হোম বই নিয়ে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রসঙ্গে ইউভাল নোয়াহ হারারি

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রসঙ্গে ইউভাল নোয়াহ হারারি

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রসঙ্গে ইউভাল নোয়াহ হারারি
1.50K
0

১.
গত ৩০ আগস্ট প্রকাশিত হয়েছে জেরুজালেম হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, ইতিহাসবিদ ও বেস্টসেলার লেখক ইউভাল নোয়াহ হারারির নতুন বই 21 lessons for 21 Century. দুনিয়ায় যাদের বই লক্ষ লক্ষ কপি বিক্রি হয় তাদের মধ্যে হারারি অন্যতম। ইতিহাস বিষয়ক বইয়ের এত বিক্রি কল্পনা করা যায় না।তিনি ইতিহাসের সাথে বিজ্ঞান, দর্শন, ধর্ম, প্রযুক্তিতত্ত্ব, সমাজবিজ্ঞান ইত্যাদিও দারুণ মিক্স ও কম্বিনেশন তৈরি করেন। ফলে, তার পূর্ব প্রকাশিত দুটো বই যারা পড়েছেন তারা জানেন, তার লেখা ইতিহাস শুধু ইতিহাস নয়। তাকে পড়ার পর একটা ঝাঁকুনি খাবেন। ফলে তাদের প্রবল একটা আগ্রহ আছে তার নতুন বই ঘিরে।

হারারির প্রথম বই Sapiens: A Brief History of Humankind হিব্রু ভাষায় প্রকাশিত হয় ২০১১ সালে। তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, প্রকাশের আগে বইটি প্রকাশক দপ্তর থেকে তিনবার ফেরত এসেছে। প্রকাশকের সংশয় ছিল যে ইজরাইলে ইতিহাসের মতো একটা নিরস বিষয় কত জনই বা পড়বে, কিনবে। প্রকাশক যা ভেবেছিলেনই তাই হয়েছিল। তবে ভাষার বদলে বইয়ের ভাগ্যও বদল হয়। ২০১৪ সালে ইংরেজিতে প্রকাশিত হবার পর থেকে বারো লক্ষ কপি বিক্রি হয়েছে। বিল গেটস, বারাক ওবামা, জুকারবার্গ এর মত আরো বহু বিখ্যাত লোক তার বই গুরুত্ব সহকারে পড়ে ও বিভিন্ন সময়ে কথা বলেছেন তা নিয়ে। Sapiens রচিত হয়েছে মানুষের ইতিহাসের বৈজ্ঞানিক মূল্যায়নের উপর ভিত্তি করে। মানুষের মতো অসহায় জীব কিভাবে দুনিয়া দখল নিল তারই বিস্তারিত বিশ্লেষণ। ৭০,০০০ বছর আগে মানুষের জন্ম সূচিত হয়। কৃষিজীবী সমাজ গঠিত হয় মাত্র ১২,০০০ বছর আগে। আধুনিক কালের সূচনা এই তো সেদিন মাত্র ৫০০ বছর আগে। এই সমস্ত সময়ের ইতিহাসকে রোমাঞ্চক ভাবে লিখেছেন Sapiens-এ। ২০১৫ সালে তার দ্বিতীয় বই Homo Deus : A Brief History of Tomorrow-এর হিব্রু সংস্করণ বের হয়। ২০১৬তে এর ইংরেজি ভার্সন প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত সাড়ে পাঁচ লক্ষ বিক্রি শেষ। বর্তমান মানুষের অর্জন সদূর ভবিষ্যতে আমাদেরকে কোথায় নিয়ে দাঁড় করাবে তার একটা ধারণা দেওয়ার চেষ্টা আছে বইটিতে। মানুষের সাধনা তাকে দেবতা পর্যায়ে নিয়ে যাবে। কিন্তু তারপর? মানুষের সদূর গন্তব্যের ঠিকানাটা খুঁজেছেন তিনি এই বইয়ে। অতীত আর ভবিষ্যতের মাঝে একটা মধ্যবর্তী সমকাল আছে। সেই সমকালের আভাসটা লেখা আছে তার নতুন প্রকাশিত 21 lessons for 21 Century-এ। বইটি বিষয় সম্পর্কে ভূমিকায় হারারি বলেছেন, “আমার প্রথম বই Sapiens মানুষের অতীতের জরিপ, নীরিক্ষা আছে কিভাবে সাধারণ একটা বানর প্রজাতি দুনিয়ার শাসক হয়ে উঠল। দ্বিতীয় বই Homo Deus-এ আবিষ্কার করার চেষ্টা করেছি মানুষের সুদূর ভাবিষ্যৎ নিয়ে, গভীরভাবে ভেবে দেখেছি কিভাবে মানুষ একদিন ঈশ্বরের জায়গা দখল করে নিবে। মানুষের বুদ্ধিমত্তা আর বিবেকের নিয়তিই বা কী! আর এই নতুন বইয়ে দেখাতে চেয়েছি সমকালকে। চলমান দুনিয়ার প্রচলিত ঘটনা প্রবাহ আর অদূর ভবিষ্যতের সমাজ নিয়েই এটা লেখা। দুনিয়ায় এখন কী ঘটছে? আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা কী? এর সমাধান কী? আমরা কিসে গুরুত্ব দিব? আমাদের সন্তানদের আমারা কী শেখাব তাদের ভবিষ্যতের জন্য?’’ সমকালীন দুনিয়ার নানা ঘটনার ব্যাখ্যা পাওয়া যায় এই বই থেকে।


মানুষই একমাত্র জীব যে গল্প বিশ্বাস করে। 


হারারি মানুষকে খুবই উদ্বিগ্ন, দুশ্চিন্তাগ্রস্ত  এক প্রাণী হিসাবে দেখেছেন। বর্তমানে স্বাধীনতা, যুদ্ধ,  শান্তি, ধর্ম, সন্ত্রাসবাদ, জাতীয়তাবাদ, মানবতাবাদ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বিচার, শিক্ষা, সমকালীন অভিবাসন সমস্যাগুলো আমদের অস্তিত্বকে আরো সংকটাপন্ন করে তুলেছে। এই সংকটের বোধই মানুষকে উতরে যাওয়ার পথ বলে দেয়। মানুষই একমাত্র জীব যে গল্প বিশ্বাস করে। এই গল্প বিশ্বাস করার প্রবণতাই মানুষকে আজ এত দূর নিয়ে এসেছে। মানুষের ঐক্য গল্পের উপর দাঁড়ানো। দুুুনিয়ায় মানুষের যা কিছু অর্জন তা যৌথতার প্রাপ্তি। বিজ্ঞানী আর প্রযুক্তিবিদরা খুব দ্রুত, সহজেই অনেক কিছু তৈরি করে। তবে সেই প্রযুক্তি সমাজে ব্যবহার করার জন্য রাজনৈতিক ও সামাজিক গল্প লাগে। যেকোনো বৈজ্ঞানিক-আবিষ্কার সমাজে ব্যবহৃত হওয়ার জন্য তাকে রাজনৈতিক ও সমাজিক গল্প, মিথের ভেতর দিয়ে যেতে হয়। ফলে, ধর্ম, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, সেনাবাহিনী, সংঘ বা বিজ্ঞান যাই বলি না কেন, মানুষের ইউনিফিকেশনের জন্য একটা কমন গল্প লাগে। দুনিয়ার পুরাতন সব গল্প শেষ হয়ে যাচ্ছে আমাদের পোস্ট-ট্রুথ এরায়। সত্য হয়ে উঠেছে তথ্য আর তত্ত্বেও সত্যতার উপর। ফেক ডেটার ভেতর থেকে তথ্য উদ্‌ঘাটিত হয় ‘সত্যের মতো’। সত্য-উত্তর যুগে আমরা কিভাবে সত্য অনুসন্ধান করতে পারি?

গণতন্ত্র বা সমাজতন্ত্র বা বিশ্বায়নের যে মিথ সমাজে প্রচলিত আছে তা দিন দিন মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি দিলেও বিশ্ব উষ্ণায়ন বা দূষণের মতো গুরুতর বিষয়ের কোনো সমাধান দিতে পারছে না। পুরাতন গল্পগুলো তার সীমাবদ্ধতার দরুণ আর কাজ করছে না এই সমস্তের সমাধানে। এর জন্য নতুন গল্প, মিথ কি তৈরি হয়েছে? প্রযুক্তির যে ব্যাপক পরিবর্তন তাতে মানুষের আয়ু বাড়বে। একই সাথে প্রযুক্তির অগ্রগতির সাথে সাথে মানুষের অনেক পেশা বদলে যাবে। বহু পেশা হারিয়েও যাবে। এমনকি কোডেড মেশিন মোৎসার্টের সুর লিখে ফেলবে। ফলে, ভবিষ্যৎ পৃথিবীর জন্য আপনার সন্তানকে আপনি কী শিক্ষা দিবেন? বিপুল তথ্য ভাণ্ডার থেকে ফেক আর ট্রুথের পার্থক্য করা খুবই ব্যয়বহুল এবটা ব্যাপার। মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা বলে যা জানতাম তা আসলে বড় ধোকা। মানুষ দিন দিন কম্পিউটারের মতো হ্যাকাবল প্রাণী হয়ে উঠছে। ফলে, দুনিয়ায় আমার নিজস্ব কোনো মতামত নাই। ডোলাল্ড ট্রাম্প হয়তো অ্যালগরিদমের মাধ্যমে জানে নেভাদা আর অ্যারিজোয়ানার মানুষের পছন্দ, প্রত্যাশা এক না। ফলে, নেভাদায় তিনি যা বলবেন তার উল্টোটাই অ্যারিজোয়ানায় বলবেন সেই অঞ্চলের মানুষের মন বুঝে। তবে সেই মানুষের সূক্ষ্ম মনের হিসাবটা মেশিন জেনারেটেড। সূত্র জানা মেশিন জানে আপনার সেলফ কিসে স্যাটিসফাড হয়। এইভাবে দুনিয়ায় একদিন জিজিটাল ডিকটেরশিপ কায়েম হবে। মানুষকে আরো বেশি স্বাধীন দেখাবে কিন্তু আসলে সে অ্যালগরিদমের শিকলে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা থাকবে। তার ইচ্ছা বলে আর কিছু থাকবে না। এই ডাটা কে নিয়ন্ত্রণ করবে? রাষ্ট্র না কর্পোরেট? দুনিয়ার ইসলামি জঙ্গীবাদের নামে যে যুদ্ধ কয়েম হয়েছে তা অমূলক। জঙ্গিবাদের কারণে আমেরিকায় যত লোক নিহত হয়, তার থেকে বেশি লোক সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায়। চিনি তার থেকে বেশি লোক হত্যা করে। ম্যাকডোনাল্ড বা কেএফসির মতো ফাস্ট ফুড কর্পোরেশনগুলো আরো বেশি লোক হত্যা করে হাই ক্যালরির প্রসেসড ফুড বিক্রি করে। সেটা কোনো বড় সমস্যা হিসাবে দেখতে আমরা প্রস্তুত বা অভ্যস্ত না। হরারির মতে জঙ্গিবাদীরা মার্কস, ফুকো ও উনিশ শতকের উইরোপীয় র‌্যাডিক্যাল এনার্কিস্ট দ্বারা বেশি প্রভাবিত। ফলে, সন্ত্রাসবাদের সমস্যাগুলোকে প্রচারযন্ত্র যত গুরুত্ব সহকারে প্রচার ও প্রসার করে, তা ততটা গুরুতর না।দুনিয়ার সমস্যা আরো গভীর।পারমানবিক অস্ত্র, ইকোলজিক্যাল পরিবর্তন, প্রযুক্তির ভাঙন, অভিবাসী সংকট ইত্যাদি এমন বহু সমস্যা দুনিয়ায় আছে যা রাজনৈতিক ও দার্শনিকভাবে মোকাবেলা করা দরকার। কিভাবে সেই মোকাবেলা হতে পারে তার কিছু অভাস হারারি রেখেছেন তার বইয়ে। তার দেখার চোখ বিজ্ঞানীর, মন তার মনোবিদের, সিদ্ধান্ত দার্শনিকের। সমস্ত সংকট থেকে উত্তরের জন্য মানুষকে নিজেকে আরো সময় দিতে হবে। মাইন্ডফুলনেসের কথা বলেছেন হারারি। অ্যালগরিদম যেন আপনাকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে। শেষ পর্যন্ত তিনি আশার কথাই বলেছেন। নিজেকে জানার কোনো বিকল্প নাই। নিজেকে জানো। হারারির অনেক কথা ও চিন্তার সাথে আপনি একমত হবেন না। তবে, এটা থট প্রোভোকিং। চিন্তার সূত্রে ঠাসা। Sapiens আর Homo Deus-এর মধ্যবর্তী সংযোগ বৃত্ত হলো 21 lessons for 21 Century. যারা প্রথম দুটো বই পড়েছেন তাদের কাছে অনেক কিছু রিপিটেটিভ লাগতে পারে। তবে সেটা ছাড়া হারারির উপায় ছিল না। এই রিপিটেশনগুলো সেতুর দুই পাড়ের ভিত্তি। যারা পূর্বে দুটো বই পড়েন নি তাদের জন্য এটা স্বাতন্ত্র্য একটা বই। আর যারা আগের দুটো বই পড়েছেন তাদের জন্য রিভিশন সমকালটাকে আরো ভালোভাবে বোঝার জন্য।

২.
21 lessons for 21 Century-এর বাংলাদেশ প্রসঙ্গ :

মজার বিষয় হলো, হারারির 21 lessons for 21 Century বইয়ে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ আলোচিত হয়েছে গ্লোবাল ভিলেজে বসবাসরত উদীয়মান দেশগুলোর অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎে প্রসঙ্গে। প্রায় দুই পৃষ্ঠা লিখেছেন বাংলাদেশ নিয়ে The Technical Challenge অধ্যায়ের শুরুতেই Work পরিচ্ছদে।প্রযুক্তির পরিবর্তনের সাথে সাথে বিশ্বায়নের স্বরূপ পরিবর্তিত হবে। যারা বাংলাদেশের ভবিষ্যতের রূপকার, যারা ভাবেন দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিয়ে তারা কিছু প্রণোদনা, পথের অনুন্ধান পেতে পারেন এখান থেকে। প্রযুক্তির অগ্রগতির সাথে সাথে অ্যালগরিদম ভিত্তিক অটোমেশন বৃদ্ধি পাবে। এই স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির উন্নয়নের ফলে বিশ্বায়নের নেটওয়ার্ক থেকে তারাই বাদ পড়বে যারা নিজেদের ভবিষ্যৎ দুনিয়ার প্রযুক্তির সাথে খাপ খাইয়ে নিতে পারবে না। বাংলাদেশের মতো যাদের অপ্রতুল প্রাকৃতিক সম্পদ রয়েছে তারা এত দিন বিশ্ব বাজারে নিজেদের স্বল্পদক্ষ শ্রম কম দামে বিক্রি করতে পেরেছে। লক্ষ লক্ষ বাংলাদেশি গার্মেন্টস শ্রমিক ইউরোপ, আমেরিকার জন্য পোশাক বানায়। কিন্তু ভবিষ্যতে যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, থ্রি-ডি প্রিন্ট, কম মূল্যে পোশাক তৈরির নতুন প্রযুক্তি আমেরিকার ফিফথ এভিন্যুতে পৌঁচ্ছে যাবে তখন এই স্বল্পদক্ষ শ্রমের আর তেমন মূল্য থাকবে না। ফলে, ক্যালিফোর্নিয়ার টেকনো জায়ান্টরা তাদের মেশিন কোডেড আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স আর নতুন নতুন যন্ত্র দিয়ে বাংলাদেশের শ্রমিকদের থেকে বেশি দক্ষ শ্রমিক দিয়ে পোশাক উৎপাদন করবে।গ্লোবালাইজেশনের ফলে দুনিয়ার উন্নত ও অনুন্নত দেশসমূহের যে অর্থনৈতিক উন্নয়ন এত দিন দেখা যেত প্রযুক্তির উন্নয়নের সাথে সাথে তার অমূল পরিবর্তন হবে। বহু উন্নয়নশীল দেশের অর্থনীতি ধসে যাবে। তার পরিবর্তে উদীয়মান সিলিকন ভ্যালির হাইটেক জায়ান্টদের আবির্ভাব হবে এবং তারাই হবে এই খেলার মাঠের বিজয়ী দল। বাংলাদেশ কিভাবে এই পরিবর্তিত বিশ্বায়নের নতুন সড়কে সংযুক্ত হতে পারে? হারারির ভাষাতেই বলা যাক :

‘বাংলাদেশ বা ভারতের মতো উদীয়মান অর্থনীতির দেশ অবশ্যই এই বিজয়ী দলের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। গার্মেন্টস শ্রমিক ও কল সেন্টার অপারেটরদের দ্বিতীয় প্রজন্মকে ইঞ্জিনিয়ার আর বিনিয়োগকারী হয়ে উঠতে হবে যারা এই সমস্ত কম্পিউটার ও থ্রিডি প্রিন্টারের উদ্ভাবক বা প্রকৃত মালিক।’


বিশ্বায়নের সেতুতে কাঁপন ধরেছে, ভেঙে পড়বে পড়বে অবস্থা।


‘অতীতে দেখা গিয়েছে কোনো দেশ খুব ধীরে ধীরে অগ্রসর হলেও অদক্ষ শ্রমিকরাও কোনে না কোনোভাবে বিশ্বায়নের সাথে সংযুক্ত হতে পেরেছে নিরাপদেই। দ্রুত উন্নয়ন থেকে সঠিক পদক্ষেপ নেওয়া বেশি প্রয়োজনীয়। বিশ্বায়নের সেতুতে কাঁপন ধরেছে, ভেঙে পড়বে পড়বে অবস্থা। যারা সস্তা শ্রমের বাজার থেকে নিজেদেরকে দক্ষশ্রমের বাজারে রূপান্তরিত করতে পেরেছে তারা বিশ্বায়নের এই নড়বড়ে সেতু পার হয়ে গিয়েছে। তাদের জন্য এটা আর কোনো সমস্যা না। কিন্ত যারা নিজেদের কোনো রূপান্তর করতে পারে নি তারা এই গহ্বরে পার হতে পারবে না। যখন অদক্ষ সস্তা শ্রম কেনার কেউ থাকবে না তখন আপনি আপনার ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আগামীর জন্য প্রস্তুত করার জন্য তাদের শিক্ষার পেছনে ব্যয় করতে পারবেন না।’

চীনের উদাহরণ আমরা লক্ষ করতে পারি। অদক্ষ শ্রমঘন গার্মেন্টস শিল্প থেকে চীন সরে যাচ্ছে দিন দিন। বেসিক গার্মেন্টস আর চীন উৎপাদন করে না। হাই ভ্যালু অ্যাডেড আইটেম তারা সেলাই করে। এগুলো হয়তো আর এক বা দুই দশক তারা করতে পারে। প্রযুক্তি উন্নয়ন, সার্ভিস ও দক্ষ জনবল তৈরির পয়সা চীন অদক্ষ শ্রম বিক্রি করে বিশ্ব বাজার থেকে তুলে নিয়েছে গত কয়েক দশকে। ফলে, তাদের পিছন ফিরে তাকানোর আর কিছু নেই। নতুন প্রজন্মকে তারা আগামী দুনিয়া মোকাবেলা করার মতো করে প্রস্তুত করেছে। কিন্তু আশির দশকে প্রতিষ্ঠিত গার্মেন্টস শিল্প থেকে বিগত কয়েক দশকে আমরা যে আয় করলাম তা দিয়ে প্রযুক্তি ও সেবাখাতে খুব একটা বিনিয়োগ আমরা করি নি। আমরা সারা দুনিয়ার পশ ব্র্যান্ডগুলো কাজ করলাম কিন্তু নিজেদের কোনো আন্তুর্জাতিক ব্র্যান্ড তৈরি করতে পারলাম না তৈরি পোশাকের বিশ্ব বাজারে। বস্ত্র শিল্প ছাড়া এই দীর্ঘ সময়ে আর কোনো শিল্প সেই অর্থে গড়ে তুলতে পারলাম না। সেবা খাত, প্রযুক্তিখাত, গবেষণা বলে তেমন কিছুই আমাদের নেই। তবে এই খাত থেকে অর্জিত অর্থ কোথায় কাজে লাগল। ভোগ বিলাশে, অপব্যয়ে? যে পরিমাণ জীবনযাত্রার মানের পরিবর্তন হওয়া দরকার ছিল তা কী হয়েছে আমাদের বিগত দশকের সস্তায় বেচা শ্রম দিয়ে। সে হিসাব করার জন্য অর্থনীতিবিদরা আছেন। সস্তায় শ্রমের দিন শেষ হয়ে আসছে। ফলে আমরা নতুন দিনের উন্নয়নের মহাসড়কে উঠতে পারব কী? পারব কি পারব না তা নির্ভর করছে দীর্ঘমেয়াদি সঠিক পরিকল্পনার উপর। আমরা ইতোমধ্যে দেরি করে ফেলেছি। জন উন্নয়নের যে সমস্ত পরিকল্পনা আছে তা খুবই অপ্রতুল এখানে। হারারি স্পষ্ট করেছেন বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ। এখন করণীয়টা আমাদের।


ঈদসংখ্যা ২০১৯

মৃদুল মাহবুব

জন্ম ৯ অ‌ক্টোবর ১৯৮৪। টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার। চাকরি করেন একটি বহুজা‌তিক কোম্পা‌নিতে।

প্রকাশিত বই :
কবিতা—
জল‌প্রিজমের গান [কবিয়াল, কলকাতা ২০১০]
কা‌ছিমের গ্রাম [চৈতন্য, ঢাকা ২০১৫]
উনমানুষের ভাষা [চৈতন্য, ঢাকা ২০১৭]

ই-মেইল : mridulmahbub@gmail.com