হোম বই নিয়ে বীজপুরুষ : ভিন্ন গল্পভাষার স্বাদ-আস্বাদ

বীজপুরুষ : ভিন্ন গল্পভাষার স্বাদ-আস্বাদ

বীজপুরুষ : ভিন্ন গল্পভাষার স্বাদ-আস্বাদ
233
0

যাপিত জীবনে বেশ কিছু পড়াশোনা করে ফেললাম। আসলে পড়াশোনার জন্য যে সময় দরকার সে-সময়টুকু সবসময় পাওয়া যায় না। কোনো বই পড়ে দুকথা বলা বা লেখার বিষয় হলে পাঠককে অনেকখানি সতর্ক হতে হয়। থাক এসব ভণিতার কথা। আসা যাক পড়াশোনার কথায়, পাঠ প্রতিক্রিয়ার কথায়। বেশ কয়েক মাস হাতের কাছে ঘুরঘুর করছিল যে বইটা তা হলো ইশরাত তানিয়ার বীজপুরুষ। এটি তার প্রথম গল্পগ্রন্থ। বিগত মাস তিনেক ধরে গল্পগুলো ঠুকরে ঠুকরে পড়েছি। বোঝা যায়, পেশায় অধ্যাপক এই লেখক সাহিত্য সচেতন এবং সাহিত্য পরিমণ্ডলে বিরাজমান। আলোচ্য গল্পগ্রন্থে সর্বমোট ষোলোটি গল্প সন্নিবেশিত হয়েছে। প্রতিটি গল্পের প্লট যেমন আলাদা তেমনি বেশ কিছু গল্পের নির্মাণও অন্যরকম। এর ফলে এক গল্পের সাথে অন্য গল্প মিলেমিশে যায় নি।


বেশ কিছু গল্প সঙ্কলনকে পুষ্ট করেছে, যাতে ইশরাত তানিয়ার নিজস্ব জীবনবোধ দর্শন ও সমাজ অভীক্ষা খুব স্পষ্টভাবে ধরা দিয়েছে।


প্রথমে নামগল্প বীজপুরুষের আলোচনা করা যাক। গল্পে নীলুফার নামে একটি মেয়ে প্রধান চরিত্র হিশেবে উঠে এসেছে। মাতৃহীন এবং সন্তানহীন। মূলত সন্তানহীনতার কারণে স্বামী আমিনুল তাকে বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছে। সন্তানহীনতার কারণে কোনো মেয়ের বাপের বাড়িতে ফেরত আসা বড় লজ্জার। মা না থাকায় সেই শূন্যস্থান পূরণের অনেকখানি দায় বর্তায় চাচি আয়েশার ওপর। হয়তো বাড়ির মেয়ের ওপর দুষ্টু জিন-পরি, ভুত-প্রেত কিংবা কোনো অপদেবতার ‘আসর’ হয়েছে। এই অতলান্ত ভাবনায় আয়েশার স্বপ্নযোগ ঘটে নীলুফারের মায়ের সাথে। স্বপ্নাদেশ পায় আয়েশা বাক্সের মধ্যেই অপদেবতাগুলো আটকানো যাবে আর নীলুফার সন্তানবতী হবে। কারিগর মহানিম গাছের নিচে বসে যে অত্যাশ্চর্য বাক্স বানাচ্ছে তা কী রকম? শোনা যাক ইশরাত তানিয়ার বয়ানে : ‘কাঠের ওপর ফুল-পাতা-কলকার নকশা করে কারিগর বাক্স বানায় একটা উদ্দেশ্য নিয়ে। সরল মনে বাক্সের বাইরের চারদিকের অংশে একের পর এক চৌকোনা আর ত্রিভুজাকৃতির জটিল নকশা ফুটায় সে। জ্যামিতিক নকশা ছাড়াও চৈত্র-সংক্রান্তির মেলা, চন্দ্র-সূর্য, ময়ূরপঙ্খি নৌকা, ফসলের ক্ষেত, ছেলের হাতে নাটাই-ঘুড়ি এবং আরও নানান রকম বৈচিত্র্যময় সূক্ষ্ম চিত্র তৈরি করে কাঠ খোদাই করে।’

স্বপ্ন দেখার পর একটা মুরগি সদকা দেয় আয়েশা। বাক্স হাতে পেলে মসজিদে পাঁচ টাকার শিরনিও মানত আছে। এখানে বোঝা যায়, ভাসুরের মেয়ের জন্য আয়েশার সত্যিকারের মা হয়ে ওঠার কাহিনি আর বাক্স ঘিরে নীলুফারের স্বপ্ন রচনা হয় স্বামী সন্তান নিয়ে সত্যিকারের নারী হয়ে ওঠার। সেই আবেশে সে গুনগুন করে গান গায়—

আমার বন্ধু বিনে নিশি নির্ঘুম, ওলো সই
ঘর জ্বালানি, পর ভুলানি বন্ধু আমার কই—
সোনার নাও পিতলের বৈঠা দিব বন্ধুয়ারে
ওগো পাষাণে সঁপিয়া মোর প্রাণ যায় রে।

অবশেষে বাক্স হাতে পেয়ে নীলুফারের মনে হয় এ এক জাদুবাক্স। নকশাগুলোও যেন জীবন্ত। মায়াময় জোছনায় কারিগরের এই বাক্স ঘিরেই তার সমস্ত সুখস্বপ্ন আবর্তিত হয়। গল্পটি শেষ হয় এভাবে : ‘ফের ক্লান্ত হয় তার চেতনা। সারা শরীর ভারি হয়ে আসে। এই প্রথম নীলুফারের গা গুলিয়ে ওঠে। মুক্ত স্তন জোড়া স্ফীত হয়ে ভরে ওঠে দুধের স্রোতে। নীলুফারের মনে হয় তার ভেতর ভ্রূণসঞ্চার হয়েছে। সে সমাচ্ছন্ন হয়ে যায় অজাতকের স্নেহস্পর্শে। ঝাপসা চোখে নীলুফার তাকায়। বহুদূরে ধোঁয়াটে নীল অন্ধকারে।’

‘প্যান্ডোরার বাক্স’-এর ঠিক বিপরীত অবস্থানে বীজপুরুষ গল্পের নির্মাণ। প্যান্ডোরার বাক্সের মধ্যে পৃথিবীর সমস্ত দুঃখ যন্ত্রণাকে তালাবন্দি করে রাখা হয়েছিল। আর এ গল্পের বাক্সে নিহিত নীলুফারের সুখ শান্তি আর পূর্ণাঙ্গ নারী হয়ে ওঠার, নারীর মা হয়ে ওঠার স্বপ্ন।

এ আলোচনায় সমস্ত গল্প নিয়ে কাটাছেঁড়া সম্ভব নয়। উদ্দেশ্যও নয় আমার। শুধু পাঠককে ইশরাত তানিয়ার গল্পের ক্ষেত্রগুলি একটু চিনিয়ে দেওয়া। তবে এটা ঠিক যে সব গল্প যেমন গদ্য নয় তেমনি সব গদ্য গল্প নয়। এই পার্থক্য বা ভেদরেখা যখন গুলিয়ে যায় তখন গল্প ও গদ্য বিষয়ে সমস্যা তৈরি হয়। এ আলোচনায় প্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে ‘থার্ড আম্পায়ার’ গল্পটি। আত্মকথনের এ গল্প একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের চিত্রপট মনে করিয়ে দেয়। এ গল্পের জন্য সঙ্গতকারণে ঋণ স্বীকার করেছেন নীলিমা ইব্রাহীম ও জাহানারা ইমামের কাছে।

বেশ কিছু গল্প সঙ্কলনকে পুষ্ট করেছে, যাতে ইশরাত তানিয়ার নিজস্ব জীবনবোধ দর্শন ও সমাজ অভীক্ষা খুব স্পষ্টভাবে ধরা দিয়েছে। যেমন : ‘আস্তাবলে কুহক’ আয়তনে ছোট, কিছু আমাদের দৈনন্দিন চেনা চেনা ছবি কথনের জাদুতে মায়াময় অনুভূতির সৃষ্টি করে। খুব টান টান উত্তেজনাময় গল্প ‘বর্তমান অবর্তমানে’। রেললাইন পেরুতে না পেরে তার মাঝখানে শুয়ে পড়া মানুষের বেঁচে ফেরার গল্প নাবিলাকে দেখে নতুন করে মনে পড়ায় আমাদের। আর প্রজাপতি নাবিলার জীবনে প্রতীক হয়ে ওঠে। নাবিলা আবার রঙিন জীবনে শব্দে গন্ধে নিজেকে খুঁজে পায়। সে তুলনায় গ্রামজীবনের অতি বাস্তবতার গল্প উঠে এসেছে ‘অমৃতস্যবয়ান’ গল্পে। কত অবলীলায় গ্রাম্যবধূ জমিলা স্বামী আতাহারকে শোবার বিছানায় বলতে পারে—‘আদর দিবা না?’ এই আতাহার জমিলা বুক দিয়ে মানুষ করে তাদের মেয়ে পরীকে। কিন্তু গ্রাম্যসমাজ মেয়েদের বিপন্নতার কথা আজও সমান সত্য। সত্য গ্রামের অর্থবান ও ক্ষমতাবান মানুষের প্রবল প্রতিপত্তির কথাও। যে কারণে পরীর মতো উঠতি বয়সের মেয়েদের অহরহ পাট ক্ষেতে কিংবা জলজঙ্গলে ধর্ষিতা হতে হয়। উল্টো আতাহারের বিরুদ্ধে নালিশ হয় তার গরু লম্পট জহিরের বাপের জমির বেড়া নাকি ভেঙেছে। এই অবিচারের কোথাও মীমাংসা হয় না। মনের দুঃখে ও ক্ষোভে মেয়ে পরীর হাত ধরে গৃহত্যাগী হয় আতাহার। মেয়েসহ আত্মঘাতী হয়। এ গল্প কিছুটা শরৎচন্দ্রের ‘মহেশ’ গল্পের পরিণতিকে মনে করায়।


ইশরাত তানিয়ার গদ্যের ভাষা ঈর্ষণীয়ভাবে সাবলীল। এক ধরনের মুগ্ধতা রয়েছে, যে মুগ্ধতায় পাঠক পাতার পর পাতা এগিয়ে যেতে পারেন। 


‘পদ্মবীজ ও কৃষ্ণ গহ্বর’ গল্পটির মধ্যে প্রবাসী বাঙালি চিত্রায়িত হয়েছে। এখানে অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন শহর তার আবহাওয়া ভূপ্রকৃতি রাস্তাঘাট প্রভৃতির সঙ্গে যেমন পরিচিত হই তেমনি রুটি, ডাল, তরকারি প্রভৃতি আমাদের বাঙালি খাদ্য খোরাকিকেও খুঁজে পাই। আসলে বাঙালি সেখানেই যাক না কেন শেষমেষ বাঙালিই থেকে যায়। ব্যাক ইয়ার্ডে তাই দেখি চাচার সবজি খেতের লাউয়ের মাচা, ঝিঙের মাচা, মরিচ গাছ আর পেয়ারা আম গাছের সমাহার। দেখি শামীমের পঞ্চাশোর্ধ হবু শাশুড়ির ‘ন্যাচারোপ্যাথি’র চিকিৎসায় ভেষজ চিকিৎসার নানান দেশীয় উপাদানের সমাহার। এই ন্যাচারোপ্যাথিতে কি ফিরে পাওয়া যায় দৃষ্টিশক্তি? ভালো লাগে গল্পের একেবারে অন্তিম পর্যায়ে কবিতার চরণগুলি—

পাপড়ি তুলে নাও, জন্মান্তর হে
পদ্মবীজ ঝরাও তোমার চোখে
আমার পদ্মরেণু তোমার চোখ ছুঁল
দুটো কৃষ্ণ গহ্বরে উড়ল জল জোনাকি।

অন্যান্য গল্প ‘ঋতু বৈচিত্র্যময়’ ‘ব্লকড আনব্লকড’ ‘সোয়েটার’ ‘সুন্দরীর রাজ্য’ পড়ার পরও ‘তারা ও মীনরাশির জাতক’ গল্পে মন আটকে থাকে। তারাকে নিয়ে তৈরি হয় মিথ। গাঁয়ের মানুষ কোনো কিছুর ব্যাখ্যার চেয়ে বিশ্বাসেই আবদ্ধ থাকতে ভালোবাসে। যে বিশ্বাসে কিশোর আকবর আলী তার দাদাজানের কাছে পেয়ে যায় মাছ মারার গুপ্ত মন্ত্র। কী সেই মন্ত্র, যা উচ্চারণ করলে জলের মাছ ডাঙ্গায় উঠে আসে—

শ্মশানের মাটি লই হাতেতে করিয়া,
বিসমিল্লা কইরা দেই পানিতে ফেলাইয়া।
যেখানে আছে মাছ, আনহো ডাকিয়া
মাটি পালাহ মাটিশ্বর আছেইন বসিয়া।

আরো আছে মাছমারা বা মাছ ধরার অনেক তুকতাক লোক বিশ্বাস, দোয়া কালাম যাতে কিনা মাছ আপন-আপনি বড়শির টোপ অনায়াসে গিলে ফেলে। ইশরাত তানিয়া এই গল্পে এমন সব নানান কথা কথকতার সন্ধান দিয়েছে।

শেষমেষ ফিরে আসি গোড়ার কথায়, গল্প ও গদ্যের কথায়। ইশরাত তানিয়ার গদ্যের ভাষা ঈর্ষণীয়ভাবে সাবলীল। এক ধরনের মুগ্ধতা রয়েছে, যে মুগ্ধতায় পাঠক পাতার পর পাতা এগিয়ে যেতে পারেন। বীজপুরুষ পড়ে কেবল কিছু লেখক-তুষ্টির কথা না বলে বরং যা বলা একান্ত জরুরি তা হলো গদ্যের ভাষা বা বর্ণনার মধ্যে মূল গল্প যেন হারিয়ে না যায়। চরিত্র যেন অবহেলিত না থাকে। চরিত্র চিত্রিত করাই হলো একজন কথাসাহিত্যিকের প্রধান কাজ। চরিত্রের সঙ্গে মিশে থাকে আমাদের সমাজজীবন ও তার নানান সঙ্গ অনুষঙ্গ। কয়েকটি গল্পের ক্ষেত্রে চরিত্র ও গল্পের বিষয় অবহেলিত হয়েছে আর প্রধান হয়ে উঠেছে গদ্যভাষা। আমার বিশ্বাস, নিশ্চয় ইশরাত তানিয়া নিজে তা বুঝবেন। আগামী দিনে তার কাছ থেকে আরো অনেক জীবনদায়ী গল্পের প্রত্যাশা রইল। আমার বিশ্বাস, তিনি তা পারবেন তার ভিন্ন গল্পভাষার মাধ্যমে।


[বীজপুরুষ—ইশরাত তানিয়া—প্রকাশক : দেশ পাবলিকেশন্স—প্রকাশকাল : ফেব্রুয়ারি ২০১৮—প্রচ্ছদ : মাসুক হেলাল—মুদ্রিত মূল্য : ২৪০ টাকা মাত্র।]

আনসারউদ্দিন

জন্ম ১৯৫৯; শালিগ্রাম, নাকাশিপাড়া, নদীয়া।

শিক্ষা : স্নাতক।

পেশা : প্রান্তিক কৃষক।

প্রকাশিত বই—

আনসারউদ্দিনের গল্প [ধ্রুবপদ, ১৯৯৪]
আনসারউদ্দিনের ছোটগল্প [প্রতিক্ষণ, ১৯৯৮]
আনসারউদ্দিনের গল্পসমগ্র [২০০৩]
গৈ-গেরামের পাঁচালি [গাংচিল, ২০০৬]
শোকতাপের কথামালা [ধ্রুবপদ, ২০১৪]
গো-রাখালের কথকতা [অভিযান, ২০১৫]
মাটির মানুষ মাঠের মানুষ [অভিযান, ২০১৬]
গনি চাচার খেত খামার [অভিযান, ২০১৭]
জনমুনিষ [অভিযান, ২০১৮]
গ্রামজীবনের সাতকাহন [ধ্রুবপদ, ২০১৮]
জীবনের কথা যাপনের কথা [অভিযান, ২০১৯]

স্বীকৃতি—

সোমেন চন্দ পুরস্কার, পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি, ২০০৩

ই-মেইল : answaruddin57@gmail.com