হোম বই নিয়ে ‘বাংলা ও প্রমিত বাংলা সমাচার’ : প্রসঙ্গসূত্রে কিছু কথা

‘বাংলা ও প্রমিত বাংলা সমাচার’ : প্রসঙ্গসূত্রে কিছু কথা

‘বাংলা ও প্রমিত বাংলা সমাচার’ : প্রসঙ্গসূত্রে কিছু কথা
747
0

শুভেচ্ছা সবাইকে। আমি তো হংসমধ্যে বকো যথা। কারণ এত তত্ত্বজ্ঞান এবং ইতিহাসজ্ঞান সত্যিই আমার নাই। মানে এতক্ষণ শুনলাম এবং আমি একটু শঙ্কিতও আছি, মানুষ কতক্ষণ আসলে শুনতে পারে এবং শুনে তার থেকে নিতে পারে। আমার মনে হয় সেই সীমারেখা আমি পেরিয়ে এসেছি অনেক আগে। কথা সংক্ষিপ্ত করা ভালো।

ভাষার তো স্তরান্তর ঘটে। যেমন আমাদের উপস্থাপক যিনি আছেন তিনি ভাষাসৈনিক বলছিলেন ফিরোজকে; ইন্টারেস্টিং, সলিমুল্লাহ খানকে। যে মুক্তিফৌজ শব্দটা আমরা ব্যবহার করি ৭১-এর সূত্রে, এ শব্দটা আমি দেখেছিলাম শিবনাথ শাস্ত্রীর বইয়ের মধ্যে। আত্মচরিততে। ওইখানে তিনি লিখলেন, রাস্তায় বাহির হইয়া একদল মুক্তিফৌজের সম্মুখীন হইলাম। ‘ক্রিশ্চান লিবারেশন আর্মি’র বাংলা করেছেন।

কেন বলছি, আমরা স্তরান্তর ভুলে যাই। তখন সমস্যাটা হয়। একবার আমার খেয়াল আছে, এ ঘটনাটা আমার জন্য প্রতীকী অর্থে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। একবার ছফা ভাইয়ের সাথে গল্পটল্প করে বের হয়েছি। ছফা ভাই না, স্যরি, গুণদার সাথে গল্প করে বেরিয়েছি। রাস্তায় দেখা হুমায়ুন আজাদের সঙ্গে। কী প্রসঙ্গে যেন নজরুলের কথা উঠল। কিছুদিন আগে নজরুলের উপর একটা প্রবন্ধ পড়লেন হুমায়ুন আজাদ। সেখানে ছিল যে, নজরুলকে মহপদ্মকার বলেছেন। এটা নিয়ে হাওয়া খুবই উত্তপ্ত। আমি একটা লেখা লিখেছিলাম সেটার বিরুদ্ধে মনে আছে। একবিংশ পত্রিকায়। এরশাদের আমলের শেষ দিকটায় হবে।

গুণদা কী একটা বললেন, তখন হুমায়ুন আজাদ বললেন যে, ও তো ছিল নাত-লেখক। হামদ-নাত-লেখক। গুণদা তখন একটা ইন্টারেস্টিং উত্তর দিলেন। আমার কাছে খুব ভালো লেগেছিল। বললেন, দেখো হুমায়ুন, উনি হামদ-নাত লিখেছিলেন বলেই তুমি আজকে আধুনিক কবিতা লেখ। তো ঘটনাটা হয়েছে কী, এগুলো নিয়ে অনেক তত্ত্বকথা, আলোচনা হয়েছে। সেগুলা বিচার করার লোক আমি নই। আমি পড়ি পাঠক হিসেবে। আজকে আমি আসছি আজমের বই নিয়ে আলোচনা করতে। আজম যে জায়গাটায় সবচেয়ে বেশি, মানে আজম তো খোঁচা দিয়ে লেখে এবং যাদেরকে খোঁচা দিয়েছে বইয়ের বেশ কয়েকটা জায়গাতে, সাহিত্য ব্যবসায়ী যারা। আমি কবিতা লিখি, ভাষা নিয়ে আলোচনা করতে গেলে তা সাহিত্যের দিকে যায়। বাংলা ভাষায় অনেক ঐতিহাসিক কারণ আছে এর, নানা কিছু আছে, আমি সেখানকার একটা প্রতিনিধিত্ব করি। ‘ইন লাইট অব ইন্ডিয়া’র মধ্যে অক্তাবিও একটা লাইন বলেছিলেন, খুবই ইন্টারেস্টিং—ভাষা সবার, আবার কারোরই না।

যেখানে ভাষা সবার কমিউনিকেশনের জায়গা সেখানে পেশাদারিত্বের জায়গায় আমিও সাংবাদিকতা করি বলে আমাকে নিয়মিত হাজির হতে হয় জনতার দরবারে। ফলে ওইখানে আমার যোগ আছে। আবার যেখানে ভাষা কারোরই না, কবিতার জায়গা, সেখানেও আছি। ফলে এক রকমের হয়তো প্রতিনিধিত্ব আমি করি। সেদিক থেকে এসেছি।

যেটা বলছিলাম, স্তরান্তর ভুলে যাই। অতীতে কী হয়েছে, ভাষা কিভাবে পরিগঠিত হয়েছে, উপনিবেশ এসেছে, তার আগে গদ্য, গদ্য ছিল কি ছিল না, আনিসুজ্জামানের একটা বই পড়ে তিনি দেখিয়েছেন, কিভাবে… আগের এক ভদ্রলোক বলে গেলেন যে, ফার্সিটা কিভাবে বাদ গেল, তারা তো পরিভাষার খোঁজ করছিলেন, ফলে সংস্কৃতের দ্বারস্থ হয়েছিলেন। বুল শিট কারণ। ওই বইটার মধ্যে আনিসুজ্জামান দেখিয়েছেন পুরনো বাংলা কবিতার মধ্যে যে, পলাশী, মানে সিরাজ-উদ-দৌলার পতনের পর ওরা যখন রি-কভার করল, তার পরের দশ বছরে, সংখ্যা ভুলে গেছি আমি, অনেকগুলো বই বের হয়েছে আইনের উপর। সেই সমস্ত আইনের বইয়ের মধ্যে দেখা যাবে যে, আস্তে আস্তে কিভাবে ফার্সি থেকে সংস্কৃতবহুল বাংলাগুলো এসেছে। বাংলা ভাষার মধ্যে, বিশেষ করে প্রশাসনিক ভাষা যদি আমরা বলি, প্রশাসন চালাতে গেলে যে ভাষা লাগে, সেখানে আরবি, ফার্সি শব্দের একটা বিরাট ভাণ্ডার বাঙালি সমাজে আত্তীকৃত হয়ে আগে থেকেই ছিল। এটা বলা বাহুল্য, এগুলো এখনো আছে—গ্রেফতার, ফরিয়াদ, জামিন, শত শত। এবং আমাদের বাঙালি মুসলমানদের, যেটা বললাম, স্তরান্তর ঘটে। ওরা যেমন করেছে, সেটা নিয়ে তর্ক হয়েছে অতীতে, শ্যামাচরণ গঙ্গোপাধ্যায় থেকে রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত একটা ক্ষীণ ধারা, তার বাইরে একটা প্রবল ধারা… ঔপনিবেশের ঔরসে যে মধ্যবিত্তের জন্ম হয়েছে, তারা কিভাবে বাংলা ভাষা গড়নের মধ্যে লেগেছেন এবং বিকৃত করেছেন। এগুলো নিয়ে আলোচনা তো বহু হয়েছে। আমার নতুন করে বলারও কিছু নাই। আমি বলতেও পারব না। আমার যোগ্যতাও নাই।


রবীন্দ্রনাথ যে সালে মারা গেলেন, ১৯৪১ সাল, মারা যাওয়ার পরে, তিনি ভাবতেও পারেন নি, যে দশকে মারা গেছেন সে দশকেই ভারতবর্ষ তিন টুকরো হয়ে যাবে এবং দুটো রাষ্ট্র আত্মপ্রকাশ করবে।


তারপর এই যে শোধন হয়েছে, পরিশোধন, তার মধ্যে সাম্প্রদায়িকতার ঘটনাও ঘটেছে। এটা অস্বীকার করার কোনো উপায় নাই। সেই ইতিহাসগুলো আমাদের বোঝা দরকার। কিন্তু বোঝা দরকার কেন? আমি মনে করি নজরুল যেটা করতে চেয়েছিলেন সেটার কারণে। আমরা আরেকটা সাম্প্রদায়িকতার খপ্পরে যেন না পড়ি। আমরা সাম্প্রদায়িকতার ঊর্ধ্বে উঠতে চাই। নজরুল যেটা চেয়েছিলেন সে জায়গা থেকে আমাদের করা দরকার। কারণ মাঝখানে কিছু ঘটনা ঘটেছে, যে কথাটা আমরা ভুলে যাই ভাষা নিয়ে আলোচনা বা যেকোনো আলোচনার মধ্যে। সেটা কী? সাতচল্লিশ এসেছে, বায়ান্ন এসেছে, একাত্তর এসেছে। রবীন্দ্রনাথ যে সালে মারা গেলেন, ১৯৪১ সাল, মারা যাওয়ার পরে, তিনি ভাবতেও পারেন নি, যে দশকে মারা গেছেন সে দশকেই ভারতবর্ষ তিন টুকরো হয়ে যাবে এবং দুটো রাষ্ট্র আত্মপ্রকাশ করবে। এবং তার তিন দশকের মাথায় যে বাঙালি মুসলমান নানাভাবে প্রান্তিক হয়েছিল তারা একটা রাষ্ট্র কায়েম করে ফেলবে। ফলে একটা রাষ্ট্রের উদ্ভব হয়েছে। এবং যে পরিস্থিতিতে… আগের আলোচনা তো তাত্ত্বিক ছিল, মানে আমি বলছি বিভাগপূর্ব সময়ে যে আলোচনাগুলো তাত্ত্বিক এবং কখনো কখনো কেউ কেউ অস্বস্তিতে ছিল। সেখানে নজরুল পার্টিসিপেট করেছিলেন, আবুল মনসুর আহমেদের তর্ক আছে ভাষা নিয়ে। এগুলো আছে। সেগুলো তো সবই জানেন, নতুন করে বলার কিছু নাই।

সেটা একটা ভিন্ন পাটাতন ছিল। তারপর পাকিস্তান রাষ্ট্র এসেছে। বাঙালি মুসলমান সেখানে ছিল, একটা বড় ভূমিকা পালন করেছে পাকিস্তান রাষ্ট্র কায়েমের পেছনে। কিন্তু তারাই আবার অবিলম্বে তিন দশকের মাথায়… তিন দশক কি ভুল বললাম, তিন দশকই তো,  তিরিশ বছর প্রায়—৪১, ৫১, ৬১, ৭১—তো রাষ্ট্র তো কায়েম করে ফেলছে। ফলে আমরা ভিন্ন বাস্তবতায় চলে এসেছি। ফলে ব্যাকরণে যে শাসন চলছে, যে প্রান্তিকীকরণ হয়েছে ব্যাকরণে মধ্যে, ব্যাকরণ রচনায় বাংলা ভাষা ঢালাই করে তোলা হয়। বাংলা ভাষা তো গড়ে তোলা হয় নাই। কে বলেছিলন, প্রমথ চৌধুরী বলেছিলেন—বাঙলা ভাষা গড়ে ওঠে নি, ঢালাই হয়েছে। এগুলা হয়েছে। কিন্তু আমরা তো অন্য একটা জায়গায় চলে এসেছি। এটা একটা ঐতিহাসিক বাস্তবতা। কিন্তু পূর্ববঙ্গের বাঙালিদের সমস্যা হচ্ছে এই, পশ্চিমবঙ্গের সাথে যদি তুলনা করি দুই বাঙালির মধ্যে, একটা বড় জিনিস হচ্ছে, ওদের মধ্যে দেখবেন একটা আর্টিকুলেশন আছে। ওরা যখন ছোট ঘটনা ঘটায় তার একটা বড় আর্টিকুলেশন হয়। একাডেমিতে, অমুক জায়গায়, তমুক জায়গায়। আর এখানে আমরা কিছু বড় বড় ঘটনা ঘটনা ঘটিয়েছি। তাই না? আমরা বায়ান্নর মতো ঘটনা ঘটিয়েছি, ঊনসত্তরের মতো ঘটনা ঘটিয়েছি, একাত্তরের মতো বিরাট ঘটনা ঘটিয়েছি। এমনকি নব্বই সালে ছোটখাটো ঘটনা হয়েছে। কিন্তু আর্টিকুলেশন নাই। ফলে একাডেমিক চত্বরে যে তর্কটা হয়েছে, আপনি দেখবেন, এখন যে ভাষা নিয়ে আলোচনাটা হচ্ছে, আমি মনে করি ভাষার আলোচনার মধ্যে, আমি দূর থেকে যখন দেখি… আমি তো ভাষা ভেতর থেকেও দেখি, কবিতা যখন লিখি এবং ব্যবহারজীবী হিসেবে সাংবাদিক হিসেবেও দেখি। এবং নাগরিক হিসেবে তো দূর থেকেও দেখি। সে জায়গাটায় দেখতে পাই যে, প্রায় দেড়-দুই দশক ধরে ভাষা নিয়ে আলোচনা বা তর্কটা গরম হয়ে উঠল, স্থানিকতার প্রসঙ্গে এসেছে ঢাকা। ব্যাকরণ বা এগুলো যেভাবে ঢালাই হয়েছে সেগুলোকে নতুন করে লেখার কথা উঠছে। তাগিদ তৈরি হয়েছে, একটা অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। আজম যাদেরকে খোঁচা দেন, এটা কিন্তু সেই ছোট গ্রুপ থেকে হয়েছে। লেখকদের মধ্যে প্রথম এসেছে। লেখকরা প্রথম বেঁকে বসেছে, বিশেষ করে সংস্কৃতিজীবী যারা। টেলিভিশনে, নাটকে তারকারা দেখা যায় মঞ্চে উঠে উঠে ঢাকার যে আঞ্চলিক, আঞ্চলিক বলব না, এখানকার একটা স্থানীয় একটা ভাষা গড়ে উঠেছে, সে ভাষায় অবলীলায় তারা কথা বলে কোনো দ্বিধা ছাড়াই। আগে তারা শুদ্ধ বলছে নাকি অশুদ্ধ বলছে এটা নিয়ে তাদের মধ্যে দ্বিধা থাকত, এটা থাকছে না। ঘটনাটা ঘটে যাচ্ছে এবং সেটা হয়েছে রাষ্ট্র যখন আমরা কায়েম করেছি। এবং জাতীয় ও রাষ্ট্রীয় অহং তৈরি করেছি কিন্তু।

আমি দেখি পরস্পরবিরোধী দুইটা জায়গা কাজ করছে ভাষা-বিতর্কের মধ্যে। একটা হচ্ছে রাষ্ট্রীয় অহং, যেখান থেকে কথাটা আসছে, একসময় যেটা ছিল প্রান্তিক। ফলে এই অহংটা আরো বেশি জেগে ওঠার কথা, কারণ তারা বঞ্চিত হয়েছে এমন একটা গোষ্ঠী। আরেক দিকে দেখি, একটা জাতিরাষ্ট্রের মধ্যে যে কেন্দ্রিকতা তৈরি হচ্ছে সেটাকে আক্রমণ করার চেষ্টা। একদিকে একটা কেন্দ্রীয় জাতিরাষ্ট্রের অহং আর তার বিপরীতে—কয়েক রকমের লোক আছে তো—সেটাকে আক্রমণ করার চেষ্টা। কেন নোয়াখালীর লোক নোয়াখালীর ভাষায় লিখবে, কী অবস্থা! সিলেটের লোক সিলেটের ভাষায় লিখবে। আছে , এরকম আছে।

ফলে দুইটা কিন্তু সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী স্রোত দেখি এখানে কাজ করছে, এই ভাষা বিতর্কের মধ্যে। সাহিত্যের অঞ্চল থেকে কিন্তু প্রশ্নটা উঠছে। আমি মনে করি, আজম এ সময়ে যে লিখছেন, আজমের এ সময়ে লেখার গুরুত্বটা হচ্ছে এখানে যে, ইংরেজিতে একটা প্রবাদ আছে ‘হিট দ্য আয়রন হোয়েন ইট ইজ হট’—লোহা যখন তপ্ত আছে আর নরম আছে তখন সেটার মধ্যে পেটানো দরকার। যদি সেটার মধ্যে একটা আকার দিতে হয়। আজম সে কাজটা করছেন। এবং আজম একটা পারঙ্গমতা নিয়ে এসেছেন, একটা যোগ্যতা নিয়ে এসেছেন। যেটা আমি দেখি যে, তিনি যে পিএইচডিটা করেছেন, আমার অবশ্য সলিমুল্লাহ খানের মতো এত তাত্ত্বিক পটভূমি নাই, ফলে আমি বলতে পারব না এটা কিরকম ভালো পিএইচডি। বাংলাদেশে এর চেয়ে উৎকৃষ্ট পিএইচডি নিশ্চয়ই হয়েছে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে। কিন্তু আমার ক্ষীণ খোঁজখবরের মধ্যে যেটা বুঝি, আমার মনে হয়েছে যে, এমন একটা অসাধারণ পিএইচডি, দরকারি পিএইচডি… অসাধারণ পিএইচডি অনেক হয় কিন্তু সেটা দরকারি কাজে লাগে কিনা আমি জানি না, হয়তো লাগে, বুঝতে পারি না, কিন্তু আজম একটা করেছেন। ফলে তিনি প্রস্তুতি নিয়ে এসেছেন। দেবেশ রায়রা যে প্রশ্নগুলো তুলেছিলেন, বিভিন্ন সময় যে প্রশ্ন বিভিন্ন জন করেছেন। আমরা বলেছি মুখস্থ ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ থেকে গদ্য তৈরি হয়েছে, এই হয়েছে, সেই হয়েছে। কিন্তু প্রকার কী, কিভাবে হয়েছে, কোন পলিটিক্স কাজ করেছে—এগুলো বিট বাই বিট কিভাবে হয়েছে, উনি এটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেছেন, সে প্রস্তুতি তার আছে।


ভাষা তো একটা অদ্ভুত জিনিস, মানে একটা বিরাট ভাষাস্রোত, যেখানে একটা চোরও কথা বলছে, ধনীও কথা বলছে, পতিতাও কথা বলছে, কবিও কথা বলছে।


এবং এখানে এই বইটার মধ্যে আমি যেটা দেখি, বিভিন্ন প্রবন্ধ, অনেকগুলো প্রবন্ধ বিভিন্ন সময় লেখা তো, কিন্তু ওর মধ্যে একটা স্কিম আছে তার মনের মধ্যে, ছক আছে। ফলে যে ভাষা নিয়ে, ব্যবহার্য ভাষা নিয়ে কথা বলেছেন, ব্যাকরণ নিয়ে কথা বলেছেন, বানান নিয়ে কথা বলেছেন, উচ্চারণ নিয়ে কথা বলেছেন। ভাষার বিভিন্ন যে জিনিসগুলো আছে, মাত্রাগুলো আছে সেগুলো নিয়ে কথা বলেছেন। আমি মনে করি যে, এটা তো সত্যি যে, ভাষা তো একটা অদ্ভুত জিনিস, মানে একটা বিরাট ভাষাস্রোত, যেখানে একটা চোরও কথা বলছে, ধনীও কথা বলছে, পতিতাও কথা বলছে, কবিও কথা বলছে। যে তোতলায় সেও কথা বলছে এবং এই বিপুল প্রবাহের মধ্যে নানা প্রান্তে, নানা ধান্ধায় যুক্ত মানুষ, যে কথক, তার মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষা প্রবাহিত হচ্ছে, তাই তো? কিন্তু রাষ্ট্র যখন ভাষা ব্যবহার করে… যেটা নাকি রাষ্ট্র সম্পর্কে বলে, নিপীড়ক কিন্তু দরকারি। তো ভাষা, তার বইয়ের নাম দেখেই বোঝা যায়—বাংলা ও প্রমিত বাংলা সমাচার—বাংলা ও প্রমিত বাংলা দুইটা দুই জিনিস। এবং তার ভেতরের একটা আকাঙ্ক্ষা আছে যে, কিভাবে প্রমিত বাংলা বা মান বাংলা যেটাকে বলছি, সেটাকে এমন একটা জায়গায় আনতে পারি, একটা গণতান্ত্রিকতার পথে, এমন একটা ভাষায় আমরা আসতে পারি, যেখানে সবাই সহজভাবে ব্যবহার্য ভাষায় পৌঁছাতে পারি। এবং এই ভাষাকে বোঝার জন্য এবং এটাকে পাড়ে বাঁধার জন্য এমন একটা ব্যাকরণ রচনা করি, এমন একটা জিনিস তৈরি করি যেটা নাকি আমার অভিজ্ঞতার সঙ্গে যায় এবং সব মানুষ সেখানে অংশগ্রহণ করতে পারে, তার জীবনে যে ভাষাস্রোতের সাথে সে যুক্ত তার প্রতিফলন তার মধ্যে থাকে, যাতে সে বুঝতে পারে এটা আমার ভাষা। আমি এভাবে গড়ে উঠছি। এই তো ব্যাপারটা। আমি তত্ত্বীয়ভাবে কথা বলতে পারি না। ফলে সেভাবে বলতে পারছি না। আমি মনে করি, আজমের বইটা দরকারি। অনেকে অনেক কথা বলেছেন, মান বাংলার কথা যেটা এসেছে।

লেখকের কতগুলো অবজারবেশন দেখে প্রশ্ন জাগে, যেমন লিখেছেন উনি, হ্যালহেডের বাংলার মধ্যে, তিনি যখন ভাষাটাকে বাঁধতে চাইছেন একটা সূত্রের মধ্যে, তখন তার মধ্যে সংস্কৃত-প্রবণতা যত বেশি, দেখা যাবে ম্যানুয়েল দ্য আসসুম্পসাওয়ের মধ্যে অনেক কম। আমার মাথায় সঙ্গে সঙ্গে কাজ করেছে, কেন হচ্ছে এটা? ইন্টারেস্টিং। কারণটা হচ্ছে উনি ভাওয়ালে বসে করেছেন, অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি, ইংরেজের উপনিবেশ গড়ে ওঠার ঠিক পূর্ব মুহূর্তে। যেহেতু কলোনির রাজধানী হিসেবে তখনও কলকাতার অভ্যুদয় হয় নি, ফলে তিনি কিঞ্চিৎভাবে পাওয়ার স্ট্রাকচারের বাইরে। যদিও উপনিবেশ গড়তে এসেছিলেন তারাও, মানে পর্তুগীজরাও, কিন্তু পারেন নি, ব্যর্থ হয়েছেন—ওইদিক থেকে নবগঠিত কোনো কেন্দ্রের অনুশাসনও ছিল না তার। ফলে এগুলা খুব ইন্টারেস্টিং।

মান ভাষার দিকে কিন্তু ভাষার একটা যাওয়ার চেষ্টা থাকে। কারণ একটা জনগোষ্ঠীর মধ্যে যোগাযোগের দরকার পড়ে। ধরা যাক, বরিশালের লোক ও সিলেটের লোক—কথা বলতে হবে তাকে। কিন্তু ভাষাটা কোথায় হবে? ভাষাটার ক্ষেত্রে কোথায় হবে? এটা তো একটা বড় প্রশ্ন, সেটা নিয়ে তর্কের সুরাহা হবে না। অনেকে অনেক প্রকল্প দিবেন। আপনারা দেখবেন, খুব ইন্টারেস্টিং, পুরনো দিনের কবিদের কবিতায় আপনি দেখবেন, যখন ভাষা এরকম কলকাতা-কেন্দ্রিকতার যে মাত্রা, তীব্র মাত্রা একটা হয়েছে, যখন তা হয়ে ওঠে নি, ধরুন আলাওলের কবিতার ভাষা, চণ্ডিদাসের কবিতার ভাষা—আপনারা দেখবেন সবার কবিতার মধ্যে কিছু, যার যার আঞ্চলিকতার মধ্যে থাকলেও এমন একটা ভাষার দিকে ওঠার চেষ্টা আছে, যে ভাষায় তিনি একটা বড় শ্রোতৃমণ্ডল পাবেন।

এখন রাষ্ট্র তো নিপীড়ক সত্তা। ধরা যাক, নোয়াখালীর লোক আলাদা ভাষায় কথা বলে, চিটাগাঙের লোক আলাদা ভাষায় কথা বলে। রাষ্ট্র বলবে তোমরা এক ভাষায় কথা বলো। তোমাদের গান একটাই :  আমার সোনার বাংলা। তোমার পতাকা একটাই। তোমার ভাষাও একটাই। এবং সেই মিথ, সেই কল্পনার মধ্যে আমাদের ঠেসে গুঁজে দিতে চায়।

মানুষের দিক থেকে একটা চাহিদা থাকে। যখন কবিরা লিখছেন তখন তল থেকে চাহিদা আসছে। আর রাষ্ট্র তো চাহিদা উপর থেকে চাপিয়ে দেয়। আমাদের এই লড়াইটা সবসময় থাকতে হবে। আমরা কী করে তলায় যে মানুষগুলা আছে তার চাহিদা পূরণ করতে পারি। সেদিক থেকে আজমের লেখা গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে। আমি যখন দূর থেকে দেখি, আমার মনে হয়েছে এ তর্কগুলো হওয়া দরকার। আজমের সব কথার সাথে আমি একমত তা বলছি না। সেগুলা আলাদাভাবে আলোচনা করার অনেক জায়গা আছে। কিন্তু আমি মনে করি দরকারি, তর্কের ক্ষেত্রও তৈরি হওয়া দরকারি। তিনি সেটা কনসিস্টেন্টলি করছেন। সেদিক থেকে তাকে আমি সাধুবাদ জানাই। আমি তার লেখা পেলে পড়ি। সলিমের (সলিমুল্লাহ খান) লেখাও পড়ি। সবসময় তার সাথে যে একমত হতে পারি তা না। কিন্তু দরকারি। তর্কগুলো দরকারি। অনেক সময় একমত হইও। তাদের সাথে আমার মনের ভাব ও প্রবণতা অনেকটা পরিমাণে যায়। তর্ক চলুক। জারি থাকুক। এতটুকুই বলি। সবাইকে ধন্যবাদ।

[একটি বক্তৃতার সম্পাদিত অনুলিপি]

সাজ্জাদ শরিফ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদক at প্রথম আলো
জন্ম ২৪ সেপ্টেম্বর ১৯৬৩, পুরান ঢাকা। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর।

প্রকাশিত বই :
ছুরিচিকিৎসা [কবিতা, ২০০৬, মওলা ব্রাদার্স]
যেখানে লিবার্টি মানে স্ট্যাচু [গদ্য, ২০০৯, সন্দেশ]
রক্ত ও অশ্রুর গাথা [অনুবাদ, ২০১২, প্রথমা]
আলাপে ঝালাতে [সাক্ষাৎকার, ২০১৯, প্রথমা]

ই-মেইল : sajjadsharif_bd@yahoo.com