হোম বই নিয়ে বিহ্বল করা গল্পের কাহিনিগমক

বিহ্বল করা গল্পের কাহিনিগমক

বিহ্বল করা গল্পের কাহিনিগমক
1.36K
0

বলে নেয়া ভালো, আমি গল্পের মানুষ নই। এই লেখা, অপরাপর পাঠকের সাথে পাঠ অভিজ্ঞতা মিলিয়ে নেবার প্রচেষ্টা হিশেবে ধরে নেয়া যায়।

বইমেলা ২০১৮-তে গল্পকার মহিউদ্দীন আহ্‌মেদের শাদা শাদা মেঘ খণ্ড খণ্ড প্রেম গল্পগ্রন্থটিতে ১২টি গল্প ঠাঁই পেয়েছে। এ সুযোগে জেনে নেয়া যাক গল্পের নামগুলিও—‘সাঁকো’, ‘হাস্যরসাত্মক গল্প লেখার কৌশল’, ‘চাল ডাল লবণ তেল ও ধর্মাচার’, ‘তেলাপোকা’, ‘৫৭৭ টাকা’, ‘ফেসবুক লাইভ’, ‘বংশের বাতি’, ‘একটি পুরনো চিঠি’, ‘যাদেরকে মেরে ফেলেছি’, ‘শাদা শাদা মেঘ খণ্ড খণ্ড প্রেম’, ‘বাচ্চাটি আমার কেউ না’ এবং ‘যদি সেনাবাহিনীর প্রধান হতাম’। প্রতিটা গল্পের শেষে লেখার সময়কাল উল্লেখ আছে, সে হিশেবে সবচেয়ে পুরনো লেখা ১৯৯৮ সালের, সর্বনয়া ২০১৭। শিরোনাম পড়ে গল্পের অন্দর অনুমান করা কষ্টকর হলেও ‘যাদেরকে মেরে ফেলেছি’, ‘বাচ্চাটি আমার কেউ না’, ‘৫৭৭ টাকা’ এবং ‘শাদা শাদা মেঘ খণ্ড খণ্ড প্রেম’ ঔৎসুক্য তৈরি করে পাঠককে পৃষ্ঠা ওল্টাতে বাধ্য করে!


‘চাল ডাল লবণ তেল ও ধর্মাচার’ গল্পটির প্লট নির্মাণ, বর্ণনাশৈলী এক কথায় অসাধারণ, টানটান গাঁথুনিতে দৃশ্যপট সামনে এগিয়ে যায়।


বিহ্বল করা গল্প বলে কেন শনাক্ত করলাম? সে প্রশ্নের উত্তর পেতে বরং গল্পে ঢুকে পড়ি। যে গল্পটির নামে বইটির নামকরণ সেই গল্পের কথাই ধরা যাক। ‘শাদা শাদা মেঘ খণ্ড খণ্ড প্রেম’ যদিও নামটির মধ্যে বাণিজ্যিক ধারার গন্ধ পাওয়া যায় তারপরও গল্পটি পড়ে বিহ্বল হতে হয়। এক সময়ের সুপার-ডুপার হিট ছবির নায়িকা মিস অনিতা জামা খুলে স্তন দেখিয়ে বলেন, তার প্রেমিক মারুফ কিংবা মধ্যবিত্তরা ভীষণ নোংরা হয়, পারভার্টেড হয়। ব্রেস্টে জ্বলন্ত সিগারেটের দাগ দেয়া অংশ দেখিয়ে বলেন, হার্ট কোন পাশে থাকে? বাম পাশেই তো? মারুফ আমার হার্টে আগুন জ্বেলে দিয়েছিল। সে আগুন জ্বলতে জ্বলতে আমাকে স্টোন বানিয়েছে… লাইফ ইজ হার্ড স্টোন! গল্পের শেষ উক্তি—উইদাউট সেক্স আই এম সো সুইট গার্ল!—মাথার ভিতর অভিঘাত সৃষ্টি করে, ভাবতে বাধ্য করে গল্পকার কি মধ্যবিত্তের একটি খারাপ দিক উন্মোচন করেছেন? মধ্যবিত্তরা ভীষণ নোংরা… উইদাউট সেক্স…

আবার ‘বংশের বাতি’ গল্পের কথা ধরা যাক, আজমত আলীর ছেলে সুলতান হেরমতুল্লার মেয়ে হাফেজার সঙ্গে পিরিত করে পেট বাঁধায়, সে কথা বেমালুম অস্বীকারও করে সুলতান! ফেলে যাওয়া কারো অচেনা সন্তানকে যখন কোলে তুলে নেয় আজমত, মনে হয় শিশুটি সন্তানসহ বিষ খেয়ে মরা তার ছেলের প্রেমিকা হাফেজারই সন্তান, নাতিহীন এই পরিবারে বড় হয়ে শিশুটি হয়তো তাকে দাদা বলে ডাকবে কিন্তু সে তার নাফরমান বাপ সুলতানকে বাবা বলে স্বীকৃতি দেবে তো? আজমতের ফিলিংস বুকের ভিতর থেকে দীর্ঘশ্বাস বের করে, হতবিহ্বল করে…।

‘বাচ্চাটি আমার কেউ না’ গল্পে ব্ল্যাকমেইলিং করে বিয়ে করা নতুন স্বামীকে ফুলশয্যার রাতে উর্বশী যখন বলে, ‘দুজন মানুষের জীবন বাঁচানোর জন্য আমি আপনার কাছে আজীবন কৃতজ্ঞ থাকব। আমি অন্তঃসত্ত্বা। পেটের বাচ্চাটিকে মারতে চাই নি। সে আপনার পরিচয়েই পৃথিবীর আলো দেখবে, বেড়ে উঠবে। এটা আমার জন্য অনেক সুখের। সে কারণে আমি আপনার সঙ্গে প্রতারণা করেছি।’…তখন বিহ্বল হওয়া ছাড়া উপায় থাকে কি?

‘সাঁকো’ থেকে কয়েক লাইন পড়া যাক—‘কারণ পথে দেরি হলে জোহরের আজানের আগে ক্ষেতে এক চাষ দেওয়া যাবে না। এমনিতেই বাইন শেষের পথে। বাইন ধরতে না পারলে ফসল বোনা অর্থহীন।’… ‘ঘনীভূত কুয়াশার স্তর কেটে কেটে বাহনে খেজুরের রস নিয়ে চেগিয়ে চেগিয়ে, এঁকেবেঁকে হেঁটে আসছে মাঙ্কি টুপি পরা জবুথবু রসঅলা।’ (পৃষ্ঠা- ১৪, গল্প, সাঁকো।)

গ্রামীণ জনপদের এক চমৎকার বর্ণনার সাথে মাঙ্কি টুপি যোগ হয়ে দিচ্ছে সমসামিয়কতার নির্দেশ আবার ফেসবুক লাইভ নামাকরণটির মধ্যেও আছে একইরকম দ্যোতনা।

হাস্যরসাত্মক গল্পে পড়ি—‘মালতীর ডাক শুনে চড়ুই পাখির মতো ফুড়ুত করে এসে হাজিরা দেই। আনন্দের চোটে আমি ফেটে পড়ি যেমন ফাটে শিমুল ভেন্না ইত্যাদি।’—পাঠকের সামনে সুন্দর দৃশ্যকল্প নিয়ে হাজির হয়। ‘চাল ডাল লবণ তেল ও ধর্মাচার’ গল্পটির প্লট নির্মাণ, বর্ণনাশৈলী এক কথায় অসাধারণ, টানটান গাঁথুনিতে দৃশ্যপট সামনে এগিয়ে যায়।—‘অ-মা মুতুম!—কাফনে ঢাকা লাশ নড়েচড়ে ওঠায় জয়নব বেগমের শীর্ণ চোখ তড়পানো শুরু হয়’, প্রথম বাক্য থেকে শুরু করে ‘সুরনহরের পাশে ত্যাড়াব্যাঁকা সুরাধার’, ড্রাগ সেন্টারের তরফ আলী মুন্সির রহস্যময় চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, জয়নবের শেষ বাক্য উচ্চারণ—‘রহম করো-আল্লা! বিপদ থিকা বাঁচাও-আল্লা!’ রুদ্ধশ্বাসের মতো পাঠককে আটকে রাখে; পাঠের পর পাওয়া যায় সার্থক গল্প পড়ার পরিতৃপ্তি।

‘বংশের বাতি’ গল্পের ক্ষেত্রেও এই কথা খাটে। শ্মশানের বটবৃক্ষ পেরিয়ে ‘নিজের সবকিছু ভুলে যাওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা’ ছাড়িয়ে আজমত আলী ‘সদ্যপ্রসূত অচেনা শিশুর শোকার্দ্র কান্নার কাছে বিগলিত হয়ে পড়ে…।

কখনো পরিচিত কবিতার পঙ্‌ক্তি ব্যবহার মহিউদ্দীনের গল্পে নিয়ে আসে ভিন্নমাত্রা। ‘ভালোবাসতে বাসতে মাতাল করে দেবো।’ (পৃষ্টা-৭৩) কিংবা ‘এতদিন কোথায় ছিলেন?’ (পৃষ্টা-২৮)।’


মহিউদ্দীন আহ্‌মেদের গল্পের চরিত্রগুলো কখনো নির্মম, কাটাকাটা, বাহুল্যবর্জিত। শাদা শাদা মেঘ খণ্ড খণ্ড প্রেমের নায়ক মারুফ কিংবা নায়িকা অনিতাও।


‘একটি পুরনো চিঠি’, ‘বাচ্চাটি আমার কেউ না’ গল্পের চরিত্রগুলো মানবিক দিক নিয়ে হাজির হয়।… ‘আমি মানুষ। কারো মৃত্যু কামনা করতে পারি না। না-হয় আমার পরিচয়েই বেঁচে থাকবে উর্বশীর সন্তান।’ পাঠককে যেমন বিহ্বল করে তেমনি ‘তারও রয়েছে একটি হৃদয়। যেমন অন্ধকার রাতেরও থাকে অনুরণনময় একটি শরীর!’, (পৃষ্টা-৬৪)।

মহিউদ্দীন আহ্‌মেদের গল্পের চরিত্রগুলো কখনো নির্মম, কাটাকাটা, বাহুল্যবর্জিত। শাদা শাদা মেঘ খণ্ড খণ্ড প্রেমের নায়ক মারুফ কিংবা নায়িকা অনিতাও। হাস্যরসাত্মক গল্প লেখার কৌশল গল্পে ‘নাদুসনুদুস ভোঁদড়ের মতো নরম আর ম্যাড়ম্যাড়ে-থলথলে হয়ে গিয়েছিলাম’ উপমা পাঠে পাঠক আরাম বোধ করবেন। ‘পুলসেরাত’ ‘রিস্তা’ ‘জোগালপাতি’ ‘ঘণ্টি দোকান’ ‘কাহিনিগমক’ শব্দগুলোর যুতসই ব্যবহারে পাঠক পুলক বোধ করতে পারেন। ‘বিপদের হাত থেকে খালাশ করে’ ‘সাচ্চা একজন মানুষের ভারে টেম্পোও যেমন ভারি হবে না তেমনি যাত্রীরাও বিরক্ত হবে না’, ‘নড়বড়ে ফটকের পকেটে কুঁজো হয়ে মাথা ঢুকিয়ে দেয়’—এসব বাক্যবন্ধ যেমন আনন্দিত করে ঠিক তেমনি ‘তেঁতুলগাছ-তলা বসে’, ‘যাই হোক’, ‘আর এটাই তিনি চাচ্চিলেন’—প্রভৃতি শব্দবন্ধ কখনো পাঠে প্রতিবন্ধকতা তেরি করে বৈকি! যাকগে, আমরা বিহ্বল করা গল্পগুলোর কাহিনিগমকেই থাকি…


[শাদা শাদা মেঘ খণ্ড খণ্ড প্রেম—মহিউদ্দীন আহ্‌মেদ—প্রকাশক : মুক্তচিন্তা—প্রচ্ছদ : সারাজাত সৌম—প্রকাশকাল : বইমেলা ২০১৮—মূল্য ১৮০ টাকা]

পরাগ রিছিল

জন্ম ৩ জুলাই, ১৯৮১; ময়মনসিংহ।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সরকার ও রাজনীতিতে সম্মানসহ স্নাতকোত্তর।

প্রকাশিত বই :
উমাচরণ কর্মকার [ঐতিহ্য, ২০১০]

ই-মেইল : ritchil04@yahoo.com