হোম বই নিয়ে বস্তাভরা বিড়াল এবং আকবর আলি খানের একটি গ্রন্থ

বস্তাভরা বিড়াল এবং আকবর আলি খানের একটি গ্রন্থ

বস্তাভরা বিড়াল এবং আকবর আলি খানের একটি গ্রন্থ
6.90K
0

একটি জাতির অস্তিত্ব রক্ষা, জাতীয় জীবনের শক্তি সঞ্চয় এবং প্রজন্মের মহৎ বিকাশের প্রয়োজনে তার জাতীয় ইতিহাস যে কতটা গভীর প্রয়োজনীয় বিষয় তা আধুনিক শিক্ষিত মানুষ মাত্রেই জ্ঞাত। কোনো জাতি যদি তার নতুন প্রজন্মের হাতে সঠিক এবং সুগঠিত ইতিহাস তুলে দিতে ব্যর্থ হয় তবে সে জাতির ভবিষ্যৎ বিশৃঙ্খলা, হীনম্মন্যতা এবং পতনের অন্ধকারে নিমজ্জিত হবে। দুঃখের বিষয় এই ব্যর্থতার অর্গলে আমরাও আবদ্ধ।

বাংলায় মুসলিম ধর্ম প্রচারকদের আগমন, শতাব্দীর পর শতাব্দী মুসলমানদের শাসন এবং অধিকাংশ স্থানীয়দের ইসলামে ধর্মান্তরিত হওয়ার বিষয় নিয়ে বিশ্লেষণধর্মী একটি বই বাংলায় ইসলাম প্রচারে সাফল্য : একটি ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে প্রথমা প্রকাশনী থেকে।

উল্লেখ্য যে বইটির রচয়িতা দেশের প্রবীণ বুদ্ধিজীবী, সাবেক আমলা এবং ইতিহাসের ছাত্র আকবর আলি খান। ১১৯ পৃষ্ঠার এই বইটি তিনি উৎসর্গ করেছেন তার গুরু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের সাবেক শিক্ষক, একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে নিহত অধ্যাপক সন্তোষ চন্দ্র ভট্টাচার্যকে। আকবর আলি খান এগারোটি অধ্যায়ে তার বিশ্লেষণ এবং আলোচনা তুলে ধরেছেন। দশম অধ্যায়ে তিনি উন্মুক্ত গ্রামতত্ত্ব নামে একটি নতুন ধারণা যুক্ত করেছেন।

এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব, আগে বাঙালির ইতিহাস চর্চা বিষয়ে কিছুটা আলোকপাত করা প্রয়োজন। উল্লিখিত এই বইয়ের শেষের দিকে আকবর আলি খান বিখ্যাত ঐতিহাসিক ই এইচ কার-এর হোয়াট ইজ হিস্টিরি বই থেকে একটি উদ্ধৃতি দিয়েছেন। ইতিহাসের তথ্য কে বস্তার সাথে তুলনা করে মি. কার বলেছেন যে ‘বস্তা নিজে নিজে কখনও দাঁড়ায় না, বস্তা তখনই দাঁড়ায় যখন তার মধ্যে কোনো কিছু পুরে দেওয়া হয়।’ অর্থাৎ ঐতিহাসিক তথ্যগুলো নিয়ে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে নির্মোহ তত্ত্বের সমন্বয়ে একটি ইতিহাস কাঠামো দাঁড় করানোই একজন ঐতিহাসিকের গুরুদায়িত্ব। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় বাঙালি জাতির ইতিহাস গঠনের প্রাথমিক পর্বেই ছেঁড়াখোঁড়া তথ্যের বস্তায় ঢুকে পড়েছিল ধর্মীয় বর্ণবাদক্লিষ্ট ধর্মাভিমানের বিড়াল। কাজেই আমাদের জাতীয় ইতিহাসের বস্তাটা দাঁড়ায় নি, ওটা দৌড়চ্ছে। যে কারণে আমাদের ঐতিহাসিকদের শব্দসম্ভারে বহুল ব্যবহারে চকচক করে ছোটলোক, নমঃশূদ্র, নিম্নবর্ণের হিন্দু, যবন, ব্রাহ্মণ, অভিজাত মুসলমান—এমন নানা চেহারার ছুরি। যেন কোনো ঐতিহাসিকের লেখা নয়, কোনো ব্রাহ্মণ পুরুতের চোখ দিয়ে আমরা পাঠ করছি বাংলার ইতিহাস। দুঃখের বিষয় এই প্যারাডাইমের ইতিহাসই এখন পর্যন্ত আমাদের শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানগুলোতে চর্চা হয়, আকবর আলি খানও যে এর খুব বাইরের তা মনে হয় না। মি. খান তার গ্রন্থের শুরুতেই ইংরেজ-রচিত বাংলার ইতিহাসে হিন্দুদের ভীরু ও কাপুরুষ হিসেবে চিহ্নিত করার বিষয় নিয়ে হিন্দু পুনর্জাগরণের পথিকৃৎ বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উষ্মার কথা বলেছেন। ইংরেজদের গড়া হিন্দু ভাবমূর্তি ভেঙে বঙ্কিমের মনের মাধুরী মিশিয়ে গল্প-উপন্যাসে অনন্য সাধারণ হিন্দু চরিত্র সৃষ্টির কথা বলেছেন। এবং বঙ্কিমের লেখা থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছেন : ‘আমাদিগের বিবেচনায়—একখানি ইংরেজি গ্রন্থেও বাংলার প্রকৃত ইতিহাস নাই। সে-সকলে যদি কিছু থাকে, তবে যে সকল মুসলমান বাঙ্গালার বাদশাহ, বাঙ্গালার সুবাদার ইত্যাদি নিরর্থক উপাধি ধারণ করিয়া নিরুদ্বেগে শয্যায় শয়ন করিয়া থাকিত, তাহাদিগের জন্মমৃত্যু গৃহবিবাদ এবং খিচুড়ি ভোজন মাত্র। ইহা বাংলার ইতিহাস নয়, ইহা বাংলার ইতিহাসের এক অংশও নয়’। অতঃপর আকবর আলি খান উল্লেখ করেছেন—মনের মাধুরী মিশিয়ে ইতিহাস লেখার বঙ্কিমের বিখ্যাত সেই আহবান, ‘কে লিখিবে? তুমি লিখিবে, আমি লিখিব, সকলেই লিখিবে।’ এটা খুবই স্পষ্ট যে বঙ্কিমের মন কাতর ছিল একখানা হিন্দুজাতিবাদী ইতিহাস রচনার জন্য, বাঙালির ইতিহাস নয়। তবে তার ওই আহবান কিন্তু ব্যর্থ হয় নি। পরবর্তীকালের অধিকাংশ বাংলাভাষী হিন্দু ঐতিহাসিকেরা তা সার্থক করেছিলেন এবং বাঙালির জাতীয় ইতিহাসের বস্তায় ঢুকে পড়েছিল পালে পালে ধর্মাভিমানের বিড়াল। এর ফলাফল পরবর্তী শতাব্দীতে ছিল বেশ লক্ষণীয়, ধর্মের বাতাবরণে আলাদা হয়ে যায় বাঙালি জাতি। বিশেষ করে রাঢ়কেন্দ্রিক বাঙালি হিন্দুদের মধ্যে বাঙালি জাতীয়তাবাদের চেয়ে তীব্রতা পেয়েছিল সর্বভারতীয় হিন্দু জাতীয়তাবাদ এবং বিপরীত প্রতিক্রিয়ায় অনগ্রসর বাঙালি মুসলমান সমাজে তীব্রতা পায় ধর্মান্ধতা। প্রশ্ন হলো এই ধর্মাভিমান আকবর আলি খান কি শুধু বঙ্কিমে এসেই পেলেন? এর শুরু তো আরও অনেক আগ থেকে।


সাম্প্রদায়িক ইতিহাস ব্যাপক প্রভাব রেখেছিল বাঙালির মেধাবী পুত্র রাজা রামমোহনের উপর এবং পরবর্তীদের উপরেও।


‘ঔপনিবেশিক শাসন—মন ও মননের ওপর কতটা প্রভাব ফেলতে পারে এবং ফেলেছে তার দৃষ্টান্ত অসাধারণ ব্যক্তিত্ব যে বিদ্যাসাগর, তার বেলাতেও দেখতে পাই। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের নির্দেশে বিদ্যাসাগর পাদ্রি ও লেখক ক্লার্ক মার্শম্যান রচিত Outlines of the History of Bengal পাঠ্য-পুস্তকটির অনুবাদ করেন। বইয়ের শেষাংশে সিরাজ-উদ-দৌলা থেকে বেন্টিংক পর্যন্ত সময়কালের ইতিহাস রয়েছে। বিদ্যাসাগরের অনুবাদটি ইংরেজ শাসকদের খুব পছন্দ হয়, তারা বিদ্যাসাগরের অনূদিত বইটিকে ইংরেজিতে অনুবাদ করার সিদ্ধান্ত নেয়। মার্শম্যান স্বয়ং এই অনুবাদের কাজটি করেন, যেটি ১৮৫০-এ A guide to Bengal, being a close translation of Iswar Chandra sharma’s Bengali version of Marshman’s History of Bengal নামে প্রকাশিত হয়। তাদের দিক থেকে এই আগ্রহের কারণ ছিল এই যে, একই মুসলিম শাসনের বিপক্ষে এবং বৃটিশ শাসনের পক্ষে জনমত সৃষ্টিতে সহায়ক হবে। নবাবি শাসনের যে ছবি বইতে রয়েছে তাতে বিদ্যাসাগরের নিজের সংযোজন যুক্ত হয়েছে। বইয়ের বিজ্ঞাপনে বলা হয়েছিল, ”বাঙ্গালার ইতিহাস। অবিকল অনুবাদ নহে। কোনও কোনও অংশ আবশ্যকবোধে গ্রন্থান্তর হইতে সঙ্কলনপূর্বক সন্নিবেশিত হইয়াছে। এই পুস্তকে অতি দুরাচার নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা সিংহাসনারোহণ অবধি, চিরস্মরণীয় লর্ড উইলিয়াম বেন্টিংক মহোদয়ের অধিকার সমাপ্তি পর্যন্ত বৃত্তান্ত বর্ণিত হইয়াছে।” মার্শম্যানের বইতে যেসব জায়গায় নবাবি শাসনের কৃতিত্বের কথা আছে বিদ্যাসাগর তা বাদ দিয়েছেন বা সংস্কার করেছেন। সিরাজ-উদ-দৌলা সম্পর্কে বলা হয়েছে, “তার শাসনামলে প্রায় কোনো ব্যক্তির সম্পত্তি বা কোনো স্ত্রীলোকের সতীত্ব রক্ষা পায় নাই।”’ (সিরাজুল ইসলাম : ১৪১)

এই মনোবৃত্তি যে শুধু বিদ্যাসাগরেরই ছিল তা কিন্তু নয়, এটা তারও অগ্রজ রাজা রামমোহনের মধ্যেও ছিল। তিনি একটি অঞ্চলের বৃহত্তর ভাষিক নৃগোষ্ঠী বাঙালিদের পরিচয়কে হিন্দু ধর্মীয় পরিচয়ে একাকার করে ফেলেছিলেন, যা তার লেখা পড়লেই বোঝা যায়। তার চেয়েও বড় কথা ব্রিটিশ শোষণে বাংলায় যে ১৭৭০ খ্রিস্টাব্দে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ হয় এবং দেশের তিন ভাগের একভাগ লোকের মৃত্যু হয়, তিনি সেই ব্রিটিশ শাসনকে দেখেছেন ঈশ্বরের আশীর্বাদ হিসেবে।

এক পত্রে রামমোহন ইংল্যান্ডের রাজাকে উদ্দেশ্য করে লিখছেন, ‘অবশেষে অপার্থিব ঈশ্বর তার অপরিসীম করুণায় ইংরেজদেরকে উদ্বুদ্ধ করলেন ওই সব পীড়নকারীদের জোয়ালটা ভেঙে ফেলতে এবং উৎপীড়িত বঙ্গবাসীকে তাদের অঙ্কে তুলে নিতে… আপনার কর্তব্যপরায়ণ প্রজারা ইংরেজদেরকে বিজেতা হিসাবে দেখে নি, দেখেছে ত্রাণকর্তা রূপে, আপনাকে তারা কেবল শাসক মনে করে না, বিবেচনা করে পিতা ও রক্ষাকর্তা হিসেবেও।’ [English Works of Rammohun Roy, Calcutta, 1921, p. 440]

কিছুটা প্রসঙ্গান্তর হচ্ছে, তবুও এই মনোবৃত্তিকে বুঝতে হলে আরেকটা বিষয়ে কিছুটা আলোকপাত করা দরকার এখানে, সেটা হলো ব্রিটিশ শাসন। ব্রিটিশরা ভারত মহাদেশে এসেছিল আমেরিকার মতো বিরাট কলোনি হারিয়ে। সাথে ছিল ভিন্ন দেশ দখল এবং কলোনি শাসনের সাফল্য ও ব্যর্থতার বিরাট অভিজ্ঞতা। ছিল ইউরোপের রেনেসাঁ এবং শিল্পবিপ্লবের জ্ঞান ও প্রযুক্তি। (আমাদের কাছে সেই জ্ঞান এসেছিল পরাধীনতার শিকল চুয়ে। অনেকেই মনে করেন ব্রিটিশরা দেশ দখল না করলে আমরা এই জ্ঞান ও প্রযুক্তি পেতাম না। এটা ভুল। প্রযুক্তি নিজেই নিজেকে বিক্রির জন্য আমাদের দ্বারস্থ হতো। তাছাড়া ইউরোপীয় অন্য জাতিগোষ্ঠীর মাধ্যমেও আধুনিক প্রযুক্তির সাথে আমাদের পরিচিত হওয়ার সুযোগ ছিল।) তারা বাংলার মতো একটি সমৃদ্ধিশালী দেশ দখল করেই ক্ষান্ত ছিলেন না, ধীরে ধীরে দখল করেছেন সমগ্র ভারতবর্ষ। আধুনিক গবেষকদের গবেষণায় প্রচুর নথিপত্র বেরিয়ে আসছে, দেখা যাচ্ছে তাদের যুদ্ধ জারি ছিল দুই ধারায়। একটি সম্মুখ সমরে, অন্যটি ছিল বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ে। এই দ্বিতীয় যুদ্ধক্ষেত্রে তাদের কোনো প্রতিপক্ষ ছিল না।

অথচ উইলিয়াম জোন্স, লর্ড মেকলে, স্টুয়ার্ট মিলের মতো অসংখ্য বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তিশালী যোদ্ধা ছিল তাদের দলে। বিশেষ করে লন্ডনস্থ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির চাকর, যে কিনা দার্শনিক জেমস মিলেরও বাপ, কোনোদিন ভারতবর্ষে না এসে সেই জেমস মিল লিখলেন, দি হিস্টিরি অব ব্রিটিশ ইন্ডিয়া। ভারতবর্ষের ইতিহাসকে তিনি তিনটি সাম্প্রদায়িক যুগে ভাগ করেছিলেন : ১. সোনালি যুগ বা প্রাচীন হিন্দুযুগ (যদিও আধুনিক ঐতিহাসিকদের কাছে এটি এক কাল্পনিক যুগ) ২. মুসলিম যুগ বা নিপীড়নের যুগ আর ৩. মুক্তির যুগ বা ব্রিটিশ শাসনের যুগ। জেমস মিলের এই সাম্প্রদায়িক ইতিহাস ব্যাপক প্রভাব রেখেছিল বাঙালির মেধাবী পুত্র রাজা রামমোহনের উপর এবং পরবর্তীদের উপরেও।

এই সময় থেকে দেখা যায় একদল সাম্প্রদায়িক হিন্দু বুদ্ধিজীবী বাঙালির সব কিছুকেই তাদের ধর্মের রঙে রঞ্জিত করার পাঁয়তারায় রত। ঐতিহাসিক তথ্যসূত্র না থাকলেও কল্পনা এবং পুরাণের আশ্রয়ে খ্রিস্টপূর্ব যুগে নিয়ে যান বাংলায় তাদের ধর্ম ও সম্প্রদায়ের শিকড়। এমনকি বাঙালি পরিচয়, যা কিনা মধ্যযুগে মুসলমান শাসনের সময় বাংলার শাসক এবং অধিবাসীদের পরিচয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তাকেও হিন্দুত্বের রঙে রঞ্জিত করার অপচেষ্টা চলে; এমনকি বাঙালির ভাষা, যা সেন এবং সেন-পরবর্তী সময়েও ঘৃণা করত ব্রাহ্মণরা। মুসলিম শাসনের সময়ে গণযোগাযোগ এবং তাদের ধর্মপ্রচারের স্বার্থে এবং মুসলিম শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতায় ব্রাহ্মণরা যে ভাষার ব্যবহার শুরু করেন, ঊনবিংশ শতাব্দীতে সেই যবন-ম্লেচ্ছদের ভাষাকে সংস্কারের নামে কিভাবে পৈতে পরানোর চেষ্টা হয়েছে তাও আমরা দেখতে পাই শব্দসম্ভারের বিবর্তনের দিকে তাকিয়ে।

‘বাংলা ভাষার প্রাচীন নিদর্শন “চর্যাপদে”র মোট দু’হাজার শব্দের মধ্যে প্রকৃত তৎসম শব্দ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র একশ’, শতকরা হিসাবে দাঁড়ায় পাঁচটি। পরবর্তীকালে শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যে সংস্কৃত শব্দের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়, কিন্তু তখনো অনুপাত শতকরা ১২.৫-কে ছাড়িয়ে যায় নি।

তৎসম শব্দ বাড়ল ঊনবিংশ শতাব্দীর গদ্যে ব্রাহ্মণ পণ্ডিতদের হস্তক্ষেপে। বাড়তে বাড়তে তা শতকরা ৮০-তে এসে দাঁড়ায়। ১৮১৮-তে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের বাংলা ও সংস্কৃতের অধ্যাপক উইলিয়াম কেরী (১৭৬১-১৮৩৪) লিখছেন, ‘The Bengalee may be considered as more nearly allied to the sangskrit than any of the other languages of India… four-fifths of the word in the languages are pure sangskrit’.” (সিরাজুল ইসলাম : ১৭)

তবে বঙ্কিমের যে বিক্ষোভ—ব্রিটিশরা ইতিহাস-বইতে হিন্দুদের ভীরু কাপুরুষ হিসেবে দেখিয়েছেন—তার কারণ ভিন্ন। ইংরেজগণ বাংলার শাসন ক্ষমতা দখল করেছিল মুসলিম শাসকদের হাত থেকে। আগের প্রায় ছয়শত বছরে বাংলা মুসলিম রাজ-শক্তি দ্বারাই শাসিত ছিল। ফলে ইতিহাস লিখতে গেলে এই পর্বের নৃপতিগণের শৌর্য-বীর্য, বিজয়ের কথা আসবে। ব্রিটিশরা ১৭৮৮ সালে সৈয়দ গোলাম হোসেন সলিমকে দিয়ে এই পর্বের একটি ইতিহাস রচনা করিয়েছিলেন ‘রিয়াজ-উস-সালাতিন’ নামে। যেহেতু তার পূর্ববর্তী ইতিহাসের উপাদান তখনও বেশ দুর্লভ ছিল, ফলে অনেক হিন্দু স্কলারের কাছেই এটা ছিল একটি উষ্মার কারণ। যদিও এই উষ্মাকেও ব্রিটিশরা সক্রিয়ভাবে পরিপুষ্ট করেছেন ১৮৫৭-র সিপাহি বিদ্রোহ পর্যন্ত, তাদের সমর্থকগোষ্ঠী রচনার কাজে।

আকবর আলি খান তার আলোচ্য বইয়ে বেশ কিছু জনগণনার পরিসংখ্যান তুলে ধরেছেন। এর মধ্যে (৬৭ নং পৃষ্ঠায়) ৭ নং সারণিতে জেলাভিত্তিক একটি খুচরো পরিসংখ্যান পাই। যেখানে দেখা যাচ্ছে মুর্শিদাবাদ, নদীয়া, বাকেরগঞ্জ, ঢাকা এবং চট্টগ্রাম জেলার ১৮০১ সালের জনসংখ্যায় মুসলমানদের হার। ১৮৫৫ সালের যশোর ও ফরিদপুরের হারও দেখা যাচ্ছে। উল্লেখ্য যে, তার সমগ্র আলোচনায় ১৭৭০ সালের দুর্ভিক্ষের বিষয়টি একবারও উল্লেখ করেন নি। যে দুর্ভিক্ষে বাংলার এক কোটির অধিক অর্থাৎ তিন ভাগের একভাগ লোকের মৃত্যু হয়েছিল এবং ধারণা করা হয় যার একটি বড় অংশ ছিল বাংলার দরিদ্র মুসলিম চাষি। তবে শুরুতেই তিনি ১৮৭২ সালের সমগ্র বাংলার জনগণনার কথা বলেছেন। তাতে দেখা যায়, বাংলার প্রায় অর্ধেক লোক ধর্মে মুসলমান এবং তিনি বঙ্কিম বাবুর সেই বিখ্যাত বিস্ময়কর প্রশ্নটিও তুলে ধরেছেন।

‘দেশীয় লোকের অর্ধেক অংশ কবে মুসলমান হইল? কেন স্বধর্ম ত্যাগ করিল?’ এ প্রশ্ন এক বিস্ময়কর প্রশ্নই বটে। কেননা কলোনিয়াল হিন্দু-পুনরুত্থানবাদীদের কাছে হিন্দু গাছ-পাথরের মতো চিরকাল যেন এই বাংলায় ছিল।

নীহাররঞ্জন রায়ের বক্তব্যে : ‘প্রাক-গুপ্তপর্বে বাঙলার জৈন, আজীবক ও বৌদ্ধধর্মের প্রসারের অল্পবিস্তর প্রমাণ যদি-বা পাওয়া যায়, আর্য-বৈদিক বা ব্রাহ্মণ্যধর্মের প্রসারের নির্ভরযোগ্য প্রমাণ প্রায় কিছুই নাই। বেদ-সংহিতায় বাংলাদেশের তো কোনও উল্লেখই নাই; ঐতরেয় আরণ্যক গ্রন্থে যদিবা আছে (?), তাহাও নিন্দাচ্ছলে। এমনকি বৌধায়নের ধর্মসূত্র রচনাকালেও বাঙলাদেশ আর্য-বৈদিক সংস্কৃতিবহির্ভূত। …জৈন-বৌদ্ধ-আজীবকেরা প্রসারের চেষ্টা কিছু করিয়াছিলেন এবং অল্পবিস্তর সার্থকতাও লাভ করিয়াছিলেন; কিন্তু বৈদিক ধর্মের দিক হইতে সে চেষ্টা বিশেষ হইয়াছিল বলিয়া মনে হয় না, সার্থকতা লাভ তো দূরের কথা। বরং বৈদিক ব্রাহ্মণ্য উন্নাসিকতা বাঙলাদেশকে বহুদিন অবজ্ঞার দৃষ্টিতেই দেখিত।‘’ (নীহাররঞ্জন : ৬৩০-৬৩১)

আড়াই থেকে তিন হাজার বছর ধরে এই হিন্দুত্ববাদ বাংলার তিনটা বিষয়কে প্রচণ্ডভাবে ঘৃণা করে এসেছে : ১. বাংলার মাটি, আর তাই উত্তর ভারত থেকে এদেশে কেউ এলে তার জন্য প্রায়শ্চিত্ত বিধান; ২. বাংলার মানুষ, যাদের তারা চিরকাল ঘৃণা করে সম্বোধন করেছে—দাস-দস্যু, ম্লেচ্ছ, নেড়ে, নমঃশূদ্র, অন্ত্যজ, ছোটলোক; ৩. এদেশের ভাষা—যাকে তারা অবজ্ঞা করেছে পাখির ভাষা বলে। বাংলার মাটি মানুষ এবং সংস্কৃতির প্রতি এত দীর্ঘ ঘৃণার ইতিহাস আর কারো নেই।

প্রশ্ন হলো এই ব্রাহ্মণ্যবাদ বা বর্ণাশ্রম ধর্ম কবে কিভাবে বাংলায় এল? স্থানীয়দের মধ্যে তাদের অনুসারী তৈরিই-বা হলো কিভাবে? আর সেই ঘৃণারই-বা কী হলো? এসব প্রশ্নের উত্তর না জেনে বাংলার মুসলমানদের ইতিহাস খুঁজতে যাওয়া এখন বেশ কঠিন কাজ বলেই মনে করি। এটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। যদিও আকবর আলি খানের আলোচনা এ নিয়ে নয়, তবু বাংলায় মুসলমানদের সংখ্যাবৃদ্ধির কারণ বুঝতে হলে এই প্রশ্নের উত্তর যে জরুরি!

এখানে অনিবার্যভাবে একটি প্রশ্ন আসবে—হিন্দু ধর্ম কী? এর বিস্তর উত্তর দিতে গেলে প্রসঙ্গান্তর ঘটবে। কাজেই সংক্ষেপে বলা যেতে পারে—ব্রাহ্মণ নেতৃত্বাধীন ভারতবর্ষীয় পৌত্তলিক ধর্মগুলোর সমন্বিত নাম ‘হিন্দুধর্ম’ বা ব্রাহ্মণ্য ধর্ম বা বর্ণাশ্রম ধর্ম, যা সনাতন ধর্ম নামেও পরিচিত। আবার খ্রিস্টপূর্ব যুগ থেকে পারস্য, আরব, গ্রিকসহ পশ্চিমা দুনিয়ার লোকেরা হিন্দুকুশ পর্বতের পূর্বদিকের জনপদকে হিন্দুস্থান এবং লোকদের হিন্দু বলে চিহ্নিত করত। তবে প্রবল পৌত্তলিকতা বিরোধী মুসলিম রাজশক্তি ভারত দখল করার পর থেকেই মূলত ব্রাহ্মণ নেতৃত্বাধীন পৌত্তলিক ধর্ম বুঝাতে হিন্দু শব্দটির ব্রান্ডিং হয়। অতএব এই ব্রাহ্মণ্য ধর্ম বা হিন্দুধর্মকে বুঝতে হলে আগে জানা দরকার এর নিউক্লিয়াস ব্রাহ্মণদের সম্পর্কে।

বৈদিক যুগে উত্তর ভারতের আর্য জনগোষ্ঠীর ধর্ম এবং শিক্ষা সংক্রান্ত বিষয়াদি নিয়ে যে শ্রেণি কাজ করত তারা ব্রাহ্মণ বলে তাদের সমাজে পরিচিত ছিল। এরা ছিল ক্ষত্রিয় বা শাসক শ্রেণি, বৈশ্য বা ব্যবসায়ী শ্রেণি, শূদ্র বা উৎপাদক শ্রেণির মতো একটি সামাজিক বৃত্তিমূলক সম্প্রদায়। তখনও ব্রাহ্মণরা সমাজের শ্রেষ্ঠ বর্ণ হিসেবে স্বীকৃত ছিল না। ধারণা করা হয় খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম শতকের পরে বৈদিক ধর্মের ব্যাপক স্খলন হলে স্খলিত ব্রহ্মণেরা যোগ্যতার বিষয়টিকে উপেক্ষা করে নিজ সন্তানদের ব্রাহ্মণ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে থাকেন। ফলে ব্রাহ্মণত্বের বিষয়টি বংশানুক্রমিক একটি বর্ণ সম্প্রদায়ে উপনীত হয়। জন্মসূত্র ধরে মানুষকে যোগ্য-অযোগ্যের কাতারে ফেলে দেয়ার এই ভুল প্রক্রিয়াটি ধীরে ধীরে কঠোর হতে থাকে। বিশেষ করে জনপদের অধিকাংশ সাধারণ মানুষ—যারা উৎপাদক শ্রেণি বা শূদ্র, তাদেরকে এই মেকি ব্রাহ্মণরা শিক্ষা ও শাস্ত্র পাঠ থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত করে সামাজিক আইন প্রণয়ন করে। যেহেতু এবার তাদের বংশাবলি নিয়ে খেয়ে-পড়ে থাকার প্রশ্ন, অন্যের শ্রম শোষণ করার বিষয়টি ছিল অপরিহার্য। কাজেই সমাজে নিজেদের প্রয়োজনীয়তা এবং শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণে সৃষ্টি করতে থাকে নানা গল্প-উপকথা এবং সামাজিক বিধান। যদিও এই শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ প্রক্রিয়ায় একসময় বাধা হয়ে দাঁড়ায় ক্ষত্রিয় সম্প্রদায়।

উপমহাদেশের প্রেক্ষিতে খ্রিস্টপূর্ব ৭ম শতক থেকে খ্রিস্টীয় ৩য় শতক পর্যন্ত সময়টা ছিল ব্রাহ্মণদের জন্য ক্রান্তিকাল এবং বৌদ্ধধর্মের উত্থান ও সোনালি যুগ। এই সময়ে প্রায় রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতাহীন ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়কে আশ্রয় খুঁজতে হয়েছে জনপদগুলোর সাধারণ মানুষের কাছে। এই দুঃসময়ের যুগেই আসলে তারা কৌশলী হয়ে ওঠে। যেহেতু সাধারণের থেকে পৃষ্ঠপোষকতা পেতে হলে তাদের পূজিত দেবদেবীকে মান্যতা দিতে হবে, সৃষ্টি করতে হবে তাদের পূজার মন্ত্র। ফলে জনপদে পূজিত হয় এমন অনেক অ-বৈদিক এবং গুরুত্বহীন বৈদিক দেবতাদের গুরুত্ব বেড়ে যায়। গুরুত্বহীন হয়ে পড়তে থাকে বৈদিক ধারার মূল দেবদেবীরা। অন্যদিকে জনপদের জনপ্রিয় লোকদেবতাদের উচ্চ মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করতে বৈদিক যোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে এবং ব্রাহ্মণদের স্বার্থ রক্ষায় সৃষ্টি করা হয় নানান পুরাণ। কখনো কখনো বিভিন্ন অঞ্চলের কাছাকাছি চরিত্রের লোকদেবতাদের একটি বিশেষ দেবতায় বা দেবীতে রূপান্তরের কাজটিও করেছেন এই ব্রাহ্মণরা।


মধ্যযুগ পর্যন্ত বাংলায় ব্রাহ্মণদের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে একটি তথ্য অনস্বীকার্যভাবে উঠে আসে, বাংলায় ব্রাহ্মণরা বহিরাগত।


এই সমস্ত নব ধারার দেবদেবী এবং মিথের উপর ভিত্তি করে খ্রিষ্টীয় ৪র্থ ও ৫ম শতকের দিকে সৃষ্টি হতে থাকে ব্রাহ্মণ-নেতৃত্বাধীন হিন্দুধর্ম। বৌদ্ধধর্মের লোভ-কাম-ক্রোধহীন বৈষয়িকতা শূন্য আদর্শ বা শীলের বিপরীতে এই ব্রাহ্মণরা চালু করে অর্থকাম ও মোক্ষের মতো চূড়ান্ত বৈষয়িক আদর্শ। সাথে স্থানীয় দেবতাদের নিয়ে নানান রকম মুগ্ধ হওয়ার মতো পুরাণ। জমে যেতে থাকে ব্রাহ্মণ-নেতৃত্বাধীন নানা রকম পৌত্তলিক ধর্ম। যাদের আমরা এক নামে আজ হিন্দুধর্ম বলে জানি। এ বিষয়ে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী মহাশয়ের বক্তব্য পাঠ করা যেতে পারে :

অশোক রাজার সময়ে—মৌর্য্যবংশের অধিকারকালে—মগধ সাম্রাজ্যের উন্নতির মুখে—কৃষ্টীয় শক আরম্ভ হইবার ২/৩ শত বৎসর পূর্ব্বে, যখন সভ্য ভারতের অধিকাংশ লোকে বৌদ্ধধর্ম্মে দীক্ষিত হয়—যখন বুদ্ধদেবের নাম বিশ্বামিত্র, বাদরায়ণ প্রভৃতি বেদপ্রবর্ত্তক ঋষিদিগের নাম ঢাকিয়া ফেলে—যখন ব্রাহ্মণগণও আমাদের সর্ব্বনাশ হইল মনে করিয়া বৌদ্ধধর্ম্মের নব অভ্যুদয় দর্শনে বিস্ময়াপন্ন হন, তখন কে ভাবিয়াছিল যে, ঐ অল্পসংখ্যক হীনবল, বীর্য্যহীন, বিচারপরাজিত ব্রাহ্মণগণই আবার ভারতবর্ষের একাধিপতি হইবেন…

বিচ্ছিন্ন ক্ষমতাশূন্য ব্রাহ্মণদিগের মধ্যে একটি শক্তি ছিল।… এখন যেমন লোকের স্বদেশহিতৈষিতা (patriotism) বলিয়া একটি শক্তি জন্মিতেছে, ব্রাহ্মণদিগের মধ্যে তৎকালে স্বশ্রেণীর অর্থাৎ ব্রাহ্মণজাতির (সমস্ত দেশের বা লোকের নয়) ঐক্য এবং ক্ষমতা বজায় রাখিবার জন্য একটি প্রবৃত্তি ছিল।

…একে বৌদ্ধধর্ম্ম রাজার ধর্ম্ম, তাহাতে ধর্ম্মপ্রচার জন্য লোক নিযুক্ত, তাহার উপর আবার বৌদ্ধগণ যে কেবল ভিন্নধর্ম্মাবলম্বীকে স্বধর্ম্মে দীক্ষিত করিতে ইচ্ছুক, এমন নহে—যে কোন জাতীয় লোককেই উন্নত পদ প্রদানেও কাতর নহে।

…সুতরাং অনেক লোক ঐ ধর্ম্মে আসিয়া পড়িল। হিন্দুস্থানের পশ্চিমাংশই ব্রাহ্মণদিগের প্রধান স্থান; ব্রাহ্মণগণ এখন আপনাদিগের ভ্রম দেখিতে পাইলেন; তাহারাও সাধারণ লোকদিগকে আপনার দলে আনিবার চেষ্টা করিতে লাগিলেন; যেখানে বৌদ্ধদিগের ক্ষমতা প্রবল হয় নাই—সেইখানে যাইয়াই তাহাদিগকে স্মৃতি উপদেশ দিতে আরম্ভ করিলেন; অনার্য্যদিগের দেবতা আপন দেবতা বলিয়া গ্রহণ করত দলবৃদ্ধি করিতে লাগিলেন।

…অনার্য্যদিগের প্রথম দীক্ষা দক্ষিণ-রাজবারায় হয়। দক্ষিণ-রাজবারায় নিষেধ বলিয়া একটি রাজত্ব ছিল। নূতন যে পঞ্চম বর্ণ পুরাণে উল্লিখিত আছে, সে পঞ্চম বর্ণের নাম নিষাদ (নিষাদ ও নিষদ একই শব্দ)। তাহাতে বোধ হয়, প্রথম অনার্য্য-প্রবেশ এইখানেই ঘটে। দক্ষিণ-রাজাবারায় হিন্দুদিগের প্রধান স্থান। শিব ও শক্তির উপাসনা ব্রাহ্মণেরা এইখান হইতেই প্রাপ্ত হন।

…অশিক্ষিত লোকদিগের পক্ষে ব্রাহ্মণ্য যত সুবিধা, বৌদ্ধ এত নহে। ব্রাহ্মণধর্ম্মের বারোটি সংস্কার আছে। একটি ছেলে হইলে গর্ভ হইতে আরম্ভ করিয়া ছেলের বিবাহ পর্য্যন্ত লোকে বারোবার আমোদ করিতে পারিবে এবং ঐ বারোটি সংস্কারই তাহারা সমস্ত জীবনের মধ্যে সুখের দিন বলিয়া মনে করে।… শেষ বৌদ্ধদিগের মধ্যেও পৌত্তলিকতা প্রবেশ করিয়াছিল, কিন্তু সে এক বুদ্ধের উপাসনা মাত্র—হিন্দুদিগের পৌত্তলিকতা দেশভেদে ভিন্ন। যে দেশের লোক যে দেবতা চায়, সে সেই দেবতা উপাসনা করিতে পারে।

…শিবভক্ত শিব উপাসনা করিল, বিষ্ণভক্ত বিষ্ণু উপাসনা করিল—অথচ ব্রাহ্মণেরা সর্ব্বত্র মান্য হইল। উপরি-উক্ত প্রবন্ধে প্রমাণ হইবে, ইতর লোককে স্বধর্ম্মে আনয়ন করিবার জন্য বাহ্যিক যে সকল আড়ম্বর আবশ্যক, তাহাতে বৌদ্ধ অপেক্ষা ব্রাহ্মণের সৌভাগ্য অধিক।

এই সময়ে ভক্তিমার্গ ব্রাহ্মণেরা উপদেশ দিতে আরম্ভ করেন। ঈশ্বরে অর্থাৎ যে কোন দেবতায় পরম অনুরাগই ভক্তি—সকলের সার ভক্তি, মুক্তি তার দাসী। পুরাণ বরাবর এই দুই সুরে গাইয়াছেন, ভক্তি ও জ্ঞান। জ্ঞান শিক্ষিতদিগের জন্য, ভক্তি অশিক্ষিতের জন্য। ভক্তিতে শুদ্ধ যে অনার্য্যগণ মোহিত হন, এমন নহে—ভক্তিতে অনেক খাঁটি বৌদ্ধও গলিয়া দেবোপাসক হইয়াছেন।

…ভক্তি গাঢ় হইয়া একবার মস্তকে প্রবেশ করিলে লোকের বুদ্ধিগুলি উচ্চতর সমালোচনায় কিরূপ অপারগ হয়, তাহা আমরা প্রত্যহ দেখিতে পাইতেছি। সুতরাং চার্ব্বাক ও বৌদ্ধ যে উহাকে ভয় করিবে, আশ্চর্য্য কি?

…হিন্দুরা প্রচারকার্য্যও ছাড়েন নাই। বৌদ্ধেরা তাহাদের ধর্ম্মশাস্ত্র প্রচার করিত। হিন্দুরা শেষ পুরাণ পাঠ আরম্ভ করিলেন।…বৌদ্ধদিগের ধর্ম্মব্যাখ্যা অপেক্ষা হিন্দুদিগের পুরাণপাঠের মোহিনী শক্তিও অবশ্য অধিক। এই পুরাণপ্রচার আরম্ভ হইয়া অবধি অশিক্ষিতগণকে হিন্দুমতে আকর্ষণ করিবার বিশেষ সুবিধা হইল। (হরপ্রসাদ : ৩০১)

কিন্তু এই প্রক্রিয়াটি বাংলায় এসেছিল খ্রিষ্টীয় নবম/দশম শতকের পরে। যদিও গুপ্তযুগের শেষ দিকে ৫ম/৬ষ্ঠ শতকে বাংলায় প্রথম বৈদিক ব্রাহ্মণদের আগমনের খবর মেলে। অনেকটা প্রবাসীর মতো। ধর্মপ্রচারও তাদের উদ্দেশ্য ছিল না। দানপ্রাপ্ত জমিতে চাষ-বাস করে জীবিকা নির্বাহই তাদের লক্ষ্য ছিল। পরে যখন নবম/দশম শতকে ব্রাহ্মণদের মূল অংশ ধর্ম-মিশনে আসে এবং আদিশূরের যজ্ঞের মিথ তৈরি করে তখন হয়তো ওই পুরনো ব্রাহ্মণদের মন্ত্রতন্ত্র ভুলে যাওয়া ‘চাষি-ব্রাহ্মণ’ হিসেবে হেয় করার কথা আমরা জানতে পারি।

খ্রিস্টীয় ১০ম শতকের দিকে বাংলায় ব্রাহ্মণদের কিছুটা প্রাদুর্ভাব দেখা যায়। এরা কেউ কেউ আসে পাল-রাজন্যদের কাছে কাজের খোঁজে, কেউ কেউ জীবিকার প্রয়োজনে কোমগুলোর দেবদেবীদের পুরোহিতের স্থান দখলের আশায়। এ সময়ে তন্ত্রের প্রভাবে বাংলার বৌদ্ধধর্মে সৃষ্টি হয়েছিল নানা রকম শাখা-উপশাখা। যা ছিল প্রায় নিম্নমানের পৌত্তলিক ধর্ম। ব্রাহ্মণদের কাছে এটা ছিল বাংলার ধর্মসমাজকে গ্রাস করার একটি মোক্ষম সময়। বৈষ্ণব ধারার ব্রাহ্মণরা আগেই ঘোষণা করে রেখেছিল গৌতম বুদ্ধ হলেন দেবতা বিষ্ণুর অবতার। অন্যদিকে ভারতবর্ষের বিভিন্ন স্থানে গৌতমবুদ্ধের মূর্তি রূপান্তরিত হচ্ছিল শিবমূর্তিতে।

খ্রিষ্টীয় একাদশ শতকে বহিরাগত হিন্দু সেনবংশ বাংলার রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের পর সমাজে প্রভাবশালী হয়ে ওঠে ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়। সেন-শাসনের দেড়শ বছরে তারা উত্তর ও পশ্চিম বাংলার ধর্মসমাজে কিছুটা আধিপত্য সৃষ্টি করতে পারলেও পূর্ব ও দক্ষিণ বঙ্গে ততটা সফল হতে পারে নি।

কুলজি গ্রন্থগুলি বাংলার ব্রাহ্মণদের বংশবৃত্তান্ত। ধ্রুবানন্দ মিশ্রের মহাবংশাবলি, নুলো পঞ্চাননের গোষ্ঠীকথা, বাচস্পতি মিশ্রের কুলরাম, ধনঞ্জয়-এর কুলপ্রদীপ, হরি মিশ্র ও এড়ু মিশ্রের কারিকা, সর্বানন্দ মিশ্রের কুলতত্ত্বার্ণব, বরেন্দ্র কুলপঞ্জিকা ও কুলার্ণব-ই সর্বাধিক পরিচিত। বেশিরভাগই আধুনিক যুগের গোড়ার দিকে লেখা, যদিও পঞ্চদশ-ষোড়শ শতকেই কয়েকটির রচনার সূত্রপাত। এ গ্রন্থগুলি যেসব কাহিনি বর্ণনা করে তা প্রায়ই পরস্পরবিরোধী ও অসঙ্গতিতে পূর্ণ। কিন্তু রূপভেদ থাকলেও একটি কেন্দ্রীয় কাহিনি মোটামুটি এক রকম। আদিশূর নামে বাংলার এক রাজা ছিলেন। যে কিনা যজ্ঞের জন্য পাঁচজন ব্রাহ্মণকে কান্যকুব্জ থেকে আনিয়েছিলেন। ঐতিহাসিকরা মনে করেন, আদিশূরের কাহিনির কোনো ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই। নৃপেন্দ্র কুমার দত্ত দেখিয়েছেন, কোনো বিখ্যাত পাল বা সেনরাজার নামের সঙ্গেই যে কুলজি গ্রন্থপ্রণেতারা পরিচিত ছিলেন এমন নিদর্শন নেই। সমসাময়িক লেখমালায় এবং পুঁথিপত্রে আদিশূর বলে কোনো রাজার উল্লেখ পাওয়া যায় না। এমন কোনো সাক্ষ্যপ্রমাণও নেই যে এই ব্রাহ্মণদের আসা থেকে বল্লাল সেনের রাজত্বকাল পর্যন্ত অন্তবর্তী শতাব্দীগুলিতে বাংলার ব্রাহ্মণরা কান্যকুব্জ ব্রাহ্মণ থেকে তাদের বংশপরম্পরা দাবি করেছেন। কাজেই নৃপেন্দ্র কুমার এই সিদ্ধান্তে আসেন যে, আদিশূরের কাহিনি কল্পিত ও নানা টুকরো ঘটনা জোড়াতালি দিয়ে অনেক পরে নির্মিত হয়েছিল। রমেশচন্দ্র মজুমদারও কুলজি গ্রন্থগুলির গ্রহণযোগ্যতা সম্পর্কে তার গবেষণাগ্রন্থে বলেছেন, এই কাহিনির ঐতিহাসিকতা নিয়ে এতটাই সন্দেহের অবকাশ আছে যে, একে বাংলার সামাজিক ইতিহাসের উপাদান হিসেবে একেবারেই গ্রহণ করা যায় না।

তবে বাংলার পুরাণগুলি স্বীকার না করলেও, ব্রাহ্মণরা যে সকলেই এক অভিন্ন শ্রেণিভুক্ত ছিলেন না, কুলজিগুলি সেই সাক্ষ্যই বহন করে। এগারো শতকে এই ব্রাহ্মণদের আমরা দু’ভাগে বিভক্ত দেখতে পাই। রাঢ়ীয় ও বারেন্দ্র ব্রাহ্মণ। এরা আবার কুলীন ও ভঙ্গকুলীন—এই দুই ভাগে বিভক্ত; শ্রোত্রিয় ও বৈদিক ব্রাহ্মণ, সপ্তশতী, মধ্যশ্রেণি, গৌড়ীয় ও বঙ্গজ ব্রাহ্মণ, গ্রহ-বিপ্র, বর্ণ ও অগ্রদানী ব্রাহ্মণ—এদের অসংখ্য উপভেদ এবং গোত্র, প্রবর, চরণ, শাখা, মেল, গাঞী ও আরও নানা বিভাগ—যদিও সকলেই ব্রাহ্মণ বন্ধনীভুক্ত।

মধ্যযুগ পর্যন্ত বাংলায় ব্রাহ্মণদের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে একটি তথ্য অনস্বীকার্যভাবে উঠে আসে, বাংলায় ব্রাহ্মণরা বহিরাগত। যদিও উত্তর-ভারতের ব্রাহ্মণরা এই বঙ্গদেশীয় ব্রাহ্মণদের ‘ব্রাহ্মণ’ বলে স্বীকার করেন না। এদেরকে তারা নকল ব্রাহ্মণ, ম্লেচ্ছ, ছোটলোক বলে হেয় করে থাকেন। হতে পারে ঠিক ব্রাহ্মণ নয়, ব্রাহ্মণদের সহযোগী-সহচর, সন্ন্যাসী অথবা ভবঘুরে ভাগ্যান্বেষীদের ছদ্মবেশী পরিচয়ের উত্তরাধিকারী এরা। নৃতাত্ত্বিক রিপোর্ট বিশ্লেষণ করতে গিয়ে নীহাররঞ্জনও একথা উল্লেখ করেছেন : ‘আশ্চর্যের বিষয় সন্দেহ নাই, বাঙালি ব্রাহ্মণদের সঙ্গে গাঙ্গেয় ভারতের ব্রাহ্মণদের জনতাত্ত্বিক আত্মীয়তা বাঙালি ব্রাহ্মণ-বৈদ্য-কায়স্থদের জনতাত্ত্বিক আত্মীয়তা অপেক্ষা কম; বরং বাঙালি ব্রাহ্মণদের আত্মীয়তা মধ্যভারতীয় অব্রাহ্মণদের সঙ্গে বেশি’ (নীহাররঞ্জন : ৮৩)। সে যাই হোক, বাংলায় এদের বর্ণবাদী ঘৃণার ছুরিখানা কিন্তু উত্তর-ভারতীয় ব্রাহ্মণদের মতোই চকচকে।

কথিত আছে রাজা বল্লাল সেন তার সময়ে ব্রাহ্মণদের উপর একটি আদমশুমারি করেছিলেন। ৩৫০ ঘর রাঢ়ী, ৪৫০ ঘর বারেন্দ্রী ছিলেন। এর ওপর, কিছু সপ্তশতী, কিছু পাশ্চাত্য, কিছু দাক্ষিণাত্য ব্রাহ্মণও ছিলেন। সব মিলিয়ে ২০০০ হাজারের বেশি ব্রাহ্মণ ছিল না।

এ বিষয়ে সমস্ত ঐতিহাসিক একমত যে, নবম শতকের পর ব্রাহ্মণরা যখন বাংলার ধর্ম-মিশনে আসেন তখন বাংলার জনসমাজে বৌদ্ধধর্মের একটা গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ছিল। ছিল নানা রকম অহিন্দু পৌত্তলিক ধর্ম। বিশাল বাংলা জুড়ে প্রাকৃত পুঞ্জের বাইরেও ছিল অসংখ্য মঙ্গলয়েড ও অষ্ট্রালয়েড ধারার আদিবাসী কৌমসমাজ। বৌদ্ধদের বিরুদ্ধে ব্রাহ্মণদের লড়ে জেতার কৌশলটা আগে থেকেই রপ্ত ছিল। তবে শক্ত প্রতিরোধ দাঁড় করিয়েছিল বাংলার অহিন্দু পৌত্তলিক সমাজ। এদের লড়াইয়ের ইতিহাসটিকে আজও আমরা সঠিকভাবে উন্মোচন করতে পারি নি। যেটা ছাড়া বাঙালির ইতিহাস ঠিকঠাক বোধগম্য হবে না বলে মনে করি। যে কারণে হাজার বছর পরও ১৯৩২ সালে বঙ্গীয় আইন পরিষদে ৭৬টি তফসিলি সম্প্রদায়ের ক্ষমতায়নের স্বীকৃতি আমরা দেখতে পাই। এরা নিজেদেরকে হিন্দু হিসেবে স্বীকার করতে চান নি। মধ্যযুগে মুসলমান সম্প্রদায় সমস্ত পৌত্তলিককেই হিন্দু হিসেবে দাগিয়েছেন। যেমন ব্রাহ্মণরা বাংলায় প্রবেশ করে সকল ভূমিপুত্রকেই শূদ্র হিসেবে দাগিয়েছেন। বাংলার মুষ্টিমেয় কিছু লোক হয়তো কায়স্থ নামক নতুন বর্ণে নিজেদের পরিচয় দেয়ার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু বর্ণবাদের হিসেবে এরাও শূদ্র।


বাংলার ধর্মসমাজে ব্রাহ্মণ-আগ্রাসন প্রক্রিয়াটি কিন্তু সেনদের পতনের পরও থেমে থাকে নি, চলেছে হাজার বছর ধরে।


হিন্দু সেনদের পূর্বেও বাংলাদেশ শতাব্দীর পর শতাব্দী স্বাধীন ছিল। ফলে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে কাজ করা বা রাষ্ট্রের কায়ায় স্থিত একদল সাবলম্বী ও অগ্রসর বৌদ্ধ পরিবার বাংলায় ছিল। প্রায় সমস্ত ঐতিহাসিক এ বিষয়ে একমত যে, বৌদ্ধ কায়স্থরা ব্রাহ্মণ্য ধর্মে মাইগ্রেট করে। সম্ভবত সেন আমলে রাজনৈতিক চাপে তাদের এই নতি স্বীকার। কিন্তু এই শিক্ষিত ও সচ্ছল বাঙালি কায়স্থরা একদমই শূদ্র হতে চায় নি। কাজেই কোনো বিশেষ বর্ণমর্যাদা না পেলেও কায়স্থ হিসেবেই নিজেদের পরিচয় দিয়ে গেছেন। ধারণা করা হয় যে, কৌশলী ব্রাহ্মণরাও বাংলার জনসমাজকে অধিকার করার প্রয়োজনে এই শ্রেণিকে বিশেষ ঘাঁটায় নি।

সেনদের পরাজয়ে ব্রাহ্মণরা কোণঠাসা হয়েছিল, কিন্তু এই ভূমিপুত্ররা যে মুক্তি পেয়েছিল তা কিন্তু নয়।

সেন-শাসনের সময় এই জনগোষ্ঠীর উপর চেপে বসেছিল সেনদের সামন্ত-মহাসামন্তরা। ফলে এদের অর্থনৈতিক ভাগ্যবিপর্যয়ের সাথে সাথে সাংস্কৃতিক বিপর্যয়ও ঘটে বলে মনে হয়। কেননা দরিদ্রের কোনো সাংস্কৃতিক ঐশ্বর্য থাকতে পারে না। আবার মুসলিম শাসন শুরু হওয়ার পরও এই সামন্ত রাজা বা রায়েরা যে নিজ নিজ দখলদারত্বে স্বমহিমায়ই ছিলেন, তাও আমরা দেখতে পাই। বখতিয়ারের মৃত্যুর কয়েক বছর পরে ১২১০ খ্রিস্টাব্দে যখন আলী মর্দান নিজেকে স্বাধীন সুলতান ঘোষণা করলেন তখন এই রায়েরা তাকে কর ও সমর্থন দিয়ে উৎসাহ যুগিয়েছিলে।

বাংলার ধর্মসমাজে ব্রাহ্মণ-আগ্রাসন প্রক্রিয়াটি কিন্তু সেনদের পতনের পরও থেমে থাকে নি, চলেছে হাজার বছর ধরে। উত্তরবঙ্গের গৌড় রাজ্য খিলজির আক্রমণের ফলে মুসলমানদের হাতে চলে গেলে বাংলায় ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতির প্রধান কেন্দ্রটির পতন হয়।

আকবর আলি খান তার বইয়ে উল্লেখ করেছেন, ১৯২১ সালের আদমশুমারির তথ্য-অনুযায়ী বাংলার হিন্দুদের মধ্যে ভদ্রলোক বা বর্ণহিন্দু ১৫ শতাংশ। বাকি ৮৫ ভাগ হিন্দুই ছোটলোক। এই অভিজাতরা আবার বাংলার চেয়ে বিদেশেই তাদের মূল খুঁজে তৃপ্তি লাভ করেন। অন্যদিকে ১৯০১ সালের আদমশুমারি নিয়ে রিজলি সাহেবের মতো বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে অভিবাসী মুসলমানদের বংশধরের সংখ্যা ১৬.৬ ভাগের বেশি নয়। মানে বিদেশে মূল। এই ১৫/১৬ শতাংশ বাদে বাকি ৮৫ ভাগ হলো ছোটলোক। এবার প্রশ্ন আসে বাঙালি কারা? এই অভিবাসী ১৫ শতাংশ না স্থানীয় ৮৫ ভাগ? নাকি বাঙালি বা দেশি মানেই ছোটলোক, নিম্নবর্ণ, নমঃশূদ্র, তফসিলি! কী বিস্ময়কর! এটা একটা একাডেমিস্বীকৃত বিষয়। একই সাথে বাংলার খাদ্য, দেশাচার, ভাষা, দ্রব্যাদির প্রতিও অবজ্ঞার দৃষ্টিভঙ্গি এইসকল বহিরাগত অভিজাত মানসের কাছ থেকে আমরা পাই। বঙ্গদেশ এবং তার অধিবাসীদের প্রতি এই অবজ্ঞার সর্বপ্রাচীন উপাত্ত আমরা দেখতে পাই বৈদিক হিন্দু-ব্রাহ্মণ্য সাহিত্যে। এবার অনিবার্যভাবেই প্রশ্ন আসে, বাংলার মানুষ কবে থেকে ছোটলোক হতে শুরু করেন? নিশ্চয়ই সেন-শাসনের খুব আগে নয়। আবার এই অবজ্ঞার ব্যাপারটি আরও একটি বিষয়ের দিকে ইঙ্গিত দেয়, তা হলো, দূর অতীতে বাংলার ঈর্ষণীয় সমৃদ্ধি হয়তো ছিল, যা উত্তর-ভারতীয়দের এই ঈর্ষার কারণ।

এই পরিসংখ্যান বিশ শতকের। কিন্তু ত্রয়োদশ শতকের শুরুতে বাংলার ধর্মসমাজে নিশ্চয়ই মুসলমান বা বহিরাগত মুসলমানদের কোনো পার্সেন্টেজ ছিল না। যদিও বলা হয় মুসলিম শাসনের আগে বাংলায় দু’চারজন পীর ধর্মপ্রচার করতে এসেছিলেন, কিন্তু তারা যে উল্লেখযোগ্য কোনো অবস্থান তখনও জনসমাজে তৈরি করতে পারেন নি, তা মোটামুটি বলা যায়। অন্যদিকে তখন বর্ণহিন্দু ভদ্রলোকের সংখ্যাও যে জনসমাজে এক শতাংশের বেশি ছিল না, তাও আমরা জানি। তাহলে কারা কারা ছিল এদেশের ধর্মসমাজে প্রধান প্রধান অংশ?

তিনটি পক্ষকে আমরা দেখতে পাই : ১. অবৈদিক আর্যধর্ম, যেমন : জৈন, সৌর, আজীবক এবং বৌদ্ধ; ২. আর্য-বৈদিক পক্ষ তথা ব্রাহ্মণ-নেতৃত্বাধীন পৌরাণিক হিন্দুধর্ম; ৩. এসব বহিরাগত ধর্মের বাইরে স্থানীয় নাথ, ধর্মঠাকুর পূজা, মনসা-চণ্ডীসহ নানা দেব-দেবীর উপাসক এবং জড়পূজারিদের একটা বিরাট উপস্থিতি, এরাই ছিল বাংলার ধর্মসমাজের প্রধান অংশ।

১৩ শতকে মুসলিম শাসন শুরু হওয়ার পর থেকে বাংলায় মূলত দুটি ধর্মের প্রচার ও প্রসার হতে থাকে। ১. রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায়, আলেম ও পীর-দরবেশদের মাধ্যমে প্রচারিত হতে থাকে ইসলামধর্ম; ২. সেন-আমলের জমিদার-সামন্ত বা রায়-রাজা, যারা মুসলিম শাসকদের বশ্যতা স্বীকার করে বহাল তবিয়াতে ছিলেন, প্রধানত তাদের পৃষ্ঠপোষকতায় ব্রাহ্মণরা জনসমাজের উপরে বিস্তার করতে থাকেন তাদের বর্ণশাসন ধর্ম।

ইসলাম প্রকৃত অর্থে কিছুটা নাস্তিক্যবাদী ধর্ম। বেদে বিশ্বাস না করাকে যেমন বলা হয় নাস্তিক তেমনি দৃশ্যমান ঈশ্বর বা দেবতায় বিশ্বাস না করা অর্থেও। তার ঈশ্বর বা আল্লার কোনো আকৃতি দেয়া যাবে না, অর্থাৎ শূন্য ঈশ্বর। এটা স্থানীয় ধর্মঠাকুর-পূজারি এবং বৌদ্ধদেরও প্রভাবিত করেছিল। বলা হয় ন্যায় দর্শন বাংলার নিজস্ব ভূমিজ দর্শন, এর থেকে আগেই ছিল মন্ত্রতন্ত্র বাউল ধারা, যার সাথে জুড়ে যায় সুফিজম।

কঠোর ইসলামি শূন্যেশ্বরবাদ স্থানীয় মূর্তিপূজারি ধর্মগুলোর অনুসারীদের ব্যাপকভাবে টানতে পারে নি বলে মনে হয়। ফলে ব্রাহ্মণ্যবাদও এখানে কাজ করার একটা বড় সুযোগ পায়। মুসলিম বিজয়ের আগ পর্যন্ত স্থানীয় যেসব পৌত্তলিক ধর্ম বর্ণাশ্রম ধর্মের বিরুদ্ধে লড়াই করে এসেছে, মুসলিম শাসনের দুই শতাব্দী পরে যখন বিরাট একটি মুসলিম সমাজ রচিত হচ্ছিল বাংলার দিকে দিকে তখন এই স্থানীয় পৌত্তলিক ধর্মগুলোর কিয়দংশ ধীরে ঢুকতে শুরু করে ব্রাহ্মণদের ধর্ম-সংকলনে এবং বিস্তার লাভ করে হিন্দুধর্ম।

এই দুটি ধর্মের ধর্মপ্রচারকদের প্রধান লক্ষ্য ছিল স্থানীয় ধর্মগুলোর অনুসারীদের ধর্মান্তরকরণ। এবং বিংশ শতাব্দী পর্যন্ত এই প্রক্রিয়াটি সচল ছিল। এ ক্ষেত্রে ইসলামের চেয়ে হিন্দুধর্মের প্রচারকার্যটি ছিল বেশ সহজ। এ বিষয়ে আমরা একটি প্রামাণ্য বক্তব্য পাই হরপ্রসাদ শাস্ত্রী মহাশয়ের লেখায় :

আমরা জানি, হিন্দুধর্মে কেহ প্রবেশ করিতে পরে না, কিন্তু কাম্বেল সাহেব বলেন, হিন্দুরা সাঁওতাল পরগনায় গ্রামকে গ্রাম হিন্দু করিয়া লইতেছে। একজন ব্রাহ্মণ একটি গ্রামে গেল; সেখানে পূজা অর্চ্চনা আরম্ভ করিল; সাঁওতালেরা তাহাদের কাছে পীড়ার ঔষধ প্রভৃতি লইতে আসিল; ক্রমে কালীপূজা করিতে শিখিল; রামায়ণ-মহাভারতের গল্প শুনিল; তাহারা হিন্দু হইল। পাদরীরা তাহাদের আর কিছুই করিতে পারিলেন না। ব্রাহ্মণ সাঁওতালের ব্রাহ্মণ বলিয়া নিকৃষ্ট ব্রাহ্মণ মধ্যে পরিগণিত হইল। (হরপ্রসাদ : ৩০০)

এই প্রক্রিয়াটি যে বিশ শতক পর্যন্ত সচল ছিল তা স্পষ্ট। ব্রাহ্মণরা বাংলার মানুষদের হেয় চোখে দেখতেন বাংলায় আসার বহু আগ থেকেই। এবং আসার পরও যে তারা স্থানীয়দের সম্মান করতেন তার কোনো নজির পাওয়া যায় না। স্থানীয় কৌমগুলোকে তারা শূদ্র হিসেবেই চিহ্নিত করতেন। যারা সহজে বশ্যতা স্বীকার করত তারা হতো সৎ শূদ্র, যেমন : সদগোপ; আবার যারা বিদ্রোহপ্রবণ ছিলেন তাদের চিহ্নিত করতেন অন্ত্যজ হিসেবে, যেমন কৈবর্ত, এদের সাথে জল অচল, এই জাত্যভিমানটুকুও ছিল তাদের কার্যকরী অস্ত্র। এ বিষয়ে শাস্ত্রী মহাশয়ের আরকেটি উদ্বৃতি পাঠ করা যেতে পারে :

এক্ষণে জিজ্ঞাস্য হইতে পারে, ব্রাহ্মণেরা এত ঘৃণা করিলেও এই সকল জাতি ব্রাহ্মণ্যধর্ম্ম রহিল কেন? তাহার এক কারণ এই, ব্রাহ্মণ্যধর্ম্মে আসিবামাত্র উহাদের একটু জাত্যভিমান জন্মে, এক জন দুলেকে জিজ্ঞাসা করিয়া দেখিলাম, সেও বলিল, মুচি মুসলমান হইতে দুলে উৎকৃষ্ট জাতি; মুচি চাম কাটে, মুসলমানের ব্রাহ্মণ নাই। ব্রাহ্মণদিগের সংস্রবে উহাদের এই জাত্যভিমানটুকু জন্মিয়াছে। (হরপ্রসাদ : ৩০১)

ছিল স্থানীয় নানা রকম দেব-দেবীর উপাসক সম্প্রদায়ের সাথে ব্রাহ্মণদের ধর্মীয় লড়াই। যাদের দেবদেবীকে নিয়ে পুরাণ সৃষ্টি করে তখনও তাদের সংকলনে অর্ন্তভুক্ত করতে পারে নি। অন্যদিকে বাংলার মানুষ বৈদিক ধর্ম বা ব্রাহ্মণদের প্রতি যে কখনোই আগ্রহ বোধ করেছেন এমনও নয়। এ বিষয়ে নীহাররঞ্জন রায়ের বক্তব্য :

বাঙলার স্থানীয় আদিম, কৌমবদ্ধ মানবসমাজও বহুদিন পর্যন্ত আর্য ধর্ম ও সংস্কৃতির প্রতি খুব শ্রদ্ধিতচিত্ত ছিল না, বরং সক্রিয় বিরোধিতাও করিয়াছে, যথাসম্ভব চেষ্টা করিয়াছে সে-স্রোত ঠেকাইয়া রাখিতে। ….সনাতনত্বের প্রতি একটা বিরাগ যেন বাঙলার ঐতিহ্যধারায়। ইহার মূল প্রধানত বাঙালীর জনগত ইতিহাস, কিছুটা তাহার ভৌগোলিক পরিবেশে, তাহার নদনদীর ভাঙাগড়ায়, কিছুটা ইতিহাসের আবর্তন-বিবর্তনের মধ্যে। (নীহাররঞ্জন : ৮৮০-৮৮১)

অতএব এটি স্পষ্ট যে, বখতিয়ার খলজীর বাংলা বিজয়ের দু’এক শতাব্দী পূর্বে আগত নতুন বর্ণাশ্রম ধর্ম বা হিন্দুধর্মের প্রসার, প্রভাব এবং অনুসারীর সংখ্যা খুব বেশি ছিল না।

অন্যদিকে পালযুগ থেকে সমগ্র বাংলার জনজাতিদের মধ্যে বৃহত্তর পরিসরে একটি ভাষা এবং জাতিগঠন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল—সেই প্রবাহটি রুদ্ধ ছিল সমগ্র সেন-আমলে। কেননা সেন-আমলে রাষ্ট্রীয়ভাবে পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছে সংস্কৃত ভাষা এবং স্থানীয়দের ভাষা ছিল তাদের কাছে অপবিত্র ম্লেচ্ছদের ভাষা।

অন্যদিকে জাতিগঠন প্রক্রিয়ায় দরকার হয় ভূখণ্ডে বসবাসরত জনমণ্ডলির মধ্যে অবাধ বৈবাহিক সম্পর্ক এবং জিনের মিশ্রণ। তাতে করে জাতিপরিচায়ক একটি কমন জিনভাণ্ডার গড়ে উঠতে পারে জনপুঞ্জে। এ ক্ষেত্রে বর্ণাশ্রম ধর্ম বা হিন্দুধর্ম ছিল ঘোর বিরোধাত্মক অবস্থানে, এই বর্ণাশ্রম গ্যালারিতে ঢোকা যাবে কিন্তু মেশা যাবে না, থাকতে হয় অনেকটা একই প্যাকেটের ভিন্ন ভিন্ন তাসের মতো।

এমন বন্ধ্যা সময়ে বাংলা আক্রমণ করেন বখতিয়ার খলজী। বলার অপেক্ষা রাখে না, সময়টা জাতীয়তাবাদ বা জাতিরাষ্ট্রের সময় ছিল না। ছিল বাহুবলে রাজ্যস্থাপনের সময়। যেভাবে পালদের তাড়িয়ে তাদের দেশ দখল করেছিল সেনরা, সেভাবে খলজীও বাহুবলে দখল করেছিল বাংলা। তিনি রাজ্যস্থাপন করেছিলেন গৌড়, পুণ্ড্র, বরেন্দ্র এবং রাঢ় জনপদের কিয়দংশ নিয়ে। সাথে ছিল তার বিহারের বিজিত অঞ্চল।

(প্রাচীন কাল থেকে প্রায় মধ্যযুগ পর্যন্ত বাংলা বা বঙ্গ বলতে বৃহত্তর ঢাকা, ফরিদপুর, বরিশাল, খুলনা, যশোর অঞ্চল পর্যন্ত বোঝাত, আবার কখনও কখনও সমগ্র বর্তমান বাংলাদেশের আয়তনকেও বোঝাত। তখন পশ্চিমবঙ্গের নাম ছিল রাঢ় জনপদ।)

এবার আসা যাক মূল আলোচনায়। আকবর খান তার বইয়ের ৩০/৩১ পৃষ্ঠায় সারণি-২ এ একটি পরিসংখ্যান পেশ করেছেন। তাতে দেখা যায়, সমগ্র ভারত মহাদেশ খণ্ডে ১৯০১ সালে ২৮৩.৮৬ মিলিয়ন লোক বাস করত। অন্যদিকে ঐ একই সালে বাংলায় লোক ছিল ৪২.১৪ মিলিয়ন। অর্থাৎ ভারতের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৭ ভাগের একভাগ লোক। এবার তাহলে আমরা একটু আন্দাজ করার চেষ্টা করব, ১২০০ খ্রিষ্টাব্দে বাংলার জনসংখ্যা কত ছিল। অতীতের জনসংখ্যা নিয়ে গবেষণা করেছেন এমন সেরা পাঁচজন গবেষকের তথ্যের সমন্বয় করে উইকিপিডিয়া একটি তথ্য উপস্থাপন করেছে ১২০০ খ্রিস্টাব্দে ভারতবর্ষের মোট জনসংখ্যা সম্পর্কে। (সূত্র : https://en.wikipedia.org/wiki/Demographics_of_India)

এতে দেখা যায় সমগ্র ভারতবর্ষে তখন ৭ কোটি ৯৮ লক্ষ লোক বাস করত। এই পরিসংখ্যান হুবহু ঠিক হবে এমন নয়। তবে এর চেয়ে কিছুটা কম-বেশি হতে পারে। আমরা ধরে নিলাম আট কোটি। এর সাত ভাগের এক ভাগে দাঁড়ায় এক কোটি চৌদ্দ পনেরো লাখ অথবা ধরে নেই খলজীর আক্রমণের সময় সমগ্র বাংলায় লোকসংখ্যা ছিল এক থেকে সোয়া এক কোটি। এটা একটা যৌক্তিক আন্দাজ।

তবে প্রশ্ন উঠতে পারে, ১৭৭০-এর দুর্ভিক্ষে বাংলার তিন ভাগের এক ভাগ লোকের মৃত্যু না হলে ১৯০১ এর জনসংখ্যার হিসেব তো পাল্টে যেত। হ্যাঁ, সেটা যেত। কিন্তু মুসলিম বিজয়ের পর বাংলার যে বহিরাগত মুসলমানদের স্রোত ছিল সেটাও এই হিসাবের মধ্যে রয়েছে। ফলে তাদের এই পরিসংখ্যানটি কাছাকাছি ধরে নেয়া যেতে পারে। প্রায় সমগ্র এই অঞ্চলটিই ছিল তখন সেনদের দখলে।

এবার প্রশ্ন উঠতে পারে, এই কোটি মানুষের সবাই কি বাঙালি কৌম বা প্রকৃতিপুঞ্জের লোক ছিলেন? আকবর আলি খান তার উল্লেখিত বইয়ের ৯৪ পৃষ্ঠায় বলেছেন—গোত্র বা উপজাতি গোষ্ঠী বাংলায় আদৌ ছিল না। এ বিষয়ে আমরা নীহাররঞ্জন রায়ের বক্তব্য পাঠ করতে পারি : আজ আমরা যাহাদের বাঙালী বলিয়া জানি তাহারা সকলেই একই নরগোষ্ঠীর লোক নহেন, এ-তথ্য সর্বজনবিদিত; বিচিত্র নরগোষ্ঠীর লোক লইয়া বৃহত্তর বাঙালী জন-এর গঠন। কিন্তু একটু গভীরভাবে বিবেচনা ও বিশ্লেষণ করিলেই দেখা যাইবে, বাঙলাদেশে বহুদিন পর্যন্ত ইহাদের অধিকাংশই ছিল কোমবদ্ধ গোষ্ঠীবদ্ধ জন এবং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরিয়া ইহারা একান্ত কৌমজীবনেই অভ্যস্ত হইয়া আসিয়াছিল। (নীহাররঞ্জন : ৮৬২)

এ ক্ষেত্রে মধ্যযুগের শুরু থেকেই ইসলামধর্মকে দেখতে পাই নৃতাত্ত্বিক বাঙালি জাতিগঠন প্রক্রিয়ার এক সচল ইঞ্জিন হিসেবে।

এবার অনিবার্যভাবেই প্রশ্ন আসে, এত বিরাট জনগোষ্ঠী এবং বিশাল ভূখণ্ড দখলে থাকার পরও বিনা যুদ্ধে লক্ষণ সেন ঢাকায় পালিয়ে এলেন, অথচ অব্যবহিত কাল পরে কেন পুনর্দখল করলেন না? এমনকি তার সামন্ত-মহাসামান্তরাও খলজিদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার সাহস দেখালেন না। বরং বশ্যতা স্বীকার করে বহাল তবিয়তেই স্ব স্ব অবস্থানে ছিলেন। অতএব এটা স্পষ্ট যে, শাসক এবং জনগণের মধ্যে ধর্ম বা অন্য কোনো ঐক্য ছিল না। অন্যদিকে লক্ষ্মণ সেনের সাথে বাংলার ব্রাহ্মণ কুলীনরা পালিয়ে এসেছিলেন ঢাকায়। একটা সময় তাদের অধিকাংশই আবার নদীয়ার প্রত্যাবর্তন করেন। কেন তারা পূর্ববঙ্গে থাকতে পারলেন না? প্রতীয়মান হয় যে, এখানে তাদের অনুসারীর স্বল্পতা এবং ধর্মান্তর-কাজের অসফলতা ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

বখতিয়ার খলজী বাংলা দখল করার পর তিব্বত অভিযানে বেরিয়েছিলেন। মিনহাজের বর্ণনা মতে, দশ হাজার ঘোড়সাওযার সৈন্যের এক বাহিনী নিয়ে তিনি যাত্রা করেছিলেন এবং যখন বিধ্বস্ত হয়ে ফিরে আসেন তখন মাত্র কয়েকশ সৈন্য তার সাথে ছিল। তিনি প্রায়ই শঙ্কিত থাকতেন মুসলিম নারীশিশুদের বিধর্মীদের কবলে পড়ার ভয়ে। এবং তিনি রাস্তায় বের হলে নিহত সৈন্যদের বিধবা স্ত্রী ও সন্তানেরা তাকে অভিশাপ দিত।

যদিও গৌড়ের নবগঠিত মুসলিম রাজ্য রক্ষার মতো যথেষ্ট সৈন্যবল তখনও তার ছিল। তবে ধারণা করা যায়, এই সময় বাংলার মুসলমান বলতে প্রায় সবই ছিল বহিরাগত এবং তার পরিমাণ স্থানীয়দের চেয়ে নগণ্য হওয়ারই কথা।


স্থানীয়দের মধ্যে ইসলামপ্রচারের উদ্দেশ্যে মসজিদ-মাদরাসা স্থাপন সুফি-দরবেশ-ওলামাদের পৃষ্ঠপোষকতার ইতিহাস বখতিয়ার এবং তার পরবর্তী প্রায় সব শাসকেরই রয়েছে।


এটা ছিল মুসলমান সমাজের প্রতিষ্ঠার কাল। এ সময় থেকেই মুসলমান সুফি ও পণ্ডিতগণ বাংলায় আসতে শুরু করেন। সুফিদের মধ্যে সর্বপ্রথম বাংলায় এসেছিলেন সম্ভবত শেখ জালালউদ্দীন এবং পণ্ডিতদের মধ্যে সর্বপ্রথম এসেছিলেন সম্ভবত কাজী রুকনউদ্দীন সমরকন্দী, যিনি ছিলেন সুলতান আলাউদ্দীন আলী মর্দান খলজীর আমলের একজন বিচারক। সম্ভবত এই সময়েই মাওলানা তকীউদ্দীন আরবি মাহিসুনে (দিনাজপুর জেলার মাহি সন্তোষ) তার মাদরাসায় শিক্ষাদান শুরু করেছিলেন। এসব কার্যকলাপ নিশ্চিতভাবেই তদানীন্তন বিদ্যমান সমাজের ওপর প্রভাব ফেলেছিল। অন্যদিকে বীরভূম জেলায় ইওজ খলজীর সময়ে খানকাহ প্রতিষ্ঠিত হয় বলে শিলালিপিতে প্রমাণ পাওয়া যায়।

বখতিয়ার খলজী নদীয়া অধিকার করার পর মুসলিম বিশ্বের অভিবাসীদের কাছে বাংলার দুয়ার খুলে যায়। মিনহাজের তথ্যে জানা যায়—তার গোত্রভুক্ত লোকজন কিভাবে ঐশ্বর্যলাভের আশায় তার চারপাশে জুটেছিল। দিল্লিতে ছিল ইলবারি তুর্কিদের আধিপত্য, কিন্তু বাংলা দখল করেছিলেন খলজি তুর্কিরা। ত্রয়োদশ শতাব্দীর প্রথম দিকে এখানে তাদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত ছিল। বখতিয়ারের মৃত্যুর পর এসব খলজি অভিজাতবর্গ লক্ষ্ণৌতি বা দেবকোটে নিজেদের আধিপত্য স্থাপনের প্রচেষ্টার  বিজিত অঞ্চল আঁকড়ে ধরে থাকতে ছিলেন মরিয়া।

স্থানীয়দের মধ্যে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে মসজিদ-মাদরাসা স্থাপন সুফি-দরবেশ-ওলামাদের পৃষ্ঠপোষকতার ইতিহাস বখতিয়ার এবং তার পরবর্তী প্রায় সব শাসকেরই রয়েছে।

ইলতুৎমিশ কর্তৃক বাংলায় খলজি-আধিপত্য ধ্বংস হওয়ার পর আরেকটা মুসলিম অভিবাসনের ঢেউ আসে বাংলায়, বিশেষত মধ্য-এশিয়ার ছিন্নমূল তুর্কিদের।

আবার বলবনের মৃত্যুর অব্যবহিত পরে দিল্লিতে ইলবারি তুর্কিদের পতনের পর দিল্লি থেকে বাংলায় অভিবাসনের নতুন ঢেউ আসে, কারণ বাংলা তখন ইলবারি তুর্কি ও তাদের সমর্থকদের আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছিল।

অধিকিন্তু আমরা দেখতে পাই, প্রথম এক শতাব্দীতে মধ্য-এশিয়ার থেকে আগত একটার পর একটা মুসলমানদের জনস্রোত বাংলায় দিকে। মঙ্গল-আক্রমণে বাগদাদের মুসলিম খেলাফতের ধ্বংস হয়ে যাওয়া—পারস্য, তুর্কমিনিস্তানসহ পশ্চিম ও মধ্য-এশিয়ার বিভিন্ন দেশে লক্ষ লক্ষ মানুষ হত্যা, স্বজন হারানো, নিঃস্ব হওয়া—এমন নানা কারণেই ফকির-দরবেশ এবং ছিন্নমূল মানুষের স্রোত বাংলার দিকে ছিল।

কাজেই এই শতাব্দীতে বাংলার মুসলমানদের সাংস্কৃতিক ভরকেন্দ্র ছিল এই বহিরাগত মুসলমানদের মধ্যে। আবার মুসলমান-শাসন শুরু হওয়ার পর প্রথম এক শতাব্দীরও অধিককাল চলে গেছে সমগ্র বাংলা দখল করতে। জোর করে মুসলমান বানানোর ঘটনা যদি কিছু ঘটে তা এ শতাব্দীতেই হওয়ার কথা। এ সময়ে গ্রামপ্রান্তর পর্যন্ত পীর-দরবেশদের পৌঁছে যাওয়ার কথা আমরা জানতে পাই।

১২৭০/৭১ খ্রিস্টাব্দের দিকে প্রতিষ্ঠিত হয় সোনারগাঁয়ের আবু তাওমার মাদরাসা। এই মাদরাসায় পড়তে এসেছিলেন বিহার থেকে বিখ্যাত ইয়া হিয়া মানরী। ছাত্রদের সংখ্যা এত বেশি ছিল যে খাবার সময় ক্রমানুসারে খাবার পেতে সময় লাগত। ফলে মানরী অনেক সময়ই খেতে যেতেন না। (সূত্র : বাংলার মুসলমানদের সামাজিক ইতিহাস, আব্দুল করিম, পৃ. ১২৯।) এসব মাদরাসার হাজার হাজার ছাত্র তখন তৈরি হতো ধর্মপ্রচারের জন্য। ধর্মপ্রচারের উদ্দেশ্যে আরও এমন উদ্যোগের উদাহরণ আমরা এই সময়ের ইতিহাসে দেখতে পাই। এর ফলাফল পরবর্তী শতাব্দী থেকেই স্পষ্ট হতে শুরু করে।

এসব কারণে মুসলিম অধিকারের দ্বিতীয় শতকে অর্থাৎ খ্রিষ্টীয় চতুর্দশ শতকে বাংলায় মুসলমান-সংস্কৃতির ভরকেন্দ্রটি ধীরে ধীরে সরতে শুরু করে স্থানীয় মুসলমানদের দিকে। ফলে বাংলা ভাষা নিয়ে এই শতাব্দীতেই মুসলমানদের মধ্যে দ্বিধাদ্বন্দ্ব শুরু হয়। কেননা, ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে এদেশের অহিন্দু—স্থানীয় পৌত্তলিক, হিন্দু পৌত্তলিক এবং বৌদ্ধ পৌত্তলিক—সাধারণ জনগণ বাংলায় কথা বলত। তখন পর্যন্ত ইসলামের ধারক যেহেতু বহিরাগত মুসলমানরা এবং তাদের ভাষা যেহেতু এটা নয়, ফলে স্থানীয় মুসলমানেরাও সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগতে শুরু করেন।

পরবর্তীকালে দেখতে পাই মুসলিম শাসকরা এই ভাষার পৃষ্ঠপোষকতায় এগিয়ে এসেছেন। আরবি-ফার্সি না-বোঝা স্থানীয়দের ধর্মকথা বোঝানোর প্রয়োজনে দ্বিধাদ্বন্দ্ব নিয়ে এগিয়ে এসেছেন মুসলমান কবিরা। অর্থাৎ বিপুল পরিমাণ বাঙালির ইসলামগ্রহণের ইঙ্গিত এবং দেশিবিদেশিদের মধ্যে ব্যাপক মিশ্রণের সময় এটি।

পরের শতকের মুসলিম কবিদের বাংলা ভাষা নিয়ে বক্তব্য অনেকটা দ্বিধাহীন—’আল্লাহ সব ভাষাই বোঝেন’। এর পরের শতকগুলোতে দেখতে পাই মুসলমান কবিরা রীতিমতো হুঙ্কার ছেড়ে বলছেন—’যে বাংলা ভাষা হিংসা করে সে বেজন্মা, সে এদেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছে না কেন’ ইত্যাদি।

এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করা যেতে পারে। ইসলামের অগ্রযাত্রায় তার পশ্চাদভূমির সংস্কৃতিকে নতুন ভূখণ্ডে নিজস্ব সংস্কৃতি হিসেবে হাজির করার নজিরও আমরা ইতিহাসে দেখতে পাই। রাজনৈতিকভাবে বাংলা দখল করেছিল ট্রান্সঅক্সিয়ানা অঞ্চলের তুর্কি মুসলমানরা। তাদের কাছে ইসলামি সংস্কৃতি এসেছিল পারস্যের মুসলমানদের কাছ থেকে। ফলে বাংলায় আরবির চেয়ে ফার্সি-তুর্কি ভাষার ইসলামি সংস্কৃতির প্রবল্যই প্রথম দিকে বেশি দৃশ্যমান হয়। ফার্সি ভাষা এদেশে ইসলামের ভাষা বা পবিত্র ভাষার মান্যতা পেয়েছিল। যেমন আরাকানের রাজ সভায় বাংলা ভাষাও অনেকটা ইসলামি সংস্কৃতির প্রতীক হিসেবেই চর্চা হয়েছে।

অন্যদিকে রাজনৈতিক শক্তির ছত্রছায়া হারানোর পর বসে থাকে নি বাংলার ব্রাহ্মণসমাজও। জীবিকার প্রয়োজনেই তাদের কোনো কোনো অংশ স্থানীয় নানা রকম দেবীভক্তদের বর্ণাশ্রম ধর্ম-সংকলনে ঢোকাতে আঁটঘাট বেঁধে নেমে পড়েছিল। ফলে ম্লেচ্ছদের ভাষা রপ্ত করেই শুরু করতে হয়। অব্যবহিতকাল পরে আমরা দেখতে পাই একের পর এক মঙ্গলকাব্য : মনসা, চণ্ডী, অন্নদা। অন্যদিকে তাদের বৈষ্ণব শাখাও নড়তে চড়তে শুরু করে।

তবে এসব ছাপিয়ে পনের শতক অব্দি ইসলামি সংস্কৃতির প্লাবনেই ডুবে ছিল বাংলাদেশ। এমনকি ব্রাহ্মণরা পর্যন্ত এই প্রভাব বলয়ের বাইরে যেতে পারে নি। ইসলামি প্রভাব ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতির শক্তিকেন্দ্র নবদ্বীপেও পরিব্যাপ্ত হয়েছিল। বৈষ্ণব কবি জয়ানন্দ নবদ্বীপের ব্রাহ্মণদের ওপর ইসলামের প্রভাব সম্পর্কে বিশদভাবে আলোচনা করেছেন। তিনি বলেছেন যে ব্রাহ্মণরা মুসলমানদের অনুকরণে দাড়ি রাখত, মোজা পরত, ছড়ি ব্যবহার করত, বন্দুক চালাত এবং মসনভি আবৃত্তি করত। (সূত্র : চৈতন্য ভগবত, আদি, চতুর্দশ)

ধারণা করা হয়, জনসমাজে এই ইসলামি সংস্কৃতির প্রবল প্রবাহটি প্রথম রোধ করা হয় হিন্দু-বৈষ্ণব শাখা থেকে। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী মহাশয়ের বয়ানে আমরা আগেই জেনেছি ভক্তিমার্গ অশিক্ষিত জনগণের জন্য ব্রাহ্মণদের একটি মোক্ষম অস্ত্র। ষোড়শ শতকে বৈষ্ণবভক্তি আন্দোলন নিয়ে আসে নদীয়ার শ্রী চৈতন্য। আন্দোলনের বাহন হিসেবে ব্যবহৃত হয় স্থানীয় ভাষা। সৃষ্টি হয় বাংলা ভাষায় শত শত বৈষ্ণব পদাবলি। আয়তনে স্ফীত হতে থাকে বাংলার হিন্দুধর্ম।

তবে বাংলা ভাষা এবং বাঙালি জাতি সংক্রান্ত যে হিন্দু সিন্ড্রম তা ঊনবিংশ শতকের রচনা।

বইটির দ্বিতীয় অধ্যায়ে—বাংলাদেশে কারা মুসলমান হয়েছে শীর্ষক আলোচনায় মি. খান উল্লেখ করেছেন ইংরেজ ও হিন্দু ঐতিহাসিকরা মনে করেন নিম্নবর্ণের হিন্দুরা ধর্মান্তরিত হয়ে মুসলমান হয়েছেন। অন্যদিকে কিছু মুসলমান ঐতিহাসিকরা মনে করেন পশ্চিম এশিয়া থেকে আগতদের বংশধরেরাই বাংলায় বেশিরভাগ মুসলমান। এ দুটি ধারণাই একই সাথে আংশিক ভুল এবং আংশিক সত্য। পূর্বের আলোচনায় আমরা দেখেছি হিন্দু ব্রাহ্মণদের কাছে বাংলার অধিবাসী মাত্রই যেখানে সব ছোটলোক, নিম্নবর্ণ, সেখানে ইসলাম ধর্মের প্রচার এবং অনুসারীদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে গেল যে ঐ ছোটলোকদেরই ধর্মান্তর করতে হবে, এতে আর বিস্ময়ের কী আছে। অন্যদিকে ত্রয়োদশ শতক থেকে বাংলায় মধ্য-এশিয়া থেকে যে জনস্রোত প্রবাহিত হয়েছিল, বিশেষ করে মঙ্গল আক্রমণের পরে, তার সংবাদ তো আমাদের সবারই জানা। তবে তার সংখ্যা যে খুব বেশি ছিল বোধ করি তাও নয়।


আকবর আলি খান বাংলায় ইসলাম প্রচারে মুসলমান শাসকদের ভূমিকাকে অতি নগণ্য বলে উল্লেখ করেছেন।


১৮৭২ সালে হেনরি বেভারলি জনগণনার শেষে জানালেন, বেঙ্গল প্রেসিডেন্সিতে মুসলমানদের সংখ্যা প্রায় পৌনে দুই কোটি। এককভাবে এত মুসলমান পৃথিবীর কোনো দেশেই তখন ছিল না। এটিই সকলের বিস্ময় উৎপাদনের প্রধান কারণ। বেভারলি ধারণা করেছেন, নিম্নবর্ণের হিন্দুরাই মুসলমান হয়েছেন। ১৯১৫ সালে হার্বাট রিজলি প্রথম নৃতাত্ত্বিক জরিপ চালিয়ে বেভারলির বক্তব্যকেই সমর্থন দেন। যদিও রিজলির জরিপকে ত্রুটিপূর্ণ, অবৈজ্ঞানিক এবং পক্ষপাতদুষ্টতার অভিযোগে খারিজ করার চেষ্টা করেন মুর্শিদাবাদের বুদ্ধিজীবী দেওয়ানে খন্দকার ফজলে রাব্বি। মি. আকবর আলি খান লিখেছেন—’রিজলির পরিমাণ ভিত্তিক নৃতাত্ত্বিক বিশ্লেষণের দুর্বলতাগুলো রাব্বি অত্যন্ত সাফল্যের সাথে তুলে ধরেছেন। কিন্তু বাংলার অধিকাংশ মুসলমানই যে অভিবাসীদের সন্তান সে সম্পর্কে সুস্পষ্ট প্রমাণ দিতে পারেন নি। নিম্নবর্ণের হিন্দুদের ইসলামধর্ম গ্রহণের পক্ষে মধ্যযুগের ইতিবৃত্তসমূহে যথেষ্ট সাক্ষ্য নেই। কিন্তু বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে বিপুল পরিমাণ নিম্নবর্ণের হিন্দু ইসলামধর্ম গ্রহণ করেছে। যদি ইসলামধর্ম শুধু অভিবাসী মুসলমানদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকত তাহলে বাংলা ভাষা নিয়ে চতুর্দশ শতক থেকে বাংলার মুসলমানদের মধ্যে আত্মপরিচয়ের সংকটই দেখা দিত না’ (পৃ. ২৪)। আমাদের মনে হয়, এখানে আকবর খানও তার পূর্বজদের মতো হিন্দু প্রপঞ্চ দ্বারা আক্রান্ত। উনিশ শতকের বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি এবং জাতিকে হিন্দুকরণের এই সিন্ড্রম এখন পুরাপুরি একাডেমিক। অব্যবহিত কাল পরেই তিনি বলেছেন, বাংলা ভাষা মধ্য যুগে হিন্দু-আবহে লালিত ছিল। এ নিয়ে আমরা ইতোমধ্যেই আলোচনা করেছি। আপাতত নৃতত্ত্বের রিপোর্টগুলো দেখা যাক।

রিজলির পর ১৯২৭ সালে নৃতাত্ত্বিক জরিপ করেন প্রশান্তচন্দ্র মহালনবিশ। তার ‘Analysis of Race Mixture in Bengal’ শীর্ষক প্রবন্ধে নিম্নবর্ণের হিন্দুদের মুসলমান হওয়ার মত সমর্থন করেন। পরের নৃতাত্ত্বিক জরিপ ১৯৪৪ সালে করেন বিএস গুহ। তিনিও রিজলি এবং প্রশান্ত মহলানবিশের রিপোর্ট সমর্থন করেন। পরের জরিপ হয় পঞ্চাশের দশকে। যার ফল প্রকাশ হয় ১৯৭০ সালে। জরিপ পরিচালনা করেন ডিএন মজুমদার ও সিআর রাও। ১৫টি দলে বাংলার মুসলমানদের ভাগ করে করা এই জরিপে তারা দেখিয়েছেন উচ্চ দৈহিক বৈশিষ্ট্যধারী একদল মুসলমান রয়েছে, ঢাকা অঞ্চলে যাদের সংখ্যা বেশি। নয়টি দলের সাথে নিম্নবর্ণের কিছুটা গড় বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয় আর পাঁচটি দলের সাথে বাংলার বিভিন্ন উপজাতিদের সাদৃশ্য রয়েছে বলে সিদ্ধান্ত দেন। তাদের মতে বাংলার মুসলমানেরা একদমই ভূমিপুত্র, পশ্চিম-এশিয়া তো দূরের কথা উত্তর-ভারতের মুসলমানদের সাথেও এদের নৃতাত্ত্বিক ঐক্য নেই।

ডিএন মজুমদার ও সিআর রাও-এর এই নৃতাত্ত্বিক জরিপটিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়। এটি মধ্যযুগে বাঙালি জাতিগঠন প্রক্রিয়ার একটি বিশেষ প্রামাণ্য স্বাক্ষ্য। মুসলিম অধিকারের প্রথমিক পর্যায় বাংলায় বসবাসকারী নানা রকম কৌম এবং উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর কথা আমরা আগেই জেনেছি। বঙ্গীয় ভূখণ্ডের এমন নানা জনগোষ্ঠীর সমন্বয়ে একটি জাতিগঠন প্রক্রিয়ায় দরকার ছিল পারস্পরিক বৈবাহিক সম্পর্ক, অবাধ জেনেটিক মিশ্রণ। ব্রাহ্মণ্য ধর্ম ছিল এ ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ নেতিবাচক অবস্থানে। ফলে মধ্যযুগে নৃতাত্ত্বিক বাঙালি জাতিগঠন প্রক্রিয়ায় ইসলামধর্মকে আমরা দেখতে পাই সচল ইঞ্জিনের মতো। বাঙালি প্রকৃতিপুঞ্জ, অস্ট্রালয়েড-মঙ্গলয়েড ধারার একাধিক আদিবাসী সম্প্রদায়, নমঃশূদ্র, কায়স্থ, ব্রাহ্মণ থেকে বিদেশি মুসলমান অভিবাসীসহ নানা বর্ণ ও জনজাতির জেনেটিক সমন্বয়ে মধ্যযুগ থেকে উদ্ভব হয় আধুনিক বাঙালি জাতির। এই নৃতাত্ত্বিক জরিপটি তার স্পষ্ট প্রমাণ।

তবে আকবর খান মধ্যযুগের ইতিহাসে দলে দলে নিম্নবর্ণের হিন্দুদের মুসলমান হওয়ার তথ্য যে নেই তা স্বীকার করে—ও বলেছেন বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে তার ইঙ্গিত রয়েছে। রয়েছে ডিএন মজুমদারের সংগৃহীত রক্ত মস্তুগত উপাত্তের ইঙ্গিত। যার ফলাফল—স্থানীয়রাই ধর্মান্তরিত হয়ে মুসলমান হয়েছেন। ১৯০১ সালের আদমশুমারির পরিচালক ই এ. গেইট সাহেবের একটি উদ্ধৃতিও তিনি তুলে ধরেছেন। গেইটের অভিমত—মুসলমানদের মধ্যে বিদেশি অভিবাসীর সংখ্যা ১৬.৬ শতাংশের বেশি হওয়া সম্ভব নয়। এন গজনভী, ড. মোহর আলী ও ড. রহিমের বিপরীত মতেরও উল্লেখ করেছেন। তাদের মতগুলোও খুব একটা ধোপে টেকার নয়। তবে ড. রহিমের পরিসংখ্যানে ১২২০ খ্রি. থেকে ১৭৫৬ খ্রি. পর্যন্ত বাংলায় ৩৩৭০০০ বিদেশি মুসলমান সৈন্যের আগমনের একটি তথ্য দেখা যায়। মি. খান এটিকে খণ্ডন করেছেন এই বলে যে তাদের পরিজন নিয়ে আসেন নি এবং স্থায়ীভাবে থাকারও বিশেষ প্রমাণ নেই। এই সিদ্ধান্তও যে বেশ দুর্বল এবং বখতিয়ারের সময় থেকেই যে সৈন্যরা পরিজন নিয়ে এসেছে ও থেকেছে তারও উল্লেখ কিন্তু আমরা ইতিহাসে পাই। এন গজনভীর একটি মতামত উল্লেখ করেছেন, যেখানে দেখায় গেইটের মতের সাথে আংশিক সমর্থন রয়েছে গজনভীর। তিনি বলেছেন—২০ভাগ মুসলমান সরাসরি বিদেশি বংশোদ্ভূত, ৫০ ভাগ দেশি বিদেশি এবং ৩০ভাগ হিন্দু ও অন্যান্য ধর্ম থেকে ধর্মান্তরিত, এ মতও অনেকটা মুসলিম অভিজাত মানসিকতার প্রকাশ। তবে রহিমের জনসংখ্যা বিশ্লেষণের মতটি মি. খান খারিজ করে দেন পরিসংখ্যান দিয়ে। তিনি দেখিয়েছেন—১৮৮১ থেকে ১৯৪১ সালের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার মুসলমানদের জনসংখ্যার জন্মহার যেখানে ১.০৬ শতাংশ সেখানে বাংলার মুসলমানদের বৃদ্ধির হার ছিল ১.০১ শতাংশ। তবে মি. খান বিদেশে মুসলিম সৈন্যদের স্থানীয়ভাবে কনে সংগ্রহের বিষয়টিকেও কঠিন বলে মত দিয়েছেন। যা সঠিক বলে মনে হয় না। কেননা রাজ শক্তির অংশ এবং অস্ত্র চালনে যারা নিপুণ তাদের কাছে স্থানীয় কৌলিন্যের যে আদৌ কোনো গুরুত্ব ছিল না তা খুব সহজেই অনুমেয়। অন্যদিকে বাংলায় কনের যে কোনো কালেই অভাব ছিল না এবং মাত্র এক মোহরেরই একজন নজরকাড়া সুন্দরীকে কেনা যেত তার উদাহরণ তো আমরা ইবনে বতুতার বিবরণেও পাই। বাংলার মুসলমানরা যে নিম্নবর্ণের হিন্দু থেকে ধর্মান্তরিত তার পক্ষে নৃতাত্ত্বিক সমীক্ষার বাইরেও মি. খান দুটি উপাদান যুক্ত করেছেন :

১. মুসলমানি শাস্ত্র কথা বাংলার রচনার প্রয়োজন এবং ২. অধিকাংশ মুসলমানের নিম্নশ্রেণির পেশায় নিয়োজিত থাকার কথা।

তৃতীয় অধ্যায়ে আকবর আলি খান বাংলায় ইসলাম প্রচারে মুসলমান শাসকদের ভূমিকাকে অতি নগণ্য বলে উল্লেখ করেছেন। এর পক্ষে তিনি তিনটি যুক্তির কথা বলেছেন। ১. উপমহাদেশের মুসলিম শাসনের কেন্দ্র দিল্লিতে—মুসলমানের সংখ্যালঘিষ্ঠতা, তেমনি বাংলার মুসলিম শাসনের প্রধান কেন্দ্র মালদহে মুসলিম সংখ্যালঘুতা। ২. দিল্লির সুলতানদের বিরুদ্ধে বাংলার সুলতানদের লড়াইয়ে স্থানীয় হিন্দুশক্তির সহযোগিতা গ্রহণ। ৩. তিন নম্বরটির কথা হয়তো তিনি ভুলে গিয়েছেন, তার উল্লেখ নেই। তবে মুঘল আমলে ধর্মান্তরকরণকে রাষ্ট্রীয়ভাবে শাস্তি দিয়ে বাধাদান করার কথা তিনি মির্জা নাথানের রেফারেন্সে বলেছেন। হয়তো রাষ্ট্রীয়ভাবে অনীহার কথা তিনি বলতে চেয়েছেন। তবে এই অনীহা মুঘল যুগের আগে যে ছিল এমনটা ইতিহাস বলে না। আর বাংলায় মুসলিম শাসকদের ইসলাম প্রচারে-প্রসারে অবদান নগণ্য তো নয়ই বরং অনেকগুলো কারণের মধ্যে এটি মূল কারণ বলেই মনে করা যায়। যদিও দিল্লিসহ ভারতের অন্যান্য স্থানে হয় নি বলে বাংলায়ও যে হবে না তাইবা হলফ করে বলার কী যুক্তি আছে? ইতিহাসপাঠে আমরা কিন্তু মুসলিম শাসনের প্রথম তিনশত বছরে ইসলামপ্রচারে শাসকদের প্রবল আগ্রহ ও সহযোগিতার বিস্তর উদাহরণ পাই। বরং এটা বলা যায় যে, প্রথম পর্বের মুসলিম শাসকদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা ছাড়া ইসলামের বিস্তার আদৌ আজকের পর্যায় আসত কিনা সন্দেহ হয়।

চতুর্দশ শতকের শেষের দিকে এসে আমরা ইতিহাসে দেখতে পাই—বাংলাকেন্দ্রিক ইসলামি খেলাফতের ঘোষণা। বাংলার সুলতান সিকান্দার শাহ নিজেকে ঘোষণা করছেন মুসলিম বিশ্বের খলিফা হিসেবে। এবং এর পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল বাংলার ইসলামিক পণ্ডিতরা। এ বিষয়ে গবেষক ড. আবদুল করিম তার বাংলার মুসলমানদের সামাজিক ইতিহাস বইতে লিখেছেন :

বাগদাদের খলিফা আল-মুস্তাসিম বহু পূর্বেই ১২৫৮ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণ করলেও বলবনী সুলতান রুকনউদ্দীন কায়কাউস এবং শামসউদ্দীন ফিরুজ শাহের বংশের সুলতানরা তাদের মুদ্রায় সেই খলিফার নাম উৎকীর্ণ করেছিলেন এবং এ রীতি ১৩৪২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত প্রচলিত ছিল। মুদ্রায় আল মুস্তাসিমের নাম উৎকীর্ণকারী বাংলার শেষ সুলতান ছিলেন আলাউদ্দীন আলী শাহ। এটা ভাবা নিরর্থক যে বাংলার সুলতানরা আল মুস্তাসিমের মৃত্যু বা ভয়ংকর মোঙ্গলদের হাতে খিলাফতের বিলুপ্তির কথা শোনেন নি। বাংলায় বলবনী সালতানাতের প্রতিষ্ঠাতা বুঘরা খান তার পিতা বলবনের রাজত্বকালে পশ্চিম সীমান্ত অঞ্চলে গভর্নর থাকাকালীন নিজেই মোঙ্গল হামলার সম্মুখীন হয়েছিলেন। সুতরাং রাজ্যের ইসলামি বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করাই ছিল অস্তিত্বহীন একজন খলিফার নাম উৎকীর্ণ করার পেছনের উদ্দেশ্য। ফখরউদ্দীন মুবারক শাহ, আলাউদ্দীন আলী শাহ এবং শামসউদ্দীন ইলিয়াস শাহের মতো গোড়ার দিকের স্বাধীন সুলতানেরা খলিফার নাম পরিত্যাগ করে নিজেদের ইয়ামিন-ই-খলিফাতুল্লাহ (আল্লাহর প্রতিনিধির ডান হাত), ইয়ামিন-উল খিলাফত (খিলাফতের ডান হাত) হিসেবে দাবি করে সন্তুষ্ট ছিলেন। এ-সময় অস্তিত্বহীন খলিফাকে স্বীকৃতিদানের ভ্রান্ত নীতি বাংলার শাসকদের কাছে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়ে পড়েছিল। কিন্তু খলিফার নাম বাদ দিলেও তারা তখনও প্রতিষ্ঠান হিসেবে ফিলাফতের আনুগত্য স্বীকার করতেন। তবুও এ অনিয়ম দূর করা সম্ভব হয় নি এবং বাংলার উলামা ও আইনবিদরা নিশ্চয়ই একটা সমাধান বের করার যথাসাধ্য চেষ্টা করেছিলেন।

এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে, দিল্লির সুলতানরাও একই সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছিলেন। মুহম্মদ বিন তুঘলক মিশরের আব্বাসীয় খলিফা আল-মুস্তাকফি বিল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে সনদ লাভ করে এর সমাধান করেছিলেন। তার উত্তরাধিকারী সুলতান ফিরুজ শাহ তুঘলকও সনদ লাভ করেছিলেন। তার মুদ্রায় আল-মুস্তাকফির দুই পুত্র আবুল আব্বাস আহমদ ও আবুল ফতেহ আল-মুতাসিদ এবং আল মুতাওয়াক্কিল আলাল্লাহ আবু আব্দুল্লাহ মুহম্মদের নামও পাওয়া যায়। কিন্তু বাংলার আলেমগণ দিল্লির আলেমদের ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন। স্বীকৃতিলাভের জন্য খলিফাদের না খুঁজে সুলতান সিকান্দর শাহ নিজেই ইমাম-উল-মুয়াজ্জাম উপাধি গ্রহণ করেছিলেন। এটা অবশ্য লক্ষণীয় যে, সিকান্দার শাহ নিজেই ইমাম ও খলিফা উপাধি গ্রহণ করলেও ঐসব মুদ্রায় নিজেকে ইয়ামিন-ই-খলিফাত-উল্লাহ ও নাসির-ই-আমীর-উল-মুমেনীন রূপে অভিহিত করেছেন। তিনি তার মুদ্রায় ইসলামের প্রথম চারজন খলিফার নামও উৎকীর্ণ করেছিলেন।

সিকান্দর শাহের খলিফা উপাধি ধারণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তার মাধ্যমে বাংলা তার প্রথম খলিফাকে পেয়েছিল যেটা নিজেই বাংলায় ইসলামের ইতিহাসে এক বিখ্যাত ঘটনা। সিকান্দর শাহের এ উপাধি ধারণের পেছনে নিশ্চয়ই একটি রাজনৈতিক বিবেচনাও ছিল। তিনি দিল্লির ফিরুজ শাহ তুঘলকের সমসাময়িক ছিলেন এবং প্রকৃতপক্ষে টিকে থাকার জন্য তাকে ফিরুজ শাহের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হয়েছিল। ফিরুজ শাহ তুঘলক তখন মিশরের আব্বাসীয় খলিফার কাছ থেকে শুধু সনদই লাভ করেন নি, খলিফার স্বীকৃতিলাভের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে তিনি তার বিশ্বাসও দম্ভভরে লিপিবদ্ধ করেছিলেন।

এ ছাড়া সুলতানদের প্রধান উপাধিসহ সর্বময় ক্ষমতা ও খিলাফতের প্রতিনিধির সুবিধাভোগের অনুমতিপত্র তিনি লাভ করেছিলেন। এটাও তিনি দম্ভভরে লিপিবদ্ধ করেছিলেন। দিল্লির সুলতানের কর্তৃত্বের এহেন দাবি বাংলার সুলতানের জন্য প্রকৃতক্ষে ভয়াবহ বিপদ হয়ে দাঁড়ায়। সুতরাং বাংলার সুলতান আরও এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে নিজেই খলিফা উপাধি গ্রহণ করে তার দিল্লি প্রতিপক্ষের উদ্দেশ্য ব্যর্থ করে দেন; রাজ্যের আলেমদের সম্মতি ছাড়া সুলতানের পক্ষে এটা করা সম্ভব ছিল না এবং এ উদ্ভাবনী দক্ষতার জন্য বাংলার আলেমদের কৃতিত্ব দেয়া উচিত।

সিকান্দর শাহের উত্তরাধিকারীগণ, গিয়াসউদ্দীন আজম শাহ এবং সাইফউদ্দীন হামজা শাহ তাকে অনুসরণ করে খলিফা উপাধি গ্রহণ করেছিলেন। এর পাশাপাশি তার নিজেদের ‘নাসির-ই-আমীর-উল-মুমেনীন’, ‘ইয়ামিনই-খলিফাতিল্লাহ’, ‘নাসির-উল-ইসলাম ই-ওয়াল মুসলিমিন’ এবং ‘ইয়ামিন-ই-আমীর-উল-মুমেনীন’ ইত্যাদি রূপে দাবি করেছিলেন। তাদের মুদ্রায় ইসলামের প্রথম চারজন খলিফার নামও দেখা যায়।

বলার অপেক্ষা রাখে না যে, ইসলামের খলিফা উপাধি ধারণকারী বাংলার এই শাসকগণ প্রকৃতার্থেই খলিফা হয়ে ওঠার চেষ্টায় কোনো খামতি দেখিয়েছেন। পূর্বে উদ্ধৃত তৎকালীন সময়ের পীর নূরে কুতুবুল আলমের চিঠিতে আমরা বাংলাকে ভারতবর্ষে ইসলামের পীঠস্থান বলে উল্লেখ করার প্রমাণ পাই।


হিন্দুদের অত্যাচারে বৌদ্ধরা ইসলাম গ্রহণ করেছে এ ধরনের মন্তব্যের কোনো ভিত্তি নেই। 


‘ব্রাহ্মণ্যবাদের উৎপীড়নের বিরুদ্ধে নিম্নবর্ণের বিদ্রোহ’ শীর্ষক চতুর্থ অধ্যায়ে মি. খান নিম্নবর্ণের প্রতি ব্রাহ্মণদের অত্যাচারের বিষয়টি বলতে গেলে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করেছেন। বাংলার ব্রাহ্মণদের নকল, দোআঁশলা হিসেবে উল্লেখ করে রেফারেন্স দিয়েছেন। এবং পরস্পরবিদ্বেষী কর্তৃত্বহীন ও দুর্বল বলে মত দিয়েছেন, যাদের পক্ষে নিম্নবর্ণের লোকদের অত্যাচার করা আদৌ সম্ভব নয় বলে তিনি মনে করেন। তাহলে নিম্নবর্ণের হিন্দুরা মুসলমান হয়েছেন কেন? খানের মতে, আধ্যাত্মিকতার কারণে। এখানে একটি প্রশ্ন অনিবার্য ভাবেই আসে, তাহলে কি আধ্যাত্মিকতা কেবলমাত্র অশিক্ষিত নিম্নবর্ণের হিন্দুরাই বুঝলেন! ব্রাহ্মণরা মোটেই বুঝলেন না? গভীরতাহীন ভাসা-ভাসা আলোচনার এই অধ্যায়টি বইটির একটি দুর্বল অধ্যায় বলেই প্রতীয়মান হয়। তিনি ৪২ পৃষ্ঠার শেষে উল্লেখ করেছেন ইসলামের শুরুর দিকে যে সাম্য ছিল তা ৫০০ বছর পর যখন বাংলায় আসে তখন ছিল না এবং মুসলমানদের মধ্যে আশরাফ-আজলাফ-আতরাফ নানা রকম বর্ণের কথা বলেছেন। ইসলামধর্মে ধনী-গরিবের ব্যবধান সব সময়ই ছিল, কিন্তু এই বর্ণবাদ কেবল ভারত মহাদেশের বিভিন্ন দেশেই বর্তমান। এর কারণ কী হতে পারে? তার কোনো উল্লেখ মি. খান করেন নি। ইসলামের ইতিহাস নিয়ে লিখতে গিয়ে অনেককেই দেখা যায় একটি সহজবোধ্য বিষয়কে উপেক্ষা করছেন। মুসলমানরা ধর্মপ্রচারের নামে যখনই কোনো দেশ ও জনগোষ্ঠীকে দখল করেছে তাদের আক্রোশের প্রধান কেন্দ্র ছিল সেই জনগোষ্ঠীর ধর্মগুরু বা পুরোহিত শ্রেণির উপর। জোর করে ধর্মান্তর করা হতো মূলত এই শ্রেণির লোকদের, সাধারণদের উপর ততটা নয়। অব্যবহিত কাল পরে—কর প্রদান, বশ্যতা স্বীকার এবং সহাবস্থানের ফলে জোর-জবরদস্তির ব্যাপারটা হয়তো থাকত না। সে হিসেবে বাংলার ব্রাহ্মণদের একটা বড় অংশ প্রথম দেড়-দুইশ বছরের মধ্যেই মুসলমান হয়ে যাওয়ার কথা। যে কারণে বাংলায় ইসলামধর্মের প্রথম দুইশ বছরের মধ্যে এই আশরাফ-আতরাফ সমস্যার কোনো আওয়াজ পাওয়া যায় না। পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে যখন অব্রাহ্মণ বঙ্গবাসীদের মধ্যে ইসলামের দ্রুত প্রসার হয় এবং সংখ্যাধিক্য দেখা দেয় তখনই বাংলা ভাষা নিয়ে কমপ্লেক্স এবং নিম্নবর্ণের প্রশ্ন স্পষ্ট হয়। এ ধারণা অসংগত হবে না যে, বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে আশরাফ-আতরাফ বর্ণবাদ ধর্মান্তরিত ব্রাহ্মণ মুসলমানদের অনুপ্রেরণায় সৃষ্ট। আকবর আলি খান তার বইয়ের ৪৫ নং পৃষ্ঠার সারণি-৪ এ একটি হাস্যকর পরিসংখ্যান উপস্থাপন করেছেন। ঐতিহাসিক সূত্র দিয়ে ১২০০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৭০০  খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত সময়ে তিনি বাংলার কুলীন ও বর্ণহিন্দুর মধ্যে মাত্র ২০টি পরিবারের মুসলমান হওয়ার তালিকা দিয়েছেন। যেখানে কোনো কোনো শাসকের নাম ও সময় খুঁজে পেতে হয়েছে মুদ্রার স্বাক্ষ্য থেকে সেখানে তিনি কিভাবে নিশ্চিত হলেন আরও হাজার হাজার কুলীন বর্ণহিন্দু মুসলমান হন নি? এরকম বিশ্লেষণধর্মী আলোচনায় এ জাতীয় পরিসংখ্যান সমগ্র আলোচনাকেই গুরুত্বহীন ও অপাঙ্‌ক্তেয় করে তোলে। এখানে উল্লেখ্য যে, রাজা গণেশপুত্র জালালুদ্দিন যদুই তো তার প্রায়শ্চিত্তে অংশগ্রহণকারী সব ব্রাহ্মণকে মুসলমান বানিয়ে ছেড়েদিলেন। এমনকি পরবর্তীকালেও জোর করে মুসলমান বানানোর অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এমনভাবে ধর্মান্তরিত করার অভিযোগ আমরা কালাপাহাড়ের বিরুদ্ধেও পাই। অর্থাৎ ইতিহাসের যে টুকিটাকি তথ্য পাওয়া যায়, তাতে দেখা যাচ্ছে বহিরাগত মুসলমানদের চেয়ে বরং ধর্মান্তরিত বর্ণহিন্দু-মুসলমানরাই ধর্মান্তরকরণে বেশি জোর-জবরদস্তি করেছেন।

মি. খান ১৯২১ সালের আদমশুমারির রিপোর্ট উল্লেখ করে দেখিয়েছেন হিন্দুদের মধ্যে কুলীন বা ভদ্র লোকের সংখ্যা ছিল মোট হিন্দুর ১৫ শতাংশ অর্থাৎ বাংলার ৮৫ ভাগ হিন্দুই ছোটলোক, নমঃশূদ্র, তফসিলি সম্প্রদায়ের। যা আমরা আগেই উল্লেখ করেছি। সেই মতো তিনি সিদ্ধান্ত দিয়েছেন যে বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে বর্ণহিন্দুদের অংশগ্রহণ ১৫ শতাংশের বেশি হওয়ার কোনো কারণ নেই। এই ১৫ শতাংশ ধারণার বিপরীতেও যৌক্তিক প্রশ্ন তোলা সম্ভব।

তবে আমাদের ধারণা এই পর্বের আলোচনায় মি. খান একটি সত্যের কাছাকাছি হয়েছেন, আর তা হলো বাংলায় ব্রাহ্মণ্যবাদ বা বর্ণাশ্রম ধর্মের প্রভাব খুব একটা ছিল না। এই বর্ণাশ্রম ধর্মটি মুসলিম শাসন আমলেই বাংলায় সংহতরূপ লাভ করে এবং ব্রিটিশ শাসনের সময় কিছুটা আগ্রাসী চরিত্র ধারণ করে।

হিন্দুদের উৎপীড়নে বৌদ্ধদের ইসলামগ্রহণ বিষয়ে মি. খান আলোচনা করেছেন পঞ্চম অধ্যায়ে। দিনেশচন্দ্র সেন, টাইটাস ও আর সি মিত্রের মতো একাধিক ঐতিহাসিকের সাথে তিনি দ্বিমত পোষণ করে বলেছেন : ‘বৌদ্ধদের দলে দলে ধর্মান্তরের তত্ত্ব সত্য বলে মনে হয় না। হিন্দুধর্ম গৌতম বুদ্ধকে দেবতা হিসেবে মেনে নিয়েছে এবং তৃণমূল পর্যায়ে হিন্দু ও বৌদ্ধধর্ম কাছাকাছি চলে এসেছিল। সুতরাং হিন্দুদের অত্যাচারে বৌদ্ধরা ইসলাম গ্রহণ করেছে এ ধরনের মন্তব্যের কোনো ভিত্তি নেই। যদিও পাল রাজারা বাংলায় ৪০০ বছরের বেশি রাজত্ব করেছেন কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসাধারণ বৌদ্ধ ছিল না। পাল রাজারা নিজেরাও ব্রাহ্মণ্য ধর্মে প্রভাবান্বিত হয়েছেন এবং অনেকেই ব্রাহ্মণ রাজকুমারীদেরকে বিয়ে করেছেন।”

হিউয়েন সাঙ বঙ্গদেশে ৬২৯-৬৪৫ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত ১৬ বছর ছিলেন। তিনি বলছেন, তখন বঙ্গদেশে ১,০০,০০০ এর বেশি বৌদ্ধভিক্ষু ভিন্ন ভিন্ন সঙ্ঘারামে বা বিহারে বাস করতেন। এছাড়াও অন্য ধর্মাবলম্বী ভিক্ষুরাও ছিলেন—মানে জৈন প্রভৃতি ভিক্ষুরাও ছিলেন। এই ভিক্ষুরা ভিক্ষা ছাড়া অন্য কোনো রোজগার করতেন না বা নিষেধ ছিল। তিন বাড়িতে ভিক্ষার পর, ৪র্থ বাড়িতে ভিক্ষা করার নিয়ম ছিল না। আবার এক বাড়িতে ভিক্ষা করার পর, সেই বাড়িতে এক মাস পর ভিক্ষা করতে পারতেন; তার আগে নয়। এটাও নিয়ম ছিল। সুতরাং একজন যতি (এই ভিক্ষুদের তাই বলা হতো, কারণ তারা ইন্দ্রিয় সংযম করতেন) প্রতিপালন করতে অন্তত ১০০ ঘর গৃহস্থ বৌদ্ধ থাকা চাই! তাহলে, লক্ষাধিক যতিকে ভিক্ষা দেওয়ার জন্য এক কোটি গৃহস্থ বৌদ্ধ থাকা চাই। এককোটি গৃহস্থ না হলেও তখন প্রায় গোটা বঙ্গদেশে যে বিরাট সংখ্যক বৌদ্ধধর্মালম্বী ছিলেন তাতে কি আর সন্দেহের অবকাশ থাকে! এর পাঁচশ’ বছরের মধ্যেই যে সংখ্যাগরিষ্ঠ বৌদ্ধরা শূন্যের কোঠায় নেমে যাবেন তাইবা কী করে হয়!

কথা হলো পালদের জনকভূমি বাংলায়ই ছিল। প্রথম রাজা গোপাল বাঙালি প্রাকৃতপুঞ্জ থেকে নির্বাচিত রাজা ছিলেন বলে ইতিহাসে সাক্ষ্য পাওয়া যায়। অন্যদিকে বৌদ্ধধর্ম বাংলায় ব্রাহ্মণদের প্রবেশের হাজার বছর আগে প্রবেশ করেছিল। বাঙালি প্রকৃতিপুঞ্জে তার একটা অবস্থান ছিল। পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শনেও দেখা যায় ঢাকা, কুমিল্লা ও উত্তরবঙ্গে প্রাচীন বৌদ্ধ-বিহারের উপস্থিতি; বরিশালে মরীচি মূর্তি পাওয়া গেছে, যশোর অঞ্চলের মাটি খুঁড়লে এখনও বৌদ্ধ তারাদেবীর মূর্তি এবং কাঠের প্যাগোডা মেলে; পশ্চিমবঙ্গে হিন্দুদের হাতে বৌদ্ধ-নিপীড়নের কথা শূন্য পুরাণে পাই।

কিন্তু কথা হলো মি. খান যেভাবে বৌদ্ধদের সংখ্যালঘু বা প্রায় অস্তিত্বহীন হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করেছেন তারইবা ভিত্তি কী?

ধর্মানুসারীদের অনুপাতে বাঙালিদের মধ্যে আজকের বাস্তবতায় যেমন মুসলমানদের সংখ্যা ৬৫ থেকে ৭০ ভাগ, হয়তো সে আমলে বৌদ্ধরা জনসংখ্যার এমন বিরাট অংশ ছিল না। কিন্তু বাঙালি জনগোষ্ঠীর মধ্যে বৌদ্ধদের যে একটা উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি সব সময়ই ছিল তা অস্বীকার করার খুব একটা কারণ আছে বলে মনে করি না।

এমনকি পঞ্চদশ শতকেও বাংলায় যে বৌদ্ধধর্মাবলম্বীদের ছিটেফোঁটা উপস্থিতি ছিল তার কথা আমরা নীহাররঞ্জন রায়ের লেখায়ও পাই : ‘১৪৩৬ খ্রিস্ট শতকে জনৈক সদ্ধৌদ্ধ করণ-কায়স্থ ঠক্কুর শ্রীঅমিতাভ বেনুগ্রামে বসিয়া সমসাময়িক বাঙলা অক্ষরে (শান্তিদেব রচিত) বোধিচর্যাবতার-পুঁথিটি নকল করিয়াছিলেন। পঞ্চদশ শতকেও তাহা হইলে বাঙলাদেশে ইতস্তত দুই চারিজন বৌদ্ধ ছিলেন এবং শান্তিদেবের পুঁথির চাহিদাও ছিল। তারনাথ বলিতেছেন, এই শতকেরই দ্বিতীয়পদে ছগল বা চঙ্গলরাজ নামে জনৈক বাঙালী নরপতি রানীর প্রভাবে পড়িয়া বৌদ্ধ হইয়া বুদ্ধগয়ার মঠগুলি সংস্কার সাধন করিয়াছিলেন।’ (নীহাররঞ্জন : ৭০৫)

আরেকটা বিষয় লক্ষণীয়। বৌদ্ধ পালরা যখন বাংলার রাজা তখন নবাগত ব্রাহ্মণরা তাদের আনুকুল্য লাভের চেষ্টা করেছেন, কন্যাও বিয়ে দিয়েছেন। গৌতম বুদ্ধকে দেবতা হিসেবে স্বীকার করে বাঙালি বৌদ্ধসমাজকেও গ্রাস করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু হিন্দু সেন-আমলে? বল্লাল সেনের দানসাগর গ্রন্থে রাজাকে যে আদর্শায়িত করার জন্য বৌদ্ধ নাস্তিকদের নিধনকারী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, এ তথ্য মি. খানও তার বইয়েই উল্লেখ করেছেন। আর কালের কী পরিহাস, মধ্যযুগে রাজনৈতিক ক্ষমতাহীন বৌদ্ধধর্মাবলম্বীদের দর্শন মাত্র বৈষ্ণব প্রেমের গুরু চৈতন্য (তারই শিষ্যের ভাষ্য মতে) লাথি মারিলেন শিরে। কথা হলো, এই বিশাল বাংলার বিভিন্ন জনপদে, গ্রামপ্রান্তরে কে কবে মুসলমান হয়েছেন তার খবরই-বা কে রেখেছে। যেখানে রাজনৈতিক ইতিহাসের উপাত্ত পেতেই আমাদের গলদঘর্ম হতে হয়! আবার ধর্ম হিসেবে ইসলাম এমন যে, এই ধর্ম গ্রহণকারীর সাথে তার পূর্ব ধর্মবিশ্বাস এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের একটা বিচ্ছেদ ঘটে। এটাও একটা কারণ হতে পারে। আরেকটি বিষয়—মুসলিম-পূর্ব বাংলায় ব্রাহ্মণেরা বৌদ্ধ শ্রমণদের পাষণ্ড, ন্যাড়া বলে গালি দিত। এই ন্যাড়া গালিটি আজও বাঙালি মুসলমানদের উপর সাম্প্রদায়িক হিন্দুরা বর্ষণ করে থাকে। কারণ বোধকরি আর ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই।

ষষ্ঠ অধ্যায়ে আকবর খান বাংলায় ইসলামপ্রচারে পীরদের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করেছেন। শুরুতে তিনি চতুর্দশ শতাব্দীর বিখ্যাত পীর জৈনপুরের আশরাফ শিমনানীর লেখা চিঠির উদ্ধৃতি দিয়েছেন—’সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর। বাংলা কত সুন্দর জায়গা—বিভিন্ন দিক থেকে অসংখ্য পীর দরবেশ, তপস্বী এসে এদেশে তাদের ঘর বেঁধেছে একে তাদের নিজের বাসভূমি করে নিয়েছে।’ মি. খান এটা স্বীকার করে নিয়েছেন যে দক্ষিণ এশিয়ায় ইসলামের প্রসারে মূল উদ্যোক্তা ছিলেন পীর-দরবেশগণ। তিনি উল্লেখ করেছেন পাঞ্জাব, উত্তর ও পশ্চিম ভারতে ধর্মপ্রচার করেছেন এমন ১১৩ জন মুসলমান ধর্মপ্রচারকের মাজারের তালিকা প্রস্তুত করেছিলেন এইচ এ রোজ। রোজের এই তালিকার বিপরীতে বাংলার প্রায় সমগ্র অঞ্চল জুড়ে নবম থেকে ১৬ শতক অব্দি সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পীর-দরবেশদের একটি তালিকা মি. খানই উপস্থাপন করেছেন তার বইতে, যা সংখ্যায় ৭৬ জন। তবুও আকবর খান প্রশ্ন তুলেছেন—’দক্ষিণ এশিয়ার অধিকাংশ অঞ্চলে মুসলমান পীর-দরবেশদের ধর্মান্তরকরণ উদ্যোগের ব্যর্থতা সত্ত্বেও বাংলায় তারা কেন তুলনামূলক সাফল্য লাভ করেছিলেন? আধ্যাত্মিক সাধনার সাফল্যের ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য অংশের পীরগণ বাংলার পীরদের চেয়ে নিম্ন পর্যায়ের ছিলেন না।’ অতঃপর তিনি সিদ্ধান্ত দিয়েছেন—’বাংলায় পীরদের সাফল্যের কারণ তাদের আধিক্য, অধ্যবসায় বা দক্ষতা নয়, বরং ধর্মান্তরকরণের জন্য উপযোগী পরিবেশ-পরিস্থিতিই তাদের সাফল্যের ক্ষেত্রে অধিক গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিল।’ অত্যন্ত স্ববিরোধী এই প্রশ্ন। ভারতের অন্য অংশের চেয়ে এখানে পীর-দরবেশ বেশি এসেছিল। অন্য অংশের পীরেরা যে খুব অসফল হয়েছেন তাও বলা যৌক্তিক মনে হয় না। বলার অপেক্ষা রাখে না, এখানে সত্যের যথেষ্ট অপলাপ হয়েছে, ঐতিহাসিক তথ্যের চেয়ে কেন তিনি কিছুটা মনগড়া সিদ্ধান্তে উপনীত হলেন! তা বুঝতে পারি পরবর্তী অধ্যায়ে তার উন্মুক্ত গ্রামতত্ত্বের প্রয়োজন হিসেবে। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই অধ্যায়টিকে আকবর আলি খান ভাসা-ভাসা অগভীর আলোচনায় শেষ করেছেন। অথচ বাংলায় ইসলামপ্রচারে শুধু সুফি বা পীর-দরবেশদেরই ভূমিকা ছিল না। ছিল ওলামা বা মুসলিম পণ্ডিতদেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। দেশজুড়ে অজস্র মাদরাসা বা ধর্মশিক্ষাকেন্দ্র স্থাপনের ইতিহাস রয়েছে এদের। এ ক্ষেত্রে মোল্লা-মৌলভি এমনকি স্থানীয় নিন্মবর্ণের মুসলমান ফকির, ল্যাংটা-বাবাদেরও বাদ দেওয়া যায় না। যার ইঙ্গিত আমরা সতের শতকেও পাই তাভেরনিয়ে-র ভারতভ্রমণ গ্রন্থের তৃতীয় ভাগের প্রথম ও দ্বিতীয় অধ্যায়ে।

বাংলায় ইসলামপ্রচারে পীরদের সাফল্যের ব্যাপারে ঐতিহাসিক এবং সমাজতাত্ত্বিকদের মধ্যে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হলেও এর সঠিক ব্যাখ্যারও প্রয়োজন রয়েছে।


আরও একটি বিষয় অনুমেয় যে, স্থানীয় বাঙালি মুসলমানদের অধিকাংশের পূর্বপুরুষই কোনোকালে হিন্দুধর্ম বা বর্ণাশ্রম ধর্মের অভ্যন্তরে ছিল না।


সপ্তম অধ্যায়ে আকবর আলি খান বাংলায় কখন মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রতিষ্ঠিত হয় সে বিষয়ে আলোচনা করেছেন। শুরুতেই প্রথম প্রজন্মের ঐতিহাসিক এবং দ্বিতীয় প্রজন্মের ঐতিহাসিকদের মতামত সংক্ষেপে তুলে ধরেছেন। মুসলিম-শাসন শুরু হওয়ার অনেক আগে থেকেই বাংলায় আরব-বণিকদের আসা-যাওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন। পাহাড়পুর এবং ময়নামতি বৌদ্ধবিহারে আরবদের মুদ্রা পাওয়ার কথাও আমরা জানি। কিছু পীরদের নাম উল্লেখ করেছেন, যাদের সম্পর্কে মুসলিম-শাসনের আগেই বাংলায় ধর্মপ্রচার করতে আসার জনশ্রুতি আছে। তবে এদের অনেকেই খলজির গৌড়-দখলের আগে যে বাংলায় আসেন নি, তা এখন প্রমাণিত। ধরা যাক, বিক্রমপুরের বাবা শহীদ আদম। তবে সবার ক্ষেত্রে এটা বলা যায় না যে, নিশ্চিত তারা মুসলিম-শাসনের পরে এসেছেন। যেখানে মুসলিম-শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সেখানেই ইসলাম ধর্মের বিস্তার হয়েছে—এই ধারণাকে তিনি ভুল ধারণা বলে উল্লেখ করেছেন। বুলিয়েটের রেফারেন্স দিয়ে বলেছেন—’ইরাক, ইরান, সিরিয়া, মিশর, তিউনিশিয়া ও স্পেনে অষ্টম শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত, যখন উমাইয়া সাম্রাজ্যের অবসান ঘটে, মোট মুসলমান ১০ শতাংশের বেশি ছিল না।’ তবে এদ্বারা প্রমাণিত হয় না যে, ঐসব অঞ্চলে ইসলামপ্রসারে পরবর্তীকালে মুসলিম-শাসনের প্রভাব ছিল না। একমাত্র ইন্দোনেশিয়া মালেশিয়া ছাড়া পৃথিবীর যেখানেই ইসলামের অনুসারীর সংখ্যা বেশি, সেখানেই ইসলামি শাসনের ইতিহাস রয়েছে। মি. খান বলেছেন হিন্দুদের কাছে পরকাল খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল, ফলে তারা ধর্মান্তকরণে আপস করতে চায় নি। প্রশ্ন হলো, বাংলার অধিকাংশ মানুষ যে হিন্দু ছিল—এই অবৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্তেই-বা তিনি এলেন কেমন করে? এর পরপরই তিনি স্বাক্ষ্য উপস্থাপন করেছেন ইবনে বতুতার। বতুতা সিলেটে শাহজালালের সাথে দেখা করতে এসেছিলেন এবং পনের দিন মেঘনার নৌপথে ভ্রমণ করেছেন। তিনি তীরবর্তী অধিবাসীদের কাফের বলে উল্লেখ করেছেন। আমরা জানি, চতুর্দশ শতকে বাংলায় আসা এই পরিব্রাজক কোনো আদমশুমারির কার্যক্রমে যুক্ত ছিলেন না। আদুল গায়ের, টুপিহীন, নেংটি-ধুতিপরা নদীতীরবর্তী একজন বাঙালি মুসলমানকেও বতুতার কাছে কাফের ছাড়া অন্য কিছু মনে না হওয়ারই কথা। কবি মুকুন্দের কবিতায় মধ্যযুগের দরিদ্র মুসলমানদের খবর যেমন আমরা পাই।

মি. খান এরপর ১৫১৪ খ্রিষ্টাব্দে আসা পর্তুগিজ পরিব্রাজক বারবোসার উদ্ধৃতি দিয়েছেন—’এখানে রাজা ও তার সহকর্মীদের কাছ থেকে সুবিধা নেয়ার জন্য প্রতিদিন অনেক হিন্দু মুসলমানধর্ম গ্রহণ করছে।’ অতঃপর তিনি সিদ্ধান্ত টেনেছেন, প্রথম তিনশত বছরে মুসলমান সংখ্যাধিক্য প্রতিষ্ঠিত হয় নি। হয়তোবা। তবে সংখ্যাধিক্য না হলেও বাংলায় ইসলামধর্মের শক্ত ভিত্তিটি মুসলিম-শাসনের প্রথম তিনশ বছরের মধ্যেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

চতুর্দশ শতকে বাংলার জনসমাজে ফকির-দরবেশদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি ছিল। সায়দা নামক এক ফকিরকে সোনারগাঁয়ের স্বাধীন সুলতান ফখরউদ্দীন মোবারক শাহ খুব ভক্তি করতেন। সমর-অভিযানে যাওয়ার সময় সুলতান তাকে রাজধানীর শাসনভার দিয়ে যান। সায়দা ছিলেন শত শত ফকিরের নেতা, ছিল বিরাট ভক্তকুল। যাদের নিয়ে তিনি সুলতানপুত্রকে হত্যা করে নিজেকে সুলতান ঘোষণা করেন। ইবনে বতুতা লিখেছেন—ফখরউদ্দীন মোবারক শাহের শুধু এক পুত্র ছিল, যিনি সুলতান কর্তৃক সুদকাওয়ানের (চট্টগ্রামের) গভর্নর হিসেবে নিযুক্ত শায়েদা নামে এক ফকিরের হাতে নিহত হয়েছিলেন। অবশ্য পরে এই ফকিরসহ আরও অসংখ্য ফকিরকে হত্যা করেছিলেন ফখরউদ্দীন মোবারক শাহ।

ইসলামি পণ্ডিত, পীর-ফকিরদের প্রভাব বাংলার তৃণমূলে কতটা শক্তিশালী ছিল তার একটি প্রামাণ্য উদাহরণ আমরা ইতোমধ্যেই পেয়েছি। পনের শতকে যখন রাজা গণেশ চক্রান্ত করে বাংলা সালতানাতের সিংহাসন দখল করেন, তখন পাণ্ডুয়ার পীর নূরে কুতুবুল আলম জৈনপুরের সুলতান ইব্রাহিম শর্কির কাছে একটি চিঠি পাঠিয়েছিলেন। সুলতান সেই চিঠিটি তখনকার জৈনপুরের বিখ্যাত আলেম আশরাফ শিমনানির কাছে পাঠিয়ে পরামর্শ চেয়েছিলেন। উত্তরে শিমনানি সুলতানকে যে চিঠিটি দিয়েছিলেন সেই চিঠি কিছুকাল আগে পাওয়া গেছে। সুখময় মুখোপাধ্যায়ের অনুবাদ থেকে হুবহু তুলে দিলাম :

কাফের কানসের জোর করে ক্ষমতা দখল করার বিরুদ্ধে আপনার সাহায্য চেয়ে কুৎব আলম আপনাকে যে চিঠি লিখেছেন, তার সারমর্ম এই,—’প্রায় ৩০০ বছর বাদে ঐশ্লামিক ভূমি বাংলাদেশে বিশ্বাস (ঈমান/ধর্ম) ধ্বংসকারী কাফেরদের কালো ছায়া পড়াতে দেশ অন্ধকার হয়ে গেছে। মুসলমানরা অমর্যাদার মধ্যে পতিত হয়েছে। দেশের প্রতিটি কোণে ইসলামের প্রদীপ তার জ্যোতি বিকিরণ করে প্রকৃত পথ প্রদর্শন করত, কানস রায় অবিশ্বাসের যে ঝড় বইয়ে দিয়েছে তাতে তা নিভে গেছে। আপনার বিজয়ী সেনাবাহিনীর আগুন দিয়ে নূরি (স্বয়ং নূর কুৎব) আর হুসেনির (শেখ হুসেন নামে আর একজন দরবেশ) প্রদীপকে জ্বালিয়ে দিন।… ইসলামের পীঠস্থানের যখন এই অবস্থা হয়েছে, তখন আপনি কেন শান্ত ও সুখী মনে সিংহাসনে বসে রয়েছেন? উঠুন এবং ধর্মের সাহায্যে এগিয়ে আসুন। আপনার এত শক্তি যখন রয়েছে, তখন এ-কাজ করা আপনার অবশ্য কর্তব্য। সাহেব কিরান (১৬. দুই শতাব্দীর প্রভু (lord of two centuries) আমীর তৈমুর কেন দিল্লির সাম্রাজ্য জ্বালিয়ে দিয়েছিলেন বলেই তো দিল্লির মতো এমন একটা জনাকীর্ণ শহর ধ্বংস করেছিলেন! (১৭. তৈমুর এই অজুহাতই দেখিয়েছিলেন। আপনি নিজে হিন্দুস্থানের সাহেব কিরান, তবুও যে নিষ্ঠুরতা ও অত্যাচারে বাংলাদেশ ধ্বংস হচ্ছে তা আপনি সহ্য করছেন! কাফেরির আগুন সেখানে দাউ দাউ করে জ্বলছে আর আপনি আপনার তলোয়ার খাপে ভরে রেখেছেন! এরকম ব্যাপার থেকে কোনো বন্ধু যে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারেন, তা দেখে আমি অবাক হয়ে যাচ্ছি! বাংলাদেশকে স্বর্গ বলা হয়; কিন্তু তা আজ নরকের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে গেছে।… প্রত্যেকের উপর এমন ধরনের অত্যাচার, সিংহাসনে বসে বিশ্রাম করবেন না। আসুন, এসে বিধর্মীকে আপনার অসি দিয়ে উচ্ছেদ করুন।’

এই হচ্ছে মহাপুরুষ নূরের চিঠির মর্ম, যে চিঠি আপনি পেয়েছেন। আপনি লিখেছেন যে, আপনি আপনার অসংখ্য দিগ্বিজয়ী সৈন্যকে বাংলা আক্রমণের জন্যে সমবেত করেছেন। এ-সম্বন্ধে আমার মত প্রকাশ করা উচিত। আমি আপনার সাফল্য প্রার্থনা করি। ধার্মিক রাজাদের পক্ষে মুসলমানধর্মের রক্ষার জন্যে সৈন্যবাহিনী পরিচালনা করার চেয়ে আনন্দের কাজ আর কিছুই নেই।… বাংলাদেশে বড় শহরের তো কথাই নেই, এমন ছোট শহর বা গ্রামও মিলবে না, যেখানে দরবেশরা এসে বসতি করেন নি। অনেক দরবেশ পরলোকগমন করেছেন; কিন্তু যাঁরা বেঁচে আছেন, তাঁদের সংখ্যাও অল্প হবে না। তাঁদের সন্তানসন্ততিকে, বিশেষত হযরত নূর কুৎব আলমের ছেলেকে এবং পরিবারকে যদি দুরাত্মা বিধর্মীদের কবল থেকে উদ্ধার করা যায়, তাহলে খুবই ভালো কাজ হবে।” (সুখময় : ১৩৪-১৩৫)।

নূরে কুতুবুল আলমের লেখা আরেকটি চিঠির অংশ বিশেষ হলো—

হাজার হাজার ধার্মিকশ্রেষ্ঠ ও পণ্ডিতশ্রেষ্ঠ এবং দরবেশ ও ভক্ত আজ ৪০০ বছরের জমিদার একজন বিধর্মীর অধীনস্থ হয়েছে। প্রকৃত ধর্মের সমস্ত ফলই নষ্ট হয়েছে। ভগবান (আল্লাহ) রাজ্যের সমস্ত কর্তৃত্ব একজন বিধর্মীর হাতে তুলে দিয়েছে।…'(সুখময় : ১৪৩)

‘৪০০ বছরের পুরানো জমিদার’ মানে সেন-আমলের সামন্ত-মহাসামন্তরা মুসলিম-শাসকদের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে তখনও যে বংশানুক্রমে বহাল তবিয়তে ছিলেন তার একটি স্পষ্ট প্রমাণ এটি। আবার কেউ কেউ যে সিংহাসন দখলের রাজনৈতিক ক্ষমতাও রাখে তার প্রমাণ স্বয়ং রাজা গণেশ। ব্রাহ্মণরাও এদের ছত্রছায়ায় জনপদে বর্ণাশ্রম ধর্মের বিস্তারে যে সক্রিয় ছিল তাও অনুমান করা যায়। অন্যদিকে বাংলা যে একটি ঐস্লামিক ভূমি, তার প্রত্যন্ত গ্রামপ্রান্তর অব্দি যে পীর-দরবেশদের আস্তানা, তারও ইঙ্গিত এই চিঠিতে আমরা পাই।

এরপর সারণি-৬-এ মি. খান দেখিয়েছেন প্রখ্যাত পীরদের প্রায় ৬৩ শতাংশই ত্রয়োদশ এবং চতুর্দশ শতাব্দীতে বাংলায় আসার তথ্য। অতঃপর আমরা ১৮০১ থেকে ১৮৭০ সাল অবধি কিছু জেলাভিত্তিক মুসলমানদের পরিসংখ্যান দেখতে পাই। জন্মহারের চেয়ে বেশি এই বৃদ্ধির ফলাফলকে বিবেচনা করে মি. বেভারলি সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন, ব্রিটিশ শাসনকালেও বাংলার হিন্দুরা ইসলামে দীক্ষিত হয়েছে। আর এই সূত্র ধরেই মি. খান সিদ্ধান্ত দিয়েছেন, সাতশ বছর ধরেই ইসলামধর্মে ধর্মান্তর ঘটেছে। অবশ্য এ ক্ষেত্রে ইটনের দ্বিমতের কথাও উল্লেখ করেছেন। মি. ইটন মনে করেন পঞ্চদশ এবং ষোড়শ শতকেই ইসলাম সংখ্যাধিক্যের ধর্মে পরিণত হয়েছে। আমরাও দ্বিমত পোষণ করি এবং কিছুটা মি. খানের সাথেও। ইসলাম প্রথম তিন শতকের মধ্যেই জনসংখ্যার একটা উল্লেখযোগ্য অংশকে ধর্মান্তরিত করে পরবর্তী শতকগুলোতে সংখ্যাগরিষ্ঠের পর্যায় পৌঁছেছে বলে মনে হয়। এবং উপর্যুক্ত সমগ্র আলোচনার প্রেক্ষিতে আরও একটি বিষয় অনুমেয় যে, স্থানীয় বাঙালি মুসলমানদের অধিকাংশের পূর্বপুরুষই কোনোকালে হিন্দুধর্ম বা বর্ণাশ্রম ধর্মের অভ্যন্তরে ছিল না।

অষ্টম অধ্যায়ে পীরদের সাফল্যের সম্পর্কে অসীম রায়ের তত্ত্ব নিয়ে আলোচনা করেছেন মি. খান। অসীম রায় তার The Islamic Syncretistic Tradition in Bengal বইতে বাংলার পীরদের সাফল্যের ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন। তিনি পীরদের আধ্যাত্মিক পরিচালক বা পথপ্রদর্শক বলেছেন। আবার অন্যদিকে হিন্দুদের ইসলামধর্মে ধর্মান্তরকরণে কোনো বাধা ছিল না, কেননা ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরকরণে কোনো আধ্যাত্মিক প্রণোদনার প্রয়োজন ছিল না।

এসব বক্তব্য স্পষ্টতই স্ববিরোধী, যা মি. খান তুলে ধরেছেন। বাংলার জল হাওয়া গ্রাম সভ্যতায় চিরকালই ছিল দর্শনের ছড়াছড়ি। এছাড়া হিন্দু বৌদ্ধ ও অন্যান্য ধর্মদর্শনের সাথে ইসলামধর্মের রয়েছে পরকাল ও ঈশ্বর-ভাবনার বিস্তর ফারাক। অসীম রায় গণধর্মান্তরের কথা বলেছেন। এর পক্ষেও বিশেষ কোনো তথ্যপ্রমাণ পাওয়া যায় না। মি. খানও বিষয়টিকে অস্বীকার করার চেষ্টা করেছেন। তবে এ ক্ষেত্রে আমাদের ধারণা মুসলমান ধর্মপ্রচারকদের মধ্যে তিনটি ধারায় এই কার্যক্রম সচল ছিল। ১. আলেম-ওলামা বা ইসলামি পণ্ডিতগণ, যাদের উপস্থিতি আমরা খলজি আমল থেকেই পাই, এরা প্রচুর মাদরাসা-মসজিদ স্থাপন করে ইসলামি শিক্ষা ও সংস্কৃতি প্রসারের মাধ্যমে ধর্মান্তরকরণে একটা বিশেষ ভূমিকা রেখেছিলেন। বিশেষ করে সমাজের উচ্চ শ্রেণির মধ্যে এদের ব্যাপক প্রভাব ছিল বলে মনে হয়। ২. শিক্ষিত পীর এবং দরবেশগণের ভূমিকা, এরা তাদের খানকা এবং শিষ্যদের মাধ্যমে নেটওয়ার্ক তৈরি করে সক্রিয় ধর্মান্তরকরণে ভূমিকা রেখেছেন। মধ্যবিত্ত শ্রেণির উপর এদের প্রভাব বেশি থাকলেও উচ্চবিত্তরা এদের যথেষ্ট সমীহ করতেন এবং অন্ত্যজ শ্রেণির উপরেও এদের প্রভাব ছিল। ৩. ফকির-দরবেশ, আধ্যাত্মিক ভবঘুরে শ্রেণির ধর্মপ্রচারকগণ। যাদের প্রবল উপস্থিতি ছিল অন্ত্যজ শ্রেণির মধ্যে, বিশেষ করে প্রান্তিক জনপদের এনিমিস্ট বা জড়-পূজারিদের মধ্যে। মৃত্যুর পরে এই দরবেশদের ঘিরে তৈরি হতো নানা রকম মিথ বা উপকথা। আবার মৃত্যুর পরেও এরা কোনো ভক্তের কারণে নতুন জনপদে উপস্থিত হতেন পৌরাণিক চরিত্র হয়ে এবং ধর্মান্তরকরণের কারণ হতেন।

নবম অধ্যায়ে আকবর আলি খান বাংলায় পীরদের সাফল্য সম্পর্কে রিচার্ড ইটনের তত্ত্ব নিয়ে আলোচনা করেছেন। সমগ্র গ্রন্থের মধ্যে এই অধ্যায়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়েছে। বাংলার মধ্যযুগের ইতিহাসকে প্রথম একটি তাত্ত্বিক কাঠামোর মধ্যে আলোচনা করার জন্য তিনি ইটনের প্রশংসা করেছেন। তবে অত্যন্ত মেধাদীপ্ত আলোচনায় মি. খান ইটনের তত্ত্বের বিরুদ্ধে ১৪টি পয়েন্ট দাঁড় করানোর কথা বলেছেন এবং খানের বক্তব্য অনুযায়ী যার একটি সত্য প্রমাণিত হলে ইটনের তত্ত্ব ধোপে টিকবে না। উল্লেখ্য মি. খানের মতে বাংলায় ইসলাম প্রচারের সাফল্য সম্পর্কে ইটনের ব্যতিক্রমধর্মী বক্তব্য যেসব অনুমান সমূহের উপর দাঁড়িয়ে, তা যে অভ্রান্ত, ইটন তা প্রমাণ করতে পারেন নি। এই আলোচনায় আমরা কয়েকটি পয়েন্ট উল্লেখ করছি। ১. ইটনের সীমান্ত তত্ত্বের অপ্রাসঙ্গিকতা যা বাংলার মতো ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চলে খাপ খায় না এবং রাজনৈতিক শক্তির পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে প্রসারিত হওয়ার বিষয়। ২. ইটন কর্তৃক নদীর খাত পরিবর্তনের প্রভাব অতিরঞ্জন। ৩. বাংলার অভিবাসন সম্পর্কে ইটনের ভুল ধারণা, কারণ বাংলায় দক্ষিণাঞ্চলে নতুন চর উঠলে শত শত মাইল দূর থেকে লোক এসে তাতে বসতি স্থাপন করে না, মূলত পার্শ্ববর্তী লোকেরাই সেখানে সুবিধামতো মাইগ্রেট করে। ৪. বাংলার জঙ্গল পরিষ্কার করে বসতি স্থাপন প্রক্রিয়া সম্পর্কে ইটনের ভুল ধারণা। মুঘল যুগের নায়ক বলে উদ্যোক্তা পীরদের সম্পর্কে ইটন কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ দিতে পারেন নি বলে মি. খানের মত। যে পাঁচজন পীরের নাম তার বইয়ে উল্লেখ করেছেন তার একজন খান হাজান, যিনি মুঘল শাসন প্রতিষ্ঠার ৬৮ বছর আগে মারা গেছেন। একজন উমর শাহ, যিনি পলাশি যুদ্ধের দুই দশক পরেও জীবিত ছিলেন। আর তিনজন মেহেরপুরের মেহের আলী। হবিগঞ্জের নাসিরউদ্দিন শাহ এবং টাঙ্গাইলের খন্দকার শহীদ আলী। এরা কেউ দক্ষিণপূর্ববঙ্গে ধর্মপ্রচার করেন নি। উল্লেখযোগ্য পীরদের মধ্যে ৮৫ ভাগই মুঘল আমলের আগে বাংলায় এসেছিল। ৫. ধর্মান্তরের জন্য আধ্যাত্মিক প্রণোদনার বিষয়টি অসীম রায়ের মতো ইটনও উপেক্ষা করেছেন। যেটা তার তত্ত্বেরও পরস্পরবিরোধী বক্তব্য। কেননা মুসলমান পীরের কথায় পশ্চিমবঙ্গ থেকে হিন্দুরা পূর্বপুরুষের ভিটেমাটি ফেলে চলে আসবে পূর্ববঙ্গের ঘূর্ণিঝড়প্রবণ চরে, এটা বিস্ময়কর যুক্তি। ৬. অতি অল্প সময়ে গণধর্মান্তরের ভিত্তিতে বাংলায় ইসলাম প্রচার সম্পর্কে ইটনের ধারণাকে ভুল বলে মনে করেন মি. খান। সর্বাধিক ঐতিহাসিক মসজিদ স্থাপনের সময় ১৪৫০-১৫৫০ সাল। এসময়টা মুঘল যুগ নয়। এটা স্বাধীন সুলতানি আমলের অংশ। মি. খানও এই সময়কে তার বইয়ে মুঘল যুগ বলেছেন। যা একটি ভুল তথ্য।

আবার এইসব ঐতিহাসিক মসজিদ সক্রিয় বদ্বীপ অঞ্চলেরও নয়। সর্বোপরি আর যাই হোক ইটনের এই তাত্ত্বিকতা বাংলার ইতিহাসের সার্বিক ব্যাখ্যা বলে মনে করেন না মি. খান।

আর একটা বিষয়—বাংলায় স্থাপনা তৈরিতে কাঠের ব্যবহারই ছিল সর্বোচ্চ। যা দুএক শতাব্দীর মধ্যে নিশ্চিহ্ন হওয়াটাই ছিল স্বাভাবিক। মুসলমানেরা সারা বাংলা জুড়ে ত্রয়োদশ শতাব্দী থেকে হাজার হাজার মসজিদ নির্মাণ করেছিল বলে ধারণা করা যায়। কেননা কয়েক ঘর মুসলমান মিলেই একটি খড়কুটোর ছাপড়া দেওয়া ঘরে মসজিদ নির্মাণের সংস্কৃতি এখনও বাংলার গ্রামপ্রান্তরে সচল। তবে মুঘল আমলে হঠাৎ করেই বাংলার দক্ষিণপূর্বাঞ্চলে মুসলমান বেড়ে যাওয়া, ধর্মান্তরকরণ, ইটনের এই ধারণার সাথে ইতিহাসের তথ্যের বৈপরীত্য লক্ষ করা যায়। কেননা মুঘল আমলে ধর্মান্তরকরণের ব্যাপারে নিরুৎসাহিত করার উদাহরণ রয়েছে। এ ব্যাপারে সুবেদার ইসলাম খানের শাস্তি দেওয়ার কথাও আমরা জানি। তবে মুঘল আমলের শুরুতে দক্ষিণবঙ্গে মুসলমানদের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার একটি প্রধান কারণ ছিল সুলতানি বাংলার অভিজাত-সামান্ত-ভূঁইয়া এবং আফগান রাজনৈতিক শক্তি মুঘলদের হাতে বিতাড়িত হয়ে দক্ষিণবঙ্গে আশ্রয় নেওয়ার ঘটনা। মুঘলদের নৌজাহাজগুলো ছিল ভারী। দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন ডুবো চরে প্রায়ই আটকে যেত। বিপরীতে আফগান-নেতৃত্বাধীন সমরজোট ছিল স্থানীয়ভাবে অভিযোজিত, ফলে তারা প্রায়ই ছোট ছোট নৌযানে করে এসে গেরিলা আক্রমণ করে চলে যেত। যে কারণে দক্ষিণবঙ্গ জয় করতে মুঘলদের যথেষ্ট বেগ পেতে হয়েছে। এই বর্ণনা আমরা পাই একজন প্রত্যক্ষদর্শীর কাছ থেকে। মি. আকবর আলি খান হয়তো খেয়াল করেন নি, মির্জা নাথানের বাহারিস্থান-ই-গাইবি-তে এই ঘটনার বর্ণনা রয়েছে।


মি. খান বলেছেন, বিশেষ করে পূর্ববঙ্গ অঞ্চলে হিন্দুদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও আচরণ পুরোপুরি বৈদিক ছিল না।


দশম অধ্যায়ে আকবর আলি খান বাংলায় পীরদের ইসলাম-প্রচারের সাফল্য হিসেবে তার উন্মুক্ত গ্রামতত্ত্বের উপস্থাপন করেছেন। এটি রিচার্ড এম ইটনের সৃজনশীল তত্ত্বের চেয়েও বেশ বাস্তবধর্মী হয়েছে। কিন্তু এটি পরিপূর্ণ কোনো তত্ত্ব বা প্রধান কারণ বলে প্রতীয়মান হয় না। শুরুতে আকবর আলি খান প্রথম প্রজন্মের ঐতিহাসিকদের পাঁচটি ধারণা নিয়ে আলোচনা করেছেন : ১. যারা মনে করেছেন পশ্চিম এশিয়া থেকে আসা মুসলমানদের বংশধরেরাই অধিকাংশ বাঙালি মুসলমান; ২. মুসলমান শাসকেরা জোড় করে স্থানীয়দের ধর্মান্তরিত করেছেন; ৩. ধর্মান্তরকরণের কারণ উচ্চবর্ণের হিন্দুদের দ্বারা নিম্নবর্ণের হিন্দুদের নির্যাতন; ৪. পূর্ববাংলায় অধিকাংশ বৌদ্ধধর্মাবলম্বী ছিল, যারা মুসলমান হয়েছে; ৫. সুফি-দরবেশদের ইসলামপ্রচারের কারণেই বাংলায় মুসলমানের সংখ্যা বৃদ্ধি হয়েছে।

এর পর মি. খান দ্বিতীয় প্রজন্মের ঐতিহাসিকদের চার ধরনের তত্ত্বের কথা বলেছেন। চার ধরনের তত্ত্ব কী তা পুরাপুরি উল্লেখ করেন নি। তবে অসীম রায়ের তত্ত্ব উল্লেখ করে সংঘবদ্ধ পীরদের ভূমিকা পর্যালোচনা করেছেন। ইটনের ব-দ্বীপ তত্ত্বের উল্লেখ করেছেন এবং তার উন্মুক্ত গ্রামতত্ত্বের কথা বলেছেন।

আমাদের মনে হয়, প্রথম প্রজন্মের ঐতিহাসিকদের কোনো তত্ত্বই যেমন পুরোপুরি ঠিক নয় তেমনি পুরোপুরি বেঠিকও নয়। একমাত্র ইটনের তত্ত্ব বাদে অসীম রায় এবং আকবর আলি খানের তত্ত্বসহ সবগুলো ধারণাই বাংলায় ইসলামপ্রচারের সাফল্যের কারণ।

তবে আকবর আলি খানের উন্মুক্ত গ্রামতত্ত্ব একটি অনুল্লেখকৃত নতুন বিষয়ের উপরে আলো ফেলেছে। বাংলায় জল ও জীবিকার প্রধান উৎস নদী। হাজার হাজার নদী। শত শত মাইল লম্বা নদী। নদীর পাড় ধরে হাজার হাজার গ্রাম। স্বাধীন জীবিকা। স্বাধীন মানুষ। নদীমাতৃক বাংলার চিরায়ত বৈশিষ্ট্য। এখানে কেন্দ্রীভূত গ্রাম গড়ে না ওঠার প্রধান কারণও এটি। তবে সামাজিক শাসন যে একদমই ছিল না তাও নয়।

মি. খান বলেছেন কেন্দ্রীভূত গ্রামে ব্রাহ্মণদের ভয়ে হিন্দুরা ইসলাম গ্রহণ করতে পারে না। তারা দূর থেকেই পীরদের মনে মনে শ্রদ্ধা জানাত। কিন্তু সমরশক্তিতে মুসলমানেরা যে অঞ্চল শাসন করত সেখানে এই প্রতিবন্ধকতাই-বা কতটা শক্ত হতে পারে? ভাবা যেতে পারে। আবার বাংলার পশ্চিমাঞ্চলে যেখানে এমন ব্রাহ্মণ-শাসিত কেন্দ্রীভূত গ্রাম আছে, সেসব স্থানেও তো হিন্দু-মুসলমান যৌথবাসের কমবেশি নজির পাওয়া যায়।

অন্য একটি পয়েন্টে তিনি বলেছেন—ব্যক্তিগত পর্যায়ে ধর্মান্তরকরণের সময় লাগে শত শত বছর। গোত্র বা উপজাতি-সমাজে তা অল্প সময়েই সম্পন্ন হয়। এ ধরনের জনগোষ্ঠী বাংলায় আদৌ ছিল না। এই তথ্যটি সঠিক বলে মনে হয় না। যা আমরা আগেই আলোচনা করেছি। আলোচনার এক পর্যায়ে মি. খান বলেছেন, বিশেষ করে পূর্ববঙ্গ অঞ্চলে হিন্দুদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও আচরণ পুরোপুরি বৈদিক ছিল না। প্রশ্ন হলো, পুরোপুরি কেন? মোটেই তো থাকার কথা নয়। এই ধারণা এবং সংশয়ের প্রধান কারণ হলো আকবর আলি খানদের ভুল প্যারাডাইমে বাংলার ইতিহাস পাঠ। যে কারণে এত বিশ্লেষণের পরও উপসংহারে গিয়ে তাকে বলতে হয় জনসংখ্যায় মুসলমানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ইতিহাসের একটি বড় প্রহেলিকা!

বইটির মধ্যে কিছু তথ্যপ্রমাদ রয়েছে। ২৮ পৃষ্ঠায় ১৯০১ সালের পরিবর্তে ২০০১ লেখা রয়েছে। অসাবধানতাবশত এটা বোঝা যায়। তবে ৩৭ পৃষ্ঠায় ‘সুলতান শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ (১৪৭৪-১৪৮১ খ্রি.) ভগবত গীতাকে বাংলায় রূপান্তরের জন্য মালাধর বসুকে নিয়োগ করেন’—এটি একটি মারাত্মক ভুল, সময় এবং তথ্য দুদিক থেকেই। ‘প্রথমা’র উচিত অবিক্রিত বইগুলো বাজার থেকে তুলে এর সংশোধন করে দেওয়া। ৬৬ নং পৃষ্ঠায়ও এমন ভুল দেখতে পাওয়া যায়। ৮৫ নং পৃষ্ঠায় ১৪৫০ থেকে ১৫৫০ সালকে মুঘল আমল বলা হয়েছে, এটাও একটি ভুল তথ্য। সর্বোপরি বিষয় ও বিশ্লেষণের গভীরে প্রবেশ করার জন্য আলোচনা আরও বিস্তৃত হতে পারত। বিষয়ভিত্তিক অধ্যায়গুলোতে বিশ্লেষণের পরিবর্তে যেন বিশ্লেষণের সার সংক্ষেপ দেওয়া হয়েছে। তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট থেকে এ এক অভিনব সূচনা। স্বাগতম—আকবর আলি খান।


তথ্যসূত্র :

১. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, বাঙালির জাতীয়তাবাদ। দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, ঢাকা, পরিবর্ধিত চতুর্থ সংস্করণ, ২০১৫।
২. নীহাররঞ্জন রায়, বাঙ্গালির ইতিহাস, আদি পর্ব। দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা, পরিমার্জিত অষ্টম সংস্করণ, আষাঢ় ১৪২২ ।
৩. হরপ্রসাদ গ্রন্থাবলী। বসুমতী-সাহিত্য-মন্দির, কলিকাতা।
৪. শ্রীসুখময় মুখোপাধ্যায়, বাংলার ইতিহাসের দুশো বছর স্বাধীন সুলতানদের আমল (১৩৩৮-১৫৩৮)। দিব্যপ্রকাশ, ঢাকা, সেপ্টেম্বর ২০১৮।

রাজু আহমেদ মামুন

জন্ম ১ জানুয়ারি ১৯৭৪; তালতলী, বরগুনা। এমএসএস, সমাজ বিজ্ঞান। পেশায় সাংবাদিক; সম্পাদক, সাপ্তাহিক ধাবমান।

প্রকাশিত বই :
কবিতা—
দহন সংক্রান্তির কবিতা [ম্যাগনাম ওপাস, ২০০৬]
ওঁ নিরর্থকতা ওঁ গতিশাশ্বত [বলাকা, ২০০৮]
ম্যানগ্রোভ মন [কাগজ প্রকাশন, ২০১৭]

ই-মেইল : razumamun@gmail.com