জানুয়ারি, ১৯৬৯; দাগনভুইয়া, ফেনী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে সম্মানসহ স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। পেশা : সাংবাদিকতা।

প্রকাশিত বই :
কবিতাগ্রন্থ : চোখ নেই দৃশ্য নেই (১৯৯৩), অসমাপ্ত শিরদাঁড়া (১৯৯৬), ও-মুদ্রা রহস্যে মেশে (২০০২), গোপনতাকামী আগুনের প্রকাশ্য রেখাগুলো (২০০৮), খুব গান হলো, চলো (২০১৩)।

উপন্যাস : কোনো এক গহ্বর থেকে (১৯৯৭), যে মৎস্যনারী (২০১১)।

গল্পগ্রন্থ : শূন্যতার বিরুদ্ধে মানুষের জয়ধ্বনি (১৯৯৯), সেই স্বপ্ন, যেখানে মানুষের মৃত্যু ঘটে (২০০৭), কোথাও না অথচ সবখানে (২০১৩)।

স্মৃতিগ্রন্থ : আমার হুমায়ুন আজাদ (২০১০)।
প্রবন্ধগ্রন্থ : কবিতার সৌন্দর্য ও অন্যান্য বিবেচনা (২০১১)

ই-মেইল : chanchalpoetry@gmail.com
চঞ্চল আশরাফ